তিনি নেই এ কথা ভাবতেই পারছি না এখনো। ভাবলেই ভীষণ হাহাকারে ভরে ওঠে মন। বিষণ্নতা ছেয়ে যায় বুকের ভেতর। মোচড় দিয়ে ওঠে বেদনার শিখা। হৃদয়ে জমাট বেঁধেছে দুঃখের বরফ। এ বরফ সরানোর আপাতত কোনো পথ নেই। দিবস নেই। দিক বা দিগন্তও নেই। নিজের ভেতর নিজে গুম হয়ে থাকার মতো ঘটনা। মন হয়ে ওঠে নিঃশব্দতার সঙ্গী। আকাশের দিকে চোখ তুলি। কী বিশাল আকাশ নিজেকে ক্রামগত সরিয়ে নিয়ে গেছে দূরের দিকে। সেই দূরের পথিক আল মাহমুদ। কত দূর জানি না সে কথা। শুধু জানি এ দূরের কোনো সীমা নেই। সীমাবদ্ধতা নেই। তবু ভাবি তিনি আছেন। আছেন হয়তো কোনো জলসায় আড্ডায়। হয়েতো কোনো সাহিত্যে জমায়েতে অথবা কবিতার কেনো জমানো আসবে মধ্যমণি হয়ে। কিংবা বাসায় নিরিবিলি কক্ষটিতে। ভাবছেন কবিতার কথা। সাহিত্যের আধুনিকতার কথা। হঠাৎ ভাবনা ছেড়ে এই বুঝি ফোন তুলে বলবেন- তোমারে দেখি না কতদিন। এসো কথা বলব। অথবা ফোন দিলে কানে তুলে বলবেন- ইয়েস স্পিকিং। এভাবে আমার কল্পনায় জীবন্ত একজন আল মাহমুদ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেখছি তার মুখের আদল। এক ধরনের আভা ছড়ানো মুখ। সামান্য কারণে প্রাণ খোলা হাসির উচ্ছ্বাস। হাসির গমকে দুলে ওঠে শরীর।
এক হারা গড়নের মানুষ। মেদ নেই শরীরের কোথাও। হাতে মুখে এক ধরনের কিরিচের ধার। ফর্সা রঙ। ভরাট মুখ। খানিকটা লম্বাটে। মুখভরা দাঁড়ি। চুলহীন মাথা। কথা বলার সময় কলকলিয়ে উঠতেন। আহা এসব দৃশ্য আর ভাসবে না পৃথিবীর আলোয়। আর জাগবে না ধরনীর বুকে। অথচ কিভাবে লেগে আছে আমাদের চোখে। লেগে আছে মনের আয়নায়।
কেনো চলে যায় মানুষা। কেনো যায়! কোথায় যায়! কিভাবে যায়! এত সব জিজ্ঞাসা অতিক্রম করে একটি মাত্র সত্য এসে দাঁড়ায়- মানুষ চলে যায়। যায় চিরদিনের জন্য। চিরকালের জন্য। কি নিঠুর পৃথিবী। তার বুকে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর জন্য একদম দুঃখ করে না। একটুও কাঁদে না তার প্রাণ। তবু মানুষ পৃথিবীকে ভালোবাসে। তবু প্রেমে পড়ে পৃথিবীর। তবু থেকে যেতে চায় পৃথিবীতে। অথচ পৃথিবী কাউকেই রাখে না তার বুকে। সব দেহ হয়ে যায় মাটির আহার। সবারই এর একটি- মাটির ঘর। সবারই হয়ে যায় মাটির বিছানা।
নিভে গেছে আল মাহমুদের জীবনপ্রদীপ। পৃথিবীর আলো বাতাস আর তাকে পাচ্ছে না। পাবে না। তার মুখ থেকে ফুটবে না কবিতার ফুল। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা জাগবে না বাতাসের শরীরে। খবরের কাগজ থেকে এসে কেউ বলবে না- মাহমুদ ভাই একটি কবিতা চাই। লিখে দিন না কবিতাটি। খুব দরকার। আপনার কবিতা ছাড়া কী করে সংখ্যা করি।
