ধনী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা হাজী মাহবুব আলী আজ দুপুরেও ভাবছিলেন, তাঁর আগামীদিনের রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে। এ রকম তিনি প্রায়ই ভাবেন। তার ছোট্ট রাজনৈতিক দলটির স্বপ্ন ‘নয়া বাংলা কৃষক-শ্রমিক জোট’। বাংলাদেশের অসংখ্য নামগোত্রহীন রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এও এক প্যাডসর্বস্ব সংগঠন। মাহবুব আলীর সাথে যারা সন্ধ্যাবেলা মদ খান, তার মতো কুরুচিপূর্ণ যারা এবং যারা প্রায় সবাই রাতের বেলায় স্যাটেলাইট টিভিতে উদ্ভট হিন্দি সিনেমা দেখে হা হা করে হাসেন অথবা কখনো কেঁদে বুক ভাসান, অর্থাৎ হাজী মাহবুব আলীর সেই বন্ধুরাই মূলত তার দলের সমর্থক। হাজী মাহবুব আলী যখন রাজনীতি ও ব্যবসা করেন, তখন স্ত্রী পুত্র কন্যাকে বেমালুম ভুলে থাকেন। তবে সন্ধ্যায় মদ্যপান ও টিভিতে হিন্দি সিনেমা দেখা মাত্র এই দুটি সময়ই হাজী মাহবুব আলী ভাবপ্রবণ। কিন্তু অন্য সময়ে ব্যবসায়ী হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে এবং রাজনৈতিক নেতা হিসাবে ভূমিকা রাখার সময় তিনি এক অতিশয় বুদ্ধিমান মানুষ। কয়েক বছর আগে তিনি হজ করেছেন এবং নামের আগে ‘হাজী’ শব্দটির ব্যবহার শুরু করেছেন। এখন তার পরিচিত সবাই তার নামের সাথে ‘হাজী’ শব্দটি বলতে অজস্র হয়ে উঠেছেন। এখন তিনি হাজী মাহবুব আলী।
আর আমি যে এক কথা বলছি, আমার উদ্দেশ্য কী? আমার উদ্দেশ্য কিছুই নয়। আমি হাজী মাহবুব আলীর স্ত্রী শিরিন সুলতানার অন্যতম ব্যর্থ প্রেমিক। কিন্তু শিরিন সুলতানার জন্য আমার যে এত দুঃখ তা কখনোই পৃথিবীর কাউকে বিচলিত করেনি। আর আমিও কখনো শিরিনকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি যে, তাকে আমি সবার আড়ালে অতি সঙ্গোপনে ভালোবাসি। এ কথা বলার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। এ কথা মনে হলেই চোখে ভেসে উঠে হাজী মাহবুব আলীর চেহারা, তার মতিঝিল চেম্বার অফিস। তিনি বের হচ্ছেন কালো প্যান্ট, কালো কোট ও কালো টাই পরে। চোখে কালো রঙের সানগ্লাস। আর মাথায় সিল্কের সাদা গোল টুপি। নামের আগে ‘হাজী’ শব্দটি ব্যবহার করার পর থেকে তার দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তন হয়নি, তবে বাইরে যতক্ষণ থাকেন তার সিল্কের সাদা টুপিটি সবসময় মাথায় থাকে। ক্লিন সেভ, কিন্তু গোঁফটি যে বেশ যতেœ লালিত তা দেখেই টের পাওয়া যায়। বিকেলবেলায় আমি যখন হাজী মাহবুব আলীর ছেলে ও মেয়েকে পড়াতে যাই তখন তার সাথে আমার দেখা হয় না। বিকেলে তিনি থাকেন রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে। আর সন্ধ্যেবেলা যখন ঘরে বসে মদ খান, তার আগেই আমি চলে আসি তার বাড়ি থেকে আমার লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্বটি পালন করে। আমার সাথে জীবনে তিন চার বছরের বেশি হাজী মাহবুবের দেখা হয়নি। কিন্তু প্রতিমুহূর্তে তার উপস্থিতি আমি অনুভব করি, এমনকি আমি যখন তানিয়া ও শিহাবকে পড়াই তখনো খুব গভীরভাবে অনুভব করি মনে হয় হাজী মাহবুব আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ে পড়ছে।
