সময়টা নিম্ন মাধ্যমিকে অধ্যয়নের। সপ্তম শ্রেণি হয়তো বা হবে। ‘না ঘুমানোর দল’ নামে একটি কবিতা পড়ি। কবিতার ডান পাশে খানিকটা জায়গা জুড়ে একটি ছবিও সাঁটা ছিল হাশেম খানের। পাখ-পাখালির মাঝে বসে একজন খুব ধ্যানমগ্ন হয়ে কি যেন লিখছেন। সেখানে নানা রঙের কিছু ফুলেরও ছবি আঁকা ছিল। রং বেরঙের ফুল-পাখি-প্রজাপতির মাঝে একজন ভাবুকের সে ছবিটি আজও মনে পড়ে। তখনও কবিতার কলারীতি সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা অর্জিত হয়নি। জ্ঞান ছিল না প্রাচ্য শব্দার্থতাত্ত্বিক রুদ্রট, রীতিতাত্ত্বিক আচার্য দণ্ডী, গুণতাত্ত্বিক আচার্য বামণ, বক্রোতিতাত্ত্বিক কুন্তক, ধ্বনিতাত্ত্বিক আনন্দ বর্ধন ও রসতাত্ত্বিক ভরতমুণি সম্পর্কে। অনুরূপভাবে পাশ্চাত্য কাব্যতাত্ত্বিক প্লেটো, এ্যারিস্টিটল, হোরেস, লঙ্গিনাসের কাব্য ভাবনাও জানার কথা নয়। সে বয়সে দোষের নয়, হেগেল, বোমগার্টেন, বরিস পাস্তেরনাক, রমাঁ রোলাঁ, পিকাসো, কার্লমার্ক্স প্রমুখের শিল্প ও নন্দনভাবনা সম্পর্কে ধারণা না থাকা। একইভাবে ধারণা থাকার কথা নয় বাংলা কাব্যের প্রাচীন মধ্য ও আধুনিক যুগের শিল্পরূপ সম্পর্কে। শুধু তাই নয় বিশ শতকের প্রারম্ভে ইউরোপে শিল্প ও সমালোচনায় যে মতবাদ বা ইজমের উদ্ভব হল সেটার সম্পর্কে ধারণা না থাকা আহামরি কোন বোকামির কাজ নয়। এরই ধারাবাহিকতায় ধারণা থাকার কথা নয় ত্রিশোত্তর যুগের কবি-স্বভাবের মৌল-প্রবণতা সম্পর্কে। এমনকি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পাক-সরকারের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা যেভাবে স্ফূর্তি লাভ করেছিল সে সম্পর্কেও ধারণা গাঢ়-প্রকৃতির নয়। এখন কথা হল উপর্যুক্ত বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা নয় তবে এ বিষয়গুলোর অবতারণা কেন? প্রশ্নটা আমার নিজেরও। একটু অতিরঞ্জন হল না? – এমনটি উল্লেখের কারণ হলো – আমরা ছোটবেলায় যে পদ্য, ছড়া কিংবা কবিতা পড়েছি সেগুলোর একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন। যেমন – ‘ছুটি’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), ‘আমি হব’ (কাজী নজরুল ইসলাম), ‘কাজলা দিদি’ (যতীন্দ্রমোহন বাগচী), ‘সুখ’ (কামিনী রায়), ‘মানুষ জাতি’ (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত), ‘কাজের লোক’ (নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য), ‘পারিব না’ (কালী প্রসন্ন ঘোষ), ‘আদর্শ ছেলে’ (কুসুমকুমারী দাশ), ‘মাতৃভক্তি’ (কালি দাস রায়), ‘কে’ (ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত), ‘মামার বাড়ি’ (জসীম উদ্দীন), ‘ঈদের খুশি’ (আহসান হাবীব), ‘আমাদের গ্রাম’ (বন্দে আলী মিঞা), ‘কানা বগির ছা’ (খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন), ‘মা’ (কাজী কাদের নেওয়াজ), ‘মুনাজাত’ (গোলাম মোস্তফা), ‘স্বর্গ ও নরক’ (শেখ ফজলুল করিম) প্রভৃতি এ-রমক অনেক কবির ছড়া কিংবা পদ্য-কবিতার সঙ্গে আমাদের নিচের ক্লাসের বিভিন্ন শ্রেণিতে পরিচয় ঘটে। আমি আল মাহমুদের প্রথম যে ছড়াটি পড়ি তা হল ‘ঝালের পিঠা’ (প্রথম শ্রেণি)। এরপর পড়ি ‘একুশের কবিতা’ চতুর্থ শ্রেণিতে এবং ‘নোলক’ অষ্টম শ্রেণিতে।
