কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক, মেনে নেবো: এ আমার ঈদ।
ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন
নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি, কিংবা কিছু নয়;
অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন;
কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী, নিশ্চয়।
স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক,
অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?
কেন দোলে হৃৎপিণ্ড, আমার কি ভয়ের অসুখ?
নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!
আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার
যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।
[স্মৃতির মেঘলাভোর; আমি, দূরগামী]
বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চায় না যেন। একজন কবি কতটা দূরগামী-আধ্যাত্মিক হলে তার আকাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশার মতো শুভ শুক্রবারে পরম করুণাময়ের ডাকে সাড়া দিয়ে লোকান্তরে যেতে পারেন। বিষয়টা মনে হতেই আমার শরীর-মনে অলৌকিক শিহরণ বয়ে যায়। কী সব আশ্চর্যজনক ম্যাজিক দেখিয়ে গেলেন কবি। এক সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা সুন্দর-শুদ্ধ মানুষের সংস্পর্শে-ছায়ায়-নিবিড় সান্নিধ্যে কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর ও তারুণ্যের সোনালি দিনগুলো। দেড় দশকের অধিক সময় ধরে আল মাহমুদ আমাকে এতটা আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আপন করে নিয়েছেন, যেন আমি তাঁর আনন্দ-উচ্ছ্বাস-অশ্রুক্ষরণ থেকে শুরু করে হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানিরও যেন সহযোগী হয়ে উঠেছিলাম। আল মাহমুদ হয়ে উঠেছিলেন আমার বেঁচে থাকা ও অস্তিত্বের অবলম্বন, আমিও ছিলাম অনেকটা তাঁর ভাষায় ‘অন্ধের যষ্ঠি’, জীবন ও সাহিত্যের সহযোগী, সেই সঙ্গে জীবিকার সংস্থানকল্পেরও একজন অনুঘটক। ফলে আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু-আত্মার পরম আত্মীয় এই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে আমার কেমন অনুভূত হচ্ছে, এ বেদনা-শোকের কোন অনুবাদ কিংবা ব্যাখ্যা হয় না। প্রসঙ্গ যখন আল মাহমুদ, হৃদয়টা বিছিয়ে দিলাম কষ্ট করে পড়ে নিন।
কবি লোক থেকে লোকান্তরে যাত্রার পরে প্রয়োজনীয় কিছু ফেসবুক স্ট্যাটাস ছাড়া একটা লাইনও তাকে নিয়ে আমার লেখা সম্ভব হয়নি। অসীম শূন্যতা, হাহাকারে, বেদনায় আমার হৃদয়টা বিদীর্ণ হয়েছে; রক্তক্ষরণ হয়েছে, বাষ্পাচ্ছন্ন চোখে নিজ গৃহে স্বেচ্ছা নির্বাসিত-কারান্তরীণ হয়ে ছিলাম বেশ কয়েক মাস। সে ক্ষরণ দৃশ্যমান হলে রক্তের সাগর নদী বয়ে যেত। কবিকে নিয়ে লিখতে বসে আমার ভেতরটা কতটা পুড়ে যাচ্ছে, কতটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি ঠিক বোঝাতে পারবো না। মনে মনে ভাবি, দেড় বছর আগে পিতাকে হারিয়ে চিরদিনের মতো এতিম হয়ে আমি কতটা ভেঙে পড়েছিলাম? পরে যখন আমাকে ১৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫ মিনিটে সবাইকে ফেসবুক ও গণমাধ্যমে ব্রিফ করে কাব্যপিতা আল মাহমুদের দেহান্তরের দুঃসংবাদ জানাতে হলো, তখন থেকে আমি কেমন করে বেঁচে আছি?
