জাহানারা আরজু বাংলাদেশের কবি এবং সাহিত্য সম্পাদক। তিনি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক ও ৯টি স্বর্ণপদকসহ ৩০টি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তৎকালীন সময় শিক্ষাব্যবস্থা এবং তার কবিতা নিয়ে তার বাসভবন গুলশানের কবিতাপ্রাঙ্গণে কথা হয় তার সাথে। তারই চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন –হাসান সাইদুল
কবিতা আপনার কাছে আসলে কী?
কবিতা আমার কাছে একটা নেশার বিষয়! আমি যখন তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তাম তখন শ্লোক বানাতাম। দু’ লাইন চার লাইনের, ছড়া বলতাম। আমার মা একটা সময় আমার মুখের বানানো ছড়া লিখে রাখতেন। সে থেকেই কবিতা লেখা। লেখতে লেখতে একটা সময় কবি হয়ে গেলাম।
আপনার প্রথম কবিতা প্রকাশের অনুভূতি জানতে চাই।
প্রথম লেখা প্রকাশের অনুভূতিটা অন্যরকম আমি বুঝাতে পারবো না। আমাদের সময় এখনকার মত এতো সহজ ছিলো না লেখা প্রকাশ করা।
১৯৪৫ সালের কথা। মফস্বল থেকে ডাকেও লেখা পাঠানো ছিলো কঠিন। দেশ থেকে পরিচিত কেউ ভারত গেলে তার মাধ্যমে লেখা পাঠাতাম। তৎকালীন সময় ‘আজাদ’ পত্রিকায় আমি আমার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে লেখা পাঠিয়েছিলাম। আমার প্রথম লেখাই আজাদ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিলে’ ছাপা হয়, কবিতার নাম ছিলো, ‘সোনার ছেলেমেলে’। প্রথম লেখা প্রকাশের আনন্দটা আমার কাছে কী আনন্দের তার প্রকাশ করে বুঝাতে পারবো না।
১৯৪৫ সালে আপনার প্রথম কবিতা প্রকাশ হয়। আর আপনার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ করেন ১৯৬২ সালে এতো দেরি করলেন কেনো?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আমি সক্রিয় ছিলাম। ছড়া কবিতা নিয়মিত লিখতাম। কলেজে থাকা অবস্থা লেখালেখি বেশি করেছি। পরে বিয়ে হলো। পরীক্ষা, বিয়ের পর সংসারের ব্যস্ততায় বই প্রকাশ করতে দেরি হয়। কিন্তু আমার লেখালেখি ছিলো নিয়মিত। তখনকার সময় প্রায় সব পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশিত হতো।
আপনার প্রথম গ্রন্থ ‘নীলস্বপ্ন’ প্রকাশের গল্পটা জানতে চাই।
সে অনেক কথা। ১৯৬২ সালের কথা। লেখালেখি নিয়মতি করছি। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে বই প্রকাশ করতে পারিনি। একদিন আমার স্বামী এ কে এম নূরুল ইসলাম পাকিস্তান আমলে বিচারপতি মওদুদ সাহেবের সাথে আইন বিষয়ে আলোচনার সময় বিচারপতি আমার স্বামীর কাছে অভিযোগ করেন, তোমার স্ত্রী এতো সুন্দর কবিতা লিখে আর তুমি এখনও তার কোনো বই প্রকাশ করোনি! শিগগিরই জাহানারা আরজুর বই প্রকাশ করো। নূরুল ইসলাম বাসায় এসে তো আমাকে বললো তোমার কবিতার বই বের করতে হবে। আমি বললাম, হঠাৎ আমার বই প্রকাশ নিয়ে তাড়াহুড়ো করছো কেনো? সে বললো, তোমার বই কেনো আগে প্রকাশ করা হলো না আমার কাছে বিচারপতি মওদুদ সাহেব অভিযোগ করলেন।
ঐ বছরই আমার প্রথম গ্রন্থ ‘নীলস্বপ্ন’ প্রকাশিত হয় মীর হাসান আলী আইডিয়া প্রিন্টিং প্রেস থেকে। কবি ফররুখ আহমেদের নির্দেশে কবি তালিম হোসেন আমার ‘নীলস্বপ্ন’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম আলোচনা করেন এবং প্রচার করা হয় রেডিও পাকিস্তানে আর পত্রিকায় প্রথম সমালোচনা লিখেন মওদুদ আহমেদ। বইয়ের একটি প্রকাশনা উৎসব করি। প্রকাশনা উৎসবে উপস্থিত ছিলেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সৈয়দ মুতাহার হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, বেগম রোকেয়া আনোয়ার, কবি তালিম হোসেন, কবি হুসনে আরা (শিশুসাহিত্যিক), কবি শামসুন্নাহার, কবি শামসুর রাহমানসহ প্রবীণ নবীন ২শ জন।
আপনাদের সময় যারা লিখতেন তাদের মাঝে সম্পর্কটা কেমন ছিলো?
