আল মাহমুদ বিশ্বসাহিত্যের একজন শক্তিমান সাহিত্যিক। তৃতীয় বিশ্বের কণ্ঠস্বর। বৃহৎ বাংলার প্রতিনিধিত্বশীল কবি। তাঁর কবিতায় হাজার বছরের বাংলাদেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কবি পার্থিব জগৎ থেকে বিদায় নিয়েছেন গত ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ। কিন্তু অমর হয়ে থাকবেন সৃজন ও মননের ঐশ্বর্যে। ২০০১ সালে ‘চাড়ুলিয়া’ সাহিত্য পত্রিকার পক্ষ থেকে কবির দীর্ঘতম একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও সম্পাদক ওমর বিশ্বাস, সাংবাদিক সরদার ফরিদ আহমদ, কবি জাকির আবু জাফর ও গল্পকার রফিক মুহাম্মদ। এই দীর্ঘতম সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাঠকের উদ্দেশে উপস্থাপন করা হলো।
আপনার দৃষ্টিতে কবিতা কি?
আল মাহমুদ: আমার দৃষ্টিতে কবিতা হলো মানব জীবনের সবচেয়ে নিগূঢ় স্বপ্ন, কল্পনার ভাষারূপ। ছন্দবদ্ধ ভাষা। আমি মনে করি কবিতা হলো একটা জীবনের নিগূঢ় উপলব্ধি। ছন্দবদ্ধভাবে সুন্দর ভাষায় উপমা উৎপ্রেক্ষাসহ প্রকাশিত ভাষাই হলো কবিতা। যে জীবন আমরা যাপন করতে পারি না কিন্তু স্বপ্নে করি। স্বপ্নে আমি চিন্তা করি এই রকমই; এই স্বপ্নটার ভাষার রূপই হলো আসলে কবিতা, যা আমরা শব্দে প্রকাশ করি।
কিভাবে, কখন বুঝতে পারলেন যে আপনি একজন কবি?
আল মাহমুদ: আমি তখন বুঝে গেছি যখন কবিতা আমার পড়তে ভালো লাগতো। ছোট সময় থেকেই। আমার সবেচেয়ে বেশি ভালো লাগে কবিতা পড়তে, অন্য কিছু নয়। এভাবেই আসলে কবি সত্তার সৃষ্টি হয়। আমার ছোট সময় থেকে লেখাপড়ার প্রতি ঝোঁক ছিল। পড়াশুনা, গল্প পড়তে পছন্দ করতাম, কবিতা বেশি ভালোবাসতাম। এগুলো থেকেই একটা মানুষের চরিত্র নির্ধারিত হয়ে যায়। আমার অন্যান্য ভাই বোনেরা অন্যরকম পড়াশুনা করতে পছন্দ করতো। আর আমি সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকতাম, কবিতা পড়তাম। এ থেকে বুঝা যায় না? এভাবেই তো বুঝতে পেরেছি ইচ্ছে করলে আমিও এ রকম লিখতে পারি। তারপর একদিন লিখতে শুরু করলাম। ভুলভাল করে একটা লেখা ছাপা হয়ে গেল। এভাবেই তো মানুষ সাহিত্যিক হয়।
তরুণদের কবিতা আপনার কেমন লাগে?
আল মাহমুদ: কথা হলো, কবিতায় কি কি নেই এটার হিসেব আমি দিতে পারবো না। এটা সম্ভব না। ভালো লাগছে না বলতে পারি। তরুণদের এ রকম কোনো কবিতা আমি পাচ্ছি না যা আমাকে তৃপ্ত করে বা আমাকে বিস্ময়াভিভূত করে বা মনে দীর্ঘস্থায়ী বেদনার সৃষ্টি করে। আমি খুব অনুসন্ধান করি। এটা হলো প্রতিভার ব্যাপার। কখন কোন প্রতিভাবান বেরিয়ে আসবে কেউ হয়তো জানে না। এদের মধ্যেই হয়তো একজন মহাকবি লুকিয়ে আছে।
ষাট-সত্তরের দশকের কবিতার সাথে এখনাকার কবিতার পার্থক্যটা কি?
আল মাহমুদ: দেখো, আমি পঞ্চাশের দশকের কবি। পঞ্চাশের দশকের তিন চারজন কবি- যাদের নাম শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, ফজল শাহাবুদ্দীন। এছাড়া মোহাম্মদ মরিুজ্জামান, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার এরাও আছেন। প্রায় একই সময় জন্ম আমাদের। ১৯৩৬, ১৯৩৭ এর মধ্যে। পঞ্চাশের দশকের আরেকজন কবি হলেন ওমর আলী। তার স্টাইলে তিনি লিখে যাচ্ছেন। এই যাদের নাম আমি বললাম তাদের কবিতা পত্রিকায় যখন ছাপা হয় আমি আগ্রহ নিয়ে পড়ি। তরুণরা আমাকে অতোটা আকর্ষণ করে না। তারা আগ্রহই তৈরি করতে পারেনি।
তোমরা হয়তো বলবে ষাটের দশকের কবিতা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে কি? ষাটের দশকে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ আসলেন। প্রথম দিকে আমি তার কবিতার বিরোধী ছিলাম। তরুণ তিনি, উপমার শৃঙ্খল অনবরত ভাঙতে চেষ্টা করেছিলেন। আমার কাছে তখন এটা খুব একটা ভালো লাগেনি। পরে চিন্তা করে দেখলাম- হ্যাঁ, এ-রকমও তো হতে পারে। সাহিত্য তো অনেকটা নতুন নিয়মেই যাবে। এখন তার সম্পূর্ণ কবিতা আমার সামনে আছে। পড়ে আমার ধারণা হয়েছে যে, এদের কবিতার মধ্যেও কিছু নতুনত্ব আছে। অবশ্যই আছে। কিন্তু তারা যদি দাবি করেন কবিতায় তারা পঞ্চাশের দশক থেকে একটি ভিন্ন মাত্রা এনেছেন, তাহলে আমি সে দাবি মানতে রাজি নই। তবে আমি তাদের কাজকে পছন্দ করি।
ষাটের দশক গেল। আসো সত্তরের দশক। সত্তরের দশকে আবিদ আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ এদের কবিতা। আমার কাছে নির্মলেন্দু গুণের একটা দুটো কবিতা ভালো লাগে। এবং আবিদেরও। এর মানে এই না যে একটা পরিপূর্ণ কবিসত্তা তাদের মধ্যে প্রকটিত হয়েছে। দেখি না আমি। হয়তো বা কেউ রাজনীতির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছেন, কেউ নিঃশব্দ হয়ে গেছেন। শামসুর রাহমান বা আমি, আমরা টিকে আছি। একটা দীর্ঘ সময় ধরে এখনো লিখছি। এখনো তাদের পাশাপাশি আমাদের কবিতা যখন পত্রিকায় বের হয়। আমাদের কবিতাটাই কেন জানি গ্রাহ্য হয়ে যায়। এটা ভেবে দেখতে হবে। তাহলে আমরা এখনো কাজ শেষ করিনি। পার্থক্য ওখানেই।
এখন আসো আশির দশকে। এই সময়ে একদল বিশ্বাসী তরুণ কবির আর্বিভাব হয়। যারা সরাসরি ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত। এদের অবস্থান আমার কাছে পরিষ্কার। তাদের ব্যাপারে আমার উৎসাহের কোনো কমতি নেই। তারা বাংলা সাহিত্যে যে একটি নতুন ধারার পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন এটা প্রতিপক্ষরাও স্বীকার করতে বাধ্য। এদের কয়েকজনের নাম আমি উল্লেখ করতে চাই- মতিউর রহমান মল্লিক, সোলায়মান আহসান, হাসান আলীম, মুকুল চৌধুরী, তমিজ উদ্দীন লোদী, মোশারফ হোসেন খান, আসাদ বিন হাফিজ প্রমুখ। বিশ্বাসী কবিদের বাইরে দু’জনের ব্যাপারে আমি বেশ আশাবাদী ছিলাম। এরা হলেন, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন ও খোন্দকার আশরাফ হোসেন। স্ট্যালিন অনেক দূর এগিয়েছিলেন। এখন কেমন জানি থেমে গেছে। আর আশরাফ হোসেন, এ-কবি ও-কবি নয়, এসব করতে গিয়ে আজ কোথায়? আশির দশকের কবিদের মধ্যে আরেকজন তরুণের নাম বলতে চাই, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কিন্তু সে তো অকালে চলেই গেলো।
ইসলামপন্থীদের দেখে আমি খুবই উৎসাহিত হয়েছিলাম। এরা নতুন কাব্য সৃষ্টি করে যাচ্ছে। যেমন, ফররুখ আহমদ করেছেন- সাত সাগরের মাঝি। ভাবাই যায় না তখন। কিন্তু এ রকম বড় কাজ এখন কেউ করতে পারছে না। পারবে না তা বলছি না। কোন কবি কখন কি করে ফেলে বলা যায় না। এটা হতে পারে- তবে এখন পর্যন্ত হয়নি, তোমরা যে সময় পর্যন্ত আমাকে ইন্টারভিউ করছো এই সময় পর্যন্ত হয়নি। আবার কালকেই এটা হতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এটা না হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো আমি তা বলতে পারি না।
আশির দশকের অনেকের মধ্যে সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সম্ভাবনার নাম কাব্য না। আমি তো লোক লোকান্তর লিখে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলাম। কিন্তু সোনালি কাবিন না বের হওয়া পর্যন্ত ধারেই ভিড়তে পারিনি। তখন আহসান হাবীব রয়েছেন, ফররুখ আহমদ রয়েছেন। তারা কথাও বলতেন না আমাদের সাথে। সোনালি কাবিন বের হওয়ার পরে বলছেন, বসো, তুমি আল মাহমুদ না! বসো, বসো। আগে এরা বসতেই দেননি। তাদের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এবং কখন অকস্মাৎ এই বসো বসো শুরু হলো তা আমি এখন বুঝতে পারি। যেটা আমি অনুরোধ করলেও আগে হতো না। তেল দিলেও হতো না। তাদের উপর পড়াশুনা করলেও হতো না। আমি যোগ্য কাজ করে আসছি বলেই তারা আমাকে বসতে বলতে বাধ্য হয়েছেন। জায়গা দিয়েছেন। এখন তো তরুণদের আমরা তার চেয়ে অনেক বেশি পাত্তা দিয়ে থাকি। তাদের কবি বলি, তাদের অনুষ্ঠানে যাই, তাদের গ্রন্থ উৎসবে যাই। তাদের প্রশংসা করি। তবু কেন তাদের অভাবটা থেকে যাচ্ছে। এটা তাদের একবার ভেবে দেখতে হবে।
কদিন আগে আমাকে একজন বলল, আপনার কাবিলের বোন উপন্যাসটি বহুদিনের জন্যে লেখা। আমিও বলি, সাহিত্য তো এ রকমই হয়। তোমার মধ্যে যদি কিছু থাকে তুমি জিতবেই। তোমার বই লাইব্রেরী থেকে সরিয়ে ফেলে, আলোচনা থেকে বাদ দিয়ে তোমাকে শেষ করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে আমার কবিতা বাদ দিয়েছে তো কি হয়েছে? কিচ্ছু হয়নি। বইমেলায় আমার কবিতা বই তো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।
সোনালি কাবিনের মধ্য দিয়ে আপনি বাংলা সাহিত্যে একটি অবস্থানে পৌঁছান, দ্বিতীয় ভাঙনকে বলা হয় মিলিনিয়াম কাব্যগ্রন্থ। এর মধ্যে আরো কাব্যগ্রন্থ আছে। দ্বিতীয় ভাঙনকে আপনি কিভাবে দেখেন?
আল মাহমুদ: এখন কথা হলো যে, সোনালি কাবিন একটা পর্যায়ে শেষ হয়েছে। এটাকে বলা যেতে পারে প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়। জীবনানন্দ দাশের পরে প্রেম ও প্রকৃতি নিয়ে নতুন কথা বলা যাবে এটাতো অঘটনীয় ব্যাপার ছিল। আমি চেষ্টা করেছি। সোনালি কাবিন পর্যন্ত এই কাজ শেষ হয়েছে। তারপর হলো মায়াবী পর্দায় দুলে ওঠো সম্পূর্ণ আলাদা একটা বিষয়। আমাদের দেশ, জেল জুলুম, সব মিলিয়ে আধুনিক কাব্যে এটা তৈরি হলো। এর মধ্যে আধ্যাত্মিকতাও আছে। ধর্মগ্রন্থের ব্যবহার আসলে এই প্রথম। সেখানে কোরআনের আয়াত তুলে আমি কবিতা লিখেছি। এটা একটা নতুন বিষয়। এটা এসে পূর্ণ হয়েছে দ্বিতীয় ভাঙনে। এই ভাঙনে আরেকটা টার্ন শুরু হলো, সেটা কি? সমসাময়িক কালকে ভিন্ন দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করা। ভালোবাসা মানে হলো হত্যা, ষড়যন্ত্র এইসব। প্রেম মানে হলো মৃত্যু। অর্থ বদলে দিচ্ছি, ভালোবাসা মানে হলো গুপ্তহত্যা। এই যে অর্থ বদলে দেয়ার চেষ্টা করছি- এটা সমসাময়িক কালের। যেমন প্রিয়তম শব্দের অর্থ হলো শুয়রের বাচ্চা। এই কাজটা আমি করেছি।
অর্থাৎ মানুষের ভাষা আর সুবোধ্য নয়, দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যখন বলে আমি তোমায় ভালোবাসি, এর মানেই হলো গুপ্তহত্যার চেষ্টা করছে সে। দ্বিতীয় ভাঙনে এই কথাগুলো বলতে চেয়েছি। এটা সমসাময়িক আধুনিকত্ব। প্রতীকীভাবে হুদহুদ পাখির কাহিনী এনেছি। সেখানে আবার রানীর চরিত্রটা দেখলেই বোঝা যাবে কাকে বলছি। এই যে এলিগরি বদলে দিয়ে কবিতার চর্চা- এটা শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ভাঙন থেকে। যদিও এর আগেও কিছু কাজ আমি করেছি। যেমন, মিথ্যাবাদী রাখাল-এ। কিন্তু এর পূর্ণতা এলো দ্বিতীয় ভাঙনে। এতো তির্যক ভাষা আমি আগে কবিতায় ব্যবহারই করিনি। একই সাথে রাজনৈতিক ভাষাও। পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতার যোগ হয়েছে। তারপর নদীর ভিতরে নদীতে পুরোপুরি একটা অধ্যাত্মিক বিষয় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ওখানে পীরের উপর কবিতাও আছে। এই নিয়ে কম কথা হয়েছে! ধর্ম নিয়ে, পীর নিয়ে কবিতা লেখে- শালা আল মাহমুদ। এসবও তো বলা হয়েছে আমাকে। কিন্তু তারপরও এটা পড়তে হচ্ছে। তোমরা জানো বইমেলায় বইটা কত কপি বিক্রি হয়েছে? কিনছে কারা? কিনছে আমার শত্রু পক্ষ। আমারটাই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে। তাও আবার কবিতাকে আমি কোথায় নিয়ে গেছি, এটা জানার আগ্রহ থেকে তারা কিনছে। আমার প্রতিপক্ষের একজন প্রজ্ঞাবান লোক এমনও মন্তব্য করেছেন, আল মাহমুদ কবিতাকে অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছে। তোমরা বুঝতে পারছ না আল মাহমুদ কি করছে। ওতো কবিতাকে মসজিদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, দরকার হলে আমি কবিতা মসজিদের দিকে নিয়ে যাবো। রাসূলুল্লাহ্র সা. যুগে কবিতা তো মসজিদের মিম্বর থেকে পাঠ হতো। আমিও জীবিত থাকতে মসজিদে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়বো ইনশাআল্লাহ।
কালের কলস এবং সোনালি কাবিন-কে বাম রাজনীতির উপর লেখা শ্রেষ্ঠতম শৈল্পিক সৃষ্টি বলা হয়েছিল এই কারণে যে, বাংলা সাহিত্যে বাম রাজনীতির উপর যে সাহিত্যগুলো হয়েছে সেগুলো আসলে শেষ পর্যন্ত সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রেই শ্লোগান হয়েছে। আপনার এ দুটোতে বাম রাজনীতির আদর্শ ছিল। কিন্তু সেটা রাজনীতিকেও উৎরে গিয়ে সাহিত্য হয়েছে, কবিতা হয়েছে। এই কারণেই মূলত এই কথাগুলো বলা হয়ে থাকে। এখন আবার অনেকে মনে করেন যে আধুনিককালে আপনি ইসলামী আদর্শের শ্রেষ্ঠ কবি।
আল মাহমুদ: আমি একটা সত্যি কথা কনফেশন (Confession) করতে চাই, সেটা হলো ইসলামকে আমি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছি। আমার ধর্ম হিসেবে, জীবনের আদর্শ হিসেবে (জীবৎকালীন ও পরকালীন) ইসলামকে গ্রহণ করেছি। কিন্তু সাহিত্যে ইসলামকে ব্যবহার করার যে পদ্ধতি এটা আমি এখনো আয়ত্ত করতে পারিনি। এখন আমি মাওলানা রুমি খুব পড়ছি। ইসলাম সম্পর্কে খুব পড়ছি। শুধু এখনই না আগেও আমার কবিতায় এর চিহ্ন আছে। আমি নিজেও তরিকতপন্থী, ঠিক আছে। কিন্তু কবিতায় খুব সূক্ষ্মভাবে আধ্যাত্মিকতার প্রতিফলন ঘটানো, আমি যে ধরনের কবিতা লিখি তা নিয়ে আসা খুব কঠিন কাজ। আমি চেষ্টা করছি। আমার শেষ কবিতার বইয়ে যদি এর কিছুও থেকে থাকে তাহলে আমি নিজেকে সার্থক মনে করবো। কিন্তু আমি মনে করি এটা এখনো পর্যন্ত আমি সার্থকভাবে আনতে পারিনি। একটি দু’টি কবিতা, যেমন- ধরো, আমার শেষ কবিতা বই, নদীর ভিতরে নদী- এতে একটা কবিতা আছে পুনরুত্থানের ফুৎকার, আমি এটাকে ইসলামী কবিতা মনে করি। এর যে গঠনশৈলী, এর যে ফর্ম, এর যে চিত্রকল্প- তাই একটি চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায়, সেটা কোনো মুসলমানই পড়–ক আর অমুসলমান পড়–ক কিছু আসে যায় না তার।
ছড়াকে কীভাবে দেখেন?
আল মাহমুদ: ছড়া মধ্যযুগের এক ধরনের লোককবিতার ধারা থেকে এসেছে। এটাকে আধুনিক কবিরা ব্যবহার করেছেন। আমাদের দেশের অনেকেই করেছেন। ছড়া প্রকৃতপক্ষে কবিতা। এটা কবিদেরই কাজ। আমি কখনো ছড়া সাহিত্যের একটা আলাদা অংশ কিংবা ছড়া লেখক বা রচয়িতা এ রকম ভাবি না। ছড়া নিয়ে অনেক কবিই কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো বড় কবির ছড়া নেই? তার সমতুল্য ছড়া কে লিখেছে? আমাদের দেশে ফররুখ আহমদের কি ছড়া নেই? পাখির উপর লেখা তার ছড়া তো অমর কাজ।
তাই বলছিলাম, ছড়া বলে আলাদা কোনো ব্যাপার নেই। এটা হলো রবীন্দ্রনাথ বা ফররুখ আহমদের সাহিত্যেরই অর্থাৎ কবিতারই একটা সময় বা রুচি। আমি এটাকে এভাবেই দেখি। ছড়া বলে আলাদা একটা শাখা তৈরি করা, এর মধ্যে নিজকে নিমজ্জিত রাখা, এটা আমি সমর্থন করি না। কেউ কেউ করছেন, তারা হয়তো সার্থকভাবেই করছেন। আমি সেটারও সমালোচনা করি না। কিন্তু আমি নিজে মনে করি ছড়াসাহিত্য হলো আধুনিক কবিতারই একটা অংশ। আধুনিক কবিতার একটা বড় লক্ষণ হলো বিদ্রƒপ। এটা ছড়ার সাহিত ছাড়া সম্ভব নয়। ছড়ায় এই যে উইট, এটা আধুনিক রূপেই করা যায়। এটা আধুনিক কবিতার মধ্যেই আছে। এটাকে আলাদা করে ছড়া সাহিত্য করতে হবে এটা ঠিক নয়। যারা ছড়া লেখে, ছড়া লেখক, তারা যদি সুবিচার পেতে চায় তাহলে ছড়াকে আধুনিক সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ত রাখলেই সেটা পারে।
আপনি আমাদের এই সাক্ষাৎকারেই বলেছেন- আপনি কবিতার জন্য জীবনটা ব্যয় করেছেন, তাহলে গল্পে এলেন কেন?
আল মাহমুদ: আমি যেমন বলেছি কবিতার জন্য জীবন ব্যয় করেছি, এটা এক অর্থে যেমন সত্য, তেমনি মোটামুটি আমি আমার সমস্ত সাহিত্যকে এর চেয়ে আলাদা করি না। আমি আমার কাব্যচর্চা বলতে বুঝিয়েছি আমার সমস্ত সাহিত্য চর্চাই। তবে আমি কবি হিসেবে বেশি খ্যাতি লাভ করেছি বলে কবিতার কথা উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু আমি এদেশের অন্যতম কয়েকটি গল্পও লিখেছি। এটা দেশবাসীর কাছে গ্রাহ্য হয়েছে। আমি যখন লিখতে শুরু করি তখন গদ্য পদ্য একই সমান্তরালে শুরু করেছি।
প্রথম আমার যে লেখা ছাপা হয় সেটা হলো গল্প, অনেক আগের। আমি গল্প দিয়ে শুরু করি কিন্তু এর আগেই খাতা ভর্তি কবিতা লিখেছি। এর মানে এই নয় যে, গদ্য দিয়ে শুরু করেছি বলে কাব্য থেকে দূরে সরে ছিলাম। আমি কবি হতে চেয়েছিলাম, আমি মনে করি আমি যে গল্প বা উপন্যাস লিখেছি এগুলো একজন কবিরই কাজ। একজন কবিরই নানা রকম ভাইব্রেশন। আর একজন কবির বহু বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ থাকতে পারে। থাকে এবং লেখেনও তারা। আজকাল তো কেউ শুধু কাব্য নিয়ে থাকে না। এতে বেঁচে থাকাই সম্ভব না। কারণ ইউরোপে দেখেছি যারা বড় কবি তাদের একটা দুটো বেস্ট সেলার উপন্যাসও আছে। বা অন্য নানাবিধ বইপত্র তারা লিখে থাকেন। কিন্তু তার কবি খ্যাতিই তাকে বড় করেছে।
আপনি ছোটগল্প লিখেছেন অনেক আগে থেকে। কিন্তু আপনার প্রথম উপন্যাস ডাহুকী বের হয় ১৯৯২ সালে। উপন্যাসে আসতে এতো দেরি করলেন কেন?
আল মাহমুদ: আমি মনে করি, উপন্যাস লেখার জন্য গল্প লিখে হাত পাকা করা দরকার। আমি কবিতাই লিখতে চেয়েছি। ছোটগল্প লিখে প্রশংসা পেলাম। আগ্রহ বাড়ল। এরপর উপন্যাস লিখার একটা তাগিদ অনুভব করলাম। যারা আমাকে ভালোবেসে সেইসব ভক্তরাও উপন্যাস লেখার জন্য তাগিদ দিল। আর আমি যেহেতু সাংবাদিকতা পেশার সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত, কাজেই গদ্য আমার ভালোই আসে। তরতর করে লিখে যেতে পারি। তোমরা কি জান, সব ছোটগল্পের লেখকই উপন্যাস লিখেছেন। ছোটগল্প লিখেছেন অথচ উপন্যাস লেখেননি এরকম লেখক খুব কম। জগতের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকই তো ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠ লেখক।
যেভাবে বেড়ে উঠি-কে আপনি কি বলবেন, উপন্যাস নাকি আত্মজীবনী?
আল মাহমুদ: এ ধরনের অসংখ্য বই লেখা হয়েছে, হচ্ছে। এটাকে অনেকে ফিকশন বলছে। কিন্তু আসলে এটা আত্মজীবনী। তবে এটিকে আমি উপন্যাসই বলবো। উপন্যাস লিখেছি, তবে নিজেকে নিয়ে।
কিন্তু এতে আত্মজীবনী ছোঁয়াটা বেশি।
আল মাহমুদ: আমি এটা লিখে যখন আত্মজীবনী বলে দাবি করেছিলাম- তখন অনেকে বললেন যে এর মধ্যে বহু মিথ্যা আছে। কিন্তু যেই আমি বললাম যে, এটা উপন্যাস এবং মিথ্যা আছে তখন আবার তারাই বললেন, না এটা সত্য (হাসি)। অদ্ভুত! আমাকে টেলিভিশনে মঞ্জুর-এ মাওলা জিজ্ঞাসা করলেন, এই বইটির ফিফটি পার্সেন্ট সত্য? তিনি তো থমমত খেয়ে গেলেন। আমি বললাম, আমি তো বলেছি- এটা উপন্যাস, ফিফটি পার্সেন্ট মিথ্যাই হওয়ার কথা, আপনি বলছেন পঞ্চাশ পার্সেন্ট মাত্র মিথ্যা। তাহলে এর চেয়ে সার্থক উপন্যাস তো আর হয় না।
বর্তমানে আমাদের দেশে সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে যে সমস্ত মাধ্যম আছে তা কি পর্যাপ্ত কিংবা এগুলো কি যথার্থ ভূমিকা পালন করতে পারছে?
আল মাহমুদ: আমার তো মনে হয় যে, এদেশে কোনো প্রকৃত সাহিত্য পত্রিকাই নেই। এখন একটা প্রথা হয়েছে পত্রিকায় সাহিত্য একটা বিভাগ থাকে, সেই বিভাগটা সমৃদ্ধ করতে সবার দৃষ্টি, সেখানে লেখা ছাপা হয়। এটা কতটুকু সাহিত্যে সহায়ক হবে তা এখনো ঠিক ততোটা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু লেখালেখিটা সেখানেই হচ্ছে। এটা কম কি? আমি এটাকে খুব বড় মনে করি। কারণ দৈনিক পত্রিকায় যে সাহিত্য পৃষ্ঠাটা ছাপা হয় সেটা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, একটা সাহিত্য পত্রিকার অতো সাধ্য নেই।
সাহিত্য বসে থাকে না। কোনো না কোনো রাস্তা খোঁজে। যেহেতু এখানে সাহিত্য পত্রিকা চলে না এবং চলে না- তাও আবার আমি বলি না। আমি বলি সমকাল বন্ধ হয়ে যাবার পরে তেমনভাবে চালাবার আর কেউ চেষ্টা করেনি। এই অবস্থায় দৈনিক পত্রিকাগুলো সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এটাকে সামান্য হিসেবে দেখলে চলবে না। এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় তো সাহিত্যের পাতাকে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়। যেমন- যুগান্তর, প্রথম আলো, আজকের কাগজ। ইনকিলাব বর্তমানে সাহিত্য পৃষ্ঠাকে কিছুটা গুরুত্ব দিচ্ছে। ইত্তেফাক আগের থেকে ভালো বের হচ্ছে। অনেকেই আবার চার কালারে বের করছে। কারণ সবাই এর আকর্ষণ মূল্যটাকে বুঝতে পেরেছে। এইসব পত্রিকা সাহিত্যের ধারাকে উজ্জীবিত রাখছে। এখন দরকার হলো বড় একটা সাহিত্য পত্রিকার। এটা আমরা উপলদ্ধি করি। কেউ যদি এটা বড় সাহিত্য পত্রিকা এবং সাহিত্য মুদ্রণে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে তাহলে একটা ভালো কাগজ হতে পারে।
রেডিও-টেলিভিশনে সাহিত্যকে কোনো সময়ই খুব বেশি একটা পাত্তা দেয়া হয়নি। এখানে সব সময় রাজনীতি চলে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দলীয় লেখকদের তখন বেশি সুযোগ দেয়া হয়। এই যে গত পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, আমাদের একবারও টেলিভিশনে ডাকা হয়নি। আগে যে সরকারই আসুক টেলিভিশনে নানা অনুষ্ঠানে আমাকে ডেকেছে। এতেও বোঝা যায় সেখানে সাহিত্য আসল উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হলো দলীয় প্রচার বা অন্য কিছু। এই দেশে এ-ধরনের মিডিয়ার কোনো সাহিত্য মূল্য নেই বলেই আমি মনে করি। আলোচনার সময় যতো বড় পণ্ডিতকেই ডেকে নিয়ে যাক কর্তৃপক্ষের ইচ্ছের বাইরে কিছু বলার ক্ষমতা নেই। কোনো একটা পণ্ডিত কি বাংলাদেশ টেলিভিশনে গিয়ে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করতে পারবে? পারবে না। টেলিভিশনে কিন্তু সে সুযোগ থাকা উচিত। যে সরকারই হোক তার বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা থাকা উচিত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা তথ্য মন্ত্রণালয় দ্বারা টেলিভিশন পরিচালিত। ওখানে বসে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করার ক্ষমতা না থাকলে বুদ্ধিজীবীদের ডেকে কোনো লাভ নেই।
জসীমউদ্দীনের কবিতার শব্দ ব্যবহার ও আপনার কবিতার শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা মিল রয়েছে। এটা কি আপনার ওপর জসীমউদ্দীনের প্রভাব?
আল মাহমুদ: দেখো, সত্য কথা বলতে কি, জসীমউদ্দীনের প্রভাব কার উপর নেই? যারা বড় বড় নাগরিক কথা বলে তাদের উপরও আছে। স্পষ্ট অস্পষ্ট যেভাবেই হোক জসীমউদ্দীনের প্রভাব আছেই। জসীমউদ্দীন যে বিষয় উত্থাপন করেছেন সেটা হলো আমাদের শিকড়। তাই আমাকে যদি বলা হয়, আমি জসীমউদ্দীনের দ্বারা প্রভাবান্বিত তাহলে তাতে আমি গৌরবান্বিত বোধ করি। আমি কোনো সময় বলি না যে আমি প্রভাবান্বিত নই। এটা কখনো বলিনি। যখনই আমাকে বলা হয়েছে আমি মনে মনে খুব পরিতৃপ্তি বোধ করেছি।
জসীমউদ্দীনের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া তো মৌলিক চেতনা। এতে কে না প্রভাবিত? কমবেশি জীবনানন্দ দাশসহ সবাই প্রভাবিত। জসীমউদ্দীনের এই দিক দর্শনের জন্য জীবনানন্দ দাশসহ সবাই জসীমউদ্দীনকে না পড়ে তাদের উপায় ছিল না। আমি জানি জসীমউদ্দীনের প্রভাবে কি হিন্দু কি মুসলমান তখন সবাই খুবই প্রভাবিত ছিল।
আমাদের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার ভূমিকা ছিল?
আল মাহমুদ: আমার ভূমিকা খুব স্পষ্ট ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমি চলে গেছি। যুদ্ধ করতে গিয়েছি। কিন্তু যুদ্ধের পরিবেশ একজন কবির উপর কতোটুকু থাকে। আমি কোলকাতায় ছিলাম এবং আমার দ্বারা যতোটা সম্ভব আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বলেছি, লিখেছি। নয় মাস আমি কোলকাতায় ছিলাম। এই নয় মাস আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই কথা বলেছি। যেখানে গেছি যেখাবে পেরেছি, করেছি। এটাও এক ধরনের যুদ্ধ, বন্দুক নিয়ে যুদ্ধটাই বড় কথা নয়। আমরা যে যুদ্ধ করেছি সেটাও প্রকৃত যুদ্ধ ছিল। সেটা একটা মটিভেশনের যুদ্ধ ছিল। আমরা যাওয়াতেই শত শত ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা যুদ্ধে যায়। আমি নিজে জানি শুধু আমাদের গলার আওয়াজ শুনে শত শত ছেলে যুদ্ধে চলে গেছে। এটা কি কম? এটাই তো প্রকৃত যুদ্ধ ছিল। আমরা তো আওয়ামী লীগারদের মতো ওখানে গিয়ে সুখে স্বচ্ছন্দে ছিলাম না। কষ্টে ছিলাম আমরা।
আপনার কাছে সুন্দর একটি দিনের অর্থ কি?
আল মাহমুদ: সবদিনই তো নিরুপদ্রব কেটে যায় আল্লাহর রহমতে। কোনো দুঃসংবাদ না পাওয়ার অর্থই হলো একটি সুন্দর দিন। সাংবাদিক বলে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা দেখি। পত্রিকার মধ্যে আমি পুরো জগৎটাকেই দেখি। আমি সম্পাদকীয় লিখি। সারাজীবনই লিখেছি। সেই গণকণ্ঠ থেকে শুরু করে আজো লিখছি। তাই আমাকে জানতে হয়। বিশ্বের contemporary modern development-সম্বন্ধে আমাকে জানতে হয়। যেহেতু সাংবাদিকতা আমার পেশা। এটা আমার কবিতাকেও সাহায্য করে।