কবিতা সহৃদয়-হৃদয় সংবাদী পাঠক-চিত্ত সাপেক্ষ হলেও তা যদি শুধু সহৃদয়বানকে আকৃষ্ট করে আর বি-হৃদয়বানকে আপ্লুত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই কবিতা তার আকর্ষণ হারায়। কারণ বর্জনে নয়, ক্রমাগত গ্রহণের মধ্য দিয়ে কবির নান্দনিকবোধ, অভ্যন্তরীণ জীবনানুভব, বিশ্লেষণক্ষম- প্রজ্ঞা ও মননশীল সৃজনীশক্তির বাঞ্ছিত সম্মিলনে কবিতা পদ্যের স্তর পেরিয়ে স্বকীয় অবস্থানে উত্তরীত হয়। রহস্যময় ও দুর্বোধ্যময় জগৎ থেকে জন্ম নিয়ে কবিতা ব্যতিব্যস্ত থাকে শিল্প হওয়ার প্রতীক্ষায়। উপন্যাসে রয়েছে বহুস্বরের সন্নিবেশ; কিন্তু কবিতা একোক্তি বা মনোলজিক ভাষা শিল্প। সুতরাং কবিতার চেয়ে কবির মূল্যও কিছুমাত্র কম নয়। নিরন্তর কাব্য সাধনার দ্বারা সিদ্ধ হয়ে কবি হয়ে ওঠেন অপূর্ব বস্তু নির্মাণক্ষম প্রজ্ঞার অধিকারী। দেরিদার টেক্সট (Text) এবং বার্থের লেখক (Author) ভাবনাকে সামনে রেখে; কিংবা স্বায়ত্তশাসিত বাচনিক কাঠামোর (Autonomous Verbal Structure) আলোকে কবিতা পাঠ করতে গেলে অভ্যন্তরীণ সারসত্তার স্বরদ্যোতনার প্রতিচ্ছবি কখনোই দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনানন্দ বলেছেন,
সকল লোকের মাঝে বসে
আমার নিজের মুদ্রা দোষে
আমি একা হতেছি আলাদা
অর্থাৎ কবি সৃষ্টিশীল আনন্দ নিয়েই পথ চলতে চান; তিনি প্রথমে লেখেন নিজের জন্য, তারপর পাঠকের জন্য। কবি সুফী মোতাহার হোসেনের কাব্যপাঠ করার সময় আমাদের এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।
সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭ -১৯৭৫) বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি। বিংশ শতাব্দের ত্রিশের দশকে সাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর আবির্ভাব। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মতো বাংলা কবিতার প্রবাদ-প্রতিম প্রাণপুরুষ না হলেও, তিনি আক্ষরিক অর্থেই অর্থাৎ সংস্কৃত আলঙ্কারিকদের সংজ্ঞার্থ বিবেচনায় রেখেই যথার্থ কবি। সারা জীবন নিজেকে নিবিড়ভাবে সাহিত্যঘনিষ্ঠ রাখায় তিনি সনেট রচয়িতা বা চতুর্দশপদী কবিতার দক্ষ রূপকার হিসেবে সর্বত্র হয়েছেন নন্দিত। কাব্য রচনায় বিভিন্ন আঙ্গিক ও রূপরীতি নিয়ে পরীক্ষায় ব্রতী হলেও, সনেট রচনা করেই তিনি কাব্যখ্যাতি লাভ করেছিলেন। উল্লেখ্য সেই সময়ে মুসলিম কবিদের মধ্যে সনেট রচনা একটা রমরমে ব্যাপার ছিল। অনেকেই সনেট রচনা করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তবে তাদের মধ্যে সুফী মোতাহার হোসেন, রিয়াজ উদ্দিন চৌধুরী, আবদুল কাদির, বেনজীর আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, হুমায়ুন কবির প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে এই ধারায় লিখে যাওয়ার দুঃসাহস কেবল তিনিই দেখিয়েছেন। আরও একটি বিস্ময়ের ব্যাপার তিনি তার জীবন যন্ত্রণার বিকল্প হিসেবেই কবিতা রচনা করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু তাতে নেই কোনো অশুভের বোধ। সে জন্য কবিতায় তার জীবনচেতনা ভিন্নরূপ ও গন্ধ নিয়ে আবির্ভূত হয়। শব্দকে অন্তরাত্মায় সঞ্চারিত করে তাকে তিনি মানুষের মর্ম মূলে বিদ্ধ করতে চান।