সেদিন আমি যাচ্ছিলাম ‘মধুমিতা সিনেমা হলের’ দিকে। দুপুরে ভার্সিটিতে ক্লাস ছিল না, আমি বেরিয়ে পড়লাম। এ আমার এক প্রিয় সখ, যখন কাজ থাকে না আমি হেঁটে বেড়াই শহরের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে। তবে বিকেলে টিউশনির সময় আমি খুব সিরিয়াস, একেবারে সময়মতো হাজির হই শিহাব ও তানিয়াকে পড়াতে। সপ্তাহে পাঁচদিন পড়াতে হয়। ওদের পড়িয়ে আমি প্রতি মাসে পাই তিন হাজার টাকা। গ্রামের বাড়িতে আমার অনেকগুলো ভাইবোন, আমার জন্য বাবাকে টাকা খরচ করতে হয় না- এ কারণে আমি এক অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করি। আর কেমন যেন নিজেকে খুব স্বাধীন স্বাধীন মনে হয়, মনে হয় আমি এক মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছি। সেদিন ক্লাস ছিল না। আমি পুরানা পল্টনের মোড় পর্যন্ত রিকশায় গিয়ে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে যাচ্ছি মধুমিতায়। মতিঝিলে কালো কাচ দিয়ে ঘেরা ফেডারেশন অফিসটার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম এবং ওপরের দিকে তাকিয়ে ফেডারেশন ভবনটিকে জরিপ করছিলাম। হঠাৎ পাশ ফিরতেই দেখি আমার পাশে হাজী মাহবুব আলী ও আরো একজন। আমি বাঘ দেখার মতো কিছুটা চমকে উঠলাম। হাজী মাহবুব আমার মুখের দিকে কেমন যেন সন্ধিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন, ‘মাস্টার সাহেব, আপনি এখানে কী করেন?’ প্রথমত একটু থতমত খেলাম, তারপর তাকে মিথ্যে বললাম, ‘গোপীবাগে আমার এক বন্ধুর কাছে যাচ্ছি, সেখান থেকে বিকেলে গুলশানে শিহাবদের পড়াতে যাবো।’ আমি যে মধুমিতা সিনেমা হলের সামনে সময় কাটাতে যাচ্ছি সে কথা তাকে বললাম না। আমি হাজী মাহবুবের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার চোখে মুখে তেমনই সন্দেহের ছায়া, তিনি যেন আমাকে বিশ্বাস করছেন না। তিনি শুধু বললেন, ‘ও বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছেন, ভালো।’ এরপর তিনি কিছুদূরে দাঁড় করিয়ে রাখা ঝকঝকে পাজেরো গাড়িতে চড়ালেন। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। হাজী মাহবুবের আরো দু’টি কার আছে, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা সেগুলোতে চড়েন। তার স্ত্রী সারাদিন রোটারি ক্লাব আর নারী উন্নয়নের কাজ করে বেড়ান। তবে বিকেল বেলাটা তিনি বাসায় থাকেন, এ সময় তিনি বিশ্রাম নেন, তখন সারাদিনের উগ্র সাজসজ্জা তার থাকে না, চমৎকার বাটিকের কাজ করা সুতির শাড়ি পরে শিরিন সুলতানা এ ঘর থেকে সে ঘরে হেঁটে বেড়ান। আমি তখন শিহাব ও তানিয়াকে পড়াই। শিহাব ক্লাস এইটে আর তানিয়া পড়ে ক্লাস ফাইভে। শিরিন আমাকে নিজ হাতে কফি ও সেই সাথে নাশতা বানিয়ে খেতে দেন প্রায় প্রতিদিন। এ পর্যন্ত তার অনুপস্থিতিতে মাত্র দু’ তিন দিন বাসায় চাকর কিংবা কাজের মেয়ে এই দায়িত্ব পালন করেছে।
