
জন্ম: ২৬ মার্চ ১৯২০, মৃত্যু: ২৫ জুলাই ২০০২
বাংলা কবিতায় সৈয়দ আলী আহসানের (১৯২০-২০০২) উদ্ভাসন ছিলো কিরণসঞ্চারী। কিন্তু সেই কিরণে ছিলো না দাহের প্রাখর্য, ছিলো রমণীয় মাধুর্য। তার স্নিগ্ধ আলোয় ছন্দময় হয়ে উঠলো দিগন্তের বিস্তার। তার সপ্রাণ তরঙ্গে সঙ্গীত হয়ে উঠলো হাওয়ার স্বনন। আলোর পঙক্তি থেকে জীবন্ত হয়ে উঠলো নন্দনের পাখি। সে বিস্তার করলো বিশাল ডানা। তার ডানার প্রশস্ততা স্পর্শ করলো আমাদের সুউচ্চ আকাশ। তার পালকগুলো বহুবর্ণিল ওজস্বীতায় প্রোজ্জ্বল। তার গানের শব্দে শব্দে বৈভব। সুরে সুরে মোহময়তা। বস্তুত সৈয়দ আলী আহসানের শিল্পের পাখি স্বকীয় সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে যখন ডানা মেলে, তখন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আমাদের শ্লাঘার আকাশ। প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো দুলে ওঠে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের একটি প্রখর শিল্পান্বেষা। যে শিল্পান্বেষা তার সমকালকে শুধু আলোড়িত করেনি, বরং গোটা বাংলাসাহিত্যের ক্যানভাসে স্বতন্ত্র মানচিত্র রচনা করেছে। এ মানচিত্র জুড়ে বিরাজ করছে প্রশান্তি, প্রসন্নতা আর নির্মল বাতাসের আদর। বস্তুত শিল্পসাহিত্যের শীর্ষচারী পাণ্ডিত্য ও সর্বত্রগামী কুশলতার যে নজির সৈয়দ আলী আহসানে, তার তুলনা যে কোনো ভাষা ও সাহিত্যে খুবই সংখ্যাস্বল্প।
চিত্তাকর্ষক শিল্পযাত্রা, কর্মবীরত্বের দীপ্তি, নিজস্ব নির্মাণের অভিজাত্য, সৈয়দ আলী আহসানে যে সুখকর সাবলীলতায় জীবন্ত, তা আমাদের নন্দনতাত্ত্বিক ইতিহাসে এক অসাধারণ অধ্যায়। এক অবিশ্বাস্য, অনির্বচনীয় সুরের মনোহারিত্বে যখন তার বিশালতা বাঙময় হলো, তখনই বোঝা গেল এই ধ্বনির কোনো পূর্বসূরিতা নেই। আজ তার উত্থানের অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত। সেই সুরের সুরভি আমাদের এখনো মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। এখনো আমাদের আত্মায় সঞ্চায়িত তার ঐশ্বর্যিক পরিতৃপ্তি। কিন্তু তার উত্তরসূরিতা আজও দুর্লক্ষ্য। এই হচ্ছে আলী আহসানের সার্বভৌম পরাক্রম। এই হচ্ছে তার স্বকীয় শৈলীর শক্তি। এই হচ্ছে তার শৈর্যের একান্ততা। এই পরাক্রম, শৈলী আর একান্ততা নিয়ে সৈয়দ আলী আহসান উদ্ভাসিত ‘প্রত্যুষের সমারোহে’ ‘এক মুঠো স্বর্গে’, কিংবা ‘সুপ্তিমগ্ন রাত্রির বিবরে’ যেখানে ‘সরীসৃপ নদী দুরাশার অরণ্যে নেমেছে।’
সৈয়দ আলী আহসান সেই সব ভাগ্যবান কবির একজন, যাদের একটি কবিতাই গোটা কবিসত্তাকে চিনিয়ে দেয়। বহুবিখ্যাত কবিতা তাদের থাকলেও একটি কবিতা হয়ে ওঠে এমন, যা তাৎপর্যে, ঋদ্ধতায়, জনপ্রিয়তায় এবং সমুন্নতিতে হয়ে ওঠে কবির উৎকর্ষের আয়না। যাতে চোখ রাখলেই দেখা যায় কবির সদর-অন্দর। বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের যেমন ‘বলাকা’, কাজী নজরুল ইসলামের যেমন ‘বিদ্রোহী’, জসীম উদ্দীনের যেমন ‘কবর’, ফররুখ আহমদের যেমন ‘ডাহুক’, সৈয়দ আলী আহসানের তেমনি ‘আমার পূর্ববাংলা’।
