স্বর
মানুষের মুখে উচ্চারিত ধ্বনিই স্বর। শ্বাস ছাড়ার সময় স্বরতন্ত্রিতে কম্পন সৃষ্টির মাধ্যমে স্বর উৎপন্ন হয়। যেহেতু স্বর আসে শ্বাস থেকে তাই আমরা স্বরের আলোচনার আগে সংক্ষেপে জেনে নেবো শ্বাস কী? আমাদের প্রশ্বাস-নিশ্বাস কে শ্বাস বলে। কথা বলার সময় শ্বাস নেয়ার জন্য আমরা মাঝে মাঝে থেমে যাই কারণ শ্বাস ফুরিয়ে যায়। একজন সুস্থ মানুষ সাধারণত মিনিটে ১৫-১৮ বার শ্বাস গ্রহণ-বর্জন করে। শরীরতত্ত্ববিদদের মতে এই শ্বাস তিন প্রকার:
১. প্রবাহমূলক শ্বাস (Tidal breathing)
২. অবশিষ্ট শ্বাস (Residual breathing)
৩. অনুপূরক শ্বাস (Supplimental breathing)
প্রবাহমূলক শ্বাস: জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা নাক দিয়ে নিরন্তর শ্বাস গ্রহণ ও বর্জন করেই চলছি। সাধারণত আমরা নাক দিয়ে যে শ্বাস গ্রহণ ও বর্জন করি তাকে প্রবাহমূলক শ্বাস বলে।
অবশিষ্ট শ্বাস: আমাদের দেহযন্ত্র এমনভাবে তৈরি যে, সে সব সময় প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু বাতাস ভবিষ্যৎ অভাব পূরণের জন্য ধরে রাখে। ফলে দেখা যায় আমরা যতোটা বাতাস প্রশ্বাসের সময় গ্রহণ করি- ছাড়ি তার চেয়ে কম। শ্বাস ছেড়ে দেয়ার পর ফুসফুসে অতিরিক্ত যে বাতাস থেকে যায় তাকে অবশিষ্ট শ্বাস বলে।
অনুপূরক শ্বাস: আবৃত্তি শিল্পী, গানের শিল্পী, অভিনয় শিল্পী বা যে কোনো বাচিক শিল্পীকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক নিশ্বাসেই দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে হয় এবং শ্বাস ধরে রাখতে হয়। ফলে দেখা যায় তাদের জন্য অবশিষ্ট শ্বাসের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু শ্বাস প্রয়োজন হয়। এই অতিরিক্ত শ্বাস চর্চার মাধ্যমে তৈরি করে নিতে হয়। এই অতিরিক্ত শ্বাসই হচ্ছে অনুপূরক শ্বাস। সাধারণত বেশি পরিমাণ শ্বাস নিয়ে তা অনেকক্ষণ ধরে রেখে ধীরে ধীরে ছাড়ার মাধ্যমে অনুপূরক শ্বাস সৃষ্টি করা যায়।
অনুপুরক শ্বাস তিন প্রকারে গ্রহণ করা যায়:
১. কণ্ঠরীতি
২. উদররীতি এবং
৩. বক্ষরীতি
কণ্ঠরীতি
কণ্ঠরীতিতে শ্বাস গ্রহণের সময় কণ্ঠের হাড় ফুলে ওঠে এবং পাঁজরের ওপরের পেশি খানিকটা শিথিল হয়। তারপর শ্বাস নিলে ফুসফুস খানিকটা ওপরের দিকে ফুলে ওঠে এবং সামান্য পরিমাণে বাতাস ধরে রাখার স্থান ও সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ পদ্ধতিতে বেশি পরিমাণ শ্বাস গ্রহণ করা যায় না। এ প্রণালীতে শ্বাস নিলে কণ্ঠ ও স্বরযন্ত্রের পেশিতে অধিক চাপ পড়ে, ফলে ওই পেশির উত্তেজনা কিছুটা বেড়ে যায় এবং ঘন ঘন শ্বাস নিতে হয়।
উদররীতি
