এই নিবন্ধের শিরোনামের উপর আমার গভীর বিশ্বাস এবং আমি অত্যন্ত আস্থাশীল। এখন প্রশ্ন কেনো এই বিশ্বাস! কেনো এই আস্থা! এই বিশ্বাস ও আস্থার কারণ একটাই, আর তা হলো যে, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মনে-প্রাণে মানুষ ও মানবতার একজন কবি হিসেবে জানি ও মানি। কবি নজরুল মানুষ ও মানবতার কবি এই চরম সত্যকে সমাজের কাছে পাঠকের কাছে কালের সামনে উপস্থিত করতে চাই। কেননা, কবি নজরুল তার বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল বর্ণাঢ্য মানুষ ও কবি জীবনে একান্তে মনে-প্রাণে আন্তরিকভাবে সচেতনভাবে মানুষকে তিনি কবিতায় ছড়ায় গানে উপন্যাসে সকল রচনাতে আরাধ্য করে তুলেছেন। তিনি একটি নতুন যুগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এই নতুন যুগকে নিজ হস্তে নির্মাণ করেছেন, প্রবর্তন করেছেন সম্পূর্ণ নব চেতনার আলোয় ভরা এক কালিক ও নান্দনিক রূপ; যে রূপ মানুষকে ঘিরে তৈরি করেছে অদম্য অনন্য মননময় মানুষের জগৎ। কবি নজরুল বলেছেন- ‘আমি সকল কালের, সকল দেশের, সকল মানুষের।’ এখন এই কথা ধরে আমাদের দেখা উচিত এমন সত্য উচ্চারণ সেই কবিই বলতে পারে যিনি মানুষের কবি। যদি-ও অনেকেই কবি নজরুলকে প্রেমের কবি, সাম্যের কবি, দ্রোহের কবি, বিপ্লবের কবি, বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি, মানবতার কবি এবং প্রকৃতির কবি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু এতোকিছুর পরেও তিনি শুধুমাত্র একজন মানুষের কবি হয়েই আমাদের কাছে বর্তমান অবধি অমর ও মহান। কবি নজরুলের সাহিত্যজীবন বিবেচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে তার গোটা সাহিত্য জীবনই গড়ে উঠেছে একান্তে মানুষকে ঘিরে। মানুষকে তিনি তার সাহিত্যে সর্বাঙ্গে স্থান দিয়েছেন। সাহিত্যে মানুষকে করে তুলেছেন মূল উপাদান। মানুষকে তিনি ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন তার রচনার পরতে পরতে শব্দে শব্দে। মুচি, মেথর, কৃষক, শ্রমিক, চণ্ডাল, হিন্দু, মুসলিম সকলকে তিনি শুধুমাত্র মানুষ হিসেবেই দেখেছেন। মহান স্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব এই মানুষের প্রতি কবি নজরুলের বিশ্বাস এবং আস্থা এতোটাই গভীর যে বিস্ময়ে অবাক হতে হয়। মূলত তার কবিতায় সবক্ষেত্রে মানুষেরই জয়গান গাওয়া হয়েছে। কবি তিনি তার ‘মানুষ’ কবিতায় এভাবেই বলেছেন-
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সবদেশে, সবকালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি…
এক অসাধারণ অনন্য বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম মূলত মানুষ ও মানবতার কবি। প্রথমত মানুষের কবি হয়েই কাজী নজরুল ইসলাম আপন কবিসত্তার অধিকার নিয়ে কাব্যভুবনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন বর্তমানকাল পর্যন্ত এবং আগামী কালেও বহাল তবিয়তে থাকবে। জীবনের কবি প্রেমের কবি সাম্যের কবি মানবতার কবি যুগের কবি কালের কবি অসাম্প্রদায়িক কবি এবং বিপ্লবেরও বিদ্রোহী কবি হিসেবেও কবি নজরুল সমাজে মানুষের চিন্তা-চেতনায় অধিক বিবেচিত। একজন প্রকৃত জাত কবিকে মূল্যায়ন করার বেলাতে সেই কবির নামের আগে অনেক বিশেষণে বিশেষিত করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের বেলাতেও একই করা হয়েছে। তবে এতোকিছুর পরেও কবি নজরুলের সবচেয়ে অধিক পরিচিত মূল্যায়িত যে বিশেষণটি তা হলো সকল বিশেষণ ছাড়িয়ে তিনি মানুষের কবি। আর এ কথা অতীব সত্য যে, যে কবি মানুষের কবি হয়ে থাকে সে তার বৈচিত্র্যময় সৃজনশীলতার সকল ক্ষেত্রে মানুষের ভালো-মন্দ মানুষের অধিকার মানুষের মুক্তির বারতার কথায় সতত আপন লেখার মাধ্যমে শব্দের গাঁথুনিতে পঙক্তিতে পঙক্তিতে তুলে ধরে। অর্থাৎ, মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার তীব্র তাগিদ নজরুল তার চিন্তা-চেতনায়, বোধে, ভাবে ভাবনায় উপলব্ধি করেছিলেন।