এ কবিতার অন্তর্লোকে আছে সৈয়দ আলী আহসানের কবিচিত্তের চাবি। এ কবিতা প্রকৃতিলগ্নতা ও মৃত্তিকামগ্নতা স্বদেশের ভালোবাসায় জীবন্ত। সেই ভালোবাসা উচ্চকিত মাতৃভূমি ও নিসর্গের অমোঘ আকর্ষণে। এ আকর্ষণ সৈয়দ আলী আহসানের কবিতায় একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে এ ধারাবাহিকতা স্পষ্ট না হলেও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে তা বিশেষ অনুপমায় হয় বিকশিত। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম ‘উচ্চারণ’। স্বদেশ ও নিসর্গের প্রতি সম্মোহনের ললিত পঙক্তিমালা উচ্চারণের প্রধান অলঙ্কার। কবি এখানে নিজেকে প্রকাশ করেন অভিনব ব্যঞ্জনায়। নিজের ধ্রুপদী, চালময় শৈল্পিক সংবেদনের শিষ্টতা এবং প্রবহমানতার নিজস্ব শৈলী দিয়ে বয়ন করেন কবিতাশরীর। সুগভীর ও বিচিত্র কল্লোলে আমাদের সমৃদ্ধ করেন। তখনই তার ধ্বনি শাশ্বতের ছোঁয়ায় সঞ্জীবিত আনন্দলোকের আশ্চর্য জীবনীশক্তি দিয়ে আকর্ষিত করে কাব্যবোদ্ধাদের মন।
তখনই তিনি স্নিগ্ধ স্বদেশের জন্য নিজের ঐকান্তিকতাকে ব্যক্ত করেন আশ্চর্য আবেগে। উচ্চারণে ‘সিন্ধুর মরু মধ্যে’ কবিতায় স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতিরিক্ত মরুর প্রতি কোনো মোহ নিজের মধ্যে লক্ষ্য করছেন না। বরং সেখানে ‘প্রতিদিন তাপদগ্ধ মধ্যাহ্ন’ এবং ‘রুক্ষতার হাহাশ্বাসে সিন্ধুর মাটিতে/ রেণু রেণু ধ্বনিগুলি কোয়াশা ছড়ায়।’ অতএব এর বিপরীতে স্বপ্নের তোলপাড়ে কম্পমান সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতির সজীবতায় বিধৌত শস্যশ্যামল পূর্ববঙ্গের জন্য সৃষ্টি হয়েছে হৃদয়ের টান। বাংলাদেশ তখনো জন্ম নেয়নি। তখনো এদেশটি পূর্বপাকিস্তান। কিন্তু তখনো জন্ম না নেয়া বাংলাদেশের প্রতি আবেগের শিহরণ আর প্রাণের অবিরল আকুতি কবির কবিতায়। এ আবেগ ও আকুতি যেন যেনো বাংলাদেশের গণজীবনের গতিধারা। এদেশের মানসিক ব্যাকুলতা যেনো এ কবিতায় বাঙময়। না, মরুভূমিতে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার সজীবতা পাওয়া যাচ্ছে না। এ মরুভূমিই তো পাকিস্তান।
পাকিস্তান! ‘সিন্ধুর মরু!’ এখানে আত্মার কোনো তৃপ্তি নেই। স্বস্তির কোনো নিবাস নেই। প্রশান্তির কোনো আশ্বাস নেই। আছে হৃদয় চৌচির করা রোদের স্বৈরাচার। আছে অসহনীয় গনগনে দাহন। আছে একরোখা দৃশ্যের বিস্তার। প্রাণ চায় বিপরীত কিছু। প্রাণ চায় সুজলা-সুফলা মাতৃমমতা। প্রাণ চায় জলের স্নেহ। প্রাণ চায় তৃপ্তির সরোবর। প্রাণ চায় স্নিগ্ধ আনন্দের স্বস্তিময় দিগন্ত। রোদে পুড়া প্রকট প্রান্তর নয়, বরং ‘একগুচ্ছ স্নিগ্ধ অন্ধকারের তমাল।’ সে জন্যই পূর্ব বাংলা। সে জন্যই মাতৃভূমি। এই যে কবির বিতৃষ্ণা ও আকুতি, তা কি শুধু তার? এ অনুভব কি কেবলই কবিচিত্তে উত্তাল? না, কবির এই মর্মধ্বনি যে একটি জাতির হৃদয়ের অনুুবাদ, তা প্রমাণিত হতে বেশি দিন লাগলো না। সৈয়দ আলী আহসান যা আগে- ভাগে উচ্চারণ করেছিলেন, তা সামান্য বিরতি শেষে সারা বাংলাদেশের ধূলি-বালি থেকে উচ্চারিত হতে লাগলো। কবি যে সমাজের সবচে’ অগ্রবর্তী সত্তা, তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। তার চেতনার অগ্রবর্তিতা ও উপলব্ধির দীপ্র জঙ্গমতার স্বাক্ষরে স্বাক্ষরে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইশারা এভাবেই কবিতার আয়নায় উপস্থাপন করেন আলী আহসান।