পরদিন শনিবার বাংলা একাডেমিতে অশ্রুসিক্ত শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, প্রেস ক্লাবের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও জানাজা আর বায়তুল মোকাররম মসজিদ ভর্তি হাজারো কবিভক্তের জানাজা শেষে নানান ঘটনা-অভিজ্ঞতার পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি বাদ জোহর কবির প্রথম বিদ্যালয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুল মাঠে তৃতীয় জানাজায় জনস্রোত বয়ে যায়, ফুলে ফুলে ভরে ওঠে কবির কফিনের চারপাশ। এরপর আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার সময় স্বার্থপরের মতো হাসতে হাসতে তিনি একাই কবরের মাটিতে শেষশয্যা পাতছেন; অথচ শেষ জীবনের বড় একটা সময়ে কোথাও গেলে আবিদকে তার লাগবেই।
কাফনের সাদা কাপড়ে আবৃত্ত মাহমুদ ভাইকে অভিমানী মনে আমি যেন বলে উঠলাম, মাহমুদ ভাই, স্মৃতির মেঘলা ভোরে রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে স্বার্থপরের মতো আপনি গেলেন একা একাই; অথচ দীর্ঘ দিনের একরকম ছায়াসঙ্গী হিসেবে অনিবার্যভাবে আমারো কথা ছিলো আপনার সঙ্গে যাবার। মৃত্যুর ফেরেস্তার তাকিদে বিষয়টিকে ঈদ মেনে নিয়ে আপনি নিজেই যখন চিরদিনের মতো প্রস্থান করলেন, তখন ‘অপ্রস্তুত এলোমেলো’ এই আমার আর কী-ই বা করার আছে? আমি ছিলাম নাকি আপনার শেষ বয়সের অন্ধের যষ্ঠি, তাই আমার অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন; আমি পিতৃ-বন্ধু-সঙ্গী-প্রেমিক হারানোর যন্ত্রণায় ফোঁপাচ্ছি আর আপনার অদৃশ্য আত্মার তরী তখন পৌঁছে গেছে জান্নাতুল ফেরদৌসে-জগতের প্রতিপালকের কাছে। স্মৃতির মেঘলাভোরে ডাহুকটার শেষ ডাক শোনার পর মনে হলো আপনি চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ। শোকার্ত স্বজন আমরা হৃৎপিণ্ড দুলিয়ে আপনার কবরের মাটি ছুঁয়ে মিনহা খালাকনাকুম….পড়ে অনুভব করি সেই স্বর্গীয় শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়। আপনার যাওয়ার কালে ঠিক ঠিক খোলা ছিলো খোদার আরশের জানালা দুয়ার, এবং আধ্যাত্মিক আশ্চর্যে সে ক্ষণ-
স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার….
কেমন করে প্রথমে আল মাহমুদের প্রেমে পড়লাম? শৈশবে, ক্লাস টুতে প্রথমে পাঠ্যবই থেকে তুমুল মুগ্ধতা শুরু। পরে তারুণ্যব্যাপী আল মাহমুদের ফিকশনের একটা ক্যারেক্টার হিসেবে নিজেকে নিরন্তর বয়ে নিয়ে গিয়েছি। অদ্ভুত? হাস্যকর? জীবনটা রূপকথা, কল্পনা ও ড্রাম্যাটিক লাগে খুব আমার কাছে। এটা সম্ভবত একটা নিরাময়হীন প্রাণঘাতী অসুখ, এ যন্ত্রণার বিরাম নাই, উপশম নাই। আছে কেবল ঘোরলাগা ভালোবাসা, স্বপ্নিল স্বর্গীয় মুগ্ধতা, আর অলীক ফুলের ভুবনভোলা সৌরভ। বিশ্বনাগরিক হিসেবে আবহমান বাংলার গৌরব, প্রেরণা, ঐতিহ্য তথাপি লাল-সবুজ পতাকা, মা-মৃত্তিকা আর মাতৃভূমিকে বুকে বয়ে বেড়াবার ইচ্ছা জেগেছিলো স্মৃতির শৈশবে; তাই ছোট্ট বুকে আল মাহমুদকে বয়ে বেড়িয়েছি সীমাহীন স্পর্ধায়…