সবার মাঝে একটা সম্প্রীতি ছিলো। আমাদের সময়ে কবি শামসুর রাহমান। ওনি আমার বয়সে বড় ছিলেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতাম। ওনি আমার কবিতা পড়তেন, আমি তার কবিতা পড়তাম। দেয়ালে আমরা এক সাথে লিখতাম। ওনার লেখা উপরে ছাপা হতো। আমি উপ-রাষ্ট্রপতির স্ত্রী বলেই নয়, আমার লেখালেখির সুবাদে অনেক কবি সাহিত্যিক আমার বাসায় আসতেন। আমার বাসায় কবি সাহিত্যিকদের আড্ডা বসতো। মনে পড়ে কবি শামসুর রাহমান আল মাহমুদের কথা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহও আমার বাসায় এসেছিলেন। আমি যখন ‘সুলতানা’ পত্রিকা প্রকাশনা অনুষ্ঠান করি। সে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে আমাদের বাসায় মহাকবি কায়কোবাদ এসেছিলেন। কবি মঈনউদ্দীন, কবি জসীম উদ্দীন আমাদের বাসায় আসতেন। কবি আহসান হাবীব, ফজল শাহাবুদ্দীন, রফিক আজাদ আমাদের বাসায় আসতেন, কবিতার আড্ডা দিতেন।
সুফিয়া কামাল এবং আপনি তো ‘সুলতানা’ পত্রিকায় কাজ করেছিলেন যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে। তার সাথে কাটানো স্মৃতির কথা জানতে চাই।
কবি সুফিয়া কামাল আর আমি ‘সুলতানা’ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ছিলাম। কাজ ছিলো লেখালেখির। নিজেরাও কবি, সব মিলিয়ে সম্প্রীতি ছিলো অনেক। ওনি আমাদের বাসায় আসতেন। মাঝে মাঝে আমিও ওনার বাসায় যেতাম আমার বড় মেয়ে মেরিনা জাহানকে সাথে নিয়ে। মেরিনার লেখালেখির হাতেখড়ি দেই সুফিয়া কামালকে দিয়ে।
‘সুলতানা’ পত্রিকা কতদূর পর্যন্ত গিয়েছিলো?
আমি ও সুফিয়া কামাল মিলেই পত্রিকাটা বের করতাম। পত্রিকাটা সাপ্তাহিক ছিলো। মোট ১৩ সংখ্যা বের করেছিলাম তার পর আর বের করতে পারিনি। পত্রিকার প্রেস ছিলো অন্যের। যতদূর মনে পড়ে কবি শামসুর রাহমানের বাবার একটি প্রেস ছিলো, ওখান থেকে ‘সুলতানা’ বের হতো। তখন তো এখনকার মত এতো লেখক ছিলো না। এক সংখ্যা বের করার পর আরেক সংখ্যার লেখা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়তো, কেনো না সুলতানা সাপ্তাহিক হওয়ার কারণে বেশি সমস্যায় পড়েছিলাম। মাসিক করলে হয়তো লেখা সংগ্রহের জন্য অনেক সময় পেতাম। লেখাপড়ার পাশাপাশি ‘সুলতানা’ বের করতাম। একটা সময় লেখাপড়া এবং নিজেদের লেখালেখির কারণে ‘সুলতানা’ প্রকাশ করা বন্ধ করে দিলাম।
কবি আহসান হাবীব তো আপনার বাসায় আসতেন তার সাথে আপনার পরিচয় কিভাবে?
কবি আহসান হাবীব এবং আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতাম। রেডিওতে আমরা এক সাথে অনেক প্রোগ্রাম করেছি, এভাবেই তার সাথে আমার পরিচয় হয়। তার কবিতা আমার খুব ভালো লাগতো। তিনি আমার বাসায় আসতেন। তাকে নিয়ে আমি একটি কবিতাও লিখেছি।
আপনি তো একুশ নিয়ে একক বই বের করেছিলেন এ বিষয়ে কিছু বলুন
হ্যাঁ। শুধু মাত্র একুশ নিয়ে আমি একক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করি। এতে সব কবিতাগুলো একুশ নিয়ে লেখা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আমি দেখেছি ভাষা আন্দোলনে শহীদদের তাজা রক্ত। সে সময় আমার লেখা ‘রাজপথ’ কবিতাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি স্মরণে কবিতা নিয়ে ‘শোণিতাক্ত আখর’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করি যা ওই সময়ে একুশ নিয়ে একক কোনো বই। আমার স্বামী এ কে এম নূরুল ইসলাম Blood Smeared Alphabets নামে বইটি অনুবাদ করেন। বইটি কয়েকটি সংস্করণ হয়ে দেশ ও বিদেশে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়।
আপনাদের সময় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে সম্পর্ক কেমন ছিলো?