সুফী মোতাহার হোসেন ১৩১৪ সালের ১২ই ভাদ্র (মতান্তরে ২৫ শে ভাদ্র) ফরিদপুর জেলার ভবানন্দপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ হাশিম বেঙ্গল পুলিশের একজন সাবইন্সপেক্টর ছিলেন। সুতরাং পিতার কর্মসূত্রেই তিনি শৈশবে ফরিদপুর, বরিশাল, বীরপাশা, ভবানন্দপুর, কুমিল্লাসহ আরও অনেক জায়গা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। অল্প বয়সেই এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁকে কিছুটা খেয়ালি ও ধ্যানী করে তোলে। ছাত্রজীবনে বেশ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে ১৯২০ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২২ সালে চার বিষয়ে লেটারসহ আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তার চিন্তাধারা আরো শাণিত হয়, দৃষ্টি হয় বহুদূর ব্যাপ্ত। ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা ধীরে ধীরে প্রাণ পেয়ে উন্মোচিত হতে থাকে। সেখানে আবদুল কাদির (ছান্দসিক কবি), আবুল ফজল, আতাউর রহমান খান (প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ) প্রমুখ ব্যক্তি ছিলেন তার সহপাঠী। উল্লেখ্য, যে বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, সে বছরই তিনি সৈয়দা আছিয়া খানমের দার পরিগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই তিনি সনেট রচনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এই তিরিশের দশকেই তার পদপাত স্পষ্ট ও সাবলীল হয়। এ সময়ই তার সনেট ‘দিনান্তে’ কলকাতার বিখ্যাত ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই কবিতা পড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং এটি তার সম্পাদিত ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। বিশিষ্ট কবি, সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার তাকে বলেছিলেন, ‘যদি তুমি কেবল সনেটের সাধনাই কর-তবে মুসলমানদের মধ্যে তুমি সনেটকার হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।’ তাঁর এই আশ্বাস কালের কপোলতলে অবসিত না হয়ে পরিণত হয়েছে আপ্ত বাক্যে। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার জন্য কর্মজীবনে তিনি দারিদ্র্যের হাত থেকে রেহাই পাননি। উপরন্তু ১৯৬৬ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিনি পক্ষাঘাত গ্রস্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন পক্ষাঘাতগ্রস্ত থেকে এবং বাকশক্তিহীন অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেন।
সুফী মোতাহার হোসেনের জীবন ছিল সর্বতোভাবে শিষ্ট ও নিবেদিত। তিনি ভারতবর্ষের বিভক্ত হওয়া পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যদিও তার প্রভাব তাঁর খুব বেশি লেখায় দেখা যায় না। তবে বিভাগের পূর্বে তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। এটাও অবশ্য বিস্মিত করে আমাদের। কারণ সমসাময়িক কালের অধিকাংশ কবির কাব্যগ্রন্থই বিভাগের পূর্বে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছিল। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে ‘সুফী মোতাহার হোসেন সনেট প্রকাশনা পরিষদ’ গঠিত হয়। এই পরিষদই তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সনেট সংকলন’ প্রকাশ করে। এ প্রসঙ্গে কবি নিজেই লিখেছেন,