কবির হৃদয়ের জমিতে ‘এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ অন্ধকারের তমাল’ যে অব্যক্ত আকাক্সক্ষার আঁধার হয়ে জাগ্রত, সে আকাক্সক্ষার উপশম তিনি খুঁজেছেন সারা বিশ্বে। কিন্তু না, মাতৃভূমি ছাড়া সে দৃশ্যের পঙক্তি আর কোনো জমির গায়ে লেখা নেই। তাই মাতৃভূমি যে মুগ্ধতার রক্ত ছড়িয়েছে তার সত্তায়, তা বার বার নড়ে ওঠে। জেগে ওঠে বিশ্বভ্রমণেও। আঙ্কারায় যখন বৃষ্টি ও ঝড়ের বর্ষণ চলছে, তখন তিনি হৃদয়কে পাঠিয়ে দিচ্ছেন স্বদেশে। বলে উঠছেন- ‘আঙ্কারা যেন বাংলাদেশের বৈশাখ অপরাহ্ন/ হৃদয়ের তল থেকে বৃষ্টি এসেছে।’ স্বদেশে তিনি এতোটা মজে থাকেন, ‘সময়ের গভীরে ডুব দিয়ে’ও খুঁজে পান হৃদয়ের মাতৃভূমি।
‘একক সন্ধ্যায় বসন্ত’ সৈয়দ আলী আহসানের পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যে এসে কবির প্রকৃতিমগ্নতা আরো নিবিড়। দেশলগ্নতা আরো প্রগাঢ়। হৃদয়ের মাতৃভূমিতে নিমজ্জন হয়েছে আরো ঐকান্তিক। এখানে তিনি মাতৃভূমির নিসর্গ নিয়ে গর্বস্ফীত চিৎকারে হর্ষিত।
আমার কাছে সুপ্রচুর আকাশ
মুঠোয়ভরা শিমুল ফুলের মতো রোদ
হঠাৎ বাতাসে বাতাসে আনন্দের মতো ঐশ্বর্য
গাছের পাতায় সবুজ রাত্রি
আর নদীতে নদীতে অফুরন্ত বিশ্রামের নীল
উজ্জ্বল লতায় সমর্পিত অনেক গাছ
[কৃষ্ণচূড়া এক/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
নদীতে রূপার ঝিলমিল
মাঠের মতো আনন্দ
[হৃদয় এক/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
জলপাই গাছের নিচে
প্রভূত জ্ঞানী প্রস্তর খণ্ডের মধ্যে
যখন প্রস্রবণ নামে
তখন আমার ধ্বংসপ্রাপ্ত
স্নায়ু ও অস্তিতে রক্ত প্রবাহিত হয়
[ইলিজি/, সমুদ্রেই যাব]
মাঠে একটি গাছ
সবুজ উৎসাহে আলোকিত হয়
একটি সাদা বিড়াল
গাছের গায়ে আঁচড় কাটে
একটি উষ্ণতাপে
প্রাণী ও প্রকৃতি বাঁচতে চায়
আমার লগ্ন তখনো
বুদ্বুদের মতো একটি বিন্দু
অবিনশ্বর শোভার নিকেতনে
আমি একটি ক্ষণকালের ব্যতিক্রম
[বেঁচে থাকা : আমার প্রতিদিনের শব্দ]
মাতৃভূমির ‘ঘাসের অরণ্যে নীল সবুজের অন্তরে প্রভাত’ তিনি দেখেন, আর দেখেন- ‘ফেনপুঞ্জের নীলাভ দীপ্তি তোমার মুকুটে’ ‘প্রগাঢ় সবুজ অনেক ঘনিষ্ঠতায় অন্ধকার হয়েছে’ ‘দৃষ্টি ছুয়ে নীলাঞ্জনের সরোবরের উচ্ছলতায় চেপেছিলো তোমার প্রণয়।’ মাতৃভূমির বিশাল বক্ষে বহুবর্ণিল সৌন্দর্যের ঘনশ্যামলিমা আর আকাশের নীলিমাকে তিনি দেখেছেন মোহনীয় রূপে। একে উপলব্ধি করেছেন তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে, মিশে গিয়ে। তাই তো তিনি বলতে পারেন ‘আমি আনন্দের নীলে নিজেকে জড়িয়েছিলাম।’
