এমিলি এলিজাবেথ ডিকিনসন (১৮৩০-১৮৮৬) বিখ্যাত মার্কিন কবি। উনিশ শতকের একজন উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবে তিনি পরিচিত। তিনি ম্যাসাচুয়েটসের আমহার্সট পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তার জীবনের অধিকাংশ সময় নিঃসঙ্গতা ও ঘরবন্দিত্বে কাটে।
উনিশ শতকের আমেরিকার কবিদের মধ্যে দু’জনকে প্রকৃতই কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ওয়াল্ট হুইটম্যান, অন্যজন এমিলি ডিকিনসন। এমিলি ডিকিনসন তাঁর কবিতায় ভাঙা ছন্দ, ড্যাশ চিহ্ন, যত্রতত্র বড় হাতের অক্ষর ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব প্রকাশরীতির জন্য আজ বিশ্বব্যাপী খ্যাত। আমেরিকার স্কুলে অহরহ এমিলির কবিতা পড়ানো হয়। স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে সে দেশের সব ধরনের মানুষ এমিলি ডিকিনসনের নাম ও লেখার সঙ্গে পরিচিত।
ডিকিনসন ১০ ডিসেম্বর, ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ম্যাসাচুসেটসের অ্যামহার্স্ট একটি বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এডওয়ার্ড ডিকিনসন ছিলেন অ্যামহার্স্ট শহরের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী। এমিলি ছিলেন খুবই শান্ত স্বভাবের মেয়ে। সঙ্গীতের প্রতি তার ছিল আসক্তি। সঙ্গীত শুনতে ভালোবাসতেন খুব। প্লিজ্যান্ট স্ট্রিটের দোতলা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। বাবার ইচ্ছে ছিলো এমিলি পড়াশোনা করে ভালো কোনো ব্যবসায় মনোনিবেশ করবে। অল্প বয়সেই এমিলি বিভিন্ন বিষয় শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। যেমন ক্লাসিক সাহিত্য, ভারগিল ও লাতিন, গণিত, ইতিহাস ও উদ্ভিদবিজ্ঞান। ১৮৪০ সালে এমিলি ও তার বোন লাভিনিয়াকে ভর্তি করা হয় অ্যামহার্স্ট অ্যাকাডেমিতে-যেটি তাদের ভর্তির দু’বছর আগেও একটি বয়েজ স্কুল ছিল। তার বাবা অ্যামহার্স্ট কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারা ছিলেন বিজ্ঞানী ও থিওলজিয়ান এডওয়ার্ড হিচককের তত্ত্বাবধানে। নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এরই মধ্যে এমিলি একজন প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন । ১৭ বছর বয়সে এমিলি পড়তে যান মাসাচুসেটসের সাউথ হেডলিতে অবস্থিত মাউন্ট হলিওক ফিমেইল সেমিটারিতে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে তিনি ফিরে আসেন শারীরিক অসুস্থতা ও ঘরকাতরতার কারণে। কেউ কেউ বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ মেরি লিওনের সঙ্গে মতভেদের কারণে এমিলি লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। পৈতৃক নিবাসে ফিরে এমিলি তাঁর প্রথম কবিতা লেখেন। এমিলি কলেজ ক্যাম্পাসের কাছেই থাকতেন এবং তাদের বাড়িতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী ও নেতার আসা যাওয়া ছিল। তবু তিনি সব দিক থেকে গুটিয়ে নেন নিজেকে। শুরু করেন আরও বেশি সময় একা থাকতে। নির্বাচিত কিছু বন্ধু ও আত্মীয়ের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতেই বেশি পছন্দ করতেন তিনি।
