তিনি লিখেছিলেন, ‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে/ মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’ তিনি মেনে নিয়েছেন তার ঈদ। অপার আনন্দে চলে গেছেন অন্যলোকে। এভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন তিনিই করতে পারেন যিনি মৃত্যু ও জীবনের মধ্যে কোনো ফারাক আবিষ্কার করেন না। তার কাছে সময়ই সব। সময়কে স্বাচ্ছন্দ্যে পাড়ি দিতে দিতে যার যাত্রা অপার। এ যাত্রা হয়তো তার জন্য আনন্দের কিন্তু আমাদের জন্য শুধুই দীর্ঘশ্বাসের শুধুই অশ্রু ও বেদনার।
আল মাহমুদ সেই কবি পঞ্চাশের কবিতায় নির্মাণে ও উচ্চারণে যিনি গ্রামীণ মিথকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তার সাথে আধুনিক নগর সভ্যতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে গড়ে তুলেছেন কবিতার একটি একক ভুবন- আপাদমস্তক আত্মসন্ধানী এ কবি অতীতের ধারাবাহিকতায় তৈরি করেছেন বর্তমান আর বর্তমানের দৃষ্টি দিয়ে শনাক্ত করেছেন তার ভবিষ্যৎ। কবিতা তার কাছে ছিলো যেন একান্তই নিজস্ব একটি বিষয় যা শুধু ন্যাপথলিনের ঘ্রাণ ছড়ায় না, অনাগত পথে নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবারও প্রেরণা জোগায়। সময়ের সাথে পারিপার্শ্বিকতার সাথে তাল মেলাতে উদ্বুদ্ধ করে, সহায়তা করে।
সমকালীন বাংলা কবিতায় অগ্রকবিদের অন্যতম কবি আল মাহমুদের কাছে কবিতা শুধু কৈশোরের স্মৃতিই ছিলো না। কবিতাকে তিনি চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম আর মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তারের কাছ থেকে টেনে নিয়ে গেছেন ছেচল্লিশের অস্থিরতার মধ্যে। নিমডালে বসে থাকা হলুদ পাখি আর শান্ত স্থির মায়ের মুখচ্ছবির পাশেই স্থাপন করেছেন দাউ দাউ দাঙ্গার আগুন, নিশান-মিছিল এবং স্কুল পালিয়ে সভা করার মতো প্রতিবাদ-প্রতিরোধের চিত্রকল্পকে।
তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিনে’র মধ্য দিয়ে তীব্রভাবে শনাক্ত কবি আল মাহমুদ তার কাব্যধারাকে পরিচালিত করেছেন-কাব্যশক্তিকে বিন্যস্ত করেছেন নানা কৌশলে নানা অভিসন্ধিতে। সম্ভবত বাংলা কাব্যসাহিত্যে তিনিই প্রথম কবি, যিনি প্রতিটি মুহূর্ত বর্তমানকে ভেঙেছেন এবং তার মধ্য দিয়ে নির্মাণ করেছেন ভবিষ্যৎ। এই যে ভাঙা-গড়ার ধারাক্রম, কবিতায় এই যে প্রতিনিয়ত বিলয় ও সৃষ্টির খেলা এর মধ্য দিয়েই নির্মিত হয়েছেন তিনি ধীরে ধীরে। আল মাহমুদের প্রতিটি কবিতাই যেন নতুন, প্রতিটি গ্রন্থই যেন এক একটি আলাদা ভুবন। লোক-লোকান্তরের আল মাহমুদ আর সোনালি কাবিনের আল মাহমুদ যেমন এক নয়, তেমনি এক চক্ষু হরিণ-এর আল মাহমুদের সাথে দ্বিতীয় ভাঙন-এর আল মাহমুদের পার্থক্য যোজন-যোজন।
কবিতা হচ্ছে ঈশ্বরের শস্যক্ষেত্র আর কবিরা হচ্ছেন তার কৃষক। পঞ্চাশের যে পাঁচজন কবি সমসাময়িকদের কাছ থেকে নিজেদের আলাদা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন আল মাহমুদ তাদের অন্যতম। শামসুর রাহমান প্রয়াত হবার পর সতীর্থদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে সরব।
কবির কাজ সময়কে শনাক্ত করা, কবির কাজ সমাজ ও জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার জন্য দিক-নির্দেশনা দেয়া। আমৃত্যু আল মাহমুদ সে দায়িত্বই পালন করে গেছেন নিবিষ্টচিত্তে প্রতিটি মুহূর্তে। কালের অভয় অঙ্গে মেখে বখতিয়ারের ঘোড়াটির ছুটে চলা ছিল যেন ক্লান্তিহীন-শ্রান্তিহীন।