কতো কতো স্মৃতি, ঘটনা ও দৃশ্যপট মনে পড়ছে। কোনটা রেখে কোনটা বলবো। তাকে হারানোর পর বিরামহীন এ শূন্যতা, যন্ত্রণা, বিষণ্নতা ও একাকিত্ব বলে বোঝাবার নয়। টানা দেড় দশক ধরে সম্ভবত তাঁর সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি সময় কেটেছে। জীবন ও সাহিত্যকীর্তির একরকম ছায়াসঙ্গী হওয়ায় অব্যক্ত কথা, বিরল স্মৃতি আর নিষ্পাপ অশ্রুলিপির অদ্ভুত প্রত্যক্ষদর্শী। কৈশোরকাল থেকে আমাকে মারাত্মক রকম প্রশ্রয় দিয়েছেন, ভালোবেসেছেন অকৃপণভাবে এবং নিজের বিষয় আশয়গুলোতে একজন সাধারণ তরুণকে যে ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দিয়ে রেখেছিলেন, তা যেন আমার প্রাপ্যই ছিলো, ছিলো ভালোবাসার অনিবার্য অধিকার, যা আমাকে অর্জন করে নিতে হয়েছে। আর কবিকে দেখভাল করার এই যে দায়িত্ব, এই চাকরিটা আমাকে কেউ দেয়নি, নিজেই নিজেকে চাকরি দিয়েছি অবৈতনিক। কবির সহলেখক হিসেবে যে অর্থপ্রাপ্তি একবারেই ঘটেনি, তা বলি কি করে? কিন্তু এই যে নিঃস্বার্থ প্রেম, আমি আসলে আল মাহমুদের কে? দীর্ঘদিনের সহলেখক? বন্ধু? হৃদয় ছুঁয়ে থাকা সতীর্থ? সাহিত্যের কাব্যপুত্র? সার্বিক বিষয় দেখাশোনা করা সচিব? আত্মার অস্থিমজ্জা ছুঁয়ে থাকা সুহৃদ? নাকি নিতান্তই ভক্ত-পাঠক? জানি না।
কবির কথা বলতে গিয়ে নিজেকে জাহির করার ধৃষ্টতা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি আসলে কবি এবং তার সাহিত্যকে নিজের ভেতরে এতটা ধারণ ও লালন করতে পেরেছিলাম যে মাঝে মাঝে মনে হয় আমিও কবির অনিবার্য এক অংশ। আমার সামান্য সামর্থ্যে কিংবদন্তির ব্যথায় ডুকরে কেঁদে উঠেছি, তার খুশিতে আনন্দিত হয়েছি, তাকে নিয়ে অপপ্রচার-অবজ্ঞ-উপেক্ষায় অশান্ত হয়ে উঠেছি, তার সাফল্য-অর্জনে গৌরববোধ করেছি, তার দিকে বরাবর ধেয়ে আসা বিভাজিত রাজনৈতিক নষ্ট নদীর স্রোত রুখতে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে সুন্দরকে লক্ষ্য করে তেড়ে আসা মিথ্যাচার, কুৎসা ও নিন্দার তীরকে নিজের বুকে বিদ্ধ করে ঘোষণা করি, পরাজিত হয় না কবিরা। ফলে, জীবনব্যাপী আল মাহমুদের পাশে থাকা প্রিয় কবি আসাদ চৌধুরীর মতো আমারো মনে হয়, ‘আল মাহমুদকে যারা ভালোবাসেন, প্রকারান্তরে তারা যেন বাংলাভাষা-সাহিত্য তথাপি দেশ, মা-মাটি আর মানুষকেই ভালোবাসেন’।
কী অপরিসীম স্পর্ধায় আল মাহমুদ স্বাধীন বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সমান্তরালে নিয়ে এসেছিলেন নিজেকে। তিনি দ্রষ্টা ও স্রষ্টা হওয়ায় সহজেই বলা যায় বাংলা, বাঙালি-মানুষ, ভাষা ও সাহিত্য এবং আল মাহমুদ এক তথা অবিভাজ্য সত্তা। দুই বাংলার অপরাজেয় এই প্রবাদপুরুষ ভাঙা সুটকেস বগলদাবা করে রাজধানীতে এসেছিলেন; তারপর তিনি সেই সুটকেস খুলে একের পর এক দেখিয়েছেন বাংলাদেশের নদ-নদী, খালবিল, পাহাড়-অরণ্য, খড়ের গম্বুজ, নারী-নিসর্গ, মক্তবের চুলখোলা আয়েশা আক্তার, গাছের ডালের ফাঁকে আটকে যাওয়া আধখানা চাঁদ, এক কথায় সমগ্র বাংলাদেশ। অনিবার্য স্পর্ধায় একটি সত্যবচন প্রকাশ জরুরি; আমি এই মা, মাটি-মৃত্তিকা, লাল-সবুজ পতাকা, বায়ান্নো, একাত্তর আর বঙ্গবন্ধুর কাছে যেমন ঋণী, তেমন অপরিসীম ঋণ রয়েছে আমার আল মাহমুদের কাছে। সে ঋণ আমাকে সম্ভবত জীবনব্যাপী পরিশোধ করতে হবে। বায়ান্নোর সময় ফেরারি ভাষাসৈনিক বা একাত্তরের মুজিবনগর সরকারের স্টাফ একইসঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কবি আল মাহমুদ নিজেই যেন একটি স্বতন্ত্র শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, একটি স্বপ্ন-স্বাধীন বাংলাদেশ। টিকটিকির রাজ্যে আল মাহমুদ ছিলেন যেন ছিলেন এক ডাইনোসর। দিন দিন বিষয়টি আরো সত্য হয়ে উঠবে। যে কবি বলতে পারেন, ‘পৃথিবীতে যত গোলাপ ফুল ফোটে তার লাল বর্ণ আমাদের রক্ত, তার সুগন্ধ আমাদের নিঃশ্বাসবায়ু।’ ঠিক তার কণ্ঠেই মানায় এ আশাবাদ, ‘আমাদের মুখাবয়বে আগামী ঊষার উদয়কালের নরম আলোর ঝলকানি।’
আল মাহমুদের সাহিত্য শ্রুতিলিখন করতে গিয়ে লেখা আদায়ে কত যে কৌশল নিতে হতো, উনিয়ে বিনিয়ে গল্প-কিচ্ছা শোনাতে হতো। একবার তার একটা কবিতা শোনানোর পর বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পর শান্ত হয়ে বললেন, শোন মিয়া তোমার জন্য একটা পাত্রী দেখেছি… এবার বিয়ে করো। আর সে কী হাসি। শিশুর মতো নিষ্পাপ কোমল সারল্যে ভরা মুখ। মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে ভালোবাসার পাশপাশি মান-অভিমানও যে ছিল না, তা নয়। চিন্তার সমর্থক হলেও ছিলো বেশ কিছু ভাবনার সঙ্গে স্পষ্ট-অস্পষ্ট মতপার্থক্য যে ছিলো না, কেমনে বলি? প্রবল প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি ঝগড়া, তর্ক ও কিছু মনোমালিন্য ছিলো কি? একবার এয়ারপোর্টে তাকে দেরিতে পৌঁছে দেয়ার ফলে প্লেন মিস করায় ভয়াবহ বকেছিলেন আমাকে, বলেছেন, তুমি এখন আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও। আমি নিজেকে সামলে বললাম, তাহলে আপনি বাসায় যাবেন কার সাথে মাহমুদ ভাই! সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চেয়েছি। আরেকবার আমাকে দেয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করে একটি ‘বিতর্কিত পদক’ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন জীবনব্যাপী বারবার ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল’ হওয়া মাহমুদ ভাই। আমি সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিলে তিনিও শিশুর মতো কেঁদে উঠে লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি পা ছুঁয়ে সালাম করেছি। ২০১৩ সালের দিকে একবার রাগ করে তার বাসায় তিন মাস না যাওয়ায় কবিবন্ধু আহমদ সাইফকে সঙ্গে নিয়ে আমার রামপুরা বাসায় তিনি হাজির হয়েছিলেন। আমার আম্মাতো ভীষণ অবাক…এতো বড় মানুষ তার বাসায়! কী দেবেন, কী খাওয়াবেন মহা অস্থির! এইতো ছিলেন মাহমুদ ভাই। সবাই কবিকে যেভাবে দেখতেন মায়াবী পর্দার অন্তরালে আমি আসলে ভিন্ন এক মাহমুদ ভাইকে দেখেছি, যিনি ছিলেন শিশুর মতো সরল একই সঙ্গে প্রেমময় ও আন্তরিক।
আজকে যখন ‘পোকায় ধরেছে আজ এ দেশের ললিত বিবেকে, মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পণ্ডিত সমাজ’ ঠিক তখন দেশহীন শেষ দশার কবির মতো, আকাশের দিকে আজান হেঁকে বাতাসে বিলীন হয়ে গেলেন; কবি। ফেলে গেলে বিপুল সাহিত্যকীর্তি, রত্ন-রাজি। তার সুরভিত জীবন ও জোসনামাখা সাহিত্য দর্শন অনুসরণ করলে আমাদের দেশ, গণমানুষের মনোজগৎ অনেক আলোকিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
