আল মাহমুদ মূলত কবি। তার মানে এ কথা নয় তিনি মাত্র কবি-ই, আর কিছু নন। সাহিত্যে শিল্পে বহু মাত্রিকতায় স্বল্পপ্রজ। খুব বিরল প্রতিভা এ ক্ষেত্রে নানা রঙে ঢঙে বর্ণিলতাকে ছুঁয়ে স্বাদ নিতে জানেন। তবে শিল্প গুণের একটা সাধারণ চারিত্র্য থাকে। যার মানসলোকে শিল্প বোধের বসবাস, তা কখনো নিঃসঙ্গ একাকী হয় না। প্রকাশ লালন এবং চর্চার মধ্য দিয়ে যে যার মননশীলতাকে প্রতিপন্ন করে- কখনো তা এককেন্দ্রিকতায় পর্যবসিত হয়, আবার বহু মাত্রিকতায় বিকশিত হয়। ব্যাপারট খুব সহজ নয়। সহজ নয় বলেই খুব কম সংখ্যককে সফলতায় সমাসীন হতে দেখা যা।
আল মাহমুদ সেই মুষ্টিমেয় জনদের মধ্যে অন্যতম। পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে এ কবিকে সবচেয়ে ভিন্ন স্বভাবের চিহ্নিত করার উপায় হলো এই, তিনি শুধুই কবি নন। তিনি বিশিষ্ট কবিই- একমাত্র অধিবাস কাব্য কাননেই নয়- তিনি সমকালের অন্যতম ও দুর্দান্ত কথা শিল্পীও। একজন কবি কথাশিল্পী হিসেবে কিংবা কথাশিল্পী কবি হিসেবেও যৌথ ঐশ্বর্য প্রকাশে কৃতী এমন ঘটনাটি আল মাহমুদ। তাই পরিণত বয়সে কবিতাকে খানিকটা পাশে রেখে নিরলস ও একাধারে কথাসাহিত্যে ফুল ফোটাতে পেরেছেন তিনিই।
আল মাহমুদের সেই নন্দিত কাননে একটু দৃষ্টি ফেরাতে সচেষ্ট হবো, যা হয়তো ভূমি হিসেবে সমগ্র মাহমুদের খুবই সামান্য, কিন্তু গুরুত্বের বিবেচনায় এক অসামান্য কীর্তি।
আল মাহমুদ এক সঙ্গে দু’টো বা ততোধিক উপন্যাস রচনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। একই প্রেক্ষাপটে নানা ঘটনা ভিন্ন কাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়ে সফল উপন্যাস রচনা করাত পারঙ্গম ছিলেন। এমন একটি সময়ের উপন্যাস বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য। ১৯৭১-র মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ কিস্তিতে ধারাবাহিকভাবে লিখিত। ধারাবাহিকভাবে উপন্যাস লেখার সুবিধা-অসুবিধা উভয়েই আছে। সুবিধা হচ্ছে, একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস প্রকাশের সুযোগ সীমিত বলে লেখক উপন্যাস লেখা ও প্রকাশের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেন। তাছাড়া বড় ক্যানভাসের কাজ করার জন্য যে সময় ও তাড়নার প্রয়োজন পড়ে, তা অনেক সময়ই মেলে না বলে লেখক হাত গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হন। অপরদিকে কথাসাহিত্যের বাজারকে তো অস্বীকার করা যায় না, অথচ এ ক্ষেত্রে আত্মনিবেদন করার মতো লোক খুবই মুষ্টিমেয়। এ প্রয়োজন পূরণও এর মাধ্যমে খানিকটা ঘটে। তবে ধারাবাহিকভাবে লেখা সহজসাধ্য নয়। লেখক মূলত নির্ভরশীল আবেগ ও পরিপার্শ্বের অবস্থার ওপর। প্রতিপাদ্য বিষয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রেখে দীর্ঘদিন একটি রচনায় নিবন্ধ থাকা সুকঠিন ব্যাপার। যে কারণে অনেক সৃষ্টিশীল লেখকই এমন বিপ্রতীপ কাজে নিযুক্ত হতে সাহস পান না। আল মাহমুদ ছিলেন এ ব্যাপারে অনন্য উদাহরণ। একসঙ্গে একাধিক ধারাবাহিক উপন্যাস, জীবনী, ভ্রমণকাহিনী লিখে গেছেন কোন ছন্দপতন ছাড়া। এমনকি তিনি যখন দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেললেন (কানা মামুদ), কলম চালনার ক্ষমতা ছিল না তখনো তিনি মুখে মুখে ডিকটেশন দিয়ে অনেক উপন্যাস রচনা করেছেন। এমনকি তিনি একটি মহাকাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন।
পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে অবশ্য কেউ কেউ কথাসাহিত্যে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এঁদের অনেকেই একটি বা দু’টি রচনার মাধ্যমে বহুমাত্রিকতায় স্পর্শ করেছেন। কেউ কবিতার পথটি রেখে কথাশিল্পী বা নাট্যকার হিসেবে চেয়েছেন আত্মপ্রতিষ্ঠা। পেরেছেন এদের মধ্যে একমাত্র সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬)। শামসুর রাহমানও (১৯২৯-২০০৬) ৪টি উপন্যাস রচনা করেন। আলাউদ্দিন আল আজাদের (১৯৩২-২০০৯) কথা এ প্রসঙ্গে এসে যায়। তিনিও একজন কবি ও কথাশিল্পী হিসেবে সফল, ঋদ্ধমান ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আল মাহমুদের গদ্যের দিগন্ত এতো বিশাল ও পরিব্যাপ্ত যার সমকক্ষ এ বাংলায় আর কেউ নেই।
আল মাহমুদ ১৩টি উপন্যাস ছাড়াও ৭টি গল্পগ্রন্থ, ০১টি আত্মজীবনী, ০২টি কিশোর উপন্যাস, ১৫ প্রবন্ধ গ্রন্থ, ০২টি কলাম, ০১টি ভ্রমণকাহিনী ও ০১টি আত্ম জৈবনিক উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর অপ্রকাশিত গদ্য লেখাও রয়েছে কম নয়।
আল মাহমুদ পঞ্চাশের সবচেয়ে প্রণিধান, শ্রেষ্ঠ কবি হওয়া সত্ত্বেও কথাশিল্পী হিসেবে ব্যাপক প্রবেশ আশির দশকে লক্ষণীয়। তিনটি কাব্যগ্রন্থ (লোক লোকান্তর-১৯৬৩, ‘কালের কলস’-১৯৬৬ ও ‘সোনালি কাবিন’-১৯৭৩) প্রকাশের পর গল্পগন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ (১৯৭৫) চিহ্নিত করে আল মাহমুদের অসামান্য গদ্য ও ভাষাশিল্পীর পরিচয়। তারপর গল্পগ্রন্থ ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’ (১৯৮৩) প্রকাশের পর তিনি একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ (১৯৮৬) লেখার মাধ্যমে তিনি উপন্যাসে আত্মনিয়োগ করেন। অনেকটা দু’ হাতেই নব্বই দশকে অনেকগুলো উপন্যাস লিখে ফেলেন তিনি। ‘কাবিরেল বোন’ (১৯৯৩) তাঁর বলা যায় দ্বিতীয় উপন্যাস।
পরবর্তীতে গদ্য লেখক আল মাহমুদ আমাদের নব আস্বাদনে ব্যাপ্তিকে প্রসারিত করেছেন ঠিকই, সত্যিকার অর্থে আশি থেকে নব্বই দশকে তার হাত ঝলকে উঠেছে বিবিধ কৌশলে উপন্যাস রচনায়। আল মাহমুদীয় গদ্য উদ্ভূত প্রাণস্পর্শী এবং ধারালো ছুরির চেয়েও তীক্ষè মারণাস্ত্র বিশেষ। কথাশিল্পীর জন্য এ হাতিয়ার অতীব প্রয়োজনীয়। আল মাহমুদের সংগ্রহে আরো মূল্যবান অস্ত্র তোলা ছিল, তা হলো জীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতা, দেখার স্বচ্ছ দৃষ্টি, উপলব্ধি ও বোধের বিশালত্ব। সর্বোপরি ভিন্নমাত্রিক আঙ্গিকে উপস্থাপনার কৌশল। সামান্য