মুজিবুর রহমান খাঁ ছিলেন সাহিত্যচিন্তক ও সাংবাদিক। শিক্ষকতাও করেছেন দীর্ঘদিন, তবে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জড়িত ছিলেন সম্পাদনার সাথে। নেত্রকোণা জেলার উলুয়াটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১০ খ্রি.। ৭৪ বছর বয়সে ১৯৮৪ সালে এই সাহিত্যচিন্তক জান্নাতবাসী হোন। তিনি পেয়েছেন বেশকিছু পুরস্কার। তার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদক অন্যতম। তার সাহিত্য চিন্তার মধ্যে ছিল স্বদেশ চেতনা। স্ব-সমাজের কথাকে কিভাবে সাহিত্যে আনা যায়। ধর্মও যে হয়ে উঠতে পারে সাহিত্যের অংশ সে বিষয়ে তিনি তার সাহিত্যের সীমানা গ্রন্থে সুচিন্তিত মতামত প্রদান করেন। এছাড়া তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো : পাকিস্তান, বিলাতে প্রথম ভারতবাসী, আমাদের ইতিহাস, গাজী ও শহীদ এবং সাহিত্যের বুনিয়াদ।
আমাদের সাহিত্য প্রবন্ধটিতে ‘সাহিত্য কি?’ ‘সাহিত্যের সার্থকতা কোথায়?’ ‘কেন সাহিত্য চর্চা করা হয়?’ সাহিত্য কিভাবে কালকে অতিক্রম করে হয়ে উঠে মহাকালের, সেসব প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন যুক্তির নিরিখে। যারা একালে সাহিত্যচর্চার সাথে জড়িত এবং ভবিকালের সাহিত্যিক হিসাবে নিজেকে স্থায়ী আসনে বসাতে চান তাদের জন্য এই প্রবন্ধটি সহায়ক হবে বলেই আমাদের ধারণা। এই প্রয়াস থেকেই পুনর্পাঠ বিভাগের এবারের আয়োজনে উপস্থাপিত হল মুজিবুর রহমান খাঁ’র আমাদের সাহিত্য প্রবন্ধটি। – শাহাদাৎ সরকার
সাহিত্যকে মনে করা হয়- ‘সব পেয়েছির দেশ’ তাই সকলে তার মাঝে খুঁজে বেড়ায় তাদের স্ব স্ব স্বপ্নসাধের সার্থক রূপায়ণ। ধার্মিক ধর্মের কথা খোঁজেন সাহিত্যে। যে সাহিত্য তাঁর আত্মিক পিপাসাকে তৃপ্ত করে না, সে সাহিত্য তাঁর কাছে সাহিত্যই নয়। দেশাভিমানী সাহিত্যিক সন্ধান করেন দেশপ্রেমের মৃত্যুঞ্জয়ী আহ্বান। তিনি তাঁর সাহিত্য-পাঠকে ব্যর্থ বিড়ম্বনা মনে করেন যদি সাহিত্যে তিনি তাঁর দেশপ্রেমের খোরাক না পান। তমদ্দুনসেবী, রাজনীতিক, সমাজ সংস্কারক ও অন্যান্য গোষ্ঠীর মানুষ এমনই করে সাহিত্যে তাঁর আপন আপন প্রিয় জিনিস আস্বাদন করতে চান। সকলের চাওয়া-পাওয়ার এমনতরো বিচিত্র আবেদন আসে নিত্য সাহিত্যের দরবারে। সাহিত্যকার দাবি কতটুকু পূরণ করে তা নিয়ে তর্কও চলে। ধরে নিতে পারি সাহিত্যের খাস আদালতে এসব কিছুরই ঠাঁই নেই। কিন্তু সাহিত্যের আম দরবারে এদের সকলেরই ঠাঁই অল্পবিস্তর দেওয়া যেতে পারে।
যাহোক, এসব তর্ক মূলতবী রেখে ‘সাহিত্য’ কি, এ কথাটারই জবাব দেওয়ার চেষ্টা আগে করা উচিত। এর জবাবেরই ভিতর সাহিত্যের সকল চাওয়া-পাওয়ার চাবিকাঠি লুক্কায়িত রয়েছে। সাহিত্য কি এই সওয়ালের সোজা জবাব দেওয়া কঠিন। একজন খ্যাতনামা সমালোচক বলেছেন : ‘সাহিত্য কি’, আমার কাছে তার সূত্র জানতে চাইলে, আমি লা জবাব। কিন্তু ‘সাহিত্য কি তা বুঝি কি না- এ প্রশ্নের জবাব আমি বলতে পারি যে, ‘আমি তা বুঝি।’ সাহিত্যের সূত্র নির্ধারণ কঠিন হলেও সাহিত্য জগতের চিন্তাশীল রথী-মহারথীরা ইহা নির্ধারণ করতে কম চেষ্টা করেন নি। ফলে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়ায় সাহিত্যের লক্ষ্য ভূমি সুস্পষ্ট আলোকে আলোকিত হয়ে উঠেছে অনেক দূর, যদিও তার ইতস্তত কুয়াশাচ্ছন্নতা এখনও রয়েছে। বিখ্যাত ইতালীয় রসতাত্ত্বিক ক্রোচে বলেছেন, সাহিত্য হল ‘রূপায়ণ’ (Expression)। তবে রূপায়ণ সার্থক হওয়া চাই। রুশীয় মনীষী এবং সাহিত্যিক টলস্টয়ের কথা হলো যে, সাহিত্যের কাজ হচ্ছে জ্ঞাপন (Communication)। তিনি বলেন, কোন ভাবানুভূতি যখন মনকে করে ভারাক্রান্ত, তখন সে প্রকাশের বেদনায় পীড়িত হয়। সেই ভাবানুভূতি অপরকে সাগ্রহে জানাবার তাগিদে মানুষ লিখে, গান গায় ও ছবি আঁকে। এ পথে মানুষ যখন কলার কারবারি, তখনই সে কবি ও সাহিত্যিক। টলস্টয়ের কথাগুলো এই : A man having experienced a feeling intentionally transmits it to others is an act of Art; When it is in words, it is literature, when it is in movements, it is dance, when if is it tune, it is music etc… যখন কোন মানুষ তার ভাবানুভূতির অভিজ্ঞতাকে ইচ্ছাপূর্বক অন্যকে জানাতে চায়, তখনই তা হয় শিল্প। এটিই কথায় হলো সাহিত্য, আন্দোলনে হলো নাচ, সুরে হলো গান ইত্যাদি। এমারসনের মত হল যে, সাহিত্য হচ্ছে Transcendentalism। আবার কারো মত হল, সাহিত্য হচ্ছে জীবনের বিচার-বিশ্লেষণ। ম্যাথিও আর্নল্ডের মতে Literature is the criticism of life সাহিত্য হচ্ছে জীবনের সমালোচনা। কাব্য-সাহিত্য সম্পর্কে ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর অভিমত হল ‘Thoughts recollected in tranquility শান্ত মুহূর্তে চিন্তাধারাকে স্মরণই হলো কাব্যের কাজ। সংস্কৃতে আছে, রসত্মং বাক্যং কাব্যং- রসযুক্ত কাব্যই বাক্য। এই ভাবে এক একজন বিশেষ বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতের আলোক ফেলে সাহিত্যের ধর্ম নিরূপণের চেষ্টা করেছেন। কেউ একে সমগ্রভাবে এবং কেউ অংশত দেখেই তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছেন। এভাবে সকলের সমবেত সুর নির্ধারণের চেষ্টা থেকে সাহিত্য সম্বন্ধে একটা সাধারণ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। মোটামুটি কথা দাঁড়াচ্ছে যে, সুন্দরের পথেই সাহিত্যের মূল অভিসার। সত্য ও মঙ্গলের আবেদনও বড় সাহিত্যে তারই সহযাত্রীরূপে মিলিত হয়েছে। সত্য ও মঙ্গল বর্জিত সুন্দর সুন্দর নয়। নিছক সুন্দর অসুন্দর। সত্য ও সুন্দর এক সুরে গাঁথা পড়েছে সাহিত্যে। কিটসের কাব্যোক্তি হলেও ইহা সাহিত্যের একটি চিরন্তন সত্যেরই জয়দৃপ্ত ঘোষণা যে, ‘Truth beauty, beauty truth সত্যই সুন্দর এবং সুন্দরই সত্য, কিম্বা ‘A thing of beauty is a joy forever’ সুন্দর চিরদিনই আনন্দ দেয়। একমাত্র সত্যাশ্রয়ী জিনিসই। নিত্যকার ছাড়পত্র নিয়ে আসে। সুতরাং সব কিছুর সংক্ষিপ্ত সার দাঁড়ালো, সাহিত্যে সোজাসুজি সুন্দরের উদ্দেশ্য নিবেদিত। তার প্রকৃত সুন্দর সত্যভিত্তিক ও মঙ্গলাশ্রয়ী না হয়েও পারে না।
