অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে এ যাবত যে জনপদটি ‘রাজশাহী’ হিসেবে পরিচিত তা এর অব্যবহিতপূর্বে ‘রামপুর-বোয়ালিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮২৫-এর আগে এটি ছিল ‘বোয়ালিয়া’ নামে পরিচিত। এরও আগে তা ছিল ‘মহাকালগড়’ বলে উল্লিখিত।
এ যাবত এই ভূখণ্ডকে নিয়ে যে সকল রচনা প্রকাশিত হয়েছে বা এ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে তাতে এই ‘রামপুর-বোয়ালিয়া’ ও ‘মহাকালগড়’-এর পরিচিতির সময়কাল চার-পাঁচশ’ বছর অতিক্রম করেনি। ঐতিহাসিক বা প্রাক-ঐতিহাসিক সময়ের কোন বিবরণের সন্ধান এখনও মেলেনি। এমনকি আমাদের আলোচ্য ‘মহাকালগড়’-এর আদি অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা জানা যায় না। শহর রাজশাহীর কথা থাক- মহাকালগড়কালিন ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াদিও গবেষণার অন্তর্ভুক্ত হয়ে উঠতে দেখা যায়নি।
একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এসে যেখানে নানান সুদৃশ্য অট্টালিকা- একদা সেখানে ছিল জলাভূমি- এটা ভাবতে কি বিস্ময় জাগে? যেখানে ছিল ঘন-গভীর জঙ্গল, নানান হিংস্র শ্বাপদের মুক্ত বিচরণ- এখন সেটি কেবলই মানুষের কোলাহলে পূর্ণ- তাও কি বিশ্বাস হয় সহজে! তবু তাই সত্য- এই রাজশাহী মহানগরী ও তার পার্শবর্তী জনবহুল ভূমি সম্পর্কে। আজ থেকে এক বা দেড় হাজার বছর পূর্বের চিত্র কল্পনা করলে অবিশ্বাস্য বোধ হয় যে একদা প্রায় জনবিরল-জলাভূমি সদৃশ একটি ভূমি ছিল বর্তমানের এই গর্বিত নগর ও নাগরিকজীবন।
গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে, এই শহরে প্রাচীন কোন বসতি ছিল না। তবে সামান্য স্থান নিয়ে যেটুকু ছিল সেটি মহাকলগড় নামে পরিচিত (বর্তমান দরগাপাড়া এলাকা)। শহর নির্মাণের শুরু থেকে এখন অবধি এই শহরের মাটির নীচে পুরাতন আমলের কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি। প্রাচীন ইট, পাথরের স্তম্ভ এমনকি মাটির তৈজষপত্রের ভাঙা কোন অংশ এই শহরের কোন স্থান থেকে উদ্ধার হয়নি- যেটি প্রমাণ করবে রামপুর বোয়ালিয়া বা রাজশাহী একটি প্রাচীন কিংবা পুরাতন নগর। মহাকালগড়ের রূপান্তরিত অবস্থান তথা বর্তমানকালের রাজশাহী বা রামপুর বোয়ালিয়া নামের যে পুরাতন শহরটির সাথে আমরা পরিচিত তার শুরুই মাত্র ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। অর্থাৎ ২০০ বছরও পূর্ণ হয়নি আধুনিক রাজশাহীর। এটি প্রাচীন ইতিহাসের কোনকালেই কোন শাসক গোষ্ঠীর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না। ১৮২৫ সালে প্রথম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের রাজশাহী নামক বিশাল জেলার সদর দপ্তর রামপুর বোয়ালিয়াতে শ্রীরামপুরে সরকারিভাবে স্থাপন করে এই জনপদটিকে শহরের মর্যাদায় নিয়ে আসে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দ হচ্ছে রাজশাহীর জন্য মাইলফলক।
মহাকালগড়-পরবর্র্তী যে জনবসতি বর্ধিত হতে থাকে তার পত্তন ঘটে হযরত তুরকান শাহের এই জনপদে আগমনের মধ্য দিয়ে। তুরকান শাহের রাজশাহী তথা মহাকালগড়ে আগমন এখানকার ইতিহাসের একটি দিক-পরিবর্তক ঘটনা বলে উল্লেখ করা যেতে পারে। যতদূর জানা যায়, সে সময় বাংলার শাসক ছিলেন তুঘরিল খান। তুঘরিল খান দিল্লীর সালতানাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ১২৭৮ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন তার পুত্র বোগরা খানকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে তৎকালিন বাংলায় আসেন। তখন দিল্লী থেকে তুরকান শাহসহ প্রায় তিন শত ইসলাম প্রচারক গিয়াসউদ্দীন বলবনের যুদ্ধযাত্রায় সঙ্গী হন। তাঁদের মধ্যে শাহ মখদুম রূপোশের পরিবারও ছিল। তুঘরিল খান যুদ্ধে পরাজিত হন এবং তাকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। বোগরা খানকে বাংলার শাসক বানিয়ে গিয়াসউদ্দীন বলবন দিল্লী ফিরে যান। কিন্তু ইসলাম প্রচারকারীদল বাংলায় বসবাস করতে থাকেন।
অতঃপর মহাকালগড়ের শাসকগোষ্ঠী তুরকান শাহকে হত্যা করে। এই দুঃসংবাদ শাহ মখদুম রূপোশের নিকট পৌঁছালে তিনি এর প্রতিকারকল্পে মহাকালগড়ে আসেন। হযরত শাহ মখদুম রূপোশ ১২৮৮/৮৯ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি ৬৮৭) সালে নদীপথে আগমন করেন। তিনি এখানে ইসলাম প্রচার করেন এবং মহাকালগড়ের শাসকদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমান দরগাহ মসজিদ তাঁর হাতে গড়া। ১৩১৪ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি ৭১৩) হযরত শাহমখদুম রূপোশ পরলোকগমন করলে তাঁকে এখানেই সমাহিত করা হয়। এই জনপদের মানুষ মহাকালগড় নাম পাল্টিয়ে স্থানটির নামকরণ করেন বুয়ালিয়া (বু-আউলিয়া) অর্থাৎ আউলিয়াগণের সুবাসিত স্থান। দীর্ঘকাল স্থানটি একরকম কোলাহলহীন ছিল। ১৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের সেনাপতি আলী কুলী বেগ বুয়ালিয়া এসে এই দরবেশের মাযার ও মসজিদটি পাকা করেন। তখন থেকে মসজিদ ও মাযারকে কেন্দ্র করে লোক সমাগম হতে থাকে।
এই জনপদে বসতি বিস্তৃত হওয়া এবং একটি লোকালয় হিসেবে গড়ে উঠার বিষয়ে এর বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। বলাবাহুল্য, আমাদের আলোচনা এর পূর্বের ইতিহাস নিয়ে। যাকে আমরা ‘মহাকালগড়’ হিসেবে উল্লেখ করছি- এই মহাকালগড়ের আলোচনাও এযাবত আট-নয়শো বছর পূর্বের সময়কালের মধ্যে সীমিত থাকছে। এই সময়সীমাও বড়জোর আরও চারশ’ বছর পর্যন্ত বর্ধিত করা যায়। তবে তা কখনই দেড় হাজার বছরের বেশি নয়- কোনভাবেই। খুব প্রাচীন সময়ের হিসেব করলে তা বড়জোর খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ১২শ’ বছর পূর্বের মহাকালগড়ের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, এর বেশি নয়। সেসময় রাজশাহীর পূর্বসূরি হিসেবে মহাকালগড়ের অবস্থান ও পরিস্থিতি নিয়ে এর আগের কোন আলোচনা হবে নিছক অনুমাননির্ভর। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে কাল, যুগ, জনপদের প্রাচীনত্ব প্রভৃতি বিষয়ও আলোচনায় চলে আসে। তাই এনিয়ে সংক্ষিপ্ত একটি বিবরণ দেওয়া গেল।
