কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম মনে নেই। যখন উঠলাম তখন দেখলাম জাপান পৌঁছাতে আরও ঘণ্টা খানেক সময় লাগবে। মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভাললাগার অনুভূতি কাজ করছিল। এত কষ্টের অবসান হতে চলছে। প্লেনের খাবার ভাল লাগেনি। তবে এক ধরণের বিস্কিট দিয়েছিল যা ছিল খুব সুস্বাদু । জ্যুস খেতে খেতে অস্থির হয়ে গেলাম। আরও কিছুক্ষণ চলার পর প্লেন নিচে নামতে শুরু করল। জাপানের ভূখন্ড দেখতে পেলাম। তখন বিকেল ৪ টার মতো বাজে। অল্প কিছুক্ষণ পর প্লেন নারিতা বিমানবন্দরে নামল । খুব বেশী ভাল লাগছিল সবকিছু। নামার পর ইমিগ্রেশনে চলে গেলাম। ব্যবহার খুব ভাল। এক মিনিটের মধ্যেই কাজ হয়ে গেল। তবে ফাইনাল চেকিং বাকী ছিল। আমার ভয় ছিল লাগেজের ভেতর বোমা সদৃশ রসকদম নিয়ে ধুম্রজাল তৈরি হবে। আশংকা সত্যে পরিণত হল। কাস্টমস অফিসার খুব বিগলিত ভাবে লাগেজ খুলতে বলল । খুললাম। রসকদমের প্যকেটের দিকেই তার দৃষ্টি গেল প্রথমে। জহুরী মাণিক চেনে! … চেনে কচু। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জানতে চাইল সেগুলো কি ?
বললাম সুইটমিট। উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হল। আমার বোন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করছে জেনে তাদের ব্যবহার মধুর মতো হয়ে গেল। লাগেজ খোলার জন্য সরি চাইল। আরিগাতও গোজাইমাস বলে প্রস্থান পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। নিশ্চিত ছিলাম কেউ না কেউ আসবেই। জাপান যদি ভূমিকম্পে ব্যপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা বেঁচে থাকে তবেও তারা এয়ারপোর্টে আসবে। যদিও বাসা থেকে যাওয়ার সময় আব্বা আম্মা কিভাবে পাপলুর বাসায় পৌঁছাতে হবে তার বিস্তারিত বলে দিয়েছিল । আমি আর্সেনিক নিয়ে যে স্যারের সাথে কাজ করি তিনিও জাপান থেকে পিএইচডি করেছেন। আমাকে যাওয়ার আগ দিয়ে বললেন- জাপানে অন্ধও পথ চলতে পারে। এত সুন্দর তাদের ব্যবস্থা। প্রস্থান দিয়ে বের হতেই দেখি শুভর হাসিমাখা মুখ। মনটাই ভাল হয়ে গেল। দীর্ঘ কোলাকুলির পর ট্রেনে চেপে বসলাম। এয়ারপোর্ট থেকেই ট্রেন ছাড়ে ।
জাপানি ভাষায় দেনসা। শুভ আবার টার্কিশ কেবাব নিয়ে এসেছিল। কেবাব মানে অন্য কিছু নয় কাবাব টাইপের জিনিস । শুধু নামটার কিঞ্চিৎ পার্থক্য । পাপলু আসতে পারেনি কারণ ফাইজানের জ্বর ছিল। আরও কেন আসতে পারেনি পরে বলছি সেকথা। টার্কিশ কেবাব অসাধারণ লাগল । আমার ভাসায় অসাম। একটা খেতেই পেট ভরে গেল। শুভ ২ টা এনেছিল। যে ট্রেনটাতে যাচ্ছিলাম সেটা শিনকানসেনএর ছোট ভাই। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ কিমি চলে। তবে ভেতর থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। কোন ঝাঁকুনি নেই। আমরা নিপ্পরি বলে একটা জায়গাতে এসে ট্রেন পালটালাম । কি অসাধারণ ব্যবস্থা। জাপানের ট্রেন সিস্টেম দেখে প্রথম দিনেই মন ভাল হয়ে গেল যা আজ পর্যন্ত থেকে গেছে। পরের স্টেশনে এসে দেখি শুভর মানিব্যগ হাওয়া। দুজনেরই মন খুব খারাপ হয়ে গেল। টাকার জন্য নয়।
সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ছিল। তারা আমেরিকায় চলে যাবে। অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে। শুভ সহজে বিচলিত হয়না। এবার একটু বিচলিত মনে হল। আমারও মন খুব খারাপ হয়ে গেগল। কি আর করা। সব ষ্টেশন এ যেয়ে তো আর খোঁজা যাবেনা। কমপ্লেন করে মন খারাপ করে দুইজন এসে যতদূর মনে পড়ে হিগাশি জুজও ষ্টেশনে এসে নামলাম। সেখানে থেকে পাপলুর বাসা হাঁটা দূরত্ব। ১০ মিনিটের মতো লাগে। নেমে হাঁটা ধরলাম। রাত হয়ে গিয়েছিল। মুগ্ধতা শুরু হল। কোন হৈচৈ নেই। রাস্তাঘাট পরিষ্কার। সবকিছু সাজান গোছান। অনেককে সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখলাম। কিছুক্ষণ পর পাপলুর বাসার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ৭ তলায় বাসা। ২৩ কেজি ওজনের লাগেজ শুভ একাই টেনে আনল। এই ধরনের ছেলেকে কি না ভালবেসে পারা যায়? লিফট দিয়ে ৭ তলায় উঠলাম।
দরজা খুলেই দেখলাম পাপলু দাঁড়িয়ে। ভিনদেশে ভাইবোন দেখা হলে কেমন লাগে যাদের অভিজ্ঞতা আছে তারা জানে। যাদের নেই তারা কোনদিন বুঝবেনা। সুতরাং সে বিষয়ে বিস্তারিত বললাম না। ভাই আসবে জেনে পাপলু অনেক কিছু রান্না করেছে সারাদিন ধরে। কেকও বানিয়েছিল। অনেক পরিশ্রম করেছে সারাদিন। টেবিলে খেতে বসে তো চক্ষু চড়কগাছ। আমি চিংড়ি খুব পছন্দ করি। পাপলু সেটা জানে। এত বড় চিংড়ি আমি কখনও খাইনি। স্যমন মাছও খেলাম। টুনার কাবাব ছিল। মাংসও ছিল। সবশেষে একটা নাম না জানা ফল খেলাম এবং সেই ফলের ভক্ত হয়ে গেলাম। এদিকে যখন খেতে বসেছি তখন শুভর মোবাইলে একটা কল এল। শুভ জাপানি ভাষায় কি কি সব বলল একবর্ণও বুঝতে পারলাম না। ও অনর্গল জাপানী বলতে পারে। তারপর বলল মানিব্যগ পাওয়া গেছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। এ ধরণের ঘটনা অনেক শুনেছি । কিন্তু এবার নিজের সামনেই সব ঘটল । আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। শুভ মানিব্যগ আনার জন্য চলে গেল। ভাই বোনের আড্ডা যেন শেষই হয়না। ক্লান্তি সব কোথায় গেল কে জানে। কিছুক্ষণ পরে শুভ আসার পর আরেক প্রস্থ আড্ডা। কোথায় কোথায় যাব পাপলু দেখি সব প্ল্যন করে রেখেছে।তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আগামীকাল ওদায়বা শহর দিয়ে আমার জাপান ভ্রমণ শুরু হবে।
২
ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল। বাইরে ছিল খুব ঠান্ডা। কিন্তু ঘরের মধ্যে বোঝার উপায় নেই। সকালে নাস্তা করলাম। রুটি, ডিম, মাংস, মিষ্টি, পুডিং, কেক,ফল আর এক কাপ লাল চা। পাপলুই কষ্ট করে বানিয়েছিল। শুভ সাহায্য করল। আমি সাহায্য করতে চাইলাম নিলনা। শুভ ফাইজানকে নিয়ে হোকুইন চলে গেল। ফাইজান এর সাথে প্রায় ৫ মাস পর দেখা। মামাদের সাথে মনে হয় ভাগ্নেদের একটা আলাদা সুন্দর সম্পর্ক থাকে। ফাইজান ও মামাকে পছন্দ করে ফেলল। হোকুইন যাবার সময় খুব মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। এত মিষ্টি হয়েছে দেখতে! আমি আর পাপলু বের হলাম। মিনিট পাঁচেক হাঁটলাম। ষ্টেশনে যেয়ে ট্রেনে উঠলাম। একটা জায়গায় যেয়ে পাপলু দ্রুত নেমে গেল। আমি নামতে যেয়েই দেখি ট্রেনের গেট দ্রুত বন্ধ হয়ে গেল। আমি বুঝতেই পারিনি এত দ্রুত গেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হতে পারে। বন্ধ হওয়ার সময় শুধু পাপলুর উদ্বিগ্ন মুখ আর একটা আওয়াজ পেলাম, ভাইয়া পরের স্টেশন। ট্রেন ছেড়ে দিল। বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। জাপানে সিম কেনা একটু ঝামেলার। মোবাইল আছে কিন্তু সেটা ছবি তোলা ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