অসুস্থতা এবং বিষণ্নতাজনিত কারণে এমিলি নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারেননি। ১৮৪৮ সালে তিনি পুরোপুরিভাবে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। মূলত বিষণ্নতাই এর জন্য দায়ী ছিল।
একাকী জীবন বেছে নেয়ার পর এমিলি তার নোটবুক কবিতা আর চিঠি লিখে ভরিয়ে তুলতে লাগলেন। পারিবারিক বন্ধু বেঞ্জামিন নিউটনের মাধ্যমে কিশোর বয়সে প্রথমবারের মত উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থেও সাথে পরিচিত হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। শব্দের প্রতি তার ভালোবাসা আর কবির অনুপ্রেরণায় তিনি ধারাবাহিকভাবে কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৮৫৫ সালে বড়ভাই তার বান্ধবীকে বিয়ে করে ঘর ছাড়ে। ফলে মায়ের দায়িত্ব এসে পড়ে এমিলি ও তার ছোটবোন লাভিনিয়ার উপর। কারণ, তখন পর্যন্ত তিনি ও লাভিনিয়া বিয়ে করেননি, একসাথেই থাকতেন সবাই। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।
১৮৬০-এর শুরুর দিকে এমিলি খুব কম সময়ের জন্যই বাসা থেকে বের হতেন। চোখের জন্য ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়েছিল সে সময়। ১৮৬৪ ও ৬৫ সালে চোখের ডাক্তার দেখানোর জন্য এমিলি তার মামাতো ভাইবোনদের বস্টনের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন। তখন তিনি লিখতে ও পড়তে পারছিলেন না। সম্ভবত এটাই তার শেষবারের মতো অ্যামহার্স্ট থেকে বাইরে যাওয়া।
১৮৭০ সালের শুরুর দিকে এমিলির মা বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ওরা দু’বোন তখন মাকে দেখাশোনা করতেন। ১৮৭৪ সালে হঠাৎ এমিলির বাবা মারা যান। এরপর এমিলি সম্পূর্ণভাবে লোকচক্ষুর সামনে যাওয়া বন্ধ করে দেন। তিনি যোগাযোগগুলো তখনও চিঠিতে রাখতেন। সে সময় তিনি তার ডেস্কে বসে লিখতেন এবং নির্জনতা উপভোগ করতেন। ভাইয়ের বিয়ের পর বাবা তাকে পাশেই একটা বাড়ি কিনে দেন। সেখানেই থাকত ভাই, ওর বউ আর বাচ্চারা। এমিলির জীবনে তখন ক্রমশ অন্ধকার নেমে আসছে। এ অন্ধকার সময়েও তিনি ভাইয়ের বাচ্চাদের সঙ্গে বাইরে বসেছেন। ওরা যখন খেলত তখন তিনি বাইরে ওদের জন্য রান্না করতেন। তবে পরের দিকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে সব সময় সেটি হয়ে উঠত না। তখন তিনি নিচের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেন। কখনও কখনও ঝুড়ি ভর্তি করে উপরে থেকে রশি বেঁধে ফল বা অন্য খাবার নামিয়ে দিতেন ভাইয়ের বাচ্চাদের জন্য। আবার বাচ্চারা সেই ঝুড়ি ভরে দিতো অন্য খাবারে। এমিলি টেনে তুলতেন উপরে।
