দিনকাল ভালো যাচ্ছে না চান বাদশার। ব্যবসাপাতি আগের মতো নাই। দিন কয়েক আগেও চান বাদশার বাঁশের খুপরির চায়ের দোকানে ভিড় বাট্টা লেগেই থাকতো। নিত্য দিনের কাস্টমারতো ছিলই, উড়াধূড়া কাস্টমারেরও কোন কমতি ছিল না। সন্ধ্যার পরতো দোকানের সামনের বাঁশের বেঞ্চিতে বসার সুযোগই পাওয়া যেত না। খাঁটি দুধের সাথে আলগা পাতির লিকারের চা খেতে প্রতিদিনই গাহেকের বেশুমার ভিড় লেগে থাকতো। দোকানের বাঁশের খুঁটিতে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চান বাদশা চোখ মুদে ভাবে “আহা কি দিনকালই না ছিল।” শুধু খাঁটি দুধের চায়ের টানেই গাহেকরা আসতো না, চান বাদশার দোকানের দু’ব্যান্ডের রেডিওর খবরা খবর গান বাজনার শোনার টানেও গ্রাহকরা মাছির মতো সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে এসে ভিড় জমাতো। চান বাদশা এই টেকনিকটা ভালো করে জানে গাহেকরা খবরা খবর গান বাজনা শোনার পাশাপাশি চা বিস্কিট খাবে, ফুক ফুক করে বিড়ি টানবে, কান পেতে গান শুনে মাথা দুলাবে, খবরের সময় কান খাড়া করে খবর শুনবে। এই টেকনিক না জানা থাকলে ব্যবসাপাতি লাটে উঠবে। তা ছাড়া দোকানটার অবস্থানও ভালো জায়গায়, নদীর ধারে। কাছেই লঞ্চঘাট, দিনে গোটা ছয়েক লঞ্চ ভিড়ে। লঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে হরেক পদের মানুষ নামে। গঞ্জ থেকে আসা ছোট ছোট কারবারিরা পলিথিনের ঠোঙায় এবং ছালায় ভরা ব্যবসাপাতির জিনিসপত্র নামায়, বউঝিরা গঞ্জের হাটথন বেস্কুমতির জিনিস কিনে আনে, যোগাযোগটা হয় রসুলপুরে আসা এই লঞ্চের কারণেই। লঞ্চ থেকে নামার পরপরই ছেলে ছোকরারা লেবেনচুষ খাওয়ার জন্য মা বোনের শাড়ি চিনা জোঁকের মতো ধরে চিক্কোর দিতে থাকে, তো কি আর করা, শেষমেশ চান বাদশার দোকান ছাড়া উপায়তো নাই। চান বাদশা চালাক মানুষ, চান মিয়া ভালো করেই জানে এই ছুইটকারা কিছু একটা না নিয়ে মা বইনের আঁচল ছাড়বে না। এই ছুইুটকাদের জন্যে সে বন্দোবস্তও করে রেখেছে চান বাদশা। দোকানের তাকের বৈয়ামে রেখেছে লেবেনচুষ, তিলের খাজা, মুড়োলি, লাঠি বিস্কিট, মুড়ির মোয়া, বড়ইয়ের আচার, লাড়– ছাড়াও কতোপদের জিনিস। লঞ্চ ভিড়লেই চান বাদশার নীরব চায়ের দোকান সরব হয়ে যায়। একদম ফুরসত পায় না চান বাদশা, এক হাতে কতো কাম কাজ করা যায়। চুলায় লাকড়ি দাও। কেটলি থেকে গরম পানি নামিয়ে চায়ের লিকারের সাথে মিশাও। সে সময় মাথাটা ভারী খারাপ হয়ে যায় চান বাদশার। উড়াধূড়া পোলাপান যে রাখবে তাতেও সমস্যা আছে। পোলার খায় খোরাকি মাসকাবারি বেতন দিতে গেলে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলবে। তো দোকানে কাস্টমারে ভরা থাকলে সব কষ্টই স্টুলে যায় চান বাদশা। কিছু আউলা ঝাউলা কাস্টমার আছে, মিঠা মিঠা কথা বলে, খেয়ে ঠিকমতো টাকা পয়সাও দিতে চায় না,… দুয়ো… হালার পুতেগো দেখলে শইল্যের গোস্ত শইল্যে কামড়ায়। এই সমস্ত লোক অইলো খারাপ মানুষ, এদের আবার হাতেও রাখতে হয়, নতুবা কোন সময়ে চুরি টুরি করে চান বাদশার দোকানের বারোটা বাজায়ে ফেলবে কে জানে। তো সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানের লণ্ঠনটি বাঁশের আগায় টিমটিম করে জ্বলে। তখন আমিনুদ্দি, গহন আলী, পরবআলী, গরিব মিয়ার কথার ফুলঝুরি ছুটে, কেচকি মাছ খেয়ে রাজা উজির মারার মতো খোশগল্পে সবাই বিভোর হয়। এই সমস্ত আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরের লোকেরা গাঁয়ের রাজনীতি থেকে শুরু করে ঢাকার উড়াধূড়া খবর, জমিনের এসএ, আরএস, পরচা থেকে শুরু করে হালিমা খাতুনের বিয়ের খবরটিও আলোচনায় বাদ রাখে না। তো রেডিওর খবর শুরু হবার সাথে সাথে সাপের মাথায় ধুলোপড়া দেয়ার মতো সবাই চুপ হয়ে যায়। কানখাড়া করে সবাই খবর শুনে। দেশের অবস্থা ভালো নয়, চারিদিকে থমথমে গুমোট পরিবেশ। শেখ মুজিব সাতই মার্চের ভাষণ দিয়েছেন। বাঙালিকে ক্ষমতায় আসতে দিবে না পশ্চিম পাকিস্তানিরা। শুধু তাই নয় ভোটে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে বাঙালিদেরকে। খবরের মাঝে গরিব হোসেন বলে ওঠে,
ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ কইরা আর চা খাওন যাইব না
কেন, কেন
দেশের খবরা খবর কিছু রাহো, দেশে আগুন লাগতাছে।
কী কথা কও কাহা।
আমাগো মারনের লাইগ্যা পশ্চিমারা অস্ত্র আনতাছে
আস্তে কথা কও কাহা, ব্যাড়ারও কান আছে। ফিস ফিস করে কথা কয় কুটর আলী। তো কুটুর আলীর কথা ঠিকই আছে। গাঁয়ের মুরুব্বিরা তো মিথ্যে কথা বলবে না। হাছা খবরটা পাওয়া যাইবো রহমত আলী মাস্টারের কাছে। এ তল্লাটের একমাত্র শিক্ষিত ও বুঝদার লোক হলেন রহমত আলী মাস্টার। নিত্যদিনের পত্রিকা না পড়লে রহমত মাস্টারের ঘুম হয় না। বিকেল তিনটার লঞ্চে মাস্টারের পত্রিকা আসে। লঞ্চ ভিড়লে আজমত আলী হকার নিয়মিত পত্রিকা দিয়ে যায় চান বাদশার দোকানে। রহমত স্যারের পত্রিকার ভাঁজ খোলা নিষেধ। পত্রিকার ভাঁজ খুললে স্যারের পত্রিকা পড়তে অসুবিধা হয়। সন্ধ্যার পর রহমত স্যার চায়ের দোকানে বসেন। স্যার সম্মানী মানুষ, স্যারের জন্য বাঁশের বেঞ্চির একটা দিক নির্দিষ্ট করা আছে। জেনে শুনে কেউ সেখানে বসে না। সন্ধ্যায় চেনা পথটুকুই লোক চলাচলের অভাবে সুনসান হয়ে পড়ে। শুধু চা আর বিড়ির টানে কুটুর আলী, পান্ডব আলী, গহন আলীরা চান বাদশার দোকানে এসে উপস্থিত হয়। নিত্যদিন এ পথ দিয়েই বাড়ি ফিরেন রহমত মাস্টার। সেই চিরচেনা দৃশ্য একহাতে লণ্ঠন আরেক হাত বই। রহমত স্যারকে দেখে সবাই সালাম দিয়ে ওঠে দাঁড়ায়। স্যার সবাইকে ইশারায় বসতে বলেন। ছাপোষা মানুষগুলো চেয়ে আছে স্যারের দিকে। স্যারের জন্যে কড়া লিকারের চা বানিয়ে চান বাদশা পত্রিকাটি এগিয়ে দেয় স্যারের দিকে। পত্রিকার ভাঁজ খুলে খবরের কাগজের হ্যাড লাইনটির দিকে চোখ বুলাতেই স্যারের কপালের বলীরেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে পড়ে, তা দেখে গাঁয়ের মানুষেরা একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলেন, গহন আলী…।
– স্যার কোন খারাপ খবর?
– হ..হ খবর খারাপ অই। পাকিস্তানিরা অস্ত্র লইয়া আইতাছে, জানে মালে শেষ করবো আমাগো…
মাস্টার সাব শেখ সাবে কি কইছে?
রেডি থাকতে কইছে আর পাকিগো লগে থাহন যাইতো না। আমাগো এইবার যুদ্ধ করতে অইবো। চান বাদশার চায়ের দোকানের তাবত লোক চিৎকার দিয়ে ওঠে।
– যুদ্ধ করমু কেমতে আমাগো অস্ত্র শস্ত্র কই…
– অস্ত্র নাই মানে আমাগো কাছে লাডি, বৈঠা, রামদা, কোচ, জুইত্যা, বক কাঁচি, টেডা হগ্গলই আছে, গ্রামে ঢুকলে শালাগো শির বক কাঁচি দিয়া পোঁচাইয়া নামামু…। কুটুর আলী, গহন আলী, পান্ডব আলী, কানু, মেন্দুর কথা শুনে মিটিমিটি হাসে রহমত মাস্টার।
– তো একটা কথা অইলো তোমাগো জান বাঁচাইয়া কাম কাজ করতে অইবো। গাঁয়ের যুবক পোলাপানগো ট্রেনিং দিতে অইবো। সীমান্ত পাড়ি দিয়া ভারত যাইতে অইবো। তা খুব সাবধানে, রাতে পাহারা দিতে অইবো। আমাগো নিজেগো মইধ্যে শত্রু আছে, হোনো মিয়ারা কাউয়ার মাংস কাউয়া দিয়া খাওনের মাইনষের অভাব নাই, সাবধান টিকটিকি নামছে মেন্দু মিয়া।