পকেটে ইয়েন নেই, ডলার আছে। কিন্তু ট্রেনের টিকিট কাটতে ইয়েন লাগবে। নামার পর কি হবে ভাবতে একটু ভয় পেয়ে গেলাম। শীতের মধ্যেও বুঝতে পারলাম ঘামতে শুরু করেছি। পাপলু যেহেতু পরের ষ্টেশন বলেছিল তাই পরের ষ্টেশনে নেমে গেলাম। নেমে এদিক ওদিক তাকাতে থাকলাম। কিছুই তো চিনিনা। যে ট্রেনে উঠেছিলাম সেগুলো ২ মিনিট পরপরই থামে। একটু পর দেখি পাপলু দৌড়ে আরেকটা ট্রেন থেকে নেমে আমার দিকে আসছে। মুখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা আর অসহায় মুখ। ভাইকে হারিয়ে দিশেহারা অবস্থা। আমাকে দেখার পর একটু স্বাভাবিক হল। যত ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে জাপানে এসেছি সে তুলনায় এটি তেমন বড় কিছু নয়। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম আমি যদি পাপলুর পরের স্টেশনে নামার নির্দেশনা বুঝতে না পারতাম তাহলে বিপদই হত।তারপর আবার যাত্রা শুরু হল। ট্রেন পাল্টে আমরা অন্য ট্রেনে চড়ে ওদায়বা পৌঁছালাম । ওদায়বা একটা কৃত্রিম দ্বীপ। অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে জাপান দেশ। কিন্তু এটির বৈশিষ্ট্য এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি। অসম্ভব সুন্দর করে তৈরি করা। আমার ভাষায় অসাম। প্রথমেই প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে চলে গেলাম।
সাগরে কিছু জাহাজ চলছিল। চড়ার ইচ্ছা ছিল। সময় স্বল্পতায় চড়া হলোনা । সিগাল দেখলাম। প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি মনোরম। আমি বিভূতিভূষণের মতো বা জীবনানন্দের মতো সে সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারবো না; তবে শুধু এটুকু বলি এগুলো আমার মনের মধ্যে সারাজীবন গেঁথে থাকবে। সেসব স্মৃতি মনে করে কষ্টের সময়েও কিছুটা শান্তি পাব। আমেরিকার আদলে তৈরি করা স্ট্যাচু অব লিবারটি দেখলাম। পাপলু অনেকবার গেছে সেখানে। তাই আমার মতো মুগ্ধ হলো না। সেখান থেকে ভাইবোন একটা শপিং মলে চলে এলাম। সেখানে দেখলাম কুকুরছানা বিক্রি হচ্ছে দাম প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি। আমি প্রথমে ৫০০০ ভেবেছিলাম। দুইটা ০০ খেয়ালই করিনি। ঘুরে দেখলাম। জাপানে সস্তায় কিছু পাওয়া যায়না! সবকিছুই খুব ব্যয়বহুল মনে হলো। তারপর আমরা বাস ষ্টেশনে এসে দাঁড়ালাম। শপিং মলের পাশেই বাস দাঁড়ায়। ১১-৪৩ এ বাস আসার কথা ছিল। ১১-৪৩ এই আসল। আবার মুগ্ধ হলাম। আমি পাপলু আর দুই একজন ছাড়া বাসে কেউ ছিলোনা । এগুলো টুরিস্ট বাস। ভাড়াও লাগল না। বাস চলতে শুরু করল। কোন হর্ন নেই, নেই কোন জ্যাম। রাস্তাঘাট চমৎকার ।
