দেশ স্বাধীন হবার পর এক জাপানি মহিলা বাংলা একাডেমি এসেছিলেন। তিনি কয়েক বছর ধরে শান্তিনিকেতনে বাংলা পড়ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আমি যতদূর জানি তোমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ পাট। পাট হতে অর্জিত হতো পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা, যার সবটাই খরচ হতো পশ্চিম অঞ্চলে। তোমরা বঞ্চিত হতে। কিন্তু সেই পাট তোমাদের বাংলাসাহিত্যে চোখে পড়ে না। এমন সাহিত্যকে জীবনঘনিষ্ঠ বলা যায় কি?’ তখন আমরা লাইব্রেরিয়ান শামসুল হক সাহেবের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলাম। তখন জাপানি মহিলা পশ্চিম বাংলায় রচিত ডায়মন্ডহারবারে পাটকলের শ্রমিকদের নিয়ে একটা উপন্যাসের উল্লেখ করলেন। আর দেখলাম অনেক কাল পূর্বে নজিবর রহমান রচিত আনোয়ারা উপন্যাসে পাটের কিছু উলেখ আছে। তা ছাড়া আমরা আর কোন উপন্যাস বা ছোটগল্পে পাটকে পাইনি।
এক সময় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন পাটের সাথে সম্পর্কিত ছিল এবং তারা ছিল চাষি, গরিব মানুষ, অশিক্ষিত মানুষ। অপর এক শ্রেণীর মানুষ পাট নিয়ে কাজ-কারবার করতেন তারা নানা দেশের, নানা জাতের ও ধনিক শ্রেণীর। এই দুই শ্রেণীর কারো সাথে বাংলা সাহিত্যের সম্পর্ক নেই। একজন অশিক্ষিত গরিব, অপরজন ভিনদেশি আদমজি, ইসপাহানি, বাওয়ানি, তোলারাম। তারা পাকিস্তান আমলে পাটের ব্যবসা করে বিশাল অর্থ সম্পদের মালিক হন। তারা অবশ্য ইংরেজ আমলে পাট কিনে পাটকলে সরবরাহ করার ব্যবসা করেই ধনী হয়েছেন। ইংরেজ আমলে নারায়ণগঞ্জ ছিল প্রধান পাটক্রয় কেন্দ্র এবং সেভাবেই শহরের সূত্রপাত। শহরটা ছিল সাহেবদের। কেবল ইংরেজ সাহেবরা এখানে থাকতেন না। অনেক জাতের ইউরোপীয় সাহেব এখানে থাকতেন। তাই এখানেই ছিল ইউরোপীয়ান ক্লাব, ঢাকায় নয়। তারা কাজ করতেন প্রধান তিনটি পাট ক্রয় অফিসে। সেই তিনটি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল নারায়নগঞ্জ শহর। তারা ছিল র্যালি ব্রাদার্স, ডেভিড কোম্পানি ও নারায়ণগঞ্জ জুট। এই তিনটি বড় ইউরোপীয় কোম্পানিকে অনুসরণ করে আরো বেশ কিছু অবফুলি পাট ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জে স্থায়ী বাসিন্দা হন। শীতলক্ষ্যা নদের তীরে অবস্থিত থাকার কারণে সেকালে এই ছোট জনপদটি স্বাস্থ্যনিবাস হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল। শোনা যায় শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দিয়ে তৈরি ডেভিড কোম্পানির সোডা ওয়াটার বিলেতে রফতানি হতো।
অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহরে ১৭৯০ সালের দিকে বাংলা থেকে আমদানি করা পাটের ব্যবসা আরম্ভ হয়ে ১৮৬০ সালে, এটি জুটমিলের শহরে পরিণত হলো। দশ বছরের মধ্যে ৬০ এর অধিক পাটকল সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এক সময় ডান্ডি বলতে পাট বোঝাত। এই সকল কল যারা প্রতিষ্ঠা করল তারা ছিল প্রধানত স্কটিশ ও গ্রিক। তাদেরকে বলা হতো জুট ব্যারন। ১৮৫১ সালে র্যালি ব্রাদার্স-এর প্রধান স্টিফেন র্যালি একজন জুট ব্যারন নিজেই কলকাতায় চলে এলেন এবং সরাসরি পাট কিনে ডান্ডি পাঠাতে আরম্ভ করলেন।