মহাকালগড় নামকরণ
রাজশাহী দুটি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল। গ্রাম দুটি হল, শ্রীরামপুর ও বোয়ালিয়া। রাজশাহী ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার-এর বর্ণনায় এ তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পূর্বে রামপুর বোয়ালিয়া এবং বর্তমান দরগাপাড়াকে মহাকালগড় বলা হত।
হিজরি ৬৭৭ এবং ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান রাজশাহী জেলার নাম মহাকাল থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। উঁচু স্থানকে গড় বলা হয়ে থাকে। রাজশাহী অঞ্চল পার্শ্ববর্তী অন্যান্য অঞ্চল অপেক্ষা উঁচু থাকার কারণে পবিত্র অঞ্চল হিসেবেও স্বীকৃত ছিল। তান্ত্রিক রাজাদের সময়ে এ স্থানটি মন্দির নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। মহাকালগড় কৌলিক দেবতা ‘মহাকাল দেও’ বা মহাদেব শিবের নামে প্রতিষ্ঠিত ছিল। মহাকালগড়ের অধিবাসীরা দেও বা দেব জাতি নামে পরিচিত ছিল। রাজশাহী থেকে পনের কিলোমিটার দূরে দেওপাড়া (গোদাগাড়ি থানার অন্তর্ভুক্ত) নামক স্থানের উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়। দেওপাড়া নামক স্থানে সেনবংশীয় রাজা বিজয় সেনের একটি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। উক্ত শিলালিপিতে মহাকালগড়ের সময়কালে দেও জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রাচীন যুগ
ইতিহাস বিষয়ক আলোচনায় যুগের বিভাজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব, বিকাশ ও প্রভাবের কার্যকারিতা নিয়েই এ যুগ বিভাজন নির্ণয় করা হয়ে থাকে। সাধারণত ইতিহাসে খ্রিষ্টপূর্ব কয়েক শতক পূর্বের সময় থেকে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতককেই প্রাচীনকাল বা যুগ ধরা হয়ে থাকে। তবে অঞ্চল ভেদে কালবিভাজনের তারতম্যও লক্ষ্য করা যায়। খ্রিষ্টীয় তেরো শতকের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২ হাজার বছরের সময়কে বাংলার প্রাচীন যুগ বলে ধরা হয়ে থাকে। প্রাচীন যুগে বাংলা (বর্তমানের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) এখনকার বাংলাদেশের মতো কোনো একক ও অখণ্ড রাষ্ট্র বা রাজ্য ছিল না। বাংলার বিভিন্ন অংশ তখন অনেকগুলি ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। আর প্রতিটি অঞ্চলের শাসক যার যার মতো শাসন করতেন। বাংলার এ অঞ্চলগুলিকে তখন সমষ্টিগতভাবে নাম দেয়া হয় ’জনপদ’।
মহাকালগড়ের ভৌগলিক অবস্থান
আমাদের আলোচ্য মহাকালগড়ের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে বিশদে কোন ধারণা পাওয়া যায় না। তবে বিংশ-একবিংশ শতকের রাজশাহীর অবস্থান হল, পূর্ব-দক্ষিণজুড়ে পদ্মা নদী, দক্ষিণ-পশ্চিমজুড়ে পবা-গোদাগাড়ী উপজেলার প্রাচীন জনপদ, পশ্চিম-উত্তরজুড়ে বাগমারা-দুর্গাপুর উপজেলার সুলতানী-মোগলযুগীয় জনপদ এবং উত্তর-পূর্বজুড়ে রয়েছে পুঠিয়া-নাটোর-চারঘাট-বাঘাকেন্দ্রিক মোগলযুগীয় জনপদ। প্রাচীনকালে একটি জনপদ প্রধানত নদীভিত্তিক জীবনধারায় পরিচালিত হত। ফলে মহাকালগড়ের নদীকেন্দ্রিক অবস্থান সম্পর্কেও আলোচনা করা জরুরি বলেই মনে হয়।
নিকটবর্তী জনপদ
তৎকালিন প্রাচীন মহাকালগড়ের নিকটবর্তী সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও সরব জনপদের মধ্যে ছিল বিজয়নগর-দেওপাড়া এলাকা। যা বর্তমান রাজশাহীর পবা উপজেলার সীমান্তবর্তী গোদাগাড়ী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। বলা যেতে পারে, বিজয়নগর ছিল সেনদের প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং দেওপাড়া ছিল ধর্মীয় কেন্দ্র। বিজয়নগরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের (আনু. ১০৯৭-১১৬০ খ্রি.) নাম উল্লেখ করা হয়ে থাকে। পালদের লিপিতাত্ত্বিক উৎস থেকে একথা জানা যায় যে, ১১৫২-৫৩ খ্রিষ্টাব্দের কিছু পরে বিজয় সেন উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা থেকে পালদেরকে বিতাড়িত করে সেখানে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’ সূত্রে জানা যায়, বিজয় সেন রাজশাহী শহরের ১১.২৬ কিমি. পশ্চিমে তাঁর শিলালিপি প্রাপ্তিস্থানে প্রদ্যুম্নেশ্বরের একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।
দেওপাড়া : ‘দেওপাড়া প্রশস্তি’ প্রাচীন বাংলার গুরুত্বপূর্ণ লিপিতাত্ত্বিক উৎস হিসেবে সুপরিচিত। একটি প্রস্তর খণ্ডের উপর খোদিত এই লিপি রাজশাহী জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে গোদাগাড়ী থানার অধীন দেওপাড়া নামক গ্রাম থেকে ১৮৬৫ সালে সি.টি মেটকাফ আবিস্কার করেন। লিপিটির প্রাপ্তিস্থানের আশেপাশে দিঘাপাতিয়ার কুমার শরৎ কুমার রায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত উৎখননের ফলে বিস্তৃৃত এক অঞ্চল, যেখানে রয়েছে পাথুরে নিদর্শনাদি, পুরানো দিঘি এবং প্রাচীন বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ (উদাহরণস্বরূপ জাঁকজমকপূর্ণ প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দির) আবিষ্কৃত হয়। বর্তমান লিপিটি পদুশ্বর নামে পরিচিত একটি বড় দিঘির পাড়ে দেখা যায়। ধোয়ীর পবনদূত কাব্যে সেন রাজাদের রাজধানী হিসেবে উল্লিখিত বিজয়পুরকে দেওপাড়া গ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত বিজয়নগর গ্রামের সঙ্গে পণ্ডিতগণ অভিন্ন বলে শনাক্ত করেন। এই লিপির বর্ণনামতে, বিজয় সেন অতি উচ্চমানের এবং জাঁকজমকপূর্ণ প্রদ্যুম্নেশ্বরের মন্দির নির্মাণ করেন এবং এর নিকটে খনন করেন একটি দিঘি (শ্লোক নং ২২-২৯)। লিপিতে এরপর বর্ণিত হয়েছে মন্দিরের অভ্যন্তরে স্থাপিত একটি মূর্তির বিষয়ে (শ্লোক