আগন্তুকের মুখের দিকে আর চেয়ে থাকবেন না তিনি। বলবেন না- বসো মিয়া। কবিতা কী বললেই হয়ে যায়। তারপর চুপ থেকে ডুব দেবেন না ভাবনার সাগরে। ভীষণ কৌতূহল নিয়ে বসে থাকবে না আর কোনো তরুণ অথবা তরুণী। দৃষ্টির ঘোর থেকে বোঝা যেত তিনি যেনো তাকে ছেড়ে চলে গেছেন কোথাও। কোনো দূরের পথে। যেখানে নৈশব্দ। যেখানে নিস্তব্ধতায় জেগে থাকে বাংলাদেশ এবং যেখানে প্রকৃতির একান্ত লীলার জগৎ। সেই জগৎ থেকে বলতেন তিনি। আচমকা বলতেন লেখো। তার পরই শব্দের পর শব্দ বাক্যের সাথে জুড়ে দেয়া বাক্য দিয়ে নির্মাণ করতেন কবিতার শরীর। এভাবে কবিতা হবে না আর কোনো দিন। কোনোদিন বলবেন না কবিতাটি রেখে দিও। লেখা কবিতাটি শুনবেন না। শুনে অশ্রুতে ভেজাবেন না নিজের মুখে।
সোনালী কাবিনের একটি কবিতা- প্রত্যাবর্তনের লজ্জা। যে ক’টি কবিতা তার প্রিয় ছিল এটি তার অন্যতম। কবিতাটি শুনলেই তিনি বিষণ্ন হয়ে পড়তেন। হয়ে যেতেন স্মৃতিকাতর। ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলতেন কখনো কখনো। এই কবিতার অর্ধেকের শেষের অংশটি ভীষণভাবে নাড়া দিতে তাকে। কত কিছু যোগ থাকে কবিতার সাথে। মিলে যায় কত কিছু। কবিতার অংশটি পাঠ করা যাক-
কুয়াশার শাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরবো
শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে
চোখের পাতার ওপর শীতের বিন্দু জমতে জমতে
হঠাৎ নির্লজ্জ্যের মত উঠে আসবে লাল সূর্য
পরাজিতের মতন আমার মুখের ওপর রোদ নামলে
সামনে দেখবো ছড়ানো ছিটানো ঘর বাড়ি গ্রাম
জলার দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে
তারপর দারুণ ভয়ের মতো ভেসে উঠবে
আমাদের আটচালা
কলার ছোট্ট বাগান
দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে
বৈঠকখানা থেকে আব্বা একবার আমাকে দেখে নিয়ে
মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন-
ফাবি আইয়্যে আলায়ে রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান
বাসি বাসন হাতে মা আমাকে দেখে হেসে ফেলবেন-
ভালোই হলো তোর ফিরে আসা
তুই না থাকলে ঘরবাড়ি কেমন শূন্য হয়ে যায়
হাত মুখ ধুয়ে আয়
নাস্তা পাঠাই
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে আমার প্রত্যাবর্তনের
লজ্জাকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলবো।
কবিতাই একটি জীবন একটি পরিবার এবং একটি সমাজকে তুলে ধরে। সমাজের পরিবেশ সেই সাথে জীবনের এক অনিবার্য বিন্দু যা বাবার সান্নিধ্য জাগ্রত।
তিনি তো প্রত্যাবর্তন করেছেন। ফিরেছেন মায়ের কাছে। মায়ের পাঁজরে শুয়ে গেলেন চিরদিনের তরে। অনন্ত ঘুমের ভেতর জমে থাকবেন তিনি। কুয়াশার শাদা পর্দা তিনি আর দোলাবেন না কোনো দিন। শিশিরে তার পাজামাও ভিজবে না আর। অথচ তার বুকে চেপে থাকা মাটিগুলো ভিজে যাবে নিশ্চিত। চোখের পাতার ওপর শীতের বিন্দু জমবে না ঠিক। কিন্তু তার কবরে গজে ওঠা ঘাসের ডগায় জমে থাকবে শিশিরবিন্দু।
