প্রাচ্যতত্ত্বকে সম্বল করে একটি জরুরি বই লিখেন অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ। সে-ই ঘটনা ঘটে ১৯৭৮ সালে। বইটি প্রকাশ মাত্র সারা দুনিয়ায় বিশেষভাবে বুদ্ধিজীবিদের নাড়ির ওপর বজ্রপাত হ্যামারের আঘাত পড়ে, এবং পরবর্তিতে বিশ্ব দেখে, একটি নীরব অভ্যুত্থান। প্রশংসার পুষ্পবৃষ্টি বর্ষিত হয় সাঈদের ওপর সারাজীবন; সঙ্গে, সমালোচনার চাবুক তাঁকে রক্ষাক্ত করে, অমানুষিকভাবে এবং নীরবাতংক তাঁকে আমৃত্যু অনুসরণ করে।
ফ্রেডরিক জেমিসন তাঁর অনবদ্য প্রয়াস সাম্প্রতিকতম ‘কালচারাল টার্ন’ বইয়ে এ সম্পর্কিত বহু গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি কথা বলেন। বইটির ভূমিকা লিখেন রবার্ট য়ুং। রবার্ট য়ুং’রও ’দ্য অরি পোসজিন অফ পোস্ট মডার্নিটি’ নামে’ একটি উল্লেখযোগ্য বই আছে, যেখানে তিনি পোস্টমডার্ন বা উত্তরাধুনিকতার ভাবকল্পের উৎস এবং এর ক্রমবিকাশমান ইতিহাসের বিস্তৃতিকে তুলে ধরেন। অন্যদিকে ফ্রেডরিক জেমিসন সাম্প্রতিক পুঁজিবাদের স্বরূপ সম্পর্কে বলতে গিয়ে পুঁজিবাদকে ’লেট ক্যাপিলিজম’ হিসেবে চিহ্ণিত করেন। এর দ্বারা তিনি আধুনিকতার কার্যকারণতাকে শনাক্ত করার প্রয়াস চালান। ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কার্যকারিতা ও যথার্থতাকে উচকিত করে এর পরিবর্তনের প্রবাহের বিকারগ্রস্ততার করার কথাও বলেন। কিন্তু শঙ্কা ও পরিবর্তনে শামিল হওয়াকে উড়িয়ে দেন নি। তিনি বলেন, উত্তরাধুনিকতা একটি পুঁজিবাদি তত্ত্ব। আর ক্যাপিটালিজম একটি সাম্প্রতিকতম সংস্করণ। উত্তরাধুনিকতা একজন কবি বা লেখকের গড়ে তোলা ভাবকল্প। আর এ ভাবকল্পের কথা বলেন নিকারাগুয়ার প্রতিবাদি কবি ফেদেরিকো দ্য ওনিস। বলা যায়, এই ভাবকল্পের উৎস হিসপ্যানিক। নিকারাগুয়া মধ্য আমেরিকার দেশ স্পেনের দখলে ছিল বহুদিন। অর্থাৎ য়ুরোপিয় ঔপনিবেশিক ক্ষমতার উপনিবেশ ছিল। এর সঙ্গে ভারতবর্ষের যোগসূত্র আছে।
নিকারাগুয়াকে ১৫২২ সালে স্পেন সামাজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন গিল গনহালেস দ্য আভিলা। নিকারাগুয়া স্বর্ণখনিজে সমৃদ্ধ একটি দ্বীপপুঞ্জ হওয়ার কারণে এর লুটেরা পৃথিবির সবদেশ থেকে ক্রীতদাস সংগ্রহ করে; ভারতবর্ষও বাদ পড়ে নি। এর মধ্য দিয়ে নিকারাগুয়ার অধিবাসি নানা দেশের মানুষের শংকরায়িত একটি জাতি। এ হুবহুচিত্র ভারতবর্ষে ইংরেজের আগমনের ফলে এর অধিবাসিদের ভাগ্যে জুটে। উপনিবেশিক লুটেদের কারণে স্পেনের আদি অধিবাসি রেড ইন্ডিয়ানদের অস্তিত্ব বলা চলে নিশ্চিহ্ন হয়। কবি ওনিস এ বরবোচিত ঘটনার চাক্ষুস স্বাক্ষি, এবং সংকরায়ন ও বহুত্বময়তার পরিণতি করুণ চিত্রগুলো তাঁকে প্রচণ্ড আলোড়িত ও রক্তাক্ত করে। এর নির্মম স্পর্শময় প্রত্যক্ষ প্রকাশ তাঁর লেখায় দেখা যায়। তাঁর লেখাগুলোর অন্তর্নিহিত চিন্তাচেতনার দিকও ক্রমাগত স্পষ্ট। স্থানিক পরিস্থিতি ভেদে এর চেহারা ও ভঙ্গি ভিন্ন, স্বাতন্ত্র্যময়। এর ধারাবাহিকতায় ঔপনিবেশিক চিন্তাতন্ত্র থেকে উঠে আসে সমগ্রের ঐক্য ও পরিসরমনস্কতা।
মজার ব্যাপার হলো, ১৮৩৪ সালে নিকারাগুয়া স্পেন থেকে স্বাধীন হয়। অনেকটা নবাব সিরাজ উদ্দৌলার মৃত্যুর পর মীর জাফরের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার মতো। স্পেন থেকে মুক্ত হলেও মার্কিনিদের ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে যুক্ত হয় নিকারাগুয়া। মার্কিন ঔপনিবেশিকতা ছিল বেস্ট রিফাইন্ড হেতু নিকারাগুয়ার উপর চেপে বসে আরও নির্মম ও শ্বাসরুদ্ধকর করুণভাবে মার্কিন। ১৮৩৪ সালে নিকারাগুয়া স্বাধীন হলেও ১৯১২ সাল থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনি সেখানে ঘাঁটি বেঁধে বসে। এর প্রতিবাদে স্থানীয় নেতা সানদিনোর নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধেও সূত্রপাত হয়। সানদিনো যে বছর দখলদারি সশস্ত্রবাহিনির হাতে নির্মমভাবে খুন হন সেই বছরেই কবি ওনিসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় স্পেনিশ ভাষায় পোস্টমর্ডানিজমো বা পোস্টমর্ডান কবিতার সংকলন। সানদিনোর মৃত্যু সত্ত্বেও প্রতিবাদি সংঘর্ষ বজায় থাকে। নিকারাগুয়ায় মার্কিন মদদে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জেনারেল সোমোজো সেই পুতুল সরকারকে নেতৃত্ব দেন।
পশ্চিমা চিন্তার একটি কেন্দ্রিয় শৃঙ্খলা যখন অপসৃত তখন প্রথাগত চিন্তাকাঠামোগত জ্ঞানভাষ্যকে ছাপিয়ে মানব-সত্তা ও ভাষা-বাহিত ঔপকরণিক নিদের্শনাকে চূড়ান্ত সত্যের অন্বেষণ করে এবং এর খোঁজ চলে ভাষার ভেতরের সত্যের মধ্যে। এই প্রত্যয় থেকে এর ঝোঁকের কেন্দ্র ভাষা ও এর অভ্যাস থেকে উদ্ভূত এবং ভাষাজনিত কারণে সম্ভব বিবিধ মানবিক অ্যভাস নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে Theory Of Knowledge রূপে পরিণত করে এবং ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে স্পষ্ট হয় মিশেল ফুকোকৃত ইতিহাসের ডিসকোর্সের বিশ্লেষণ থেকে।
সারা পৃথিবীর অনেককে নড়ে চড়ে বসতে হয়েছিলো। আর এ ঘটনাটি এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টাল বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে। এটি ঘটে ১৯৭৮ সালের দিকে। তৃতীয় বিশ্বের সাপেক্ষে উপনিবেশিক চেহারার নগ্ন দিকগুলো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে তিনি যেভাবে তৃতীয় বিশ্বের চিন্তকদের সঙ্গে এর বাইরের বিশ্বের অনেক মোড়লকে তাদের চোখকে কপালের উপরে তুলতে হয়েছিলো।
অরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ বোঝার ক্ষেত্রে উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য (Discourse) ধারণাটি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা সত্য যে, উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য ধারণাটি এডওয়ার্ড সঈদের কল্যাণে সর্বজন স্বীকৃতি পায়। উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য ধারণাটি বর্ণনা করার জন্য তিনি ফুকোর জ্ঞানভাষ্য ধারণাটি ব্যবহার করেন। ফলে, শ্রেণিবদ্ধ রীতিসহ উপনিবেশিক ধারণা সব মানুষের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে; এবং একই সঙ্গে তার ধারণাটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
সাঈদের অরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদের ওপর ভিত্তি করে উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য সংগঠিত হয়। তার ফলে, এর পদ্ধতিগুলো অনুসন্ধান করা সহজ হয়, পরবর্তিতে যা উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্যের তত্ত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য পাঠের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাঈদ ছাড়া আরও একজন বিখ্যাত উপনিবেশিক তাত্ত্বিক হলেন হমি ভামা। এ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ কেবল উল্লেখযোগ্য নয়, তাৎপর্যপূর্ণও। কেননা, তিনি উপনিবেশিক সম্পর্কগুলোর দুর্বল অসঙ্গতিকে নির্দিষ্ট করে তুলে ধরেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি উৎপাদনমুখিতা, উভয়বল এবং অনুকরণকে উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্যের সহজাত ফাঁকফোঁকরগুলোর কথা উল্লেখ করেন।
ফুকো জ্ঞানভাষ্যকে তত্ত্বে রূপ দিয়েছেন। তাঁর মত, এটা হলো এমন একটি তথ্যমূলক জ্ঞানভাষ্য, যা পৃথিবীকে সব মানুষের জানার মুঠোর নাগালে এনে দেয়। এটা এমন একটি পদ্ধতি, যার দ্বারা সমাজের কর্তৃত্বশীল শ্রেণিকে নিপীড়িত মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট জ্ঞান, শৃঙ্খলা এবং মূল্যবোধ আরোপের মাধ্যমে সত্যের পরিসরকে প্রতিষ্ঠিত করে। সামাজিক সংগঠন হিসেবে এটা বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে জ্ঞেয় বস্তুর সমাবেশ ঘটানো কেবল কাজ করে না, বরং তার উপর ভিত্তি করে সেই জ্ঞাতা বা কর্তৃত্ব শ্রেণিরও সমাবেশ ঘটিয়ে সম্প্রদায় গঠন করে। এ কারণে উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য হলো চিহ্নের জটিলতা এবং তার রীতি, যা উপনিবেশিক সম্পর্কের মধ্যে সামাজিক অস্তিত্ব ও সামাজিক পুনরুৎপাদনকে সংঘবদ্ধ করে।
কেন্দ্রিভূত য়ুরোপ ধারণার সঙ্গে উপনিবেশিক ডিসকোর্স অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ফলে উপলব্ধির সঙ্গে তার সমাবেশ ঘটে, যা আধুনিকতাবাদী বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে, যেমন- ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য এবং প্রযুক্তি সম্বন্ধে ধারণা। এভাবে উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্য ভাষার রীতি হয়ে ওঠে, যা উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো এবং উপনিবেশিত মানুষ, উপনিবেশিক শাসন কিংবা শক্তিসমূহ-এ দুয়ের সম্পর্কের মধ্যে সাঁকো তৈরি করে।
উপনিবেশিকরণ সম্বন্ধে এটি হলো জ্ঞান ও বিশ্বাসের পদ্ধতি। উপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে প্রচলিত থাকলেও উপনিবেশগত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে এর জ্ঞানভাষ্য গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে উপনিবেশিত রাষ্ট্রবোধের মধ্যে একটি গভীর সংঘর্ষ তৈরি করে। কারণ, বিশ্ব সম্বন্ধে অন্যান্য জ্ঞানের (এবং বিভিন্ন প্রকার জ্ঞান) অমিল। উপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের জাগিয়ে তোলা’র জন্য আন্তঃ ও বর্হি নিয়মগুলোকে উপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, শিল্প, রাজনৈতিক পঠনসমূহ, সামাজিক প্রথা এবং চাহিদার সন্নিবেশকে পরিচালনা করে। প্রকৃতপক্ষে, সাম্রাজ্যবাদের আগমনের মুহূর্তে শ্রেণিসংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে উপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্যের সূত্রপাত হয়। আদিম ও সভ্য হিসেবে ঔপনিবেশিক সামাজিক সংগঠনরীতি-প্রকৃতির শ্রেণিকরণকে উপস্থাপন করে।
অবশ্য উপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের সম্ভাবনাগুলো বর্জন, ঔপনিবেশিত শক্তির রাজনৈতিক অবস্থান এবং একটি সাম্রাজ্যের উন্নয়ের লক্ষ্যে গৃহিত সাধারণ নীতির গুরুত্ব- এসব যুক্তি উপনিবেশিক সম্পর্কিত ভাষা বা জ্ঞানভাষ্যকে খারিজ করে দেয় না। বরং উপনিবেশিক রাষ্ট্রের হীনতা, উপনিবেশিক সমাজের বর্বরোচিত নীতিভ্রংশ বা নীতিহীনতা সম্বন্ধে ভাষার বা জ্ঞানভাষ্যের মধ্যের সুবিধাসমূহ প্রকাশ করে।এ কারণে উপনিবেশিক সমাজে সাম্রাজ্যবাদ শাসনের দায়িত্বসমূহ উপস্থাপন এবং ব্যবসা, প্রশাসন, সাংস্কৃতিক এবং নীতির উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উপনিবেশিক সভ্যতা অগ্রসর হয়। এরকমই হলো উপনিবেশিত জ্ঞানভাষ্যের শক্তি যে সব অধীনস্থ একক উপনিবেশিত রাষ্ট্রসমূহ প্রায় সচেতনভাবে তাদের অবস্থানের কপটতা সম্বন্ধে সজাগ থাকে না; কারণ, উপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের মতো অধীনস্থ উপনিবেশিত রাষ্ট্রসমূহ গঠন করে। দণ্ড বা শাস্তিকে আরোপ না করে কিংবা একক শ্রেণিসমূহ যে সব অসংলগ্ন ও অস্বাভাবিক ভাষ্য তৈরি না – করে ভাষ্যসমূহ যা বৈপরীত্য তৈরি করে তা কোনও জ্ঞানভাষ্য নির্মাণ করতে পারে না।