রহমত মাস্টারের কথা শুনে সবাই থমকে দাঁড়ায়। কী থেকে কী হয়ে যায়, কে জানে। রহমত মাস্টার যখন আছেন তিনিই টেকনিকটা বাতলে দিবেন। দিন দুই পর, রসুলপুর গ্রামের মানুষ দূর থেকে ভেসে আসা একতালের কিছু কথা শুনে আশ্চর্য হয়, দূর থেকে ক্রমশই ভেসে আসছে একটি শব্দ ‘লেফট রাইট লেফট রাইট… হেপা হাইট… হেপা হাইট…বাম..ডান….।’ দিন কয়েকের মধ্যেই গাঁয়ের রূপ পাল্টে যায়। ক্ষেতে, খামারে, নদীতে, ডাঙায়, নৌকায় সবখানে একই আলোচনা, দেশ না বাঁচলে আমরাতো বাঁচবো না। স্বাধীন করতে হবে দেশ, কাজ কামে কেউর মন নেই। কাজ কামে সারাদিন কাটলেও সন্ধ্যার সময় স্থবির হয়ে পড়ে গ্রাম। এমনকি কাক পক্ষীর ডানা ঝাপটানোর শব্দও যেন বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু লণ্ঠনের আলোয় কয়েকজন গ্রামবাসী চান বাদশার চায়ের দোকানের রেডিওর সামনে স্থির হয়ে বসে অপেক্ষা করে কখন রহমত মাস্টার পত্রিকা খুলে দেশের খবরা খবর শোনাবেন। মাস্টার সাহেবই বা কী করবেন, গাঁয়ের কিছু মাতব্বর শ্রেণীর লোক আছেন যারা মাস্টার সাহেবের এ ধরনের কার্যকলাপকে পছন্দ করেন না। এই সমস্ত লোকগুলো চুপচাপ বসে মাস্টার সাহেবের কথা শুনে, মাস্টার সাহেবের চলে যাবার পর মুহূর্তেই ফিস ফিস আলাপ জুড়ে দেয়, ‘মাস্টার সাহেবের চেলারা পাকিস্তানেরে ভাইঙ্গা ফালাইতে চায়।” এই সমস্ত লোকদেরকে চান বাদশার খুব অপছন্দ। কিন্তু কি আর করা, দিনকাল খারাপ, ঠেকায় পইরা এই অপছন্দের লোকগুলিরে চা, পান, বিড়ি খাওয়াইতে হয়। এদিক সেদিক তাকিয়ে চান বাদশা ভয়ে ভয়ে বলে ওঠে, ‘রাইত অইয়া গেল, রহমত স্যার আইতাছেন না কে।’ নিঃশব্দ রাতকে ঠেলে দ্রুত একটা লণ্ঠন চান বাদশার দোকানের কাছে এসে থেমে যায়। লণ্ঠনের আলোয় চান বাদশা তাকিয়ে দেখে এ কয়দিনেই রহমত মাস্টার যেন আরো বুড়িয়ে গেছেন। কাছে আসতেই স্যার গলার স্বরটা নিচু করে বলেন, ‘আইজকা আর পত্রিকা পড়ার সময় নাই,… কাশেম, ইজ্জত আলী, জানু, লোকমানেরে পার কইরা দিয়াইছি।’ বৃদ্ধ রহমত মাস্টার কোথায় তাদের পার করে দিয়ে আসছেন, রসুলপুরের গ্রামের মানুষ তা বুঝতে পারে না। মেন্দু মাঝি কথার ফাঁকে বলে ওঠে ‘কোথায তাগো পার কইরা দিয়া আইলেন, বুঝতাম পারলাম না।’ ‘এত্তো কথা হোনন আর বোঝনের দরকার নাই, চানমিয়া দোহান বন্ধ কইরা বাইত যাওগা…রেডিওটা চালু করতো দেহি বিবিসির খবরডা হুইন্যা যাই।’ ভাঙা ভাঙা স্বরে বিবিসির নিউজ ভেসে আসে। উৎসুক সবাই রহমত মাস্টারকে ঘিরে আছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্যার বলে ওঠেন, ‘চুপচাপ হগ্গলতে বাইত যাওগা, বউ ঝিগো যার যার সেবমতো দূরে পাঠাইয়া দাও, দিনকাল খুব খারাপ, কে বাঁচে, কে মরে এর কোন ঠিক ঠিকানা নাই…স্কুল ছুটি দিয়া দিছি…. হোনো মিয়ারা আমি
যুদ্ধে যাইতাছি, বাঁচলে আবার দেহা অইবো…।’