কবি মাতৃভূমির নদীর স্রোতে, সমুদ্রের কল্লোলে, আকাশের প্রশান্তিতে, পাহাড়ের অটলতায়, বৃক্ষের শ্যামলিমায়, পাখির গানে, প্রেমাবিষ্ট হৃদয়ের যে উজ্জীবন খুঁজে পেয়েছেন, তাতে তার হৃদয়ের সংসার ‘অজস্র সৌরভের দোলায় হয়ে উঠেছে বসন্ত।’ এই বসন্তের সজ্জাকে তিনি ব্যক্ত করেছেন ছন্দ-নৃত্য-সৌকর্যে। শব্দের রাজকীয় গীতলতায়। সেই গীতির তরঙ্গ চাঁদের আহ্বানে ঝলমল করতে থাকে তার রুচিবৈদগ্ধের অপূর্ব সৈকতে। হৃদয়ের উষ্ণতা সেখানে স্নিগ্ধতা ছড়ায়। দৃশ্যে, বর্ণে, গন্ধে, স্পর্শে জীবন্ত হয়ে ওঠে মননের ফেনপুঞ্জ। কবি তারপর শীতল চাঁদের নিচে একাকী দাঁড়ান আর দেখেন- ‘সমুদ্রের দীপ্ত কল্লোল্লাস, দূরাগত হয়ে যেনো/ রাত্রির বিবরে আজ তুলেছে গুজন’ ‘উজ্জ্বল লতায় সমর্পিত অনেক গাছ’, ‘যেখানে ঘাসের পাতা ঘুমের মতন/ অজস্র পাতার ফাঁকে হৃদয়ের নদী হয়ে চাঁদ নেমে আসে’, ‘আরো ঊর্ধ্বে, আরো দূরে/ সূর্যের রূপার রঙ্গে ঝলমল করিছে প্রহর/ নিম্নে দিকচিহ্নহীন সুপ্তিমগ্ন মেঘের প্রান্তর’, ‘প্রথম রৌদ্রে ঝলমল আমগাছের কচিপাতা/ প্রতি মুহূর্তের বসন্ত হঠাৎ বকুল ফুল।’ ‘তৃপ্তির তীরে ঘুমন্ত হৃদয়’, ‘অনেক অন্ধকার চূড়া বিচ্ছিন্ন আকাশের নিচে/ পৃথিবী মিশেছে বাষ্পের আকাশে।’
মাতৃভূমি তার কাছে অন্ধকারে প্রদীপের মতো এবং মায়াবতী। এই স্বদেশ যখন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের দাঁতের কামড়ে রক্তাক্ত হয়, তখন কবি হয়ে ওঠেন সশস্ত্র যোদ্ধা এবং আহত মৃত্তিকার আর্তনাদ শুনে ক্ষোভে, বেদনায়, ঘৃণায় কবি হয়ে ওঠেন উচ্চকিত। ‘আমার প্রতিদিনের শব্দ’ গ্রন্থে ছড়িয়ে আছে কবির সেই মর্মদাহনের কাব্যকথা। যে অফুরান ভালোবাসায় তিনি স্বদেশের জন্য হৃদয়কে মথিত হতে দেখেন, যে প্রেমের পরিপ্লাবনে মাতৃভূমি ব্যাপ্তিময় হয় তার মর্মে, সেই আচ্ছন্ন দ্রবন ও দগ্ধস্মৃতির অপরূপ- প্রতিকৃতি কবি ফুটিয়ে তুলেছেন ‘অবশেষে ফিরে এলাম’ ‘স্বাধীনতা’ ‘মাটির ধুলা’ ‘মাতৃভূমি’ ‘আমার দেশ’ ইত্যাদি কবিতায়।
কবি অনুভব করতেন তার জগৎকে জীবন্তরূপে। তার জীবনপাঠ বরাবরই ছিলো ব্যতিক্রমী। তিনি জানিয়েছেন অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতিকে তার অনুভবের ধরন। কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় তার কবিতা। ‘আমি চেষ্টা করেছি সমগ্র কবিতাভাবনার মধ্য দিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিচিত্র পরিক্রমাকে উপস্থাপনা করতে; বিশেষ বিশেষ অনুভূতিকে সত্য আর প্রয়োজনীয় করে তোলার ক্ষেত্রে আমার অভিনিবেশ ছিল। আমি একবার চট্টগ্রামের রামগড়ে ঘনবিন্যস্ত বনভূমিতে একটি গাছের অনেক নিচু শাখায় একটি মৌচাক দেখি । মৌচাকটি দেখে মনে হয়েছিল যেন একটি রমণীর মাথার খোঁপা। সবুজ শাড়ির আঁচল ফেলে দিয়ে রমণী যেন পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছে।’ প্রকৃতির রূপকে এভাবে দেখতে পারেন যে কবি, তার পক্ষেই লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে তার নিজ বাসভূমি পূর্ব-বাংলার অপার সৌর্ন্দয বিবরণের কবিতা। এ কবিতায় তিনি অঙ্কন করেন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবয়ব। তুলে ধরেন গণজীবনের সজীবতা। সাথে সাথে নির্মাণ করেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবয়ব।