আজ ইত্তেফাক মোড়ে ‘দেশবন্ধু রেস্টুরেন্টে’ পরটা-ভাজি খেলাম। এই আমার দুপুরের খাবার, যেদিন হলে খাই না, সেদিন প্রায়ই এভাবে খেয়ে নিই। ‘দেশবন্ধু’ থেকে বেরিয়ে যথারীতি মধুমিতা হলের সামনে কিছুটা সময় কাটালাম। তারপর বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড় থেকে বাসে চেপে গুলশান এক নম্বরে হাজী মাহবুবের বাড়িতে হাজির হলাম। শিহাব ও তানিয়াকে পড়াচ্ছি দোতলার ড্রয়িংরুমে, আর ব্যালকনিতে বসে গল্প করছেন শিরিন ও মেজর (অব:) সেলিম খান। হাজী মাহবুবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে সেলিম খানও বাসায় প্রায় প্রতিদিনের নিয়মিত অতিথি। ‘নয়া বাংলা কৃষক শ্রমিক জোটের’ সভাপতি হাজী মাহবুব ও সাধারণ সম্পাদক মেজর (অব:) সেলিম খান। দু’জনেই পুরনো বন্ধু ও পরস্পরকে ‘তুই’ বলেন। পাঁচ বছর হল সেলিম খানের স্ত্রী মারা গেছেন, তিনি উত্তরা তার বিশাল বাড়িতে একা থাকেন। তার একমাত্র ছেলে আমেরিকায় পড়াশোনা করে। এই মুহূর্তে হাজী মাহবুবের স্ত্রী শিরিন ও মেজর (অব:) সেলিম গান গল্প করছেন, তাদের কথা বলা ও হাসির শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি। হাজী মাহবুব বাসায় ফেরেন সন্ধ্যার পর, সন্ধ্যার পর তাদের অন্যরূপ। সেই রূপ আমি একদিনই দেখেছিলাম।
সেবার জরুরি প্রয়োজনে আমাকে গ্রামের বাড়ি যেতে হয়েছিল। শুক্রবারে আমার ছুটির দিন। আমি আর পনেরো দিন পড়াতে পারবো না এ কথা জানাতে গিয়েছিলাম হাজী মাহবুবের বাড়ি শুক্রবার সন্ধ্যার পর… সেদিন সন্ধ্যার পরে কলিংবেল কয়েকাবার টিপলাম, দেখি কেউ আসছে না। একটু পরে কাজের মেয়ে এসে দরোজা খুলো দিলো। আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলার ড্রয়িংরুমে আসতেই এক অচেনা দৃশ্য দেখলাম। দেখলাম হাজী মাহবুব শিরিন, মেজর সেলিম এবং আরো একজন অচেনা লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছেন এবং কিছুটা জোরে অসংলগ্ন আলাপ-আলোচনা করছেন। তাদের সবার হাতে পানপাত্র। শুনেছিলাম আজকাল ঢাকায় কিছু কিছু বিত্তবানের বাড়িতে নিয়মিত মদ্যপানের আসর বসে, সেদিন সে দৃশ্যটি স্বচক্ষে দেখেছিলাম। আমাকে দেখে সবাই কেমন যেন বিরক্ত, আমি ড্রয়িংরুমের দরোজায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমাকে রক্ষা করলেন শিরিন সুলতানা, তিনি পানপাত্র হাতেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর হেসে বললেন, ‘কী মন্টু, তোমার জরুরি কোনো দরকার আছে?’ আমি সংক্ষেপে আমার কয়দিন ঢাকায় না থাকার ব্যাপারটি তাকে বললাম। তার বাক্য কেমন যেন জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছিল, তিনি বললেন ঠিক আছে, অসুবিধা নেই। তবে তুমি আর কোনোদিন সন্ধ্যার পর এ বাড়িতে আসবে না।’ সেদিন আমি ভয়ে ভয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম, গুলশান এক নম্বর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়াতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছিল। আমি একটি দোকানের ভিতর আশ্রয় নিয়েছিলাম, বারবার ভেবেছিলাম না এসে ফোন করলাম না কেন! আমি ভেবেছিলাম, ফোন করলে তারা যদি বিরক্ত হন এবং আমার ছুটির প্রয়োজনটা ভালোভাবে না বোঝেন। তারা যদি আমাকে আর টিউশনিতে বহাল না রাখেন!