সাহিত্যের আরও একটি দিক নিয়েও তর্ক নেই। সে হচ্ছে যে, সাহিত্যের আবেদন সার্বজনীন এবং আন্তর্জাতিক। সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের পথাশ্রয়ী বলেই সাহিত্য দেশ-কাল-পাত্রের সীমানা ও ব্যবধান অতিক্রম করে যায়। ব্যবধানের কোন প্রাচীরই তার পথ রোধ করতে পারে না। কারণ, সর্বকালের ও সর্বলোকের স্থায়ী মানব-মানের আসনে সাহিত্যের প্রতিষ্ঠা। সারা দুনিয়ার মানুষের মনের ধর্মে সাধারণত কোন বিরোধ নেই।
প্রেম, প্রীতি, হিংসা, দ্বেষ, সুবিচার, সাম্য, ভক্তি, ক্ষমা প্রভৃতি বৃত্তি সকল মানুষেরই আছে। এসব সকল দেশের ও সকল কালের মানুষেরই সাধারণ গুণ, দোষ ও বৃত্তিরূপে বিবেচিত হয়। সাহিত্যের কামরার এসব সার্বজনীন মানবিক গুণাগুণ নিয়েই চলে। এ কারণেই এক দেশের সাহিত্য অন্যকালের মানুষের মনকে নাড়া দিয়ে থাকে এবং আনন্দদান করে।
তবে মানব-মনের এই ঐক্যের মধ্যেও বৈচিত্র্য আছে। সে বৈচিত্র্য নির্ধারিত হয় জাতিতে জাতিতে, এসব গুণাগুণ সম্পর্কিত মৌলিক গুরুত্ব এ বিরোধ নয়, মৌলিক গুরুত্ব আরোপের বিরোধ মাত্র। প্রেম ও ক্ষমার আদর্শকে সব দেশের ও সব জাতির মানুষেরই বড় বলে মেনে নিতে দ্বিধা নেই। তবু এই দুটি গুণ খ্রিস্ট ধর্মেরই ঐতিহ্যানুযায়ী বিশেষভাবে এজন্যই সাধারণভাবে এসব গুণকে বলা হয় খ্রিস্টান ধর্মের মূল্যবোধ। ঠিক এইভাবে বলা যায় সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ইনসাফ প্রভৃতি ইসলামের মূল্যবোধ আর ভক্তি, অহিংসা হলো হিন্দুসুলভ গুণ। মৌলিক গুরুত্ব আরোপের ব্যবধানের জন্য এসব মানসিক মূল্যবোধকে কারবারে এসব মানবিক গুণের লীলাবৈচিত্র্য অল্পবিস্তর দুনিয়ার সকল জাতির সাহিত্যেই দেখা যায়।
সাহিত্যের মূল সুরের ব্যাপারে দেশ-কাল-পাত্র বিচারে হয় তো এখানে-সেখানে সীমারেখা টানা বিপজ্জনক কাজ হলেও তার বাইরের রঙের বৈচিত্র্য চিহ্নিত করা যায় সহজেই। সাহিত্য তার ভাষা, অলংকার ও লীলাধর্মে বিশেষভাবে জাতীয়, দেশগত ও পরিবেশাশ্রিত। তাই সাহিত্যের বিশ্বরূপ যেমন আছে, তেমনই আছে তার দেশরূপ। সকল জাতির মানুষ উদার আকাশের তারার স্বপ্ন দেখতে পারে স্বাচ্ছন্দ্যে এবং এখানে সারা দুনিয়ার সাহিত্যিক এক। কিন্তু আকাশচারী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে গেলেও সাহিত্যিককে মাটিতে পা রাখতে হয়। এই মাটির পরিচয় থেকেও কোন সাহিত্যের অব্যাহতি নেই। সুতরাং সাহিত্য আন্তর্জাতিক হয়েও জাতীয়।
এখানে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে আমার বক্তব্যটি আরো পরিষ্কার করে নেয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। সব ফুলই সুন্দর, বর্ণে, গন্ধে ও রূপে তারা বিচিত্র ও সংখ্যাহীন হলেও সুন্দর। সব সাহিত্য রঙে, রূপে, বর্ণে, গন্ধে এক না হতে পারে কিন্তু তাকে সৌন্দর্যাভিসারী হতে হবেই, তাকে সুন্দর হতেই হবে। গোলাপ, পদ্ম, চেরি ফুল সবই নয়ন-মন ভুলায়, কিন্তু সব দেশের মাটিতে এরা সকলে ফুটে না। ঠিক