স্বভূমি, স্বজাতি, স্বইতিহাস ও ঐতিহ্যের বুক থেকে জন্ম নেয় যে চেতনা, তিনি তাকে করে তুলেন দৃশ্যমান রূপক। এ রূপকের অনবরত সম্মিলন ঘটেছে আমার পূর্ব বাংলায়। যা থেকে আমরা পাই মাতৃভূমি ও তার ইতিহাসের মুগ্ধরূপ আর দুগ্ধস্বাদ। ভূমি ও ভূমা এবং সৌন্দর্য ও নিসর্গ চেতনা দেশের অবয়বে বয়ে গেছে ‘আমার পূর্ববাংলা’ কবিতার রসোত্তীর্ণ তিন তরঙ্গ প্রবাহে। এই তরঙ্গের দোলায় বিমুগ্ধ সমীরণ প্রবাহিত হলো। দেশপ্রেমের পুষ্পসম্ভার হলো পূর্ণ বিকশিত। মাতৃভূমি এখানে অমিয় আনন্দে লীলামত্ত। প্রকৃতির দৃশ্যমদে কবি এখানে মদির। প্রকাশের শুদ্ধতা ও বুদ্ধতায় কবিতা এখানে উদ্ভাসিত। বুননের অনন্যতায় কবির আত্মরূপ বিকশিত। এ কবিতা নির্মাণে প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল ছিলো কবির ব্যক্তিচৈতন্য। টান পড়েছে সরাসরি অনুভূতিতে। কবি লিখছেন-
‘আমার পূর্ববাংলা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ অন্ধকারের তমাল
অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায় একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ
সন্ধ্যার উন্মেষের মতো, সরোবরের অতলের মতো
কালো- কেশ মেঘের সঞ্চয়ের মতো
বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি’
…….
‘আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারের অনুরাগ
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সিক্ত নীলাম্বরী
নিকুঞ্জের তমাল কতক-লতায় ঘেরা’
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
এক ঝলক দৃশ্যের মেঘ বয়ে গেলো যেনো। দৃশ্যগুলো প্রাকৃতিক। কিন্তু কবির মনের ভেতর এগুলো নির্মিত। এগুলোকে সাজিয়েছে কবির অভিজ্ঞতা। দেশের ছবিকেই তিনি অঙ্কন করলেন। তবে তার মনের ভেতরে দেশের যে চিত্র তৈরি হয়েছে, সেটা উল্লেখ করলেন। সরাসরি প্রকৃতিকে উল্লেখ করেননি। ফলে বাংলার সৌন্দর্য নিয়ে যেসব কবিতা আমরা পাই, তা থেকে উতরে গিয়ে সম্পূর্ণ স্বনিষ্ঠ ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে এ কবিতা।
কবি তার স্বদেশের ভেতর দু’টি স্রোতধারা প্রত্যক্ষ করেছেন। একটি শান্ত, শীতল আরেকটি উদ্বেলিত। তার ভাষায়-
আমার পূর্ব বাংলা কী আশ্চর্য
শীতল নদী
অনেক শান্ত আবার সহসা
স্ফীত প্রাচুর্যে আনন্দিত
একরাশ কোলাহল অনেকবার
শান্ত শৈথিল্য
আবার অনেকবার স্তিমিত কণ্ঠস্বরের
অনবরত বন্যা
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
মাতৃভূমিকে নদীর সাথে উপমা দিয়ে যে অবিরল জীবনীশক্তির গতিময়তা ও জাতিসত্তার সৃষ্টিশীল প্রবাহকে কবি ব্যক্ত করলেন, নদীর দুই রূপ তার দু’টি দিককে বর্ণনা করছে। এর একদিকে ফাগুন আরেক দিকে আগুন। একদিকে প্রেম ও প্রশান্তি, অপরদিকে আত্মশক্তির উচ্ছল ঢেউ। যার ভেতরে নিহিত আছে স্বাধিকারচেতনার বীজ আর দ্রোহের জ্বালানি। নদীর এই নিরন্তর প্রবাহে কবি হয়েছেন বিস্মিত। একে উচ্চারণ করেছেন- ‘কী আশ্চর্য!’ – এই চমকিত ঘোরে ।