নং ৩০-৩১) এবং সবশেষে রয়েছে প্রশস্তিলিপির রচয়িতা উমাপতিধর এবং খোদাইকারীর পরিচয়। দেওপাড়া প্রশস্তিলিপিটিকে আধুনিক বাংলা বর্ণমালার পূর্বসূরি বলে পরিচিত করানোর চেষ্টা করেছেন লিপি গবেষক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজয়নগর : ‘গৌড়রাজমালা’ গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহী শহরের ৯ মাইল পশ্চিমে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়কের রাজাবাড়ি নামক স্থানই ছিল বিজয় সেনের রাজধানী বিজয়নগর। সেন রাজসভার অন্যতম কবি ধোয়ী রচিত পবনদূত কাব্যেও এই রাজধানীর কথা আছে। সেখানে বিজয়পুর হিসেবে কোথাও কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঐতিহাসিকেরা একমত হয়েছেন যে কবি ধোয়ীর ‘বিজয়পুর’ ও ‘বিজয়নগর’ এক ও অভিন্ন। এখন বিজয়নগরের বৃহদাংশ গ্রাস করেছে এককালের কীর্তিনাশা পদ্মা নদী। বিজয়নগর নামে ক্ষুদ্র জনপদ রয়েছে মাত্র, তবে এর পূর্বদিকে বিশাল এলাকা নিয়ে অর্ধশতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারের গবাদিপশু খামার। এসব স্থান থেকে প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উৎখননে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ প্রত্ননিদর্শন। এই নিদর্শনের সিংহভাগই রক্ষিত হয়েছে দেশের সর্বপ্রাচীন সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে। বিজয় সেনের রাজধানীর প্রাচীনতার স্মারক হয়ে এখনও আছে ‘উপরবাড়ি ঢিবি’, ‘কুমারপুর ঢিবি’, ‘প্রদ্যুশ্বর দিঘি’ প্রভৃতি। ‘উপরবাড়ি ঢিবি’ এখন পদ্মার চরাঞ্চল থেকে আসা মানুষের দখলে চলে গেছে। তারা ঢিবি কেটে কেটে এখন ঘরবাড়ি বানাচ্ছে। ‘কুমারপুর ঢিবির’ মাটির দুর্গেরও বেহাল অবস্থা। প্রায় শতাব্দীকাল আগে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে বিজয়নগর এবং তার আশপাশে আংশিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ করা হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের ধারণা, বিজয়নগর, কুমারপুর, কদমশহর, পালপুর, ধরমপুর প্রভৃতি স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক খনন চালালে পাওয়া যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন।
গবেষক এবনে গোলাম সামাদ উল্লেখ করেন, রাজশাহী শহর থেকে প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার পশ্চিমে বিজয়নগর নামে একটি গ্রাম আছে। অনেকে অনুমান করেন, এই জায়গায় সেন বংশীয় নৃপতি বল্লাল সেনের পিতা বিজয় সেনের রাজধানী ছিল। এর উত্তর দিকে অবস্থিত দেওপাড়া নামক পল্লী থেকে একখানি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। যা থেকে জানা যায়, কর্নাটক দেশের সামন্ত সেনের পৌত্র ও হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন পাল বংশীয় রাজাদের কাছ থেকে গৌড় রাজ্য জয় করেছিলেন। এই শিলালিপি সংস্কৃত ভাষায় উমাপতি ধর কর্তৃক রচিত এবং শিল্পী চনক শূলো পানি কর্তৃক উৎকীর্ণ। এই শিলালিপির অক্ষরকে মনে করা হয় আদি বাংলা অক্ষর (Proto-Bengali script)। এর অক্ষরগুলোর মধ্যে ২২টি পুরোপুরি প্রায় বাংলা অক্ষরের মতো। এই প্রস্তর লিপিতে উল্লিখিত বিজয় সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পদুমেশ্বর দেবের মন্দির তৎপ্রতিষ্ঠিত বৃহৎ দিঘি পদুমেশ্বর এর ধারে অবস্থিত ছিল বলে ধরা যায়। পদুমেশ্বর দিঘির ধার থেকে দুইটি পাথরের কারুকার্য খোচিত চৌকাঠ আবিষ্কৃত হয়েছে। এর নিকটে পালপুর নামক স্থানে সুদীর্ঘ দুর্গ পরিখার চিহ্ন এখনও দেখতে পাওয়া যায়। তাই মনে করা হয় বর্তমান রাজশাহী জেলার এই অংশে ছিল সেন রাজাদের প্রথম রাজধানী।
নিকটবর্তী প্রাচীন জনপদের দূরত্ব
মহাকালগড়ের নিকটবর্তী প্রাচীন জনপদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেওপাড়া ও বিজয়নগর ছাড়াও রয়েছে তানোরের বিহারৈল, ধানোরা, পাঁড়িশো, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, তাহেরপুর প্রভৃতি। তৎকালিন মহাকালগড় তথা বর্তমান রাজশাহী শহর থেকে পশ্চিম দিকে দেওপাড়ার দূরত্ব সাড়ে ৭ মাইল এবং কুমরপুর-বিজয়নগরের দূরত্ব সাড়ে ৮ মাইল, উত্তর দিকে ধানোরার দূরত্ব প্রায় ২২ মাইল এবং বিহারৈল-পাঁড়িশোর দূরত্ব প্রায় ২৮ মাইল। পূর্ব দিকে বাঘার আলাইপুরের দূরত্ব প্রায় ৩০ মাইল। দুর্গাপুর রাজশাহী শহর থেকে ১৮ মাইল দূরত্বে উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। পুঠিয়ার দূরত্ব সাড়ে ১৯ মাইল এবং তাহেরপুরের দূরত্ব ৩৬ মাইল।
রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার মাদারীপুর গ্রাম থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত প্রাচীন স্থাপনা বিহারৈল ঢিবি বা রাজবাড়ী ঢিবি একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করা হয়। এটি বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এর প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে অনুমান করা হয়, বিহারটি চার বা পাঁচ শতকে নির্মিত। এখানে অনেক পুরাতন ইট ও বেলে পাথরের তৈরি বুদ্ধ মুর্তি পাওয়া যায়। মুর্তিটি বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত আছে। বৌদ্ধযুগে এই বিহারৈলকে কেন্দ্র করে একটি নগরী গড়ে উঠার কথা অনুমান করা হয় এবং এই এলাকা অনেক দূর বিস্তৃত ছিল- যার ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। এছাড়া তানোর উপজেলার মাদারীপুরের একটি প্রাচীন নিদর্শন ধানোরা ঢিবি। এটিও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনা। রাজশাহী শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তানোর বাসস্ট্যান্ড থেকে ২.৫ মাইল উত্তরে মাদারীপুর বাজার অবস্থিত। ধানোরা ঢিবি এক সময় বেশ উচ্চতাসম্পন্ন থাকলেও বর্তমানে যতেœর অভাবে ঢিবিটি বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম।
মহাকালগড় কতটা প্রাচীন?