আর তাই আমরা নজরুলের কবিতায় ছড়ায় গানে প্রবন্ধে গল্পে উপন্যাসে সাহিত্যের সকল শাখাতেই মানুষের কথা দেখতে পাই। তিনি সমগ্র জীবনে মানুষকে আরাধ্য করে নিত্য পূজা দিয়েছেন। অবশ্য এখানে বলে রাখা ভালো যে, মানুষের জয়গান করা মানেই সত্যকে মানবতাকে প্রেমকে এবং সুন্দরকে জয়গান করা। কেননা, মানুষের জয়গানের মধ্য দিয়ে তিনি সেই অধরা পরম সত্তাকে চরম সত্যকে খুঁজে ফিরেছেন। মোটকথা, কবি নজরুলের কাছে মানুষই ধ্যানজ্ঞান, মানুষই তার শক্তি, মানুষই তার সকল সৃষ্টি সুখের প্রেরণার উৎস। এই জন্য মানুষের অধিকারের কথা মানুষের মুক্তির কথা মানুষের জীবনের কথা অকপটে তার কলমের কালিতে বারংবার বিজলির মতো ঝলকানি দিয়ে উঠেছে। এভাবেই দ্রোহের তীব্র প্রতিবাদী আলো তার চলার পথে সাহিত্যাকাশে আলোকিত করে দিয়েছে, যা চির ভাস্বর। দিগন্তময় সূর্যের সোনালি আলোয় আলোকিত মরুভূমির বুকে দ্রোহের বিপ্লবের স্বাধীন পতাকা উড়িয়েছেন। এ বিষয়ে আমাদের বাঙালি জাতির মহান নেতা ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার বিরোধী গণ-আন্দোলনের অন্যতম বীর সৈনিক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কবি নজরুল সম্পর্কে অত্যন্ত বাস্তবিক গুরুত্ব যুগ-উপযোগী কঠিন কিন্তু চরম সত্য বলেছেন- ‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাবো তখন গাওয়া হবে নজরুলের গান, যখন কারাগারে যাবো তখনও গাইবো নজরুলের গান।’
আমাদের এই মনুষ্য সমাজে মিথ্যা ভণ্ডামি অন্যায়-অত্যাচার জুলুম নির্যাতন ধর্মীয় সংঘাত সাম্প্রদায়িকতা হিংস্র মৌলবাদিতা অপরাজনীতি অপসংস্কৃতি সকল অসঙ্গতি কুসংস্কার কূপমণ্ডূকতা বিদ্যমান সব ধরনের মিথ্যে নষ্ট অন্ধকারের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন মানুষ ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কেননা, কবি মাত্রই কালের পূজারি। কবিরা সময়কে অনেক কাছ থেকে দেখতে পায় এবং সময়ের ঘটনা প্রবাহ তাকে ভাবনার অতল সাগরে নিযে যায়। এমনি করে সমকালীন চিন্তা ভাবনা যুগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কবি নজরুল আপন সত্তাকে বিবেককে চিন্তাকে বোধকে বিশ্বাসকে তার ক্ষুরধার লেখার মাধ্যমে সমাজের সামনে পাঠকের কাছে যারপরনাই তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। আর তাই এ কথা জোর গলায় বলতে পারি যে, সময়কে সময়ের আহ্বানকে উপেক্ষা না করে বন্ধু করে মানুষের অধিকারের কথা মানুষের মুক্তির কথা মানুষের চাওয়া পাওয়ার কথা মানুষের চেতনার কথা মানুষের কবি নজরুল তিনি তার কবিতায় গানে ছড়ায় গল্পে প্রবন্ধে তুলে ধরে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে তার কবিতায় যুগ-চেতনার আহ্বান অনেক বেশি দেখতে পাই। কবিতাকে তিনি যুগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে করে তুলেছেন যুগবাণী। ফলে মানুষের কবি নজরুল দ্রোহের সাম্যের মানবতার প্রেমের কবিসত্তাকে সতত জাগ্রত করে জীবনের পথের পরে নির্ভীক মনে পাড়ি দিয়েছেন।