কাহিনী, আগামী পটভূমি ও ছেদো কাহিনী ও তাঁর জাদুকরী ভাষায় অসাধারণ রূপ নিতে দেখেছি। ভাষাশিল্পীর পরিচয়তো এখানেই। আল মাহমুদ যে একজন প্রকৃতই শক্তিমান কথাশিল্পী তা তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠক উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। কবিতায়ও জীবন কাহিনী বর্ণনা, নাটকীয়তা এবং উদ্ভূত রসঘন পরিবেশ সৃষ্টি করার ক্ষমতা আমাদের এ বিশ্বাস এনে দেয়।
আল মাহমুদের ‘কাবিলের বোন’ আমাদের জাতীয় জীবনের একটি বড় টার্নিং পয়েন্টের ঘটনাপ্রবাহ। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান নামে যে ভূখণ্ড বিশ্বের মানচিত্রে অঙ্কিত হয়েছিল তার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল দশকোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়ার স্বপ্নের আভৌমিক বিন্যাস। বিশ্বাস এবং অঙ্গীকার। অর্থাৎ, পঁচাশি ভাগ মুসলমান চেয়েছিল পাকিস্তান হবে শোষণহীন ইনসাফভিত্তিক ইসলামী আদর্শনির্ভর একটি সত্যিকার মুসলিম রাষ্ট্র। মুসলিম লীগের নেতৃত্ব সেই আশ্বাস ও বিশ্বাস কম দেয়নি। বক্তৃতায় বিবৃতিতে পাকিস্তানবাসীকে বার বার আশ্বস্ত করেছে যে পাকিস্তান হবে একটি স্বপ্নের দেশ।
অর্থনীতি হবে ইনসাফভিত্তিক। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। সার্বিক অর্থেই কল্যাণ রাষ্ট্র। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ ঘটতে সময় নেয়নি। পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান দু’টি ভূখণ্ডের হাজার মাইলের ব্যবধান যতটা নয় তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পর্কহীনতা দূরত্ব সৃষ্টি করলো মানসিক। সন্দেহ অবিশ্বাস হিংসা-প্রতিহিংসা দিনের পর দিন বাড়তে থাকলো। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী এই ব্যবধানকে কমিয়ে আনার বা মুছে ফেলার চিন্তা করলেনই না। চাইলেন শক্তি ও বল প্রয়োগে সমাধান করতে। পরিণামে জাতীয় জীবনে ঘটে গেলো পরপর রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনাসমূহ। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-র গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০-র আইউব শাহীর বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি নেতৃত্বের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন, ১৯৭১-র সশস্ত্র যুদ্ধ-১৬ই ডিসেম্বরে গৌরবময় বিজয় এবং স্বাধীনতা অর্জন। কিন্তু ১৯৪৭-’৭১ এ কালপর্বটি (২৪ বছর) আমাদের কাছে নানা কারণেই বিশেষ গুরুত্ববহ। এ সময়ে বিশ্লেষণে গেলে খুঁজে পাওয়া যাবে দু’টি ভূখণ্ডের বিচ্ছেদ-বেদনার মৌল আবেগ ও সূত্র। হাজার মাইলের ব্যবধানেও একই রাষ্ট্রের বাসিন্দা হওয়ার কারণে সামাজিক সৌহার্দ্য সম্পর্ক সাংস্কৃতিক লেনদেনের যে ক্ষীণ প্রবাহ ঘটেছিল তারই ছিটেফোঁটা মানবিক বিপর্যয়ের বিশাল পটভূমি তৈরি করেছিল, হয়তো সময়ের ডামাডোলে অতলান্তিক বোধটি সহসা হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত কোন ব্যাপক প্রভাব রাখতে সমর্থ হয়নি, এর গভীরতাকে উপলব্ধি করার কার্যকারণ কিন্তু সপ্রমাণিত হয়েছে। ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসে সেই আবেগ ও অনুভবের এক চিরসত্য কাহিনী উন্মোচিত হয়েছে। উপন্যাসের ভাষায় :
