মর্জিনা বেগম নামটা শুনেই আঁতকে উঠলো ডা: শিহাব। চোখের সামনে ভাসছে এক নারীর মুখ। এক ভয়ঙ্কর দজ্জাল নারীর মুখ। নির্দয় হাতে কাঠের স্কেল দিয়ে পিটাচ্ছে তাকে। যেন কোন গুরুতর অপরাধের দোষী সে। শিহাব ছাড়া পাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু ততক্ষণে তার চুলের মুঠি চেপে ধরেছে। মাথা ঠকাঠক ধাক্কা মারছে দেয়ালের গায়ে। উহু কী নরক যন্ত্রণা, কী কষ্ট, চোখ দিয়ে তারা ছুটে যাচ্ছে। মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। অসহায়ের মতো সে গোঙাচ্ছে। তবুও দজ্জাল সৎ মা তাকে ছাড়ছে না। ঐ দিকে বাবা চুপচাপ। একদম কাঠের পুতুল। একটা কথাও বের হচ্ছে না তার মুখ থেকে। কথাগুলো মনে হতেই ডা: শিহাবের হৃৎপিণ্ড ধক্ ধক্ করে উঠলো। শিরা উপশিরায় রক্ত কণিকাগুলো দাপাতে শুরু করলো। সে চোখ থেকে চশমা খুলে ফেললো, আবার আটকালো। ভালো করে পরখ করতে লাগলো সামনের বয়স্ক রোগিনীকে। হ্যাঁ হ্যাঁ সেই চোখ, সেই মুখ, সেই মুখের তিল। তবে বয়সের ভারে শরীরটা সামান্য নোয়ানো। মুখে দাঁত নেই বললেই চলে। মাথার চুলগুলো পাটের আঁশের মতো। কাল প্রবাহের বাঁকে তিনি এখন বয়স্ক নারী। কী করবে ডা: শিহাব! প্রতিশোধ নেবে? ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে? কিন্তু তা কী করে হয়! সে তো একজন চিকিৎসক। মানবসেবাই তো তার ধর্ম। তাহলে কী করবে সে? ঐ দিকে জানালার ফাঁক ফোকর দিয়ে শেষ বিকেলে ছোট ছোট তির্যক আলোর রেখা প্রবেশ করছে ঘরে। দেয়ালে বিচিত্র ছায়াচিত্র তিরতির করছে। সেই দিকে তাকিয়ে বেদনার সরোবর থেকে মাথা তুললো ডা: শিহাব। মুখোমুখি হলো মর্জিনা বেগমের দিকে। বললো আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন ?
– জি হ্যাঁ, শান্ত গলায় উত্তর দিল মর্জিনা বেগম। ওখানকার ডাক্তার সাহেব বলেছেন আমার নাকি ক্যান্সার হয়েছে। তাই কলকাতায় এলাম। আমাকে একটু ভালো করে দেখুন ডাক্তার সাহেব।
– অবশ্যই দেখবো এটা আমাদের দায়িত্ব। দেখি আপনার কাগজপত্র। ডা: শিহাব ফাইলে চোখ বুলাতে লাগলো। ব্যবস্থাপত্রে রোগের ইতিহাস আছে। ডাক্তার সাহেবের ঠিকানা আছে। কিন্তু রোগীর নাম ছাড়া কোনো ঠিকানা নেই। সুতরাং আরও নিশ্চিত হবার জন্য ডা: শিহাব জিজ্ঞেস করলো বাংলাদেশের ডাক্তার সাহেব তো রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। আপনি কি রাজশাহী থাকেন।
– জি হ্যাঁ, সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল মর্জিনা বেগম।
অঙ্ক যেন মিলে গেছে, ডা: শিহাব ঢোক গিলে আবার জিজ্ঞেস করলো সঙ্গে কে এসেছে?
– আমার এক ভাইয়ের ছেলে
– কেন আপনার স্বামী কিংবা নিজের ছেলে মেয়ে?