আজ বিকেলে শিহাব ও তানিয়াকে পড়ানোর সময় আমি সেদিনের সে ঘটনাটি ভাবছিলাম। বারান্দায় শিরিন ও সেলিম খানের কথা বলার আওয়াজ একসময় থেমে গেল। সেলিম সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেন, হয়তো আবার আসবেন প্রতিদিনের সান্ধ্য আসরে। হাজী মাহবুবও তার ব্যবসার কাজ সেরে তখন বাসায় ফিরে আসবেন। তখন সবার অখণ্ড অবসর। সেলিম খান চলে যাওয়ার পর শিরিন আমাদের কাছে এসে বসলেন, আমার প্রতি তার কিছুটা স্নেহের দৃষ্টি আছে। তিনি আমার চেয়ে বয়সে প্রায় দশ বছরের বড়, তবু আমি তার একতরফা এক অতিশয় ব্যর্থ ও গোপন প্রেমিক- যার প্রেমের অনুভূতি কোনোদিনই মুখ ফুটে বলা হবে না। তবে শিরিনকে আমি শিরিন আপা বলেই ডাকি। শিরিনের বাড়ি সিরাজগঞ্জ, যমুনা নদীর স্নিগ্ধ সারল্য আমি মাঝে মাঝে তার মুখে দেখতে পাই, মনে হয় শরতের যমুনা পাত্রের কাশবনের মতো নরম তার হৃদয়। সিরাজগঞ্জের এক কলেজে বাংলায় অনার্স পড়াতেন শিরিন, রূপসী এবং সেইসাথে অপূর্ব সৌন্দর্য তার। মফস্বলের মধ্যবিত্ত রূপসী মেয়েদের লেখাপড়া শেষ করার সুযোগ হয় না, নাইন-টেনে পড়ার সময় থেকে তাদের একটানা বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে, কারণ কন্যা রূপসী। ধনী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা হাজী মাহবুব তার বিত্ত ও ক্ষমতার জোরে যমুনাপাড় থেকে বিয়ে করে এনেছিলেন শিরিনকে। শিরিনও খুশি হয়েছিলেন, তার মনে হয়েছিল পাড়ার অন্য মেয়েদের তুলনায় তিনি কত ভাগ্যবতী। সিরাজগঞ্জের এলিয়ট ব্রিজের ওপর বাহিরগোলা নামের এক অখ্যাত পাড়া থেকে তিনি সরাসরি চলে আসেন ঢাকার গুলশানে। বিলাসিতার সব উপকরণই তার হাতের নাগালে। শিরিন আমার পাশে এসে বসলেন। বললেন, ‘মন্টু, তোমার ছাত্রছাত্রীকে ছুটি দিয়ে দাও।’ শিহাব ও তানিয়া খুশি হয়ে চলে গেল তাদের ঘরে। শিরিন বললেন, ‘তুমি আবার আমাকে সেই কবিতাটা পড়ে শোনাও।’ তার প্রাত্যহিক রোটারি ক্লাব ও নারী উন্নয়নের পাশাপাশি এ এক অদ্ভুত খেয়াল, সিরাজগঞ্জে বাংলায় অনার্স পড়ার সময় তিনি জীবনানন্দের কবিতা পড়েছিলেন এবং জীবনানন্দের একটি মাত্র কবিতার একটি পঙ্ক্তিকে তার বিষণ্ন ও নিঃশব্দ মুহূর্তের পরম সঙ্গী হিসেবে নিয়েছেন। আর এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে হয় আমাকে এ এক সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ব্যাপার; কিন্তু পৃথিবীর অনেক কালজয়ী উপন্যাসের সত্যের চেয়েও কঠিন সত্য এ ব্যাপারটি। আমি ধীরে ধীরে বললাম-
পৃথিবী প্রবীণ আরো হয়ে যায়
মিরুজিন নদীটির তীরে।