একাকিত্বের জন্যই বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা আর এগোরাফোবিয়ায় ভুগছিলেন তিনি। এর মধ্যেই তিনি বেশকিছু বিখ্যাত কবিতা রচনা করে ফেললেন। সাকুল্যে ১৮০০ কবিতা লিখেছিলেন তিনি যার দুই-তৃতীয়াংশই লেখা হয়েছিল ২০-৩০ দশকের মধ্যে। এগুলোর খুব কম সংখ্যক লেখাই প্রকাশিত হয়েছিল। ছাপার জন্য কবিতাগুলোকে এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছিল যাতে সেগুলো সমসায়ময়িক লেখাগুলোর মতো হয়। ফলে লেখাগুলিতে এমিলির নিজস্ব ভঙ্গি আর কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হয়েছিল। এরপর তিনি লেখাগুলো কেবল পারিবারিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। সে সময়ে ঔষধি লতাপাতা সংরক্ষণের দিকে ঝোঁক চলে আসায় উদ্ভিদতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করতে লাগলেন। তিনি গাছের ফুল লতা পাতা সংগ্রহ করে নোট বইতে সেঁটে নিচে নাম লিখে রাখতেন। উদ্ভিদ সম্পর্কে তার এতো ভাল জ্ঞান ছিলো যে, উদ্ভিদবিদরাও অনেক সময় তার কাছে হেরে যেতেন। এরপর কম লিখতেন তিনি। লেখাগুলো সংরক্ষণও করতেন না। নিজের শারীরিক ও মানসিক অবনতির পাশাপাশি পরিবারের বেশকিছু সদস্যের মৃত্যু ঘটেছিল তখন। একসময় বাবার বিপত্নীক বন্ধু ওটিস ফিলিপ লর্ডের সাথে মধুর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ওটিস ফিলিপকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের পরিকল্পনাও করেন। কিন্তু পরিকল্পনার ১ বছরের মাথায় তিনিও ইহলোক ত্যাগ করেন।
১৮৮৬ সালের ১৫ মে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা যান এমিলি ডিকিনসন। কিডনি রোগে মৃত্যু হয় তার। ভগ্নস্বাস্থ্য এবং মানসিক চাপের দরুন অল্পবয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। টাউন সিমেট্রিতে তার সমাধি হয়, আর বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। তার লেখাগুলি সম্পর্কে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। কোন কোন গবেষকের মতে, দিস্তা কাগজের বাঁধানো তিনটি খাতা (পাণ্ডুলিপি) তিনি মারা যাবার আগে বোনকে দিয়ে গিয়েছিলেন। আবার কারো মতে, তার প্রয়াণের পর লাভিনিয়া লেখাগুলো আবিষ্কার করেন। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে লেখাগুলো প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমগ্র লেখাগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। বিখ্যাত লেখাগুলোর মধ্যে ‘Hope is the thing with feather, Because I couldn’t stop for death’ (যার থিম ছিল মৃত্যুভাবনা) অন্যতম। নির্জনতা, বিষণ্নতা আর অদ্ভুততার জন্য সুপরিচিত ছিলেন তিনি। আমেরিকান সাহিত্যে তিনি একজন বিখ্যাত এবং পছন্দের কবি ছিলেন।
স্থানীয়দের কাছে তিনি একটু অদ্ভুত স্বভাবের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাদা কাপড়ের প্রতি তার ঝোঁক বেশি ছিল। তিনি সাদা কাপড়ের লম্বা জোব্বা জাতীয় পোশাক পরিধান করতেন। জোব্বার দু’পাশে দুটো পকেট থাকতো। এক পকেটে থাকতে দিস্তা কাগজ আর এক পকেটে কলম। কিছু মাথায় এলেই তিনি টুকে রাখতেন। অতিথিদের আপ্যায়ন করতে তিনি কখনো সামনে আসতেন না। তিনি কোনদিন বিয়ে করেননি, এমনকি বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও ছিল অতি নগণ্য। আর তাই জীবনের শেষ সময়টুকুও কাটে একাকী।