“আমি ফরিদপুরের লেখক বলেই ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র ও অধ্যাপকমণ্ডলী আমার রচনা সংকলন ও প্রকাশে আগ্রহশীল হন। এবং একমাত্র তাদেরই অর্থানুকূল্যে ও প্রযত্নে ঢাকা ও কলিকাতার বিশিষ্ট মাসিক পত্রিকাদিতে প্রকাশিত আমার সনেটসমূহ থেকে একশত সনেট যোগে এই ‘সনেট সংকলন’ এতদিনে প্রকাশিত হল।”
এই গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৬৬ সালে তিনি ‘আদমজী সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। আদমজী পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর কবিখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাপকভাবে সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তার কাব্যচর্চার পথ অধিকতর সুগম হয়। ১৯৬৮ সালে ঢাকার ‘পূবালী প্রকাশনী’ থেকে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুরের ‘ওরিয়েন্টাল পাবলিশার্স’ ২৪টি কবিতা নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সনেট সঞ্চয়ন’ প্রকাশ করে। ১৯৭০ সালে ঢাকার ‘সোসাইটি ফর পাকিস্তান স্টাডিজ’ প্রকাশ করে তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সনেট মালা’। এতে স্থান পায় ৫৫টি কবিতা। তা ছাড়া দুই বাংলার অসংখ্য সংকলন গ্রন্থে তাঁর বিপুল সংখ্যক কবিতা সংকলিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সেগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণের তেমন কোনো উদ্যোগ অদ্যাবধি প্রতীয়মান হয় না। বিদ্বৎজনদের উচিত অনতিবিলম্বে তাঁর কবিতাগুলো সংগ্রহ করে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করা। গুণী এই কবি ১৯৭৪ সালে পেয়েছেন সম্মানজনক ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’।
সুফী মোতাহার হোসেন মনে প্রাণে একজন বাঙালি ছিলেন। তাঁর বাঙালি চেতনার একটা স্বাভাবিক উপাদান বঙ্গভূমির প্রকৃতি। সে কারণেই হয়তোবা জীবনানন্দ তাঁর এক অন্তঃপ্রেরণা। কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা নয়। তিনি যে বিশেষ রীতিতে কাব্যচর্চা শুরু করেন, তার জন্য মাইকেল মধুসূদন দত্তকে অনুসরণ করা জরুরি ছিল। তিনি তা-ও করেছেন। আমাদের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে এই যে, আঙ্গিকের ক্ষেত্রে মধুসূদন দত্তকে নমস্য করলেও আসলে তিনি জীবনানন্দের পথেরই পথিক, তাঁরই রূপসী বাংলার অনুবর্তী। তাছাড়া গঠনরীতি ও ভাব বিন্যাসের দিক থেকে তাঁর কবিতাকে পৃথক করা না গেলেও, শান্ত নিসর্গ প্রীতি এগুলোকে অন্তর্মুখ পরিক্রমায় স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে। ‘মায়ামৃগ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন,