কিন্তু এক্ষেত্রে উপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষা নামে শব্দবন্ধটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৫ সালের এক সমীক্ষায় বরার্ট য়ুং এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন। য়ুং কর্তৃক নির্ণিত হলেও এটি চিহ্নিত করে যেসব ক্ষেত্রে এর ব্যাপ্তি ঘটে, যা যৌনতার কারণে ঔপনিবেশিক জ্ঞানভাষ্যের বিস্তৃতি ঘটে। স্বয়ং উপনিবেশিক ধারণা ধর্ষণ, যৌনতা এবং গর্ভধারণ কামজ অনুষঙ্গগুলো জ্ঞানভাষ্যের ওপর ভিত্তি করে বিস্তার লাভ করে, যেখানে পশ্চাৎবর্তী সম্বন্ধ ঔপনিবেশিক বা উপনিবেশস্থাপনকারি ও উপনিবেশবাসিদের মধ্যে উগ্র যৌনতার বিষয়গুলো এমনভাবে তুলে ধরা হয়। একই রূপে, উপনিবেশবাসী বা ঔপনিবেশিক প্রবণতার ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো বিধৃত করা হয়, যেমন অরিন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ একটি উদ্ভুত প্রেক্ষিত বা দৃষ্টিকোণেেক প্রতিফলিত হয়, যা মৌলিকভাবে নিম্নগতির বা ধীরগতিসম্পন্ন। মূল অধিবাসির শিথিল অথচ নেতিবাচক ভাবনার জগতের সঙ্গে সংলগ্নতার কারণে উপনিবেশ স্থাপনকারি বা ঔপনিবেশিকরা উ™ভূত বিপদগুলো বা ঝুঁকিগুলো উপলব্ধি করে, এবং এমন একটি অবস্থার দিকে তারা পরিচালত হয়, এর ফলে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশা করে এবং তাদের রীতিনীতি গ্রহণ করে, যা অন্যদের যুগপৎভাবে প্রলুব্ধ করে ও তাদের ভয় প্রদর্শনের আশংকাগুলো বাস্তবে রূপ দেয়। ইয়াং দেখিয়েছেন, যেমন, অবৈধ যৌনতার প্রতিমূর্তি, মিশ্র শংকরায়ণের বদ্ধসংস্কারের ধারণা ও ঔপনিবেশিকদের দ্বারা উৎপাদিত সন্তান এবং একই সঙ্গে তাদের মধ্যকার উদ্ভূত লিঙ্গের কল্পনার দ্বারা উপনিবেশবাদের রীতি বিকশিত হয়। এ কারণে, তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যৌনতা হলো প্রথম উপনিবেশিক অনুপ্রবেশকারীদের বাণিজ্যিক সংযোগের প্রত্যক্ষ ও এর থেকে উদ্ভূত ফল এবং বাণিজ্য ও যৌনতার বিষয়গুলো একে অন্যের পরিপূরক ও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ প্রসঙ্গে য়ুং (১৯৮৫: ১৮১-১৮২) বলেছেন:
একেবারে শুরুর থেকে, যেমন, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সম্মান বা সম্ভ্রম, বিবাহ, অর্থনীতি পদ্ধতি এবং যৌন সংযোগ বা বিনিময় অঙ্গাঙ্গিভাবে একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত। ‘কমার্স’ বা ‘বাণিজ্য’ শব্দের অর্থের ইতিহাসের সঙ্গে পণ্যদ্রব্য বা বাণিজ্য ও যৌন সম্পর্ক-এ দু’য়ের বিনিময় সম্পৃক্ত। অতএব, এটা পুরোপুরিভাবে সঙ্গত যে, যৌন সম্পর্ক এবং এর ফলে উৎপন্ন দ্রব্য বা সন্তান, যা সাংস্কৃতিক বিকাশের শক্তিশালী বিপক্ষীয় ক্ষমতা সম্পর্ককে সংকুচিত করে। গৃহীত উপনিবেশবাদের গভীর অর্থনীতি রীতি ও রাজনৈতিক বাণিজ্য বা বিষয়ের মধ্যে দিয়ে এটা একটি প্রধান উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়।
যেহেতু ঔপনিবেশিকতার একটি চলমান প্রকল্প হলো ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত একচ্ছত্রতার বর্হিপ্রকাশ, যা সময়ের সঙ্গে এর রূপকল্প পাল্টায় এর রূপ ও কাঠামোর ভাষ্য। এর ফলে, যে আত্মপরিচয়ের শূন্যতা ও সঙ্কট তৈরি হয়, তা চিন্তার হালনাগাদ ঝোঁকগুলোর উত্থান ও বিকাশে ক্ষমতার তৎপরতাকে শৃঙ্খলা ও পদ্ধতিকে, একে কেবল বিঘ্নিত করে না, বরং প্রথাগত ভাবনার বিপরীতে এর অর্থ ও চরিত্রকেই বদলে দেয়। ফলে, সমাজের সবস্তরে ফায়দা লুটা সুযোগ সন্ধানি মানুষের উত্থান ও উদ্ভব। এ শ্রেণির প্রায় প্রতিটি একে অন্যকে টপকে যেতে উদগ্রীব, এবং সেই কাজই তারা প্রতিটি মুহূর্তে লিপ্ত থাকে। এবং শ্রেণিই সমাজে প্রতিভূ হিসেব দৃশ্যমান। অতীতে এ কথা সত্য একইভাবে বর্তমান সময়ে আরও প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত। অর্থনীতির কাণ্ডারি হিসেবে তারাই সমাজে, রাষ্ট্রে প্রতিটি স্তরে তাদের আধিপত্য এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। আরও যুক্ত করা যায়, বর্তমান সময় এক ধরনের করুণামিশ্রিত ভিত্তি থেকে সামনে এগিয়ে চলার পথে ভ্রান্তিতে আত্মগ্লানি মিশিয়ে থাকে, এ দৃষ্টিভঙ্গি হয়ত এমনই তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমস্ত রকম হীন ও অনৈতিক মত ও পন্থাকে পুঁজি করতে তারা কার্পণ্য করে না। প্রসঙ্গে প্রস্ত’র কথা স্মরণ করা যায়। এ বেড়াজালে থেকে ভোট কেন্দ্রিক ’গণতন্ত্র’ রাষ্ট্র কতটা মঙ্গলকামী রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারছে, সময় ও ইতিহাসের দিকে চোখ দিলে এর অন্তর্হিত সত্য আর গোপন থাকে না। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার তফাৎ- উপেক্ষা করা কঠিন। এজন্য ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ব্যক্তি সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করার সর্বোচ্চ প্রয়াস গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মূল ভিত্তি বলে ধরা হয়। এ ধারাবাহিকতায় শ্রেণি সংগ্রাম এগিয়ে বিপ্লবের কাজে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা আদৌ সম্ভব কিনা তলিয়ে দেখলে থলের বেড়াল বেরিয়ে পড়বে। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অসাধারণ অগ্রগতির ফলে শ্রমের অপরিহার্যতা গুরুত্ব হারাচ্ছে, এবং এর পরিবর্তে নানা ধরনের শ্রেণি বিন্যাসের কারণে সুবিধাভোগি শ্রেণির উদ্ভবে মানুষের মনন ও চেতনা থেকে বিপ্লবের মানসিকতা মিয়্রমাণ হয়ে পড়ছে, এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে একাধিক বিভাজন ক্ষেত্র বিশেষে এতটা তীব্র ও প্রকট হয়ে উঠঠে, তা থেকে বেরিয়ে আসা আদৌ কতটা সম্ভব তা একমাত্র সময়ই বলে দিতে পারে। তবে বলা যায়, দিন দিন সমস্যা ও এর বিন্য্যাস এতটা গভীরে চলে গেছে তা সমূলে উৎপাটন করা কঠিন নয়, দুরুহ বটে। উল্টোদিকে, ব্যক্তিহীনতার পরিচয়ের মধ্যে বর্তমান মানুষের ললাটলিখন। পুঁজিবাদি রাষ্ট্র এ সুযোগ নিতে কার্পন্য করে না, কড়ায় গণ্ডায় মহাজনের মতো তুলে নেয়। অপরদিকে, সাম্যবাদি রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্র ও মানুষ- দু’য়ের পুঞ্জীভূত হতে থাকে সমস্যার পাহাড়, যা তাদেরকে ঠেলে দিয়ে একটি অশুভ পরিণতির দিকে, প্রকৃতপক্ষে এটা মোটে কল্যাণকর নয়।
পুঁজিবাদি ও গণতান্তিক রাষ্ট্রগুলোর সুবিধাগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। এর ভেতরে প্রবেশ করলে গাত্রদাহ পীড়াগুলোর মুখোমুখি হওয়া যায়। ব্যক্তি ও সমাজের নানা ঘটনা-অঘটনা প্রবাহের জটিলতায় শক্তিপ্রদর্শন, ক্ষমতায়ন, লোভ-হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, অর্থনৈতিক ফায়দা, অনৈকিতা, কর্দযতা, ব্যক্তিমুখিতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কারণে ব্যক্তিমানুষের যাপন ও সামাজিক জীবনের কোডগুলো পাল্টে যায় এবং ক্রমশ তরান্বিত করে হীন ছোট ছোট স্বার্থগুলো। এর সূত্রপাত ঘটে বৃটিশ শাসনের গোড়াপত্তনের সময় থেকে। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।
পুঁজিবাদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গাণিতিকভাবে পার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিমানুষের স্বার্থকে উভয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এ প্রসঙ্গে রাশিয়াকে বিপ্লবোত্তর সমাজকে বিবেচনা করা যায়। সেই সময়ে রাশিয়ায় যে পরিবর্তন সূচিত হয়, তা অনেক রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য উদাহরণ ও ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ালেও শিল্পোন্নত সমাজের সঙ্গে পাল্লা দিতে ব্যর্থ হয়। এ দুটোর অন্তর্হিত দর্শনে সমন্বয় ও সামগ্রিক দৃষ্টিগত দর্শনের অভাব। ফলে, গণতন্ত্র ও সাম্যতন্ত্র- এ দু’য়ে লেভের প্লেয়িং পরিপ্রেক্ষিত তৈরির তাৎপর্য অপরিহার্য হলেও উপেক্ষিত হওয়া কারণে এ দুয়ের মতাদর্শ ভার্চুয়াল, বাস্তব জগতে এর উপস্থিতি কাল্পনিক, ভিন্ন ও একস্তরা। এ কারণে, বৃটিশ কাগজে-কলমে এ দেশ থেকে চলে গেলেও তাদের ভার্চুয়াল উপস্থিতি শারীরিক উপস্থিতি থেকেও প্রতিপত্তিময়, তীব্রময়। এর বাস্তবিক প্রয়োজন বর্তমানে দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে, যে তত্ত্ব কিংবা টেক্সট অথবা মতবাদ, যেমন-আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা, সার্বাল্টান কিংবা অরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যতত্ত্ব, বিজ্ঞাপনের তকমায় যে বাহারি লেভেলে সাহিত্য (সামগ্রিক অর্থে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক)’কে বিবেচনা করা হয়, এর পেছনে বাণিজ্যিক নেতিবাচক উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। এ অনেকটা বিপদজনক অস্ত্রের বানানো কিংবা মজুদ রয়েছে, যা মানবজাতির জন্য অশুভ ও মারাত্মক অজুহাতে ইরাকে ঢুকে পড়া নিজস্ব ঘরানার লোকদের নিয়ে। এর বিপরীত দৃশ্য দেখা যায় রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যেখানে এসব অনুষঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের তলানি থেকে দেখাটা উচিত। একটি উদাহরণের দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ভারত ও পাকিস্থান দুটো দেশই উপরে উপরে মাঝে মধ্যে গলায় গলায় ভাব দেখা দিলেও প্রকৃতপক্ষে দুটো দেশ নিজেদের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্কের সঙ্গে এশিয়া মহাদেশের মানুষের কম-বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ সুয়োগকে তৃতীয়পক্ষ সৎব্যবহার করে। তার দরকার দু’দেশের বাজার : ভারতের বাজার তার দরকার, আবার পাকিস্তানের বাজার দরকার। সন্ত্রাস প্রতিরোধের পরিবর্তে সন্ত্রাসবিরোধী সমর্থন দরকার। এটা স্পষ্ট হয়, অবস্থানের পরিবর্তন হয় কেবল, পরিপ্রেক্ষিত নয়; সঙ্গে, শোষণ ও নিপীড়নের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে ঔপনিবেশিকতার থেকে মুক্তি, তৃতীয় তরঙ্গের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিপত্তি ও বিস্তৃতি, সাহিত্যে টেক্সটের অবস্থানচ্যুতি ও পবির্তন, য়ুরোসেন্ট্রিক মানসিকতা ও ভ্রান্তির আবাহন, অবস্থানজনিত সংকট ও সমস্যা এবং সর্বোপরি সম্পর্কায়নের বিশ্বায়ন। উৎপাদনের মাত্রা ও বাজারের আকৃতির ভারসাম্যের আদলে প্রযুক্তির দখালের সঙ্গে বাজারের দখল একই সূত্রে গাঁথা। উদ্ভূত হয় এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ, আউটসোর্সিং। জুনাথন সুইফটে’র গালিভার্স ট্রাভেলে’র পরিপ্রেক্ষিত বর্তমানেও প্রাসঙ্গিক। হালে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যাপনের প্রতিটি পন্যসামগ্রীর প্রয়োজনের নিরিখে দাবি করছে আউটসোর্সিং। একদা ঔপনিবেশিক শক্তিমান দেশগুলো যেরকম সমস্যায় ভুগেছিল, বর্তমান এরই প্রতিফলন। অর্থনৈতিক কারণে যাপনের সবকিছু আউটসোর্সিং-এর চাহিদাকে উসকে দেয় যদিও ইকোলজির কারণগুলো এর বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তবে, বাজারদর্শন পূর্বের মতো কোন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কিংবা এমত কোন পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কোন প্রভাবকের ভূমিকা পালন করতেও ব্যর্থ হয়। বর্তমানে বাজারদর্শনে কোন একচেটিয়া পরিস্থিতি নেই, বরং বাজারকরণে আছে। এ কারণে, একচেটিয়া মনোভাব থেকে হালেও যেসব রাষ্ট্র শাসন করেছে, তাদেরকে সরে আসতে বাধ্য করে। যেহেতু, সময়টা প্রযুক্তিনির্ভর। প্রযুক্তি দখলের সঙ্গে বাজার দখল এক সূত্রে গাঁথা হেতু সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ‘লেট ক্যাপিটালিজম’ কর্পোরেট ইকনমি হওয়া সত্ত্বেও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। এর কারণ, উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণের ছকের বাইরে। গ্রামীণ ব্যাংক এই একচেটিয়া খেলা খেলতে গিয়ে স্বয়ং নিজেই বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এবং বিস্তর জরিমানার মতো পদস্খলন হগেয়ছে। যেমন বিল গেইসকে স্বয়ং মার্কিন মুলুকে জরিমানা দিতে হয়। কর্পোরেট ইকোনমি আর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে নেই।
গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদি রাষ্ট্রের মতো আধুনিকতাবাদি সাহিত্য যেমন ক্যাননধর্মি চেতনাকাঠামো ধারণ করে, যা একঅর্থে সময়তাড়িত চেতনাকাঠামোকে প্রকাশ করে। আদত কথা ক্যানন নির্ভরতা আধুনিকতাবাদি সাহিত্যের মূল উপজীব্য এবং ম্যানিফেস্টো প্রধান, যেখানে ছোট ছোট গোত্রের ইতিহাস ও যাপনের সম্পর্কানের অবস্থানজনিত দিকগুলো ব্যাখ্যা করে না, বরং তাদের টেক্সট উপেক্ষিত, পক্ষপাতদুষ্ট। সময়ের সঙ্গে এর ধরন পাল্টালেও এর পরিপ্রেক্ষিত ও অবস্থানজনিত পরিস্থিতি একই থেকে গেছে। যদিও প্রেক্ষিতের প্রয়োজন থেকে একই কারণে স্থানিকতা গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় সমূহ ও সমগ্রের অবদান থেকে। এই পারস্পরিক আসঙ্গযুক্ত চেতনার দিকটি প্রকাশ হওয়াটা জরুরি নিজস্ব আইডেনটিটি অপরিহার্যতা প্রয়োজনে। কার্যত ব্যতিক্রমিবাদি ডিসকোর্স বা জ্ঞানভাষ্যকে পুনরাবিবেচনা জরুরি এ কারণে যে ব্যতিক্রমিবাদি জ্ঞানভাষ্যকে সবসময় আরোপিত, যেমনটা দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে দখল করে, পরবর্তিতে দখলের বৈধত দেওয়া হয় গণতন্ত্রায়নের প্রতিশ্রুতি প্রদানের মধ্য দিয়ে। একই সত্য ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে। প্রাচ্যতত্ত্বের মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃত সত্যকে কেবল উন্মোচিত করা নয়, একই সঙ্গে পেছনের কার্য-কারণ জ্ঞানভাষ্যের ভূমিকা ও শোষণপ্রক্রিয়ার সম্পর্কায়ণের ধারাবাাহিক প্রতিবেদনকে উপস্থাপন করা, যেখানে প্রাচ্যকে অপর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তৃতীয় বিশ্বে মানুষের অবস্থান রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ম-নীতি নিষ্ঠার চাপে ব্যক্তিত্বের যে সংঘাত, অসহায়ত্ব অবশম্ভাবী সে কথা উপলব্ধি করে বারবার প্রতিবাদ করার যে স্পেস বা পরিসর তৈরি হয়, তা দ্বিখণ্ডিত, দ্বিধাবিভক্ত। সামগ্রিকভাবে, সমষ্টিগত কিংবা যৌথ প্রচেষ্টায় ব্যক্তিত্বের ভূমিকা ফাঁপা, বোধশূন্য। খুব সূক্ষ্মভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে সমাজ সভ্যতার ভবিষ্যৎ। সময় ও মানুষ বদলে যায়, তবে এর পরিপ্রেক্ষিত একই আছে, এবং আরও বহুমাত্রিকভাবে মানুষের উপর এর নিপীড়ন ও শোষণ জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসে। এবং বসছে। এ অনেকটা ’ফেয়ার এন্ড লাভলি’ বিজ্ঞাপনের মতো। এর মূল শক্তি অর্থনৈতিক। রাজনীতি এখন অর্থনৈতিক কারণে হয়, মানব কল্যাণের কথা বিবেচনা করে নয়। তাই ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে সোশ্যালিজমের মধ্যে তত্ত্বগত অমিল থাকলেও ব্যবহারিকভাবে এরা সহোদর। যে পার্থক্য দেখা যায় তা মোটা দাগের কিছু নয়, বরং পার্থক্যটুকু হলো কেবল কথার কূটকৌশল ছাড়া কিছু নয়। মানুষের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত তৈরি করা, সামাজিক ক্যানন ও কোডের ব্যালেন্সে বৈষম্য সৃষ্টি করে প্রশ্নবিদ্ধ করা। মানুষকে একরকম গিনিপিকে পরিণত করার একটি নয়া কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। ব্যক্তির স্বাধীনতা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বর্তমান সমাজে রাষ্ট্রে মানুষ যাপনের পরতে পরতে শৃঙ্খলিত, বহুদিন বন্দি থাকা পাখিকে খাঁচার দরজা খুলে দিলে উড়ে যায় না, উড়তে ভুলে যায়, আজকের দুনিয়ায় তা ক্যাপিটালিজম ও সোশ্যালিজম রাষ্ট্রের হোক মানুষের অবস্থানগত পরিস্থিতি একই। ক্যাপিটালিম সমাজে রাষ্ট্রে পুঞ্জিভূত ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে মানুষের যাপনের মান ও গতিপথ পরিবর্তন ঘটে নি। তাই মানাুষের স্বাধীনতার দাবি আজও সোচ্চার, উচকিত। শুধু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নয়, সাম্যবাদি রাষ্ট্রে এ দাবি দিন দিন তীব্র হয়, কোথাও কোথাও এ দাবিকে গ্রাহ্য নয়, মান্যও করতে হয়। শ্রেণি শোষিতসমাজের পরিবর্তন ঘটাতে গিয়ে মানবিক ও সামজিক ক্যাননের অপমৃত্যু ঘটে। এর পরিণাম দেখি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ও চিন্তকদের মধ্যে বিভাজন ও বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। পৃথিবীর সর্বত্র আজ সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি উদ্ভূত, এবং একই সঙ্গে দ্রোহ ও দ্বন্দ্বময় পরিবেশ। এ স্বাপদসংকুল পরিবেশের সুর ’না’। আর এর প্রধান লক্ষ্য হলো যাপনে পরষ্পর সম্পর্কে মানুষের বাাঁচার পদ্ধতিকে অন্বেষণ, যা হবে মানবিক, মানুষের পক্ষে কল্যাণকর, জবাবদিহিতামূলক; কিন্তু ঔপনিবেশিক ও উত্তরোপনিবেশিক সমাজে ও রাষ্ট্রে পণ্যায়ন ও বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে সমাজের বৃহত্তর অংশকে অন্ধকারে রেখে কীভাবে শোষণ ও শাসন করা যায়, এরই পরম্পরা প্রকাশ।
২.
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সবসময় কল্যাণকর হলেও এর গঠনতন্ত্রে মোটাদাগে শুভংকরের ফাঁকি দৃশ্যমান। এ সুযোগে দু’একটি রাষ্ট্র ব্যতিত অধিকাংশ তৃতীয় বিশ্বরাষ্ট্রে এর সুফল দুরাশার মতো। এর কারণ, অর্থনৈতিক ও অশিক্ষা। এ সুযোগে উত্তরোপনিবেশিক রাষ্ট্রের অধীনস্ত রাষ্ট্র হিসেবে তাদের কার্যক্রম চলতে থাকে। কাগজপত্রে এসব রাষ্ট্র স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখা যায়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন না-থাকার কারণে এরা উত্তরোপনিবেশিক রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত ও শোষিত হয়। এক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, সাম্যবাদি বা বামপন্থিদল কার্যত অদৃশ্যমান। এ কথা জ্যঁ পল সার্ত্র বলেন। সম্প্রতি যেসব মিটিং-মিছিল কিংবা ধর্মঘট হয়, তা লোক দেখানো। মানুষকে ধরে আনা হয় অন্য দল বা মানুষকে দেখাতে। অবশ্য অর্থ কিংবা স্বার্থের বিনিময়ে। লোক দেখানো যেখানে পরমার্থ বলে মনে করা হয়, সেখানে সে-ই নীতি বা দল কোনভাবে কল্যাণকর রাষ্ট্র হতে পারে না। একই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র যতই তাদের হাত প্রশস্ত করে না কেন, এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে স্বার্থ। যেমনটা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের গ্রামীণ ফোন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভাবা যায়। নোবেল তাঁকে দেওয়া হয়নি, দেওয়া হয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ফোনকে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একাধিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার সুবাদে তৃতীয় বিশ্ব দেশগুলো থেকে তৈরি করে নেয় তাদের যোগ্য উত্তরসূরি। আর মুক্তবাজার অর্থনীতির কল্যাণে ঢুকে পড়ে তাদের শাসিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে। তৈরি করে স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্র’র মধ্য থেকে নয়া চারিত্র্য, যা এর কার্বন কপি। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র থেকে বের হয়ে আসা স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো মূলত যে আদর্শ ও উদ্দীপনা নিয়ে নিজেদেরকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, এর মূলনীতির একটি হলো মুক্ত মানসিকতা। কিন্তু বিশ্বায়ন সেই মানসিকতাকে উসকে দিয়েছে ঠিকই ঔপনিবেশিকতা মন সেখানে উপস্থিত ছিল। এবং আছেও। যে মূলনীতি ও বিধেয় নিয়ে এর পথচলা, তা মুখের কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, এবং এর পরিণতি খুব ভয়াবহ ও আতঙ্কজনক। প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ এর অশুভ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সোজা সাফটা কথা, এর উদ্ভূব রাষ্ট্র কর্তৃক, যারা এর নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে থাকে, তাদের অভিপ্রায় ও রাষ্ট্রনীতির কূটচিন্তা হেতু এ পরিস্থিতির সৃষ্টি।
ঔপনিবেশিক চোখে অনুষঙ্গ ও প্রেক্ষিতকে সবসময় ভাবা হয় পণ্য হিসেবে। এর অধীনস্ত প্রায় সব দেশ স্বাধীন হলেও মানুসিকভাবে শুধু নয়, শারীরিকভাবেও ঔপনিবেশিক চিন্তাকে বহন করে অভিসন্ধি স্পষ্ট, যেখানে সুন্দরভাবে জাতিগতভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে তত্ত্ববিদ্যাগত ও জ্ঞানভাষ্যগত একটি দূরত্ব ও বিভাজন তৈরি করা এর মূখ্য উদ্দেশ্য, যা সহজে অনুমেয়। হালসময়ে মিডিয়ার উপস্থাপনে প্রাচ্য যেভাবে উঠে আসে তা যেমন কম-বেশি সবাইকে নাড়া দেয় না, তাদের অবচেতন চিন্তা প্রক্রিয়াকেও স্পর্শ করে।
ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র’র অভিজ্ঞতার আওতায় প্রাচ্যের বিশেষ এলাকার ভিত্তিতে ’প্রাচ্য’ ধারণা উদ্ভব হয়। যেহেতু প্রাচ্য ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বলা চলে, প্রাচ্য ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর বড় উপনিবেশ। এ কারণে, প্রাচ্যের ভাষা ও সভ্যতার সূচনা ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হয়। যদিও বিৃটিশ ও ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ও আন্দোলনের পরম্পরায় ধারনটি বিকশিত ও বিস্তার লাভ করে। তবে, এর মূল ব্যক্তিরা হলো ঔপনিবেশিক রাষ্টের উপনিবেশ রাষ্টের অধিবাসি। তবে সত্য যে, প্রাচ্যতত্ত্বের ধারণা ও প্রকৃতি ব্রিটিশ ও ফ্রান্সের মডেলে সংজ্ঞায়িত ও বিস্তৃতি লাভ করে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রাচ্যকে শাসন, শোষণ ও নিপীড়ন করে। প্রাচ্যতত্ত্বের তাত্ত্বিকগত ধারণাটি মৌলিক দ্বিভাজনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়। এ তত্ত্বমতে, প্রাচ্যকে উপস্থাপন করা হয় এশটি অপরিশোষিত ও অসভ্য বা অসংস্কৃতিমনষ্ক (আনকালচার্ড) জাতি হিসেবে যারা বৃদ্ধিবৃত্তিকগতভাবে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অধীন। শ্রেষ্ঠত্ব এখানে প্রধান ভূমিকায় থাকে। প্রাচ্য সবসময় অস্পর্শশ্রেণি ও গিনিপিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হালেও এ ধারণাটি বলবদ রয়েছে। সময় বদলে গেছে, বদলে গেছে প্রেক্ষিত। প্রাচ্য ও প্রাচ্যের বাইরে অনেক রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদেরকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিবাসী ঘোষণা করলেও প্রকৃতপক্ষে আদৌ কি তারা স্বাধীন?
