কবি আল মাহমুদের সঙ্গে ষাটের ও সত্তরের দশকে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ আমাকে দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন সমালোচনা লেখার জন্য। সমালোচনা আমি লিখেছিলাম এবং তা প্রকাশিত হয়েছিল রশিদ আল ফারুকী সম্পাদিত দিগন্ত নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকায়। ওই সময়ে সুন্দরম নামে আমি একটি অনিয়মিত সংকলন প্রকাশ করতাম। তাতে আল মাহমুদের কবিতা ছেপেছিলাম; পরে ‘লোকায়তে’ও আমি আল মাহমুদের কবিতা ছেপেছি। ‘লোক লোকান্তরে’র সময় থেকেই আমি আল মাহমুদের কবিতার অনুরাগী পাঠক ছিলাম। তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতাকেই আমার কাছে অসাধারণ ভালো কবিতা মনে হতো।
‘লোক লোকান্তর’, ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিনে’র কবিতাগুলো আমাকে এখনো মুগ্ধ করে। পরে ধীরে ধীরে তিনি ইসলামের প্রতি এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রতি ঝুঁকতে থাকেন। মুসলিম জাতীয় চেতনায় তিনি বখতিয়ারের পররাজ্য দখলের সমর্থক। কবি ফররুখ আহমদও মুসলিম চেতনা নিয়ে বখতিয়ারের বিজয়ে মুগ্ধতা প্রদান করে কবিতা লিখেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র যবনদের প্রতি বিরূপতা প্রকাশ করে লিখেছেন বলে আহমদ ছফা ‘শতবর্ষের ফেরারী : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ নামে বই লিখেছেন। মুহম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়, সুলতান মাহমুদের পনেরো বার ভারত আক্রমণ ও সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন, দিল্লীতে নাদির শাহের হত্যাযজ্ঞ, দিল্লীতে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ঘটনার মূল বিচারে মুসলিম জাতীয়তাবাদী ও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র। এই বিরোধের মধ্যে কবি আল মাহমুদ পক্ষ অবলম্বন করেছেন। বাংলা সাম্রাজ্যের ইতিহাস প্রণেতা সুকুমার সেন রাজা লক্ষণ সেন সম্পর্কে একটি প্রবন্ধে লক্ষণ সেনকে দেশপ্রেমিক ও সুশাসক বলে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। আল মাহমুদ এখানে প্রগতিবাদী ধারার বিরাগভাজন হয়েছেন। আল মাহমুদের মৃত্যুর পর তাঁর ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতাটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে যাতে আল মাহমুদের প্রতি বিরূপতা বাড়ে। পশ্চিম বাংলায় পর্যন্ত এটি প্রচারিত হয়েছে।
আমার মনে হয় দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের কাব্য সাধকদের মধ্যে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, ফররুখ আহমদ, শিকানদার আবু জাফর, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ প্রমুখের কবিতা পাঠ করা উচিৎ। ‘যবন’, ‘আশরাফ’, ‘আতরাফ’ ইত্যাদির পরিচয় পক্ষপাতমুক্ত অবস্থানে থেকে বোঝা দরকার এবং সত্যনিষ্ঠ অবস্থানে থেকে ঐতিহাসিক সত্য সন্ধান করা দরকার। ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে। ইতিহাসের চাকাকে সম্মুখ গতি দিতে হবে।
কবি আল মাহমুদের সঙ্গে শেষ পর্যন্তই আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তিনি বলতেন, ‘আপনাদের সঙ্গে আমার পার্থক্য আধাসুতার, একসুতারও নয়। আপনারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন… আমি আল্লাহ খোদা ছাড়তে চাই না।’ লক্ষ্য করার বিষয় এটাও যে আল মাহমুদ ইসলামগত প্রাণ হয়ে যাননি। শিল্পকলা একাডেমিতে বঙ্গবন্ধু তাঁকে চাকুরি দিয়েছিলেন। তার আগ পর্যন্ত তিনি দারিদ্র্যে দুর্গত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পর তিনি জিয়াউর রহমান ও এরশাদকে ধরে চলেছেন।
আল মাহমুদ সুন্দর কবিতা লিখেছেন শেষ পর্যন্তই। কিছু কবিতা ছাড়া সব কবিতাই তাঁর সব দিক দিয়ে উৎকৃষ্ট। গত পনেরো বছরের মধ্যে কয়েকবার আমি তাঁর কবিতা সম্পর্কে লিখব বলে ভেবেছি। কখনো কখনো কাগজ কলম দিয়ে বসেছিও। কিন্তু কেন যেন লিখতে পারিনি। আমি মনে করি আল মাহমুদ অবশ্যই আধুনিক যুগের বাংলা কবিতার ইতিমধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তা সত্ত্বেও এখনও তাঁর সম্পর্কে লিখতে পারছি না। আল মাহমুদ ছিলেন যথার্থ সৃষ্টিশীল কবি। সৃষ্টিশীল ব্যক্তি সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞের একটি অত্যন্ত বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ছে:
The executive person is both more primitive and more cultivated, more destructive and more constructive, occasionally crazier and yet adamantlly saner, than the average person. — F. Barron (1963), Creativity and Psychological Health, Princeton, NJ: Van Nostrand.
আল মাহমুদের প্রথম পর্যায়ের বেশ কিছু কবিতার চরণ অনেক পাঠকের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে। সেগুলোতে মানুষের জীবনের ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা আছে বলে সেগুলো লোকমুখে স্থান পেয়েছিল। ছয় দফা আন্দোলনের ঠিক আগে আইয়ুব খানের দুঃশাসনের মধ্যে লিখিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামে কবিতাটি অনেকের মুখস্থ ছিল, সভা-সমিতিতে বস্তৃতায় অনেকে যেটি শুনিয়েছেন। যে কেনো দুঃশাসনের মধ্যেই এই কবিতাটি জনমনে প্রতিবাদের স্পৃহা জাগানোর মতো:
এ কেমন অন্ধকার বঙ্গদেশ উত্থান রহিত
নৈশব্দের মন্ত্রে যেন ডালে আর পাখিও বসে না।
নদীগুলো দুঃখময়, নির্পতগ মাটিতে জন্মায়
কেবল ব্যাঙের ছাতা, অন্যকোন শ্যামলতা নেই।
বুঝি না, রবীন্দ্রনাথ কী ভেবে যে বাংলাদেশে ফের
বৃক্ষ হয়ে জন্মাবার অসম্ভব বাসনা রাখতেন।
গাছ নেই নদী নেই অপুষ্পক সময় বইছে
পুনর্জন্ম নেই আর, জন্মের বিরুদ্ধে সবাই
শুনুন, রবীন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত কবিতা
আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি
নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না
আপনার বাংলাদেশ এ রকম নিষ্ফলা, ঠাকুর!
অবিশ্বস্ত হাওয়া আছে, নেই কোন শব্দের দ্যোতনা,
দু’একটা পাখি শুধু অশত্থের ডালে বসে আজও
সঙ্গীতের ধ্বনি নিয়ে ভয়ে ভয়ে বাক্যালাপ করে;
বৃষ্টিহীন বোশেখের নিঃশব্দ পঁচিশ তারিখে।
আল মাহমুদের কবিতা ব্যাপকভাবে পঠিত হোক এবং তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হোক- এই কামনা করি।