উদররীতিতে আমরা পেট ফুলিয়ে বাতাস নিই। এতে পাঁজরের নিচের দিকটা ফুলে ওঠে ফলে ডায়াফ্রাম নিচে নেমে ফুসফুসকে বাড়বার সুযোগ করে দেয়। কণ্ঠরীতির চেয়ে এতে অনেক বেশি বাতাস ধরে রাখা যায়। এই পদ্ধতি আমাদের স্বাভাবিক শ্বাস গ্রহণের সঙ্গে একাত্ম বলে একে স্বাভাবিক রীতি বা মধ্যচ্ছদা রীতিও বলা যেতে পারে। কথা বলার সময় সাধারণত প্রশ্বাস-নিশ্বাস রীতির অনুপাতের কিছু পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তন শ্বাস গ্রহণের চেয়ে নিশ্বাস নির্গমণের সময় অধিক হয়। কারণ নিশ্বাস ত্যাগের সময় তা ধরে রেখে নিয়ন্ত্রণ করে একটু একটু করে ছেড়ে কথা বলতে হয়। এতে শিল্পীর কথা বলা বা আবৃত্তি করার সময় কণ্ঠ ঠিকভাবে কাজ করা নিশ্চিত হয়। ভালো স্বরের জন্য ভালোভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে হয়। নাক, মুখ ও গলা খোলা রেখে সহজভাবে গভীর ও পূর্ণমাত্রায় শ্বাস গ্রহণ এবং অবিচল থেকে সমানভাবে নিশ্বাস ছাড়াই হচ্ছে শ্বাস-নিশ্বাস ক্রিয়ার উত্তম পন্থা। এ রীতি বেশ সহজ তাই আয়ত্ব করতে শিল্পীর খুব একটা বেগ পেতে হয় না।
বক্ষরীতি
বক্ষরীতিতে পাঁজরের পেশিগুলোকে সংকুচিত করে পাঁজর ফুলিয়ে শ্বাস নেয়া হয়। ফলে পাঁজর অধিক মাত্রায় প্রসারিত হয়। এ পদ্ধতিতে বক্ষগহবরের পেশি এবং পাঁজর অধিক ক্রিয়াশীল হয়ে দুপাশে বিস্তার লাভ করে। তাই একে পার্শি¦ক রীতিও বলা হয়। এ রীতিতে বেশি পরিমাণ শ্বাস গ্রহণ সম্ভব। সবচেয়ে বেশি বাতাস ধরে রাখা যায় এবং স্বরযন্ত্রে কোনো চাপ পড়ে না। দীর্ঘ সময় শ্বাস ধরে রাখা যায় বলে কবিতার বড় বড় পংক্তি এ পদ্ধতিতে আবৃত্তি করা সম্ভব।
কণ্ঠরীতিতে ফোলে পাঁজরের ওপরের দিক, উদররীতিতে বাড়ে পাঁজরের নিচের দিক আর বক্ষরীতিতে বাড়ে পুরো পাঁজর। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করে পরিপূর্ণ কণ্ঠস্বর তৈরি করা যায় না। চমৎকার কণ্ঠস্বর তৈরির জন্য তিন পদ্ধতিতেই কণ্ঠশীলন করতে হবে। ‘কণ্ঠশীলন’ অধ্যায়ে কণ্ঠ সাধনের নিয়মগুলো আলোচনা করা হয়েছে।
আবৃত্তির জন্য ‘স্বর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের কণ্ঠের উত্থান পতনের উপর স্বরের বিভিন্নতা নির্ভর করে। আমরা যখন শ্বাস নিই তখন আমাদের ফুসফুস ফুলে উঠে। ফুসফুস থেকে বাতাস ত্যাগ করার সময় শ্বাসবায়ু স্বরতন্ত্রি ও মুখ বিবরের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও কম্পন সৃষ্টি করে। এই কম্পনের স্থানে পরিমাণ অনুযায়ি ভিন্ন ভিন্ন ধ্বনি সৃষ্টি হয়। এই ধ্বনিই আমাদের স্বর বা কণ্ঠস্বর।
স্বরের প্রকারভেদ:
স্বর মূলত তিন প্রকার। তবে ইদানিং আরও দুটি স্বরকে স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে। যদিও এই দুটি স্বর মূল তিনটি স্বরের যে কোনটিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
মূল তিনটি স্বর:
১. উদাত্ত স্বর
২. স্বরিত স্বর
৩. অনুদাত্ত স্বর
অন্য দুটি স্বর:
৪. কম্পিত স্বর
৫. ফিসফিস স্বর
উদাত্ত স্বর
মাঝে মাঝে আমরা স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে উঁচু স্বরে কথা বলি। এই উঁচু স্বরই উদাত্ত স্বর। উদাত্ত স্বর হারমোনিয়ামের তারাতে অবস্থিত। সাধারণত বিপ্লব-বিদ্রোহ, ঘৃণা, অবজ্ঞা, উৎসাহমূলক কবিতা আবৃত্তিতে এই স্বর ব্যবহার করা হয়। যেমন-
আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা
মনে হয় রক্তই ফয়সালা।
বারুদই বিচারক। আর
স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।
-[বখতিয়ারের ঘোড়া/ আল মাহমুদ]
স্বরিত স্বর
স্বরিত স্বর মানে মধ্যম প্রকৃতির স্বর। আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় যে স্বরে কথা বলি তাই স্বরিত স্বর। হারমোনিয়ামের মুদারাতে এই স্বর অবস্থিত। যেমন-
আমি ভালো নেই বলে তুমি ভালো আছো
আমার ভালো না থাকবার বিনিময়ে
তুমি অনন্তকাল ধরে ভালো থাকবে।
-[নববর্ষে অমিতাভের প্রতি/ নীলাঞ্জন বিদ্যুৎ]
অনুদাত্ত স্বর
মাঝে মাঝে আমরা স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে নীচু স্বরে কথা বলি এবং কণ্ঠকে খাদে নামিয়ে ফেলি অর্থাৎ স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে নীচু স্বরকেই অনুদাত্ত স্বর বলে। অনুদাত্ত স্বর হারমোনিয়ামের ‘উদারা’তে অবস্থিত। সাধারণত ভয়, বীভৎস বা করুণ কোন বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় অথবা এরকম বিষয়ের কবিতা আবৃত্তি করার সময় আমরা আমাদের স্বরস্তরকে নীচে নামিয়ে আনি। যেমন-
ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান,
এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ।
ছোট কুঁড়েঘর বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু।
-[পল্লি জননী/ জসীমউদ্দীন]
কম্পিত স্বর
স্বর যখন কম্পিতভাবে বেরিয়ে আসে তখন এ স্বরের সৃষ্টি হয়। উত্তেজনা এবং আবেগ প্রকাশের সময় অথবা মাঝে মাঝে শব্দকে শ্রুতি মধুর করার জন্য আমরা এ স্বর ব্যবহার করি। যেমন-
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াষা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝরঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া ছবি।
-[বিদ্রোহী/ কাজী নজরুল ইসলাম]
ফিসফিস স্বর
আমরা আমাদের গোপন কথা বলার সময় মাঝে মাঝে নীচু স্বরে কথা বলি, এই কথা কিছুটা বুঝা যায় কিছুটা বুঝা যায় না অর্থাৎ অস্পষ্ট থাকে। এই রকম কথা বলার সময় দেখা যায় শিষ ধ্বনির মত আওয়াজ হয় তাই একে ফিসফিস স্বর বলে। এ জাতীয় স্বর উৎপাদনে স্বরতন্ত্রিতে কিছু বেশি ফাঁকের দরকার হয়। যেমন-
খুব ভোর করে উঠিতে হইবে, সূর্যি উঠারও আগে,
কারেও কবি না, দেখিস, পায়ের শব্দে কেহ না জাগে।
রেল সড়কের ছোট খাদ ভরে
ডানকিনে মাছ কিলবিল করে;
কাদার বাঁধাল গাঁথি মাঝামাঝি জল সেঁচে আগে ভাগে,
সব মাছগুলো কুড়ায়ে আনিব কাহারো জানার আগে।
-[নিমন্ত্রণ / জসীম উদ্দীন]
প্রক্ষেপণ স্থান অনুযায়ি স্বর আবার চার ভাগে বিভক্ত। যথা-
১. মুখ গহ্বর থেকে বলা
২. নাভি থেকে বলা
৩. নাকের সাহায্যে বা নাকের সংস্পর্শে বলা
৪. মস্তিষ্ক স্পর্শ করে বলা
মুখ গহ্বর থেকে বলা: আমরা স্বাভাবিক কথোপকথনে যে সমস্ত বাক্য ব্যয় করি অর্থাৎ স্বাভাবিক পারস্পরিক যে আলাপ-আলোচনা করি সেটা মুখ গহ্বর জাত স্বরেরই প্রক্ষেপণ।