যেহেতু এই নিবন্ধে কবি নজরুলকে মানুষ ও মানবতার কবি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেহেতু তিনি একজন মানুষের কবি হয়ে সব সময়ে মানুষের জয়গান গাইবে, মানুষের ভেদাভেদ মানবেন না, মানুষের বৈষম্য তুচ্ছজ্ঞান করবে এটাই স্বাভাবিক। কেননা, একজন প্রকৃত মৌলিক মানুষের কবি কোনো ভাবেই কোনো কালেই কোনো অবস্থাতেই কোনো ভৌগোলিক সীমানা টেনে মানুষকে ছোটো বড়ো উঁচু-নিচু জাত-ভেদাভেদ করে না কিংবা সমাজের আইন নিয়মকে মূল্যায়িত করতে গিয়ে ধর্মের বিধানকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে জাত-পাত-গোত্র ইত্যাদি সৃষ্টি করে না এবং তা মনে-প্রাণে এতোটুকু মানেও না। একজন মানুষের কবির কাছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান বা অন্য কোনো জাতি মুখ্য গণ্য হয়ে ওঠে না, তার কাছে শুধুই মানুষ পরিচয়ে হৃদমাঝারে স্থান পায়। কবি নজরুল একজন আপাদমস্তক মানবতার কবি সাম্যের কবি প্রেমের কবি ভালোবাসার কবি দ্রোহের কবি চির সত্য ও সুন্দরের কবি সর্বোপরি মানুষের কবি। এই জন্যে তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনে লেখক জীবনে জাত-পাত-গোত্র সকল প্রকার ভেদাভেদ বৈষম্য স্বীকার করবেন না বিরোধিতা করবেন এটাই খুবই যুক্তিযুক্ত স্বাভাবিক। মানুষের কবি নজরুল অকপটে দ্ব্যর্থহীনকণ্ঠে ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ কবিতায় বলেছেন-
জাতের নামে বজ্জাতি সব, জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে, জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া
হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি ভাবছো এতেই জাতির গান
তাইতো বেকুব করলি তোরা এক জাতিকে একশ খান
… … …
বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত
কোন ছেলের তার লাগলে ছোঁওয়া অশুচি হন জগন্নাথ?
নারায়ণের জাত যদি নাই তোদের কেনো জাতের বালাই
তোরা ছেলের মুখে থুথু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া…।
মানুষের কবি নজরুল আবারও বলেছেন-
এক আদমের মোরা সন্তান, / নাহি দেশ কাল ধর্মাভিমান,
নাহি ব্যবধান, উচ্চ, নীচ, সুজন; / নিখিলের মাঝে আমরা এক জীবন…।
কবি নজরুলের রচনায় বিশেষ করে তার কবিতায় সমাজে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের কথা ঘুরে ফিরে বারংবার স্বমহিমায় উপস্থিত হয়েছে। কৃষক শ্রমিক কুলি মজুর চাষা মানুষের পরম বন্ধু, এরাই দেশের প্রাণ; দেশকে মায়ের মতো ভালোবেসে নিঃস্বার্থে আপনকর্মে নির্মাণ করে নিবেদিত হয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে। এই শ্রেণী মানুষগুলোকে কবি নজরুল অনেক বেশি ভালোবেসেছেন এবং তাদের কথা কলমের কালিতে শব্দে শব্দে তুলে ধরেছেন। যতো অবহেলিত লাঞ্জিত নিড়ীড়িত অত্যাচারিত অসহায় মানুষের মুক্তির তাদের অধিকারের কথা বলেছেন। আমাদের দেশের যারা চাষা তারা নিজের জমির মাটিকে নিজ কন্যার সাথে তুলনা করে, আপন করে আঁকড়ে ধরে রাখে; মাটির বুকে লাঙল দিয়ে যে সোনার ফসল এই চাষারা ফলায় সেই লাঙল দিয়ে অত্যাচারী জুলুমবাজ মহাজন রাজার সৈনিকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্প অন্তরে পোষণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কবি এমনি করেই তার ‘চাষার গান’ কবিতায় বলেছেন-
আমাদের জমির মাটি ঘরের বেটি, / সমান রে ভাই!