– না কেউ আসেনি, আমি নিঃসন্তান। আর আমার স্বামী চাকরি অবস্থায় মারা গেছেন।
ডাক্তার শিহাবের মাথার ভেতর যেন গোলার বিস্ফোরণ হলো। তাহলে বাবা মারা গেছেন। অনেক দিন থেকেই ভাবছিল বাংলাদেশে গিয়ে একবার দেখা করে আসবে। কিন্তু তা হয়ে উঠেনি। এর জন্য দায়ী তার ব্যস্ততা নাকি তার রাগ, অভিমান, ডা: শিহাব তা তলিয়ে দেখেনি। তবে এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে সে একটা মহা ভুল করেছে। সে ভুলের মাশুল দেওয়া আর সম্ভব নয়। ভেতরে মাথাচারা দেওয়া এক অবাধ্য কান্নাকে সে অতি কষ্টে সংহত করে মর্জিনা বেগমকে বললো, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কাল আসুন।
চেম্বার থেকে ফেরার পথে ডা: শিহাব লক্ষ্য করলো রাতের আকাশে কোথাও তারা নেই। দু-এক জায়গায় বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল থেকে থেকে। ক’দিন থেকে আকাশের এমন অবস্থা, কালো মেঘের আনাগোনা ছিল, বৃষ্টি নামছিল না। আজ বোধ হয় বৃষ্টি নামবে। বাসায় গিয়ে ড্রইং রুমে প্রবেশ করে দেখলো স্ত্রী নার্গিস মনোযোগ সহকারে টেলিভিশন দেখছে। আজকাল কিছু চ্যানেলে এমন কিছু সিরিয়াল দেখায় যেগুলো না দেখলে মেয়েদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ডা: শিহাব তার উপস্থিতি জানান দিল বটে তবে নার্গিসের মনোযোগের বিঘ্ন ঘটালো না। শোবার ঘরে প্রবেশ করলো এদিকে সত্যি সত্যি বৃষ্টি নেমে গেছে। প্রবল বৃষ্টি, পানির ছাট আসছে জানালা দিয়ে। ডা: শিহাব তাড়াতাড়ি জানালার পাল্লা বন্ধ করলো। কাপড় চোপড় ছাড়লো। হাতমুখ ধুয়ে নিল। ততক্ষণে নার্গিস পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সেই ভুবন ভোলানো হাসি হেসে বললো, তুমি একটু বিশ্রাম নাও না, চা নাস্তা পরে দিচ্ছি। ডা: শিহাবের নিজের মনের অবস্থা বুঝতে দিল না। মৃদু হেসে সম্মতি জানালো। নার্গিস ড্রইং রুমে যেতেই ডা: শিহাব ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিল। মেঘের ডাক মুহূর্তের জন্যও থামছে না। বৃষ্টির শব্দে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গেছে। ড্রেসিং আয়নার সামনে দাঁড়ালো সে। নিজেকে আবার নতুন করে দেখলো, কী মনে করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিল। বিছানায় শুয়ে পড়লো, হলিউডের সর্বকালের সেরা অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের বাল্য কৈশোর নাকি কেটেছে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায়। কাজের সন্ধান, খাদ্যের সন্ধান পদে পদে খেয়েছে চড় থাপ্পড়। আবার নিজের ঘুমানোর জায়গা ফুটপাথে, পার্কে কাঁদতে গিয়েও পাবলিকের হাতে খেয়েছে, চড়, থাপ্পড়। এ জন্য পিতা-মাতাহীন অসহায় চার্লি চ্যাপলিন কান্নার মোক্ষম সময় বেছে নিয়েছিলেন ঝম-ঝম বৃষ্টির ভেতর। বৃষ্টির সময় তিনি সোজা নেমে পড়তেন সড়কে। প্রাণ খুলে কাঁদতেন। তাতে চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে যেত। অথচ কেউ আঁচ করতে পারতো না। সেরূপ ডা: শিহাবও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। অথচ ড্রইং রুমে তার স্ত্রী কিছুই আঁচ করতে পারলো না। কিন্তু এই কান্না কিসের? তার দুঃখ বেদনার জন্য নাকি পিতার মৃত্যুর শোকে। হয়তো দুটোই। কষ্টের স্মৃতিরা আবার অতীত থেকে মাথা তুলেছে। আবার বাবার মৃত্যুর খবরও তার বুক বিদীর্ণ করে ফেলছে।