কাবিল যদি আদৌ তার চাচার কাছে না আসতো, তাহলে রোকমানা কি আন্দালিবকে অযোগ্য বা অসুন্দর ভাবতো?. হয়তো তখন জীবনটা হতো অন্য ধাঁচের। বাংলাদেশের নৈসর্গিক এবং প্রাকৃতিক জগৎ, সমাজ, রাজনীতি, ভাষা ইত্যাদিও রোকসানার আয়ত্তের বাইরে থেকে যেতো। সে হতো বিপুল বাঙালি জনগোষ্ঠীর পরিচয়হীন আত্মগর্বী, সচ্ছল, উর্দুভাষী মোহাজির তরুণী মাত্র। যে কি না অভ্যেসবশত বাঙালিদের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক অস্বীকার করে পরগাছার মত এ দেশের মাটিতেই বেড়ে উঠতো।
অপরদিকে দেখুন রোকসানার মা’র উপলব্ধি ও মানসিক বিকাশ কিভাবে ঘটেছে।
রওনক মুসলমানদের মধ্যে ভাষাগত পার্থক্যকে আমল দিতেন না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স পড়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং বিয়ে করেছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত সম্ভ্রান্ত বাঙালি মুসলমানকে। কিন্তু ও কারণে তিনি তার স্বসমাজ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের মোহাজিরদের ধনী-গরিব সকলের কাছেই নিন্দার পাত্র হয়েছিলেন।
একই ধরনের ঘটনার সূত্রপাত দেখা যায় কাবিলের চাচার ব্যাপারেও।
এ চিঠি লেখার কয়েকদিন পরই আহমদ কামাল (কাবিলের বাবা) হৃদরোগে ইন্তেকাল করেন। ভাবীর চিঠি পেয়ে আলম গ্রামে আসে। ভাবীকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করে যে সে তার ভাইয়ের সাথে বেঈমানী করতে চায় না। সে ভাবীর ও কাবিলের দেখাশোনা এবং খায়-খরচ বহন করবে। তাছাড়া ভাতিজার শিক্ষার ভার তার ওপর। তারা তার সাথে ঢাকায় চলুক।
কিন্তু জাকিয়া বেগম আলমকে খোলামেলা জানিয়ে দেন যে, মৃত্যুকালে মুমূর্ষু অবস্থাতে তার ভাই তাকে আলমের সাথে এ পরিবারের কোন সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করে, জাকিয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে মৃত্যুবরণ করেন।
কাবিলের বাবার আমৃত্যু ক্ষোভ আর কিছু নয় বিহারি মেয়ে রওনককে বিয়ে করায়। এই ব্যবধান ও আন্তঃকলহ মীমাংসায় এগিয়ে আসে আরেক জেনারেশন কাবিল ও রোকসানা।
‘৭১-র পটভূমিতে অনেক উপন্যাস লিখিত হয়েছে। সার্থকতা পেয়েছে এমন উপন্যাসের সংখ্যা খুবই সীমিত। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অদেখা অজানা অস্পষ্ট অধ্যায় আছে এবং দ্রুততা ও আপাত অসংযত আবেগ ও আরোপিত বিষয় আশয় আছে যা অনেক কথাশিল্পী অতিক্রম করতে বা ধারণ করে উঠতে পারেননি। পারেননি এক পেশে দৃষ্টিভঙ্গি ও টনটনে আদর্শ পরাভূত ভীত মানসিকতার জন্য। কিংবা সম্যক অভিজ্ঞতার অভাবও প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। শুনে শুনে কিংবা কল্পনার ফানুসে চড়ে আর যা অর্জন সম্ভব, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সার্থক উপন্যাস রচনা সম্ভব নয়।