কে রাবণ করে হরণ / দেখবো রে তাই।
… … …
যে লাঙল-ফলা দিয়ে / শস্য ফলাই মরুর বুকে,
আছে সে লাঙল আজও / রুখবো তাতেই রাজার সেপাই….।
এই ধরাধামে মানুষ আসার পর থেকে রাজনৈতিকভাবে সামাজিকভাবে ধর্মীয়ভাবে ধনী-গরিবের ব্যবধান ঢের সৃষ্টি করা হয়েছে। সমাজে বঞ্চিত অবহেলিত ক্ষধার্ত দারিদ্র্য জেলে কুমার তাতি পীড়িত মানুষগুলোকে সর্বদা সকল অধিকার থেকে পেছনে ফেলে দেওয়া হয়েছে, প্রতিনিয়ত ঘৃণার বাঁকা চোখে দেখা হয়েছে এবং এখনো দরিদ্রতার অজুহাত টেনে এক ভয়ানক বৈষম্য বিভেদের বেড়াজাল দিয়ে মনুষ্য এই সমাজকে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু একজন কবি এসব মনে নিতে পারেন না কোনোভাবেই। বরঞ্চ তার বিদ্রোহী মন বিদ্রোহ করে ওঠে, প্রতিবাদের ভাষা শব্দ হয়ে কলমের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। অবহেলিত বঞ্চিত দরিদ্র এসকল মানুষকে একজন মানুষের কবি নিজের আপনজন হিসেবেই গণ্য করে এবং আপনার মাঝে ভালোবাসার স্থান করে দেয়। হত-দরিদ্র মানুষের অধিকারের কথা অকপটে বলেছেন, তাদের জন্য কবির ব্যাকুলহৃদয় কেঁদে উঠেছে। কবি নজরুল তাই বলেছেন-
যতোদিন মোর লেখার শক্তি র’বে
যতোদিন আমি বেঁচে র’বো এই ভবে,
উহাদের কথা লিখিয়া যাইবো, কহিবো ওদেরি কথা,
… … …
আমরা গরীব, মোরা শতকরা নিরানব্বই জন,
আমরা সংঘবদ্ধ হইবো করিয়া পরাণ পণ…।
কবি আবারও বলেছেন-
(আমরা) নিচে পড়ে রইবো না আর
শোনরে ও ভাই জেলে
এবারি উঠবোরে সব ঠেলে…।
মহান স্রষ্টার উপরে ছিলো কবি নজরুলের অকাট্য বিশ্বাস এবং ভক্তি। যারা স্রষ্টা ও ধর্মের নামে ভণ্ডামি করে তাদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। সমাজে যারা ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে তাদেরকে তিনি তীব্র ঘৃণা করেছেন। কবি নজরুল মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর জয়গান গেয়েছেন তার কবিতায়, তিনি কবিতায় এক আল্লাহ ও সাম্য শান্তির কথা প্রচার করেছেন অন্তরে প্রেম ভালোবাসা বিশ্বাস নিয়ে। মনে সকল পাপ-সংকীর্ণতা পরিহার করে বিশাল দূর ওই নীলাকাশের মতো উদার হওয়ার আকুল ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। সমাজে অশান্তিকারীরা হিংসুকেরা নিন্দাকারীরা যতোই হিংসা-বিদ্বেষ ছড়াক না কেনো কবি এক আল্লাহর জয়গান ও শান্তির কথাই প্রচার করতে বদ্ধপরিকর। কবি নজরুল তার ‘এক আল্লাহ জিন্দাবাদ’ কবিতায় বলেছেন-
উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ,
আমরা বলিবো সাম্য-শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ,
আমরা চাহিবো উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ….।
কবি আবারও তার ‘আল্লাহ পরম প্রিয়তম মোর’ কবিতায় বলছেন-
আল্লাহ পরম প্রিয়তম মোর, আল্লাহতো দূরে নয়,
নিত্য আমারে জড়াইয়া থাকে পরম সে প্রেমময়।
পূর্ণ পরম সুন্দর সেই আমার পরম পতি,
মোর ধ্যান-জ্ঞান তনু-মন-প্রাণ, আমার পরম গতি….।