তেমনই দেশ, কাল ও পাত্রভেদে সাহিত্য বৈচিত্র্যাধর্মী হয়েও সৌন্দর্যাভিসারী। তবে সৌন্দর্যাভিসারী হওয়া সত্ত্বেও মাটির স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের ছাপ সকল সাহিত্যই উজ্জ্বল। এ দেশের সাহিত্যের ও মাটির পশ্চাদভূমি রয়েছে। এই জাতীয় পরিবেশ থেকে তার অব্যাহতি নেই। সার্বজনীনতার স্বপ্নলোক তার কায়েম থাকবে নিশ্চয়ই, কিন্তু পরিবেশের সীমার দাবি তার মেনে নিতেই হবে। কারণ, তার ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে, তাহজিব ও তমদ্দুন আছে। তারই সাথে যুক্ত হয়েই তাকে সাহিত্য ও সুন্দরের বিশ্বরূপের ধ্যানী হতে হবে। সাহিত্যের কোন একটি যুগ সাহিত্যের সাধারণ ইতিহাস থেকে একটি বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। বিখ্যাত সমালোচক ইলিয়ট বলেন :
Tradition is a matter of much wider significance. It cannot be inherited, and if you want it. You must obtain it by great labour. It involves, in the first place, the historical sense, which we may call nearly indispensable to anyone who would continue to be a poet beyond his twenty fifth year, and the historical sense involves a perception, not only of the pastiness of the past, but of its presence. The historical sense compels a man to write not merely with his own generation in his bones, but with a feeling that the whole of the literature of Europe from Homer and within it the whole of the literature of his own country has a simultaneous order. This historical sense, which is a sense of the timeless as well as of the temporal and of the timeless as well as of the temporal and of the timeless and of the temporal together. Is what makes a writer traditional. And it is at the same time what makes a writer most acutely conscious of his place in time of his own contemporarily.
ইলিয়টের কথাগুলো বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় যথাযথ তাৎপর্যে আজ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের উৎসমূল সুদূর অতীতে চলে গেছে। মুসলমান বিজয়ের পূর্বেও এদেশে আরব মুসলমানরা এসেছিল সমুদ্র ও নদীর কূল-উপকূলের পথ বেয়ে এবং সাথে করে এসেছিল আরবি জবান ও তমদ্দুন। তারা বাংলার মানুষের জীবনে ও মানসে পলি ফেলে গেছে, তারপর এলো পাঠান মুঘল। তারা প্রত্যেকেই তাদের নজরানা, রঙ ও রূপ বাংলার তমদ্দুনিক জীবনে নিবেদন করে গেছে। আরবির পর ফারসির চর্চা করেছেন এদেশের লোক এবং তার সাথে চলেছে বাংলার জবানের ভাঙাগড়া ও নব নব রূপায়ণ। ব্রিটিশ শাসন বাংলার তমদ্দুনিক জীবনে নিয়ে এলো বিপর্যয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে হিন্দু জাগরণের সাথে সাথে বাংলা জবানের ভেতরে সংস্কৃতের নবজন্ম ও নবরূপ দেখা দিল। সাধারণ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ইহা সবচাইতে গৌরবদীপ্ত যুগ। এরই ভেতর যে মুসলমান ধারা সীমিত ও স্তিমিত হয়ে পড়ল, সে কথার পুনরাবৃত্তি বহুবার হয়েছে। তারপর এলো পাকিস্তান এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশ। এসবের প্রভাব-প্রতিক্রিয়াও রয়েছে।