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলো এমন অনেক সীমাবদ্ধতায় প্রাণহীন গতিহারা হয়েছে। তাছাড়া খণ্ডিত জীবনকে দেখা ব্যাপক জীবনের অনিবার্য সম্মিলন সংঘাত বেদনাকে ক্ষমা করার উদারতার অভাবও দেখা গেছে। যেমন ’৭১-এ উর্দুভাষী মোহাজির যারা এদেশে বসবাস করছিলেন, তাদের জীবনেও ঘটে গেছে মর্মান্তিক বিয়োগান্ত ঘটনা। ভারতে হিন্দুদের নির্যাতনের শিকার হয়ে স্বস্তি ও শান্তিতে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বসবাসের আশা নিয়ে আগত মোহাজির উর্দুভাষীদের জীবন ও সম্পদহানির ঘটনার ব্যাপকতাকে আমরা কি অস্বীকার করতে পারি? বেদনা-বিচ্ছেদের করুণ ইতিহাসও খুব ক্ষুদ্র পরিসরের নয়- কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসে ও সত্য ইতিহাস প্রতিপাদ্য হয়নি।
একটি দেশে মুক্তিযুদ্ধ হলে দু’টি পক্ষ থাকে। এক পক্ষ মুক্তি চায়, স্বাধীনতা চায়, লড়াকু জনগোষ্ঠী। আরেক পক্ষ অধীন রাখতে চায়, পদানত করতে চায়- স্বাধীনতা দিতে চায় না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে চারটি পক্ষ ছিল। একটি পক্ষ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বিপরীত পক্ষ পূর্বপাকিস্তানি বাঙালি স্বাধীনতাকামী। তৃতীয় পক্ষ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী ভারত থেকে আগত উর্দুভাষী মোহাজির। চতুর্থপক্ষ মুক্তিযুদ্ধে মিত্রশক্তি ভারতের সেনাবাহিনী এবং সরকার। এই চারটি পক্ষই মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনটি পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান পাওয়া যায়। ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু আরেকটি পক্ষ যারা ভারত হতে এসেছিল নিরাপদ আশ্রয় পেতে তাদের পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দোসর হিসাবে চিহ্নিত করে ঘৃণ্য অমানবিক আচরণ করা হয়েছে তার ইতিহাস অজ্ঞাত রয়ে গেছে।
পাকিস্তানি শাসক সম্প্রদায় এদেরকে নিয়েও করেছে বিভেদের রাজনীতি। পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় দিয়ে তাদের জন্য আলাদা কলোনি নির্মাণ, আলাদা জমি বরাদ্দ, মিল কারখানা, অফিস-আদালতে চাকরি দান, সরকারি রেশন সুবিধা ইত্যাদি দ্বারা তাদের বোঝানো হয়েছিল তারা বাঙালিদের চেয়ে ভিন্ন, যেহেতু তারা উর্দুভাষী-প্রকারান্তরে তারা শাসকগোষ্ঠীর শ্রেণিভুক্ত। যে কারণে পূর্ব পাকিস্তানে এরা মোহাজির হিসেবে বসবাস করলেও বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সঙ্গে একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতো। ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসে এই বিভেদের সঙ্কট কাহিনী হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। যে কাজটি আমাদের দেশের কথাশিল্পীরা উপেক্ষা করেছেন, আল মাহমুদ তাঁর কাবিলের বোনে এ মানবিক বিপর্যয়কে তুলে আনার খানিকটা চেষ্টা করেছেন। হয়তো সমগ্রতাকে স্পর্শ করেননি তিনি সঙ্গতভাবেই। তবু এ কথা বলা সমীচীন এই একটি মাত্র উপন্যাসে আমরা একটি নিরপেক্ষ সৎ প্রয়াস লক্ষ্য করি।