নিজের মাকে দেখেনি শিহাব। বুদ্ধি হবার পর থেকে দেখেছে তার এই সৎ মাকে। সমস্ত কষ্টকে অগ্রাহ্য করে তাকেই আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিল সে। কিন্তু তার এই অচেনা মা ছিল সাক্ষাৎ সীমারের জাত, দয়ামায়াহীন হৃদয় বলে কোন বস্তু ছিল না তার বুকে। বরং সেখানে ছিল একটা শক্ত পাথর। শত কান্নাতেও একচুল সরাতে পারেনি সে পাথর। কারণে অকারণে তার হাতে উঠে আসতো কাঠের স্কেল। অনর্গল পিটিয়ে যেত। আর বাবা অসহায়ের মতো নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এতে তার কোনো আবেগও ছিল না বা আক্রোশও ছিল না। হয়তো তার বাজখাই স্ত্রীর প্রভাব ক্ষমতার কাছে তিনি ছিলেন একবারে নির্বিকার, ভীরু খরগোশ।
বর্তমানে অতীতের কোনো কিছুই আর স্থির থাকে না। সব কিছু এতটাই বদলে যায় যে পূর্বের ঘটনাকে মিথ্যে বলে মনে হয়। যেমন আজ মনে হচ্ছে সব কিছুকেই। কিন্তু প্রথম জীবনের বঞ্চনা কষ্ট তো আর মিথ্যে হয় না, সেই সঙ্গে কোনো নিখুঁত ভালোবাসাও। শিহাব যখন দশ বারো বছরের কিশোর তখনকার কষ্ট মিশানো সময়ে একদিন পাশের বাসার কলেজপড়ুয়া রানী আপা দোতলা থেকে হাত ইশারায় ডেকেছিল তাকে। বাড়ির মার্বেল সিঁড়ি বেয়ে ড্রইং রুমে প্রবেশ করতেই শিহাব হতবাক। রানী আপা দাঁড়িয়ে আছে। সামনে টি টেবিলে থরে থরে সাজানো আম, ভেজা চিঁড়া, মুড়ি, দুধ। তাকে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রানী আপা বলেছিল, নে বস, খা। তারপর কোন কিছু বুঝে উঠবার আগেই সে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। হু হু করে কেঁদে উঠেছিল। তারপর কান্না একটু থামিয়ে বলেছিল, তোর জন্য আমার কষ্ট হয়রে, ভীষণ কষ্ট হয়। কত আর না খেয়ে পড়ে পড়ে মার খাবি। তোর ঐ ডাইনী মা তোকে বাঁচতে দেবেনারে, তোকে বাঁচতে দেবে না। তারপর একটু সোজা হয়ে শিহাবের চোখের উপর চোখ রেখে বলেছিল, তুই কোথাও পালিয়ে যেতে পারিস না। এই জাহান্নাম থেকে পালিয়ে যা। পালিয়ে গিয়ে তুই বাঁচ, আমাকেও বাঁচতে দে। তোর কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।
শিহাব হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল। জীবনে এত আদর এত ভালোবাসা সে কোন দিন পায়নি। মনে হচ্ছিল রানী আপার পা দুটো মাথায় তুলে রাখি। পা ধুয়ে পানি খাই। আচ্ছা তার মা কি এতটা সুন্দরী ছিল? তার মনেও কি এমনি দয়া মায়া ছিল? সে মুহূর্তে কোনো উত্তর খুঁজে না পেলেও তৃপ্তি সহকারে জামাই আদরে আহার করছিল সে। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিল। কিন্তু ঘরে ফিরে দেখলো সেই পরিচিত দৃশ্য। তার নকল মা প্রস্তুত হয়েই আছে। বাজখাই গলায় জিজ্ঞেস করলো, এ্যাই তুই কোথায় গিয়েছিলিরে? শিহাব আমতা আমতা করে বলেছিল, রানী আপার কাছে। শিহাবের উত্তর শেষ হতে যতক্ষণ, মুহূর্তের মধ্যে তার সৎ মা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর। প্রথমে চড় থাপ্পড়, তারপর দেয়ালের সাথে মাথা ঠুকিয়ে ঠুকিয়ে আঘাত।