জীবনানন্দের এই কবিতাটা আমি ভালোভাবে বুঝতেও পারি না। শিরিন বললেন, ‘তুমি কি মিরুজিন নদী কী জান? পৃথিবীর কোথাও কি এ নদী আছে?’ আমি বললাম, ‘এ নদীর নাম আমি কোনো বইতেই পাইনি।’ তিনি বললেন, ‘আমি এই নদীটিকে একবার স্বপ্নের মধ্যে দেখেছি। খুব প্রাচীন এক প্রাগৈতিহাসিক নদী। চারপাশে রুক্ষ পাথুরে পাহাড়, একটিও বৃক্ষ নেই। আকাশে গভীর কালো মেঘ। পাথুরে পাহাড়ের মধ্যে সুতীব্র স্রোত, নদী বয়ে যায়। মিরুজিন নদী। এই নদীর জলও কালো। আমি একদিন মিরুজিন নদীর তীরে যাবো।’
শিরিন যখন এসব কথা বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল না, এই শিরিনই সারাদিন রোটারি ক্লাব নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, নারীবাদী তত্ত্ব নিয়ে চমৎকার বক্তৃতা দেন। এবং এই সেই শিরিন সুলতানা যিনি প্রতিদিন সন্ধ্যার পর স্বামী ও স্বামীর বন্ধুদের সাথে বাসায় বসে মদ্যপান করেন এবং অসংলগ্ন কথা বলেন, কণ্ঠস্বর ও বাক্য তখন জড়িয়ে আসে তন্দ্রাচ্ছন্ন সান্ধ্য বাউলগানের মতো।
আমার দিন তেমনই আছে, ভার্সিটিতে একঘেয়ে ক্লাস, মাঝে মাঝে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ও সেই সাথে গুলশানে হাজী মাহবুবের বাড়িতে টিউশনি। বৃহস্পতি ও শুক্রবার আমি পড়াতে যাই না। এমনই এক বিরতির পর আমি একদিন শনিবার বিকেলে গুলশানে শিহাব ও তানিয়াকে পড়াতে গেলাম। সেদিন অপ্রত্যাশিতভাবে হাজী মাহবুবকে বাসায় পেলাম। আমি আগের মতোই তাকে দেখে ভয় পেলাম, কেন জানি না তাকে আমি ভয় পাই প্রথম দেখার পর থেকে। কিন্তু কী আশ্চর্য, হাজী মাহবুবের কণ্ঠে সেই আগের রক্ষতা নেই, চেহারাও কেমন যে ম্লান। হাজী মাহবুবের পাশে শিহাব ও তানিয়া। শিহাব ও তানিয়া মায়ের সৌন্দর্য পেয়েছে, দু’জনের চেহারাই খুব সুন্দর। হাজী মাহবুব বললেন, আপনি দু’ তিনদিন পরে পড়াতে আসবেন। আমাদের একটু সমস্যা হয়েছে। আপনি কিছু মনে করবেন না। রুক্ষ ও বদমেজাজি স্বভাবের হাজী মাহবুবের কাছে থেকে এমন ভদ্র ব্যবহার ও বিনয় আমি কখনোই আশা করিনি। আমি বললাম, ‘দু তিনদিন পরেই পড়াতে আসবো।’ সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি; দেখলাম, শিহাবও আমার পেছন পেছন নেমে আসছে। আমি তার দিকে তাকালাম। সে বললো, ‘স্যার, আম্মা আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।’ আমি বললাম, ‘উনি কোথায়?’ শিহাব পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিলো, সেই কাগজে শিরিনের বর্তমান ঠিকানা লেখা আছে।