১৮৫৫ সালে কলকাতায় প্রথম পাটকল স্থাপিত হলো। পঁচাত্তর বছর পর এই শহরেই বিশ্বের ৭০% পাটজাত দ্রব্য তৈরি হতো। কাঁচাপাট আসত ঘরের নিকট নারায়ণগঞ্জ থেকে। নারায়ণগঞ্জ থেকে কলকাতা এবং কলকাতা থেকে ডান্ডি।
জুট ব্যারনরা চলে আসে নারায়ণগঞ্জে, স্থাপন করে পাটক্রয় কেন্দ্র র্যালি ব্রাদার্স। পাট কিনে ডান্ডিতে রফতানি ব্যবসার কাজে যোগ দিয়েছিল আরো বেশ কিছু ইউরোপীয় ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে ছিল আরমানীয়, পর্তুগিজ, ইংরেজ, গ্রিক ইত্যাদি। এরাই ছিল শহরের প্রকৃত বাসিন্দা, হর্তা-কর্তা, মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান। তেমন একজন চেয়ারম্যানের নাম শিরকোর। যার নামে নারায়ণগঞ্জে মেয়েদের একটা স্কুল ছিল। স্কুলের নাম ছিল ‘শিরকোর গার্লস স্কুল’। ১৯৫০ এর পর স্কুলটা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মর্গান গার্লস স্কুলের এই মর্গান সাহেব কে আমরা জানি না।
নারায়ণগঞ্জের এই সাহেবদের সেবা করার জন্য গড়ে উঠল বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নানা পেশার নানা মানুষের বসতি। এলো রাজমিস্ত্রি, খানশামা, উকিল, মোকতার, থানা-পুলিশ ইত্যাদি। অন্যদিকে পাটের অফিসে পাট বিক্রেতা ফরিয়া, দালাল ইত্যাদি। পাটের দালালদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত সাহেবদেরকে খুশি করা নিয়ে। সাহেবদেরকে খুশি করার উপর নির্ভর করত তার উপার্জন। সাহেবদের দয়ার ওপর নির্ভর করত দালালদের ভাগ্য। পাটের সাহেবরা কেবল নারায়ণগঞ্জে থাকতেন না, তারা থাকতেন রাজশাহীর আত্রাই ও ময়মনসিংহের জামালপুর। সেখানেও তাদের সেবাদাস ও সবাদাসী থাকত অনেক। স্থানীয় ভাবে তাদের নিয়ে অনেক কাহিনী ছিল। নারায়ণগঞ্জেও অনেক কাহিনী ছিল। সেগুলো হতে পারত উপন্যাস ও ছোটগল্পের উপাদান। এমনকি বিগত দেড় শ’ থেকে দু’শ’ বছরের বিভিন্ন পরিবারের উত্থান পতন ও বিবর্তন থেকে উপন্যাসের উপাদান পাওয়া যেতে পারে।
ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বাংলার শিক্ষিত মানুষ বিভাগ-পূর্বকালে পাটের সংস্পর্শে আসতেন না। অল্পশিক্ষিত সাহসী দু-একজন অনেকটা দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে পাট বিক্রেতা ও সাহেব ক্রেতাদের মধ্যস্থতা করত। তাদেরকে বলা হতো দালাল। পাটের দালালদের মধ্যে যারা একটু চালাক তারা সাহেব ক্রেতাকে খুশি করার জন্য যা করার তাই করত। সকলেই দালাল হতে পারত না। পাট চাষ করা হতে আরম্ভ করে সাহেব কোম্পানিতে বিক্রি করা পর্যন্ত বেশ কয়েক হাত বদল হয়ে আসতে হতো। একজনকে বলা হতো ফরিয়া, আর একজনকে বলা হতো পাইকার। আর দু-একটা পদবি ছিল হয়তো। সবচেয়ে দামি পদবি ছিল ‘দালাল’।