এসব নিকট ও অদূরবর্তী প্রাচীন জনপদের সঙ্গে মহাকালগড়ের কোন যোগসূত্র ছিল কি-না তা বোঝা যায় না। বিশেষ করে পাল ও সেন রাজাদের রাজত্বকালে বর্তমান রাজশাহী শহরের স্থানটিতে কোন জনবসতি গড়ে উঠেছিল কি-না, ইতিহাসে নির্দিষ্ট করে এ বিষয়ের কোন উল্লেখ নেই। তবে অনুমান করা হয় যে, মহাকালগড় নামক এলাকাটি প্রাচীন যুগে বিজয়নগর অথবা দেওপাড়ার অধীন কোন সামন্ত রাজার একটি অনাবাদী বা অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল স্থানমাত্র ছিল। খানিকটা জঙ্গলাকীর্ণ এই এলাকায় দেও মন্দির এবং খাজনা আদায়ের কুঠি থাকার সম্ভাবনাও ছিল। এই দেও মন্দির বা দেব-মন্দিরের প্রাচীনত্ব সম্পর্কেও কোন তথ্য মেলে না। ফলে মহাকালগড় আসলে কতটা প্রাচীন সে সম্পর্কেও কিছু অনুমান করা সম্ভব হয় না। তবে গুপ্ত সম্রাটগণ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন বলে সেসময় থেকেই এই মহাকালগড়ের সূচনা হয়ে থাকতে পারে। আর পরবর্তী সেনবংশের রাজত্বকালে যেহেতু দেও-দানব কিংবা দেব-দেবীর পূজার লক্ষ্যে বিপুল সংখ্যক মন্দির গড়ে উঠে এবং তৎকালিন সমাজ-সংস্কৃতির বিপুল অংশজুড়ে মুর্তিপূজা ও নরবলির মত প্রথা বিদ্যমান ছিল, সেহেতু মহাকালগড়ের সময়কালের বিস্তৃতিও সেসময়ের মধ্যে হয়ে থাকবে। খ্রিষ্টীয় তিন শতকের শেষ এবং চার শতকের প্রথমদিকে বাংলায় গুপ্ত শাসন সম্প্রসারিত হয়। এমত পরিস্থিতি থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, খ্রিষ্টীয় তিন শতকের শেষ থেকে একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীজুড়ে প্রায় সাতশ’ বছরকাল মহাকালগড়ে হিন্দু-সামন্তবাদী শাসন বিদ্যমান ছিল। এর মাঝখানে পালদের বৌদ্ধধর্মীয় শাসনকাল চললেও সেসময় যথেষ্ট সামাজিক ও ধর্মীয় সহনশীলতা বিদ্যমান থাকতে দেখা যায়। ফলে এখানে হিন্দু ধর্ম ও সামাজিক আধিপত্য বজায় থাকতে কোন বাধা দেখা যায় না। বলতে গেলে, ১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে এই ব্রাহ্মণ্য-হিন্দু-সামন্তবাদী রাজত্বের অবসানের সূচনা ঘটে।
দেও জাতির শাসন
মহাকালগড়ের সমকালে এর সামাজিক অবস্থার বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া না গেলেও কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি চিত্র পাওয়া যায়। বিশেষত হযরত শাহ মখদুম রূপোশের আগমনের প্রেক্ষিত বিষয়টি ইতিহাসের আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। একটি বিবরণে বলা হয়, প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত একটি জনপদের নাম মহাকালগড়। এখানে বাস করতো মহাকাল দেবের পূজারি ‘দেও জাতি’। এখানে ছিল প্রকাণ্ড এক মন্দির। সেই মন্দিরে ছিল ‘মহাকাল দেও’ এর খুব বড় এবং ভীষণ এক মূর্তি। এই মন্দির সংলগ্ন ছিল মহাকাল দীঘি (বর্তমানে রাজশাহী কলেজ মাঠ)। প্রায় ৩০-৪০ বিঘা জমির ওপরে ছিল দেও আলয় ও দেও রাজার বাড়ি। অংশুদেও চান্দভণ্ডি বর্ম্মাভোজ ছিল ওই দেও আলয়ের সেবাইত এবং দৈত্য রাজা ছিল অংশুদেও খেজ্জুরচান্দ খড়গ বর্ম্মা গুজ্জভোজ। এই মন্দিরে প্রতিবছর নরবলি দেওয়া হতো। এ জন্য দূর দূরান্ত থেকে মানুষ খরিদ করে আনা হতো, জবরদস্তি করে কখনও মানুষ ধরেও আনা হতো। কেউ কেউ আবার স্বেচ্ছায় নিজ সন্তানকে বলি দেওয়ার জন্য দেও রাজাকে দান করত। কারো সন্তান না হওয়ার কারণে এই মন্দিরে এসে এই মর্মে মানত করত যে, সন্তান হলে সে একটি সন্তান নরবলি দেওয়ার জন্য দেও রাজকে দেবে। দেও ধর্মমতে যোগ সময় উপস্থিত হলে নরবলি দেওয়া হতো। সবার বিশ্বাস ছিল ওই দেও রাজদ্বয় ছিল ঈশ্বরের অবতার।
এই বিবরণ গল্পের মতো করে বলা হলেও কিছু নিদর্শণ তার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়। এই নরবলির প্রথা বন্ধ হয় হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (র:)-র আগমন, দেও জাতির সঙ্গে পর পর তিনটি যুদ্ধ এবং দেও রাজের চরম পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। দেও রাজ সপরিবারে ইসলাম গ্রহণ করলে মহাকাল গড় মুসলমান অধ্যুষিত জনপদে উন্নীত হয়। শাহ মখদুমের মাজার চত্ত্বরে আজও নরবলির কড়িকাঠ বা পাথরের যুপকাষ্ঠ এখনো বিদ্যমান।
ধর্মীয়-সামাজিক অবস্থান
রাজশাহী জেলার আদি অধিবাসী হিসেবে পুণ্ড্রের সাথে শবর ও পোড জনগোষ্ঠীর উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। বরেন্দ্রের অধিভুক্ত রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে তারা বসতি স্থাপন করেছিল। আর্যগণ কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে তারা খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মগধ মিথিলার জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে ভবঘুরে জীবনযাপন করতে থাকে। তবে আর্যদের সাথে শক্তির দ্বন্দ্বে তারা কিছুটা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে এই আদিবাসীদের একটি শাখা জৈন ধর্ম গ্রহণ করে বর্ণ জাতির অন্তর্ভুক্ত হতে চেষ্টা করে। রজনীকান্ত চক্রবর্তীর মতে এই পুণ্ড্র জাতি তুঁত চাষ করে শিল্ক শিল্পের সূচনা করে। পরবর্তীতে এতদঞ্চল মুসলিম বিজয়ের পর এদেরই একটি অংশ ইসলাম গ্রহণ করে।
শিলালিপি ও তাম্রশাসন পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত রাজশাহী জেলার অধিকাংশ অঞ্চল গুপ্ত শাসনের অধীনে ছিল। এ সময় জৈন ও ব্রাহ্মণ্যবাদ এই অঞ্চলের প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ছিল। রাজশাহী অঞ্চলের বেশিরভাগ হিন্দু ছিল পৌরাণিক মতাবলম্বী। এরা ছিল বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত। বৈষ্ণবরা দুইভাগে বিভক্ত ছিল। যথা পাশাচার এবং যোত্যাচার। আমিষভোজী হওয়ার কারণে সমাজের নিরামিষভোজীরা তাদের ঘৃণার চোখে দেখতো। যোত্যাচারেরা ছিল নিরামিষভোজী তবে এরা পাঁচটি শাখায় বিভক্ত ছিল। যথা, গীর, ভারতী, নাড়া, বাউল ও দরবেশ। এদের মধ্যে গীর ও ভারতীরা মনে করতো সাংসারিক ক্রিয়াকর্ম ও স্ত্রী সংসর্গ অন্যায় ও নিষিদ্ধ। তবে এদের মধ্যে গোপন যৌনাচার যথেচ্ছাচারেই বিদ্যমান ছিল। বাংলায় মুসলমানদের আগমনের প্রাক্কালে রাজশাহীতে তান্ত্রিক রাজারা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তান্ত্রিকরা নিরাকার স্রষ্টার ধ্যান ও আরাধনা করতো। তারা প্রকৃত তান্ত্রিক শক্তিকে পরম ধর্ম জ্ঞানে উপাসনা করতো। কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই ছিল যে, তারা স্রষ্টার ধ্যান না করে মূর্তির পৌত্তলিকতায় নিমগ্ন হয়ে পড়ে এবং জড় পদার্থও পূজা করতে শুরু করে। ফলে হিন্দু ধর্মাচারে অনাচার সৃষ্টি হয় এবং বিপথগামী জাতি হিসেবে তারা পরিচিতি পায়। বিভিন্ন পার্বণে বিগ্রহ ও মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা অর্চনা ও নৃত্য গীত পরিবেশন