একবার আমি ‘কবির অভাবে দেশ’ বলে একটা কবিতা লিখেছিলাম; অবশ্য দ্বিধান্বিত চিত্তে। ভয়ে ভয়ে। কারণ আমি তো জানতাম আমাদের দেশের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পৃষ্ঠায় নিয়মিত যে কবিতা ছাপা হয় তা আকাশের নিষ্প্রভ তারাদের চেয়েও বেশি এবং গুনে দেখতে গেলে এক ধরনের দুঃসাধ্য গণনা। যে তারার নিজস্ব কোনো আলো নেই তা বেশি টিপ টিপ করে। পরে অবশ্য আমার এ জন্য অনুতাপ হয়েছে। কারণ আমি নিজেও তো কবি। আর লেখালেখির ব্যাপারে আমারও তো কোনো ক্লান্তি নেই। প্রায়ান্ধ চোখ নিয়ে হাতড়ে হাতড়ে পরনির্ভরশীল হয়ে কবিতাই লিখতে চাইছি। চাইছি বাজারে আমার নামটি উপস্থিত থাকুক। এ নামের প্রয়োজন আছে কি নেই যেন সে বিবেচনা আমার নয়। এ বিবেচনা তবে কার? কে এসে আমার মুখের ওপর বলবে তোমার দুর্গন্ধময় পঙক্তি বস্তায় বন্ধ করো। এদেশের সব কাজই বিরক্তিকর হলে কেউ বাধা দেয়। কিন্তু পদ্যকারদের কেউ তো থামতে বলতে পারে না।
এই স্বাধীনতাই আধুনিক বাংলা কবিতার সমস্ত রহস্যকে পানসে করে দিয়েছে। একটা জাতির সমস্ত স্বপ্নই যখন একই স্বপ্নে পর্যবসিত হয় তখন বুঝতে হবে এদের আর উদ্ভাবনা শক্তি নেই। আমি বলবো না আমাদের সাহিত্যে এখন নৈরাজ্যের যুগ চলছে। কিন্তু কবিতার যখন রক্ত-মাংস থাকে না তখন আমার নিজের মন বিরাম প্রার্থনা করে। মনে হয় যেখানে বা যে গ্রামে আমার জন্য খানিকটা বিশ্রাম জুটবে সেই বিরামপুরে চলে যাই। কবির প্রধান কাজ হলো তার স্বজাতি ও স্বভাষার নর-নারীকে কল্পনায় সাঁতার দিতে শেখানো। দেশপ্রেমে, আত্মপ্রেমে, আত্মলিপ্সায় এবং প্রকৃতির মাধুর্যকে উপলব্ধিতে আচ্ছন্ন করে রাখা। শুধু কবির আত্মবিবৃতি গত শতাব্দীতে আধুনিক কবিতার প্রধান লক্ষণ হয়ে উঠেছিল। বিংশ শতাব্দী ছিল পুঁজিবাদের সাথে সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ের যুগ। আর বিশ্ব কবিতা অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে সমাজতন্ত্রেরই পক্ষ নিয়েছিল। যেন মার্কসবাদী না হলে কারও পক্ষে কবি হওয়া সম্ভব নয়। যারা এই ছকের বাইরে দাঁড়িয়ে কবিতার কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে সন্দেহ নেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রধান। তিনি জন্মেছিলেন তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে যেটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাকেও দিকভ্রান্ত করে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু তার অধ্যাত্মশক্তি তাকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। তিনি নোবেল বিজয়ী ছিলেন এটা বড় কথা নয়, বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল একজন প্রাচ্যদেশীয় কবি ফ্যাসিবাদকে পাশ কাটিয়ে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর বিপরীতে বিশ্বাসের জয়গান গেয়ে উঠেছিলেন। আর সেই জয়গান প্রতিধ্বনিত হয়েছিল পশ্চিমা পুঁজিবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহরগুলোতেই। কিন্তু এই যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হলো আধুনিক সাহিত্যের প্রবক্তা পৃথিবীর সব কবি