কবি নজরুলের কবিতায় গানে ছড়ায় প্রবন্ধে ও উপন্যাসে বিশেষ করে তার কাব্যের পরতে পরতে শব্দে শব্দে ছন্দে ভাবে নান্দনিক শৈল্পিকরূপে মানুষের কথা, মানুষের অধিকারের কথা, মানুষের যাপিত জীবনের কথা, মানুষের সুখ-দুঃখের কথা, মানুষের পাওয়া না পাওয়ার বেদনার কথা এবং মানুষের জয়-পরাজয়ের ও উত্থান-পতনের কথা স্পষ্ট করে ফুটে উঠেছে। একজন মহান শিল্পী জীবনের কবি সৃষ্টিশীল লেখক সতত কথায় চিন্তা-চেতনায় ভাবে ভাবনায় জীবন-সৌন্দর্যের গুরুত্ব দেয় মানুষকে জ্ঞান করে। আর তাই কৃষক-শ্রমিক, কুলি-মজুর, মুচি-মেথর-চণ্ডাল থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া সাধারণ মেহনতি দরিদ্র মানুষ কবি নজরুলের কলমের কালিতে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে, প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে এবং আপন অধিকারকে দ্রোহের অনলে পুড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। এখানেই শুধু মানুষকে ঘিরে সৌন্দর্যের প্রকাশ, নান্দনিকতার উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। যুগ-স্রষ্টা অনন্যসাধারণ বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মানুষের কবি নজরুলের রচনায় এমনটিই সন্ধান মেলে ঢের।
মানবজীবনে প্রেম ভালোবাসা এক মহা অমূল্য সম্পদ হিসেবে পৃথিবীতে বিরাজিত। প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া মানবজীবন একেবারে অপূর্ণতায় থেকে যায়। প্রেমের অপার শক্তি দিয়েই মানুষ পৃথিবীকে জয় করতে শিখিয়েছে। বিশ্বস্রষ্টাকে প্রেমের মাধ্যমে চিনতে পেরেছে। কবি বলেছেন-
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি, একি মোর অপরাধ…।
আমরা জানি যে, ভারত এই উপমহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান পর্যন্ত ধর্মের ভেদাভেদ টেনে এবং শুধুমাত্র ধর্মকে সামনে রেখে ভয়ানক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রক্তপাত কাটাকাটি মারামারি হিংস্র রাজনীতির নষ্টামির ভণ্ডামি হিন্দু-মুসলমানকে একে অপরের শত্রুতে শামিল করেছে। পাশাপাশি থেকেও হিন্দু-মুসলমান যেনো অনেক দূরের কেউ। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মানুষ হয়ে মানুষের যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অতীব জরুরি ছিলো তা অনেকটা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু নজরুল মানুষের কবি বলেই সারাটি জীবন হিন্দু-মুসলমানকে এক কাতারে আনতে ঐক্যবদ্ধ করতে পাশাপাশি সহাবস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মনে-প্রাণে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন। আর এ কথা কবি নজরুল তৎকালীন সময়ে কলকাতায় এক ভাষণে দৃঢ়কণ্ঠে সাহসী চিত্তে নির্ভীক মনে অকপটে বলেছেন- ‘আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে-হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়েও অশোভন হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁট-ছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোনো বেগ পেতে হবে না।’
এই বিশ্ব জগতের স্রষ্টা মহান দয়ালু আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মানবজাতির মুক্তির কণ্ঠস্বর আর্তমানবতার মহানায়ক মহানবী হযরত মুহম্মদ মোস্তফা (সা) এর প্রতি প্রেম ভালোবাসার অকাট্য স্বাক্ষর রেখেছেন কবি নজরুল তিনি তার অনেক গানে ও কবিতার পরতে পরতে। মহানবীকে নিয়ে তার রচনা গান-কবিতা একদিকে তার সাহিত্য ভাণ্ডারকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি আবার নজরুলকে নবীপ্রেমের এক মূর্তিমান প্রেমিক হিসেবে আমরা দেখতে পাই। তিনি তার কবিতায় মহানবীকে সত্যি এক জ্যোতির্ময় আলোকরূপে তুলে ধরেছেন। নবীকে তিনি মনে-প্রাণে এতোটাই ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালোবেসেছেন যে, সুদূর আরব ভূমির কোনো এক পথ হতে চেয়েছেন; যে পথ দিয়ে প্রিয়নবী হেঁটে যাবেন। এবং কবীর জীবন সার্থক হবে। কবি তাই বলেছেন-