নাভি থেকে বলা: মাঝে মাঝে আমরা কোনো গভীর ভাব প্রকাশ করার জন্য ভারি গলায় কথা বলি। আবার আবৃত্তি করার সময় কিছু কবিতা ভাব অনুযায়ি গম্ভির স্বরে একেবারে ভিতর থেকে উচ্চারণ করতে হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় স্বর প্রক্ষেপণের সময় নাভির ওপরের দিক অনেকটা ভেতরের দিকে ঢুকে যায় বা একটু শক্ত হয়ে যায় অথবা কেঁপে কেঁপে ওঠে। এভাবে যে স্বরের প্রক্ষেপণ ঘটে তা নাভি থেকে হয়ে থাকে।
নাকের সাহায্যে কথা বলা: অনেক সময় আমরা দূরের মানুষকে ডাকতে খুব জোরে চিৎকার করে ডাকি; এক্ষেত্রে দেখা যায় আমাদের কণ্ঠের উপর বেশ চাপ পড়ে এতে কণ্ঠের সমস্যা হতে পারে। একজন আবৃত্তিকার যেহেতু তাঁর কণ্ঠ সম্পর্কে সচেতন থাকেন তাই তিনি যখন দূরের কাউকে ডাকেন তখন কণ্ঠের ওপর জোর চাপ না দিয়ে নাকের সংস্পর্শে ডেকে থাকেন এতে তাঁর কণ্ঠের উপর চাপ কমে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কিছু কবিতায় আবদার বা অভিমান প্রকাশ করতে নাকের সংস্পর্শে আবৃত্তি করতে হয়; এতে কবিতার ভাব প্রকাশে সহায়ক হয় এবং কবিতার অর্থবহ প্রকাশ ঘটে।
মস্তিষ্ক ছুঁয়ে বলা: কখনো কখনো আমাদের ভীষণ ক্রোধ হয়, কষ্ট হয়, যন্ত্রণা হয়। মাঝে মাঝে আমরা এসব বিষয় প্রকাশ করতে গিয়ে এমন উত্তেজিত হয়ে যাই যে, মনে হয় শব্দ প্রক্ষেপণ আমাদের নাক, মুখ, চোখ এমন কি স্বরযন্ত্রের সমস্ত অংশকে ধাক্কা দিয়ে যেন মস্তিষ্ককে স্পর্শ করে যায়। এ ধরনের স্বর প্রক্ষেপণই মস্তিষ্ক ছুঁয়ে বলা।
মনোভাব প্রকাশের দিক থেকে স্বর আবার দুই প্রকার :
১. শ্বেতস্বর ও
২. কৃষ্ণস্বর
শ্বেতস্বর: আনন্দজনক মনোভাবের জন্য মুখ খোলা রেখে যে দীপ্ত স্বর প্রয়োগ করা হয় তাকে শ্বেতস্বর বলে। উল্লাস বা উচ্ছ্বাস করার সময় আমরা এ স্বর সৃষ্টি করি। খুশিতে যখন গদগদ করতে থাকি তখনি স্বররাজ্যে এ স্বরের আমদানি চলে। স্বরের রাজ্যে এই স্বর মহারাজ। মানুষের আবেগের অবদমিত প্রবাহ এই স্বর। যেমন-
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে
-[আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে/ কাজী নজরুল ইসলাম]
কৃষ্ণস্বর: বিষন্ন মনোভাব প্রকাশের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খোলা মুখে যে স্বর প্রয়োগ করা হয় তাকে কৃষ্ণস্বর বলে। বেদনার সবটুকু হৃদয় নির্যাস দিয়ে এ স্বর সৃষ্টি। স্বরের সভায় এ স্বর ম্লান ও হতাশ। নিধুয়া পাথারে ডুবতে ডুবতে মানুষ যখন অস্ত্বিহীন অনুভব করে তখনি এ স্বরের আগমন ঘটে। যেমন-
জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো
শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,
চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি
বললো না কেউ তরুণ তাপস এই নে চারু শিতল কলস।
লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম।
-[যাতায়াত/ হেলাল হাফিজ]
স্বরায়ন