এগুলো পড়ার পরে কেমন যেন অন্যরকম মনে হোত। সেটা ব্যাখ্যা করার মত ভাব ও ভাষা সে সময়ে আয়ত্বে থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই ‘অন্যরকম’ ভাব-ভাবনাকে এখন প্রকাশ করতে চাইলে হয়ত অনেক কিছুই হয়ে পড়বে আরোপিত। আসলে সেই অন্যরকম অনুভবরাশিকে যৎকিঞ্চিৎ প্রকাশ করতে চাইলে হয়ত এগুলো এভাবে এসে পড়বে – আল মাহমুদের কবিতায় বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওঠে এসেছে; বাঙালির লোকজ জীবনকে নানা মাপে মাত্রায় বর্ণাঢ্যভাবে অঙ্কিত হয়েছে। তাঁর স্বীয় সংগ্রামী যাপিত জীবন যেন বাঙালির প্রতিবিম্বিত জীবন হয়ে মানব-জীবনের মহিমা ঘোষণা করেছে ঋদ্ধ প্রত্যয়ে। এ অনুষঙ্গ উপলব্ধির জন্য ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩), ‘কালের কলস’ (১৯৬৬), ‘সোলালি কাবিন’ (১৯৭৩), ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ (১৯৭৬), ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’র (১৯৮০) মত সাড়া জাগানো কাব্যের অবতারণার প্রয়োজন হয় না। সে-ক্ষেত্রে ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ (১৯৮০) ছড়াগ্রন্থের নামোল্লেখই যথেষ্ট। এগ্রন্থের ছড়া-কবিতাগুলো ১৯৬৪-১৯৭০ কালপর্বে রচিত। বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এ সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্র্ণ।
১৫টি ছড়া নিয়ে গ্রন্থটির অবয়ব নির্মিত হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য, বীর বাঙালির প্রতি স্তুতি, হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের স্মরণ এবং শহুরে যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে সমৃদ্ধ লোকজীবনে প্রবেশের আকুতি প্রকাশিত হয়েছে ছড়াগুলোর মধ্য দিয়ে।
‘ছড়া’র মধ্যে অর্থনৈতিক অসমতায় নিষ্পেষিত জীবনের মমর্স্তুদ প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত হয়েছে এভাবে-
বন-বাদাড়ে যাইনি মাগো
ফুলের বনেও না
রাঙা খাদির অভাবে মা
পাতায় ঢাকি গা।
‘ছড়া’য় লিয়ানা নামের যে পাহাড়ি মেয়ের কথা বলা হলো তার মত অনেকের জীবনবাস্তবতা বড়ই করুণ –
চিবিদ গাছের ছায়ার পিনোন্,
অঙ্গে জড়িয়ে
পাঁচ পাহাড়ের খাদের নিচে
যাচ্ছি গড়িয়ে।
আবার চাকমা মেয়ে রাকমা’র জীবন বিপন্ন হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে। পাহাড়ি উপত্যকায় যে ফসল হত এখন সেটা সম্ভব নয় জলাবদ্ধতার কারণে। ফলে তাদের জুম চাষ ব্যাহত হয়েছে পাহাড়ি জনপদ স্বচ্ছলতা হারাচ্ছে এভাবে –
চাকমা মেয়ে রাকমা
ফুল গোঁজে না কেশে
কাপ্তায়ের ঝিলের জলে
জুম গিয়েছে ভেসে।
জুম গিয়েছে ঘুম গিয়েছে
ডুবল হাঁড়িকুড়ি,
পাহাড় ডোবে, পাথর ডোবে
ওঠে না ভুরভুরি।
‘মনপবনের নাও’তে আবহমান কালের বহমান নদীতল এখন বালুস্তূপে ভরপুর যা ড্রেজার দ্বারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় কবি আহত হয়েছেন। শুধু তাই নয় ফল-ফসলবিহীন চরবাসীদের অভাবী জীবনে সমৃদ্ধির নৌকার আগমন প্রত্যাশা করেছেন –
শুকনো নদীর তলপেটে ঐ
ড্রেজার যখন হাতড়ায়,
ধানের খেতে পাওয়ারটিলার
ক্লান্ত হয়ে কাৎরায়. . .