আশেপাশের সবকিছুই ছবির মতো সাজান। কোথাও এতটুকু ময়লাও চোখে পড়লোনা। সেখান থেকে চলে এলাম মিরাইকানে। মিরাইকান হচ্ছে বিজ্ঞান জাদুঘর। ভেতরে ঢুকে অবাক হলাম। কত কিছু সেখানে। পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞান যাতে সবাই বুঝতে পারে তার সবকিছুই আছে এখানে। বিজ্ঞান বিষয়টা যে মজার এবং মুখস্তের নয় এখানে আসলে বোঝা যাবে। সবকিছু সব সুন্দরভাবে বলা আছে সেখানে। ভাবলাম ইস! আমার মেয়ে যদি এসব দেখতে পেতো। আমার মেয়ের বয়সী বেশ কিছু বাচ্চা দেখলাম। আমার মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল! সবাই ফর্সা, লাল টুকটুকে গাল কিন্তু চোখ দুটো ছোট। সহজ সরলভাবে বড় হচ্ছে। জীবন অনেক সহজ সেখানে। আগে কি ছিল বর্তমানে কি হচ্ছে আর ভবিষ্যতে কি হবে সবই দেয়া আছে জাদুঘরে। ভবিষ্যতে এক্সরে কেমন হবে সেটাও দেখলাম। ভবিষ্যতের ওষুধ এবং রোগ নির্ণয় পদ্ধতি কেমন হবে তারও ধারণা দেয়া আছে মিরাইকানে। সেদিন ছিল বাচ্চাদের জন্য ফ্রি।
কিন্তু বড়দের ফ্রি ছিলনা। আমরা ঢোকার কোন টিকিট চেকারও চোখে পড়লো না। তাও বের হয়ে এসে টিকিট কাটলাম আমরা। তারপর ভাইবোন বার্গার আর ড্রিংকস খেতে থাকলাম। ট্র্যাভেল বাসের অপেক্ষায় থাকলাম। খাওয়া শেষ হতে না হতেই বাস চলে এল। এরপর গেলাম ভেনাস ফোরটে। খাসা জায়গা। ভেনিসের আদলে তৈরি । ইউরোপ ইউরোপ ভাব আছে। আমরা পুরোটা ঘুরে দেখলাম। ইউরোপের স্থাপত্য আমাকে আকর্ষণ করে। আমার খুব ভাল লাগল। ভেতরে কেনাকাটার ভাল ব্যবস্থা আছে; তবে এক্সপেন্সিভ মনে হল। টয়োটা কার মিউজিয়ামে গেলাম। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। সেদিন বন্ধ ছিল। উঁকি দিয়ে যেটুকু দেখা যায় দেখলাম। খুবই সুন্দর জায়গা। যারা ভবিষ্যতে জাপানে আসবেন তারা অবশ্যই এই জায়গায় আসবেন। ঘোরা শেষ করে আমরা আবার স্টেশনের দিকে গেলাম। সুন্দর স্বপ্নের মতো সুন্দর একটা দিন কেটে গেল।
৩
এরপর আমরা ট্রেনে চড়ে রোপ্পঙ্গির দিকে গেলাম। কেউ আবার চৌরঙ্গি বা সেরকম কোন এলাকা মনে করেন না। যদিও কলকাতার চৌরঙ্গি আমার কাছে যথেষ্ট আকর্ষণীয় লেগেছিল। যাই হোক আমরা রোপ্পঙ্গি তে গেলাম। সেখানে শুভর অফিস। রোপ্পঙ্গি হচ্ছে টোকিওর মাঝে অবস্থিত। অভিজাত এলাকা। বাংলাদেশের গুলশানের মতো । অনেক দেশের এম্বেসি এখানে আছে। টোকিওর মাঝে বিখ্যাত এলাকা। যখন রোপ্পঙ্গি তে পৌঁছালাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। পাপলু নিয়ে গেল শাহিফা কাবাব ঘরে। অভিজাত রেস্তোরাঁ । সবকিছু এক্সপেন্সিভ। শুভকে ফোন দেয়া হল। আমরা ঢুকে খাবার অর্ডার দিলাম। আমি নিলাম নান রুটি আর কাবাব। বাকীরা বিরিয়ানি খেল।
আমি কিছু বিরায়ানির ভাগও পেলাম আর স্বগতোক্তির সাথে বললাম, না না কি দরকার ছিল! অনেক বিল এল। কত বিল এল সেসব বলে আমি পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাইনা। খাবারের মান খুব ভাল। ওদায়বাতে অনেক হাঁটতে হয়েছিল। খিদেও লেগেছিল খুব। শাহিফাতে ঢোকার কিছুক্ষণ পরেই সুপ দিয়ে গেল। কমপ্লিমেনটারি। খেতে খুব সুস্বাদু । হালাল খাবার। অনেক মুসলমানকে সেখানে খেতে দেখলাম। আমাদের খাবারের যে অর্ডার নিয়ে গেল তিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান। খাবার খেয়ে তিনজন বের হয়ে রোপ্পঙ্গি তে হাঁটতে থাকলাম। শুভর অফিসের কাছে গেলাম। অভিজাত এলাকায় হাঁটতে ভালই লাগছিল। তারপর এক জায়গায় চা খেলাম। এত ভাল লাগল কিছু কিনে নিলাম। শুভ অফিসে চলে গেল। ভাইবোন ট্যাক্সি নিয়ে টোকিও টাওয়ার দেখতে গেলাম। টোকিও টাওয়ার প্রায় ১০০০ ফিট লম্বা। ১৯৫৮ সালে তৈরি করা হয়। আইফেল টাওয়ারের আদলে তৈরি করা। জাপানের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার টোকিও স্কাইট্রি। এর পরেই টোকিও টাওয়ার ।