তার লেখা প্রায় ১৮০০ কবিতার মধ্যে এক ডজনও প্রকাশ হয়নি। তার কবিতার ধরন ছিল ব্যতিক্রম। সেগুলো ছোট ছোট বাক্যের মধ্যে থাকতো। যেখানে না থাকতো টাইটেল, এমনকি কবিতার মধ্যে কিছু যতিচিহ্ন বা বর্ণ ব্যবহার করা হতো। তার কবিতার মধ্যে মৃত্যু এবং অমরত্ব এই দুইটি ভাবের প্রকাশ ঘটতো। এমনকি বন্ধুদেরকে চিঠি লেখার সময়ও এই দুইটি ভাব লক্ষণীয় ছিল।
তার প্রথম কবিতা ১৮৯০ সালে টমাস ওয়েটভর্থ হগিনসন এবং মেবেল লুমিস টডদের দ্বারা ছাপা হয়। টমাস এইচ জনসন কোন ধরনের সম্পাদন ছাড়া তার কবিতাগুলো ১৯৫৫ সালে ‘দ্য পয়েমস অফ এমিলি ডিকিনসন’ প্রকাশ করেন। উনিশ শতক এবং বিংশ শতাব্দীর আগে তার প্রতিভা যত্ন না করা হলেও, তিনি এখন সারা বিশ্বে অন্যতম একজন কবি হিসেবে স্বীকৃত।
তার কবিতা আর ব্যক্তিত্ব ঘিরে রহস্যের জট এখনো পুরোপুরি খোলেনি সাধারণ পাঠকের কাছে। তার কবিতা আঙ্গিকের নতুনত্বে এবং বিষয়ের গভীরতায় অতিশয় সাহসী ও গভীর রহস্যঘেরা। আবেগ-অনুভূতির দিক থেকে ছিলেন আরো পাঁচজন কবির চেয়ে একেবারেই আলাদা। লোকজনের সঙ্গ এড়িয়ে চলতেন সচেতনে। অবিবাহিত জীবনে বাড়ির বাইরে খুব একটা বের হননি। তার জীবদ্দশায় মাত্র ডজনখানেক কবিতা প্রকাশ পেয়েছিল। তার সীমিত পরিমণ্ডলে যাদের বিচরণ ছিল, তাদের অন্যতম লেখক এবং নারী অধিকারকর্মী টমাস ওয়েন্টঅর্থ হিগিনসন। ডিকিনসনের কবিজীবনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে হিগিনসনের বিশেষ অবদান ছিল। তবে তাদের মধ্যে প্রায় ২৪ বছরের যোগাযোগ থাকলেও সরাসরি দেখা হয়েছিল মাত্র দু’বার। তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল ১৮৭০ সালে। হিগিনসন জানান, ডিকিনসনের সামনে তার স্নায়ু যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিল। যদিও তার সঙ্গে ডিকিনসনের ছোঁয়া পর্যন্ত লাগেনি, তবু তার মনে হয়েছিল ডিকিনসনের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের চুম্বকীয় ক্ষমতা তিনি টের পেয়েছিলেন। ডিকিনসন সম্পর্কে আরো একটি রহস্যের কিনারা করতে পারেননি হিগিনসন। ডিকিনসন একবার জানিয়েছিলেন, ১৮৬২ সালে হিগিনসন তার জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু হিগিনসন কিছুতেই বুঝতে পারেননি, কিভাবে তিনি কবির জীবন বাঁচিয়েছেন। মা-বাবার প্রতিও আবেগী নৈকট্য ছিল না ডিকিনসনের। মা সম্পর্কে তার মন্তব্য আরো ভয়াবহ। তিনি বলেছিলেন, তার নিজের মা নেই। আরেক রহস্য হলো, তার কবিতার অনেক রকম অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ড্যাশের (-) ব্যবহার। তার নিজের মতোই ড্যাশগুলোও রহস্যঘেরা; কেননা সেগুলো আকারে নানা রকম। কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, এগুলো তার স্বাধীনতা প্রকাশের প্রতীক। তিনি বলেছেন, ‘সব সত্যই বলব, তবে বলব তির্যকভাবে।’ এমন আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উক্তি করে গেছেন এমিলি:
* পরমানন্দদায়ক অভিজ্ঞতাকে আমন্ত্রণ জানাতে আত্মা সবসময়ই আধখোলা অবস্থায় থাকে। * অসমর্থরা অমরণশীল ভালোবাসার জন্য মরতে ভালোবাসে।* কিছু না বলা, কোনো কোনো সময় অনেক কিছু বলা।* সত্য এতই দুর্লভ যে, এটি বলতে গিয়ে আনন্দ অনুভব করা যায়।* আমি কেউ নই, তুমি কে? * আহত হরিণই অনেক উঁচুতে লাফাতে পারে। * সৌন্দর্য কোনো কারণে হয় না, এটি এমনিতেই হয়। * ভাগ্য সাহসীদের বন্ধু হয়। * আচরণ হচ্ছে একজন মানুষ যা করে-সে যা ভাবে, বিশ্বাস ও অনুভব করে তা নয়। * সাফল্য তাদের কাছেই দারুণ মধুর, যারা কখনই সফল হননি।