সাহিত্যিকেরই সমাজতন্ত্রের ছত্রচ্ছায়ায় নিজেদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। একবিংশ শতাব্দী শুরু হবার আগেই সমাজতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে সোভিয়েত রাশিয়ার পতন এবং বিশ্বের সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে পচন ধরে যায়। শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের পক্ষে সৃজনশীল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পুঁজিবাদ এমন এক অপরাজিত দৈত্য হিসেবে আকাশের দিকে মাথা তুলেছে যা পৃথিবীর সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দার্শনিক ও বিপ্লবীদের চিন্তার ত্রিসীমার মধ্যে ছিল না। এর মানে এ নয় যে দৈত্য অমর। কিন্তু তার মৃত্যুর প্রাণ ভোমরাটি কোথায় লুক্কায়িত তা কেউ জানে না। অন্তত দার্শনিক ও বিপ্লবীরা তো জানেন না বলেই মনে হচ্ছে। কেবল ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী সৃজনশীল কবি-সাহিত্যিকরাই তাদের রচনায় ভবিষ্যদ্বাণী করছেন এই অপরাজিত দানবের পরাজয় ঘটবে নির্যাতিত মানুষের হাতেই। মানবতার হাতেই। ধর্মের হাতে এবং ইতিহাসের নিয়মে।
ইতিহাস ইতিহাসকেই রক্ষা করতে চায় এবং ইতিহাস শব্দের দ্রুততম অর্থ হলো সভ্যতার বিবরণ। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে তবে কি সৃজনশীল মানুষ অর্থাৎ পৃথিবীর কবিরাই ওই দৈত্যের প্রাণভোমরা কোথায় লুক্কায়িত, কোন্ সমুদ্রের নিচে, কোন্ সিন্দুকের ভেতর তা জানেন? দার্শনিকরা যদি হঠাৎ বলেন, দর্শনের কাজ হলো জগতের ব্যাখ্যা নয় জগৎটাকে বদলানো। তবে কবিরা কেন বলতে পারবেন না জগৎটা বদলে যায় কোনো দার্শনিক নিয়মে নয়। কোনো ডায়ালেক্টিক পদ্ধতিতে নয়। কোনো শ্রেণী সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় নয়। জগৎটা বদলে যায় মানুষের স্বপ্নে। মানুষের আশায়, মানুষের বিশ্বাসে ও মানবতার ধর্মে। সর্বোপরি মানুষের বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে। এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শুধু গবেষণায় আয়ত্ত হয়নি। ল্যাবরেটরিতে কিংবা মানুষের মস্তকে অকস্মাৎ তা স্ফুলিঙ্গরূপে আবির্ভূত হয়। মানুষ হঠাৎ পেয়ে যায়। যেমন একজন কবি ছন্দ, মিল ও উপমা অলৌকিকভাবে একদিন পেয়ে গিয়ে এক অসাধারণ কাব্য সৃষ্টি করেন।
আমাদের দেশে যে কোনো কারণেই হোক কাব্যই হয়ে উঠেছে আধুনিক ও মননশীল সাহিত্যের প্রতিভূ। অথচ কে না জানে সারা পৃথিবীতেই আধুনিক মননশীল সাহিত্য হিসেবে এ সময়ের পাঠকের কাছে কবিতা সে সম্মান পাচ্ছে না। বরং গল্প-উপন্যাস অর্থাৎ সাম্প্রতিক ফিকশন ন্যায়সঙ্গতভাবেই পাঠকের কাছে আধুনিক পাঠ্য বিষয় হিসেবে মর্যাদায় সমাসীন। কবিতা আমাদের দেশে কেন এতটা অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছে তা দুর্বোধ্য নয়। কারণ এদেশে সব সময় প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে নিয়ম ভাঙা সৃজনশীল হিসেবে কবির একটা স্পষ্ট ভূমিকা ছিল। কিন্তু অতি সম্প্রতি গদ্য বা কথাশিল্প তার নিজের ভূমিকা ও মর্যাদা আদায় করে নিতে আগুয়ান হয়েছে। এতে অবশ্য কবিদের ভয় পাবার কিছু নেই। কারণটা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। কাজের কাজ হলো সমকালীনতার সাক্ষ্য দেয়া নয়। বরং সমকালীনতার মধ্যে যে রহস্য আছে সেই রহস্যের নিগূঢ় অন্তরালকে উন্মোচন করা। অর্থাৎ মানুষের মনে আশা-ভরসা ও স্বপ্ন সৃষ্টি করা। এখানে কোন কবি প্রধান ভূমিকা পালন করবেন বা করছেন এটা ধর্তব্যের বিষয় নয়। কারণ দেখা গেছে যে, সমকালের অনেক প্রধান কবি আয়ু ফুরিয়ে গেলে নিঃশেষিত হয়ে যান। এমনকি পাঠক নিজের অজান্তেই সেই কবির নাম উচ্চারণ করতে ভুলে যায়। যেহেতু কবরের মাটি ফাটিয়ে ওই কবির প্রাত্যহিক সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় তার নামটি মুদ্রিত করার জন্য প্রত্যাবর্তনে আর পারঙ্গম হন না সম্ভবত সে কারণেই বিস্মৃতির অন্ধকারে এক ধাপ মাটির নিচেই তাকে পরকালের অপেক্ষা করতে হয়। তিনি পরকাল মানুন আর না মানুন অপেক্ষার জগতে তাকে থাকতেই হবে সুবিচারের আশায়।
আমাদের সাম্প্রতিক কবিতা মূলত একবিংশ শতাব্দীর কবিতা হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, এ সময়ের কবিতার সমস্ত উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও বিবরণ অত্যন্ত গতানুগতিক এবং গত শতাব্দীর অনুষঙ্গে ঠাসা। প্রেম যে কবিতার একটি মহার্ঘ বিষয় সেটাও যৌনতাড়িত তরুণ কবির পঙক্তি রচনায় হাস্যকর হয়ে উঠেছে। তাদের কবিতা পড়ে মনে হয় তারা তাদের সমস্ত প্রেমের আর্তি মূলত তাদের চেনা কয়েকটি নারীকে ছলেবলে করায়ত্ত করার মরিয়া প্রয়াস মাত্র। প্রেমের কৌশল কখনো প্রেম নয়। প্রকৃতির ভেতর পাখি ধরার শিকারির ফাঁদের মতো চতুর চেষ্টা। এতে এই যুগের যুবতীদের যেহেতু কোনো আস্থা সৃষ্টি হয় না সে কারণে তারা কবিতা নয় গদ্যে ঘটনার বর্ণনা চায়। চায় হুমায়ূন আহমেদ কিংবা ইমদাদুল হক মিলনকে চেখে দেখতে। প্রেমের কবিতা মাঠে মারা পড়ে। আমি কিছুদিন আগে নব্বই দশকের কবিতার ওপর একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলাম। এতে সাম্প্রতিক কবিতার প্রতি আমার যে গভীর আস্থা ও সন্দেহ ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে তা বলতে চেয়েছি। এই জট ছাড়াতে পারে একমাত্র একালের প্রতিভাবান কবিত্ব শক্তি। তেমন কবি আমাদের নেই এটা সত্য নয়। আমি কিছু কিছু লক্ষণে তাদের চিনতে পারলেও দৃঢ়মূল শনাক্ত করার মতো শক্তি আমার কোথায়। আমি আগামীকালকে ঈর্ষা করি না। তবে আগামীকালের সূর্যালোক আমার বয়সের জন্য যদি আমার কাছে স্পষ্ট না হয় তাহলে হলফ করে এ কথা কি বলা যায় আমি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা?
জীবনানন্দ দাশ কি জানতেন যে তার মৃত্যুর পর শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদ বলে কোনো কবি এসে বাংলা ভাষার মৌচাকে মধু সংযোগ করবে? না, জীবনানন্দ তা জানতেন না। তার রচনায় এমন কোনো আশাও ব্যক্ত করে যাননি। নতুনত্বের স্ফূরণ অন্তত কাব্যে চিরকালই অভাবিতপূর্ব-আকস্মিক। প্রতিভাবান কবিত্ব শক্তি তার কালকে জিজ্ঞাসা করে আবির্ভূত হন না এবং কোনো হিসাব দিয়ে কোনো জবাবদিহি করে অস্তমিতও হন না। প্রকৃত কবি তার কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত থাকেন এমন কথা আমি সাহিত্যের ইতিহাসে খুঁজে পাইনি। আমি নিজেও নিঃশঙ্কচিত্তে আমার আয়ুষ্কাল অতিক্রম করে যাচ্ছি। আমি আমার শাকান্ন আহার করে পরিতৃপ্ত। আমি যিশু খ্রিষ্টের মতো কখনো বলবো না যে সিজারের মুখ আঁকা মুদ্রা সিজারকে দাও। আর ঈশ্বরের প্রাপ্য ঈশ্বরকে দাও। আমি বরং কবি হিসেবেই চিরকাল এ কথা বলে যাবো যে, সিজারের মুখ আঁকা মুদ্রাও আমার প্রভুকে দাও। আমার বিশ্বাসের বেদিতে তর্পণ করো। কোরবানি করে দাও নিজেকে আমার প্রভুর বেদিতে।
শেষ পর্যন্ত দার্শনিকতা কাব্যরস সৃষ্টিতে কবিকে নানা ধরনের দুর্বোধ্যতা ও অস্পষ্টতায় নিমজ্জিত করে। বচন সৃষ্টির প্রাথমিক শর্ত হলো আনন্দ। কবির মনে আনন্দের আকাক্সক্ষা জমে উঠলে তিনি উপযুক্ত ভাষায় সে আনন্দ ব্যক্ত করার আয়োজন করবেনই। ছন্দ, মিল মাত্রাও কবির সহজাত দক্ষতার বিষয়। এসব কবিকে কখনো ব্যাকুলতায় ভোগায় না। এ নিয়ে তার বিশেষ বিবেচনা থাকতে পারে। কিন্তু আনন্দটাই প্রকাশযোগ্য বেদনা হয়ে তার সত্তাকে আকুল করে।
আমাদের দেশে কবির প্রধান বিপদ হলো রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের দ্বারা কবিকে দলীয় পক্ষপুটে টেনে আনা। রাষ্ট্র কবির পৃষ্ঠপোষকতা করুক এটা কবি মাত্রেরই আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু দলীয় রাজনীতি কবিকে বৃত্তবদ্ধ রাখুক এটা কবিতার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। রাজনৈতিক বৃত্তে আবদ্ধ কবিমাত্রই আক্ষেপের রোগে আক্রান্ত থাকেন। এ রোগ যক্ষ্মার চেয়েও ক্ষয়কারী এবং কর্কটের চেয়ে উৎকট। এদেশের সর্বাধুনিক চিন্তার উদগাতা সব সময় কবিরাই হয়েছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, নির্বোধ রাজনীতি সব সময়ই কবিকে আশ্রয়দাতা ছদ্মবেশে নিরাশ্রয় এবং জনগণ ও সমাজ থেকে অনিকেত রাখতে চেয়েছে। কবিকে দিয়ে এমন কথা বলাতে চেয়েছে যা কোনো অবস্থাতেই কবির জিহ্বা থেকে নিঃসৃত হতে চায় না। অথচ শাসক ও রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারীরা নির্বোধ বলে তা সর্বপ্রথম যিনি উপলব্ধি করেন তিনি কবি। রাজার নৈকট্যপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীরা নির্বুদ্ধিতর প্রশংসাকারী। এটাই তাদের জীবিকা। কবি চিরকালই জীবিকা বিষয়ে উদাসীন প্রাণী।
তবুও আমাদের দেশে কাব্য সৃষ্টি হয়। এর কারণ এদেশের প্রকৃতি এবং ঘন সবুজ পল্লবে আচ্ছাদিত রসালো মাটি। প্রকৃতি কিছু মানুষকে জাগতিক বাস্তবতা বিষয়ে উদাসীন করে জন্ম দেয়। এ জন্যই ‘সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ আমি তরুণ কবিদের সর্ব প্রকার কাব্য প্রয়াসকেই সমর্থন করতে চাই। তবে কবি হিসেবে আমার ঈর্ষা ও সমালোচনার কথাও আমি অস্বীকার করি না। প্রচলিত কথা হলো যে কবিতা তারুণ্যের মুখাপেক্ষী। কিন্তু আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে জানি কবিতা তথা সৃজনশীল সাহিত্য বহু বিচরণশীল অভিজ্ঞতা ও বার্ধক্যেরও মুখাপেক্ষী। ব্যাপক পাঠ ও পর্যবেক্ষণের কাতরতায় কম্পমান। কবি অধ্যাপনাবৃত্তি গ্রহণ না করুক এটাই আমার পছন্দ। তবে কবিকে বলতে হবে। বক্তৃতায় এবং বিবরণদানে কবির মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা একান্ত কাম্য। মনে রাখতে হবে তরুণ শব্দটির অর্থ হলো কম বয়সী, কম অভিজ্ঞতা ও অল্প বোধসম্পন্ন চঞ্চল প্রাণ। এমন একটা তারুণ্য জগতের সব কবিকেই অতিক্রম করে আসতে হয়। কিন্তু বার্ধক্য ও পূর্ণতা কবিকে প্রবীণ করে তোলে। এ কথা ভুলে গেলে কবির চলে না।