অভিব্যক্তির সুন্দর প্রকাশের জন্য কবিতা বা কোনো বিষয়ের অন্তর্গত শব্দের ওঠানামা কেমন হবে, কোন শব্দের অধোপ্রকাশ হবে, কোনটির তীব্র প্রকাশ হবে, কোনটি অপ্রকাশ্য থাকবে, কোনটিকে চাপ দিয়ে বা বিলম্বিত বিস্তার ঘটিয়ে অর্থবহ করা উচিত তা একজন আবৃত্তিকারকে যথার্থ স্বর প্রয়োগ করে ঠিক করে নিতে হয়, এক্ষেত্রে বিষয়টি যদি কবিতা হয় তাহলে খেয়াল করতে হয় কবিতাটি কোন ছন্দে রচিত, এতে কোন রস প্রাধান্য পেয়েছে, কবিতাটির দর্শন কী, কবিতাটির চিত্রকল্প কেমন, কবিতাটির সাথে বাস্তব জীবনের মিল কতটুকু আছে। এরপর কবিতার বিষয়, ভাব ও অর্থের দিকে নজর রেখে কবিতাটির পংক্তি বিভাজন করতে হয়। অর্থাৎ কবিতাটি আবৃত্তি করার পূর্বে কবিতাটিকে ভেঙেচুরে কীভাবে কোন স্বরে প্রকাশ করবে এই নিয়ে আবৃত্তিকারের যেই চিন্তন বা যেই নির্মাণ সেই চিন্তন বা নির্মাণ কে বলে স্বরায়ন।
স্বরের প্রক্ষেপণ
স্বরায়ন তৈরি হয়ে গেলে সেই স্বরায়নের প্রয়োগই হচ্ছে স্বরের প্রক্ষেপণ। এই প্রক্ষেপণ যথার্থ হওয়া চাই। আপনি একটা অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন, অন্যরা তা শুনে বলবেন সেটা কী প্রকাশ হল- ক্রোধ না বেদনা, লজ্জা না ব্যঙ্গ, হতাশা না উদ্দীপনা, আবেগ না উৎসাহ, বিপ্লব না বিদ্রোহ, ভালোলাগা না ভালোবাসা, প্রেম না প্রণয় ইত্যাদি। যদি অন্যরা আপনার প্রকাশিত অভিব্যক্তি বুঝতে পারে ও সবার মনে রসবোধ জাগ্রত হয় এবং বিষয় সম্পর্কে কোনো অস্পষ্টতা না থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনার স্বরের প্রক্ষেপণ সঠিক হয়েছে। যদি অন্যরা আপনার প্রকাশিত বক্তব্য বুঝতে না পারে তাহলে আপনার স্বরের প্রক্ষেপণে ভুল ছিল। আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে কোন শব্দ কীভাবে উচ্চারিত হয় সেই দিকে; আবার একই শব্দ একাধিক ঢঙে উচ্চারিত হয়- সেদিকেও। যেমন- ‘আচ্ছা’ শব্দটি কখনো ব্যঙ্গ, কখনো বিস্ময়, কখনো সম্মতি, কখনো উৎসাহ, কখনো অনিচ্ছা, কখনো হুমকি, কখনো ক্রোধ আকারে ব্যবহার হতে পারে। অনুরূপ ভাবে ‘যাই’ শব্দটি ব্যস্ততা, আলস্য, বিষণ্নতা, উদ্দীপনা, বিরক্তি, প্রভৃতি অর্থে ব্যবহার হতে পারে। একইভাবে ‘হায়’ শব্দটি কখনো শোক, কখনো বিষণ্নতা, কখনো আনন্দ, কখনো নিন্দা, কখনো মুগ্ধতা, কখনো হতাশার ভাব বহন করতে পারে। এইক্ষেত্রে আবৃত্তিকারকে তার শিক্ষিত মনন দিয়ে শব্দের সঠিক প্রক্ষেপণ নিশ্চিত করতে হবে।
একজন আবৃত্তিশিল্পীকে স্বরের বিভিন্ন অবস্থা জানতে হবে এবং আবৃত্তির সময় মানতে হবে। কখন উদাত্ত, কখন অনুদাত্ত, কখন কম্পিত, কখন মুখ গহবর থেকে বলতে হবে, কখন নাভি থেকে কথা বের করতে হবে আর কখন মস্তিষ্ক ছুঁয়ে বলতে হবে, সে ব্যাপারে খুব সচেতন থাকতে হবে। শ্বেতস্বর এবং কৃষ্ণস্বর এর বৈশিষ্ট্য জানতে হবে এবং আবৃত্তির সময় অবশ্যই মানতে হবে। আবৃত্তি যেহেতু স্বরের খেলা তাই এই খেলায় ভালো খেলতে হলে স্বরের বিভিন্নতা সম্পর্কে জেনে সেই অনুসারে শব্দ প্রক্ষেপণ করতে হবে।