বকের ঝাঁক জলার দিকে উড়ে যাবে আজো। হয়তো তার বুকের ওপর জেগে থাকা শূন্যতা বেয়ে উড়ে যাবে পক্ষী। কলার দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপবে এখনো। কিন্তু তার দৃষ্টি আর আলোড়িত হবে না এসব দেখে। পরাজিতের মতো রোদও নামবে না তার মুখের ওপর। ঠিক তার চারপাশে বৃক্ষ-পাতা ফুলে নেমে আসবে রোদের উষ্ণতা-।
বাসি বাসন হাতে মা আর হাসবেন না কোনো দিন। বলবেন না- হাত মুখ ধুয়ে আয় নাস্তা পাঠাই। বাবাও কোনো দিন মুখ নিচু করে পড়বেন না- ফাবি আইয়্যে আলায়ে রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান।
তিনি প্রত্যাবর্তন করেছেন। এ প্রত্যাবর্তনে তার কোনো লজ্জা নেই। কোনো দ্বিধা নেই। নিশ্চিত তিনি। ভাবনাহীন এক সময়ের ভেতর ঘুমিয়ে ফিরলেন তিনি। প্রকৃতির কাছে নয়। ফিরলেন মহাকালের কাছে। ফিরলেন তার চির বাসভবন- মাটির বাসরে।
তার জন্য নির্ধারিত মাটি গ্রহণ করেছে তাকে। পৃথিবীতে জীবনের এ এক রহস্য। এ রস্যের কূল নেই। কিনার নেই। কে কোথায় কিভাবে বিদায় নেবে। কোথায় কোন মাটিতে সমাধি রচিত হবে তার, সবই নির্ধারিত। শত চেষ্টা করেও অন্যথা ঘটে না। ঘটানো যায় না। আল মাহমুদের ক্ষেত্রেও ঘটেনি।
কিভাবে আল মাহমুদ আমার আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠলেন জানি না। হৃদয়ের সাথে জমে গেছেন তিনি। তাকে যেভাবে স্মরণ করে মন, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ভাষার ক্ষমতা এতটা নেই বললে বেশি বলা হবে না।
সময়ে অসময়ে। দিনে রাতে। সকাল কিংবা দুপুর অথবা সন্ধ্যা অথবা রাত্রি কোনো বাছ-বিচার ছিল না। যখন ইচ্ছে যখন দরকার অথবা অদরকারেও তার কাছে গেছি। আড্ডা দিয়েছি। প্রয়োজন অপ্রয়োজনে গেছি। গল্প করেছি। বলেছি নানান কথা।
কত রঙের কথা কত রকম করে বলা। আহা সেসব দিনগুলো। ভাবলে বুকের ভেতরটা শূন্যতায় হাহাকার করে ওঠে। কেমন যেনো অস্থিরতা কাজ করে। মনে হয় কি যে হারিয়ে গেল। কি যে শেষ হয়ে গেল। আসলে কি হলো? এবাএবই ঘটে জীবনের সমাপ্তি।
ভাবলেই অদ্ভুত সব স্মৃতিগুলো ভিড় করে মনের আঙিনায়। বেদনা ঢেউ তোলে বুকের তলে। মন উদাস হয়ে ওঠে। ভীষণ উদাস। শিশুর মতো তার সারল্য খুব মনে পড়ে। বয়সে দ্বিগুণের বেশি। অথচ বন্ধু পরিচয় দিতেন খুব সহজে। বন্ধু তো সত্যিকার বন্ধু। বয়স কোনো বাধা নয় বন্ধুত্বে এ শিক্ষা তার কাছে পেয়েছি। দেখেছি এবং অনুভব করেছি। চেতনে অবচেতনে বন্ধুর মতোই আচরণ করেছেন। কখনো কখনো নিয়েছেন অভিভাবকের ভূমিকা। দিয়েছেন স্নেহ ভালোবাসা।
