আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কার কবিতায় বাংলাদেশের প্রাণের স্পন্দন আর মর্মের সুর শুনতে পাওয়া যায়? সমস্ত কুণ্ঠা আর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আমি আল মাহমুদের নাম নেব। এই কবিই আমাকে চমকে দিয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্নের ভেতর, ‘নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল/ ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা গোলগাল।’ পাঠ্যবইয়ের এই কবিতা স্বপ্নগ্রস্ত করে ফেলেছিল। স্বপ্নগ্রস্ত করেছিল আরও একটি কবিতা : ‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসেনা/ কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।’ অনেক পরে হাতে উঠে এসেছিল সোনালি কাবিন। তারপর পুরনো বইয়ের দোকান থেকে হাতে উঠে এসেছিল আল মাহমুদের কবিতা। সোনালি কাবিন পড়ার ঘোর আমি আজও কাটাতে পারিনি। কিন্তু বেশ কয়েকটি সংকট ছিল তাঁকে পড়ার –
এক. তাঁকে পড়ছিলাম ‘আধুনিক’ কবি হিসেবে, দুই. অথচ আধুনিক কবিতার সংকলন থেকে তাঁকে খারিজ করা হচ্ছিল, তিন. কেউ কেউ আবার উত্তর-আধুনিক কবিতার সংকলনে তাঁকে জায়গা দিয়ে পরিপূরণের কাজ করছিলেন, চার. তাঁকে বিবেচনা করা হচ্ছিল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানের দিক থেকে।
বিশ বছর বয়সী তরুণের পক্ষে এইসব মীমাংসা করা জটিল জটিলতর একটি কাজ। আর তাই মনের ভেতর সংগুপ্ত সংশয় নিয়েই তাঁকে পড়তে হয়েছে। কিন্তু আজ বুঝতে পারি, ওই সংশয়ের আড়ালে চাপা পড়েছিল আল মাহমুদের কবিতার প্রতি তুলনারহিত মুগ্ধতা ও ভালোবাসা। তাই কল্পলোক কম্পিত করে ছড়িয়ে পড়ে অজস্র পংক্তির ঢেউ।
২.
একটি ইস্তেহার লিখেছিলেন আল মাহমুদ; প্রেম আর বিপ্লবের খুন মাখা ১৪টি সনেটসহ পুরো সোনালি কাবিন একটি অখণ্ড ইস্তেহার। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কালে লেখা চলছিল কবিতা ও ইতিহাস। আঁকা হচ্ছিল বাঙালির ভাবপরিচয়ের রেখাচিত্র। আলাওল, মুকুন্দরাম, কপিল, শবরী, শ্রীজ্ঞান, লালন এই সব শব্দোচ্চারণ জানান দিল কবিতার স্বরবদল জরুরি – আধুনিকতার নামে আর প্রতারণা নয়, যদি জাতি, জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতির লড়াই বুঝতে চাই তাহলে খনন করতে হবে পূর্বসূরির সৃজনভুবন। আর তাই আল মাহমুদ লিখে চললেন ধর্ম-সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ, অন্বয়বাদী, সাম্য-দীক্ষিত ইস্তেহার। শহুরে মধ্যবিত্তের গালে জোরসে এক থাপ্পড় মেরে বলে ফেললেন, ‘ক্ষেতের আড়াল থেকে কালো/মানুষের ধারা এসে বলে দেবে সরোষে আমাকে/কী ভাবে এগোবে তারা দুর্ভেদ্য নগরের তোরণে প্রথম।’ কণ্ঠের লাবণ্য ঝেড়ে শোনালেন, ‘যে অতর্কিতে/শহরগুলোকে দখল করা হবে/আমার মুখ তারি রক্তাক্ত পরিকল্পনা।’ গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের কথা শোনা গিয়েছিলো মাওসে তুঙের কণ্ঠে।
কিন্তু না, ইতিহাসের এই মহাবাসনা, বলা চলে বিপ্লবী বাসনা আল মাহমুদ নিজেই চূর্ণ করলেন, ভাঙলেন সাম্য ও সমঝোতার দেউড়ি। একটি ধর্ম ও ধর্মানুষঙ্গের সাথে জড়ালেন স্বঘোষিতভাবে। নিন্দার কাঁটা গায়ে না-মেখে লিখলেন ধর্মবাদী কবিতা, ধর্মের পরিচয় সেঁটে দিয়ে এ-ধরনের চর্চাকে আদর করে ডাকতে থাকলেন ‘ইসলামী সাহিত্য’। শুভত্ব ও কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল সাহিত্যের জন্য বরাদ্দ রাখলেন ওই একই শিরোনাম। ১৯৯৪-এ হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতা থেকে অন্য অনেকের মতো বহিষ্কৃত হলেন আল মাহমুদ। তাঁর সাবেক কৃতিত্বের সবটা প্রত্যাখ্যাত হল না ঠিকই, কিন্তু সাদরে গৃহীতও হল না। প্রগতিশীলতা বনাম মৌলবাদিতা নিয়ে এক দোনোমোনা ভঙ্গি বিস্তৃত হতে থাকল। আজও আমরা এই দ্বিধাদোদুল মনকে স্থির করতে পারি কিনা সন্দেহ!