কান্না থেকে কাব্য লেখার
চাও কি কোনো মওকা?
দুঃখী লোকের চরের কাছে
ভিড়াও তবে নৌকা।
‘বোশেখ’ ছড়ায় প্রকৃতির রুদ্ররূপে কবি ব্যথিত হয়েছেন। বৈশাখের তাণ্ডবে সম্পদশালী মানুষের অট্টালিকার ন্যূনতম ক্ষতি না হলেও গরিব মাঝির পালের দাঁড় ছিঁড়ে কিংবা গরিব চাষীর ভিটে গুঁড়িয়ে বোশেখের স্বার্থকতা কোথায়। বরং অত্যাচারীর অট্টালিকা ধ্বংস করে ধনী-গরিবকে একই সমতলে আনার জন্য বোশেখের তাণ্ডবের কাছে প্রার্থনা করেছেন-
ধ্বংস যদি করবে তবে, শোনো তুফান
ধ্বংস করো বিভেদকারী পরগাছাদের
পরের শ্রমে গড়ছে যারা মস্ত দালান
বাড়তি তাদের বাহাদুরি গুঁড়িয়ে ফেলো।
‘ঝালের পিঠা’র মধ্যে মানুষ ও প্রকৃতির ক্ষুদ্র সৃষ্টি ব্যাঙ কীভাবে ক্ষুধায় কাতর হয়ে উৎকণ্ঠিত বুভুক্ষু জীবন-যাপন করছে তার চকিত-চিত্র অঙ্কিত হয়েছে –
ঝালের পিঠা, ঝালের পিঠ
কে রেঁধেছে কে?
এক কামুড়ে একটুখানি
আমায় এনে দে।
কোথায় পাবো লঙ্কাবাটা
কোথায় আতপ চাল,
কর্তফুলীর ব্যাঙ ডাকছে
হাঁড়িতে আজকাল।
বাঙালি বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী শাসক দ্বারা শোষিত বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু মুখবন্ধ করে সবকিছু সহ্য করেনি, কখনো কখনো রুখে দিয়েছে। এজন্য ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন অধিকার আদায় সংগ্রামে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে।
‘একুশের কবিতা’র ছড়ার মধ্যে বাঙালির দীর্ঘদিনের সংগ্রামী বীর সেনানীদের স্মরণ করেছেন। ছড়ার শুরুতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও বাংলার বিপ্লবী সন্তান ক্ষুদিরাম, নিসার আলী ওরফে তিতুমীর প্রমুখের বীরত্বের প্রসঙ্গ সশ্রদ্ধ স্মরণ করেছেন। একুশের শহিদদের স্মরণ করেছেন এভাবে –
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুরবেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত।
তিতুমীর-ক্ষুদিরামকে স্মরণ করেছেন এভাবে –
প্রভাতফেরির মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।
চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে
মুক্ত বাতাস কিনতে?