২০১১ সালে প্রথমা থেকে প্রকাশিত কবির কাব্যগ্রন্থ ‘তোমার রক্তে তোমার গন্ধে’ আমাকে উৎসর্গ করার পর একাধিক বইয়ে আমার কথা লিখেছেন। আমিতো শুধু বই নয় শুধু, একটা তারুণ্য এমনকি জীবনটাই কবিকে ভালোবেসে উৎসর্গ করতে রাজি ছিলাম। আমার নিজের আঙুলের দিকে বিস্ময় নিয়ে আমি তাকাই মাঝে মধ্যে, কারণ এ আঙুল ছিলো আল মাহমুদের শেষ সময়ের কলম। ফলে আমার সময়টাই কেটেছে আল মাহমুদময়। রবীন্দ্র, নজরুল, জসীম, জীবনানন্দ বা ফররুখকে আমরা দেখিনি, নিবিড়ভাবে দেখেছি আল মাহমুদকে-এই পাওয়াটাকে আমি পরম পাওয়া হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। শুরুর দিকে প্রিয় কবি জাকির আবু জাফরের মাধ্যমে মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়েছিলো। তাঁর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাই। জানি না, আল মাহমুদের ব্যাপারে আমার আবেগ, পাগলামী অনেক বেশি কি-না। বলা যায়, আল মাহমুদ আমার হৃৎপিণ্ডের অংশ।
শিক্ষাজীবনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে যাকে পাঠ করে আমাকে শিক্ষিত হতে হলো, তাঁর অমূল্য সাহিত্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন নিয়ে একজীবন কাজ করলে খুব বেশি কিছু হবে? আল মাহমুদ থেকে আমার আসলে মুক্তি নাই, মুক্তি পেতে চাইও না। আরো নিমজ্জিত হতে চাই। আমি একবার ফেসবুকে মজা করে লিখেছিলাম, ‘আওয়ামী লীগ, আল মাহমুদ ও আবিদ আজম- এই তিন ‘আ’ থেকে সহসা তোমার মুক্তি নাই আয়েশা আক্তার…’।
আল মাহমুদ আমার কাছে হাজার ফুলের সৌরভপূর্ণ এক গন্ধবণিক, যে ঘ্রাণ আমি জীবনব্যাপী নিতে চাই। আমার জন্য মাহমুদ ভাইয়ের লেখা একটা কবিতার উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ‘আবিদ আজমের জন্য একটি কবিতা’য় ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ‘বন্ধুবরেষু’ উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন :
এই পৃথিবীর সড়ক-সুড়ং পাহাড় ও পর্বত
পেরিয়ে এসে হাঁটছি আজো হাঁটাই আমার কাজ
কেউ বলেনি থামতে আমায়, ঘামতে ঘামতে যাই
কোথায় এলাম কী যে পেলাম মুষ্টিবদ্ধ হাত।
খুলে দেখি আয়ুর রেখা আর কিছুতো নাই
তবু কারো মুখের রেখা হঠাৎ দেখা
চমকে যাওয়ার মতো,
মনে হলো এইতো চিনি এইতো প্রিয়
মুখখানি কি তার?
এইতো পেলাম বন্ধু আমার প্রাণের সীমানায়-
কী নাম তোমার, কোথায় বাড়ি কোন দেশে যে বাস,
তোমার সাথে দেখা হলো ‘এটা ফাগুন মাস’
মনে রেখো স্মৃতির ভেতর ভীতির শেষে আছে দূর্বাঘাস।
বসো আমার পাশে তুমি
বাক্য বলো ইচ্ছা মতো
কিচ্ছা খুলে দাও,
হৃদয়টা জুড়াও।
আমার কথায় তোমার মুখে রক্ত লাজের রেখা,
এইতো হলো দেখা ।
তুমি যুবক-বৃদ্ধ আমি আমার তো শেষ আছে
তোমার শুরু, পাখির শব্দে উড়াল গাছে গাছে
আকাশে মেঘ বাতাসে বেগ পুলক জাগে মনে
বসো আমার পাশে তুমি ঘাসেরই অঙ্গনে।
সামনে তেপান্তর
ঝড় উঠেছে মনের মাঝে বক্ষ থরথর
এরই নামতো আত্মীয়তা আত্মহারা পাখি
উড়াল দিয়ে ডাক দিয়েছে হাঁক দিয়েছে বনে-
আমরা দু’জন পাশাপাশি জগদ্বাসী বলছে প্রেমিক পুরুষ,
এইতো দেখ হাত মিলিয়ে কাঁধ মিলিয়ে
আসছে কাছাকাছি।
সামনে তোরণ-দ্বার,
এবার হবো পার।
যেতে যেতেই দুঃখ ও শোক আছড়ে পড়ুক ভবিষ্যতের গায়ে,
আমরা এখন চলছি পায়ে পায়ে।
আমরা দু’জন দূরের যাত্রী মায়ার সড়ক ধরে
যাবো কোন শহরে?