আমরা ট্যাক্সি নিয়ে যখন গেলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ফেরার তাড়া ছিল। উপরে আর উঠলাম না। আমার কিছুটা উচ্চতা ভীতি আছে যদিও প্লেনে উঠলে সেটা আর মনে থাকেনা। টাওয়ারের নিচে অনেক দোকান চোখে পড়ল । প্রচুর পর্যটক চোখে পড়ল। কোন বাঙালিকে দেখলাম না! তারপর আমরা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে টোকিও ডেন্টাল এন্ড মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এলাম। পাপলু এখানেও কিছুদিন কাজ করেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসের শাহাঙ্গির ছিল সেখানে। ওকে ফোন দিলাম। এল। পিএইচডি করছে সেখানে। কাজের চাপে কিঞ্চিত বিধ্বস্ত । কিছুক্ষণ গল্প করলাম। মেডিকেলে যেতে চাইলাম। অনুমতি নেই তাই যেতে পারলাম না। একটা হাসপাতাল এমনই হওয়া উচিত। আজকাল হাসপাতালে প্রায়ই নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির খবর পাই। এর বেশীরভাগই ঘটে রোগীর সাথে থাকা উটকো লোকের কারণে । যাই হোক এরপর আমরা বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ফেরার পথে ফাইজানকে হোকুইন থেকে নিতে গেলাম। আমাকে ভেতরে যেতে দিল কিন্তু একেবারে ভেতরে যেখানে বাচ্চারা থাকে সেখানে যেতে দিলনা। বাচ্চাদের চমৎকার ব্যবস্থা হোকুইনে ।
খেলাধুলা, খাবার খাওয়ানো, ঘুম, পড়া সবকিছুর ব্যবস্থা আছে সেখানে। আমাদের এখানে কর্মজীবী মায়েরা খুব কষ্ট পায়। বাসায় বাচ্চা রেখে যেয়ে তারা অফিসে তেমন মন বসাতে পারেনা। সবসময় টেনশনে থাকতে হয়। এসব পরিস্থিতির ভাল সমাধান হোকুইন। কবে আমাদের দেশে হবে এসব? ফাইজান মা আর মামাকে একসাথে দেখে খুবই খুশি হল। তারপর আমরা আড়াই জন মিলে বাসার দিকে হাঁটা দিলাম। বাসায় এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। তারপর শুরু হল আবার খাবার দাবারের অত্যাচার । ভরপেট খাবার পর কিছুটা নিদ্রার আমেজ অনুভব করলাম। টিভি দেখলাম। জাপানি প্রোগ্রাম হচ্ছে। খুব একটা উৎসাহ পেলাম না। রাতে চমৎকার আড্ডা হল। ২৩ তারিখ হিরোশিমা যেতে হবে। প্লেনের টিকিট কাটা ছিল। জাল এয়ারলাইন্সে। গল্প করতে করতে ঘুম এসে গেল। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম মনে নেই। পাপলুর চিৎকারে ঘুম ভাঙল। প্রবল ভূমিকম্প টের পেলাম। সবার আতংকিত মুখ। এত ক্লান্ত ছিলাম চোখও পুরোপুরি খুলতে পারছিলাম না। নিচে নামতে হবে কিনা সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হলোনা। জাপান হচ্ছে ভূমিকম্পের দেশ। তাদের এমন শত শত অভিজ্ঞতা আছে। আমি সেখানে নতুন। ভয় আমারই পাওয়ার কথা। কেন জানি পেলাম না। অতিরিক্ত ক্লান্তিও একটা কারণ হতে পারে। আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। সকালে এই নিয়ে অনেক হাসাহাসি হল। দেশে ফেরার পর ওয়ার্ডেও এই নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমি জাপানে গেলাম আর পরেরদিনই ভূমিকম্প হল! ব্যপারটা আসলে কাকতালীয়। এর সাথে আমার বা কারো কোন সম্পর্ক নেই।