এরপর কবি অঙ্কন করছেন ছবি। বারবার দেখা যাচ্ছে বক আর গাঙশালিক। মাছরাঙাও আছে মাঝে মাঝে, আছে অবিরল কাক আর বাতাসে আন্দোলিত কাশবন। সুর আর ছন্দের মায়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে বৃৃক্ষেরা, তারা স্বচ্ছ, নির্মল। তাদের পাতায় টলমল করছে মুক্তা, ডালে ডালে ফুটছে ছোট ছোট ফুল। তাদের সবুজ হাসিতে আনন্দ ঝরছে। সেই বৃক্ষের পাতায় পাতায় বৃষ্টির শব্দ শুনা যাচ্ছে আর চেতনা ধনাঢ্য হয়ে হয়ে অন্ধকারে প্রদীপের মতো জ্বলে উঠছে। সব কিছুর মর্মে আছে শনপাতার ছাউনির ঘর। যেন আনন্দ ও নির্ভরতার এক টুকরো মাটির দ্বীপ। সমস্ত চিত্রকল্প মিলে তৈরি হচ্ছে যে সামগ্রিকতা আর দৃশ্যসমন্বয়, তা হয়ে উঠছে জলে- সবুজে- প্রেমে একাকার; সুবিশাল প্রতীক; প্রশান্ত মমত্বময় শীতল পূর্ব বাংলার মুখোচ্ছবি।
এই প্রতীকের পাশে আরেকটি নদী, প্রমত্ত, স্রোতোময়। কল্লোলময়ী। নদীর ভেতরের জলধারা যেনো বিস্ফোরণে উন্মুখ। আনন্দ বন্যাকে স্পর্শ করতে চায়। এরই মধ্যে ধরুন নদীতে ভাসলো তুমুল নৌকা। গলুইয়ের উপর বসে গলা ছেড়ে কেউ গান গাইলো। সে গানে কী আছে? কবি জানাচ্ছেন, তাতে আছে- ‘কী আশ্চর্য প্রাণের প্রসার!’ এ হচ্ছে দ্বিতীয় নদীর দৃশ্য। যার গতিশীলতায় অপরিমিত হৃদয়ের বৈকুণ্ঠ। প্রাচুর্য ও উচ্চলতার কলতান।
এই সব কিছু নিয়েই-
আমার পূর্ব বাংলা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ
অন্ধকারের তমাল
অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়
একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
তমাল হচ্ছে কৃষ্ণবর্ণের গাব জাতীয় গাছ। অন্ধকারে এ বৃক্ষ প্রগাঢ় কৃষ্ণবর্ণের অনুভূতি সৃষ্টি করে। সবুজের ছায়ানিবিড় অন্ধকার আর অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায় গড়ে ওঠা প্রশান্তির নিকুঞ্জ- এই হচ্ছে বাংলাদেশ। যেন সবুজ পল্লব আর সজীব লতার ভেতর উচ্ছল হয়ে উঠেছে পূর্ববাংলার অন্তরাত্মা। এখানে যে আত্মিক তৃপ্তি, ঐন্দ্রজালিক সৌন্দর্য আর দৃষ্টির মুগ্ধতা- তা তো এনে দেবেই- ‘সন্ধ্যার উন্মেষের মতো/ সরোবরের অতলের মতো/ কালোকেশ মেঘের সঞ্চয়ের মতো/ বিমুগ্ধবেদনার শান্তি।’
কবি পূর্ববাংলার সৌন্দর্যকে দেখেন বিচিত্র অবয়বে। বর্ষায় সেই সৌন্দর্য লাভ করে ভিন্নমাত্রা। কবির চোখে তা প্রতিভাত হয় বিস্ময়কর দ্যোতনায়। কবি দেখেন ‘বর্ষার আকাশে অলক মেঘ মেতে ওঠে অবাধ ক্রীড়ায়’। বিশাল আকাশের প্রান্ত মাড়িয়ে গাঢ় কালো সেই মেঘের সঞ্চয় যখন দিগন্তে নেমে আসে কিংবা বৃক্ষশ্রেণির মাথায় নেমে আসে, তখন মেঘ আর মেঘ থাকে না, কবির চোখে তা ধরা পড়ে ‘কাকের চোখের মতো কালো চুল এলিয়ে’ দিগন্তে ঢেকে ফেলা নারীর সুরতে। আর বর্ষার বৃষ্টিতে যখন ডুবতে থাকে মাঠ- ঘাট, তখন পানির উপর দাঁড়িয়ে থাকে বৃক্ষ, শস্য আর পদ্মফুল। কবি তখন গোটা বাংলাদেশকে একটি পদ্মফুল হিসেবে দেখেন, যা কিনা পানিতে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অপরূপ সৌন্দর্যের পুলক সৃষ্টি করে। কবি তাই গেয়ে চলেন-
কাকের চোখের মতো কালোচুল
এলিয়ে
পানিতে পা ডুবিয়ে রাঙা উৎপল
যার উপমা
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সিক্ত নীলাম্বরীতে
দেহ ঘিরে
যে দেহের উপমা স্নিগ্ধ তমাল