– তুই এ বাড়িতে খাবি থাকবি আর নিন্দে করবি আরেক জনের কাছে। দেখাচ্ছি মজা, শিহাবের চোখ দিয়ে কতক্ষণ তারা ছিটকে বেরুচ্ছিল তা খেয়াল ছিল না, তবে মনে হয়েছিল সে জ্ঞান হারাতে বসেছে। নেতিয়ে পড়লো মেঝেতে। অনেকক্ষণ ধরে গোঙিয়ে গোঙিয়ে কেঁদেছিল সে। তারপর যখন সে একটু স্বাভাবিক হয়েছিল দেখলো পাশের বাসার দোতলার জানালার ফাঁকে এক জোড়া চোখ। সেই চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছে টস্টস্ করে।
বিকেল হতেই শিহাব বেরিয়ে পড়লো। গেল রাজশাহীর সেই বিখ্যাত পদ্মার পাড়ে। যখন তার মন খারাপ হয়, কষ্ট পায় তখনই সে ছুটে আসে পদ্মার পাড়ে। নদীর সঙ্গে কথা বলে। নদীর নীল পানির ভেতর নিজের কষ্টকে বিসর্জন দেয়। কিন্তু আজ তার অন্যরকম চিন্তা। পকেট হতে বের করলো রানী আপার দেওয়া টাকাগুলো। গুনে গুনে দেখলো, আবার পকেটে পুরে রাখলো। তারপর তক্কে তক্কে থাকলো। সন্ধ্যার আবছা আলোতে যখন চোরাকারবারির দল চর পেরিয়ে নদী পেরিয়ে ভারতের বহরমপুর বর্ডারের দিকে রওনা দিল তখন সেও ওদের পিছু নিল। নদী, বর্ডার পার হয়ে সোজা গিয়ে পৌঁছালো লালগোলা স্টেশনে। তারপর উঠে পড়লো লালগোলা এক্সপ্রেস ট্রেনে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল খেয়াল নেই। যখন ঘুম ভাঙলো দেখলো সে কলকাতার শিয়ালদা জংশনে। অগণিত মানুষের ভিড়ে সে এক ভিন্ন জগতে এক ভিন্ন দেশে। তারপরের ইতিহাস এক স্বপ্নের ইতিহাস। এক প্রশান্তির ইতিহাস। ঘরের অন্ধকারের মাঝেও ডা: শিহাবের চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক দয়ালু মানুষের অবয়ব। তার পালক পিতা আফতাব সাহেবের প্রতিকৃতি। এই মানুষই তাকে শূন্য থেকে স্বর্ণশিখরে নিয়ে গেলেন। ভাবতে অবাক লাগে এক সময়ের সহায় সম্বলহীন নির্যাতিত শিহাব এখন ডা: শিহাব। কলকাতার নামকরা ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ। অথচ সেই সময় কাজ খুঁজতে গিয়ে শিহাব নাটকীয়ভাবে পরিচিত হয় আফতাব সাহেবের সঙ্গে। প্রথম প্রথম আফতাব সাহেব ভেবেছিলেন শিহাবকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু দুটি কারণে তিনি মত পাল্টালেন। এক, শিহাব একেবারে নাছোড়বান্দা সে কিছুতেই বাংলাদেশে যাবে না। দুই, তার কোনো বৈধ কাগজপত্র পাসপোর্ট ছিল না। আবার শিহাবকে কলকাতার জনারণ্যে একা ছেড়ে দিতেও সাহস পেলেন না তিনি। কারণ এ ক্ষেত্রে সে হয় সমাজ বিরোধীদের হাতে পড়বে নয়তো পুলিশের হাতে পড়বে। তারপর সোজা যাবে হাজতে। ঠিক করলেন হুগলিতে তার যে মাদ্রাসা আছে সেখানে পাঠিয়ে দেবেন শিহাবকে। কিন্তু পরক্ষণে মত পাল্টালেন। শিহাবকে নিয়ে সোজা উঠলেন তার পাক সার্কাস ফ্ল্যাটে।
