সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একজন মননশীল লেখক। যিনি একজন অধ্যাপক, গবেষক, অনুবাদক, সমালোচক আবার সৃষ্টিশীল কথাসাহিত্যিক। কাজেই তাঁর লেখায় বিচিত্রতা বা বহুমাত্রিকতা নৈমিত্তিক এবং স্বাভাবিক। উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পের অঙ্গনেও তাঁর বিচরণ অবাধ। বিশেষত ছোটগল্পের ক্ষেত্রে-সেখানেই ঘটেছে তাঁর উপলব্ধি এবং অর্জনের বিচক্ষণতা। যেহেতু তাঁর সাহিত্য-যাত্রার শুরুটাই ছোটগল্প দিয়ে, বাবার আদেশ কিংবা বন্ধুত্বের তাগিদ যাই হোক না কেন-পারিপাশ্বিকতার উপলব্ধিই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে গল্প রচনায়। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে শানিত করেছেন আরও। তাঁর অর্জন গল্পবলার ভঙ্গির সহজবোধ্যতায়, যার পাঠ তিনি নিয়েছিলেন শিশুবয়সেই। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটগল্প অবশ্যই জীবন-বাস্তবতার বহুস্তর-বিন্যাসী, মননশীল চেতনায় ঋদ্ধ, তবে নিরীক্ষার নামে দুর্বোধ্য নয়। তাঁর নিরীক্ষা দৃষ্টিভঙ্গির পরিচ্ছন্নতায় এবং ভাবপ্রকাশের অভিনব বৈচিত্র্যে। তাঁর ছোটগল্প সংকলন বিচিত্র স্বাদের গল্প এই বৈচিত্র্য এবং অভিনবত্বের এক স্মারক উদাহরণ। সংকলিত গল্পগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ত বা হাস্যরস পরিবেশন, হাস্যরসের শরে বিদ্ধ করেই তিনি হয়ত তুলে ধরতে চেয়েছেন আমাদের সমাজের তথাকথিত মানুষগুলিকে, কিন্তু গল্পগুলির অভিনবত্ব সেই শরবিদ্ধ মানুষগুলিরই পরিপূর্ণ অবয়বপ্রাপ্তিতে। হালকাচালের গল্প হিসেবে আর নয়, গল্পগুলি প্রসারিত হয়ে যায় আমাদের চিরাচরিত সামাজিক জীবনের অলিতে-গলিতে-বিষাদে-আনন্দে আমাদের অতিচেনা প্রতিদিনের দিনযাপনের সহজ-জটিল বহিঃপ্রকাশে।
আপাতভাবে হালকা-রসালো মনে হলেও তাঁর ‘ঘুড়ি,’ ‘ক্রান্তি’, ‘ভাগ্যরেখা’, ‘কবি’ ইত্যাদি গল্পগুলোতে মুখব্যাদান করে রয়েছে জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবসত্য। ঘুড়ি বানিয়ে ঘুড়ি বিক্রির টাকায় দারিদ্রকে জয় করার স্বপ্ন দেখে কিশোর হাবলু। কিন্তু মাকে নিয়ে ঢাকা শহরের উঁচু দালানে বসবাসের স্বপ্ন তার গুড়িয়ে যায় রাজনৈতিকভাবে পরিপুষ্ট একশ্রেণীর মানুষের অসৎ আকাক্সক্ষার কাছে। তারা মতি মিয়া, তাদের নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে অসহায় হাবলুরা। দেশ থাকে, পতাকা মানচিত্রও থাকে, কিন্তু এই দেশ আসলে কাদের? ক্ষমতা, নির্বাচন, ভোটাধিকার ইত্যাদি ধারণাতেও পরিপক্ক নয় নিম্নআয়ের মানুষগুলো, অথচ তারাই পরিণত হয় প্রতিশোধের বীভৎস শিকারে। গল্পের ঘটনা সেভাবে স্পষ্টাকারে তুলে না ধরলেও এভাবেই কিছু সত্যের ইঙ্গিত রেখেছেন লেখক। এই ইঙ্গিতই গল্পটিকে সার্থক করে তুলেছে। ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ এই ইংরেজি শব্দটির অভিনব ব্যবহার ‘ক্রান্তি’ গল্পটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ‘কালাম সাহেবের চেহারা হুবহু তার নানার মতো’ – এই ভাবপ্রকাশটি ঘুরিয়ে লেখক বলছেন, ‘কালাম সাহেবের জীবনটাই শুরু হয়েছিল ফ্ল্যাশব্যাক দিয়ে – তাঁকে রমা দাইয়ের হাতে প্রথম দেখে তাঁর মা ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে তাঁর মরহুম বাবার চেহারা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। শিশু কালামের মুখটায় কেটে বসানো ছিল নানার মুখ।’ গল্পে আমরা যে কালাম সাহেবকে পাই তিনি ৬২তে পড়েছেন, কড়া স্বভাবের কিপ্টে ধরনের মানুষ। তাঁর এই কিপ্টেমির পেছনেও ফ্ল্যাশব্যাক রয়েছে – মৃতদার এই মানুষটির ‘স্ত্রীর এক জটিল অসুখ হয়েছিল; এবং তাঁর ধারণা, ক্যানসার।’ স্বল্পআয়ের কালাম সাহেবকে কিপ্টেমি করেই স্ত্রীর চিকিৎসা, সাংসারিক খরচ এবং ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে হয়েছে। সেই থেকে সকলের ধারণা তাঁর স্বভাবটাই কিপ্টেমির। এমনকি তাঁর ছেলেমেয়েরা এ-কথাও বিশ্বাস করে যে, ‘বাবার কিপ্টেমির জন্য মা মারা গেছেন।’ কালাম সাহেবও কোনোদিন ছেলেমেয়েদের এই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়ে মূলসত্যটি জানানোর চেষ্টা করেন নি যে, সাতক্ষীরার ডাক্তার আজিজুল হকের ভুল চিকিৎসার কারণেই তাদের মায়ের মৃত্যু ঘটেছে। বরঞ্চ এই ডাক্তারের বিরুদ্ধে এক নিদারুণ ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে তিনি একাকি নিজের ভেতরে লালন করে চলেছিলেন। গল্পের শেষাংশের ঘটনা অবশ্য বর্তমানকে কেন্দ্র করে – ঈদ কাটাতে মেয়ে সুমনার বাড়ি দিনাজপুর যেতে গিয়ে ট্রেনে তিনি অজ্ঞান পার্টির পাল্লায় পড়ে যান এবং পার্বতীপুরের নিউ লাইফ ক্লিনিকের ডাক্তার ওয়ারিস এবং তাঁর স্ত্রী ডা. রিফাত তাঁকে চিকিৎসা দিতে উদ্যোগী হন। ডা. রিফাত ডা. আজিজুল হকের মেয়ে এবং সে-ই অবশেষে সার্থক হয় বাবা এবং ছেলেমেয়ের সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে। তবে এই অসম্ভবটিও সম্ভব হয় চিরচেনা সেই শব্দ ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমেই। ‘ভাগ্যরেখা’ দীর্ঘায়তনের এই গল্পটিতে মানবভাগ্য, নিয়তি ইত্যাদি বিষয়গুলি গাঢ় এবং স্পর্শকাতরভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন লেখক। গল্পশেষে যে বাস্তবসত্যটিকে তিনি সামনে নিয়ে এসেছেন সেখানেও রয়েছে বিশ্বাস, আস্থা এবং মানবিক উপলব্ধিবোধের সুনিপুণতা। গল্পে দুটি প্রধান চরিত্র – ভাগ্যান্বেষে সুদূর সিলেট থেকে আগত লন্ডনের কভেন্ট্রি শহরের অভিবাসী তরুণ সুজন উদ্দিন এবং লেখক নিজে। সুজনের ভাগ্যরেখায় আস্থা এবং লেখকের অনাস্থা গল্পটির সঠিক স্পর্শকাতরতার জায়গা নয়। গল্পটি স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে তখনই যখন চরিত্রদুটির পারস্পরিক সহমর্মিতার দিকটি পাঠকের কাছে উন্মোচিত হয়ে যায় এবং এই উন্মোচনের কাজটিই লেখক করেছেন অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে। লেখকের ভাগ্যপাঠই সুজনকে উদ্ধুদ্ধ করে জীবনের সহজপাঠ গ্রহণে। জীবনান্দ দাশ বলেছিলেন, সকলেই কবি হয় না কেউ কেউ হয়, তবে বর্তমানে বাংলাদেশে কবিত্বের এই সংজ্ঞা হয়ত কিছুটা পাল্টে গেছে – সকলেই কবি হয় যদি সময় এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার ঘটান