স্বাধীন হলে কতটা? প্রাচ্যের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়। পূর্ব ও উত্তর ঔপনিবেশিক সময়ের সমাজের প্রেক্ষিতে তৃতীয় বিশ্বের বর্তমান সংকট ও সমস্যার ত্রিশূল অন্তর্ঘাতময় পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টির মতো এশটি ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি ও অবস্থান উদ্ভূত হওয়ার কারণে এশটি নিষ্ফল ও আদর্শিত একটি অতীতের প্রতি প্রচণ্ড মোহ তৈরি হয়, যা ঠিক যেন স্ব-অবস্থান থেকে পলায়নপরতা। এ হলো একটি দিক, অন্যটি ক্রোধে ও প্রতিবাদে সরব হওয়া। দুটো সমাজ নানারকম সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় উত্থিত থাকে, যা বেশির ভাগাংশে মারাত্মক ও বিপদজনক সশস্ত্র সংঘর্ষ, বিদ্রোহ ও গ্রহযুদ্ধ এবং এমনকি শাসকগোষ্ঠির সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ ও নির্মূলের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপনিবেশিত সমাজ ও রাষ্ট্রগুলো বিদ্রোহি সমাজের ধব্জাবাহী হলেও মূলত এ সমাজ স্বাধীন সত্তা লাভ করলেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে তৃতীয় বিশ্বের শাসকরা ভয়াবহভাবে কর্তৃত্ব প্রকাশ করে। উপনিবেশিত সত্তা স্বাধীন হলেও তারা মূলত ঔপনিবেশিক সত্তারই সম্প্রসারণ এবং ঔপনিবেশিকতার প্রতিনিধিত্ব করে মেধায় ও মননে। উপনিবেশিত স্বাধীন সত্তা ঔপনিবেশিক প্রভুর চেয়ে অধিকমাত্রায় ক্ষমতা উপভোগ করার কারণে তারা বেপরোয়া ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসকে পরিণত হয়। যেহেতু সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী ও মজবুদ না-হওয়ার কারণে ঔপনিবেশিকতা থেকে অবমুক্ত উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলোর শাসক ঔপনিবেশিক প্রভুদের ছায়াশাসক। ফলে তাদের কণ্ঠস্বর বিপ্লবী ও সচকিত হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ফাঁপা পিপের মতো হয়, এবং কোন সুসঙ্গত ও সুগঠিত কার্যক্রমের পরিবর্তে যৌথ স্বপ্নের একটি উন্মুক্ত প্রকাশই সেখানে দেখা যায়। তাই বলা চলে, এ শ্রেণি, অনেকটা ফ্রান্ৎস ফ্যানন বর্ণিত, উপনিবেশবাদের ছত্রছায়ায় উত্থিত একটি মেধাশূন্য অনুন্নত বর্গ, এবং উপনিবেশের সহযোগি ও মুৎসুদ্দি হিসেবে তারা নিজেদেরকে বিস্তৃত করে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঔপনিবেশিকতার উপর নির্ভরশীল থাকে। এ নির্ভরশীলতা অর্থনৈতিক দুর্বলতা এর মূল কারণ ভাবা মানে অন্য দিকে এর মোটিভকে প্রবাহিত করা। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রতিরূপ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চাওয়ার ইচ্ছেও এর অন্যতম কারণগুলোর একটি। এছাড়া এ শ্রেণির বুর্জোয়ারা উৎপাদনের সঙ্গে কোন প্রত্যক্ষ সংযোগ থাকে না, বরং মধ্যস্বত্বভোগী কর্মকাণ্ডে তাদের বিস্তার ও বিস্তৃতি, যেখানে ব্যবসায়িক মানসিকতা প্রতিনিধিত্ব করে, দেশজ শিল্পোন্নয়ন নয়, যা আদলে উপনিবেশবাদ তাদের উপর সংক্রামিত করে। তাদের উত্থান প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তশ্রেণি থেকে হয়ে থাকে বলে মধ্যবিত্তশ্রেণির চিন্তা ও চেতনায় শক্তভাবে গেঁড়ে বসে উপনিবেশি মন, যা অন্যার্থে বলা যায় এ দুর্বলতার অপ্রত্যক্ষ কারণ। Confronting Empire বইয়ে ইকবাল আহমদ বলেন, ঔপনিবেশিকোত্তর রাষ্ট্র হলো উপনিবেশিতের একটি বাজে উদাহরণ। ঔপনিবেশিকোত্তর রাষ্ট্র কাঠামো- একটি কেন্দ্রিভূত ক্ষমতা, পিতৃতান্ত্রিক আমলাতাতন্ত্র এবং মিলিটারি ও ভূস্বামিদের আঁতাত এই ধরনের রাষ্ট্রের কাঠামো একই থাকে, কিন্তু নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটে এবং পুরনো ব্যবস্থা ক্রিয়াশীল থাকে না। (Iqbal Ahmad, Confronting Empire, South End Press. 2000, USA, p. 131) ।
ইকবাল আহমদ একই বইয়ে আরও বলেন, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র উপনিবেশিতদের যথার্থভাবে পরিসেবা প্রদান করে না। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র স্ব-স্বার্থে কেন্দ্রিভূত থেকে শাসন করে এবং সম্পদ শোষণ ও লুণ্ঠণ করে। ঔপনিবেশিকোত্তর রাষ্ট্রও সে-ই কাজটাই করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চেয়ে নিষ্ঠুর, বিবেকহীন। উদাহরণ টানেন হিসেবে তিনি ইরানকে উল্লেখ করেন। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের সময় প্রায় ৬০ হাজার ইরানি যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করে। এক্ষেত্রে, ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিয় সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম নয়। পড়ালেখা শেষে তার দেশে ফিরে উপনিবেশিতের রাষ্ট্র কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত করে। কিন্তু আদতে তারা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রতিমূর্তি হিসেবে কাজ করে। ফলে, তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের এক ধরনের ছেদ ঘটে, এবং এমন একটি বর্ণবৈষম্য ব্যবস্থা প্রচলিত হয় যেখানে ধনী গরীব থেকে পৃথক হয়ে যায়, এবং ধনীর সঙ্গে পশ্চিমের সংযোগ সাধিত হয়, তেমনি মেট্রোপলিশের সঙ্গে।
তৃতীয় বিশ্বের রাাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে সৃষ্টি। উপনিবেশ পরিণত করার সত্তা হিসেবে ঔপনিবেশিকোত্তর রাষ্ট্র, যেমন-পশ্চিমা ও য়ুরোপিয় দেশগুলো,তৃতীয় বিশ্বে কর্পোরেট আগ্রাসন বজায় রাখে-এই প্রক্রিয়ায় দুটো উদ্দেশ্য সাধিত হয়, যেমন-উপনিবেশিত রাষ্ট্রের মানুষদের শোষণ করা, সামন্ততান্ত্রিক থেকে পুঁজিতান্ত্রিক অবস্থানান্তর কারণে সৃষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো রফতানি করে। কেনিয়া এর উজ্জ্বল উদাহরণ। কেনিয়া স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৬৩ সালে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র থেকে নিজেদের মুক্ত করলেও আত্মপ্রকাশ ঘটে নব্য ঔপনিবেশিকতার ধারক হিসেবে আধুনিক কেনিয়ার। কেনিয়ার নব্য ঔপনিবেশিকতার রূপকে উপলক্ষ্য করে নগুগির উপন্যাস ’উইজার্ড অব দ্য ক্রো’।
বর্তমানে দাঁড়িয়ে এই চেতনাবোধ তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ। অপ্রতিরোধ্য এ নাজুক পরিস্থিতিতে কে কার পাশে দাঁড়ায়? কেউ না। বরং পরিস্থিতিকে উসকে দেয়। আন্তর্জাতিক মতামতকে তোয়াক্কা না করে বিশচেতনার চোখের সামনে প্রহসন বিচারের নামে বুশ প্রশাসন সাদ্দাম হুসেনকে হত্যা করে মিথ্যা অপবাদে, রাসায়নিক অস্ত্র রাখার অজুহাতে গণতন্ত্র নাজুকতার কারণে। এতেও বাণিজ্য: তেল, অস্ত্র, পুরাকীর্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুট। নতুন উপনিবেশের পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নেওয়া। তা-ই হয়, হচ্ছে। হালে যে পৃথিবির নানা দেশে ও প্রান্তে বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাস, এ তারই পরিণতি। চিন্তবিদদের মত, ইরাকেকরা যে অজুহাতে বুশ প্রশাসন নিজেদের উপনিবেশিক স্থাপন করতে গিয়ে যে অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যেমন-লাখে লাখে নারী-পুরুষ-শিশুদের হত্যা করে নির্মমভাবে, খাদ্যের ঘাটতি ও অনিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করে নারী ও শিশুকন্যাদের শস্তা পণ্য করে তোলা, জাতিগত বিভেদকে আরও উসকে দেওয়া। বুশ প্রশাসন থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে সুচি ও তার আর্মি যেভাবে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়, জাতিসংগের কিংবা মানবিকাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবেদন পাঠ সেই অভিজ্ঞতাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নেয়।
সন্ত্রাসের অগ্নি চারদিকে এখন নীরবাতঙ্কের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে মানুষকে এরকম ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। এর থেকে খোদ আমেরিকা কিংবা বড় শক্তিগুলোও শঙ্কা মুক্ত নয়। এর উত্তরণে ফুকোর Discipinary Power কে কাজে লাগানো বিবেচনা করা যায়। সমাজ ব্যবস্থার যে রূপান্তর ঘটে, সঙ্গে মানুষের যাপনের সম্পর্কগুলো, তা কিভাবে সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করা যায় Discipinary Power সেই পথকে বাদলে দেয়। কিন্তু সত্য যে, যে উপনিবেশিক পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি হচ্ছে চারদিকে পৃথিবির বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষভাবে এশিয়ার দেশগুলোতে, এর থেকে বেরিয়ে আদৌ কি সম্ভব?
এশিয়ায় এখন কর্পোরেট ইকোনমি চলছে। প্রতি মুহূর্তে এর ফর্ম ও রূপ বদল হয়। এ অনেকটা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির বিজ্ঞাপনের মতো । সমাজতন্ত্র এখন সাইনবোর্ড। বিশ শতাব্দির শেষেও এ নিয়ে কথা কথা বললে মানুষ বিবেচনা করত। এর অন্তিম লগ্ন, প্রদীপের সলতে নিবু নিবু। কর্পোপটে ইকোনমির মতো কর্পোরেট ডেমোক্রেসি চলছে সর্বত্র। ফেয়ার এন্ড লাভলির উজ্জ্বলতার মতো কর্পোরেট ডেমোক্রেসির দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে এশিয়াময়। আফ্রিকাসহ পিছিয়া পড়া দেশগুলোতে। এটা নিঃসন্দেহে ঔপনিবেশিক দুর্যোগ, আর এর প্রধান হাতিয়ার হলো অর্থনৈতিক ও নির্যাতন। অক্টেভ মানোনিও (Octave Manoni) তাঁর বই Prospero and Caliban, the Philosophy of Colonization (1956) এর মধ্য দিয়ে এ পরিস্থিতিকে যথার্থভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পান, যার মূল উপজীব্য হলো ’নির্ভরশীলতার জটিলতা’। এর সঙ্গে মিলিয়ে নাফিসি’র একটি উপন্যাস ’রিডিং লোলিটা ইন তেহরান’কে পড়লে এর পেছনের অর্থোদ্ধার সহজ হয়ে যাবে। স্বাধীন দেশের অধিবাসি হলেও আমরা নিঃসন্দেহে উপনিবেশিক হালতে জীবনযাপন করি, যাদের অস্তিত্ব হীনম্মন্যতায় টানাপোড়নে প্রতিনিয়ত পীড়িত, উদ্বিগ্নযুক্ত। এ শঙ্কায় প্রোথিত, যা সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে আমাদেরকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়ভাবে নিয়ক্রণ করে। এর মূলকথা, ডারবিশের মতে, পশ্চিম, সবকিছুকে পবিত্র করে, আর মুসলিম দেশগুলো সবকিছুকে কলঙ্কিত করে। এ মর্তাদশে নাফিসির মতো সালমার রুশদী, ভি এস নাইপলসহ এমত অনেক আত্মবিক্রিত ও হীনম্মন্যতায় পীড়িত লেখক উপনিবেশিক মানসিকতা লালন করে। ‘ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক’ এর পরিপ্রেক্ষিতে এ মতাদর্শকে ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে না। এ কারণে, আফগানিস্তান ও ইরাক আগ্রাসনকে পশ্চিমা শিক্ষায় দীক্ষিত বুদ্ধিজীবি, অনুরাগী, সিভিল সোসাইটি নিঃসঙ্কোচভাবে হর্ষমুখে স্বাগত জানায়, এবং এর পক্ষে তাদের অলস ও স্বার্থসম্বলিত মতামত পেশ করে, যা অমানবিকভাবে একটি উপনিবেশিক রাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যকে সমর্থন করে। এবং একই সঙ্গে নিজেদের অজ্ঞাতে ও অজ্ঞানে, স্বদেশিয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে কলুষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে দেশ সুনাম ভূলুণ্ঠিত হয়। বস্তুত, তারা পার্শ্বচর হিসেবে কাজ করে, যেখানে তাদের হীনম্মন্যতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। এসব লেখক কোনভাবে নিজদেশিয় ঐতিহ্য পরম্পরার সঙ্গে সম্পর্কিত নন, তার একটি ঐতিহ্যবিচ্ছিন্ন পরগাছা বর্গ হিসেবে চিহ্নিত। তাদের কণ্ঠস্বর সবসময় নিম্নগামি ও অস্পর্ধিত হয়। তারা কোনভাবে ডায়াস্পরো বর্গের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত নয়। ফার্নোর ভাষায়, ‘যাদের রয়েছে শিকড় ধারণের বেলায় হীনম্মন্যতার জটিলতা, যাদের স্থানিয় সাংস্কৃতিক খাঁটিত্ব সমাধিতে সমর্পিত।’ এ কারণে, ‘ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক (১৯৫২)’কে নির্যাতনমূলক অভিযোগপত্র বা দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেহেতু জাতিদ্বেষ ও উপনিবেশবাদের সম্পর্কে পুনঃমূল্যায়ন নতুন সময়ের প্রেক্ষিতে স্পষ্ট করে তোলে, যা প্রাচ্যতত্ত্বকে বিকৃতির দিকে ঠেলে দেয়, আর দেশিয় বুদ্ধিজীবী উপনিবেশবাদের ছক মতো একটি সংস্কৃতিকে নির্মাণের নামে আত্মনিয়োগ করে, যেমন-সিভিল সোসাইটি, রাষ্ট্রিয় বুদ্ধিজীবী ও তাদের অর্ধস্তন, যে ভাষা ও রীতি, টেকনিক ও ফর্ম তাদের যাপিত সম্পর্কায়নে ব্যবহার করেন, তা তাদের নিজের নয়, পুরোটাই ধার করা। বাংলা উপন্যাসের অগ্রদূত হিসেবে যাবে বিবেচনা করা হয়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ে’র উপন্যাসকে সেই মতাদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করে। এভাবে প্রাচ্যের মন ক্ষতিগ্রস্ত ও রক্তাক্ত হয়। উপনিবেশিত বুদ্ধিজীবীদের হীনম্মন্যতার হেতু নব্য উপনিবেশিত দেশগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবাদর্শে উজ্জীবিত বুদ্ধিজীবীদের আবির্ভাব ঘটে। যাকে মুৎসুদ্দি বুদ্ধিজীবী বা লেখক হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা ক্ল্যাজিক্যাল বুদ্ধিজীবী বা লেখকের কার্বনকপি বলা যায়।
আরও একটি উদাহরণ দিলে উপনিবেশিক চারিত্র স্পষ্ট হকে। হালে সংগঠিত দুটো ঘটনা, যেমন-
২০০৮ সালের নবেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পৃথকভাবে সংঘটিত দুটো ঘটনাকে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমটি ২০০৮, নভেম্বরে ভারতের মুম্বাইয়ের একটি সহিংস মানুষ কমপক্ষে ১৭৩ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। এর এর দায় সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অনেক বুদ্ধিজীবী এ ঘটনার পেছনে ইসলামের হিংসার প্রকৃত চরিত্র খুঁজে পায়, এবং প্রায় দু’বিলিয়ন জনগোষ্ঠিকে অপরাধীর কাঠগড়ায় তোলে, বিশ্বমানবতার সামনের একটি ঘৃণ্য ও কলঙ্কিত জনগোষ্ঠিকে মুসলিম সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপনের হীন মানসিকতার প্রয়াস চালায়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে গাজা এলাকায়। ইসরাইল যখন প্যালেস্টাইনদের ভূমি দখল করে স্থানীয় ফিলিস্তিনি অধিবাসি প্রতিবাদ করতে গেলে ইসরাইল প্যালেস্পইরকে নির্যাতন, রক্তাক্ত ও হত্যা করে। প্রকাশ যে, তিন সপ্তাহে তারা ১৪০০ প্যালেস্টাইনের মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এখনও প্রতিনিয়ত ইসরাইলরা বিনা কারণে ও ওৎর ছাড়াই প্যালেস্টাইনিদের নির্যাতন, রক্তাক্ত ও হত্যা করছে। কিন্তু কেউ ইসরাইলকে ইহুদি সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করছে না।
এখানে অবিশ্বাস্য সত্য যে, মুম্বাইয়ে সংঘটিত ঘটনাটি ঘটিয়েছে সেই দেশের ইসলামবিচ্যুত কিছু বিচ্ছিন্ন মানুষ, আর ইসরাইল অন্য একটি দেশ প্যালেস্টাইনে বসবাসকারি ভাসমান জনগোষ্ঠি সেই দেশের ভূখণ্ড দখল করে তাদের বসতি স্থাপন ও শাসন করছে। এবং মূল জনগোষ্ঠিকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত ও হত্যা করছে। দুটো পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন ও গুণগতভাবে পার্থক্য থাকলেও উপনিবেশিক চারিত্রের একটি সাম্প্রতিকতম স্ট্যাটেজি পাওয়া যায়, যেখানে পূর্বের চেয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে মিডিয়ার বদৌলতে অমানবিক ও ঘৃণ্যতম কর্মকাণ্ডকে এর প্রেক্ষাপট ও কন্টেন্টকে তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে একটি ঐতিহ্যসম্বদ্ধ জাতি ও ধর্মবিশ্বাসির উপর সবকিছু অবললীয় চাপিয়ে দিয়ে ট্রেড করার মানসকিতা উন্মোচিত হয়, যা কেবল অবিশ্বাস্য নয়, ধ্রুবভাবে সত্য। ট্রেডই উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর প্রধান লক্ষ্য। মিডিয়া এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়, তবে এর সংখ্যা নগণ্য ও নিয়ন্ত্রিত। শেখ হাসিনার কৌশলি পদক্ষেপে কিছুদিন পূর্বে বাংলাদেশে কিছু তরুণের সম্পৃক্ততায় ঢাকাস্থ গুলশানে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ঘৃণ্যতম ঘটনাটি ঘটানো হয় এর পেছনে তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবীরা মনে করে এতেও উপনিবেশিক চারিত্র নিহিত আছে। আর সেটি হলো ট্রেড। এ ঘটনার পর অধিকাংশ বাসা-বাড়ি, অফিস, বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে যেভাবে রাতারাতি সিসি ক্যামেরা বেচা হয়, তা অনেক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিকল্পনা বহুদিনের। কিছু প্রতিশ্রুতিশীল ও প্রতিভাবান ছাত্রদের ধর্মকে কাজে লাগিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করা হয়। ইসলাম ধর্ম কি এ শিক্ষা দেয়, এ বাণি কোরানের কোথাও বর্ণিত হয়, অন্তত আমার জানা নেই। কোন ধর্ম এরকম শিক্ষা দেয় না। বাঙ্গালি ঐতিহ্য পরম্পরা মহমর্মিতা ও সহিষ্ণুতা মৌল বৈশিষ্ট্য হিসেব গৌণ। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবকিছুর উর্ধ্বে। এরপরও কিছু হলেই ইসলাম ধর্মবিশ্বাসি মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় সব ঘটনার দায়-দায়িত্ব। মুম্বাই ও ইসরাইলে সংঘটিত ঘটনার জন্য সমস্ত মুসলমানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। যারা এ সমস্ত ঘটনা ইসলামের নামে ঘটায় তাদের পেট্রোনাইস করা করে, অস্ত্র কারা সরবরাহ করে, কাদের ছত্রচ্ছায়ায় কারা এসব করে, কীকারণে এসব জঘন্যতম ঘটনা ঘটায় মিডিয়ার বদৌলতে মাঝে মধ্যে থলে ছেঁড়ে প্রকৃত বেড়াল বেরিয়ে পড়ে। প্রাচ্যতত্ত্ব এসব ঘটমান ও সংঘটিত ঘটনাগুলোকে বর্ণনা করে। সেসব আমরা পর্যায়ক্রমে দেখব, উপনিবেশিক- উপনিবেশিত সম্পর্কগুলো, এদের উত্তরপর্বেও সম্পর্কায়নের সূত্র কী প্রাচ্যতত্ত্বের দ্বারা এর চিহ্নায়নের মিথক্রিয়াকে উন্মোচনের প্রয়াসগুলো চিহ্নিত করা হয়, তা দেখা যাবে।
৩.
যা হোক, উপনিবেশ স্থাপনে জাতিবিদ্বেষযুক্ত আধিপত্য উৎপাদন এবং এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রাচ্যতাত্ত্বিকদের সম্পৃক্ত করে উপনিবেশবাদের একটি অগ্রসর পর্যায় নির্মাণ করা উপনিবেশবাদের একটি নতুন অবয়বকে নরায়ণ করা। এ যেন প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতকভাবে দুর্বল হয়ে-পড়া উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো, যেমন-যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও য়ুরোপিয় রাষ্ট্রগুলো নতুন সাম্রাজ্যবাদি কৌশল গ্রহণ করে। ফলে, তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে যে গণপ্রতিরোধ ও রোষের মুখে পড়ে, প্রত্যক্ষের পরিবর্তে পরোক্ষ নীতি গ্রহণের কারণে প্রত্যক্ষ উপনিবেশিক শাসন অপসৃত করে উপনিবেশ দেশগুলোর জাতীয়তাবাদ শক্তির উত্থানকে উপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রতি প্রতিবাদের ভাষাকে স্তিমিত করে। স্বাধীনতাপ্রাপ্ত উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি এলিট শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এজেন্ট বা মুৎসুদ্দি বুদ্ধিজীবী বা লেখক উদ্ভব ঘটে। উদ্ভব ঘটে সিভিল সোসাইটি, যারা থাকে শাসন কেন্দ্রে। এসব দেশগুলোর অনুন্নত অবকাঠামো, ভঙ্গুর অর্থনীতি, অসমাপ্ত বিপ্লবের কারণে নড়বড়ে অবস্থান থেকে উত্তরণ হেতু উপনিবেশিক রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। ফলে, সদ্য উপনিবেশিক রাষ্ট্র থেকে মুক্ত স্বাধীন দেশগুলোর স্বার্বভৌমের শক্ত ও মজবুত মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়াতে পারে না, বরং অর্থনৈতিক নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তৈরি হয় পরনির্ভরতা। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, শিল্প, সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মিতি ও রীতির উচ্চমার্গ প্রকাশ ঘটে উপনিবেশকের হাত ধরে। এবং উপনিবেশিত রাষ্ট্র বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়; সঙ্গে এর শিল্প ও ভাষা, রীতি ও নীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যে গাণিতিকভাবে পরিবর্তন ঘটে, এবং নিজস্ব স্বকীয়তা ও মূলবোধ, আচার ও আচরণ উৎকর্ষ ও প্রগতির নামে মূলত উপনেিবশিক রাষ্ট্রকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে। অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র থাকার হেতু উচ্চমার্গিয় শ্রেণির যাবতীয় উপকরণ প্রতুল থাকে। একসময় উপনিবেশিত দ্রোহি ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলো নিচু হতে থাকে, এবং মঞ্চের পুতুলে পরিণত হয়। স্কলারশিপ, মোটা অঙ্কের চাকরি, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, পদোন্নাতি, সম্মাননাসহ নানাবিধ উপকরণ উপযোগী হিসেবে কাজ করে। উপনিবেশিকোত্তর সময়ে প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উপনিবেশিক রাষ্ট্র আরও সূক্ষ্মভাবে দানবীয় চরিত্র নিয়ে ঢুকে গেছে প্রাচ্যের জীবনযাপনের সম্পর্কায়নের প্রতিটি পরিপ্রেক্ষিতে ও চারিত্রে, যেমনটা ঢুকে পড়ে ভারত বর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সবসময় প্রাচ্যকে ব্যাখ্যা ও বিচার করা হয় উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, এবং এর থেকে উদ্ভূত বুদ্ধিজীবী ও লেখক কিংবা সমাজতান্ত্রিক, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একই মিথষ্ক্রিয়ায় সৃষ্ট প্রোডাক্ট। প্রাচ্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যেভাবে উপস্থাপন করা তা আমরা দেখি:
উপনিবেশিক আকরণবাদি দৃষ্টিভঙ্গি
শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভুত্বমূলক মনোভাব
কর্তৃত্ব ও নতুনত্ববাদি আচরণ ও প্রদর্শন
উপনিবেশিত অপর
অপভ্রংশের বর্গ
উপনিবেশিত রাষ্ট্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান উপনিবেশিক চরিত্রকে লালন করে, এবং এর অধীনস্থ মানুষগুলো এক একজন ছায়া মানুষ ও উপনিবেশিক মতাদর্শকে বহন করে।