নারীর নুনের মধ্যে মায়াবী আগুন খুঁজে পাওয়া কবি তার আনন্দ নিঃশ্বাসকে ছুঁড়ে দিয়েছেন পৃথিবীর কাকচক্ষু দীর্ঘ সরোবরে এবং পরাজিত মৃত্যুর পিছনে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনেছেন অবিশ্রাম ডানার আওয়াজ- আর এসবের মধ্য দিয়ে তার বোধ জুড়ে জন্ম নিয়েছে এক অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।
তার মনে হয়েছে-
একমাত্র জ্ঞান ছাড়া আর সবি কালের অধীন
যেমন পুকুরে ভাসে
নিরিবিলি পদ্মের কোরক
ভেসে থাকে নিস্তরঙ্গ পাতার আশ্রয়ে।
এবং তিনি ভেঙে পড়েছেন। তার কণ্ঠ জুড়ে যেন সেই প্রাচীন আর্তনাদ। তিনি প্রার্থনার মতো উচ্চারণ করেছেন-
শুধু চাই সূর্যালোক। / শুধু চাই- /
স্বাধীন বাতাস। / মৃণালের ভর চাই /
আর চাই / মাটির আদর। / মাটিই পরম স্পর্শ, মাটি শেষ সমতার মতো। (জ্ঞান)
মৃত্তিকার প্রতি- জন্মের প্রতি এই যে আবেগ, এই যে ভালোবাসা, এই যে বিশ্বাস- এর মধ্য দিয়েই একজন আল মাহমুদ শনাক্ত হন চূড়ান্তভাবে। প্রশ্নাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তার ঈশ্বরপ্রেম। একদা মনুষ্য সৃষ্ট জাগতিক সাম্যের যে ধ্বনি তাতে সংক্রমিত হয়েছিল, চূড়ান্ত পরিণতিতে তা যেন ধর্মের প্রতি গভীর আস্থা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিকশিত ও পল্লবিত হয়ে ওঠে। ইসলাম এবং একমাত্র ইসলামের সাম্যই যে প্রকৃত সাম্য- শুধুমাত্র বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে নয়- কবিতা ও কর্মের মধ্য দিয়েও কবি তার প্রতিফলন ঘটাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। আল মাহমুদের এই আচরণ নিঃসন্দেহে একজন ঈশ্বরাক্রান্ত কবির আচরণ এবং এর মধ্য দিয়ে তার ‘কবি-চরিত্র’ মূর্ত হয়ে ওঠে।
আল মাহমুদ ছিলেন চিরকাল ‘মানুষের কবি’। তার কবিতায় মানুষের প্রতি পক্ষপাত অধিকমাত্রায় দৃশ্যমান। মানুষকে ভালোবাসা একজন মানুষের জন্য যতটা জরুরি একজন কবির জন্য তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি জরুরি। আল মাহমুদ মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে যে মানবিক আচরণের প্রকাশ ঘটিয়ে গেছেন তা আমাদের কাব্যসাহিত্যে একটি বিরল ঘটনা।
আল মাহমুদ মানুষের কবি, মানবতার কবি। আল মাহমুদ মৃত্তিকা ও ফসলের কবি। আল মাহমুদ প্রেম ও প্রণয়ে ভাস্বর। আল মাহমুদ ছুঁয়ে গেছেন নিসর্গকে। তার আত্মাজুড়ে বহমান তিতাস নদী। তিনি সেই নদীতে আবিষ্কার করেছেন তার শৈশব-কৈশোর এবং প্রিয়তমা নারীকে এবং ফেটে পড়েছেন শনাক্তের অদম্য ‘উচ্চারণে’-
‘দ্যাখো প্রতিটি নারীর ভেতর বয়ে চলেছে অচেনা নদী।’
‘তিতাস’ তার চিরচেনা নদী হলেও পৃথিবীর প্রতিটি নারী তার পরিচিত নয়। তবুও শাশ্বত নারী চরিত্রের মধ্যে নিরন্তর এক একটি অচেনা নদীর গন্ধ আবিষ্কার করেছেন তিনি। পৃথিবীর সকল বড়ো কবিই বিরলপ্রজ- সকল শ্রেষ্ঠ কবিতাই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ অনুদান। আল মাহমুদ কবি হিসেবে যেমন বিরলপ্রজ তেমনি তার অসংখ্য কবিতাকে শনাক্ত করা যায় ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ অনুদান হিসেবে। একজন কবি আল মাহমুদের জন্য এ প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে কিঞ্চিৎকর নয়।
তিতাসের তীর থেকে মৃত্তিকার গন্ধ নিয়ে উড়ে আসা কবি এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষে আবার ফিরে গেলেন সেই তিতাসের কাছে। মৃত্যু হয়তো জীবনের সমাপ্তি কিন্তু কর্ম ও স্মৃতির অবস্থান দীর্ঘকালের। সে যাত্রায় আল মাহমুদ বেঁচে থাকবেন আরও অনন্তকাল। শুক্রবারের আরাধ্য চিঠি তার আত্মাকে যে শান্তি প্রদান করেছে সে শান্তি বর্ষিত হোক তার অগণিত ভক্তকুলের মধ্যেও।