রাতে ভার্সিটির হলে ফিরে ঠিকানা লেখা কাগজটা বারবার দেখলাম মেজর (অব:) সেলিম খানের উত্তরার বাড়ির ঠিকানা। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবলাম, শিরিন কেন হাজী মাহবুবের বাসা ছেড়ে উত্তরায় সেলিম খানের বাসায়? তারপর ভাবলাম, তিনি মিরুজিন নদীর থেকে চেয়েছিলেন তিনি কি সেই স্বপ্নময় জীবনানন্দীয় নদীর সন্ধান পেয়েছেন? এরকম অনেক প্রশ্নের জবাব পেলাম না। রাত এগারোটার দিকে হল ছেড়ে বেরিয়ে মাঠের মধ্যে ঘুরলাম। দেখলাম আকাশে ম্লান চাঁদ ও সাদা মেঘ হেসে বেড়াচ্ছে। জয়নালের দোকান থেকে সিগারেট কিনলাম। ভাবলাম, আমার মৃত্যুর পরও আমার মতো কেউ হয়তো নীলক্ষেতের মাঠে এমন হেঁটে বেড়াবে। এইভাবে একটি জীবনের অবসান এবং আরো অনেক জীবনের শুরু। দুনিয়ার এমনই নিয়ম। সেদিন অনেক রাত আমি ঘুমিয়েছিলাম। পরদিন বিকেলে আমি সেলিম খানের উত্তরার বাসায় গেলাম। সাত নম্বর সেক্টরের এই বিশাল বাড়িতে তিনি একা থাকেন কয়েকজন চাকর নিয়ে। কলিংবেল বাজাতেই কাজের মেয়ে দরোজা খুলে আমাকে বসার ঘরে নিয়ে এলো। আমি দেখলাম ঘরে একা সেলিম খান বসে। তিনি টেলিফোনে কার সাথে যেন কথা বলছেন। কিছুক্ষণ তার কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, তিনি টেলিফোনে হাজী মাহবুব আলীর সঙ্গে কথা বলছেন। আমি সেলিম খানের দিকে তাকালাম, তিনি আমাকে হাত দিয়ে বসার ইঙ্গিত করলেন। এক ফোনে কথা বলা অব্যাহত রাখলেন। তিনি বললেন, ‘মাহবুব, তুই যে পরিস্থিতির রিয়েলিটি বুঝতে পেরেছিস, দিস ইজ ভেরি পজিটিভ। তোর বিরুদ্ধে কখনো ষড়যন্ত্র করিনি এবং করবোও না। মানুষের মনের উপর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। যা ঘটেছে তা আমাদের মেনে নিতেই হবে।
শিরিন বলেছে, সিহাব ও তানিয়ার ওপর ওর কোনো দাবি নেই। সুতরাং তোর সন্তানদের ব্যাপারে তুই নিশ্চিন্ত থাক। আর কোনো স্ক্যান্ডাল যাতে না হয়, পত্রিকায় যাতে কোনো আজেবাজে খবর না বের হয়- সে ব্যাপারে তোর মতো আমিও সচেতন থাকবো। তোর আর আমার দু’জনের সম্মান এর সাথে জড়িত। আর ‘নয়া বাংলা কৃষক শ্রমিক জোট’ টিকিয়ে রাখতেই হবে। এর সঙ্গে শুধু তোর আর আমার ব্যক্তিগত স্বার্থই নয়; আরো অনেক কিছু জড়িত। আমি পার্টির জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তুই আগামীকাল সকালে ফোন করবি। রংপুর ও নীলফামারী জেলায় এবারের বন্যায় আক্রান্তদের ত্রাণ ও সাহায্যের ব্যাপারে পার্টির পক্ষ থেকে কিছু করা যায় কিনা ভাবা দরকার। আচ্ছা ঠিক আছে, এখন রাখছি।’ দীর্ঘক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে সেলিম খান আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
হাজী মাহবুবের চেয়ে আমি সেলিম খানকে একটু কম ভয় পাই। তিনি বেশ হাসিখুশি ও প্রাণখোলা মানুষ আর আমাকে তিনি তুমি বলে ডাকেন। তবে তাদেরকে ‘ভাই’ বলে ডাকার সাহস আমার নেই। তাঁদের দু’জনকেই আমি ‘স্যার’ বলে ডাকি। মেজর (অব:) সেলিম বললেন, ‘মন্টু, তোমার কী খবর? তোমাদের ভার্সিটির কী অবস্থা? সন্ত্রাস কি কমেছে?’