সেই যে বি বছর আগে রসুলপুর ছেড়েছিল মোমেনা, আফাজ, সাদেক, রহিমুন তারা সবাই গ্রামে ফিরে এসেছে। আগে দুবার লঞ্চ ভিড়তো রসুলপুরের ঘাটে, এ ক’দিন ঘন্টা দুয়েক পরপরই লঞ্চের উপর নিচ ছাদ বোঝাই হয়ে মানুষ ছুটে আসছে বানের পানির মতো গাঁয়ের দিকে। বাক্স পেটরা বোঝাই করে পুরো সংসারটিই নিয়ে ছুটছে রুদ্ধশ্বাসে। সবার মনে এক চিন্তা জান বাঁচাইতে অইবো। রহমত মাস্টার তার স্কুলে উড়িয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা। সুলতান মাতব্বর হুংকার ছেড়েছে ‘রহমত মাস্টারের কল্লা পড়বো।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। মেন্দু মাঝির বড় কোষাটা বোঝাই, ছাগল, মুরগি, বকরি এমনকি গাঁয়ের পোষা কুকুকরটিও বাদ যায়নি। সবাই নৌকাতে ওঠে বসেছে শুধু রহিমুন বেওয়া মাটি কামড়ে পড়ে আছে তার পোষা মোরগ মুরগিগুলোকে নিয়ে, তার এক কথা বুকে গুলি লমু কিন্তু রসুলপুরের চর ছাড়তাম না। কী করা তাকে ছাড়াই রওনা দিয়েছে মেন্দু মাঝির কোষা। মেন্দু মাঝি শরীরের সর্বশক্তি নিয়ে বৈঠা টানছে, দরদর করে ঘাম বেয়ে পড়ছে শরীর থেকে। বৈঠা বাওয়ার তার বিরাম নাই। কদমির চরে তাদের পৌঁছিয়ে দিয়ে ফের আবার রসুলপুরে তাকে ফেরত যেতে হবে। নৌকার ভেতরে ভীত আদম সন্তানরা জোরে জোরে কলেমা শরীফ পড়ছে। রসুলপুরের মানুষ তাকিয়ে দেখে একটি জাহাজ দ্রুতগতিতে ধেয়ে যাচ্ছে রসুলপুর গ্রামের দিকে। পর মুহূর্তে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ারের ট্যা ট্যা শব্দে কানে যেন তালা লাগছে। মেন্দু মাঝি চিৎকার করে বলছে ‘পাক সেনারা মনে অয় আইয়া পড়ছে।’ ভীত সন্ত্রস্ত নিরক্ষর মানুষগুলো চেয়ে দেখছে তাদের চোখের সামনেই পুড়ছে রসুলপুর গ্রাম। আরো জোরে বৈঠা চালায় মেন্দু, জান যায় যাক, তবু তাকে রসুলপুর গ্রামে ফিরে যেতে হবে। গাঁয়ের অসহায় মানুষগুলো চেয়ে আছে মেন্দু মাঝির দিকে। নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কুকুরটি ভয়ার্ত সুরে চিৎকার করে ডাকছে ভেউ…. ভেউ…। সুনসান রসুলপুরের গ্রাম ভারী বুটের খট খট শব্দে কাঁপছে আলিশান গ্রামটিতে মানুষ বলতে এখন আর কেউ নেই। শুধু মায়মুনা বেওয়া তার জরাজীর্ণ ছনের ঘরটিতে একা বাস করছে। পালায়নি রসুলপুরের পোস্টমাস্টার ছাবেদ আলী। সাররাত বুটের খট খট শব্দের সাথে মেশিনগানের ব্রাশফায়ারের আতশবাজিতে ছেয়ে যায় রসুলপুরের আকাশে বাতাস। লেলিহান আগুনের শিখায় পুড়ে কাঠ কয়লা হয়েছে শ দুয়েক জ্যান্ত মানুষ। পালাতে গিয়ে যারা ধরা পড়েছে তাদেরকে কোমরে রশি বেঁধে লাইন ধরে দাঁড় করানো হয়েছে নদীতীরে। তাদের পাশে জনপঞ্চাশেক পাক হায়েনা স্টেন নিয়ে রক্ত চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চান বাদশা, হরিদাসী, ছাবেদ মাস্টার, জমির শেখ, রূপবান, তারা মাঝিসহ অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপছে। ঘোলা চোখের পাক মেজর ঘন ঘন ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। হাতের বেত উঁচিয়ে ধমকের সুরে বলছে,
– তেরা নাম কেয়া হ্যায়
-স্যার হাম মুসলমান হ্যায়, কলেমা জানতা হ্যায়
– ডান্ডি কার্ড হ্যায়
– জি, জি… মেজর ছাবেদ মাস্টারের পেটে বেতের খোঁচা মেরে গর্জে ওঠে
– শালে গিধর কি বাচ্চে, ডান্ডি কার্ড হ্যায়
– স্যার হাম গভর্নমেন্ট কা নকরি করতা হ্যায়
– নকরি…
– জি.. জি পাকিস্তান পোস্ট অফিস কা…
– পাকিস্তান পোস্ট অফিসকা… হাঃ হাঃ হাঃ প্রচণ্ড শব্দে হেসে ওঠে পাক মেজর।
– সমঝে তোম পোস্ট মাস্টার হ্যায়, মানি অর্ডার পাঠাতে হায়…।
– জি জি…
বরাতের গুণে বেঁচে যায় ছাবেদ মাস্টার। কিন্তু হরিদাসী, চান বাদশার কপাল খারাপ।
– ইধার আইয়ে জেনানা…।
পাক মেজর হরিদাসীর চিবুক ধরে বলে ওঠে,
– খব সুরাত আওরাত… তোমহারা নাম…
– হরিদাসী…
– তোম মালায়ুন হ্যায়..
– জি জি স্যার হাম বাঙালি হ্যায়..