করা হিন্দু তান্ত্রিকদের ধর্ম পালনের প্রধান রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে কালিপূজা, শিবপূজা, দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা ও সরস্বতি পূজার মণ্ডপ ও থান নির্মিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময়ে শিলাখণ্ডের দ্বারা বিভিন্ন কল্পিত দেবদেবীর প্রতিকৃতি নির্মাণ করে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করা হতো। তান্ত্রিক হিন্দুরা এ সকল বেদীমূলে অর্ঘ নিবেদন করতো। রাজশাহীতে যে সকল কোম বাস করতো তাদের মধ্যে পুণ্ড্র, শবর, পোড, কোচ, মেচ, রাজবংশী প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ সব কোচ বা আদিবাসীর পূজা, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, ভয়, বিশ্বাস ও সংস্কার হিন্দুদের মধ্যে সংক্রামিত হয়ে হিন্দু ধর্মবিশ্বাস এবং আচার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। আদিবাসী ও কোমদের শীতলা, মনসা, বনদুর্গা, ষষ্ঠী, নানা প্রকার চণ্ডী, নরমুণ্ডমালিনী, শ্মশানচারী কালী, শ্মশানচারী শিব, পর্ণশবরী জাঙ্গুলী প্রভৃতি দেব-দেবীরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মে স্বীকৃতি লাভ করেছে বলে মনে হয়। এভাবে কালী পূজা, দুর্গা পূজা, শিব ও শিবলিঙ্গ পূজা, লক্ষণ ও স্বরস্বতী পূজা হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে পৌত্তলিকতার শিকড় শক্ত করে তুলেছিল এ অঞ্চলের শহর ও গ্রামগঞ্জে। সমাজের নর-নারীদের অবৈধ সংসর্গ সমাজকে কলুষিত করে দিয়েছিল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় সে সময়ের হিন্দু সমাজের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “ব্রাহ্মণ্য ধর্মের আচার অনুষ্ঠানকে নানা প্রকার যৌনাতিশয্যে ব্যাধিগ্রস্ত করেছিল। বোধ হয় তারই ফলে উচ্চবর্ণ ও শ্রেণিগুলিতে নানা প্রকার কাম ও যৌনবিলাস দেখা দিয়েছিল।”
মহাকালগড় ছিল দেওরাজ শাসনাধীন অঞ্চল। দেওরাজের শাসন-শোষণে, কালো যাদুর চর্চা, নরবলি অর্থাৎ অন্ধকার জনপদ বলতে যা বুঝায় তার সমস্ত উপাদানই ছিল সে রাজ্যে। দেওরাজের সমসাময়িক রাজশাহী তথা মহাকালগড়ে ফসল ও মাছ ছিল অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন। তাই সকল শাসক কৃষক ও জেলেদের উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করে রাখতেন। কৃষক-চাষী, জেলে তথা নিম্নবর্গের এই গোষ্ঠীকে অধীনে রেখে রাজ্যের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার উদ্দেশ্যে সে সময়ের মহাকালগড়ের দেওরাজ যে কাজটি করতেন তা হলো, প্রতি বছর পূজার সময়ে একজন মানুষকে দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া। সেই পূজা কোন সময়ে হবে বা কী ধরনের বলি দেওয়া হবে সেটা নির্ধারণ করা হতো গণনার মাধ্যমে। শাসকদের এহেন নিষ্ঠুরতা সমকালের নি¤œবর্গের জনগণ মেনে নিতে বাধ্য হয়। ধর্মের ছদ্মাবরণে প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল জনগণকে দাবিয়ে রাখার কূটকৌশল। ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া ও মৌলিক চাহিদাকে একপাশে ঠেলে ফেলে নিজেদের রাজ্য শাসনের ধারাবাহিক সুযোগকে কণ্টকমুক্ত করার অভিপ্রয়াস। ধর্মের মুখোশে অনেক নির্যাতনই জনগণকে মেনে নিতে হতো।
নদীকেন্দ্রিক জনপদ
বর্তমান সময় থেকে পাঁচ-ছয়শ’ বছর পূর্বের মহাকালগড়ের যে সামান্য চিত্র পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, এই জনপদ ছিল মূলত নদীকেন্দ্রিক। গবেষকদের অভিমত, পঞ্চদশ শতাব্দীতে বর্তমান রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো মহানন্দা নদী। পদ্মা ছিল এখান থেকে আরও ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে। সে সময় সরদহর ভাটিতে পদ্মার সাথে মহানন্দার মিলন হতো। মহানন্দা থেকে বারাহী, স্বরমংলা বা রাঁইচাদ, নারদ প্রভৃতি শাখা নদ-নদীসমূহের জন্ম। এই নদ-নদীগুলির পলল দ্বারা সৃষ্ট ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই জনপদ। কাদা, পলি ও বালি দ্বারা সৃষ্ট এই স্থানটিতে জনপদ গড়ে উঠেছে অনেক পরে। সেই বিবেচনায় স্থানটিকে নবীন বলা চলে। স্থানীয় প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, রাজশাহী শহরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা নদী (পদ্মা) বহুকাল পূর্বে আরও অনেক দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং সে সময়ে মহানন্দা নদী এই শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সরদহের কাছে এসে গঙ্গায় মিলিত হতো। পাঁচশত বছর পূর্বে গঙ্গার মূল প্রবাহ ছিল ভাগীরথীর প্রবাহপথ ধরে। এরপর গঙ্গা ভাগীরথীর প্রবাহ ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্বমুখি পথে অগ্রসর হয়েছে। একসময়ে জলঙ্গীঁ-মাথাভাঙ্গা ও গড়াই নদীর প্রবাহ পথে গঙ্গার অধিকাংশ পানি গড়াত। মেজর জেমস রেনেল জানিয়েছেন, এক সময়ে গঙ্গার মূল ধারা বর্তমান সময়ের চলনবিল হয়ে (বড়ালের পথে) জাফরগঞ্জ এরপর বুড়ীগঙ্গার পথ ধরে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হত।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেও রাজশাহী শহরে কোন বড় আকারের বাজার গড়ে উঠেনি। গ্রামকেন্দ্রিক বাজার-বন্দর ছিল সে আমলে রাজশাহী জেলার বাঘা, মীরগঞ্জ, তাহেরপুর, নাটোর, প্রেমতলীতে। শহরের পার্শ্বে বারাহী নদী তীরের বায়াতেও ছিল পুরাতন একটি বাজার। রাজশাহী শহরে স্থায়ী কোন হাট-বাজার না থাকলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে উনবিংশ শতাব্দীর পুরোটাই পদ্মা তীরের রামপুর বোয়ালিয়া বন্দরটি ছিল বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। কলকাতার পরেই এর স্থান ছিল। রামপুর বোয়ালিয়া বন্দরের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ছিল। রাজশাহী জেলাসহ চলনবিল এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান, পাট, গাঁজা, কাঁচা রেশম, নীল, লাক্ষ্মা ইত্যাদি রামপুর বোয়ালিয়া নদী বন্দরে এসে জমা হতো। এরপর দেশী ও বিদেশী বণিকগণ এগুলি জাহাজে বোঝাই করে ভারতের অন্যান্য প্রদেশসহ মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপে নিয়ে যেতো।
মহাকালগড়ের ধর্ম-সমাজ