আমি বললাম, ‘সন্ত্রাস আগের চেয়ে কম। তবে যে কোনো সময় আবার শুরু হতে পারে। তবে ছাত্ররা নিজেদের কল্যাণ কিংবা লেখাপড়ার সমস্যা নিয়ে কোনো আন্দোলন করতে চায় না। ওরা বড় বড় দলীয় নেতাদের নির্দেশ মেনে চলে। এসব কারণে বাংলাদেশের মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।’
মেজর (অব:) সেলিম খান আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন; বললেন, ‘তোমাদের বাংলাদেশের মূল সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে স্পেশাল পরিকল্পনা নিতে হবে। তাহলে যদি কিছু হয়।’ এই কথা বলে তিনি হা হা করে হাসলেন।
এমন সময় ঘরে ঢুকলেন শিরিন সুলতানা। শিরিনের চোখে মুখে খুশি। আর লক্ষ্য করলাম, আগের চেয়ে তাকে আরো সুন্দরী লাগছে। শিরিনকে দেখে আমি উঠে দাঁড়ালাম। শিরিন বললেন, ‘আমাকে দেখে তুমি দাঁড়াও কেন? আমি কি তোমার স্যার নাকি? আর কখনো এভাবে দাঁড়াবে না।’ এবার তিনি সেলিম খানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সেলিম ডোন্ট মাইন্ড, অন্য ঘরে যাও। আমি মন্টুর সাথে একটু কনফিডেন্সিয়াল কথা বলবো।’ মেজর (অব:) সেলিম একটু হেসে আমার দিকে তাকিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন।
এই প্রথম আমি শিরিনের মুখে এক ধরনের সলাজ দুষ্টুমির ছায়া দেখলাম। তিনি হাত দিয়ে আমাকে বসার ইঙ্গিত করে নিজেও আমার মুখোমুখি বসলেন। বললেন, ‘তুমি খুব অবাক হয়েছো, তাই না?’ আমি চুপ করে তাঁর দিকে তাকিযে থাকলাম।
শিরিন বললেন, ‘সেলিমের কাছে এসে জীবনে অনেকদিন পর একটা মুক্তির আনন্দ পেয়েছি। আমার মনে হয়, আমি এখন মিরুজিন নদীর অনেক কাছে আসতে পেরেছি। তুমি একদিন ঠিক দেখে নিয়ো মন্টু, পৃথিবীর মতো আমিও একদিন প্রবীণ হয়ে মিরুজিন নদীর তীরে সত্যিই চলে যাবো। যেখানে সোনালি আগুন সত্যিই জ্বলছে জলের ভেতর এক আশ্চর্য জাদু বলে।’
মানুষের কথা যে এত কাব্যাক্রান্ত হতে পারে সে ধারণা আমার ছিলো না। কিন্তু শিরিনের কথার মধ্যে আমি একই সঙ্গে জীবন ও বাক্যের বাস্তবতাকে অনুভবের চেষ্টা করলাম।
আমি বললাম, ‘কিন্তু শিহাব ও তানিয়ার কী হবে?’
শিরিন কিছুটা শুব্ধ হলেন আমার কথা শুনে। বললেন, ‘বিশ্বাস করো মন্টু, ওদের জন্য আমার কোনো ফিলিং নেই। ওদের শুধু আমি পেটে ধরেছিলাম, তারপর ফিরিয়ে দিয়েছি ওদের বাবার কাছে। এখানে হৃদয়ের কোনো স্পর্শ নেই। আই নেভার লাভড হাজী মাহবুব অ্যান্ড হিজ ডটার অ্যান্ড সান।’
আমি রূপসী শিরিনের মধ্যে এক হৃদয়হীনাকে খুঁজে পেলাম, এতদিন ধরে যাঁর রূপ ও সৌন্দর্যের আমি অন্ধ ভক্ত- এখন তার মধ্যে আমি এক বিষে ভরা বিশাল গোখরো সাপের ফণা দেখতে পেলাম; সুন্দরী শিরিনের মুখ এবং সেই সাপের ফণাটি যেন পাশাপাশি দুলছে। ব্যাবিলন ও মিসরে আমি যেন জীবনানন্দ দাশের পাশে দাঁড়িয়ে শিরিনকে দেখেছি।
শিরিন তেমনই আপন মনে বলে যাচ্ছেন, ‘মন্টু, আমাকে ঘৃণা কোরো না। আমার আর কারো প্রতিই ভালোবাসা নেই, মোহ নেই। সেলিম আমার জীবনে একটা স্টেশন। একদিন আমি সত্যিই চলে যাবো মিরুজিন নদীর তীরে।’
আমি এখন উত্তরায় যে বাসায় এসেছি, তার কিছু দূরেই এয়ারপোর্ট। দেশ-বিদেশের বিমান আসছে এবং যাচ্ছে। কোথায় কতোদূরে চলে যাবে এই সব বিমান এই মুহূর্তে জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম, একটি বিশাল বিমান উড়েছে আকাশের দিকে। এই বিমান কোথায় যাবে? যদি তা সময়ের বাঁধন ছিঁড়ে অতীত কিংবা ভবিষ্যতের অবচেতন অন্ধকারের দিকে পারতেন, তবে হয়তো মিরুজিন নদীর হাদিস মিলতো। মিরুজিন নদীর তীরে চেতনার কোনো অবচেতন বিমানবন্দরে হয়তো আমাদের সে বিমান একদিন নামবে। তখন হয়তো শিরিন সুলতানার সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে।