বিশ্বসাহিত্যে অনিবার্য কবির নাম আল মাহমুদ। এশিয়ার কবি, তৃতীয় বিশে^র কণ্ঠস্বর, বৃহৎ বাঙলার কবি, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্যিক, মৌলিক প্রতিভা এবং ভাটি বাংলার লোকায়ত চেতনার আধুনিক রূপকার আল মাহমুদ লোক থেকে লোকান্তরে বসতি গড়েছেন। আল মাহমুদ মানেই আমরা জানি বাংলাদেশের প্রতিধ্বনি ও প্রতিচ্ছবি। জীবনানন্দ দাশ ও জসীমউদ্দীনের পর ‘বাংলার কবি’ হিসেবে সবচেয়ে শক্তিমান, পাঠকপ্রিয় ও প্রভাবশালী তিনি। অমর কৃতি ‘সোনালি কাবিন’ ছেড়ে বরেণ্য কবি উড়াল দিয়েছেন ইহলোকের মায়াবী পর্দার ওপারে।
একজন কবির আবেগ-অনুভূতি ও মেধা-মননের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে কবিতার জন্ম। উনিশ শতকে উপনিবেশিক আবহাওয়ায় বঙ্গীয় নবজাগৃতি, প্রথম মহাযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, দমন-পীড়ন, দাঙ্গা, মন্বন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইত্যাদি এবং পাশ্চাত্য দর্শন, সাহিত্যান্দোলন ও সাহিত্যাদর্শের হাওয়া বাংলা কবিতার মূল স্রোতকে বিচিত্রগামী, বিস্তৃত ও দূরসঞ্চারী করে। দেশবিভাগের শক্ত বাঁধ এই স্রোতকে কলকাতা ও ঢাকা- এই দুটি ধারায় প্রবাহিত করে। বায়ান্নোত্তর বাংলাদেশের কবিতা সাংস্কৃতিক তরঙ্গভঙ্গে অর্জন করে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। আল মাহমুদের কবিতা একুশের ভাষা ও জাতীয়তা ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, চেতনা ও স্বরূপ ধারণের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আবহমান গ্রাম-সভ্যতা, লোকসংস্কৃতি, অনার্য নারী-পুরুষ, বাংলার ঋতুজ প্রকৃতি, সাম্যবাদ, ইতিহাস-ঐতিহ্য-বিশ্বাস, আন্তর্জাতিকতাবাদ তাঁর কবিতায় বারবার বাঁকবদলের মাধ্যমে বিকাশ ও বিস্তৃতি লাভ করেছে অভীষ্ট লক্ষ্যে। ফলে তাঁর কবিতার বৈচিত্র্য অর্জিত হয়েছে কাব্যিক সুষমায়, লোকজ শব্দযোগে এবং কবিতার ভাববস্তু নির্মিত হয়েছে শৈল্পিক উৎকর্ষে। তাঁর কবিতার শিল্পলোকে সার্বক্ষণিক বিরাজ করেছে স্বাধীন মনোভাব, লোকসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই মনোভঙ্গির আলোকে তাঁর কবিতার ভাব, ভঙ্গি ও গন্তব্য নির্ণিত হয়েছে।
বর্তমান সংখ্যাটি আল মাহমুদকে নিয়ে একটি ক্রোড়পত্র করা হয়েছে। আল মাহমুদের ব্যক্তিসত্তা, সৃজন ও মননের ঐশ^র্য নিয়ে মূল্যায়ন ও স্মৃতিচারণ করেছেন দেশের পাঁচ প্রজন্মের লেখকবৃন্দ। সেইসঙ্গে ভালোবাসাময় একগুচ্ছ নিবেদিত কবিতা লিখেছেন কবিকুল। সহযোগিতার জন্য সকল লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। নিয়মিত কয়েকটি বিভাগ থাকছে; তবে অনিবার্য কারণে ধারাবাহিক উপন্যাসটি এ সংখ্যায় যাচ্ছে না।
বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা আরো নিবিড় ও সমৃদ্ধ হোক, এই কামনা করি।