প্রাচ্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উপনিবেশিকতার কল্পিত ধারণা হেতু দেখার কারণে প্রাচ্যের বৈসাদৃশ্যমূলক বৈশিষ্ট্যগুলো উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে একটি অপর প্রাচ্যকে বিবেচনা করা হয়, যার সঙ্গে প্রকৃত প্রাচ্যের কোন সাদৃশ কিংবা সঙ্গতি- কোনটি নেই। যদিও প্রাচ্যের স্পন্দন অন্তর্নিহিত আছে ঐতিহ্যগত পরম্পরা ও সংস্কৃতি ডিসকোর্সে, যেখানে ধর্ম যাপনের একটি অনুষঙ্গ মাত্র, সামগ্রিক প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা নয়, যা উপনিবেশিক সময় রোপিত হয়, এবং উপনিবেশিকোত্তর এর বিকেন্দ্রিকয়ান সম্পর্কগুলো একটি মেটান্যারেটিভকে প্রকাশ করে প্রাচ্যকে এখনাধি একালে ও সেকালে একইভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে এর অধিবাসিকে ক্যালিবানের মতো দেখা হয়, তাদের আদর্শকে মান্ধাতার আমলের ঘৃণ্য, বস্তাপচা ও নোংরা এবং একই আদর্শে স্থির ও অপরিবর্তণীয় চেতনায় নিজেদেরকে স্বীকৃতি প্রদান। প্রাচ্য এমন একটি মহাদেশ যেখানে লুকিয়ে আছে হিরে খচিত ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে, সামাজিক ও রাজনৈতিকতায় বাঙ্গালি সর্বজনগ্রাহ্য মতাদর্শ শৌর্যে-বীর্যে উচকিত। ১৭৫৭ সালে সিরাজের শাসন এবং তাঁর করুণ পরাজয়ের পরপর ব্রিটিশ সামাজ্য বাদ দিলেও কেবল লর্ড ক্লাইভ যে পরিমাণ অর্থসম্পদ ও হিরে-স্বর্ণ-মুক্তা এদশে থেকে য়ুজাপের মতো লুটে নেয় যুক্তরাজ্যে, যা ভারতবর্ষের অনেকে কাছে চিন্তাতীত। প্রাচ্যের অধিবাসিকে নির্মমভাবে শাসন, শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে যতরকম পলিসি গ্রহণ ও চাপিয়ে দিতে , তা ব্রিটিশ উপনিবেশিক ভয় ও শঙ্কার মধ্যে প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাচ্য কখনও অপরিবর্তনীয় নয, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে এটি চলমান ও হালনাগাদ। তাই প্রাচ্য শাসিত উপনিবেশিত তথ্য ও তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মূল পাথক্যগুলো বিশ্বমানুষের সামনে আনার পাশাপাশি প্রাচ্যের অধিবাসিকে এ সম্পর্কে জানা ও নিজেকে সেই চেতনাকে ঋদ্ধ, বলিয়ান ও জায়মান। যে কাজটি করে চীন। প্রাচ্যকে এর নিরিখে নয়, তার নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দ্বারা ব্যাখ্যা জরুরি। এছাড়া বুশ প্রশাসন কর্তৃক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে প্রাচ্য নিজস্ব সরকার গঠনে অনভিজ্ঞ ও অসমর্থ সেই দেশের নিরীহ সিভিল জনগোষ্ঠিেেক, বিশেষভাবে বৃদ্ধ নর-নারি, যুবতী, শিশু, মহিলাও যুবককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রথমত নিষিদ্ধ অস্ত্র রাখার অজুহাতে, পরে নাজুক গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করতে দমননীতি চালায়। এর মৌল কারণ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। উপনিবেশিক সৃষ্ট মুৎসুদ্ধি বুদ্ধিজীবী এবং এদেশিয় তাদের প্রতিনিধি। এর থেকে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলো এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি। সেই সম্ভাবনা আছে তা কুয়াশাবৃত দূরের পাহাড়ের মতো ঝাঁপসা, অস্পষ্ট, যা সমূহ সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা নিজের সৃষ্টি। প্রতি মুহূর্তে সমস্যাগুলো বিস্তৃত হচ্ছে। উপনিবেশিক রাষ্ট্র কখনও উপনিবেশিত রাষ্ট্রকে ভালোভাবে উপস্থাপন করে নি। যখনই প্রাচ্য সম্পর্কে তাদের বলতে হয়, উপস্থ্াপন করতে তখনও বিকৃতভাবে প্রাচ্যকে উপস্থাপন করে। এখানে আমি প্রাচ্য অর্থে ভারতবর্ষ ও মুসলমানদের প্রেক্ষিত ও অনুষঙ্গগুলো বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে প্রাচতত্ত্বের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং এর অন্তর্নিহিত ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে বণর্ন করার প্রয়াস করব। উপনিবেশিক রাষ্ট্র আরও শারীরিকভাবে মানসিকভাবে চেপে বসে আসে প্রাচ্যে এবং অস্তি-মজ্জা নিঙড়ে শুষে নিচ্ছে দৃশ্যমানভাবে রক্ত, অবর্ণনীয়। উপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিকৃত উপস্থাপনা কথা বলতে গিয়ে ফ্রান্ৎস ফ্যানন তাঁর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের ক্ষেত্র আফ্রিকা সম্পর্কে উপনিবেশিক রাষ্ট্র যে অপকর্ম, নিপীড়িন ও শোষণ করে ক্রান্ত হয় নি, বরং আরও একটি মারাত্মক কাজ করে রাখে তা ভৌগোলিত ও জাতিগত বিভক্তি। যে কাজটি করে গেছে ব্রিটিশ কাশ্মির নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে। দু’রাষ্ট্রের মধ্যে পড়ে কী করুণ শঙ্কময় মুহূর্ত কাশ্মিরের মানুষদেরকে দেখতে হয়, যা অভাবনীয়। এখানেও ব্রিটিশের দূরভিসন্ধি ও যড়যন্ত্র কাজ করে। ফ্রান্ৎস ফ্যানন তাঁর বই The Wretched of the Earth এ যে অভিজ্ঞতার বলেন তা থেকে আমরা একটি ধারণা পেতে পারি। উপনিবেশিক রাষ্ট্র দেশ দখলের সঙ্গে নানাভাবে এর অধিবাসিদের উপর নির্যাতন চালায়, শোষণ ও লুন্ঠন করে নেয় অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পত্তি, এবং সৃষ্টি করে শ্রেণি ও জাতিগত অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিভেদ। আফ্রিকা মহাদেশ সাদা ও কালোতে বিভক্ত করে নিজেদের মতো একটি বানায়াট বাস্তবতা তৈরি করে। উপস্থাপন করা হয় সাদা আফ্রিকাকে একটি সহস্র বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ দেশ। ভৌগোলিকভাবে সাদা আফ্রিকা গ্র্যাকো-ল্যাটিন সভ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত, এবং য়ুরোপের বর্ধিতাংশ। আর কালো বা কৃষ্ণ আফ্রিকাকে ক্যালিবানদের মতো অসভ্য, অসংস্কৃতিবান, হিংসাত্মক, নোংরা ও অলস হিসেবে দেখা হয়। জাতিবিদ্বেষের বিষবৃক্ষ রোপন করে উপনিবেশিক রাষ্ট্র জিইয়ে রাখে জাতিগুলোর মধ্যে। ম্যান্ডেলার আজীবনের সংগ্রাম এর বিরুদ্ধে ছিল এবং বলা হয় এক্ষেত্রে সফলও। কিন্তু যে বিষবৃক্ষটি উপনিবেশবাদ ছড়িয়ে গেছে, তা কি নির্মূল হয়েছে? সত্য হলো, এখনও রেসিয় দ্বন্দ্ব বর্তমান আফ্রিকা জুড়ে। অপরকে হেয়, জাতিগত অন্তর্দ্বন্দ্ব উসকে দেয়া ও বৈরিতা তৈরি করা, ধর্মিয় মূল্যবোধকে বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে মহমর্মিতার ও সম্প্রীতির পরিবর্তে দ্বেষ ও সন্দেহ জিইয়ে অন্তর্ঘাত ও বৈরি পরিবেশ তৈরি করা। ফ্রান্ৎস ফ্যানন যে পরিস্থিতি ও পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনা করেন তাঁর বই The Wretched of the Earth যেখানে আফ্রিকাকে উপনিবেশিক কী করুণ ও নির্দয়ভাবে শোষণ করে এর যেমন বর্ণনা পাওয়া যায়, একইভাবে অবৈধভাবে অন্যের ভূমিদখল এবং এর অধিবাসিদের উপর তাদের করা অন্যায় জুলুম ও নির্যাতন ঢাকতে উপনিবেশিক অপবাদ চাপিয়ে দেয়, সঙ্গে রোপন করে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষ। এর আওতায় সবশ্রেণির মানুষ পড়ে: নিম্ন পেশার মানুষ থেকে অতি উচ্চ পর্যায়ের মানুষ, সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিজীবী মানুষও এর পরিধির বাইরে নয়। ব্রিটিশ এদেশ ছেড়েছে কিন্তু ত্যাগ করে নি। ১৭৫৭ সালের এর আগে-পরে এবং ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে কয়েক শতাব্দি তারা এদেশের মানুষের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চালায় এবং প্রাকৃতিক মূল্যবান সম্পদ থেকে মানুষের রক্ত নিঙড়ে সম্ভাব্য শক্তি ব্যবহার করে সবটুকু লুটে নেয়। এর খতিয়ান বাপক ও সর্বগ্রাসী। তারা সভ্য জাতি হিসেবে উঁচু কণ্ঠে কথা বলে, মিডিয়া সেই কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত কথাগুলোকে মাধুর্য প্রদান করে, অন্যদিকে ভারতবর্ষে অসভ্য, নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ও অসাংস্কৃতিকভাবে ঋদ্ধ মানুষের বাস। ভারতবর্ষের এ পরিণতিতে কে দায়ি? আরও একটু এগিয়ে বলা যায়, উপনিবেশিক থেকে মুক্ত ভারতবর্ষ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো উপনিবেশিক ও উত্তরোনিবেশিক চক্র থেকে মুক্ত ও স্বাধীনভাবে স্বকণ্ঠে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমবায়ে নিজেদের প্রতীতি ও প্রত্যয়ে অবিচল থাকে। উপনিবেশবাদ একদিকে যেমন সুচতুরভাবে অন্তর্ঘাত করে সমাবতান্ত্রিক কাঠামোতে, অন্যদিকে উপনিবেশিকতা থেকে অবমুক্ত উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলোর নব উদ্দীপিত চেতনায় নিপূণভাবে আঁটোসাটো ফাঁস পরিয়ে দেয়। অবশ্য এক্ষেত্রে ডাঙ্কেল প্রস্তাব ও গ্যাট চুক্তি উপনিবেশবাদকে আরও শক্তিশালি এবং এর শোষণ ও আগ্রাসি আক্রমণকে আরও বহুমুখি ও বিস্তৃত করে। ফলে, উপনিবেশবাদ আরও নিরঙ্কুশ প্রাধান্য ও গুরুতে সর্বব্যাপি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আর এর কারণ কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নন্দনতাত্ত্বিক অধিসংগঠনগুলোর দিকে উপনিবেশবাদে গভীর মনোযোগ দ্রবীভূত।
প্রাচ্যের মন তিমিরোৎসারিত আলোর মতো। এর কারণ, প্রাচ্যের জগত ও জীবন, সত্য ও মিথ্যা, সুন্দর ও অসুন্দর, সফলতা ও ব্যর্থতা, কুৎসিত ও নান্দনিকতা সময় ও পরিসরে বিমূর্তায়িত থাকে; তবে বিলুপ্ত হয় না কখনও। উপনিবেশবাদ সৃষ্ট চিহ্নায়কের আড়ালে সব অনুষঙ্গ চাপা পড়ে তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারায়। সামাজিক দায় হিসেবে যে কর্তব্যকে তারা নিজেদের উপর চাপিয়ে নেয় তা প্রকৃতপক্ষে সমূহ ছদ্মবেশের উন্মোচন ও কল্পিত বাস্তবতার বিনির্মাণ। বস্তুত, যতক্ষণ বিকল্প বাস্তব বিকল্প সন্দর্ভ বিকল্প মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা করতে না পারবে, ততক্ষণ উত্তরোপনিবেশবাদের গোপন ও প্রকাশ্য চক্রান্ত ও সন্ত্রাস থেকে মুক্তির সুযোগ খুব কম। উপনিবেশোত্তর চেতনা ধীরে ধীরে নিশ্চিতভাবে সমস্ত দৃশ্য-অদৃশ্য শৃঙ্খল ও অনিয়মকে ভেঙ্গে এর প্রতিবেদন সামাজিক ও নান্দনিক ইতিহাসে গড়ে ওঠে। মেনে নেয়া ও মানিয়ে নেয়া দর্শনকে আশ্রয় করে যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির নন্দন সৃষ্টি হয় তা এর আঁতুড়ঘরে মরে যায়। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে এর সম্পর্ক নামমাত্র। স্ববিরোধিতা ও আত্মঘাত দ্বারা গড়ে ওঠে উপনিবেশবাদের প্রতিবেদন। জীবন ও সংস্কৃতি, সাহিত্যে ও সমাজের নানা পর্বে উত্তরোপনিবেশবাদের অভ্যাস ও চর্চায় বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে আধিপত্যপ্রবণ প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে অর্থাৎ সোচ্চার অভিব্যক্তিকে অপরশূন্য ছদ্মবাস্তবতা নির্মিত হয়। সত্য-মিথ্যা, যোগান-নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন দ্বারা নিম্নবর্গিয় দলিত ও নিষ্পেষিত হয়।