ভেবেছিলাম একা একা জাপান ঘুরবো। কিন্তু কি ভাবলাম আর কি হলো। পাপলু একা একা কোথাও বের হতে দিবে না। কি আর করা। পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে। পরের দিন সকালে খিচুড়ি আর ডিমের ভাজির আয়োজন ছিল। সাথে ছিল আম্মার দেয়া আচার। সবচেয়ে বেশী যেটা ভাল লাগছিল তা হচ্ছে তাজা ফল। পাপলু আমার জন্য বেশ কিছু ফল কিনে রেখেছিল। টাটকা ফলের স্বাদই আলাদা। চা খাওয়া হলো বেশ কয়েকবার। তারপর বের হলাম। প্রথমে গেলাম টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে । ট্রেনে গেলাম। পাপলুর কর্মস্থল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতেই মানুষসহ একটি কুকুরের মূর্তি দেখলাম। কুকুর প্রভুভক্ত আমরা জানি। কিন্তু মূতি পেছনের ইতিহাস জেনে চমকিত হলাম। কুকুরটি তাঁর মালিক, টোকিও বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর উয়েনোর জন্য টানা দশ বছর ধরে ট্রেন স্টেশনে অপেক্ষা করেছিল। এই অসামান্য ঘটনার সম্মানে বানানো হয়েছে মূর্তি।পরে দেখা হয়েছিল কিনা জানিনা। অদ্ভুত ঘটনা সন্দেহ নেই। মানুষ কত অকৃতজ্ঞ আর সেখানে…।
এগিয়ে গেলাম কিছুদূর। মেডিকেল ফ্যকালটি চোখে পড়ল। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনেকটা ইউরোপীয় ধাঁচে তৈরি। আমি আগেই বলেছি আমি ইউরোপীয় স্থাপত্যের গুণমুগ্ধ ভক্ত। প্রথমে গেলাম স্টুডেন্ট সেন্টারে । সেখান থেকে গেলাম ক্যফেটেরিয়াতে। ছাত্র ছাত্রীরা বসে নাস্তা করছিল। ভাইবোন বসে কফি খেলাম। আমাদের প্ল্যান ছিল সারাদিন টোকিও ঘুরবো । দ্রুত বের হয়ে এলাম। আজ আর এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ হলোনা। বিশ্ববিদ্যালয় হেঁটে হেঁটে যতদূর সম্ভব ঘুরে দেখলাম। মেধাবী পরিশীলিত শান্ত মানুষগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কয়েকজন নোবেল পুরস্কারও পেয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাদের অনেকের ভাস্কর্য তৈরি করে রাখা হয়েছে এখানে সেখানে। কোন হৈচৈ হট্টগোল দেখলাম না। বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রী চোখে পড়ল। বেশ কিছু মনোমুগ্ধকর রঙিন গাছপালা চোখে পড়ল।
চিনতে পারলাম না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী ) ড. নাদেরুজ্জামান চাচা আমাকে অনেক গাছ চিনিয়েছিলেন। তার কথা হঠাৎ মনে পড়ল। এরপর আরও কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। মুগ্ধ হয়ে সেখান থেকে বের হলাম। ট্রেনে উঠলাম । ডায়েটে চলে গেলাম। ডায়েট জাপানের সংসদ ভবন। ডায়েট টোকিওর চিওদাতে অবস্থিত এবং ১৯৪৭ সালে তৈরি হয়। অপূর্ব সুন্দর দেখতে। চারিদিক দিয়ে ঘুরে দেখলাম। চমৎকার, খাসা, উৎকৃষ্টসহ আরও যা যা বিশেষণ সবই এর জন্য প্রযোজ্য । ভেতরে যাবার সুযোগ ছিল। কিন্তু তার জন্য ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে। দ্বিধায় পড়লাম। একজনকে