আর বাংলা যে কবির মায়ের ভাষা, মধুর চেয়ে পেয়তে শ্রেয়সুধা – তা গোপন রাখেননি :
প্রভাতফেরি, প্রভাতফেরি
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।
‘নোলক’ এক অসম্ভব শিল্প সমৃদ্ধ কবিতা। বাঙালির স্বাধীকার-স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে আছে যে, মায়ের ‘নোলক’ তা বারবার বিদেশি-বিজাতি-বিভাষী দ্বারা লুণ্ঠিত হয়েছে। আজ পূর্ব বাংলায় বসে জননী জন্মভূমির সে নোলক না নিয়ে কবি ঘরে ফিরবেন না। বড় বড় রাঘব বোয়াল মাৎস্যন্যায়ের দ্বারা বাংলা নিগৃহীত হলেও আজ সাধারণ ছাত্রজনতা একাট্টা হয়ে জন্মভূমির সমৃদ্ধির প্রতীক ঐ হারানো নোলক না নিয়ে ঘরে ফিরবে না বলে কবি প্রত্যয় দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন –
আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
[. . .]
বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দিবে ভাই,
আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে চেতে চাই।
[. . .]
এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা
আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।
‘ঊনসত্তরের ছড়া-১’ ও ‘ঊনসত্তরের ছড়া-২’ ছড়াগুলোতে ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থানের সেই অগ্নিগর্ভ সময় খণ্ডকে ধারণ করা হয়েছে। আগরতল ষড়যন্ত্রমূলক মামলার সূত্রধরে বীর বাঙালি ফুসে উঠতে শুরু করে। ১১ দফার হাত ধরে পূর্ব-পাকিস্তানে আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছে ১৯৬৯ এর জানুয়ারি মাসে। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ কিংবা ‘তোমার দেশ, আমার দেশ, বাংলা দেশ বাংলা দেশ।’ এই স্লোগান সেদিন মন্ত্রমুদ্ধের মতো মিছিলগুলোতে উচ্চারিত হত। বিশেষ করে ১৯৬৮ র ডিসেম্বরের শুরু থেকে ১৯৬৯ র জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আন্দোলন অগ্নিস্ফূলিঙ্গের মতো তীব্রতা ছড়ায় ছাত্র-জনতার মধ্যে। ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহিদ হন ছাত্র নেতা আসাদ এবং ২৪ জানুয়ারি সচিবলায়ের সামনে থেকে একটি মিছিল বের হলে সেনাবাহিনীর গুলিতে শহিদ হন স্কুলছাত্র মতিউর ও রুস্তম আলী নামক জনৈক ব্যক্তি। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি গণজোয়ার রুদ্ধ করার জন্য সান্ধ্যআইন জারি করা হয়। কিন্তু কাউকে সেদিন আর ঘরে রাখা যায়নি। জেলের মধ্যে নিহত হন সার্জেন্ট জহিরুল হক। রাবির তৎকালীন অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা শহিদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে। এই সংবাদ বারুদের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আইয়ুব খান এ অভ্যুত্থানে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ইতিহাসের এ বাঁক নির্মিত পেয়েছে উপরযুক্ত ছড়াতে। যেমন-
ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
ট্রাকের মুখে আগুন দিতে
মতিয়ুরকে ডাক।
কোথায় পাব মতিয়ুরকে
ঘুমিয়ে আছে সে!