সাম্প্রতিককালের কবিতায় যে কোনো নতুন উপমা বা উৎপেক্ষা নেই এমন নয়। নব্বই দশকের কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে আমি তাদের উদ্ভাবনা শক্তির প্রশংসা না করে পারিনি। আমরা ওই ধরনের উদ্ভাবনার পরিচয় আমাদের কালে দিতে পারিনি। কারণ আমরা জন্মেছিলাম আমাদের সময়ের গর্ভে। আমাদের সাধ্য অনুযায়ী আমরা এর কাব্যময় বর্ণনাও দিয়েছি এবং তা আমাদের পাঠকদের খানিকটা পরিতৃপ্তিও করতে পেরেছে।
আমার সময়ের কবিবন্ধুরা আমাকে এই বলে ঠাট্টা করতেন যে আমি ঢাকা এসেছিলাম গায়ে খদ্দরের পিরহান এবং পরনে খদ্দরের পাজামা ও রাবারের স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে। আমার বগলের নিচে নিয়ে এসেছিলাম একটা ভাঙা টিনের সুটকেস। যার গায়ে গোলাপফুল আঁকা। তারা একবিন্দুও মিথ্যে বলেননি। প্রকৃতপক্ষে আমি এভাবেই ঢাকায় এসে হাজির হয়েছিলাম, এসেছিলাম অবশ্য কবি হতে। আজ প্রায় অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল আমি এই শহরে আছি। আমার ভাঙা সুটকেসের ভেতরে আমি নিয়ে এনেছিলাম বাংলাদেশের সবগুলো নদী, পাখি, পতঙ্গ, নৌকা, নর-নারী অর্থাৎ বহমান আস্ত একটি বাংলাদেশ। যা আমি নিয়ে এসেছিলাম আমার ভাঙা সুটকেসের ভেতর তাতো একটি একটি করে আমার জাতিকে আমি দেখিয়েছি। যেমন জাদুকরেরা তাদের দ্রষ্টব্য তাদের মুগ্ধ দর্শককে দেখায়। আমিও কি আমার লওয়াজিমা একটি একটি করে দেখাইনি? বহমান জীবনের সমস্ত বাস্তবতা আমার ওই গোলাপফুল আঁকা ভাঙা সুটকেসে ছিল। তা আমি আমার জাতিকে দেখিয়েছি। আমার দ্রষ্টব্য দেখে তারা কখনো হাততালি দিয়েছে, কখনো অশ্রুসিক্ত হয়েছে। আমি এখনো এই শহরেই আছি। আমি যখন এসেছিলাম তখন আমার বন্ধুদের বগলের নিচে থাকতো সিলেকটেড পয়েমস জাতীয় ইউরোপের নানা ভাষার নানা বাছাই করা কাব্যগ্রন্থ। আমি যেমন আমার ভাঙা সুটকেস থেকে আমার জিনিস বের করে দেখিয়েছি তারাও তাদের বগলের নিচের পুঁজি থেকে নানা ভেলকি দেখিয়েছেন। আমি তো এখনো এই শহরেই আছি। আমার সেইসব বন্ধুদের অনেকেরই এই সৌভাগ্য হয়নি। তারা এখন আর দেখাবার মতো কোনো কিছু তাদের বগলের নিচ থেকে বের করতে পারছেন না। তাদের আয়োজন ও উদ্যম ফুরিয়ে গেছে। তারাও আমার মতো বয়সের ভারে জর্জর। রোগ-শোকে ক্লান্ত। তাদের প্রতি আমার সহানুভূতির কোনো সীমা নেই। কিন্তু তাদের অনেকেরই নাম এই মহানগরীর তারুণ্য আর উচ্চারণও করে না। হয়তো তারা নিজেরাও এই সংবাদ অন্যের মুখে শুনতে পান কাব্য কোনো সময়ই কোনো প্রতিযোগিতার ব্যাপার ছিল না। ঈর্ষার ব্যাপার ছিল না। ছিল আনন্দের বিষয়। ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। প্রকৃত কবিরা রাবারের স্যান্ডেল পরে। খদ্দরের জামা গায়ে দিয়ে ভাঙা সুটকেস নিয়ে চিরকালই শহরের দিকে যাত্রা করেন। আর ফিরে যান না।