অপর বর্গিয়দের চিহ্নিত ও এদের ইতিহাসকে বিনির্মাণ করা দরকার এ কারণে যে ঐতিত্যের কল্পপ্রতিমা প্রকৃত বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। প্রাচ্যতত্ত্বের ভুল ব্যাখ্যা ও প্রেরণা হেতু ঐতিহ্য ও অতীত কখনো সমার্থক নয়-একথা বিস্মৃত হয় প্রাচ্যবাসি। এজন্য উপনিবেশোত্তর চেতনা মনোযোগ কেন্দ্রিভূত হয় প্রতাখ্যাত অপর। এর পেছনে ডারবিশ্ব যে তিনটি বৃদ্ধিবৃত্তিক উৎস থেকে উদ্ভূত সমালোচনামূলক আখ্যানের কথা উল্লেখ করেন, সেগুলো হলো: বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কর্মকাণ্ডের পরিবর্তনের কারণে বর্তমান বাস্তবতাকে বিশ্লেষণের দ্বারা পরিমার্জন ও সংস্কার করা; নতুন সময়ের প্রেক্ষিতে রেসিয় কিংবা জাতিবিদ্বেষ, হীনম্মন্যতা ও মৌৎসুদ্দি শ্রেণির উদ্ভব ও বিস্তৃতিতে উপনিবেশবাদের সম্পর্কের পুনঃমূল্যায়ন স্পষ্টকরণ; এবং সর্বশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক উৎস অন্বেষণ। অবশ্য তৃতীয় ধারণাটি সাঈদ থেকে নেয়া। উদ্বাস্তু, নির্বাসিত কিংবা তৃতীয় চিন্তার বুদ্ধিজীবীরা এর মূখ্য উৎস। এসব বৃদ্বিজীবী কর্তৃক বিরুপ কিংবা আগ্রাসি, আধিপত্যমূলক ও উদ্দেশ্য প্ররোচিতমূলক উপনিবেশবাদের পক্ষে কথা বলিয়ে নেয়া সহজ। যুক্তরাষ্ট্র অন্যায়ভাবে ইরাকে ভূমি আধিপত্য বিস্তার, নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা ও সর্বস্ব লুটে নেয় মিডিয়ার বদৌলতে যুক্তরাষ্ট্রের দখলের পক্ষে বর্হিবিশ্ব ছাড়া সেই দেশের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদও স্বকণ্ঠকে উচকিত করে। মাতৃভূমি দখল, বোমা মারার নৈতিকতা ও দখলের ন্যায্যতা নিয়ে কথা বলে। যে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র এর খতিয়ান অফুরন্ত এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইরাকের অর্থনীতি এখন তৃতীয়বিশ্বের অতি গরীবদেশের অর্থনীতির চেয়ে খুব একটা বেশি বলা কঠিন। পত্রিকায় প্রকাশ, সন্তানের সামনে দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তায় জননীকে তার সম্ভম বেচতে হয়। কিন্তু সংবাদ এখন ইরাকে একটি অতি নিত্যনিমিত্ত বিষয়। কারও স্পর্শ করে না। এটি এখন চলমান ঘটনা, যা উপনিবেশের সৃষ্টি। এ প্রেক্ষিতে, প্রাচ্যতত্ত্ব উদ্ভূত অনুষঙ্গকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে, যা বর্তমানে উপনিবেশবাদের সম্পর্কায়নের মিথষ্ক্রিয়ায় একটি জটিল কাঠামো ও ভাষার দুর্বোধ্য পরিখা নির্মাণ করে যার থেকে বেরুনো কেবল কঠিন নয়, জটিলও বটে। উপনিবেশ আমলে প্রভুদের শোষণ ছিল একরৈখিক, আর উপনিবেশোত্তর সময়ে মৌসুদ্দি উপনিবেশিত প্রভুদের শোষণ ও নির্যাতন বহুুমুখি ও নিষ্ঠুরভাবে নির্মম। অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এয়ার ফোনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাঁদগুলো আরব বিশ্বের মরুভূমিতে অদৃশ্যভাবে পোতে রাখা বোমার চেয়েও ভয়ংকর। পূর্বে মানুষ হয়ত তার প্রয়োজনে যেত, আর এখন মানুষের প্রয়োজনটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্ট।
এ নিরিখে উপনিবেশবাদ ও প্রাচ্যতত্ত্ব সহাবস্থান করে। উপনিবেশবাদ যেমন বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারে ডেমোক্র্যাসি ইকোনমি বাজার অর্থনীতি চালু করে বিশ্বময় বিশেষ করে তৃতীয়বিশ্বের তথা প্রাচ্যবাসিদের উপর আধিপত্য করে। এ সম্পর্কের উপর অমর্ত্য সেনের একটি বই পরিচিতি ও হিংসা। তিনি বলেন, ‘বস্তুত উপনিবেশ অধীনস্থ মন ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সঙ্গে বহিরঙ্গের সম্পর্ককে পরজীবীর মতো আঁকড়ে থাকে। এরকম আচ্ছন্নতার প্রভাব যদিও নানা রূপ নিতে পারে, অভ্যস্ত এই নির্ভরতা আত্ম-উপলব্ধির সুষ্ঠু ভিত্তি হতে পারে না।’(পরিচিতি ও হিংসা, পৃ. ৯০, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা)
প্রাচ্যতত্ত্ব উপনিবেশের দৃষ্টিতে অপর হিসেবে বিবেচিত হেতু প্রাচ্যের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিত উপনিবেশ বা প্রতীচ্যকে এর আগ্রাসনকে বৈধতা দেয় বলে উপনিবেশের আধিপত্য আরও বিস্তৃত হয়, প্রোথিত হয় উপনিবেশিত রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। উপনিবেশ নিযন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের উদ্দেশ ও আকাক্সক্ষার কারণে প্রাচ্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলোর পরিবর্তন ঘটে। প্রাচ্যতত্ত্ব বলছে, পরিস্থিতি ও শ্রমবিমুখতা একটি শ্রেণির উদ্ভবশ ঘটায় উপনিবেশবাদ, এর উত্তরকালে উদ্ভব ঘটে শাসনকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মধ্য, মধ্যউচ্চবিত্ত, আমলা ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। যেমনটা এর উপনিবেশ পূর্ববর্তিতে জমিদার, রাজা, মহারাজা ইত্যাকার শ্রেণি উপনিবেশবাদের পক্ষে কাজ করে। যা হোক, আমলা ও মৌৎসুদ্দি শ্রেণির শ্রমবিমুখতা এক পর্যায়ে নিবীর্য ও পরগাছায় পরিণত হয়। কর্পোরাল সমাজে এ শ্রেণির আধিপত্য ও দৌরাত্ম প্রতীচ্য মানসিকতায় উচকিত। উত্তরোপনিবোদের যথার্থ মানস প্রজন্ম হিসেবে এ শ্রেণির উত্থান সর্বগ্রাসি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়ংকর ও মারাত্মক। তবে এটা সত্য, কর্পোরাল ইকোনমির ডেমোক্রেসির অস্তিমানে মূর্ত হয় প্রাচ্য। একে কেন্দ্র করে প্রাচ্য তৈরি হয় যথার্থ পরিপ্রেক্ষিত ও অনন্য ক্ষেত্র। স্বাধীনতাত্তোর ভারতবর্ষ মান্যতা প্রদান করে উপনিবেশোত্তর প্রাচ্য সমাজ ও এর বিদ্বৎসমাজ ইংরেজের সঙ্গে উপনিবেশ ডিসকোর্সের সমাপ্তি ঘটার কথা ছিল। বি-উপনিবেশিকরণ শর্তাবলির ভাবনায় ভারতবর্ষের বিদ্বৎসমাজের ডিসকোর্স ইংরেজি ভাষার সহযোগিতায় প্রবর্তিত হয়। এ সুযোগে অন্যদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির চিন্তা প্রাচ্যের সঙ্গে আত্তীকৃত ও মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। এর মূলে সাঈদ আঘাত করেন। তাঁর অরিএন্টারিজম বইয়ের মাধ্যমে প্রাচ্যতত্ত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অবয়বগুলোর অবগুণ্ঠণ করার প্রয়াস করেন। উপনিবেশবাদ ও প্রাচ্যতত্ত্বের লুকানো অবয়বগুলোর মধ্যের পার্থক্যগুলো স্পষ্ট করা এবং এদুয়ের বোঝাপড়াগুলোকে পাঠ করা। এবং উপনিবেশ অপরকে নিয়ে খেলা করে এর মৌল অন্বয়কে উপস্থাপন করা। আর এজন্য উপনিবেশবাদ শাস্ত্রেও সমর্থন নিয়ে আধিপত্য শ্রেণি, সম্প্রদায়, রেসিয় ও শ্রেণিবিভজানের হেজেমনি গঠন করে। তৈরি হয় আত্মপরিচয় সঙ্কট ও হীনম্মন্যতা। ফলে, কেউ কারও বিশ্বাস করে না, সবসময় দেখে সন্দেহ ও অবিশ্বাস নিয়ে। নয়া উপনিবেশবাদের এটি কৌশল। মুক্ত মানুষ তার চারপাশে যেসব সম্ভাবনাকে বর্তমান অস্তিত্বশীল জগতে অর্থবহ মনে করে, আয়ত্তে রাখার গুরুত্ব উপলব্ধি করে, উপনিবেশ তার চোখকে সরিয়ে নেয় কিংবা সেসব থেকে তাকে অপসৃত করে। সংবাদের পর সংবাদ তৈরি করে মানুষের দৃষ্টিকে থেকে সরিয়ে ফেলে এর কেন্দ্র থেকে কিংবা অর্থবহ তথ্যের পরিবর্তে অন্য কোন তথ্যকে তীব্র ও মূর্ত করে তোলে। এভাবে দ্রোহ, প্রতিরোধ কিংবা প্রগতি চিন্তার বাধাগ্রস্থ হয়। এর অন্যতম কারণ, প্রাচ্যের মন সম্পূর্ণভাবে প্রতীচ্য নির্ভর। প্রতীচ্য অধীনস্থ মন জটিল সীমাবদ্ধতা ও প্রতীচ্যসংশ্লিষ্টতা হেতু পরিস্থিতি উত্তরণে সম্ভাবনার চক্র থেকে বেরুতে পারে না। প্রাচ্য মন প্রতীচ্য নিবিষ্টতায় আচ্ছন্ন তার মুক্তি চেতনায় দ্বান্দ্বিকতা দুর্ভর এক শাস্তি। এ দণ্ড অসুখাক্রান্ত উপনিবেশি মন চিহ্নিত। এ অসুখ শক্তি, অর্থ, রাজনীতি ও টিকে থাকা। বর্তমান বার্মাকে এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে সুচি আর্মির সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি ক্ষুদ্র নিরপরাধ জাতিকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে। হাজার হাজার অসহায় নারীকে ধর্ষণ শেষে নদীতে কেটে ভাসিয়ে দেয়া, যুবতীদের গণধর্ষণের মতো অমানবিক নির্যাতনের পর হত্যা কিংবা পুড়িয়ে ফেলা কিংবা এর চেয়ে নিষ্ঠুর নির্মমতায় হত্যা করা। জাতিসংঘ, বিভিন্ন মানবিকাধিকার সংস্থা ও দেশি-বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ সেই কথা নীরবে বলে। ক্ষমতার অসুখাক্রান্ত সুচির মতো প্রাচ্যদেশের আরও অনেক রাষ্ট্রপ্রধান।
নয়া উপনিবেশ তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে নির্ভর করে সামরিক হস্তক্ষেপ, অভিযান ও নির্যাতনের ওপর। তাদের সৃষ্ট মৌৎসুদ্দি গোষ্ঠি দেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বকে জলাঞ্জলি দেয়। একই সঙ্গে প্রগতি ও মুক্তিকামী মানুষের মানসিক জগতকে নিয়ন্ত্রণ করে উপনিবেশবাদের নিজম্ব সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দিয়ে। প্রাচিন প্রাচ্যকে নিয়ে আধুনিক জ্ঞানভাষ্যের অনুশীলন বা চর্চার প্রচলণ স্বার্থে যেসব সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞানপীঠ ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠ হয়, বস্তুত তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বা উপনিবেশিক রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায়, তাদের প্রয়োজনে। লিখিতভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয় সিরাজের পতনের বহু পরে। বলা চলে, অষ্টাদশ শতাব্দির দ্বিতীয় দশকের দিকে। প্রাচিন ভারতের আইনকানুনও রীতিনীতি বোঝার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ১৭৮৪ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ’এশিয়াটিক সোসাইটি’, এবং লন্ডনে ’এশিয়াটিক সোসাইটি অব গ্রেট ব্রিটেন ’ স্থাপিত হয় ১৮২৩ সালে। উইলিয়ামাম জোনস এই সূত্রটির উপর গুরুত্বারোপ করেন এ বলে, ’আদিতে ইউরোপিয় ভাষাগুলো সংস্কৃত ও ইরানিয় ভাষাগুলোর সঙ্গে সাদৃশপূর্ণ ছিল। এর থেকে জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং য়ুরোপিয় দেশে ভারততত্ত্ব সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে।’ [অমর্ত্য সেন, তর্কপ্রিয় ভারতীয়, আনন্দ পাবলিশার্স, কলিকাতা, পৃ.১৩৮-১৪০] তবে মূলত লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের আগ্রহ ও অনুপ্রেরণাতে উইলিয়াম জোনস ও কিছু আগ্রহী সংস্কৃত চর্চার পাশাপাশ প্রাচ্যচর্চার ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সংস্কৃতজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ। প্রাচ্যতত্ত্বকে জানতে ও ভারতবর্ষকে শাসন করতে প্রচুর বই অনুবাদ ও ছাপা হয়। ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত হয় বাংলা ব্যাকরণ। তখন থেকে হাতে লেখার বদলে মুদ্রণ জগতে প্রবেশ করে প্রাচ্যের বইগুলো। আধুনিক গদ্যের প্রবর্তন ঘটে তখনই। ‘ছাপা অক্ষরে বাংলা গদ্য দুটি ধারায় আত্মপ্রকাশ করছিল, একটি আইন-কানুনের অনুবাদ, যার পেছনের তাগিদ শাসক সম্প্রদায়ের; আর একটি বাইবেলের অনুবাদ, তার তাগিদ খ্রিস্টীয় ধর্মপ্রচারকদের। আধুনিক বাংলা গদ্যের শুরুও হয়েছিল ঐ দুটি প্রয়োজনে। জাতীয় প্রয়োজনে, আত্মপ্রকাশের নতুন পথ আবিষ্কারের প্রেরণায় বাংলাদেশের মুদ্রণশিল্পের পত্তন হয় নি।’ [শিশিরকুমার দাশ, সাহেবদের ঠাকুর, দুই শতকের বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশন, সম্পা. আনন্দ পাবলিশার্স, কলিকাতা, ১৯৮১, পৃ. ৬৮।] লর্ড ক্লাইভ ভারতবর্ষে যে উপনিবেশিক শাসনের বীজ বপন করে উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার সত্যিকার বিস্তৃতি ঘটে লর্ড ওয়ারেট হিস্টিংসের মধ্য দিয়ে উপনিবেশবাদের সঙ্গে প্রাচ্যতত্ত্বকে সফলভাবে জুড়ে দিয়ে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। দ্বৈত শাসনের বিলুপ্তি ঘটে তার দ্বারা। প্রাচ্যতত্ত্বের গতি প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য বুঝতে ১৭৫৭ সালের পূর্ববর্তি ও এর পরবর্তি সময়কে বোঝা খুব জরুরি এ কারণে যে এর দ্বারা ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা ও ১৭৯২ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং প্রাচীন বইগুলো বিশেষকরে ’এ কোড অব জেন্টু লজ’ (১৭৭৬)। এ প্রধানতম কারণ, সমাজ ও সংস্কারের যুক্তিগ্রাহ্যতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে উপনিবেশিক শাসনের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করা। আর ব্রিটিশ ভারতবর্ষে প্রাচ্যতত্ত্ব নির্মাণ প্রকল্প প্রচলন ঘটে তা উপনিবেশিকতার প্রয়োজনেই তৈরি হয়। এখানে একটি বিষষকে প্রাধান্য দেয়া হয় তা হলো, যা কিছু ভালো প্রাচ্যে এর উৎস পশ্চিম। এবং একই সঙ্গে উপনিবেশবাদ এর অপর তৈরি করে, আর অপরকে হেয় বা অবজ্ঞা করার বিষয়টি উপনিবেশ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অংশ, যেখানে অতি সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক মহৎ মানুষও এর বাইরে নন। এর কারণ, প্রতীচ্য বা উপনিবেশ সবসময় প্রাচ্যের বিষযগুলো