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
কখনো কবি মাতৃভূমিকে উপলব্ধি করেন ‘অনেক রাত্রে গাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দের মতো’। তিনি দেখেন :
‘স্বচ্ছ নির্মল গাছের পাতায় মুক্তা
ছোট ছোট ফুল যেন অনেক তারা
যেন বনকন্যাদের চোখের পানি
যেন নিটোল নখের উপর শক্তিস্বচ্ছতা’
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
পূর্ববাংলাকে তিনি দেখেছেন ‘অন্ধকারের অনুরাগ’ হিসেবে। অভিধা দিয়েছেন ‘হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সিক্ত নীলাম্বরী।’ আর এর মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার প্রাচীন গরিমাময় আখ্যানকে এনে উদ্বেল আবেগের জানালা খোলে দেন। পাঠককে তিনি পাঠিয়ে দেন বৈষ্ণব কবিতায়। পাঠক যেন স্মরণ করেন বর্ষার রাতে রাধার বিরহের বেদনা ও প্রেমমত্ততা।
প্রবল বর্ষণময় রাতে বিরহ-বিহ্বল রাধা নীল শাড়ি পরে অন্ধকার সাঁতরে প্রেমিকের উদ্দেশ্যে অভিসারে যেতেন। কৃষ্ণ তার প্রেমিক। যাত্রা পথে রাধা হতেন ভিজে একাকার। তার জলসিক্ত শরীর, তার ভিজে কাপড় কৃষ্ণের মনে সৃষ্টি করতো প্রেমের জোয়ার। কৃষ্ণকে যেভাবে সিক্ত রাধা আবেগে মথিত করতো, মুগ্ধতায় সিক্ত করতো, পূর্ববাংলার প্রকৃতি কবিকেও তেমনি গভীর অনুরাগে করে উজ্জীবিত। রাধার বিরহের যে দশটি দশা, কবি তার মাতৃভূমির প্রেমে মজে গিয়ে এদেশের মানুষের ভাবাবেগের বৈচিত্র্যে, জীবনযাত্রার বহুমাত্রিকতায় বিরহ বেদনার সেই সব দশা উদযাপন করেন। কবির অস্তিত্বের গভীর থেকে তাই আওয়াজ ওঠে- ‘কত দশা বিরহিনীর এক দুই তিন দশটি/ এখানে এস্থ আকুলতায় চিরকাল অভিসার।’
একবার কৃষ্ণের অনুভূতিকে স্পর্শ করেন কবি, আরেকবার মিশে যান মহাকবি কালিদাসের অভিজ্ঞতায়। নবমেঘের সঞ্চারে উৎফুল্ল নারী কেশ এলায়িত করে আকাশের দিকে তাকিয়ে যে সুস্বাদু শিহরণময় মুহূর্ত উদযাপন করে, কালিদাস মেঘদূতে তার বিবরণ দিয়েছেন। আলী আহসান সেই মুগ্ধতার মুহূর্তগুলো কেন প্রদক্ষিণ করবেন না? তিনি তাই অতিক্রম করেন সেই অভিজ্ঞতা আর আমাদের শুনান সেই ধারাভাষ্য :
নিকুঞ্জের তমাল কনকলতায় ঘেরা
কবরী এলো করে আকাশ দেখার
মুহূর্ত
অশেষ অনুভব নিয়ে
পুলকিত সচ্ছলতা’
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
এসব নিয়েই কবির পূর্ববাংলা ‘অন্ধকার আকাশের চেতনার মত।’ শুধু কি আকাশের চেতনার মতো? না। সে চেতনা বহু বৈচিত্র্যে শিহরিত। কখনো সেই চেতনা ‘অবলুপ্তির’ কখনো ‘কালো চোখের তন্দ্রা’ কখনো ‘হঠাৎ জাগরিত বর্ম’। কিন্তু সময়ে সময়ে যতই বৈচিত্র্য আসুক, তার চিরকালীন চরিত্র আলাদা। কবির চোখে তা ‘চিরকাল অনেক গন্ধ, শব্দ এবং/ চোখ চেয়ে দেখার কথার ভরপুর।’
