
[দ্বিতীয় পর্ব]
কয়েদিদের আবাসের ধ্বংসস্তূপের নানান চিহ্ন আমরা দেখতে পাচ্ছি। লণ্ঠনের মৃদু আলো বহুদিনের সংস্কারহীন প্লাস্টারবিহীন গির্জার দেয়ালে পড়ে বিচিত্র ছবির সৃষ্টি করছে। মনে হচ্ছে কিছু অশরীরী আত্মা ওখানে দেয়ালের মধ্যে নড়াচড়া করছে।
ইতিহাস বলে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে এখানে আসা নতুন আসামিদের ধর্মীয় কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ওদের দিয়ে এই গির্জা তৈরি করা হয়। গির্জার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে গাইড মুখ বলতে শুরু করলো। এই গির্জার ছাদ থেকে একজন আসামি নাকি আরেকজন আসামিকে মাথায় হাতুরির আঘাত দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছিলো। পরে সেই আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিলো। আরো বললো, এই গির্জার সেই সময়ের পাদ্রিকে নাকি এখানে সবাই এখনো রাতে ঘুরে বেড়াতে দেখে। তাই তার কবর গাত্রে সম্প্রতি একটি শ্বেত পাথর খোদিত করা হয়েছে। তাতে লেখা হয়েছে-
‘আমরা তোমার আত্মার মৃত্যু চাই’।
গির্জার পাশে আসামিদের জন্য জেলখানা তত্ত্বাবধায়ক অফিসারদের বাড়ি ঘরের চিহ্ন দেখা গেলো। যেসব আসামিকে ফাঁসি দেয়া হতো তাদের পোস্ট মর্টেমের টেবিল দেখাবার জন্য গাইড এইবার আমাদের অন্ধকারের মধ্যে নিয়ে গেলো এক ডাক্তারের ভাঙা বাড়ির বেসমেন্টে। ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে অতি সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে আমরা বেসমেন্টে গেলাম। গাইড একটা টেবিলকে সামনে রেখে লণ্ঠনের আলো আঁধারিতে আমাদের দাঁড় করিয়ে এই জায়গার অনেক লোমহর্ষক কাহিনী কখনো উচ্চস্বরে কখনো ফিস ফিস করে নানা ভঙ্গিতে বয়ান করে বুঝালো। তার বলার ঢঙে ভৌতিক পরিবেশে আমাদের চারিদিকে যেনো সে ঘটনাগুলো সিনেমার দৃশ্যের মতো দেখা দিলো। গাইড নাটকীয় ভঙ্গিতে এমন করে কথাগুলো বললো যে, আমাদের সঙ্গী অস্ট্রেলিয়ান তরুণ-তরুণীরা ভয়ার্ত চিৎকারে আবহাওয়াটা আরো ভারি করে তুললো। তারপরে নিয়ে গেলো কয়েদিদের জেলখানায়। জেলখানার মধ্যে অসংখ্য কক্ষ। তবে আকারের দিক দিয়ে ছোট বড় অনেক রকমের। ভেতরে একটা ডরমিটরির মতো জায়গায় আমাদেরকে মেঝেতে বসালো। গাইড দোতলা ওঠার সিঁড়িতে বসে কয়েদি হয়ে যারা আসতো তাদের অপরাধ কি ছিলো কোন স্তরের লোক ছিলো বর্ণনা করলো। আমরা চারিদিক তাকিয়ে দেখলাম ছোট ছোট আঁধার কুঠুরি অনেকগুলো। কোনোটাতেই আলো বাতাস প্রবেশের পথ নাই। এমনকি শোয়ার মতো জায়গাও নাই। গাইড বললো, গুরুতর অপরাধের সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের এইসব ঘরে রাখা হতো। আর আপনারা যেখানে বসেছেন এই গুলোতে ঢালাও ভাবে সাধারণ কয়েদিদের রাখা হতো। জেলখানা থেকে বেরোনের পথে একটি হাসপাতালের ধ্বংসাবশেষ দেখলাম।
একশ পঞ্চাশ বছর আগের জায়গাগুলো খুব সযতনে অথচ সংস্কারবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। গোস্ট ট্যুরে নামে এই ধ্বংসাবশেষ দেখিয়ে দেদার পয়সা উপার্জন করছে। পুলিশ ছাউনি, সামরিক অফিসারদের বসতি সব মিলে ছোটখাটো একটা শহর গড়ে উঠেছিলো এখানে কয়েদিদের কেন্দ্র করে।
