কাজী নজরুল ইসলামের শেষ দিনগুলি অত্যন্ত করুণ এবং বেদনাদায়ক। ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই তারিখে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে কবি ছোটদের আসরে নিজের জীবনের গল্প বলা শুরু করেন। এই বেতার অনুষ্ঠানটির পরিচালক ছিলেন কবি বন্ধু নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। গল্প বলতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে এলো, কথা জড়িয়ে গেল। কবির বন্ধু তখনই বেতারে ঘোষণা দিলেন যে কবি অসুস্থ। নজরুল ইসলামের এই অসুস্থতা তখন সবার মাঝে প্রচারিত হলেও মুজফ্ফর আহমদের মতে এই অসুস্থতা ১৯৩৫ সালে শুরু হয়েছিল।
অসুস্থতার প্রথম দিকে কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের কাছে লেখা চিঠিপত্রেও তাঁর স্মৃতিবিভ্রম ও অসংলগ্নতার পরিচয় পাওয়া যায়। এসব চিঠিপত্রের কোনো কোনোটিতে নিজেই সংসারের অর্থাভাব এবং টাকার অভাবে নিজের ভালো চিকিৎসা না করাতে পারার কথা উল্লেখ করেছেন। কবি অসুস্থ হওয়ার পরপরই হাওয়া বদল করতে সপরিবারে বিহারের মধুপুরে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের অনুরোধে অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কবির এই মধুপুর যাত্রার খরচ বাবদ ব্যক্তিগতভাবে পাঁচশত টাকা জোগাড় করে দিয়েছিলেন।
অসুস্থ হবার প্রথম পর্যায়ে কবি পুরোপুরি বাকশক্তি হারাননি। তিনি কথা বলার চেষ্টা করতেন এবং প্রমীলাসহ পরিবারের অন্যান্য লোকজন তাঁর কথা বুঝতেও পারতেন। প্রথম পর্যায়ে বাড়িতেই কবির হোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসক ছিলেন ডা. ডি এল সরকার। প্রথমে কবির অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেও পরে অসুস্থতা বাড়তে থাকে। পরে কবিরাজ বিমলানন্দ বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় কবিকে মনোচিকিৎসক ডা. গিরীন্দ্র শেখর বসুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডা. বসুর মতে, কবির রোগটা বেশ পুরানো এবং আগেই এর লক্ষণগুলো দেখা দেবার কথা ছিল, এখন তা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়েছে। ডা. বসুর অধীনে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পারায় কবিকে কলকাতার বাসায় আনা হয়। বাসায় হোমিও ডাক্তার এস. এন. সেন মাঝে মাঝে কবিকে ওষুধ দিতেন।
১৯৪৩ সালে কবির সাহায্যার্থে কলকাতায় একটি কমিটি গঠিত হয় এবং কবি পরিবারকে মাসিক দেড়শ টাকা করে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু চার মাস পর এই অর্থ-সাহায্য দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। কাজী নজরুল ইসলামের চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত ডাক্তার বিধান রায় একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করেন। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডা. রায় মত দেন যে, কবির রোগ আরোগ্যের অতীত।
বাঙলার প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারের পক্ষ থেকে কবির জন্য মাসিক দুইশত টাকা ভাতা বরাদ্দ করেন। কিন্তু এই দুইশত টাকায় নজরুল-পরিবারের ব্যয় নির্বাহ হতো না। প্রচণ্ড দারিদ্র আর কষ্টের মধ্যে তখন কবি-পরিবারের দিনগুলি অতিবাহিত হয়। দেশভাগের পর পূর্ব-পাকিস্তান সরকার মাসিক দেড়’শ টাকা এবং পশ্চিম বঙ্গ সরকার মাসিক একশ টাকা ভাতা বরাদ্দ করে। ১৯৫২ সালে কবির উন্নত চিকিৎসার জন্য লেখক-সাহিত্যিকদের পক্ষ থেকে ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’ – গঠিত হয়। এই সমিতির সংগৃহীত টাকায় চিকিৎসার জন্য নজরুল ইসলামকে বিহারের রাঁচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডা. ডেভিসের তত্ত্বাবধানে কিছুদিন চিকিৎসা করা হয়। ডেভিসের মতে রোগটা মস্তিষ্কের এবং অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি রোগীকে বিদেশ পাঠানোর পরামর্শ দেন।
এরপর কবিকে ‘নিরাময় সমিতি’র উদ্যোগে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। লন্ডনে ডাক্তারগণ কবির রোগ নির্ণয়ে একমত হতে পারেননি। তাঁরা এক্স রে ও অন্যান্য রিপোর্ট সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার কয়েকজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠান। রিপোর্টগুলো দেখে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থেকে বিখ্যাত নিউরো-সার্জন ড. হনস হাফ নিজে কবিকে একবার দেখতে চান। এজন্য কবিকে ভিয়েনা নিয়ে যাওয়া হয়। ড. হাফ কবির রোগকে ‘পিক্স ডিজিজ’ বলে শনাক্ত করেন এবং নিরাময়ের সম্ভাবনা নেই বলে মত দেন। ড. হাফের রিপোর্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হলে তাঁরাও একই মত দেন। ফলে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কলকাতায় ১৯৫৩ সালের ১৪ ই ডিসেম্বরে ফিরিয়ে আনা হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের ২৪ শে মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত আগ্রহে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকায় আনা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ শে আগস্ট (১২ ই ভাদ্র ১৩৮৩) কবি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
মোরশেদ শফিউল হাসান, নজরুল জীবনকথা