নিজেদের বিষয়গুলোর অনুরূপতার সাপেক্ষে বিবেচনা করে। প্রাচ্যের নিজস্ব কিছু আছে এটা কখনও উপনিবেশ যেমন অতীতে বিবেচনা করে তেমনি বর্তমানেও একই দৃষ্টিতে উপনিবেশ দেখে। তাই প্রাচ্য উপনিবেশিয় জগতের বাইরের কোনও ক্ষমতাদর কিংবা অসীম শক্তিশালি দেশ হিসেবে আবির্র্ভূত হয় না, সবসময় সামনে গড়া একটি নাট্যমঞ্চ হিসেবে উপনিবেশিয়রা বিবেচনা করে। প্রাচ্য একটি সংস্কৃত ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ দেশ-এরও আছে উপনিবেশিয়দেরও বেশি কিছু, তা তাদের বিবেচনায় কমই আনা হয়। এভাবে প্রাচ্যতত্ত্বের অপরিমেয় পরিধি এবং বিভাজন ও উপবিভাজনের অপরিসীম ক্ষমতা ও শক্তি উপলব্ধি করা যায়। এবং বর্তমানে প্রাচ্যতত্ত্ব সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত একটি ডিসকোর্স। প্রাচ্য সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক উপনিবেশ জ্ঞানের উপস্থাপনকারি বিষয় হিসেবে প্রাচ্যতত্ত্ব ক্রিমুক্তি শক্তি ব্যবহার করে-প্রাচ্যের ওপর, প্রাচ্যতাত্ত্বিকদের ওপর এবং প্রাচ্যতাত্ত্কি প্রতীচ্যের ভোক্তদের ওপর। এভাবে প্রাচ্য তৈরি করে নিচ্ছে একটি নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিত, পরিসর এবং একটি ডিসকোর্সের দৃষ্টিভঙ্গি। এ ডিসকোর্স কেবল বুদ্ধিজীবী কিংবা পেশাজীবী মানুষের একক কোন সম্পত্তি নয়, এবং তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং উপনিবেশিয় যারা প্রাচ্য সম্পর্কে আগ্রহি ও কৌতূহলি এবং প্রাচ্য নিয়ে চিন্তা করেন, তাদের সবাইর যৌথ সম্পত্তি, যা প্রাচ্যতত্ত্ব এখন ডিসকোর্সে পরিণত হয়। যদিও বর্তমান উপনিবেশবাদ বা হালে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক অনুষঙ্গ উপনিবেশবাদ মানবজাতিকে সমরূপ চিন্তা করতে আগ্রহী নয় এ কারণে তারা একটি তত্ত্ববিদ্যাগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ডিসকোর্স তৈরি করে, যাকে আখ্যায়িত করা হয় প্রাচ্যতত্ত্ব। আর এ প্রাচ্য উপনিবেশিয়দের সৃষ্ট কল্পনাপ্রসূত একটি ডিসকোর্স, যেখানে নিঃসন্দেহে প্রাচ্যতাত্ত্বিক চিন্তার কাল্পনিক ভূগোল বা মানচিত্র নির্মিত হয়, যা ধারণাসংশ্লিষ্ট বিভাজনের ভিত্তিতে বানানো ও সমৃদ্ধ হয়ে তাতে ঘুরপাক খেতে থাকে। একই সঙ্গে, প্রাচ্যকে উপনিবেশিয়দের প্রয়োজনে পণ্যায়িত করা, বিকৃত ও কুৎশ্রীভাবে। ফলে, প্রাচ্য হয়ে উঠছে বৈশ্বিকভাবে বিজ্ঞাপ্তিত ও পণ্যায়িত বাজার উপযোগিতার সম্পর্কায়নের মিথষ্ক্রিয়া। এ কারণে, প্রাচ্যকে দেখা হয় অর্থশালী ও বিলাসি পর্যটকের জন্য পুতুল ইতিহাস হিসেবে। বস্তুত, প্রাচ্যতত্ত্ব ডিসকোর্স সৃষ্টি হয় উপনিবেশিয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হেজেমনির বদৌলতে, যা উপনিবেশ প্রাচ্যের ভেতরে অনুপ্রবেশে অনুমোদন করে, নিজের মতো প্রাচ্যকে নির্মাণ করে, প্রাচ্যতত্ত্বের ডিসকোর্সের মধ্যে প্রাচ্যকে উপস্থাপন করে এবং উপনিবেশ স্বার্থকে চরিতার্থ করতে প্রাচ্যকে ব্যবহার করে। আশ্চর্যজনকভাবে, এখানে প্রাচ্য নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। আর উপনিবেশ এখনও নিজের হেজেমনি ক্ষমতা ধরে আছে হেতু ক্ষমতার প্যারাডাইম বদলে এখন স্বপ্রতিভূ, আধিপত্যময, সর্বগ্রাসী। নয়া প্রাচ্যতত্ত্ব হলো সেই ক্ষমতা বদলের একটি প্রকাশ, যার চেতনাকাঠামোর পরিভাষা, রীতিবিন্যাস ও পদ্ধতি প্রাচ্য ও প্রতীচ্য বা উপনিবেশ কর্তৃক নির্ণীত, যেখানে বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে পছন্দের বুদ্ধিজীবী বা পণ্ডিত ও সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকে। নয়া প্রাচ্যতত্ত্ব তাই স্বপরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। যদিও প্রাচ্য নিয়ে গৎবাঁধা ছাঁচে প্রাচ্যকে ব্যাখ্যা করা। তবে এটা ভাবা ঠিক হবে না যে, প্রাচ্যতত্ত্বের রীতিবিন্যাস ও সংগঠন সমবায় রূপকের সংগঠন এবং সত্য প্রকাশ হলে এর প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে পড়বে, যেখানে কেবল যা কিছু আছে সবই মিথ্যা, খারাপ, কল্পনাপ্রসূত ভূগোল ও চারণভূমি, জাদু, মন্ত্র, উদ্ভট, অপরিবর্তনশীল ও রক্ষণশীলতা সর্বময় মন্দত্বের আধিপত্য। এ কারণে বলা হয়, উপনিবেশ প্রকল্প ও কর্মপন্থা এতই সূক্ষ্ম ও বিমূর্ত প্রাচ্যতত্ত্ব বিকাশে ও বিস্তৃতিতে কোন বিঘ্ন ঘটায় না, কেবল শায়লকের ভূমিকা পালন করে। এবং প্রাচ্যকে একটি শিশুসুলভ উপস্থাপনা করে। ১৯৭৮ সালে এডওর্য়াড সাঈদ তাঁর অরিএনটালিজম বা প্রাচ্যতত্ত্ব বইয়ে এ দেখান প্রাচ্যতত্ত্ব এমন একটি ডিসকোর্স যেখানে ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্য’র মধ্যে তত্ত্ববিদ্যাগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করে, যা রাজনৈতিকভাবে নির্মিত যুগ্মরূপ, যার বিস্তৃতির মূলে থাকে অভিসন্ধি ও ষড়যন্ত্র এবং প্রাচ্যকে অপর হিসেবে দেখার কাল্পনিক ও ঐতিহাসিকভাবে স্থাপিত চক্রান্ত। সঙ্গে যুক্ত হয়, ইসলাম, জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদ ও রেসিয় বিভাজন। এ কারণে, উপনিবেশবাদের দীর্ঘপথের কর্তৃত্ব ও রীতিসংগঠন প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করা দরকার। তাই সাঈদের ভাষায় বলা যায়, প্রাচ্যতত্ত্ব কিংবা ঔপনিবেশিক উপস্থাপনের সমালোচনার মধ্যে ঘুরপাক না খেয়ে, বরং প্রত্যাবর্তিত লড়াইয়ের মনোভঙ্গি ও সংগঠন রীতিবিন্যাস এবং এর প্রতিরোধের প্রসঙ্গকে প্রাধান্যই বিবেচ্য। তাই প্রাচ্যতত্ত্ব বর্তমান প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক জ্ঞানভাষ্যে পরিণত হয়েছে এবং উপনিবেশ কর্তৃক প্রাচ্য যে রূপক কূটাভাসাবৃত ব্যাখ্যা করে বিপদসঙ্কুল জটিল পরিস্থিতিতে বিপদজনক উত্তরাধিকার অন্বেষণ করে। কারণ, ভেতর ও বাইরের কর্তৃত্বের মাধ্যমে যে উপনিবেশিক সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, শিল্প, রাজনৈতিক নির্মিতি ও সামাজিক রীতির উচ্চমার্গ আরোপ কর হয় বৈশ্বিক জ্ঞানভাষ্যের কারণে একে পৃথিবির অন্য জ্ঞানের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হতে হয়। আর এভাবে প্রাচ্যতত্ত্ব তৈরি হয় এবং এর মধ্য দিয়ে উপনিবেশিকের সংস্পর্শে উপনিবেশিত অপরকে উচকিত হতে দেখা যায়। প্রাচ্য একটি ডিসকোর্সে পরিণত হয় যা চিহ্ন ও চর্চার জটিল চেতনাকাঠামেকে প্রকাশ করে, যা উপনিবেশিক সম্পর্কেও মধ্যে সামাজিক অস্তিত্ব ও সামাজিক পুনরুৎপাদনকে বর্ণনা করে, এবং উপনিবেশিত চেতনাবোধের গভীরে যে অভিঘাত ও সংঘাত সৃষ্টি হয়, তাকে প্রকাশ করে।
এবং ফ্রান্ৎস ফ্যাননের ভাষা বলা যায় যেমনটা তিনি তাঁর বই ব্ল্যাক স্কিন ওয়াইট মাস্কস (Black skin White masks, 1952)-এ যে বৈপ্লিবিক উত্তরাধিকার সমকালিনতায় বোঝার সম্ভাবনার প্রতীতি জাগিয়ে রাখেন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে বর্তমান পার্থক্যগুলো মূর্ত করেন, প্রতীচ্যের আধিপত্যের নতুন অবয়ব দিতে নতুন মতাদর্শিক ভাষা নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে, প্রাচ্যতত্ত্বকে উপনিবেশবাদের কার্যসাধনের শাস্ত্র গণ্য করে প্রাচ্যসহ তৃতীয়বিশ্বের উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলোকে চিত্রিত করা। প্রাচ্যমন, সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অনুভূতি ও রাজনীতি বোঝা ও নির্মাণ করা হয় নির্মিত জ্ঞানের সঙ্গে মিল রেখে প্রাচ্যের ধর্ম, ছাঁচ ও বাস্তব অবস্থানকে চিহ্নিত করা হয়। উত্তরোপনিবেশ সময়েও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংগঠন সমবায়ে একটি প্যারাডাইমে বেঁধে ফেলা হয়। প্রাচ্যতত্ত্ব একটি জটিল সংগঠন প্রক্রিয়ায় এর যে মিথষ্ক্রিয়া ঘটানো হয়, এর থেকে বেরিয়ে আসাটা কঠিন; তবে, দুর্বোধ্য নয়। উপনিবেশ কর্তৃক প্রাচ্য বিষয়ে উদ্দেশ্য নিমিত্তে অনুশীলনের দ্বারা গড়ে-ওঠা জ্ঞানভাণ্ডারকে প্রাচ্যতত্ত্ব গণ্য করা হয়, যেখানে প্রাচ্যতত্ত্ব, উপনিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষায় উপনিবেশ তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তন করে প্রাচ্যকে উচ্চ, উচ্চ-মধ্য এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিবীর্য ও গিনেপিকে পরিণত করে। তাই আজ যে প্রাচ্যতত্ত্ব চর্চা হয়, তা উপনিবেশিকতার চিন্তার ফসল এবং তাদের দয়া ও দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় প্রাচ্যকে। এডওয়াট সইদ অন্যোন্যজীবীভাবে অস্তিমান উপনিবেশ ও প্রাচ্যতত্ত্ব’র মধ্যে সীমাবদ্ধতার সূত্রগুলো দেখিয়ে দেন এবং প্রাচ্যতত্ত্বের লুকানো মুখাবয়বকে উন্মোচন করেন। কিন্তু যেহেতু প্রতিনিয়ত সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠছে প্রাচ্য, তাই প্রাচ্যকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রাচ্যের অধিকার ও দায়বদ্ধতা আছে। তাই প্রাচ্যের অপর ক্ষুধার্ত প্রাচ্যবাসি, ভূমিহীন নিরন্ন কৃষক ও শোষিত শ্রমিক দ্বারা প্রাচ্যের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস লিখিত হবে নিম্নবর্গিয় কণ্ঠকে উচকিত করে, মিয়্রমাণ ও নিচু। এ সূত্রে উত্তরোপনিবেশ মূল্যবোধ মূলত বহুমূখি প্রতিসন্দর্ভ তৈরির প্রতি আগ্রহের কারণে উপনিবেশিত অপরের উপস্থিতিকে প্রকট করে উপনিবেশিক বা প্রতীচ্যের সন্দর্ভকে অস্বীকার বা বিনির্মাণের মধ্যে প্রাচ্যের অপরের প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের রাজনীতি প্রস্ফুটিত হয়। নিষ্পেষিত বর্গ অপর প্রাচ্য এভাবে নিজের অনুপস্থিতিকে প্রকাশ করে, এবং যে পাঠকৃতি উপনিবেশিক রীতিবিন্যাস ও সংগঠনের মাধ্যমে এতদিন অন্ধকারে ছাপা ছিল (অবজ্ঞায়, নিষ্পেষণে, রাজনীতির কূটভাষে, ক্ষমতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনির্মাণে) সম্ভাবনার পরিসর থেকে এর প্রকৃত আদল বা সুরত মূর্ত হচ্ছে। তবে সর্বপ্রথম জরুরি, প্রাচ্যতত্ত্বকে মুখোশ থেকে মুখ এবং সত্যভ্রম থেকে সত্যের সংবিদের গোটা আদল প্রাচ্য মনের চালিকাশক্তি গণ্য হয়। এ নিয়ে বিনির্মাণই প্রাচ্যের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিবেদন, যেখানে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও অস্তিত্বসম্পর্কিত প্রশ্ন সংকুচিত থাকে, এবং সত্তা ও অপরতার দ্বিবাচনিক সংঘর্ষের বীজ উপ্ত হয় স্ববিরোধিতা ও আত্মদ্বন্দ্বে। সত্যের মতো প্রাচ্য ঢাকা পড়ে সত্যভ্রমের রীতিবিন্যাসের নিচে। প্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিকে তাকালে এর প্রকৃত স্বরূপটি স্পষ্ট হয়। কিন্তু নানারকমের টিভি চ্যানেল, মিডিয়া ও পাঠবিশ্ব প্রাচ্যের ভেতরে ও বাইরে যেভাবে খুলে রাখা আছে, তাতে প্রতিবাদ কিংবা জেগে-ওঠার স্ফূলিঙ্গকে সূচনাপূর্বে বিনষ্ট করতে যথেষ্ট। এসব প্রতীচ্যের নয়া উপনিবেশবাদ। সমস্তই পণ্যসবর্স্ব, কর্পোরাল ডেমক্রেসি ইকোনমির উপযোগিতায় নির্ধারিত হয় সবকিছুর মূল্য। এমনকি প্রাচ্যের মানুষ ও বুদ্ধিজীবী। তাই প্রতীচ্য দৃষ্টি নিবন্ধ করছে এতদিন অবহেলিত ও নিষ্প্রেষিত অপরতার দিকে। তাই নিম্নবর্গিয় চেতনার উন্মেষ, ক্রমবিকাশ ও পর্বান্তরকে বিধৃত করা একটি অপরিহার্য কৃত্য হিসেবে গণ্য করা হয়। এবং ইতিহাসের বিনির্মাণ জরুরি হয়ে পড়ছে। অন্যথায়, ঐতিহ্যের কল্পপ্রতিমা প্রকৃত বাস্তবতা ও সত্য সবসময় আড়ালেই থেকে যাবে। প্রাচ্য তৈরি হচ্ছে, কেউ কি তার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে? প্রতীচ্য কি প্রস্তুত?