শ্রাবণ বর্ষণ স্নিগ্ধ ঘন শ্যামতরু বীথিকার
ঘনঘোর ছায়া হতে দিগন্তের রেখা অনুসরি
কোন এক মায়া-মৃগদিবা-নিশি ফিরিছে সঞ্চরি
মেঘাচ্ছন্ন ধরা তলে স্বপ্ন সমগূঢ় চমৎকার।
যতো তারে গাঢ় বর্ষা তীক্ষ্ণ শরহানে বারম্বার
ততো সে দুরন্ত মৃগ ছুটে চলে পক্ষ মুক্ত করি
চঞ্চল উলাস ভরে দিশেদিশে দিবস শর্বরী
লঙ্ঘিয়া সাগরগিরি অবহেলী কানন – কান্তার
সনেটের চারিত্র্য, আঙ্গিক ও রূপরীতির নিরিখে একে বলা যায় ‘মুহূর্তের কবিতা’। কারণ এর মধ্যে যেকোনো বিষয়ের আংশিক দিক ধরা পড়ে মাত্র। কিন্তু এই কবিতাটিতে সময়ের সে নির্ধারিত গণ্ডি মান্য করা হয়নি। ধীরে ধীরে তাঁর এ জড়তা কাটতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তিনি নিশ্চল ছবিকে চলচ্চিত্রের মতো প্রাণ দান করে সজীব করে তোলেন। এক্ষেত্রে তাঁর কল্পনার কোনো প্রকার দীনতা পরিলক্ষিত হয় না। ‘ঊষা’ নামক কবিতায় তিনি লিখেছেন,
রাত্রির আঁধার শেষে ঊষা বালা সিঁদুর বরণ
কখন বুলায় আসি শুভ্র বর্ণ আলোর অঙ্গুলি
সুপ্ত ধরণীর, শিরে, আলো স্পর্শে জাগিয়া ব্যাকুলি
বিহঙ্গেরা গাহে গান মাঙ্গলিক করি উচ্চারণ।
স্বর্ণময়ী ঊষাবালা জ্যোতির্মালা করিয়া ধারণ
দিগন্ত রাঙায়ে তুলে, বিশ্ব পদ্ম মেলে দলগুলি
সুবর্ণ অঞ্চল তার জ্যোতি জালে উঠে যেন দলি
ক্ষণেকের সৌন্দর্যের স্পর্শে জাগে জগৎ জীবন।
এ পর্যায়ে এসে আমরা দেখছি যে, ‘ক্ষণবাদ’ সম্পর্কে তাঁর বোধ এবং কবিতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা যথেষ্ট পোক্ত হয়েছে। তৎকালীন সময়ের যে সব কবির কবিতায় চিন্তার ছাপ আছে তিনি তাঁদের একজন। তাঁর কবিতা বিশেষ শব্দায়তনে নিগড় বদ্ধ হলেও, চেতনা-জগৎ ছিল রোম্যান্টিক। টি. এস. এলিয়ট মন্তব্য করেছিলেন : ‘Words move, music moves only in time, but that which is only living can only die. Words, after speech, reach into the silence.” সুফী মোতাহার হোসেনও তেমনি প্রাণ সঞ্চারী, নান্দনিক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে শব্দের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সচেষ্ট ছিলেন।
প্রেমকে উপজীব্য করেও অসংখ্য কবিতা লিখেছেন মোতাহার হোসেন। প্লেটো প্রেমের তিনটি পর্যায়ের কথা বলেছিলেন- বস্তুগত প্রেম (physical beauty), মননশীল প্রেম (intellectual beauty ও বিমূর্ত প্রেম (absolute beauty)। বস্তুগত প্রেম থেকে চিন্তা জগতের প্রেমে উত্তরণ, পরে ধ্যান জগতে বিমূর্ত হয়ে ওঠা প্রেমকে পাওয়ার কথাই প্লেটোর প্রেম-দর্শনের ইতিকথা।’ অর্থাৎ একটির পর একটি স্তর অতিক্রম করে অগ্রবর্তী হতে হয় প্রেমকে। তবে তাঁর প্রেম ভাবনাকে নিওপ্লেটোনিক বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ রবীন্দ্রনাথ তাঁর জাদুকরী প্রতিভার স্পর্শে সেটি সহজেই পেরেছেন; কিন্তু মোতাহার হোসেন তাঁকে অনুসরণের নিষ্ফল চেষ্টা করেছেন। এটিকে তাঁর প্রতিভার সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করা যায়। শরীর-সর্বস্ব প্রেমের কথা তাঁর কাব্যে নেই, নেই উপভোগের তৃষ্ণাও। প্রেম ও কামকে তিনি দেহ-বাস্তবতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি নারীর রূপ-সৌন্দর্যের বর্ণনাকেই করেছেন মুখ্য, তাতে নেই কোনো দেহজ আবেদন।