মাথায় নানা স্মৃতি ভাসছে শিহাবের। অনেক কথা অনেক দৃশ্যই দৃশ্যমান হচ্ছে তার কাছে। আফতাব সাহেবকে সে কাছ থেকে দেখেছে, দূর থেকেও দেখেছে। তার অতীত খুঁজতে গিয়ে দেখেছে তিনিও জীবনে হুঁচট খেয়েছেন। হুগলির এক কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। মেধাবী ছাত্র হিসেবে কলকাতায় এসেছিলেন ডাক্তারি পড়তে। কিন্তু বাবার মৃত্যুতে চতুর্থ বর্ষে তিনি মেডিক্যাল কলেজ ছেড়ে হয়েছিলেন ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি। একসময় তিনিও খুলে বসেন একটা ঔষধ কোম্পানি। এখন তিনি যেমন শিল্পপতি তেমনি দানশীল সমাজসেবকও। জন্মভূমি হুগলিতে স্থাপন করেছেন স্কুল মাদ্রাসা। বিবাহ সূত্রে তাঁর মেয়েরা দিল্লিতে থাকায় ফাঁকা বিশাল ফ্ল্যাটে শিহাবই বনে যায় তার পুত্র।
আর এখানে থেকে তার লেখা পড়া, উত্থান। এখন সে নিজস্ব ফ্ল্যাটে সংসার পেতেও বসেছে।
এই দিকে বৃষ্টি থেমে আসছিল। কিছুক্ষণ পর বোধ হয় পুরোপুরি থেমে যাবে। ড্রইং রুমে নার্গিস তখনো টিভির সিরিয়ালের অতলে ডুবে আছে। কিন্তু ডা: শিহাব কিছুতেই নিজেকে সংযত করতে পারছে না। ভেতর থেকে একটা আক্রোশের সাপ ফণা তুলেছিল, প্রতিশোধের বিষ ঢেলে দিচ্ছিল সারা শরীরে। সেই সঙ্গে তীব্র ক্ষোভ। এক সময় এ ক্ষোভ থেকে বাঁচতে ডা: শিহাব ড্রইংরুমে গেল। নার্গিসের পাশে বসলো।
প্রায় বিনিদ্র রাত্রি সত্ত্বেও ডা: শিহাব সকাল আটটার ভেতর হাসপাতালে গেল। রাউন্ড দিল, রোগী দেখলো। তারপর ক্যান্টিনে দুপুরে আহার পর্বের পর সোজা গেল চেম্বারে। হ্যাঁ ঐদিকে মর্জিনা বেগম সময়মতো এসে গেছে। অন্যান্য রোগীর সঙ্গে সেও অপেক্ষা করছে। ডা: শিহাব এখনো সিদ্ধান্ত ঠিক করতে পারছে না। কেমন সব এলামেলো হয়ে আসছে। কী করবে সে ভাবনার কোনো কূল কিনারা না পেয়ে প্রথম রোগী হিসেবে মর্জিনা বেগমকে বেছে নিল। তার রিপোর্টগুলো দেখতে লাগলো। মর্জিনা বেগম আড়ষ্ট হয়ে থাকলো। কিছুটা অসুখের ভয়ে, কিছুটা ডাক্তারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে। কিন্তু ডা: শিহাব কিছুতেই ভেতরের ক্ষোভগুলো দমন করতে পারছে না। কি করবে সে এখন? ঐ দিকে তার চিকিৎসার নীতি আদর্শের সঙ্গে এসবের কোন মিল নেই। হঠাৎ এক দমকা শীতলতা তার মনকে গ্রাস করতে লাগলো। ডা: শিহাব অঙ্ক মিলাতে পারছে না। সব হিসাব উল্টে পাল্টে যাচ্ছে। সুতরাং এ থেকে পরিত্রাণ পেতে সে মর্জিনা বেগমকে বললো, আপনার হোটেলের ঠিকানা এমনকি বাংলাদেশের ঠিকানা ফোন নম্বর লিখে দিন। রিপোর্টগুলো আরও পর্যালোচনা করা দরকার। আগামী কাল সময় মত ডেকে নিব।
পরদিন মর্জিনা বেগম ডাক্তার শিহাবের টেলিফোনের অপেক্ষায় হোটেল কক্ষে ছিল। ভাইয়ের ছেলে রানা টিভি দেখছে। একদম দুশ্চিন্তা মুক্ত রিলাক্সড মুডে। হঠাৎ রুমের কলিং বেলটা বেজে উঠলো। মর্জিনা বেগম হকচকিত। এ সময় আবার কে কলিং বেলটা বাজাতে এলো। কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে রানাকে বললো, দেখতো কে এলো! দরজা খুলে রানা অবাক। সামনে ডাক্তার সাহেবের হুকুম তামিল করার সার্ভিস বয়। হাতে নানা জিনিসপত্র। বিশেষ করে শাড়ির প্যাকেট ফলমূল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওদের কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই ছেলেটি ঘরে প্রবেশ করলো। ফলমূলের ব্যাগ আর শাড়ির প্যাকেট টেবিলের উপর রেখে বললো এই নেন আপনার কাগজপত্র, ঔষধপত্র। আর এটা হলো আপনার বাংলাদেশে যাবার ট্রেনের টিকেট। ডাক্তার সাহেব পাঠিয়েছেন এগুলো। তারপর একটু ঝুঁকে এসে বললো, এই টাকাগুলো সাবধানে রাখুন, অনেক টাকা ! আর এটা হচ্ছে আপনার চিঠি।