গহিন রাত, তারা ভরা আকাশ, লণ্ঠনের মৃদু আলো বিশাল বিশাল গাছের শাখা-প্রশাখার শির শিরানির মধ্য দিয়ে ইট বিছানো অথচ মসৃণ পথ মাড়িয়ে ত্রিশ জনের আমাদের এই কাফেলা নীরবে গা ছমছম করা ভৌতিক পরিবেশে ভীতিময়, বুক কাঁপানো শিহরণ বুকে ধরে প্রায় একঘণ্টা অদৃশ্য এক শক্তির আকর্ষণে বিচরণ করছি এই মৃত পুরীতে। নানা দেশ থেকে আগত ত্রিশজন অপরিচিত যাত্রী একদম বাকরুদ্র অবস্থায় ফিরে এলাম অভাবনীয় এক জগৎ থেকে তথ্য কেন্দ্রের উজ্জ্বল আলোতে।
তথ্য কেন্দ্রে ফিরে এসে গাইড বসলো দুঃসাহসিক এই অভিযানের সার্টিফিকেট লিখতে। অল্প বয়সী যারা তারা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ালো।
আমার দুই নাতনী সারা ও জেবা যারা আমার সাথে কয়েদিদের মৃত আত্মার অস্তিত্ব অনুসন্ধানের সঙ্গী ছিলো। তাদেরও সার্টিফিকেট দেয়া হলো। ওদের সার্টিফিকেটে লেখা হলো-
‘গোস্ট ট্যুরে এদের সাহস ও জানার আগ্রহ প্রশংসাযোগ্য’।
কয়েদিদের যন্ত্রণা দগ্ধ স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক জায়গাগুলো দেখার জন্য আধিভৌতিক জগতের রহস্য উন্মোচনের নেশায় জোট বদ্ধ হয়ে যারা এতক্ষণ একসঙ্গে চলাফেরা করেছিলাম তথ্য কেন্দ্রের বিজলি বাতির আলোতে এসে সবাই সবার দিকে একবার তাকালাম। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছে সবাই এখানে একটি অদৃশ্য জগৎ দেখার নেশায়। কিছুক্ষণের মধ্যে দলছুট হয়ে কে কোথায় যাবো কেউ জানি না। ভাবতেই মনটা ব্যথাতুর হয়ে উঠলো। এতক্ষণ সবাই একসাথে থেকেছি একই চিন্তায় ভাবিত হয়েছি। সবার চিন্তা ভাবনা ছিলো কয়েদিদের আত্মা উপলব্ধির চেষ্টা। এখানে ধর্ম বর্ণের কোনো ভেদাভেদ ছিলো না। আমরা মুসলমানরা মনে করি সব মানুষ ভাই ভাই। আমাদের মধ্যে সালাম দেয়ার একটা রেওয়াজ আছে। এই সালাম দিয়েই আমরা সহজেই সকলের সাথে মিশে যেতে পারি। পরিচয় করে নিতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে মনেরও মিল হয়ে যায়। এরাতো কারো সঙ্গে কথা বলে না। যার জন্য সব সময় থাকে স্বজন হারা। পথে প্রান্তরে একা একা ঘুরে বেড়ায়। এদের জীবনধারা সম্পর্কে যখন এসব ভাবছি দেখি তথ্য কেন্দ্র এরই মধ্যে একদম ফাঁকা শুধুমাত্র কোল ড্রিংকের দোকানটি ছাড়া। গোস্ট ট্যুরের সাহসিকতার সার্টিফিকেট দিয়ে গাইডও বিদায়।
গা ছমছম করা অভিজ্ঞতা ও পুলক মিশ্রিত রোমান্স বুকে নিয়ে আমরাও গভীর রাতে মৌন গম্ভীর এক অদৃশ্য শক্তির স্পর্শ গায়ে মেখে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এলাম।
ছবির মতো ঝকমকে সুন্দর অ্যাপার্টমেন্ট। দেখে চোখ প্রশান্তিতে ভরে যায়। কিন্তু পেটে ক্ষুধা। হেঁটেছি প্রচুর, ক্লান্তিতে শরীর নেতিয়ে পড়তে চাইছে। গোস্ট ট্যুরে বেরুবার আগে অল্পস্বল্প খেলেও আবার খেতে হলো। খেতে বসে স্বাদ পেলাম ভিন্নতর। খাবারের সুখময় উপলব্ধি তন্দ্রালু আড়ষ্টতা শরীরকে টানছে বিছানার দিকে। কিন্তু না, আমি আল্লাহর কাছে অকৃতজ্ঞ হতে পারবো না। সারাদিন আল্লাহকে একবারও ডাকিনি। যদিও আল্লাহ ছিলেন মনের মধ্যে সারাক্ষণ। তার সৃষ্টির মহা ঐশ্বর্য চোখ ভরে, মন ভরে দেখতে দেখতে এসেছি। আল্লাহ মেহেরবান, দূর প্রবাসে গেলে কষ্ট লাঘবের জন্য ফরজ নামাজকে ছোট করে পড়ার নিয়ম দিয়েছেন। অর্থাৎ কছর পড়ার কথা বলেছেন। সারাদিন তাও পড়িনি। কছর কাযা পড়া যায় কিনা তাও জানি না। আল্লাহ আমাকে মাফ করবেন। এই ভরসা রেখে সব ওয়াক্তের ফরয নামাজের কছর পড়ে নিলাম।