আলোচ্য রাজশাহী তথা মহাকালগড় এলাকা যে প্রাচীন বরেন্দ্র জনপদের অংশ ছিলো তা অনেকটাই সুনিশ্চিত হওয়া যায়। তবে এই অঞ্চলের মানুষের ধর্মীয়-সামাজিক পরিচিতি সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায় না। ইতিহাস-গবেষক ড. মাহবুবুর রহমান মনে করেন, ‘প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল। হিউয়েন সাঙ পুণ্ড্রবর্ধনে ২০টি বৌদ্ধ মঠ দেখেছিলেন। জৈন ধর্মও এখানে কিছুটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বরেন্দ্রভূমি চারশ’ বছর (৭৫০-১১৬১) পাল শাসনাধীনে ছিল। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। স্বভাবতঃই এখানে বৌদ্ধ ধর্ম রাজ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু সেন শাসনামলে এই এলাকায় বৈদিকরণ বা হিন্দুকরণ শুরু হলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এমনি পরিস্থিতিতে বখতিয়ার খলজী এই এলাকায় মুসলমান শাসন শুরু করলে সেন শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলমান শাসনকে সমর্থন করে এবং স্বেচ্ছায় তারা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এইভাবে বরেন্দ্রভূমি কালক্রমে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পরিণত হয়।’
অপর গবেষক ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘ইতিহাস-ঐতিহ্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রাচীন গৌরব বহন করে চলেছে রাজশাহী। ইতিহাসের সহজাত গতিতে জৈন, বৌদ্ধ এবং বৈদিক হিন্দু ধর্মের সাহচর্যে এসেছে এই অঞ্চল। প্রাক ইসলাম কিংবা তার পরবর্তী প্রায় সবসময়ই রাজশাহী ছিল দেশের শাসনকেন্দ্রের একেবারে কাছাকাছি।’
গবেষক এবনে গোলাম সামাদ উল্লেখ করেন, রাজশাহী শহরের হড়গ্রাম নামক এলাকা থেকে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে বিরাট বোধিসত্ত্বের মূর্তি। যা থেকে অনুমান করা চলে, এই অঞ্চলে এক সময় প্রচলিত ছিল মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম। মহাযান ধর্মমতে, পরম বুদ্ধ থাকেন বৈকুণ্ঠে। তাঁর ধর্মকায়া হিসাবে মর্তে আসেন বোধিসত্ত্বগণ। এরা পরম বুদ্ধ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। যাতে সাধারণ মানুষের পাপের বোঝা এবং দুঃখ যন্ত্রণা লাঘব হতে পারে। আদি বৌদ্ধ ধর্মে পূজা-অচর্ণা ছিল না। কিন্তু মহাযান বৌদ্ধ ধর্মে আছে। বৌদ্ধ ধর্মে এই বিরাট পরিবর্তন আসে কুষণাদের সময় থেকে। কুষাণ যুগের কিছু মুদ্রা উত্তরবঙ্গে পাওয়া গিয়েছে। বগুড়ার মহাস্থানগড়ে একটি স্বর্ণ মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে যার এক পিঠে রয়েছে বিখ্যাত কুষাণ রাজ কনিষ্কের প্রতিমূর্তি। কুষাণ এসে ছিলেন মধ্য এশিয়া থেকে। তাঁরা কথা বলতেন প্রাচীন পারসিক ভাষায়- যাতে ‘বোরিন্দ’ মানে উঁচু। উত্তরবঙ্গে উঁচু লাল মাটি অঞ্চলকে এখনও বলে বোরিন্দা।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার মন্ডয়েল বা মাড়ইল নামক গ্রামে ধ্বংসপ্রাপ্ত চারটি মৃত্তিকা স্তুপ আছে। এই চারটি স্তুপের মধ্যে একটি হলো ১২ মিটার (৪০ ফুট) উঁচু। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি এখান থেকে জৈন র্তীথাঙ্কর শান্তি নাথের প্রস্তর মূর্তি পেয়েছেন। মনে হয় এই স্থানের অধিবাসীরা বহু পূর্বে জৈন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। পরে এই স্থানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিষ্ঠা পায়। এক সময় বরেন্দ্র অঞ্চলে জৈন ধর্মের যথেষ্ঠ প্রভাব ছিল। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত একটি তা¤্রশাসন থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে অথবা তার পূর্বে ঐ স্থানে একটি জৈন বিহার ছিল।
এভাবে দেখা যায়, আমরা যে মহাকালগড় নিয়ে আলোচনা করছি সেটি প্রাচীনকালে বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন করেনি। কেবলই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় একটি অনুল্লেখযোগ্য জনপদ হিসেবে ধর্মীয়-সামাজিক অবস্থান অতিক্রম করে এসেছে।
প্রাকৃতিক অবস্থা
প্রাচীন মহাকালগড়ের প্রাকৃতিক অবস্থা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও এটি যে বিভিন্ন প্রকার জলাশয়ে সমৃদ্ধ ছিল তা পরিস্কার। গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে, আজকের শহর রাজশাহী গড়ে উঠেছে গঙ্গা (পদ্মা) এবং এর শাখা বারাহী, স্বরমঙ্গলা, দয়া, নবগঙ্গা, জামদহ এসকল নদীর পলি, কাদা, বালু ইত্যাদি দ্বারা গঠিত ভূমির উপরে। শুধু তাই নয়, প্রাচীন তিস্তার নিম্ন প্রবাহ আত্রাই নদীর প্লাবন ভূমি ছিল রাজশাহী শহরের বেশ কিছু এলাকাজুড়ে। আজকের বিলসিমলা, তেরখাদিয়া, কয়েরদাঁড়া, বসুয়া, গাইডহরার বিল, সাপমারার বিল, বগমারি বিল, ছুটদাঁড়া বিল, ভূগরইল বিল, দৌলতপুর বিল, ভোলাবাড়ীর বিল প্রভৃতি প্রাচীন জলাভূমিগুলি সরাসরি বর্তমানকালের দুয়ারী খালের (দুয়ারীখাল আসলে বারনই এর উপনদী এবং পদ্মার শাখা বললে ভুল হবার কথা নয়) সাথে সংযুক্ত ছিল এবং এখনও রয়েছে। —প্রাচীন কাল থেকেই তিস্তার পানি, তিস্তার নিম্নপ্রবাহ আত্রাইয়ের পানি, বারনই নদীর মাধ্যমে দুয়ারীখাল হয়ে বিলসিমলা পর্যন্ত পৌঁছে যেতো। স্বাভাবিক কারণে রাজশাহী শহরের একটি বড় অংশ ছিল তিস্তা বা আত্রাইয়ের প্লাবন ভূমি। —এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ষাটের দশকের প্রথমে এই শহরে ৪২৮৩টি ছোট বড় দীঘি পুকুর, ডোবা, নয়নজুলি ও অন্যান্য জলাশয় ছিল। ১৯৮১ সালে কমে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ২২৭১টিতে। এই সংখ্যা ২০০০ সালে এসে দাঁড়ায় ৭২৯টিতে। ২০০৯-এর সর্বশেষ জরিপে শহরের পুকুর ও দীঘির সংখ্যা মাত্র ৩১৩টি। ২০১৫ সালে এর সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ২০০টি।
গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী আরও দেখিয়েছেন, প্রাচীন রাজশাহী বেশ কয়েকটি নদী ও খালের দ্বারা আবৃত ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বারাহী, স্বরমংলা, রাইচান, দয়া, হোজা, চিনারকূপ প্রভৃতি। এসব নদী ও খাল বেশ প্রবহমান ছিল। মূলত গঙ্গার শাখা-উপশাখা হিসেবেই এগুলি বিবেচিত হতো। বারাহী সম্পর্কে বলা হচ্ছে, রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থল দিয়ে খরস্রোতা একটি ছোট আকারের নদী প্রবাহিত হতো। বর্তমান সাহেববাজার বড় মসজিদের পূর্ব পাশ দিয়ে শহরের বড় পাকা নর্দমাটি হচ্ছে গঙ্গার শাখা নদী বারাহী। উৎস মুখ সাহেবগঞ্জ নামক মৌজা। সাহেবগঞ্জের ৯৫ ভাগ এখন গঙ্গার গর্ভে। ১৮৫৫ সালের বন্যা ও ভাঙনে সাহেবগঞ্জসহ শ্রীরামপুর, নবগঙ্গা, এসকল আদিগ্রামগুলোকে গঙ্গা গ্রাস করেছে। সাহেবগঞ্জের সামান্য অংশ রয়েছে শহরের দক্ষিণে গঙ্গার পাড়ে। সাহেবগঞ্জ মহল্লায় গঙ্গার উত্তর পাড়ের ধার ঘেঁষে রয়েছে একটি মাতৃস্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র। সেবা কেন্দ্রটির উত্তরপূর্বপাড়ে মন্নুজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের মাঝ দিয়ে গঙ্গা থেকে নির্গত হয়েছে বারাহী নামের নদীটি। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে শহরের দক্ষিণ পাড় দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে সাত মাইল দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মিত হয়েছিল। সাত মাইলের মধ্যে সর্বমোট ১২টি স্লুইস গেট বা কপাট নির্মিত হয়। এগুলি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে শহরের মধ্যে এবং শহরতলী দিয়ে যে সকল ছোট নদী ও খাল প্রবাহিত হয়ে শহর অতিক্রম করেছে এবং সর্বশেষে উত্তর দিকে বিল ও বারনই নামের নদীতে প্রবেশ করেছে, এসকল প্রবাহগুলিকে। সবগুলিই গঙ্গা থেকে নির্গত। উল্লিখিত ১২টি পানির প্রবাহ পথগুলির মধ্যে ৩টি পূর্ণাঙ্গ নদী। এই তিনটি নদীর মাঝখানের প্রবাহটির নাম বারাহী।