আমাদের সাহিত্যিক বাস্তবতা এই যে, আল মাহমুদের ‘ব্যক্তি-ইতিহাসে’র সঙ্গে তাঁর কবিতাপাঠের একটি রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই রীতি বাদ দিয়ে পাঠ যেন অসম্ভব। আল মাহমুদ নিজেও তাঁর কবিতাপাঠের সহজ রাস্তাগুলো তৈরি করে দেন কবিতায় বা সরব সাক্ষাৎকারে। কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে গেছে তাঁর সাম্যবাদ, দ্রোহ আর ইসলামপন্থায় সমর্পণের খবর। আল মাহমুদের কবিতাজীবনই তো দুই ভাগে ছিন্ন হয়ে গেছে; এক ভাগ লোক লোকান্তর থেকে সোনালি কাবিন পর্যন্ত বিস্তৃত, অন্য ভাগ মায়াবী পর্দ দুলে ওঠো থেকে ক্রমপ্রসারমান। তাঁর নিজের জীবনঘেঁষা মন্তব্য ও পদ্য-পঙক্তির খাত ধরেই আমরা পড়ে উঠি তাঁর সমস্ত বই। বাংলাদেশের আরও কোনো কবি কি ভাবনার রূপবদলের জন্যে এতোটা আলোচিত হয়েছেন? কৈফিয়তের ধরনে আরও কোনো কবি কি নিজেকে ঘিরে জমে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন কবিতায়? সম্ভবত না।
৩.
রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি কবির পক্ষে অন্তরায় বলে মনে করি না। এক রাজনৈতিক বিশ্বাস, আরেকটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের সমালোচনা করবে, এটাই স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক। আল মাহমুদের বেলায় এই বিচার উহ্য রাখা প্রবল অন্যায়। আর এই আশাবাদও অর্থহীন ও ফ্যাসিস্ট প্রবণতা যে, কোনো কবি/ লেখক/ শিল্পী অন্য কারো বিশ্বাসমতো শিল্প সৃষ্টি করবেন বা হৃদয়তুষ্টির জন্য লিখবেন। এমনও আশা করা অনুচিত, কোনো কবি একই বিশ্বাস ও চিন্তায় রূপান্তরহীনভাবে সচল থাকবেন। ব্যক্তির অন্তরবদলকে অস্বাভাবিক মনে করার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ নেই। বাস্তব বিশ্ব আমাদের এই প্রমাণই হাজির করে যে, আর্থ-সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতির বাতাবরণে মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের বদল ঘটে। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ চিরকাল একই চিন্তা ও বিশ্বাসে স্থির থাকেন না; যদিও মৌল কিছু ধারণা সারা জীবন ধরেই বহন করেছেন। কিন্তু চিন্তা ও রুচির বদল ঘটিয়েছেন সময়ের তাগিদেই।
একইভাবে বদলেছেন আল মাহমুদ। তিনি গিয়েছেন ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কৃতির পথে। আর তা কাব্যিক কৌশলেই। কিন্তু তাই বলে এমন নয় যে, তাঁর পরবর্তী কবিতা মানেই ধর্ম, ধর্ম এবং ধর্ম। ধর্ম হলেই বা সমস্যা কোথায়? আধুনিক কবিরা কি ধর্ম ও ধর্মবোধকে কবিতায় ব্যবহার করেন নি? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের অনেক সঙ্গীত কি পরম ব্রহ্মের কাছে প্রার্থনা নয়? এলিয়টের ধর্মবিশ্বাস ও তার প্রয়োগ কি তাঁর কবিতা পাঠের অন্তরায়? আধুনিকতার অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে? কিংবা তলস্তয়ের মতো প্রতিভা কি বিলীন হয়ে গেছেন উপন্যাসে খ্রিস্টমহিমা লিপিবদ্ধ করার অভিযোগে?