যায়। ‘কবি’ গল্পে হাস্যরসের মাধ্যমে এই বাস্তবসত্যটিকেই সামনে নিয়ে এসেছেন লেখক। আরশাদুল আলমের কবি হয়ে ওঠা এবং কবিখ্যাতি লাভের গল্প। আলম সাহেবের কবি এবং কবিখ্যাতি লাভের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় তাঁর স্ত্রী (এক বড় হাসপাতালের রোগী- সেবা বিভাগের উপপরিচালক) তৃণা আলমের ভূমিকাও কম নয়, স্বামীর সুপ্ত আকাক্সক্ষার বাস্তব রূপদানে তার ভূমিকা অনেকটা শেক্সপীয়রের ম্যাকবেথ নাটকের লেডি ম্যাকবেথের মতোই। তবে গল্পশেষে তৃণার ভূমিকাও ম্লান হয়ে যায় বর্তমানের শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কাছে। গল্পটির মূলআকর্ষণ এই ফেসবুকসত্যকে সামনে নিয়ে আসা।
‘ছোটোগল্প অবশ্যই ছোটো হওয়া চাই এবং গল্প হওয়া চাই’- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রমথ চৌধুরীর সংজ্ঞার এই দাবী মিটিয়েছেন এবং তাঁর বিচিত্র স্বাদের গল্পগুলি তখনই এক একটি গল্প হয়ে উঠেছে যথন সেখানে এসে লেগেছে শিল্পদৃষ্টি এবং সৃষ্টিশীলতার মননশীল ছোঁয়া। বিশেষ করে ‘একটি আষাঢ়ে গল্প-১’, ও ‘একটি আষাঢ়ে গল্প-২’ এই গল্প দুটি। প্রথম গল্পটিতে তিনি এক স্বপ্নের কথা বলেছেন এবং স্বপ্নটিকে তিনি এমনভাবে গল্প-শরীরে গেঁথে দিয়েছেন যা হয়ে উঠেছে প্রতিটি পাঠকের প্রতিদিনের জীবন-যাপনের সংকট এবং উত্তরণের সোনালি সোপান। গল্প-চরিত্র সোমার মতো করেই আমাদের পাঠক-চিত্তও তো চায় টঙ্গির তুরাগ তীর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব মাত্র আধাঘণ্টা সময়-সীমায় নামিয়ে আনতে, অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-মহোদয়েরাও তো পারেন অপারগতার গ্লানি মেটাতে পদত্যাগের পথ বেছে নিতে, বাংলাদেশ খেলা-ধুলাতেও পারে বিশ্বের শিরোমণি হয়ে উঠতে – ‘টঙ্গিবাসী সাবরিনা টেনিসে উইম্বলডন শিরোপা জিতেছে’ – এও কী শুধুই আষাঢ়ে কল্পনা? যানবাহন হিসেবে আকাশ-বাস কিংবা পাতালরেল সেও তো নাগালের ভেতরেই, স্বপ্ন কেবল অভিযোগ জানাতে যোগাযোগ মন্ত্রীকে এতটা সহজেই নাগালে পাওয়াটা, চার মিনিট দেরির অভিযোগে মন্ত্রীর যে প্রতিক্রিয়া Ñ ‘চার মিনিট! অসম্ভব! মানুষের সময় নিয়ে এ রকম ছিনিমিনি খেললে সহ্য করা যায়, বলুন?’ এভাবেই তাঁর মননশৈলী দিয়ে স্বপ্নের জাল বুনে গেছেন লেখক, তিনি নিজে স্বপ্ন দেখেছেন এবং পাঠককেও সেই স্বপ্নের ভেতরে ঢ়ুকিয়ে নিয়েছেন। দ্বিতীয় আষাঢ়ে গল্পটি তালপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মজিদ সাহেব এবং তাঁর পরিবারের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতাকে ঘিরে। অভিজ্ঞতাটি এরকম – দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত মজিদ সাহেবের ছোটো ছেলে আসেম যে কি-না বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, এই ছেলেটিকে নিয়েই সমস্যা তাঁর। কারণ ‘ছেলেটি প্রায়ই মার খায়, হয় বড় কোনো দলের ক্যাডার, না হয় পুলিশ তাকে পেটায়, জেলেও যায়।’ এভাবেই একদিন অস্ত্র মামলায় ফেঁসে গেল সে, আকুল বার্তা পাঠাল বাবার কাছে, ‘বাবা, বাঁচাও।’ বড় ছেলে হাশেম একটা ব্যাংকে চাকরি নিয়েছিল, সে চাকরিটাও গেল ব্যাংকের কোনো হিসাব থেকে চার লাখ বারো হাজার টাকা মেরে দেয়ার অভিযোগে, এই হাশেমেরই বন্ধু আবার দৈনিক সৎচিন্তা-র স্টাফ রিপোর্টার পীযূষ রায়। পীযূষের অপরাধ সে ‘সুনীতির পথে সবসময়’ কথাটি মাস্ট হেডে লাগিয়ে প্রতিদিন দুর্নীতি, পুকুরচুরি – এসবের সংবাদ দেয় এবং চমকপ্রদ সংবাদ দিয়ে সাড়া ফেলে দেয় দেশজুড়ে।’ এই সুনীতির কারণেই সমাজের দুর্নীতিবাজ উপরমহলের ভয়াবহ নজর পড়ে তার ওপরে, পরিণতিতে সারা শরীরে জখম নিয়ে হাসপাতালের বেডে কাৎরাতে হয় তাকে। একমাত্র মেয়ে নিশাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, গল্পের শেষপর্বে দুষ্কৃতি বাহিনীর হাতে দুই ভাইয়ের সঙ্গে কিডন্যাপ্ড হয় সেও। গল্পের আকর্ষণীয় দিকটি হল বিপন্ন এই সবগুলো চরিত্রকে যেন একটি তোড়ায় বেঁধে তুলে দেয়া হয় মজিদ সাহেবের হাতে। নিজের অজান্তেই রীতিমত একটি বাহিনীর নেতা বনে যান তিনি, সেই বাহিনীর প্রতীকী নামকরণ করা হয় বোকা বাহিনী হিসেবে। শেষ পর্যন্ত এই বোকা বাহিনী নিয়ে এক ভয়াবহ মহাবিপদে পতিত হন মজিদ সাহেব। গল্পটির শেষ সেই মহাবিপদ থেকে মজিদ সাহেব এবং তাঁর পরিবারের পরিত্রাণের এক চমকপ্রদ এবং অভূতপূর্ব বর্ণনায়। চমকপ্রদ কারণ সম্পূর্ণ বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত থেকে রচিত গল্পটি – উপরিমহলের ক্ষমতার প্রসার এবং প্রভাবে, পর্যুদস্ত নীচু মহলের সাধারণ মানুষেরা। পর্যুদস্ত এবং অসহায় – তাদের পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকে না, মজিদ সাহেবেরও ছিল না, ‘চোখের সামনে তিনি দেখেছেন, তাঁর উনিশ বছরের মেয়েকে একটা গাড়িতে টেনে তুলল দুজন মানুষ। তাদের চোখেমুখে লালসার হাসি … এখন কান্না ছাড়া কী করার আছে মজিদ সাহেবের, এই বঙ্গদেশে?’ এটাই তো বাস্তব ! অথচ এই বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত রক্ষিত হয় নি, আষাঢ়ে প্রাপ্তি ঘটেছে গল্পটির – একজন দুজন করে হাজারো মানুষ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর। বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পেশার মানুষ – ‘মজিদ সাহেব বললেন, আমি তালতলা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিদ মুন্সি। আরেক তরুণ বলল, স্যার আমরা আছি। সেই তরুণ থেকে আরেক তরুণ, ওই তরুণ থেকে এক পৌঢ়, পৌঢ় থেকে পান দোকানদার, পান দোকানদার থেকে বিমর্ষ পুলিশ এবং পুলিশ থেকে নার্সের পোশাক পরা একটি মেয়ের গলায় একটা ঢেউয়ের মতো যেন কথাগুলো বাজতে লাগল। কত, কতজন, গুনে শেষ করতে পারবেন না মজিদ সাহেব। একে একে, একসঙ্গে, উঁচু গলায়, আকাশ কাঁপিয়ে তারা বলতে লাগল, স্যার আমরা আছি।’ এভাবেই একটি আশাহত জাতিকে আশার স্বপ্ন দেখিয়েছেন লেখক, গল্পের মূল প্রাপ্তিটুকুও এখানেই।