শহর শহর শহর
পায়ে পড়ুক কহর
আমরা তবু ছাড়বো নাতো মানুষের আঙিনা
ভালোবাসার বীণা
কোথায় যেন বাজছে দূরে ঘুরে ঘুরে, সেই
এরতো কোন নাই সীমানা আপন ও পর নেই।
আমরা দু’জন শখার মতো বুকের ক্ষত
লুকিয়ে বাস করি,
সাপকে ভাবি দড়ি
আবার দড়িকে সাপ করি।
আমরা দোহে পরম সুখে হাত মিলিয়ে যাই,
আমাদের তো অতীতও নেই কেবল গতি
যতিচিহ্ন ছাড়া,
বলো, আছে কার সে সাহস দেবে কে পাহারা?
ছাড়িয়ে যাবো সব,
ভালবাসার মেঘ ডেকেছে বর্ষণের উৎসব।
(কাব্যগ্রন্থ : তোমার গন্ধে ফুল ফুটেছে)
নাহ, আর কুলুচ্ছে না; পারছি না কিছু লিখতে। কী সব এলোমেলো বকলাম কিছুই মনে ধরে না। অশান্ত মনটা শান্ত না হলে কি গুছিয়ে কিছু লেখা যায়? কবিবিহীন তাঁর প্রথম জন্মদিনে ১১ জুলাই স্মরণ করা হবে আল মাহমুদকে। মহাকালের এই পথযাত্রীর কীর্তি সৃজনকর্ম, আনন্দ ও অশুলিপির যে সাক্ষী হতে পারলাম, হয়তো এটা একজন তরুণের জীবনের এক শ্রেষ্ঠতম অর্জন। কবি প্রয়াত হবার আগে ও পরে কিছু অলৌকিক বিষয় প্রত্যক্ষ করে বারবার আমি কেঁদেছি। পঞ্চাশের দশকে গোলাপ ফুল আঁকা একটা টিনের সুটকেস নিয়ে ঢাকায় আসা ত্রিকালদর্শী আল মাহমুদ ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় নিজ ভূমিতে চিরজনমের মতো যখন ফিরলেন তখনও তাঁর কফিনে সেঁটে দেওয়া ছিলো একটা গোলাপ ফুল। আমি অনেক অনুসন্ধান করেও জানতে পারিনি, কফিনে এ কাঠগোলাপ কোথা থেকে এলো! প্রবল বর্ষণের দিনে কবির জন্ম হয়েছিলো, কবি যেদিন মাটিতে চিরশয্যা পাতবেন, সেদিন সকালে ছিল তুমুল বৃষ্টি। প্রেম, প্রকৃতি ও প্রার্থনার কবি আল মাহমুদের স্পিরিচুয়ালিটির দ্বারা আমি অনেক প্রাণিত। তার প্রতি প্রবল পক্ষপাতের মূলেও কি তাই? আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার, প্রাণপ্রিয় বন্ধু আল মাহমুদের উদ্দেশে শুধু একটি কথা, লোক থেকে লোকান্তরিত হে রাষ্ট্রের গন্ধবণিক, আপনি কেন আমার স্বাভাবিক জীবনটা বিস্ময়করভাবে বদলে দিলেন? হে বরেণ্য বাংলাদেশ, আপনাকে অযুত সালাম। প্রাণহীন হলেও আপনি পৃথিবীব্যাপী বাংলাভাষীদের প্রাণে প্রাণে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে আছেন। আপনার হৃদয়ে হৃদয় মিলিয়ে আমি আবার কবে কবিতা শ্রুতিলিখন করবো? হাজার বছরের পুণ্যের ফলে যে কবির জন্ম হয়, তাঁর মৃত্যু নেই, সমাপ্তি নেই।