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, আরবি, ফারসি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে একাত্ম হয়ে আছে। অতীতে ফারসি রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পেয়েছিল। ফারসি আজ সে আসনকৃত হলেও আমাদের জীবনে ও তমদ্দুন ফারসি যে ছাপ রেখে গেছে, তা কেউ মুছে ফেলতে পারে না। ফারসি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মৃত হলেও ধর্ম ও তমদ্দুনের ভাষা হিসেবে আরবির সাথে তা আমাদের জীবনে চির জীবন্ত। সুতরাং বাংলা ভাষায় তাদের প্রভাব অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে ভবিষ্যতের দিকে চলে গেছে। মাঝখানের সংস্কৃতের অস্বাভাবিক পুনরুজ্জীবনের প্রভাব বিভ্রান্তি ঘটালেও বাংলা জবানের সমৃদ্ধি সাধনও সংস্কৃত যথেষ্ট করেছে। তার সম্পদকে বাংলার সাহিত্যে যথাসাধ্য গ্রহণ করতে হবে। গুমরাহি বর্জন আমাদের কাম্য, সংস্কৃত বর্জন নয়। আসল কথা হলো, সাহিত্য, ঐতিহ্য ও তমদ্দুনের ঐতিহাসিক ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে নয়, যুক্ত হয়েই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। এ ধারা থেকে আমাদের বিচ্ছিন্নতা যেমন আত্মঘাতী, তেমনই বহির্মুখী, বিজাতীয় মনোভাবও আমাদের জন্য ক্ষতিকর।
ইলিয়টের আরো কয়েকটি সুন্দর কথা এখানে উদ্ধৃত করা গেল। তিনি বলেন :
In poetry there is no such thing as complete originality owing nothing to the past, whenever a Virgil, a Dante, a Shakespeare, a Goethe is born, the whole future of European poetry is altered. Which a great poet has lived, certain thing have been done once and for all, and cannot be achieved again, but on the other hand, every great poet adds something to the complex material out of which future poetry will be written .
ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের বাংলা সাহিত্যে যে নবযুগ এল তাতে প্রাচীন হিন্দুদের বেদ, গীতা, পুরাণ, কাব্য, উপনিষদ, ইতিহাস এবং ইংরেজ কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাংলা সাহিত্য নতুন প্রাণ-তরঙ্গে কল্পোলিত হয়ে উঠল। মাইকেলের উপর মিল্টনের, বঙ্কিমের উপর স্কটের, রবীন্দ্রনাথের ওপর রোম্যান্টিক যুগের পরবর্তী কালের ইংরেজ কবি লেখকদের প্রভাব নিয়ে সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক আলোচনা হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের মনিরত্নজাল হিন্দু কবি-সাহিত্যিকরা উদারভাবে গ্রহণ করলেও তাঁরা তাঁদের সংস্কৃত কাব্য, দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্যের