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বিচিত্র স্বাদের এই গল্প-সংকলনে কিছু গল্প রয়েছে যেখানে হাস্যরসটাই প্রধানত বিবেচ্য। বিশেষত প্রথম আলো-র রস ম্যাগাজিন আলপিন এবং ইত্তেফাক-এর ঠাট্টা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত গল্পগুলি। এসব গল্পে সামাজিক অসঙ্গতিগুলো চিহ্নিত হলেও রসাস্বাদনটাই মুখ্য। তবে রস-সৃষ্টির জন্যও প্রয়োজন শৈলীগত দক্ষতার, সে প্রয়োজনও মিটিয়েছেন লেখক তাঁর অসাধারণ ভাষা-নির্মাণকৌশলে, যেখানে শব্দভাঙ্গা এবং শব্দসৃজনের খেলায় তিনি অনবদ্য। শুরু করা যাক ‘স্যার সংবাদ’ গল্পটি থেকে যেখানে ‘স্যার’ শব্দটি নিয়ে বিচিত্র খেলায় মেতেছেন লেখক, শব্দটির বহুবিধ সৃজনে আমাদের তোষামেদী সমাজ-ব্যবস্থার বহিস্থ-অন্তস্থ-পারিপার্শ্বিক-পারস্পরিক সবগুলো দিকই লক্ষ্যযোগ্য হয়ে উঠেছে যেন- যেমন, স্যারথি, অস্যার, স্যাসস্বত, স্যর্থকতা স্যারমর্ম, স্যার-টিফিকেট ইত্যাদি। ‘চেয়ারের গল্প’, নামকরণেই বোঝা যায় এই গল্পের সারবার্তা – বাংলা অর্থবিহীন ইংরেজি এই শব্দটি এমনভাবে আমাদের জাতীয় সত্তার সঙ্গে মিশে গেছে যে ‘চেয়ার’ এবং ‘ক্ষমতা’ দুটো শব্দই একই সমার্থক ধারায় এসে মিলেছে – ‘চেয়ার ছাড়া যাবে না ভাই, চেয়ার ছাড়া মুক্তি নাই। আমাদের দেশে বিরোধী দলেরও একটাই উদ্দেশ্য : সরকারকে চেয়ার ছাড়া করে নিজেরা চেয়ারনশিন হওয়া। বস্তুত এদেশের সকল রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল, আমলা-কামলা, টাউট-বাটপার একটা উদ্দেশ্যেই ধাবিত : সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে চেয়ার।’ এই ‘চেয়ার’-এর সঙ্গে মিলিয়ে লেখকের অন্যান্য সৃজনীশব্দমালা – ‘চেয়ারটেকার’, ‘চেয়ারনশিন’, ‘চেয়ারাসক্তি’, ‘উপ-চেয়ার’, ‘চেয়ারলেস’ এবং ‘থ্রি চেয়ার্স’। এ তো গেল শব্দ গড়ার খেলা, শব্দ ভেঙে নূতন শব্দ গড়াতেও তাঁর মুন্সিয়ানা কিছু কম নয়! দুচারটি নমুনা – সব ‘মন’ একইরকম, যেখানে জমা থাকে দুঃখ-কষ্ট-ভালোবাসা-উদারতা, কিন্তু এই মনই যখন ‘ই-মন’ (অর্থাৎ অ্যান্ড্রয়েট বা অ্যান্ডিদের) মন হয়ে যায়, পাল্টে যায় কি মনের সংজ্ঞা? লেখক তাঁর ‘একটি আষাঢ়ে গল্প-১’-এ এই ‘মন’ এবং ‘ই-মন’ নিয়ে হৃদয়স্পর্শী একটি প্রেমের গল্প শুনিয়েছেন আমাদের। একইভাবে গরীবের ‘ভাবমূর্তি’ যখন পরিণতি পায় ‘অভাবমূর্তি’তে, শব্দে সংযোজিত নূতন এই দার্শনিকবোধটি আমাদেরকে ভাবায়। আবার ‘হার-জিত’ গল্পে ‘ফুটবলে’র সহাবস্থানে ক্রিকেট পরিণত হয় যখন ‘বাহুবলে’ এবং ‘পাবলিক অপিনিয়ন’ নবতর ব্যাখাপ্রাপ্তিতে হয়ে যায় ‘পাবলিক অনিয়ন’ – ‘পাবলিক অপিনিয়ন জিনিসটা হচ্ছে একটা অনিয়নের মতো। খোসাওয়ালা পেঁয়াজ খুব নিরীহ-দর্শন। কিন্তু খোসাটা ছাড়াতে শুরু করলে টের পাওয়া যায়, ঝাঁঝ কী জিনিস। বিশেষ করে পেঁয়াজটা যদি হয় দেশি। ক্ষমতার লোকজন দেশি পাবলিক অনিয়নকে প্রথমে তাচ্ছিল্য করে। পরে যখন খোসা ছাড়ানো-ঝাঁঝ শুরু হয়, তখন চোখ কচলে আর কেঁদে-কেটে কূল পায় না।’ লেখকের এই যুক্তি বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করে নিতে পারি আমরা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বিবিত্র স্বাদ ও ভাবনার গল্পগুলি এভাবেই দ্বিধাহীন আসন গেড়ে নেয় আমাদের মনে। তাঁর অন্যান্য গল্পগ্রন্থের চাইতে এই গ্রন্থের স্বাতন্ত্র্য হয়ত আছে, সে স্বাতন্ত্র্য যতখানি না জীবনপাঠের তার চাইতেও অনেক বেশি নূতন পাঠকরুচি নির্মাণের।