আমেরিকার যে কোনো লাইব্রেরিতে গেলে এমিলি ডিকিনসনের ওপর শ’খানেক বই পাওয়া যাবে। তারপরও তার ওপর অনুসন্ধান করে চলেছেন পণ্ডিতরা। সত্যকে জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা, প্রেম ও মৃত্যুচিন্তা থেকেই তার লেখার জন্ম। আর পাশাপাশি দুটি বাড়ি, যে বাড়িতে এমিলি ডিকিনসন থাকতেন এবং তার পাশের বাড়ি যেখানে তার ভাই অস্টিন ও তার পরিবার বাস করতেন-এ দুটি বাড়ির মধ্যেই এমিলি ডিকিনসন তার জীবন ও চলাফেরা সীমিত রেখেছিলেন। কারণ তিনি পছন্দ করতেন নির্জনতা।
এমিলি ডিকিনসনের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরে দু’টি বাড়িই স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক মিউজিয়াম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। ২০০৩ সালে অ্যামহার্স্ট কলেজের অধীনে এ দু’টি একত্রিত করে সৃষ্টি হয় ‘এমিলি ডিকিনসন মিউজিয়াম’। এ মিউজিয়ামের দু’টি ভাগ। দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ। একটি ‘হোমস্টেড বা খামারবাড়ি’, যেখানে এমিলি থাকতেন এবং ‘এভারগ্রিনস’, যে বাড়িটিতে এমিলির ভাই ও তার পরিবার বাস করতেন। এ বাড়ির মাধ্যমে এমিলির সঙ্গে অ্যামহার্স্টের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ঘটত।
তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় মৃত্যুর ৪ বছর পর। ১৮৯০ পর্যন্ত তার কবিতাগুলো টানা প্রকাশ হতে থাকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ১৯৫৫ সালে এইচ জনসন প্রকাশ করেন এমিলি ডিকিনসনের কবিতাসমগ্র। পাশ্চাত্যে এমিলি স্থান আমেরিকার প্রখ্যাত কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান, ওয়ালেস স্টিভেন্স, রবার্ট ফ্রস্ট, টিএস এলিয়টদের কাতারে। তার দশটি বহুলপঠিত কবিতা : ১. আই টেস্ট আ লিকুর নেভার ব্রুড ২. সাকসেস ইজ কাউন্টেড সুইটেস্ট ৩. ওয়াইল্ড নাইটস-ওয়াইল্ড নাইটস ৪. আই ফেল্ট আ ফিউনারেল, ইন মাই ব্রেইন ৫. আই অ্যাম নোবডি! হু আর ইউ ৬. হোপ ইজ দ্য থিং উইথ ফেদার্স ৭. আ বার্ড, কেইম ডাউন দ্য ওয়াক ৮. বিকজ আই কুড নট স্টপ ফর ডেথ ৯. মাই লাইফ হ্যাড স্টুড- আ লোডেড গান ১০. টেল অল দ্য ট্রুথ বাট টেল ইট স্ট্যান্ট।
এমিলির মা পিয়ানো বাজাতেন। নির্জন দুপুরে পুকুরের পাড়ের টুপ টুপ কোন শব্দ এমিলির কানে মধুর হয়ে বাজতো। ফুল পাতা সংগ্রহ করতে ভালবাসতেন। ডেস্কে বসে লিখতে লিখতে জানালা দিয়ে তাকিয়ে গৃহযুদ্ধের তাণ্ডবকারী সেনাদের দেখে কষ্ট পেতেন। খুব ভালবাসতেন ভাইয়ের বাচ্চাদের। জীবনবাদী ছিলেন তিনি মারাত্মকভাবে। তবু তিনি ছিলেন আপন গহিনে আবদ্ধ। তার ভাগনি মার্থার মতে, এটা ছিল স্বেচ্ছাবন্দিত্ব। তিনি তার লেখক জীবনের চরম উৎকর্ষে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। তাই সব ছেড়ে হয়েছিলেন তপস্বী। তিনি পৌঁছেছেন সেখানে, যা তিনি চেয়েছিলেন।