– তোমলোক ইন্ডিয়ান এজেন্ট হ্যায়। আইয়ে মেরা পাছ…। মুখটি বাড়িয়ে দেয় পাক মেজর। সবাইকে স্তম্ভিত করে মেজরের মুখে একদলা থু থু নিক্ষেপ করে হরিদাসী। মুহূর্তে ক্রুদ্ধ বাঘের মতো গর্জে ওঠে পাক মেজর, হরিদাসীর গালে কামড় বসিয়ে দেয়। রক্তলোলুপ চিতার হিংস্র গর্জনের মতো গর্জে ওঠে স্টেনগান, নদীতীরে জনাদশেক আদম সন্তান মৃত্যু চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। সে যাত্রায় নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায় কানু নাপিত। ক্রুদ্ধ মেজর হরিদাসীর নিক্ষেপ করা থুতু মুছতে মুছতে গগনবিদারী চিৎকার করে বলে ‘ফায়ার’। নিমেষে পাক হায়েনা দলের মুখের জিহবার আগুন গ্রাস করে কোমরে দড়ি বাঁধা অসহায় মানুষদের। ওদিকে রসুলপুর গ্রামের টিনের চালে গুলি লেগে টিনের চালা ফুটছে ফটাস ফটাস করে। দিন দশেক আগে চান বাদশার যে চায়ের দোকানটিকে ঘিরে রসুলপুর গ্রামের তাবত লোকদের জমজমাট চায়ের আড্ডা জমে উঠতো তা নির্ঘাত এখন প্রেতপুরী। বাইরে শুধু দু একটা চাছা ছোলা চামড়া ওঠা কুকুর নীরবে আউ আউ শব্দে বিলাপ করছে।
রসুলপুরের ছোট টিনের ঘরে পোস্ট অফিস। ব্রিটিশদের সময়ে কোন প্রজাহিতৈষী জমিদারের দেয়া পোস্ট অফিসটি রসুলপুরের একমাত্র সরকারি অফিস। প্রতিদিনই নির্দিষ্ট সময়ে লঞ্চে ডাক আসে। মুকবিল পিয়ন সিলগালা করা চিঠি ভর্তি ছালাটি ছাবেদ মাস্টারের কাছে পৌঁছে দেয়া পর্যন্তই তার ডিউটি শেষ। ছাবেদ মাস্টার ছালা থেকে চিঠিগুলো বের করে টেবিলের উপর গ্রাম ভাগ করে চিঠিগুলো সাজিয়ে রাখেন। সিলের তারিখ পাল্টিয়ে সিলটি রেডি করে। প্যাডের কালিতে সিলটি ঘষে ডাকে আসা চিঠিগুলোতে ধপ ধপ শব্দে সিল মারে। এক ফাঁকে একখিলি পান মুখে দিয়ে চাবুর চুবুর করে চাবাতে থাকে। বেলা দুইটার দিকে চিঠিগুলো বগলদাবা করে গাঁয়ে বেরিয়ে পড়ে চিঠিগুলো বিলি করতে। রসুলপুর গ্রামে ছাবেদ মাস্টারকে সবাই ইজ্জত করে। শত হলেও সরকারের খাস ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন ছাবেদ মাস্টার। ত্রিশ বছর বয়সী ছাবেদ মাস্টার ভাগ্যগুণে এ যাত্রায় জীবনে বেঁচে গিয়েও গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাননি। পাক হায়েনারা ছাবেদ মাস্টারকেও তাকে তাকে রেখেছে। গাঁয়ের মানুষের টাকা পয়সা লুট করে পাকরা মানি অর্ডারে টাকা পাঠায় পশ্চিম পাকিস্তানে। ছাবেদ মাস্টারের প্রতিহিংসা জ্বলে দাউ দাউ করে। আমাগো দেশের টেহা পাচার অইতে দিতাম না। মানি অর্ডারে টাকা পাঠাতে এসে পাক মেলেটারিদের সাথে বেশ ভাব হয়ে যায় ছাবেদ মাস্টারের। পাকদের ইচ্ছে করে চা বিস্কিট খেতে দেয়। ছাবেদ মাস্টার সুযোগ খুঁজতে থাকে। একদিন রাতের আঁধারে মানি অর্ডারের জমানো টাকা নিয়ে বের হয়ে পড়ে ছাবেদ মাস্টার। টাকা পয়সার অভাবে দক্ষিণপাড়ার ছেলেগুলো যেতে পারছে না সীমান্তের ওপারে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং দিতে। টাকার পুঁটলিটা শক্ত করে কোমরে বেঁধে ছাবেদ মাস্টার বগামারা বিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। রাতের আঁধারেতো নৌকা পাওয়া যাবে না। যদি পাক হায়েনারা টের পায় তো এই বগামারা বিলে লাশ ভাসবে ছাবেদ মাস্টারের। জান যায় যাক টাকাগুলো যে ভাবেই হোক পৌঁছাতে হবে দক্ষিণ পাড়ার জলিল, ইয়াকুব, জাব্বার এবং মিনহাজের কাছে। চিন্তা করার বিন্দুমাত্র সময় নাই। ছাবেদ মাস্টার মুহূর্তেই লাফিয়ে পড়েন পানিতে। শরীরের শক্তি নিয়ে সাঁতরাতে থাকেন। মধ্যরাতের দিকে ছাবেদ মাস্টার দক্ষিণ পাড়ায় পৌঁছেন। ইয়াকুবের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই এক ছায়ামূর্তি এসে সামনে দাঁড়ায়। ছায়া মূর্তিটিকে দেখে ছাবেদ মাস্টার এগিয়ে গিয়ে বলে ‘ইয়াকুব না’। ছায়ামূর্তি মাথা নাড়ে। ‘শালাগো মানি অর্ডারের টেহা বেবাক লইয়াইছি…. আমাগো টেহাই আমরা আনছি… আমাগো টেহা পশ্চিম পাকিস্তানে যাইতে দিতাম না…দেরি করিস না.. সব রেডিতো.. ভোরে সূর্য ওঠার আগেই রামচন্দ্রপুরের লঞ্চ ধরতে অইবো… চল.. তগো লগে আমিও মুক্তিবাহিনীতে যামু।’ কানু নাপিতের হয়েছে জ্বালা। সবাই সটকে পড়লেও কানু নাপিত কোথাও যেতে পারেনি। নিজ ভাগ্যের ওপরই সঁপে দিয়েছে জীবন। বটতলার আশপাশ খাঁ খাঁ করছে। আশপাশের নীরব নির্জন এলাকায় সহসা কেউ আসে না। আসবেই বা কিভাবে। পাক হায়েনার দল ক্যাম্প করেছে রহমত মাস্টারের স্কুলে। তোরাব আলী হয়েছে পিস কমিটির চেয়ারম্যান। তোরাব আলী, লোকমান এখন পাকিস্তান দরদি সেজে সব খবরাখবর আদান প্রদান করছে পাকদের কাছে। রহমত মাস্টারকে পই পই করে খুঁজছে পাক সেনারা। মাস্টারের সাথে ছাবেদ মাস্টারের নামও লিস্টে উঠেছে। চারিদিকে টিকটিকি লাগানো হয়েছে। ছাবেদ, রহমত মাস্টার কোথায়? দেখতে দেখতে বর্ষা এসে গেল। এ বর্ষা কালটির আশায়ই ছিল কানু নাপিত। পাক শালাগো পানিতে ডুবায়ে মারতে হবে। বটতলার নিচে পানি থৈ থৈ করছে। মাচানের ওপর কানু নাপিতের দোকান। দুপুর বেলা সুনসান, বাজারে কেউ নাই। এই সময়টাতে খুব ভয়ে ভয়ে থাকে কানু নাপিত। পাকরা তাদের চুল দাড়ি কাটতে হর হামেশাই কানু নাপিতের দোকানে আসে। ভাঙা বাংলা এবং উর্দু জবানের মিশেলে কানু নাপিত পাকদের সাথে আলাপ জুড়ে দেয়। প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ধিকিধিকি। সুযোগ পেলে এই ক্ষুর দিয়ে পোঁচ মেরে শির আলগা করে ফেলবে। কাজটা করতে হবে খুব সাবধানে। এ কাজে একটু হেরফের হলে কানু নাপিতের লাশ ভাসবে বগামারা বিলে। সেদিন ছিল মেঘলা দিন। চুপচাপ বসে আছে কানু। সেলুনের ভাঙা আয়নায় নিজ চেহারা দেখে চমকে ওঠে কানু। চেহারার একি হাল হয়েছে, গালের চোয়াল ভেঙে গেছে, চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। পেছনে তাকিয়ে দেখে এক পাক হায়েনা সেলুনের দিকে আসছে। পাক হায়েনাকে দেখে কানু নাপিত সেলুট দিয়ে ওঠে দাঁড়ায়॥ জিজ্ঞেস করে
– স্যার বাল কাটতা হ্যায়
– ইয়েস
– বৈঠিয়ে সাহেব বাংলা মুলুক মে আতা হ্যায়, তো ইয়ে খুব সুরাত জেনানাকা দেশ হ্যায়….
পাকির চোখ দুটো সাপের চোখের মতো ধক করে ওঠে
– খবসুরাত জেনানা কিধার হ্যায়….
– স্যার কদমির চর কা হ্যায়..
কানু নাপিতের কথা শুনে খুব খুশি হয় পাক সেনা। কানু নাপিতের সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলে। ঠিক হয় দু’জনে মিলে আজই কদমির চরে যাবে খবসুরাত জেনানার খোঁজে॥ তর তর করে শেভ করে চলেছে কানু নাপিত। সাবানের ফেনায় ভরে আছে পাকির মুখ। আরামে চোখ মুদে আছে। এখনইতো সুযোগ। মানুষ দূরে থাকুক একটি কাক পক্ষিও নেই রসুলপুর বাজারে। ক্ষুরটা নামায় নিচে, আরো নিচে একেবারে গলার কাছে। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ক্ষুরটা চেপে ধরে গলায়। একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে পাকির মুখ। টের পেয়ে গেছে পাকি, মুহূর্তে শরীরের শক্তি নিয়ে দু হাতে ধরে কানু নাপিতের হাত। কানুর হাতের ক্ষুর পাকির গলার কণ্ঠনালী ভেদ করে ঢুকছে … ফিনকি রক্তের ধারায় ভেসে যায় কানু নাপিতের দোকানের পাটাতন। ক্ষুরের পোঁচে আধাখণ্ড গলা নিয়ে পাকি জাপটে ধরে কানুকে। দু’জনের মাঝে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে গড়াগড়ি করে পাটাতন ভেঙে দুজনে একেবারে বর্ষার খলবলা পানিতে। পাকির রক্তে লাল হয়ে যায় বর্ষার জল। ততক্ষণে পাকি খতম। সে যাত্রায় কানু নাপিত বেঁচে গেলেও দিন কয়েক পর বেয়নেটে খোঁচানো কানু নাপিতের পচা লাশ ভেসে উঠেছিল বগামারা বিলে।
মায়মুনা বেওয়ার এই দুনিয়ায় কেউ নেই। সেই যে পঁচিশ বছর আগে মায়মুনাকে ছেড়ে লোকটা দেশান্তরি হলো আর ফিরলো না। অভিমানে নাকি সংসার পালার দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার ঝামেলা থেকে বাঁচতে লোকটা যে গেল, এই ত্রিশ বছরেও লোকটার চেহারা দেখতে পায়নি মায়মুনা বেওয়া। স্বামীর কথা মনে করে মায়মুনা এখনও ডুকরে ডুকরে কাঁদে।