আমার পূর্ব বাংলায় সৈয়দ আলী আহসান এক সঙ্গে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক। আন্তর্জাতিক জগৎ থেকে আহরিত তার পরিশীলিত রুচির স্পর্শ দিয়ে দেশের আত্মার ভেতর তিনি নিজের আত্মার উৎসারণ ঘটিয়েছেন। বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা মাতৃভূমির বিশেষত্বে ও বিশিষ্টতায় তাকে যেভাবে আস্থাবান করেছে, তেমনি অনিবার্য তাৎপর্যে মাতৃপ্রেমকে করেছে হিন্দোলিত। কতোবার তিনি ঘুরেছেন পৃথিবীর কতো প্রান্তে। সেই সব জায়গায় তিনি দেখেছেন জীবনকে। প্রকৃতিকে, সুন্দরের বৈচিত্র্যকে। কিন্তু ১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে এবং ১৯৬১ও ৬২ সালে পূর্ববাংলার অভ্যন্তরে ব্যাপকভাবে ভ্রমণ তাকে দেয় আলাদা স্বাদ। আলাদা অনুভব।
বিদেশ থেকে সদ্য প্রত্যাগত কবির কাছে মাতৃভূমির সকল দৃশ্য অপূর্ব লেগেছিলো। সেই অপূর্ব স্বাদের অনুভূতিগুলোই উচ্চারিত হয়েছে কবির বাকবৈদগ্ধে। শব্দতরঙ্গের বেলাভূমিতে, রুচি ও শৈলীর স্বাক্ষরে তা হয়ে উঠেছে মাতৃভূমির অনন্য কাব্যগাঁথা।
কবি মাতৃভূমিকে দেখেছেন একদিকে, অপরদিকে তার মানসলোকে ভেসে উঠেছে বিভি২ন্ন দেশের ছায়াছবি। ফলে কবির চিত্তে- ‘ঘর আর বিদেশ আঙিনা/ আকুলতায় একাকার’ হয়ে উঠেছে। পাথর, গাছ, বরফ, ধোয়াসমুদ্র, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, তটভূমি, বরফের ওপর বিচিত্র রঙের খেলা, ব্যাভেরিয়ার অরণ্যের বিস্তারে সবুজের সমারোহ- এরা এতদিন শিথিল বিশ্রামের মতো কবিকে রেখেছিলো আচ্ছন্ন করে। কিন্তু মাতৃভূমিতে ফিরে এসে তিনি লক্ষ্য করলেন তার পৃথিবী আরো সুন্দর, আরো রূপময়ী।
কবির উচ্চারণ-
হঠাৎ নতুন প্রত্যাগত আমার কাছে
বন্য উচ্ছলতায় সবুজের ঔদার্য
এখানে আমার পৃথিবী অনেক রূপময়ী
এখানে নদীর মতো এক দেশ
শান্ত স্ফীত কল্লোলময়ী
বিচিত্র রূপিণী অনেক বর্ণের রেখাঙ্কন
এ আমার পূর্ব বাংলা
যার উপমা একটি শান্ত শীতল নদী
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
সৈয়দ আলী আহসানের মাতৃভূমি, জীবনের বৈচিত্র্যময় এক নদী। যার ধারে অনেক বর্ণের শিল্পময় সম্পদ। যেখানে ‘এস্থ আকুলতায় চিরকাল অভিসার।’ সেই অভিসারের মুগ্ধতা নিয়ে কবি দেখেন- ‘তিনটি ফুল আর অনেক পাতা নিয়ে/ কদম্বতরুর একটি শাখা মাটি/ ছুঁয়েছে।’ তিনি দেখেন-
অনেক গাছ পাতা লতা
নীল হলুদ বেগুনি অথবা সাদা
অজস্র ফুলের বন্যা অফুরন্ত
ঘুমের অলসতায় চোখ বুজে আসার মতো
শান্তি।
[আমার পূর্ব বাংলা/ একক সন্ধ্যায় বসন্ত]
এই অনবরত দেখা আর অনুভবের ভেতর দিয়ে কবিতার মধ্যে আশ্চর্য মৃদূতা, চারুতা, কম্পন ও গুঞ্জরণের মধ্য দিয়ে মাতৃভূমি নিজেকে মেলে ধরতে থাকে। স্নিগ্ধ ও লাবণ্যমণ্ডিত উপমায়, চিত্রকল্পে, রূপকে, প্রতীকে আবেগের শিহরণ তুলে কবি একাত্ম হতে থাকেন তার ভেতর। স্বদেশের প্রকৃতি, পরিবেশ, নদী ও নিসর্গ স্বনন সৃষ্টি করে তার রক্তের গভীরে। আর কবির রণনশীল কণ্ঠের সম্মোহনে মাতৃভমির আত্মা প্রবল আবেগে উছলে ওঠে বন্যার মতো। এভাবেই পূর্ববাংলার রূপচিত্র ও অন্তরাত্মার সাথে মিশে ‘রাশি রাশি ধান মাটি আর পানির’ ‘নিশ্চেতন করা গন্ধের’ ভেতর কবি নিজেই হয়ে ওঠেন ‘একগুচ্ছে স্নিগ্ধ অন্ধকারের তমাল।’ তার অস্তিত্ব জোড়ে ‘হৃদয়ের নদী হয়ে চাঁদ নেমে আসে’।
তার আমার পূর্ব বাংলা পরিণত হয় বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র গ্যালারি। যেখানে দৃষ্টি ও হৃদয় দিয়ে দেখা যায় বাংলাদেশের শরীর; দৃষ্টি ও হৃদয়!