সুফী মোতাহার হোসেন সেই সময়ের কবি, যখন জীবন আর মাহাত্ম্যবান নয়, বরং নিরানন্দ এবং অর্থহীন। মানুষ তখন পরিণত হয়েছিল পুঁজিরকীটে, এখনও তার খোলস ত্যাগ করতে পারেনি। মানুষ অদ্যাবধি পুঁজির ক্রীড়নক হিসেবেই বিবেচিত। বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্বের জটিল সমীকরণে না গিয়ে মোতাহার হোসেন লীন হতে চেয়েছেন প্রকৃতির মাঝে, লালন করেছেন মানবতাবাদী দর্শন। জীবনের জটিলতা, ঔপনিবেশিক শাসনের দৌরাত্ম্যের প্রবল প্রতাপে একটুও বিপর্যস্ত না হয়ে সুনির্দিষ্ট বৃত্তের ভেতরে থেকেই পা রাখতে চেয়েছেন আলোর অধ্যায়ে। তাঁর অনুভূতিশীল ও উদ্ভাসিত হৃদয় তাই দেশের গণ্ডি অতিক্রম করেছে সহজেই। তাঁর কবিতায় বিশ্ব-শান্তি ও মানব-মৈত্রী নবতর ছন্দে স্পন্দিত হয়েছে। ‘মানবতা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন,
মানবে মানবে মহামিলনের সূচির স্বপন
বিশ্ব মঙ্গলের লাগি তাই সে সাজায় বারেবারে
বিশ্ব মানবতা তার-ঐক্য ছন্দে বাঁধিয়া সবারে
তাই সে নিবিড় করি, সত্য লাগি করেন বপন।
মোতাহার হোসেন শিল্পের কাছে দায় বদ্ধ ছিলেন, পুঁজির কাছে নয়। তাই নৈরাশ্যের অতলতলে অবগাহন না করে তিনি ব্যক্ত করেন দৃঢ় প্রত্যয়। সে জন্য তাঁর কবিতায় মানবতা বোধ স্বপ্নোত্থিত সৃজনশীলতায় সৃষ্টি হয়ে বাস্তবতার চৈতন্য স্রোতে অভিষিক্ত হয়েছে।
কোনো কোনো সমালোচক মোতাহার হোসেনকে সুররিয়ালিস্টিক কবি হিসেবে অভিহিত করতে চান। তবে তা আদতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ পরাবাস্তববাদীরা সব সময় এক ধরনের উচ্চস্তরের অধিবাস্তবের কথা বলেন। তাঁদের মূলমন্ত্র : ‘To create a super reality in which real and unreal, meditation and action meet and mingle.” কিন্তু কোনো উচ্চতর অধিবাস্তব নয়, বরং তাঁর কবিতায় আমরা ইউটোপিয়ার আবেশ প্রত্যক্ষ করি; সেটাকে জেগে দিবাস্বপ্ন দেখা বলা যেতে পারে। চেতন মনের খোলস তিনি খুব বেশি ছাড়তে পারেননি। ১৯২২ সালে ডাডাবাদী আন্দোলনের পরিসমাপ্তি হলে ব্রেঁতওআরাগঁ পরাবাস্তববাদ (surrealism) -এর সূত্রপাত ঘটান। ব্রেঁতএর মতে, ‘Psychological automatism’- ই হল পরাবাস্তবতার মূল উপায়। প্রত্যাশিত ভাবেই এটিরও কোনো প্রভাব মোতাহার হোসেনের কাব্যে নেই। সুতরাং কোনো পাশ্চাত্য তত্ত্বের মানদণ্ড ধরে নিয়ে, সেই মাপকাঠিতে তাঁকে বিচারনা করে, বরং তাঁর কবিতাগুলো বিশ্লেষণের দ্বারা তাঁর কবিসত্তার স্বরূপ নির্ণয় করা যেতে পারে। মানুষ কর্মের মাঝেই তার অস্তিত্বকে বহমান রাখে। সার্তের ভাষায়, ‘Since there is no pre – established pattern for human nature, each man makes his essence as he lives.’ সুতরাং পূর্বনির্ধারিত তত্ত্বের ছকে ফেলে নয়, কবির ব্যক্তি সত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে কাব্য- বিশ্লেষণের ঘরানা তৈরি করা আশু আবশ্যক।