স্বরমঙ্গলা-রাইচাঁন সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজশাহী শহরের তালাইমারী-কাজলার মাঝামাঝি স্থানে গঙ্গা থেকে উৎপত্তি লাভ করে কাজলা মহল্লার মাঝ দিয়ে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক অতিক্রম করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)-এর মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেছে জামালপুর নামক মহল্লার মধ্য দিয়ে। উৎস থেকে তিন কিলোমিটার আসার পর জামালপুর মহল্লার মাঝামাঝি স্থানে স্বরমঙ্গলা থেকে দয়া নামের একটি শাখা নদীর জন্ম হয়েছে। জামালপুর, নামোভদ্রা, নারকেলবাড়ীয়া, কমলাপুর, ললিতাহার, কালুমেড়, বালানগর, ভালুকপুকুর, পান্তাপাড়া, রামচন্দ্রপুর, ভবানীপুর, ঘোলহারিয়া, শিরোলিয়া, কাপাশমূল, হাটগোদাগাড়ী হয়ে ফলিয়ার বিলে প্রবেশ করেছে। ফলিয়ার বিলে প্রবেশের পূর্বে ঘোলহাড়িয়া উত্তরপাড়া নামক গ্রামে দয়া এসে মূল নদীর (স্বরমঙ্গলা-রাইচাঁন) সাথে মিলিত হয়েছে। স্বরমঙ্গলা উৎস থেকে ৭ কিলোমিটার চলার পর কালুমেড় নামক গ্রামে এসে রাইচাঁন নাম ধারণ করেছে। আসলে কালুমেড় নামক গ্রাম থেকে রাইচাঁন নামক নদটির খাতটি চাক্ষুশ বুঝতে পারা যায়। এখান থেকে যতোই ভাটি অর্থাৎ উত্তর দিকে গেছে খাতটি আরও প্রশস্ত এবং গভীর হয়েছে। স্বরমঙ্গলা উৎস থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার আসার পর জামালপুর মহল্লার মধ্যে এখনও এর একটি প্রাচীন খাতের চিহ্ন রেখে গেছে। রুয়েট এলাকার মধ্যেই রয়েছে খাতটি।
দয়া নদী সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, গঙ্গার শাখা স্বরমঙ্গলা। স্বরমঙ্গলার শাখা দয়া নদী। দয়া গঙ্গার প্রশাখা। স্বরমঙ্গলা উৎস থেকে তিন কিলোমিটার বয়ে আসার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পশ্চিমের সীমানা দেয়ালের স্থানটি থেকে দয়া নামের নদীটি স্বরমঙ্গলা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। স্থানটি জামালপুর মৌজার অন্তর্ভূক্ত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কবরস্থানকে পশ্চিমদিকে রেখে সোজা উত্তরমুখী পথ ধরে মেহেরচন্ডী, খড়খড়ি, ললিতাহার, কুখুন্ডী, বামনশিকড়, মল্লিকপুর, তেবাড়িয়া, কাঁঠালপাড়া, রুইয়ের বিল, সারাংপুর, শিরোলিয়া হয়ে ঘোলহাড়িয়া উত্তর পাড়ায় এসে রাইচাঁন নদের সাথে মিলিত হয়েছে। মিলিত স্রোতটি আরও প্রায় ৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে ফলিয়ার বিলে পতিত হয়েছে। ফলিয়ার বিল থেকে রাইচান ও দয়া নদীর মিলিত স্রোতটি হোজা নামে পৃথক একটি নদীর অস্তিত্ব নিয়ে এগিয়ে গেছে। এছাড়া হোজা নদী সম্পর্কে বলা হয়েছে, হোজানদী আসলে গঙ্গার প্রশাখা। রাইচাঁন ও দয়া নদীর মিলিত ধারাটি রাজশাহী জেলার পবা উপজেলাধীন ফলিয়ার বিলে পতিত হয়েছে। সেখান থেকে হোজা নামের নদটি উৎপত্তি লাভ করে দুর্গাপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ও বর্ধনপুর হয়ে পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী পথ বেয়ে রওয়ানা হয়েছে। পলাশবাড়ী গ্রামে নদীকে খণ্ড খণ্ড করে বহু পুকুর জলাশয় তৈরি করা হয়েছে।
রাজশাহীতে অনেক নদী ও বিল থাকায় বোধ হয় হিন্দু রাজাগণ-সময়ে বাণিজ্য জলপথে চলত। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ইতিহাসের ঊষালগ্ন পর্যন্ত এই সুদীর্ঘকাল যে মানব গোষ্ঠীসমূহ আদি বরেন্দ্র-পুণ্ড্র ভূমিতে বিচরণ করেছে, নদী-জলাশয়ের তীরে মৎসাদি শিকার করে জীবন ধারণ করেছে এবং আরও পরে যারা গ্রামীণ সমাজ রচনা ও কৃষির সূচনা করেছিল-কি ছিল তাদের নরগোষ্ঠীগত পরিচয়, কেমন ছিল তাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, তাদের সাথে আজকের বরেন্দ্রের কোন জাতি-গোষ্ঠীর আদৌ সাদৃশ্য রয়েছে কি না, তাদের আদি উৎসভূমি কোথায়- এই সব প্রশ্ন আজও নৃবিজ্ঞানীদের কাছে কৌতূহলের বিষয়।
বরেন্দ্র পরিস্থিতি
পরিবেশ গবেষক ড. ইকবাল জুবেরী ঐতিহাসিক বিবরণ সূত্রে এক গবেষণা প্রবন্ধে জানান, সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দীকালে বরেন্দ্র অঞ্চলে ছিল বিস্তৃত সবুজ বনভূমি। ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ পর্যটক সাইমন বর্ণনা করেন, বৃহৎ বৃক্ষ আচ্ছাদিত বনাঞ্চল বা নীঁচুস্থানে কাঁটা ও গুল্ম দ্বারা বিস্তৃত ও উচ্চস্থানে শুল্ক ও তৃণাবৃত। এ অঞ্চল এত বিস্তৃত ও দীর্ঘ যে শিকারীর পক্ষে পশু শিকার প্রায় অসম্ভব। বন্যপশু যথা হরিণ, বন্য শুকুর, চিতা ও বৃহৎ বাঘের উত্তম প্রজননস্থল। ১৮৭৫ সালে উইলিয়াম হান্টার এই অঞ্চলকে কাঁটাপূর্ণ জঙ্গল হিসেবে দেখিয়েছেন। বৃক্ষের মধ্যে শিমুল, পিপুল, কুল, পাকুড়, বাঁশ প্রধান। ১৯১২-১৯২২ বিবরণে নেপসন এই অঞ্চলকে জঙ্গল প্রায় পরিস্কার দু’এক স্থানে ছোট ছোট কাঁটা বনের উপস্থিতি ছাড়া অন্যান্য এলাকা উঁচু-নিচু, ক্ষেতে পরিণত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৮৫০ সালের পরবর্তী সময়ে নীল চাষ বন্ধ হওয়ার পর একাজে নিয়োজিত সাঁওতাল শ্রমিকরাই প্রধানত বরেন্দ্র অঞ্চলের জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে কৃষিভূমিতে পরিণত করে। এই ঐতিহাসিক বিবরণ থেকেই দেখা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলের বনভূমি কত দ্রুত এবং কত নৃশংসভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আজও এই ধারার কতকটা অব্যাহত রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা, বগুড়া ও দিনাজপুর অঞ্চলের বৃহত্তর অংশ জুড়ে বরেন্দ্র বৈশিষ্ট্য বিরাজমান। এই এলাকার ৮ হাজার ৩ শত বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের প্রকৃতির ব্যাপক ও অপরিকল্পিত ধ্বংসের ফলে পরিবেশ আজ ভীষণভাবে বিপর্যস্ত।
মহাকালগড়ের অভ্যন্তরে জঙ্গলাকীর্ণ স্থান হিং¯্র জীব জন্তুর আবাস ভূমি ছিল। মহাকাল গড়ের অধিবাসীরা ‘দেওজাতি’ নামে পরিচিত ছিল। গৌড় বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল তখন তান্ত্রিকতায় ভরপুর ছিল। এখানে মানুষের জীবনের ছিল না কোনো নিরাপত্তা, ধর্মের কোনো প্রভাব, প্রবণতা। ফলে বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী বাগদাদ থেকে এ স্থানের সংস্কারের উদ্দেশ্যে হযরত তুরকান শাহকে পাঠানো হয় বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন।