তারপর ছেলেটি আর কিছু বললো না। যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেভাবে চলে গেল। কিন্তু গোলকধাঁধায় পড়লো মর্জিনা বেগম। কী এমন ব্যাপার থাকতে পারে যে ডাক্তার সাহেব এগুলো পাঠাতে পারেন। চোখে চশমা এঁটে প্রবল উৎকণ্ঠায় চিঠিটা খুলে ফেললো।
প্রথমই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো। কারণ ডাক্তার সাহেব লিখেছেন তার কোন ক্যান্সার হয়নি। যে অসুখ হয়েছে তার ঔষধপত্র দিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু পরক্ষণে সে ভূমিকম্পের মতো দুলতে লাগলো। হৃদপিণ্ডের রক্তকণিকাগুলো অসম্ভব রকম দাপাদাপি শুরু করলো। কিন্তু তা কী করে হয়? মনে হচ্ছে ডাক্তার সাহেব তার সঙ্গে কোন তামাশা করছেন। কিন্তু ডাক্তার সাহেব তার অতীত জানলেন কী করে? এমনকি তার স্বামীর কথাও। না, না এটা কোন টিভি নাটকের দৃশ্য নয়। এটা একেবারে বাস্তব। ডা: শিহাব যে তার ঝাঁটা পেটা খাওয়া শিহাব এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব হলো। পরক্ষণে মনে হলো সব সৃষ্টিকর্তার লীলাখেলা। তিনি আমিরকে ফকির করতে পারেন আবার ফকিরকে আমিরও করতে পারেন। তিনি ঠিকই মজলুমকে সিংহাসনে বসিয়েছেন আর অত্যাচারীকে বসিয়েছেন তার পায়ের তলে। কিন্তু শিহাবতো তাকে কোন শাস্তি দেয়নি। বরং মা বলে সম্বোধন করেছে। লজ্জায় অনুশোচনায় মর্জিনা বেগমের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে লাগলো। ডুকরে কেঁদে উঠলো। ত্রিশ বছর পর শিহাবকে চিনতে পারেনি বটে কিন্তু সে শিহাবের সাক্ষাৎ পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। তবে এখানে বড় বাধা। শিহাব স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে যে, ক’দিনের জন্য সে কলকাতার বাইরে যাচ্ছে। এটা যে তার রাগ অভিমানের ব্যাপার, মর্জিনা বেগম অল্প শিক্ষিত হলেও বুঝতে কোন অসুবিধা হলো না।
কিন্তু জীবনের এই অসহায় মুহূর্তে, এই পড়ন্ত বেলায় সে মুক্তি পেতে চায়। পাপ থেকে বাঁচতে চায়। সুতরাং শিহাবকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। ওর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে। ওর পা দুটো মাথায় তুলে নিতে ইচ্ছে করছে। সুযোগ এসেও যেন হাতছাড়া হয়ে গেল। এক অবরুদ্ধ কান্নাকে থামাতে মর্জিনা বেগম জানালার দিকে তাকালো। ঐদিকে আকাশ থেকে আবারও বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। একটা স্নিগ্ধ ও শীতল অনুভূতির পরশ বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মর্জিনা বেগম এখনো অনুতাপের আগুনে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। সে শিহাবের শীতল স্পর্শ পেতে চায়। শান্ত হতে চায়। তার বিশ্বাস শিহাব একদিন ঠিকই সামনে এসে দাঁড়াবে। মা বলে ডাকবে। সেই শুভক্ষণের অপেক্ষায় মর্জিনা বেগম শিহাবের দেওয়া দামি শাড়ির আঁচল বুকে জড়িয়ে নিল।