তোরাই সব সোনামাণিক
আগুন জ্বেলে দে।
ইয়াইয়া খানের সকল রাজনীতিকে বাংলার দামাল ছেলেরা কীভাবে রুখে দিয়েছে কিংবা দীপ্ত পদব্রজে হেঁটে কারফিউ-সান্ধ্যআইন অমান্য করেছে দেখুন:
লাল মোরগের পাখা ঝাপট
লাগল খোয়াড়ে,
উটকোমুখো সান্ত্রি বেটা
হাঁটছে দুয়ারে।
খড়খড়িটা ফাঁক করে কে
বিড়াল – ডাকে ‘মিউ’,
খোকন সোনার ভেংচি খেয়ে
পালাল কারফিউ।
কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম ও হিন্দু মিথের এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চমৎকার প্রয়োগ করেছিলেন। আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ মুসলিম মিথ প্রয়োগে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। এ ধারার যোগ্য উত্তরসুরী আল মাহমুদ। ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ ছড়াগ্রন্থে স্বল্প অবয়বে সে প্রয়োগ পাঠককে সত্যি আকৃষ্ট না করে পারে না। ‘পাখির মতো’, ‘বোশেখ’, ‘তারিকের অভিলাষ’ প্রভৃতি ছড়ায় সেটা প্রত্যক্ষ করা যায়। সবাই যখন রাতের আধারে গভীর ঘুমে মগ্ন থাকেন তখন কবির শৈশব কালে ইচ্ছা জাগত নদী ধারে থাকতে, পাখির মতো ডালে ডালে লুকাতে। শুধু তাই নয় –
সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
কর্তফুলির কূলটায়।
দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি
ফেরেস্তারা উল্টায়।
তখন কেবল ভাবতে থাকি
কেমন করে উড়বো,
কেমন করে শহর ছেড়ে
সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো।
তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হবো
পাখির মতো বন্য।
‘বোশেখ’ ছড়ায় বায়ুপুত্র হনুমানের প্রসঙ্গ আছে এবং মুসলিম পয়গম্বর সুলায়মানের প্রসঙ্গ আছে। সোলেমান যেমন জীব ও প্রকৃতি রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন ঠিক বোশেখ যেন সোলায়মানের আদেশ হয়ে ধনীর গর্ব চূর্ণ করে ধনী-গরিবের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয় :
হায়রে কত সুবিচারের গল্প শুনি,
তুমিই নাকি বাহন রাজা সলোমনের
যার তলোয়ার অত্যাচারীর কাটত মাথা
অহমিকার অট্টলিকা গুঁড়িয়ে দিত।
আল মাহমুদ লোকজ জীবনের কবি। শহরে দীর্ঘদিন বাস করলে নিজ গ্রামের কুরুলিয়া বিলের কৈ মাছ সমহিমায় ‘সোনালি কাবিনে’ জায়গা করে নিয়েছে। অন্তরদৃষ্টিতে আবহমান বাংলার রূপ-রসকে কবি ধারণ করেছেন নিযুত প্রত্যয়ে। ‘ভরদুপুরে’, ‘পাখির মতো’ ছড়ায় সেটা চমৎকারভাবে ওঠে এসেছে।
‘ভরদুপুরে’ :
শাপলা ফুলের শীতল সবুজ পালিশে
থাকবে খোকন ঘুমিয়ে ফুলের বালিশে।
‘পাখির মতো’ :
আম্মা বলেন, পড়রে সোনা
আব্বা বলেন, মন দে;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।
আমার কেবল ইচ্ছে জাগে
নদীর কাছে থাকতে,
বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে
পাখির মতো ডাকতে।
‘মনপবনের নাও’ এর কবিভাষাটা সত্যি কাছে টানে সবাইকে –
গাঁয়ের দিকে উড়াল মারো
শব্দ চুরির ইচ্ছায়
ইচ্ছেমত শব্দ পাবে
দাদি নানির কিচ্ছায়।
চিলের মতো ওপর থেকে
মিলের দিকে ঝুঁকবে।
শীতলপাটি বিলের পানি
একটুখানি শুকবে।
প্রকৃত অর্থে আল মাহমুদ বহুমাত্রিক কবি, জীবনবাদী কবি, তাঁর কবিদৃষ্টি সমকালীন সময় সমাজ মানুষকে ধারণ করার পাশাপাশি অনন্ত-সৌন্দর্যকেও অবলীলায় আত্মস্থ করেছেন।
[উদ্ধৃত ছড়াগুলো ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ থেকে সংকলিত যা ২০১৮ সালে ঐতিহ্য কর্তৃক প্রকাশিত আল মাহমুদ রচনাবলি একাদশ খণ্ডে সংযুক্ত রয়েছে।]