প্রকৃতপক্ষে আল মাহমুদের রূপান্তরের ইতিহাস দেখাতে গিয়ে রচনা করা হয়েছে তাঁকে প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস। কিন্তু কাল খুবই নির্মম পর্যবেক্ষক। আর তাই যতোই তাঁকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে ততোই তিনি প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। এর পেছনে যাদুমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে – আর কিছুই নয়, তাঁরই কবিতা, গল্প, উপন্যাস। প্রশ্ন হলো : কেন তাঁর সাহিত্যের কাছে পাঠক ধাবিত হয়? তার উত্তর মিলবে আমাদের ঐতিহাসিক বিকাশের ভেতর। আল মাহমুদের সাহিত্য আমাদের নিয়ে যায় গ্রামীণ মধ্যবিত্তের জগতে- যে-জগত থেকে ধানের গন্ধ মুছে যায়নি, কাদামাটির লুপ্ত হয়নি। তাঁর কবিতা আধা-শহুরে আধা-গ্রামীণ মধ্যবিত্তকে নিয়ে যায় গ্রাম-গ্রামান্তরের পথে, নস্টালজিয়ায়। তাঁর সমকালীন কবিরা যখন কবিতায় ঠেসে দিতে চেয়েছেন কল্পিত মেট্রোপলিটন মন, তিনি তখন লিখে চলেছেন গ্রামীণ জীবন, জনপদ, সংস্কৃতি, বিশ্বাসের বৃত্তান্ত। এ-কারণে সহজেই তাঁকে আলাদা করে চেনা যায় এবং এ-কথাও বলা যায়, তিনি আসলে ইউরো-আমেরিকান কবিতার ছাঁচে ঢালাই করা ‘আধুনিক’ কবিতাকে অনুসরণ করেন নি। তাঁর আধুনিকতা জাতীয়তাবাদী, আঞ্চলিক এবং বি-উপনিবেশী।
আমাদের দেশে আধুনিক কবিতার কবি ও বিচারকরা বরাবরই কবিতাকে মাপতে চান ইউরোপীয় গজ-ফিতা দিয়ে; কিন্তু তার বাইরেও আধুনিকতারই আরও আরও দিক-চিহ্ন আছে। সেই নিশানায় চোখ রাখলে দেখা যাবে, আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা-ক্যারিবীয় অঞ্চলে তৈরি হচ্ছিল আধুনিক কবিতার প্রতিরোধী পাটাতন, যা ইউরোপকে গ্রহণ করেই ইউরোপের সমালোচক। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা গেছে ভিন্ন রূপ; আধুনিক কবি ও সমালোচকদের বেশির ভাগই ইউরো-আমেরিকান আধুনিকতার মহাস্তাবক ও দুর্বল অনুসারী।
আমাদের সৌভাগ্য আল মাহমুদ সে-পথে হাঁটেন নি। তাঁর পথ ধর্মের দিকে বেঁকে গেলেও আফসোস করার কিছু নেই; কেননা তাঁর ধর্মানুষঙ্গযুক্ত কবিতাগুলো শেষ পর্যন্ত ‘কবিতা’রই স্বাদ দেয়। সেখানেই আল মাহমুদের কৃতিত্ব আর কাব্যিক সাম্রাজ্য, যাকে উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু উৎখাত করা যায় না।