জেবাসহ রুহি, লিজা পাশের রুমে ঘুমাতে গেছে। আমার বিছানায় আমি আর সারাহ। সারাহ ঘুমাচ্ছে নাক ডেকে। আমার চোখে ঘুম নাই। মন আমার ঘুরে বেড়াচ্ছে দেড়শত বছর আগের তৈরি কয়েদিদের কক্ষগুলোর জন্ম ইতিহাসের মধ্যে।
তাসমানিয়ার মেরিন কলেজের শিখ প্রফেসর ড. দেবেনদ্বার এর স্ত্রী কিরণের কথা বারবার মনে হচ্ছে। কারণ তার উৎসাহে আমার জীবনের সার্বক্ষণিক অসুস্থতা, ক্লান্তি সব ঝেড়ে ফেলে আমি পোর্ট আর্থার দেখার দুঃসাহস করেছিলাম। রুহি অনেক সংশয় নিয়েও আমাকে আল্লাহর এই অপার মহিমা দেখার জন্য সুযোগ করে দিলো। কিরণ বলেছিলো, আন্টি তাসমানিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষিণ ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। অস্ট্রেলিয়ার অংশ হলেও ইউরোপিয়ান পর্যটক ছাড়া এই অংশে পৃথিবীর অন্যান্য পর্যটকরা খুব কমই আসেন। পোর্ট আর্থার যাওয়ারতো কথাই ওঠে না। আপনি একজন বাঙালি মা, তাসমানিয়ার মতো ট্রেজার আইল্যান্ড দেখার সুযোগ পেয়েছেন। এইখানে এসে পোর্ট আর্থারের মতো বিরল দ্রষ্টব্য স্থান দেখে না গেলে সারাজীবন আপনি আফসোস করবেন। অস্ট্রেলিয়া পত্তনের শুরুতে ইউরোপিয়ানরা যে সব আসামিকে কাজে লাগানোর জন্য এনেছিলো তাদের গুরুতর অপরাধের শাস্তির জন্য পোর্ট আর্থারে প্রথম পেনাল সেটেলম্যান তৈরি করে। কয়েদিদের শ্রম, কর্মনৈপুণ্য, শিল্পদক্ষতা এখানকার প্রকৃতি প্রদত্ত কাঠ সম্পদ অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছে। এদেশের মূল সমৃদ্ধির মূল জায়গাটি না দেখে যাবেন না। দেখবেন, তারা মরে গেলেও আজও তাদের আত্মা পোর্ট আর্থারে সর্বত্র জীবিত মানুষের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি হোটেলে আপনি যেখানে থাকবেন সেখানেও আপনার বিছানার কাছে তাদের নিঃশ্বাস টের পাবেন।
কিরণের কথা শুনে আমি দু’একদিন খুব ভাবলাম, তখন তাসমানিয়ার একটি বই নাতিনকে বলে স্কুল লাইব্রেরি থেকে আনিয়ে পড়েছিলাম। এখন যেখানে শুইয়ে আছি, এই ঘরটি পোর্ট আর্থারে আসা কয়েদিদের দিয়ে তৈরি। অফিসারদের বিলাস-বাসনাকে চরিতার্থ করার প্রয়াসে ফকস অ্যান্ড হাউন্ড রাখার তাগিদে তৈরি করা হয়েছিলো। সাধারণ কথায় এই ঘরটি হলো বাংলাদেশি ভাষায় খোঁয়াড় ঘর।
সময়ের কাছে বর্তমান বলে কিছু নাই। ইংরেজ জাতির কাছে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নাই। সময়ের ধাক্কায় বর্তমান যেমন বিলীন হয়ে যায় অতীতের শরীরে তেমনি অতীতও বিলীন হয়ে যাচ্ছে বর্তমানের গর্ভে। তাই ফকস্ হাউন্ড হারিয়ে গেছে কালের ¯্রােতে। বুদ্ধিমান ইংরেজ জাতি কোনো জিনিসই সহজে নষ্ট হতে দেয় না। এরা জানে কেমন করে টাকা করতে হয়। দেশের ভিতকে শক্ত করতে হয়। তাই দেখি ফকস হাউন্ড এর খোঁয়াড় ঘর এখন হয়ে উঠেছে পর্যটকদের জন্য সুরম্য, মনোহর ভাড়া দেয়ার অ্যাপার্টমেন্ট।