জীর্ণ ছনের চালার নিচে কতো রাত কেটেছে নির্ঘুম। চোখে মুখে অন্ধকার দেখেছে। কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো কিছু মানতে চায় না। পেটতো বাঁচাতে হবে। কী করবে মায়মুনা। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় একটি মুরগি দিয়েছিল মায়মুনাকে। এক মুরগি থেকে বাড়তে বাড়তে এখন গোটা দশেক মুরগি হয়েছে। মুরগির ডিম বেচে এদিক সেদিক ঝি গিরি করে মায়মুনার জীবন চলে। মুরগিগুলোই মায়মুনার সন্তান। এই মুরগিগুলোর মায়ায় মায়মুনা মেন্দু মাঝির সাথে কদমির চর যায়নি। না গিয়ে সে কি ভুল করেছে। না কিছু ভুল করেনি মায়মুনা, তার মতো একজন বেওয়ার বাঁচা মরার প্রশ্নে রসুলপুর গ্রামের তো কিছু যায় আসে না। দিনের বেলায় সাংসারিক কাজ কামের ঝামেলায় সময় কেটে গেলেও রাতের সময় আর পোহাতে চায় না। সময় খুব খারাপ। দিনের বেলায়, রাতে ফকফকে জ্যো¯œায়, অথবা অমাবস্যার ঘোর রাতে রসুলপুর গ্রাম যেন নেশাখোরের মতো টাল হয়ে থাকে। পাক মেলেটারিদের খটখট বুটের আওয়াজ আর গোলাগুলির শব্দে ঘুমাতে পারে না মায়মুনা বেওয়া। মায়মুনার বাড়িটি রসুলপুর সদর গ্রাম থেকে মাইল খানিক ভেতরে। ছনের ঘরের চারদিকে বেতগুল্মের জঙ্গল। কাটাকেন্দুল্যা ঝোপঝাড়ে ছেয়ে আছে চারদিকে। এই ঘন জঙ্গলের ভেতরে যে কেউ বাড়ি থাকতে পারে তা কেউ কল্পনাই করতে পারবে না। জায়জংলার ভেতরে মায়মুনার ছোট কুটির ঘরে সন্ধ্যার কুপি জ্বলে টিমটিম করে। তাও বেশিক্ষণ নয়। কেরোসিন তেলের টাকা পাবে কোথা থেকে? সন্ধ্যার সময়েই মুরগিগুলোকে খোঁয়াড়ে বন্দী করে চারটা ডাল ভাত গোগ্রাসে গিলে ছেঁড়া কাঁথাটি গায়ে জড়িয়ে মায়মুনা শুয়ে পড়ে। মুরগিগুলো মায়মুনার পাশেই খোঁয়াড়ে আরামে চোখ মুদে থাকে। মাঝে মাঝে গুলি গোলার শব্দে থর থর করে কাঁপতে থাকে, দোয়া দরুদ পড়ে, বুকের ঢিবঢিব শব্দ বেড়ে যায়। ঘুমের মাঝে চিৎকার করে ওঠে ‘পাকিগো যদি পাই তো খবর লইয়া হালামু।’ কখনো কখনো দুঃস্বপ্নের ঘোরে আউ আউ করে কাঁদে। দুনিয়ায় মায়মুনারতো কেউ নেই, রোগে শোকে মায়মুনার খোঁজ খবর নিবে। পাকিস্তানি সেনারা মায়মুনাকে গুলি করে মেরে ফেললেও তাকে গোর দেয়ারও কেউ নেই। অনবরত বাঁশের বেড়াটিকে কারা যেন ধাক্কা মারছে। ভয়ার্ত মায়মুনা প্রথমে চুপচাপ থাকলেও শেষাবধি চুপ থাকতে পাওে না। চাপা গলায় গোংড়ানির শব্দ তুলে মায়মুনা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে ‘কেডা… কেডা… কথা কওনাকে…। চাপা ফিসফিসানির আওয়াজ ভেসে আসছে বাহির থেকে। একজনতো নয়ই, হয়তোবা কয়েকজন।’ ‘এত্তো রাইতে কি মেলেটারিরা…’ মায়মুনার কলজেটা তড়াক করে ওঠে। চোর টোর, গুণ্ডা বদমাশ নয়তো…দূর যা… চোরেরা এহানে আইয়া কী পাইবো ..কয়ডা মুরগি ছাড়া মায়মুনার আর কী আছে… মায়মুনার ভাঙাচুরা শরীরে আছেডা কী, চাইটা পইটাযে খাইবো…। চকিতে বঁটিটা শক্ত হাতে ধরে এগোয় মায়মুনা। যদি শুয়োর আইয়েতো বঁটির কোপে খবর লইয়া হালামু। ফের থমকে দাঁড়ায়, তাইলে কী সোনার চান জাদুরা আইলো। দরজার বাইরে ফের ফিসফিসানি আওয়াজ ‘খালা.. অ খালা… দরজাটা খোল…। বঁটিটা সিথানের পাশে রাখে মায়মুনা। চোখ দুটো এক অজানা আনন্দে ঝাপসা হয়। মুক্তি জাদুমনিরা আইছে। দরজাটা খোলা মাত্রই ইয়াকুব, জলিল, মিনহাজ, ছাবেদ মাস্টার ঢুকে পড়ে। সবার কাঁধে ঝোলা। হাতে স্টেন, থ্রি নট থ্রি রাইফেল, গুলির বাক্স, বোঁচকা বুঁচকি ভেতরে গ্রেনেড। কুপিটা জ্বালায় মায়মুনা। একনজরে চেয়ে থাকে ইয়াকুব, জলিল, মিনহাজের দিকে। চোখের দুই ধার বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
– খালা তুমি কানতাছো… চিন্তা কইরো না খালা এইবার দেশ ঠিকই স্বাধীন অইবো…
– হাছা কইতাছোস সোনার চানরা… দেশ স্বাধীন অইবো..
– দেশ স্বাধীন করনের লাইগ্যাইতো ট্রেনিং দিয়া আইছি..
– আমি না একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লইছিলাম… তগো লগে যুদ্ধ করতে গেছি.. হে… হে। পাগলের মতো হাসতে থাকে মায়মুনা। ছাবেদ মাস্টার মৃদু ধমক দিয়ে ওঠে,
– খালা এতো হাসতাছো কে.. পাগল অইয়া গেলানি… দেশ স্বাধীন অইলে দেখমুনে বুড়ির চাপায় হাসনের কতো জোর থাহে…
– যুদ্ধ করমু মাইরা হালামু… আরে বাজানগো তো ক্ষুধা লাগছে, দেহ দেহি পোলাগো খাওন দাওনের নাম নাই, খালি আজাইরা আলাপ…।
– খালা ব্যস্ত অইয় না আমরা এহানে আছি মাঝরাইত পর্যন্ত, ভোর রাইতে বগামারা বিল পার অইয়া অপারেশনে যামু…। তো ক্ষিধাতো লাগছেই…। কী করা যায়, চট করে বুদ্ধি আসে মাথায়। মুরগিগুলোকেই জবাই করবে মায়মুনা। আহা… সোনাচানরা কয়দিন যাবৎ খায় নাই.. কে জানে? মুক্তিযোদ্ধাদের চাইতে কি মুরগির মূল্য বেশি? দেশ স্বাধীন অইলে কতো মুরগি কট কটাস করে মায়মুনার চারদিকে ঘুরবো। ইয়াকুব..অ ইুয়াকুব আমার লগে আয়…
– কিয়ের লইগ্যা খালা
– মুরগি গুলান জবাই করতে অইবো, বঁটিটা লইয়া আয়…
– ইডা কী কও খালা..তুমি চলবা কেমতে…
– আল্লায় চালাইবো…
মায়মুনার জঙ্গল ঘেরা উঠোন একে একে নয়টি জবাই করা মুরগির রক্তে লাল হয়ে ওঠে। বড় সাদা ডিমঅলা মুরগিটা হঠাৎ হাত ফসকে পালিয়ে যায়। উঠোনের কোনার গনগনে আগুনের চুলোয় মুরগির মাংস রান্না হচ্ছে। চুলোর আলোয় থিরথির করে কাঁপছে মাযমুনার ছনের ঘর। আগুনের আলোয় মায়মুনার দেহ থেকে এক স্বর্গীয় দ্যুতি ঠিকরে পড়ছে। কড়ই গাছের মগডালে বসে নিশুতি প্যাঁচা কু কু স্বরে ডেকে ওঠে। বেত ফলের মতো মতো চোখ মেলে রাতজাগা পাখি দেখে একজন বেওয়া তার শেষ সম্বল বিলিয়ে দিয়ে মুক্তিদের খাওয়াচ্ছে, গভীর মমতায় মায়মুনা চেয়ে থাকে ইয়াকুব, জলিল, মিনহাজের দিকে ‘বাজানরা কত্তোদিন ধইরা এই খাওন খায় না কেডায় জানে, বাজানরা পেট ভইরা খাও… আরে এতো কম খাইতাছো কে, জুয়ান বেডা মানুষ তোমরা, ছালুন বালা অয়নাই… আছেতো, মেলা মাংস আছে.. পেড ভইরাা খাও… আহা ডাইল অইলে মনে অয় বালা অইতো…।
কতোদিন পর জলিল ছাবেদ এই খাবার খেতে পারলো। এক অসহায় দুস্থ বিধবা নিজ সন্তানদের খাওয়ালো, অথচ এই মুরগিগুলোই ছিল বিধবার বাঁচার একমাত্র সম্বল। এ কথা মনে করে ছাবেদ মাস্টারের চোখে পানি এসে যায়। ভোরের আজান এখনি আরম্ভ হবে, ভোরেই পাড়ি দিতে হবে বগামারা বিল। সে মুহূর্তে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ারের শব্দে কেঁপে উঠলো রসুলপুর। আওয়াজটা ক্রমশই মায়মুনার ছনের কুটিরের দিকে ছুটে আসছে। ইয়াকুব, জাব্বার, ছাবেদ মাস্টার মুহূর্তেই স্টেন নিয়ে ক্রলিং করে জঙ্গলের মাঝে হারিয়ে যায়। পূব পাড়া গ্রামের দিকে জলিল, ছাবেদ, ইয়াকুবরা গ্রেনেড নিয়ে দৌড়ায়। পাকি হায়েনারা হ্যান্ড মাইক নিয়ে চিৎকার করে বলছে ‘ইধার মুক্তি হায়…. হাতিয়ার ঢাল.. দো…অ্যাডভান্স … ফায়ার…।’ আচমকা একটি গুলি মায়মুনার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়। বঁটি হাতে মায়মুনার গুলি খাওয়া শরীরটা দশ হাত উঁচুতে ওঠে ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। শীর্ণ একটা রক্তের ধারা উঠোন বেয়ে গড়িয়ে যায় জঙ্গলের দিকে। জঙ্গল থেকে বের হওয়া সাদা মুরগিটা রক্তের শীর্ণ ধারা দেখে থমকে দাঁড়ায়। পা ফেলে সামনের দিকে আগায়, মায়মুনার বীভৎস চেহারা দেখে জঙ্গল ঘেরা বাড়িটি কাঁপিয়ে ডেকে ওঠে ‘কট… কট… কটাস….।’