যখনই গেছি মমতার হাসিটি পেয়েছি তার কাছে। ব্যবহারে উষ্ণতার আনন্দ পেয়েছি। সম্পূর্ণ মনোযোগ পাওয়ার সৌভাগ্য সবার ঘটে না। আমার এ ভাগ্য পুরোমাত্রায়। হৃদয় ঢেলে যেমন আমি গেছি। আমাকেও হৃদয় দিয়েই দেখেছেন। দেখেছেন একান্ত আপন করে। অন্য রকম করে। ফিল করতেন নানাভাবে। নানা কাজে। তার ব্যক্তিগত থেকে প্রকাশনার বিষয়েও। এমনকি পারিবারিক অনেক বিষয়ে শেয়ার করতেন। অকপটে চাইতেন পরামর্শ। তার এমন উদার আচরণে মুগ্ধ ছিলাম। মুগ্ধতা কখনো কমেনি। বরং বেড়েছে। বেড়েছে তারই গুণে। তিনিই প্রবলভাবে কাছে টেনেছেন। নিয়েছেন একান্ত করে। অকৃপণ প্রশংসা করেছেন আমার লেখালেখির।
উদ্দেশ্য প্রণোদিত কোনো প্রশংসা তার মুখে ফোটেনি। কখনো কবিতার বিষয়ে আপোস করেননি। বরং এ ক্ষেত্রে অন্য সব তার সাথে আপোস করেছে। তার আপোস ছিল কবিতার সাথে। কবিতার জন্য যে ত্যাগ তিনি করেছেন, তার তুলনা ভার। পথে ফেলে এসেছেন অনেক কিছু। অনেক লোভনীয় বিষয়। অনেক প্রান্তির প্রস্তাব। কিন্তু কবিতাপ্রেম তাকে অন্য দিকে ফেরার সুযোগই দেয়নি। কবিতার সাথে তার বন্ধন চিরদিনের। চির জীবনের। আত্মার সাথে একীভূত তার কবিতা। আত্মা ও কবিতার মাঝে কোনো পর্দা ছিল না তার। তিনি এভাবেই কবিতাকে গ্রহণ করেছেন। এভাবেই দেখেছেন। দেখেছেন আমৃত্যু।
তার দৃষ্টির আগুন কবিতাকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। দিয়েছে অন্যরকম আঙ্গিক। কবিতা পেয়েছে নিজস্বতা। জীবনের অলিগলি সন্ধি যা-ই বলি, কোনোটিই কবিতা বাদ দিয়ে দেখেননি তিনি। যেখানে যখন যেভাবে থেকেছেন কবি হিসেবেই থেকেছেন। বিচরণ করেছেন কবি হিসেবেই। সভায় আসরে জলসায় সর্বত্রই কবির স্বভাবে পেয়েছি তাকে। কবিতার আনন্দ তাকে জাগিয়ে রেখেছিল আজীবন। তিনি কবি কবি এবং কবি। আপাদমস্তক কবি। শয়নে জাগরণে চলনে বলনে সর্বাবস্থায় কবি। জীবনকে কবিতার ভেতর দেখা অথবা জীবনের ভেতর কবিতা দেখার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। এ ক্ষমতা সহজাত। জোর করে নয়। অথবা দেখানোর জন্যও নয়। বরং স্বতঃস্ফূর্ত একটি অভিব্যক্তির প্রকাশ ছিল তার যা কবিতার পক্ষে কেবল। এবং যা কবিতা ঘিরেই শুধু।
জীবনের গভীর থেকে কবিতা উপলব্ধি করেছেন খুব কম কবি। আল মাহমুদ সেই কমদের উল্লেখযোগ্য। কবিতা ঘিরেই তার জীবনের সমস্ত চরাচর। তার চাওয়া পাওয়ার যাবতীয় উচ্ছ্বাস, তার সমস্ত পরিধির কেন্দ্রে কবিতাই ছিল। কবিতার মতো মূল্যবান কিছু ছিল না তার জীবনে। সব কিছুর ঊর্ধ্বে ছিল কবিতার স্থান। কবিতাই ছিল তার পরিপূর্ণ জীবন।
এভাবে তাকে দেখেছি। পেয়েছি। অনুভব করেছি। কাছে থেকে পাশে থেকে এবং দূরে থেকে অনুভব করেছি। অনুভব থেকেই বলি, তিনি একজন বন্ধু। একজন অভিভাবক।