সবাই দালাল হতে পারত না। গ্রাম থেকে যারা পাট বিক্রি করতে আসত, তারা প্রথম প্রথম সাহেবদের সাথে দেখা করার সাহস পেত না। নতুন দালালরা পাট বিক্রেতার পক্ষ থেকে সাহেবদের সামনে উপস্থিত হতো। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকত আসল দালালরা। সব দালাল সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সাহেব চিন্তা করতেন কোন দালালের মাধ্যমে পাট কেনা হবে। তিনি কোন একজন দালালের দিকে ইসারা করতেন। তার ভাগ্য আজকের জন্য সুপ্রসন্ন হলো। পাট বিক্রেতা তথা নতুন দালাল প্রকৃত দালালের মাধ্যমে পাট বিক্রি করে দাম পেল আর প্রকৃত দালাল মোট দামের একটি অংশ পেল। এমনভাবেই দালাল সাহেব কোনো কাজ না করেই সাহেবের সামনে বসে থেকেই অর্থ উপার্জন করত। সাহেব ভাঙা বাংলায় কথা বলেন আর দালাল সাহেব ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলেন। এমন করে তাদের মধ্যে সম্পর্ক হয়। সাহেবের অনুগ্রহ প্রাপ্ত এই দালালদের নিয়ে অনেক কাহিনী ছিল। সাহেবদের অনুগ্রহে দু-একজন দালাল প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। কেউ বিয়ে করতেন কয়েকটি, কেউবা মদ খেয়ে চুর হয়ে থাকতেন। কেউ মাতাল হয়ে রাস্তার পাশের নর্দমায় গড়াগড়ি দিতেন। আবার সাহেবদের সুপারিশে তারা কেউ কেউ সরকারি খেতাব রায় বাহাদুর বা খান বাহাদুর পেয়ে যান।
ওদিকে ডান্ডি শহরে পাটের ব্যবসা করে কত সাহেব হলেন জুট ব্যারন, তাদের অধীনে চাকরি করে কেউ হলেন জুটওয়ালা। ডান্ডির পাটকলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা কলকাতায় এসে পাটকল স্থাপন করতে আরম্ভ করলেন। সেই সঙ্গে মিল চালানোর জন্য দক্ষ স্কটিশ শ্রমিকদের নিয়ে আসলেন। কলকাতায় এসে তারা হতেন জুটওয়ালা। রাতারাতি তাদের জীবনযাত্রা বদলে যেত। চাকর-বাকর বাবুর্চি-খানসামা দারোয়ান নিয়ে এলাহি কারবার। তারা সেখানেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে বংশানুক্রমে থাকতে আরম্ভ করলেন।
এক এক যুদ্ধের সময় পাটের ব্যবসায় সুসময় আসে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় ডান্ডির প্রসার ঘটল। প্রথম মহাযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় প্রসার ঘটল কলকাতার। আবার কোরিয়ার যুদ্ধের সময় আমাদের চোখের সামনে নারায়ণগঞ্জে কতজনকে দেখলাম রাতারাতি ধনী হতে। স্থাপিত হলো বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল নারায়ণগঞ্জে আদমজি জুটমিল। আমাদের সামনেই সেই আদমজি জুটমিল আর জুটমিল রইল না। আগেই বলেছি পাটের সাথে সম্পর্কিত এক দিকে বাংলার গরিব পাটচাষি, অন্যদিকে দেশ-বিদেশের ধনী ব্যবসায়ী। বাঙালি মধ্যবিত্তের সাথে পাটের কোন সম্পর্ক নেই। সেই কারণে বোধ হয়, বাংলাসাহিত্যে পাটের কোন ভূমিকা নেই।
এক সময় এদেশে নীল চাষ হতো, চাষ করত গরিব চাষি আর মুনাফা অর্জন করতেন নীলকর সাহেবরা তখনই লেখা হয়েছিল ‘নীলদর্পণ’। অথচ কেন লেখা হয় না ‘পাটদর্পণ’। পাটকে, পাট চাষিকে বা পাটের দালালকে নিয়ে আজও কেন বাংলা উপন্যাস লেখা হলো না?