আমি যদি আরবও হতাম মদিনারই পথ /
সেই পথ দিয়ে হেঁটে যেতো নূর নবী হযরত…।
কবি প্রিয়নবীকে পূর্ণিমার চাঁদের সাথে তুলনা গেয়েছেন-
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে,
যেনো উষার কোলে রাঙ্গা রবি দোলে….।’
নবীর প্রতি এই যে ভালোবাসা সত্যিই অবাক করে দেয়। এধরনের বহু গানে ও কবিতায় তিনি নবীকে নিয়ে লিখেছেন। পাশাপাশি তিনি আবার অসংখ্য শ্যামা সঙ্গীতও লিখেছেন। আসলে কবি নজরুল সম্পূর্ণভাবেই মনে-প্রাণে একজন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন। মানুষের এই কবি কোনো সাম্প্রদায়িকতা ধর্মীয় গোঁড়ামি ব্যক্তিগত জীবনে চলনে বলনে আচরণে ব্যবহারে বিশ্বাসে ও চেতনায় এতোটুকু স্থান দেয়নি।
জন্ম : মানুষ ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে দুখু মিয়া বিগত খ্রিষ্টাব্ধ ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ) অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমায় রানীগঞ্জ থানার ছায়াঘেরা পাখিডাকা প্রাকৃতিক মনোরম এক গ্রাম চুরুলিয়ায় পিতা ফকির আহমদ ও মাতা জাহেদা খাতুনের কোল আলোকিত করে এক ঝড় সন্ধ্যায় পৃথিবীর বুকে আলোর মুখ দেখেছিলো। আর দীর্ঘ ৭৭ বছর কালাতিকাল পার করে বিগত ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্টে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মানুষের কবি আমাদের প্রিয় কবি নজরুল পরপারে পাড়ি জমান।
কবিতা : অগ্নিবীণা (১৯২২), দোলন চাঁপা (১৯২৩), ভাঙ্গার গান (১৯২৪), বিষের বাঁশী (১৯২৪), পূবের হাওয়া (১৯২৫), চিত্তনামা (১৯২৫), ছায়ানট (১৯২৫), সাম্যবাদী (১৯২৫), সর্বহারা (১৯২৬), ফণিমনসা (১৯২৭), সিন্দু-হিন্দোল (১৯২৭), সঞ্চিতা (১৯২৮), জিঞ্জির (১৯২৮), চক্রবাক (১৯২৯), সন্ধ্যা (১৯২৯), প্রলয় শিখা (১৯৩০), নির্ঝর (১৯৩৮), নতুন চাঁদ (১৯৪৫), শেষ সওগাত (১৯৫৯), ও ঝড় (১৯৬০) ইত্যাদি।
অনুবাদ কবিতা : রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ (১৯৩০), কাব্য আমপারা (১৯৩৩), ও রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়ম (১৯৫৯) ইত্যাদি।
শিশুতোষ কবিতা : ঝিঙেফুল (১৯২৬), সঞ্চয়ন (১৯৫৫), পিলে পটকা (১৯৬৩), পুতুলের বিয়ে (১৯৬৩), ঘুম জাগানো পাখি (১৯৬৪), সাত ভাই চম্পা (১৯৬৪), ঘুমপাড়ানি মাসীপিসি (১৯৬৫), ফুলে ও ফসলে (১৯৮২), তরুণের অভিযান (১৯৮২), ভোরের পাখি (১৯৮২), মটকু মাইতি (১৯৮২), নজরুল সমগ্র (১৯৮২), ও জাগো সুন্দর চির কিশোর (১৯৮২) ইত্যাদি।
উপন্যাস : ব্যথার দান (১৯২২), রিক্তের বেদন (১৯২৪), বাঁধন হারা (১৯২৭), মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০), শিউলি মালা (১৯৩১) ও কুহেলিকা (১৩৩৮) ইত্যাদি।
প্রবন্ধ / নিবন্ধ : ধূমকেতু, যুগবাণী, দুর্দিনের যাত্রী, রাজবন্দীর জবানবন্দী ও রুদ্র মঙ্গল ইত্যাদি।
গান : বুলবুল (১৯২৮), চোখের চাতক (১৯২৯), নজরুল-গীতিকা (১৯৩০), চন্দ্রবিন্দু (১৯৩১), বনগীতি (১৯৩২), সুরা সাকী (১৯৩২), গুলবাগিচা (১৯৩৩), সুর মুকুর (১৯৩৪), গানের মালা (১৯৩৪), জুলফিকর (১৩৩৯), গীতিশতদল (১৯৪১), সুরলিপি ইত্যাদি।