জাতীয় ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁদের হাতে বাংলা ভাষায় সংস্কৃতের নতুন করে নবজন্ম হলো। তাঁরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দু’টি ধারার এই মিলন ও সমন্বয়ে যে সাহিত্য সৃষ্টি করলেন, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভই তার শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ। বাংলা সাহিত্যের এই ইঙ্গ-হিন্দু ধারায় অনেক আকাশচুম্বী প্রতিভার জন্ম হলো। এদিক বহু প্রতিভার দ্বারা কর্ষিত, চর্চিত ও পরীক্ষিত। ফলে এর প্রতিশ্রুতি ও সম্পদ আজ প্রায় নিঃশেষিত। এ ধারা বড় বড় প্রতিভার দ্বারা এমনভাবে লুণ্ঠিত যে, এ পথের সাহিত্যিক অভিযানের পুনরাবৃত্তিতে তেমন বেশি লাভের আশা নেই। বাংলা সাহিত্যের হিন্দু ধারা থেকে আমাদের উপাদান ও উপকরণ আহরণে বাধা নেই। তবে আমাদের সব সময়ই মনে রাখতে হবে যে, আমাদের কামিয়াবির প্রতিশ্রুতি এর অল্প অনুকরণে নয়। সে আমাদের জাতীয় ধারার অনুসরণে। ইলিয়টের শেষোক্ত উদ্ধৃতির ইঙ্গিত এখানেই গ্রহণ করতে হবে। সাহিত্যে একটি বিশেষ দিকে বড় যা হয়, একবারই হয়, পরবর্তীদের জন্য তার জের থাকে এবং থাকে তার উপাদান। দূর অতীতে আরব যে সাহিত্য-নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল, তা আরবের সীমানা ছাড়িয়ে গেল। সে ধারা ইরানে নব ফুল ফুটাল এবং এমনইভাবে পথে পথে ফসল ফলায়ে ফুল কুড়ায়ে এসে পৌঁছলো বাংলার সজল-শ্যামল মাটিতে। সে সাহিত্যে মধুর অমৃতের সঞ্চয় আমরা দেখেছি সুফি প্রভাবের ধারায়, আউল-বাউল, মুরশিদি মারফতি গানে ও পুঁথি-কিতাবের পাতায় পাতায়। তাই দেখতে পাই, বাংলার অপরীক্ষিত অনাবাদি দিক বিচিত্র সম্পদে ভরা এবং সাতরঙা হাতছানিতে পূর্ণ। আরবের প্রাণশক্তি, ইরানের রসঘন জাদু, পাশ্চাত্যের মনন ও পশ্চিম বাংলার সংস্কৃত মন্থিত ধারা বাংলার সাহিত্য মোহনায় মিলিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যকে সম্মুখে রেখে সব কিছু থেকে বাছাই করে সব কিছুই প্রয়োজন মতো আমরা নেব। কিন্তু ব্যবহার ক্ষয়িত, বিলুণ্ঠিত, বহু-আচরিত পশ্চিম বাংলার পুরাতন ধারায় সম্ভাবনাশূন্য নিষ্ফল গতানুগতিকতা ও অন্ধ অনুকরণের মোহাচ্ছন্নতা আমাদের যত শীঘ্র দূর হয়, ততই মঙ্গল।
ইরানের মাটিতে ইসলাম ও সেমেটিক ভাব-প্রবাহ হাফিজ, রুমী, সাদী, খাইয়ামের জন্ম দিয়েছিল। ইসলাম ও আরব ইরানগত সাহিত্যিক ঐতিহ্যের দৌলতে বাংলার মাটিতে নবসৃষ্টির আর এক বিস্ময়কর অধ্যায় আয়োজিত হতে পারে। নজরুলের কাজ এরই সম্ভাবনার ইঙ্গিতে পরিপূর্ণ। এক কথায় বাংলার লোক-সাহিত্য ও পুঁথি-সাহিত্যের সন্ধানী নজরুল ইসলাম ও জসীম উদ্দীন এক নয়া অভিযানের তোরণদ্বারে আমাদেরকে ডাক দিয়েছেন। এই অনাবাদি ও পতিত জমির আবাদ করলে সত্যই সোনা ফলবে।