আমাদের সময় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে সম্পর্ক ছিলো মধুর। সব সময়েই শিক্ষকদের প্রিয় কিছু শিক্ষার্থী থাকে। আমাদের সময় দেখতাম, শিক্ষকদের কোনো প্রিয় শিক্ষার্থী দেরি করে ক্লাসে এলে শিক্ষকও একটু দেরি করে ক্লাস শুরু করতেন। ছাত্রছাত্রীরাও ছিলো শ্রদ্ধাশীল। এখনকার মত এত উশৃঙ্খল ছিলো না। বলতে গেলে সব সময়েই খারাপ ভালো ছাত্রছাত্রী কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে ছিলো বা আছে। আমাদের সময়ও রাজনীতি ছিলো কিন্তু আমরা কখনও মারামারি হানাহানি করিনি। আমাদের মাঝে মাঝে মাঝে কবি সাহিত্যিকদেরও একটা আড্ডা হতো। কবিতা নিয়ে তর্কবিতর্ক হতো।
আপনার প্রিয় কবি কে? তাঁর সম্পর্ক কিছু বলুন
আমার প্রিয় কবি জসীমউদ্দীন। স্কুলে পড়ালেখা অবস্থায় তার ‘কবর’ পড়ে মুগ্ধ হয়ছি। আমি যখন আমার বাসায় কবর কবিতা আবৃত্তি করতাম বাসার সবাই কান্নায় ভেঙে পড়তো। কবিতার কথায় মানুষ মুগ্ধ হতো। আমার জীবনে একটা ইচ্ছে ছিলো, কবি জসীমউদ্দীনের উপর গবেষণা করবো। তাঁর উপর পিএইচডি করবো! কিন্তু প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে তা আর করতে পারলাম না। আমার জীবনে এ একটা শূন্যতা থাকবে। আমার স্বামী আমাকে উৎসাহ দিয়ে বলতেন, ‘তুমি জসীমউদ্দীনের ওপর পিএইচডি করতে পারো নি, দুঃখ পেও না। একটা সময় দেখবে তোমাকে নিয়ে মানুষ পিএইচডি করবে।
নূরজাহান বেগমের সাথে আপনার শেষ স্মৃতিকথাগুলো জানতে চাই
নূরজাহান বেগমের সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো মধুর। তিনি আমাকে জাহান বলে ডাকতেন। তিনি যখন হাসপাতালে ছিলেন তখন আমি অসুস্থ ছিলাম। ওনাকে আমি ফোন করেছিলাম। ওনার সাথে আমার শেষ কথা হয়েছিলো, আমি এখনও শোনতে পাই তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘জাহান কেমন আছো?’ অসুস্থ ছিলাম বলে অনেক কিছুই বলতে পারিনি। কয়দিন পর তো তিনি চলেই গেলেন। নূরজাহানকে নিয়ে আমি একটা কবিতা লিখছিলাম, ‘কোন উপমায় বাঁধবো তাকে’ শিরোনামে। কবিতাটি নূরজাহানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি স্মরণিকায় ছাপা হয়।
কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন ছিলেন আপনার বান্ধবী?
ও তো আমার খেলার সাথী আমার বান্ধবী। ছোটবেলা থেকে তাকে আমি চিনি। আমরা একই এলাকায় বড় হয়েছি। রাবেয়া ও আমি পুতুল পুতুল খেলতাম। তার পুতুলের সাথে আমার পুতুলের বিয়ে দিয়েছিলাম। ব্যস্ততা আর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে কাছের মানুষগুলো দূরের হয়ে যায়। আমি জানি না রাবেয়া আমাকে কতটা মনে করতে পারছে। আমি সব সময় রাবেয়াকে মনে করি। আমার একটা বই তাকে আমি উৎসর্গ করেছিলাম। বইমেলাতে বইটা গিয়েছিলো। শুনেছি রাবেয়া অসুস্থ আমিও অসুস্থ পাশাপাশিই থাকা হয়। রাবেয়া থাকে বনানীতে আর আমি গুলশানে অথচ কারও সাথে সাথে তেমন একটা দেখা হয় না।
নতুন যারা লিখছে তাদের কী পরামর্শ দিবেন?
পরামর্শ দেয়ার মতো কিছু নাই। আমরা পড়ালেখার পাশাপাশি লেখালেখি করেছি। বিয়ে সংসারের পাশাপাশি লেখালেখি করেছি। যুদ্ধ দেখেছি। ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছি। ’৭১ এর যুদ্ধ দেখেছি। সব বিষয় আমরা কবিতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। নতুন যারা লিখছে তাদের বলবো তারা যেনো দেশের কথা দেশের মানুষের কথা লেখায় প্রকাশ করে। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তেমন লেখা দেখছি না পত্রিকায়। দেশে অনেক অনেক পত্রিকা সাহিত্য পাতা অথচ আমরা যেমন ’৫২, ’৭১ নিয়ে লিখেছি তরুণরা বর্তমন প্রেক্ষিত নিয়ে লিখছে না। দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে লিখতে হবে।