উপন্যাসের নায়ক কাবিল পড়াশোনার সুবাদে ঢাকায় চাচার বাসায় এসে ওঠে। দু’টি পরিবারের দীর্ঘ বিচ্ছেদ মান-অভিমানের অবসান ঘটান কাবিল। পিতৃহীন কাবিল চাচী চাচাত বোন রোকসানার সাহচর্যে এসে অনুভব করে এতদিনের ব্যবধান শুধু রচিত মানসিক। বাস্তবে মোটেই তা নয়। এরূপ কাবিলের বেড়ে ওঠা জীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র হিসেবে, ছাত্রলীগের তুখোড় নেতা হিসেবে, রোকসানার সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠার ও ’৬৯-র রাজনৈতিক পটভূমি ঘিরে নানা ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে যায়। এরপর আবর্তিত হয় দ্রুত জটিল রাজনৈতিক ঘটনার ঘূর্ণিতে উপন্যাসের কাহিনী। রাজনৈতিক ঘটনা যতো জটিল ও দুর্বিপাকে এগিয়ে যাক না হৃদয়ের ময়দানে উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের তাতে কিছুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি। এখানে নির্মল হৃদয়াবেগের গতি এবং অদ্ভুত সম্মোহনী কাহিনীবিন্যাস। মূল পাত্র-পাত্রীর সঙ্গে এসে যোগ হয়েছে আরো দু’টি জীবনের আবেগ। কাবিলের ফুফাত বোন মোমেনা এবং রোকসানার খালাত ভাই আন্দালিব। এদের প্রেম রোম্যান্সের ঘটনাও হৃদয়কে কম স্পর্শ করে না। স্পর্শ করে কাবিল ও রোকসানার প্রেমের বিয়োগান্ত পরিণাম। উপন্যাসের অপর পাত্র-পাত্রীর জীবনেও একই দুঃখ-বেদনার অভিঘাত গোটা উপন্যাসে এক বেদনামন্থিত সাগরের ঊর্মি উছলে ওঠে। একদিকে দেশ ভাগের বিপর্যয় বেদনা অপর দিকে উপন্যাসের কাহিনীর বিয়োগ-ব্যথা সব মিলিয়ে একটি সামাজিক বিপর্যয়ের বেদনাকে স্পর্শ করার উদ্ভূত সফলতা দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক। যদিও উপন্যাসের শেষ পরিণামকে খানিকটা সহনশীল করার চেষ্টাও করেছেন লেখক কাবিল ও আঞ্জুমানের সম্পর্ক সৃষ্টি করে। কিন্তু তা কিছুমাত্র উপশম দিতে সক্ষম হয়নি।
আল মাহমুদ ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসে রাজনৈতিক ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় যতো না মনোযোগী তার চেয়ে বেশি যত্নশীল ছিলেন মানবিক সম্পর্কের সংঘাত বিপর্যয় এবং চূড়ান্ত মানসিক কষ্টকে প্রতিষ্ঠিত করতে। তাই ইতিহাসের পথে হাঁটতে যতটা বিশ্বস্ত থেকেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি ভক্ত-অনুরক্ত দু’টি প্রজন্মের বিয়োগ-সম্পর্কের ব্যবধান সম্বন্ধের মানসিক স্তরগুলিকে নিখুঁত বর্ণনায় থেকেছেন যতœশীল। পাশাপাশি ইতিহাসের পার্শ্বচরিত্র বা প্রধান ব্যক্তিকে সুযোগ মত মঞ্চে আলোকপাত ঘটিয়ে দেখাতে চেয়েছেন আসল মানুষটিকে।
যেমন:
মনে রাখতে হবে, শেখ সাহেবকে দিয়ে যতোটা এগোনো যাচ্ছে ততটা এদেশের অন্যান্য প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের এগোতে বললে ভিরমি খেত।
এ ছাড়া রাজনৈতিক সংঘাতের মৌল কারণকে খুঁজে পেতে হাজির করার ইচ্ছেও তার উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে।
যেমন:
বিহারিদের ফালতু আভিজাত্য, মিথ্যা প্রভুমূলক ভক্তি ও অমিশুক স্বভাবের জন্য সারা অবাঙালি পরিবারগুলোকে এখন বাঙালি মুসলমানদের দৃষ্টিতে বিহারিই ঠেকছে। তারা অবাঙালি মাত্রকেই ঘৃণার চোখে দেখতে প্রকৃতপক্ষে বাধ্য হচ্ছেন।
আর এ জন্য শুধু দায়ী মোহাজিরগণই নয় বরং তৎকালীন পাঞ্জাবি শাসকও। ভারত থেকে আগত মোহাজিরদের পুনর্বাসনে শাসকগোষ্ঠীকে যেভাবে আন্তরিক হাত দেখা যায় এবং বিভেদের প্রাচীর রচনা করে আলাদা কৌলিন্য ও জাত্যাভিমান তৈরিতে তাদের ভূমিকাও সংকট সৃষ্টির আবেক উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।
এই সত্যটি উপন্যাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ লেখক খুবই সংযত সংহত থেকেছেন এবং নিরাপত্তার বেষ্টনীকে অতিক্রম করতে চাননি।
অনিবার্য না হলেও এ উপন্যাসের আরেকটি দিক বিশেষভাবে উন্মোচনের দাবি রাখে, তা হলো, সামাজিক সম্পর্কের মাত্রা জ্ঞান।
লেখক নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক রচনার ঘটনা বিন্যাস করতে গিয়ে পেছনের প্রায় অর্ধশত বছর আগের জীবনের স্বাভাবিকতার কথা ভুলে গেছেন কিনা! বর্তমান কালের মননকেও খানিকটা অতিক্রম করে না তা ভাবনার বিষয়। যারা সচেতন এবং সমাজের হিতাহিত নিয়ে ভাবেন এমন পাঠক খানিকটা বিব্রত ও বিচলিত হতে পারেন বৈকি! উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
কথাগুলো বলে রোকসানা যেতে উদ্যত হতেই শব্দ করে বাথরুমের দরোজাটা খুলে গেল। পানির ধারাটা বন্ধ করে ভেজা শরীরে কাবিল দাঁড়িয়ে হাসছে। বুকের পাতলা পশমের ওপর পানির বিন্দু সূটিকের দানার মত ঝুলছে। মুহূর্তের মধ্যে রোকসানা মুখ নামিয়ে নিয়ে মাটির দিকে তাকাল।
সবশেষে যে কথাটি বলতে হয়, আল মাহমুদ একজন শক্তিমান কথাসাহিত্যিক হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে সমর্থ হয়েছেন। তাঁর লিখিত গল্প উপন্যাসে তিনি প্রমাণ রেখেছেন অসামান্য বাকচাতুর্থ ভাষার নিখুঁত বুনন, কাহিনীর বিশ্বাসযোগ্য বিন্যাস, মানবিক সম্পর্কের জয়গান উঠে এসেছে। প্রত্যেক মহৎশিল্পের একটা মেসেজ থাকে। ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসেও একটা মেসেজ তিনি দিয়েছেন তা হলো ভাষা কিংবা অন্যকোন বিষয় মানুষের সম্পর্কের বাধা হওযা উচিত নয়- মানবিক সম্পর্কই গড়তে পারে এক স্থিতিশীল শান্তির সমাজ। পাকিস্তানি তৎকালীন পাঞ্জাবি শাসকরা তা বুঝতে চাননি বলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হয়েছে বাংলাদেশ- কিন্তু এর জন্য মানবিক বিপর্যয়ের যে বিরাট দুঃখময় পর্বত ডিঙাতে হয়েছে তা নিয়ে লিখিত হওয়া উচিত হাজার হাজার পৃষ্ঠার উপন্যাস।