তবে আমার কথার ভুল বোঝাবুঝি না হলেই আমি সুখী হবো। আমার ইতিহাস ও ঐতিহ্য-প্রীতির অর্থ কেউ কেউ হয়তো করে বসবেন যে, আমি অতীত-মুখী এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করতে চাই। আর আমি যুগের দাবি ও অগ্রগতির প্রতি মুখ ফিরিয়ে বসে আছি। মোটেই তা নয়। আমি কেবল বলতে চাই যে, অতীতের পরিচয়পত্র দিয়েই বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথ চলা ও সাধনায় আমরা পাথেয় অর্জন করব। যার যাত্রা-শুরুর ঠিকানা নেই, তার সম্মুখে চলার লক্ষ্য-ভূমিও অজ্ঞাত। নোঙরছেঁড়া নৌকা অনামী বন্দরেই আটকা পড়ে। সময়-সচেতন ও সমাজ-সচেতন যে সাহিত্য নয়, তা বদ্ধ জলাশয়ের নোঙরা পাকের মত।
সাহিত্যকে মনে করা হয়- ‘সব পেয়েছির দেশ’ তাই সকলে তার মাঝে খুঁজে বেড়ায় তাদের স্ব স্ব স্বপ্নসাধের সার্থক রূপায়ণ। ধার্মিক ধর্মের কথা খোঁজেন সাহিত্যে। যে সাহিত্য তাঁর আত্মিক পিপাসাকে তৃপ্ত করে না, সে সাহিত্য তাঁর কাছে সাহিত্যই নয়। দেশাভিমানী সাহিত্যিক সন্ধান করেন দেশপ্রেমের মৃত্যুঞ্জয়ী আহ্বান। তিনি তাঁর সাহিত্য-পাঠকে ব্যর্থ বিড়ম্বনা মনে করেন যদি সাহিত্যে তিনি তাঁর দেশপ্রেমের খোরাক না পান। তমদ্দুনসেবী, রাজনীতিক, সমাজ সংস্কারক ও অন্যান্য গোষ্ঠীর মানুষ এমনই করে সাহিত্যে তাঁর আপন আপন প্রিয় জিনিস আস্বাদন করতে চান। সকলের চাওয়া-পাওয়ার এমনতরো বিচিত্র আবেদন আসে নিত্য সাহিত্যের দরবারে। সাহিত্যকার দাবি কতটুকু পূরণ করে তা নিয়ে তর্কও চলে। ধরে নিতে পারি সাহিত্যের খাস আদালতে এসব কিছুরই ঠাঁই নেই। কিন্তু সাহিত্যের আম দরবারে এদের সকলেরই ঠাঁই অল্পবিস্তর দেওয়া যেতে পারে।
যাহোক, এসব তর্ক মুলতবি রেখে ‘সাহিত্য’ কি, এ কথাটারই জবাব দেওয়ার চেষ্টা আগে করা উচিত। এর জবাবের ভেতরই সাহিত্যের সকল চাওয়া-পাওয়ার চাবিকাঠি লুক্কায়িত রয়েছে। সাহিত্য কি এই সওয়ালের সোজা জবাব দেওয়া কঠিন। একজন খ্যাতনামা সমালোচক বলেছেন : ‘সাহিত্য কি’, আমার কাছে তার সূত্র জানতে চাইলে, আমি লা জবাব। কিন্তু ‘সাহিত্য কি তা বুঝি কি না- এ প্রশ্নের জবাব আমি বলতে পারি যে, ‘আমি তা বুঝি।’ সাহিত্যের সূত্র নির্ধারণ কঠিন হলেও সাহিত্য জগতের চিন্তাশীল রথী-মহারথীরা ইহা নির্ধারণ করতে কম চেষ্টা করেননি। ফলে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত হওয়ায় সাহিত্যের লক্ষ্য ভূমি সুস্পষ্ট আলোকে আলোকিত হয়ে উঠেছে অনেক দূর, যদিও তার ইতস্তত কুয়াশাচ্ছন্নতা এখনও রয়েছে। বিখ্যাত ইতালীয় রসতাত্ত্বিক ক্রোচে বলেছেন, সাহিত্য হলো ‘রূপায়ণ’ (Expression)। তবে রূপায়ণ আজ যুগের ভাবধারা সহস্র পথে আমাদের জীবন মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কায়েমি স্বার্থের লোভ ও নিঃস্ব মানুষের ক্ষুধার দাবি জানানোর শাণিত আলোকে যতখানি বড় হয়ে উঠেছে, কোন যুগে তা হয়নি। বঞ্চিত ও লাঞ্ছিতের যুগ-যুগান্তের অকথিত বেদনা আজ ভাষা খুঁজে ফিরছে। আমাদের সাহিত্যে যদি তার প্রতিধ্বনি না থাকে, তবে তাতে বাস্তব জীবনের তপ্ততা, অকৃত্রিম আন্তরিকতার স্পর্শ থাকবে না। ফলে সাহিত্য হবে ব্যর্থতা ও বিড়ম্বনার খোলস মাত্র। বাস্তব ও বর্তমানকে গ্রহণ না করা, পলায়নি মনোবৃত্তি শুধু সাহিত্যেই নয়, সর্বত্রই অবাঞ্ছিত।
