যিনি আছেন কবিতার শয়নে-স্বপনে-জাগরণে, তিনি আর অন্য কেউ নন; তিনি আমাদের কাব্য জগতের কিংবদন্তি আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। যিনি কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) নামেই অধিক পরিচিত ।
তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথিতযশা প্রধান কবি হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। তিনি একাধারে কবি, ঔপ্যাসিক ও গল্পকার হিসেবে সুপরিচিত।
তিনি কাব্য রচনার পাশাপাশি মৌলিক কথা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে আধুনিক বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে করেছেন সুসমৃদ্ধ।
তবে আল মাহমুদের প্রথম পরিচয় তিনি একজন কবি। মানুষ ও প্রকৃতির ধ্যান ধারণাগুলো তার মনে যেভাবে আবেগ তাড়িত হয়েছে, তাই তিনি কাব্যরস মিশ্রিত করে উপস্থাপন করেছেন ।
মানব প্রেম, দুঃখ-দুর্দশা, আশা- আকাঙ্ক্ষা, পাওয়া না পাওয়ার বেদনা তাকে প্রচণ্ডভাবে দগ্ধ করেছে প্রতিনিয়ত। সেই ব্যঞ্জনাগুলোকে তিনি শিল্পিত মনে উপলব্ধি করে কবিতায় রূপ দিয়েছেন।
তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বেড়ে উঠেছেন গ্রামীণ প্রকৃতির নিবিড় কোমলতায়। তার শৈশব- কৈশোরে এই প্রকৃতির গাছপালা, নদীনালা, শস্যক্ষেত্র, মাঠঘাট, খাল-বিল, বন-বনানী, ঘরবাড়ি প্রচণ্ডভাবে আন্দোলিত করেছে। যার ফলশ্রুতিতে তার কাব্যে এই কোমল স্পর্শের অনুভূতিগুলো ফুটে উঠেছে বারংবার। পাশাপাশি লোকজ শব্দের ব্যবহার হয়েছে কবিতার আদি-অন্তে।
লোকজ শব্দের ব্যবহারে তিনি অনেক কবিদের চেয়ে বহুগুণে অগ্রগামী। গ্রাম বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের সুখ- দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে তার কাব্যে। আর এতে রয়েছে অসংখ্য লোকজ শব্দের আনাগোনা।
যে শব্দগুলো অতি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে অবিরত শোভা পেত, সেগুলোকেই তিনি প্রাণ দিয়েছেন। এই গ্রাম বাংলার শেকড় তার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তাইতো তিনি সাধারণ মানুষের আবেগগুলো তার সুষ্ঠু নিখুঁত লোকজ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে সারা বাংলায় জ্যোতি ছড়িয়েছেন। শব্দের ব্যবহার, বিন্যাস এবং আবেগকে তিনি তার কাব্যের মাঝে অতি সুনিপুণভাবে ব্যক্ত করেছেন।
তন্ন তন্ন দেখে নেবে বাসন কোশন
পুঁথিপত্র ছারখার ছড়িয়ে চৌদিকে
শিকার পাইলা খুলে দেখবে নেই, ভাত বা সালুন।
কইরে হারামজাদা, দেখুম আজকা তর হগল পুংটামি
কোনখানে পাড়ো তুমি জবর সোনার আন্ডা, কও মিছাখোর?
বলেই টানবে লেপ, তারপর তাজ্জবের মতো
পেখম উদাম করে দেখবে এক বেশরম কাউয়ার গতর !
(আমিও রাস্তায়)
কবি তার কবিতায় লোকজ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিদ্ধ হস্ত। যেটি সচরাচর অনেকের ক্ষেত্রে মেলা ভার। এই লোকজ শব্দের ব্যবহারে গ্রামীণ মানুষের ও প্রকৃতির আবেগগুলো কাব্যপ্রেমীদের কাছে ধরা দেয় অধিক স্পর্শকাতর হয়ে।
পাঠকহৃদয়ে জন্ম দেয় অনুভূতির নতুন মাত্রা । বোধ শক্তিই কবিকে এই ধরনের সৃষ্টি সাধনে মাতোয়ারা করে তোলে।
ছেঁদা করে, কালসাপ, কলস, জিয়ল মাছ, গাঁওয়ার, মোরগফুল, অঙ্গারের দাগ, কটোরা, রুয়া, ক্ষীর, গলুই, চাঙড়, কৈবর্তপাড়া, ছিতড়ে, কলাপ, বিরাণ, লেহনে, উরুত, পাজন, গোসর গোঙানি, ছারখার, হগল, পুংটামি, কাউয়ার গতর, বান্দীর পুতেরা, আজকা, তর, জেয়র, চোরের ছিনাল, মরদ, নাদান ইত্যাদি লোকজ শব্দগুলো কবির বিভিন্ন কাব্যচরণের পরতে পরতে উন্মোচিত হয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। আর সমৃদ্ধ করেছে আধুনিক বাংলা লোকজ শব্দের ভাণ্ডারকে।
যে শব্দগুলো নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে। কালের গর্ভে এই শব্দগুলো বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে কবির কাব্যের ব্যবহারের ফলে। পরবর্তী প্রজন্ম এই লোকজ শব্দগুলো সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে। অন্যথায় আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অনেক কিছু অজানা থেকে যাবে।
গ্রাম বাংলার কবিতার সঙ্গে আল মাহমুদের এমনই সুদৃঢ় ও মজবুত সম্পর্ক যা কখনোই ছিন্ন হবার অবকাশ নেই। সেই সূত্র ধরেই কবির কবিতায় অসংখ্য লোকজ শব্দের পদচারণায় ভরপুর। তিনি মৃত্তিকার টান অনুভব করেছেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। তার অনেকে কবিতায় অরণ্যে ও প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়ার এক ব্যাকুল আহ্বান পরিস্ফুট হয়েছে। তিনি আধ্যাত্মিকতা ও অতিলৌকিক উত্তাপ্তেও গা ভাসিয়েছেন। সেখানেও রয়েছে লোকজ শব্দের সমাহার।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার কবিতার বিনির্মাণ ও সৃজনশীলতা পাঠক হৃদয়ে আবেগের ঝড় তুলেছে যেকোন কবিতার থেকে অধিক সময়। তিনি কবিতার দেহগঠনে অন্বেষণ করেছেন বহুমাত্রিক শব্দচয়ণ।
কবি আল মাহমুদ একজন আধুনিক সৃষ্টিশীল শব্দচাষী। বাংলা ভাষাভাষী কবিদের মধ্যে এই নিপুণতার ক্ষেত্রে তাকে যথোপযুক্ত কবি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় । তার কাব্যে একটি মৌলিক স্বতন্ত্র ধারার বহতা লক্ষণীয়।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কাব্যে কবি আল মাহমুদ তার আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ এত সুনিপুণভাবে ঢুকিয়েছেন যে পাঠক হৃদয়ে তা নতুন পুলক সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে অনায়াসে। নিঃসন্দেহে তিনি একজন সফল কাব্যচাষি।
কবি ব্যক্তিগত জীবনে কত কিছু ফেলে এসেছেন। তাকেও ফেলে গেছে বহু কিছু। কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি কবিতাকে আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন। আর কবিতাও তাকে বাঁচিয়ে রাখবে পাঠকহৃদয়ে আজীবন।