অনুরোধ করলাম। লাভ হলো না। জাপানীরা নিয়মের প্রতি বেশ শ্রদ্ধাশীল। এজন্য চারপাশের সবকিছু খুব স্নিগ্ধ মনে হয়। বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েনা। আশেপাশে অনেক সুরম্য অট্টালিকা চোখে পড়ল। জানতে পারলাম সেগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং অফিস। খুবই সুন্দর লাগছিল দেখতে। তারপর আবার ট্রেনে চড়ে ইম্পেরিয়াল প্যালেসে গেলাম। মাত্র ২ মিনিটের মতো সময় লাগলো। ইম্পেরিয়াল প্যালেসে রাজা এবং তার পরিবার থাকেন।
বিরাট পার্কের মতো এলাকা। সুন্দর বাগান চোখে পড়ল। প্রায় ৩ বর্গকিলোমিটারের মতো বড়। ভাইবোন অনেকদূর হেঁটে হেঁটে ঘুরলাম। পা ব্যথা হয়ে যাচ্ছিল। বসারও ব্যবস্থা আছে। অনেক পর্যটক আসে সেখানে। বিরাট এক মাঠ আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে ভয়ংকর রকমের সুন্দর লাগে। ভাবলাম মাঠে বসে থাকি। পাপলুর আমেরিকা যাবার তাড়া ছিল। মাত্র ১০ দিনের ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম। মনে হল বিরাট ভুল হয়েছে। কিন্তু উপায় ছিলনা। বেঁচে থাকলে ইনশাআলাহ্ আবার যাব । মাঠে বসে থাকব। এত সুন্দর জায়গা বারবার দেখলেও মনের সুখ মিটবেনা। তার ভেতরে যেখানে রাজা এবং তার বংশধর থাকেন সেদিকে বেশ কড়াকড়ি । কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়না। রাজাকে খুব সম্মান করে তারা। অত্যন্ত ভাল অভিজ্ঞতা নিয়ে বের হয়ে এলাম। তারপর ট্রেনে চড়ে আবার চলে গেলাম ইকেবুকরো। ইকেবুকরোকে বংলাদেশের গুলিস্থানের সাথে তুলনা করা যেতে পারে! অনেক ভিড় চোখে পড়ল। বাংলাদেশের শহীদদের স্মরণে একটা শহীদ মিনার আছে সেখানে।
খুব ক্ষুধা লেগেছিল। ম্যনহাটন ফিশ বিখ্যাত খাবার দোকান। সেখানেই খাওয়া হলো। অনেক ধরনের সামদ্রিক মাছ খেলাম। অপূর্ব স্বাদ। কিভাবে যে এত সুস্বাদু বানাল অবাক হয়ে গেলাম। ঝাল লবণ সব পরিমাণ মত। পরে আরেকদিন খেয়েছিলাম। সেদিনও একইরকম ভাল লেগেছিল। বিভিন্ন দেশে এর ব্রাঞ্চ আছে। শুনেছি ঢাকাতেও নাকি হয়েছে। আমি নিশ্চিত নই এই ব্যপারে। এরপর আইসক্রিম খাবার পালা। বাস্কিন রবিন্স আর হ্যগেন ডায এর আইসক্রিম খেলাম। তুলনাহীন। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে গেলাম টোকিও ডোম সিটিতে । অনেক কিছু আছে সেখানে। টোকিও ডোম স্টেডিয়াম দেখলাম। চমৎকারভাবে তৈরি করা। ১৯৮৮ সাল থেকে নানা ধরনের খেলাধুলা এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশেই একটা পার্কে গেলাম। বিভিন্ন রাইড আছে সেখানে। এক ধরনের রোলার কোস্টার দেখলাম। যেভাবে যাচ্ছিল দেখে খুব ভয় লাগল। পাপলু বলল, উঠবি কিনা? ভয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করলাম। এত তাড়াতাড়ি কবরের আজাব ভোগ করতে চাইনা! কোরাকুয়েনে গেলাম। অসাধারণভাবে সেখানে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। টোকিও ডোম হোটেলের স্থাপত্যও অতি মনোরম। রাত হয়ে যাচ্ছিল। ট্রেনে চেপে আবার অজি কামিয়াতে চলে আসলাম। সেখান থেকে হেঁটে বাড়ি। মনের ভেতর অসাধারণ টোকিওর চেহারা চিরদিনের জন্য গেঁথে রইল। এই মুগ্ধতা কখনই শেষ হবার নয়।