সভ্যতার অগ্রগমনের হাত ধরে এগিয়েছে সময়, প্রসারিত হয়েছে চিন্তার ব্যাপ্তি। সুফী মোতাহার হোসেন তাঁর সনেটের মাধ্যমে মানুষের শুভবোধ ও কল্যাণ তৃষ্ণা জাগ্রত করে কুসুমিত সভ্যতা নির্মাণ করতে চেয়েছেন। জাতীয় আর বৈশ্বিক টানাপড়েনের গভীর সংকটের সময় তিনি প্রত্যাবর্তন করেছেন প্রকৃতির কাছে, হয়েছেন ঐতিহ্যমুখী। অস্থিরতা বদলে দেয় ছন্দের গতি, সে জন্য বারবার বদলেছে তাঁর সনেটের ধারা। শুধু বিষয়বস্তু (context) নয়, আঙ্গিকও (form) লেখকের বক্তব্য উপস্থাপনের বৃহৎ ক্যানভাস হতে পারে। তাই বিষয়বস্তুর অতোটা চমৎকারিত্ব না থাকলেও, আঙ্গিকের নিয়ন্ত্রিত ভাঙা-গড়া তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অনন্যের স্বীকৃতি। বিষয়ের উপরে অলংকারের অহংকার থাকলেও তাঁকে সুদক্ষ কারিগরের তকমা দিতে কালবিলম্ব করতে হয় না পাঠক-সমালোচককে। সুফী মোতাহার হোসেনের স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে বিশিষ্ট সমালোচক ও প্রাবন্ধিক আবদুল হক বলেছেন,
“সুফী মোতাহার হোসেন সম্পর্কে একটি কথা বিশেষভাবে বলার প্রয়োজন রয়েছে। এ যুগের অনেক কবিই সনেট জাতীয় অনেক কবিতা লিখেছেন এবং কাব্যের বিচারে সে-সব কবিতার অনেকগুলোই উঁচু দরের কিন্তু সনেটের যে একটা বিশেষ টেকনিক রয়েছে, সে দিক দিয়ে বিচার করলে হয়তো দেখা যাবে, এসব সনেটের অনেকগুলোই হয়তো সনেট নয়। এদিক দিয়ে সুফী মোতাহার হোসেন সতর্ক এবং অভ্রান্তশিল্পী। যখন থেকে তিনি লিখছেন, তখন থেকে সবচেয়ে সার্থক এবং সঙ্গতি যুক্ত সনেট, বিশেষ করে পেত্রাকান টাইপের সনেট যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর স্থান অত্যন্ত উঁচুতে। অন্ত্যানুপ্রাসের বিন্যাস, অষ্টক ও ষটকের সংগঠন, যেদিক দিয়াই দেখা যাক তিনি এ টাইপের সনেটে ‘ব্যাকরণের’ বিশুদ্ধ অনুসারী, স্বচ্ছন্দ রূপকার; এর আত্মাকে তিনি সঠিকভাবে বাংলা কবিতায় বিধৃত করেছেন।”
কবিতা যে এক ধরনের শিল্প এবং তার জন্য যে নিরন্তর সাধনা ও পরিশীলিত পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে- তা সুফী মোতাহার হোসেনের অকৃত্রিম ঐকান্তিকতায় অন্বিষ্ট। সদা-সতর্ক দৃষ্টির সাথে, তাঁর কবিতায় রয়েছে উচ্চারণের শক্তি। অবচেতন ও চেতনের মধ্যে দেয়াল তুলে নয়, বরং স্বপ্ন ও সত্যকে পৃথকভাবেই দেখতে চেয়েছেন তিনি। ঐতিহ্যের শক্তির স্বরূপ প্রকাশ আর নানা মাত্রায় তাকে পুনর্নির্মাণ পাঠকের চেতনাকে করে তোলে বিলোড়ন- মুখর। সনেটকে উৎকর্ষের দ্বারে পৌঁছে দেবার প্রত্যয়ে যারা নিরন্তর সক্রিয় ছিলেন-সুফী মোতাহার হোসেন নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতম। ছন্দ-ভাবনায় কুশলী আর কবিতা-শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ এই কবি নিভৃতে করেছেন সনেটচর্চা; পরিব্রাজন করেছেন সনেটের মুক্তরাজ্যে গভীর মমতায় ও সহজাত আন্তরিকতায়।
গ্রন্থঋণ :
১. মোহাম্মদ মাহফুজউলাহ, সুফী মোতাহার হোসেন :
১৯০৭-১৯৭৫, ঢাকা
২. আবদুল কাদির (সম্পাদিত), সনেট-শতক, চট্টগ্রাম।
৩. আবদুল কাদির (সম্পাদিত), বাংলা সনেট, ঢাকা।
৪. বন্দে আলী মিয়া, কাব্য-বীথিকা, ঢাকা
৫. ডক্টর এনামুল হক, মুসলিম বাংলাসাহিত্য, ঢাকা।
৬. কাজী দীন মুহম্মদ, সাহিত্য-সম্ভার, ঢাকা।