সেকালে এখানকার সাধারণ মানুষের পেশা কৃষি উৎপাদন ও মৎস্য শিকার ছিল- সেকথা বলাই বাহুল্য। এর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পেশা হিসেবে রেশম চাষও চালু ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। কাজী মোহাম্মদ মিছের বলেন, ‘পাক-ভারতের অন্যান্য দেশ অপেক্ষা বিভাগ-পূর্ব বাংলা রেশমের উপযুক্ত স্থান। এখানে প্রায় সকল জেলাতেই অল্প-বিস্তর রেশম জন্মে। বাঙলা দেশের ভূমিতে যেমন উৎকৃষ্ট ধরণের রেশম উৎপাদন হয়, ফলনও তেমনই প্রচুর পরিমাণে হইয়া থাকে।’ মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বগুড়া ও রাজশাহীর বড় বড় নদী তীরবর্তী দো-আঁশ ভূমিতে রেশমের চাষ অপেক্ষাকৃত বেশী ছিল এবং ফলনও হত প্রচুর। আবার এই কয়েকটির মধ্যে উৎকৃষ্ট ধরণের রেশম-চাষের ক্ষেত্র হিসেবে বগুড়া, মালদহ ও রাজশাহীর রেশম বিখ্যাত ছিল। উত্তর বঙ্গে ‘বুয়ালিয়া’ ও বগুড়া ‘সুলতানপুর’ সেই রেশম কেনা-বেচার বন্দর হিসেবে গড়ে উঠেছিল। তৎকালিন মহাকাল গড়ের প্রাচীন জনপদে এই রেশম উৎপাদনের শত শত বছরের ধারাবাহিকতায় অষ্টাদশ শতকে বোয়ালিয়ায় পদ্মার তীরে গড়ে তোলা হয় বড়কুঠি। যা এই এলাকায় রেশম শিল্পের প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে।
পরবর্তী ইতিহাস
শুধু গুপ্ত আমল কিংবা পাল আমলই নয়, সুলতানী আমল বা মোঘল আমলের সৃষ্ট কোন প্রশাসনিক কেন্দ্রও মহাকালগড়ের পরবর্তী বোয়ালিয়া নামক জনপদে ছিল না। সুলতানী আমলে প্রশাসনিক এবং সামরিক কেন্দ্র ছিল পদ্মা তীরবর্তী আলাইপুর এবং হোজা নদী তীরবর্তী দমদমা (পুঠিয়া) নামক স্থানে। মোঘলদের সময়ে আলাইপুর এবং চাপিলায় মোগল ফৌজদার থাকতেন। এ জাতীয় কোন ধরনের প্রশাসনিক কেন্দ্র বোয়ালিয়া ছিল না। নবাবী আমল কিংবা কোম্পানি আমলেও বোয়ালিয়ায় কোন ধরনের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না। সুলতানী ও মোঘল আমলে গড়ে উঠা শহর তাহিরপুর ও পুঠিয়ায় নিরাপত্তাসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য স্ব স্ব রাজা ও জমিদারগণ প্রত্যক্ষভাবে দায়িত্ব নিতেন। শহরের শান্তি শৃঙ্খলার বিষয়টিও তাঁদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু বোয়ালিয়াতে এ ধরনের কোন কর্তৃপক্ষ নবাবী কিংবা কোম্পানি আমলে ছিল বলে জানা যায় না। কাজেই নবাবী আমলের শেষে এবং কোম্পানি আমলের প্রথম দিক থেকে বোয়ালিয়া একটি দ্রুত বর্দ্ধনশীল শিল্প কারখানার শহর হিসেবে বেড়ে উঠতে শুরু করলেও প্রকৃতপক্ষে এই শহরটির শাসনকার্য পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট কোন কর্তৃপক্ষ না থাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলার বিষয়গুলি ছিল অনুপস্থিত। সেই বিবেচনায় বোয়ালিয়াকে উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক অবধি পূর্ণাঙ্গ শহর হিসেবে আখ্যা দেওয়া সঠিক হবে বলে মনে হয় না। যদিও এই সময়কালের মধ্যে বোয়ালিয়ায় বসবাসরত জনসংখ্যা ছিল দশ হাজারেরও অধিক।
উপরের আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে যে সারমর্ম পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, কমবেশি এক হাজার বছরের পূর্বের রাজশাহী তথা মহাকাল গড়ের ভৌগলিক, নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার খুব সুনির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না। একটি ভূ-খণ্ড বা জনপদের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন খুব সহজে ঘটে না। শত-সহস্র বছরব্যাপি নানান উত্থান-পতনের মধ্যেও মানুষ ও প্রকৃতি তার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করে। এটা তার স্বভাব ও প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যও বটে। সেই আলোকে বিচার-বিবেচনা করে বলা যায়, এই জনপদ সেকালে তথা খ্রিষ্টপূর্ব কাল থেকে প্রকৃতিগতভাবে ছিল জল ও জঙ্গলাকীর্ণ। পেশাগতভাবে প্রধানত ছিল কৃষি, মৎস্য ও রেশমচাষ নির্ভর। জীবনপ্রণালী ছিল আজকের সময়ের থেকে যোজন যোজন দূরে; কাঠ, মাটি ও পাথরের সামগ্রীর ব্যবহারই ছিল প্রধান।
সাংস্কৃতিকভাবে বিবিধ বৈচিত্র্যে ভরপুর। ধর্মীয়ভাবে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ও গোত্রে বিভক্ত। প্রবলের প্রাবল্য ছিল সীমাহীন, নিষ্ঠুরতাকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে প্রদর্শণ করা হতো। সহস্রাধিক বছরকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটেছে বটে প্রচুর মাত্রায়, কিন্তু পেশাগত ঐতিহ্যের রেশ আজও বিদ্যমান- একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। –
সহায়ক গ্রন্থ:
মাহবুব সিদ্দিকী, শহর রাজশাহীর আদিপর্ব, নবরাগ প্রকাশনী, ২০১৩।
মুহাম্মদ এনামুল হক, এ হিস্ট্রি অব সুফিইজম ইন বেঙ্গল, ঢাকা: এশিয়াটিক সাসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৭৫।
মুহাম্মদ আবু তালিব, হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর জীবনেতিহাস, ঢাকা: পাকিস্তান বুক কর্পোরেশন, ১৯৭৯।
খোন্দকার আখতার আলী, হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) ও মহাকালগড়ের ইতিকথা, ১৯৬৮।
মুহাম্মদ আবু তালিব, বিস্মৃত ইতিহাসের তিন অধ্যায়, ১৯৬৮।
রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, পঞ্চম সংস্করণ, বাংলা ১৩৭৭।
অনিরুদ্ধ রায়, বাংলাপিডিয়া, খণ্ড ৩, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩।
আবদুল মোমিন চৌধুরী, বাংলাপিডিয়া, খ- ৬, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩।
আকসাদুল আলম, বাংলাপিডিয়া, খ- ৩, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩।
আবদুল মোমিন চৌধুরী, বাংলাপিডিয়া, খ- ৫, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩।
চিত্তরঞ্জন মিশ্র, বাংলাপিডিয়া খ- ৪, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩।
আকসাদুল আলম, বাংলাপিডিয়া, খ- ৭, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৩।
সাইফুদ্দীন চৌধুরী, প্রাচীন বাংলার অজানা রাজধানী, প্রথম আলো, ১৫ মার্চ, ২০১৩।
এবনে গোলাম সামাদ : রাজশাহীর ইতিবৃত্ত, প্রীতি প্রকাশনী, রাজশাহী, ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯।
এ কে এম ইয়াকুব আলী, রাজশাহীতে ইসলাম, ঢাকা: তাম্রলিপি, ২০০৮।
কাজী মোহাম্মদ মিছের, রাজশাহীর ইতিহাস, ১ম খ-, ১৯৬৫।
আবু নোমান মো. আসাদুল্লাহ, রাজশাহীর প্রথম ইসলাম প্রচারক তুরকান শাহ শহীদ, হেরিটেজ রাজশাহী, ২০১৯।