বার্ট্রান্ড রাসেলের অন্যত্র উদ্দিষ্ট একটি কথাও সাহিত্য-আলোচনায়, বিশেষ করে বাংলার সাহিত্যে বর্তমানের আলোচনায় আমি উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করি। রাসেল বলেছেন যে, জ্ঞান ও প্রেমের মিলন ভিন্ন আদর্শ জীবন গড়ে তোলা যায় না। A good life is guided by intelligence and inspired by love. তাঁর কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন যে, আগের দিনে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকদের মানবপ্রেম ছিল তীব্র। কোথাও কোনো সংক্রামক রোগ দেখা দিলে তাঁরা জমাতে মিলিত হয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করতেন। এতে বেশি করে মানুষের মেলামেশার দরুণ রোগ ছড়িয়ে পড়ত। এইসব ধর্মপ্রচারকদের মানবপ্রেম ছিল গভীর, কিন্তু ছিল না জ্ঞানবুদ্ধি। এ যুগের মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির অন্ত নেই। কিন্তু তারা বিজ্ঞানের সাহায্যে তৈরি করেছে মারণাস্ত্র। প্রেমবর্জিত জ্ঞানদীপ্ত দুনিয়ার এ পরিচয় কারো কাম্য নয়। রাসেল এ কথাটা সাহিত্যে আদর্শ হিসেবে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছিলেন মানুষের সাধারণ-জীবনাদর্শ হিসেবে। তবে সাহিত্যেও এটি তাৎপর্যপূর্ণ। সত্যিকারের সৃষ্টি-ধর্মী সাহিত্যকেও প্রেমতপ্ত ও জ্ঞানদীপ্ত হতে হবে। সাহিত্যের বড় সৃষ্টি জ্ঞান ও প্রেমের সমন্বয়েই সম্ভব। আমাদের সাহিত্যে মনীষা ও মননের ছাপ কম। বুদ্ধিমার্জিত শাণিত দৃষ্টির পরিচয় আমাদের সাহিত্যে আজও সামান্য। এর জন্য দায়ী আমাদের সাহিত্যিকদের পড়াশুনা ও অনুসন্ধিৎসার স্বল্পতা। অতলান্ত জ্ঞান, আকাশভেদী বুদ্ধি-বধ-মনীষার সহযায়ী। যুগের দাবি সাহিত্যিকরাও এড়িয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রাণসঞ্চার করতে পারে প্রেম। এই প্রেমই সকলকে মানুষ, দেশ, দেশের ঐতিহ্য, অতীত ও ইতিহাসকে ভালোবাসতে শিখায়। বহির্মুখিতা, পরানুকরণ ও পলায়নি মনোবৃত্তি খড়কুটার মত প্রেমের বন্যায়ই ভেসে যায়। আজ আমাদের সাহিত্যে প্রেম ও জ্ঞানের সাধনার চাইতে প্রার্থিত আর কিছুই নেই। বহির্মুখিতা ও কূপমুণ্ডকতার মধ্যে সেতু নির্মাণ করতে পারে বুদ্ধি ও প্রেম। প্রেম ও বুদ্ধির জোরেই অতীতের অন্ধতা, বহির্মুখী দৃষ্টি এবং আকাশচারিতা ত্যাগ করে নিচের পায়ের তলার মাটিতে আমরা এসে দাঁড়াব এবং স্বদেশকে, স্বজাতিকে ও সাহিত্যের স্বকীয়ত্বকে সৃষ্টি করব। এই পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের সুন্দর কথাগুলোকে এখানে আজ আমাদের গ্রহণ করতে কোন বাধা নেই। তিনি বলেছেন :
তারায় তারায় দীপ্তি শিখায়
আগুন জ্বলে
নিদ্রাবিহীন গগন তলে,
আলোক মাতাল স্বর্গ সভার
মহাঙ্গন
হোথায় ছিল কোন্ যুগে মোর
নিমন্ত্রণ!
কালের সাগর পাড়ি দিয়ে এলাম চলে,
নির্দ্রাবিহীন গগন তলে
হেথায় মন্দ-মধুর কানাকানি
জ্বলে-স্থলে,
শ্যামল মাটির ধরা তলে
মাসে মাসে রঙ্গীন ফুলের আলাপন
বনে পথে আঁধার আলোর
আলিঙ্গন॥