কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাঁপি
আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি
তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া
তুমি বাংলা ছাড়ো
– সিকানদার আবু জাফর
কবি সিকানদার আবু জাফর সাতক্ষীরা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৯ সালে। কবির পুরো নাম ছিল সৈয়দ সিকান্দার আবু জাফর হাসমী বখত। খুলনায় বি ডি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। কবি পত্নীর মতে তিনি বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্র ছিলেন কিন্তু বি এ পরীক্ষা দেননি। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘দৈনিক নবযুগে’র সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫২ সালে গ্রেট বেঙ্গল লাইব্রেরিতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক-এ কাজ করেন। ১৯৫৩ তে দৈনিক ইত্তেফাকের পরপরই তিনি দৈনিক মিল্লাতের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে তার সম্পাদনায় সুবিখ্যাত জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা ‘সমকাল’ আত্মপ্রকশ করে। এই পত্রিকাকে অবলম্বন করে দেশের তরুণ সাহিত্যিকবৃন্দ খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে ‘সমকাল মুদ্রায়ণ’ ও ‘সমকাল প্রকাশনী’ হয়ে ওঠে সমকালের সম্প্রসারিত প্রতিষ্ঠান। ১৯৭০ পর্যন্ত তিনি সমকালের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট পিজি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাসত্যাগ করেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘প্রসন্ন প্রহর’ (১৯৬৫), ‘তিমিরান্তিক’ (১৯৬৫), ‘বৈরী বৃষ্টিতে’ (১৯৬৫), ‘কবিতা ১৩৭২’ (১৯৬৮), ‘বৃশ্চিক লগ্ন’ (১৯৭১)। ‘অপ্রকাশিত (মৃত্যুর পর প্রকাশিত) কবিতা ১৩৭৪’ এবং ‘বাংলা ছাড়ো’।
কবি সিকানদার আবু জাফর একজন রাজনীতি সচেতন কবি। আমরা তাঁর কবিতায় সে দৃঢ়তাই দেখি। তিনি শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, তিনি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও অসাধারণ অবদান রেখেছেন। পাকিস্তান আমলে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিল্পীদের অধিকার আদায়ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন এমনকি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন, কেননা তিনি ছিলেন সংস্কৃতিকর্মীদের অকৃত্রিম সহচর। তাই তাঁর লেখা সবকিছুর সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে ছিল। তাঁর সম্পাদনায় সে সময়ের সাহিত্য পত্রিকা ‘সমকাল’ বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। ‘সমকাল’ রাতারাতি দেশের শ্রেষ্ঠতম পত্রিকায় পরিণত হয়েছিল, এর উন্নতরুচি, বৈশ্বিকবোধ, বিচিত্র রচনা বৈচিত্র্য ও অনবদ্য রচনা সম্ভার এবং দেশের শ্রেষ্ঠ নবীন, প্রবীণ লেখকদের অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটানোর কারণে। সমকাল কবির ইচ্ছাশক্তির রূপায়ণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাঙালির সংস্কৃতির মুক্তি আন্দোলনে এদেশে যে একজন ব্যক্তির শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় তাঁদের মধ্যে সিকানদার আবু জাফর নিঃসন্দেহে একজন। আমরা তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রসন্ন প্রহর’-এ সে ইঙ্গিত পাই। এ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত তাঁর সব কবিতাই ১৯৫৩-১৯৫৪ সালে রচনা। আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে ভাষা আন্দোলনের এ দেশের জনতার আত্মাহুতি কোনদিনই বৃথা যাবার নয়, কবির কাব্যভাষায় তা সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত।
রাজপথে যত রক্ত ঝরেছে আজ
শুনেছ কি পেতে কান?
রক্ত-বীজের মৃত্যু-আর্তনাদে
মুক্তি সেনার দুর্বার অভিযান।
[রক্তাক্ত রাজপথ, প্রসন্ন প্রহর]
তরল রক্ত জমাট বেঁধেছে
পাথর হয়েছে আজ
বিস্ময়ে শঙ্কায়।
ইতিহাস-খ্যাত নরখাদকের দল
এ-দস্যুদের নির্মমতার কাছে
মেনে গেল পরাজয়।
[এই রক্তের দাগ, প্রসন্ন প্রহর]
‘সমকাল’ পত্রিকা সম্পর্কে সিকানদার আবু জাফর বলেন, ‘তবে রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সমালোচনা করে একটা সুস্থ ও সুচিন্তিত গতিপথ করার ইচ্ছে আমার অবশ্যই ছিল।’ তিনি প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় সম্পাদকীয়তে লিখেন, ‘সমকাল যাতে করে ব্যাপক সংখ্যক পাঠকের সাংস্কৃতিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে সে ব্যাপারে সে দিকটায় আমরা বিশেষ লক্ষ্য রাখতে পারবো বলেই আশা রাখি। আমাদের কোন দল নেই কাজেই আমাদের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ দলনিরেপেক্ষ হবে।’ কবি যে সময়টার কথা বলছেন তখন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রিক সত্তায় মুসলমান মধ্যবিত্তের দ্রুত বিকাশ ঘটছিল এই ভূখণ্ডে। এবং সে সময়ে আমাদের সাহিত্য প্রধানত এই নতুন মধ্যবিত্ত সমাজেরই শৈল্পিক অভিব্যক্তি ছিল। পাশাপাশি কবির ছিল ক্ষয়িষ্ণু ইংরেজ আমলের সীমাবদ্ধ সুযোগের অভিজ্ঞতা। তিনি দেখেছেন দেশভাগ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, দুর্ভিক্ষ ও ঔপনিবেশিক শাসন। এবং সর্বদা সে শাসন থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন তাঁর মূল্যবান লেখনী দিয়ে। সমাজ ও ধর্মের অনুশাসনে তিনি ভীত ছিলেন না। একটি স্বাধীন সর্বভৌম দেশের জন্য, শোষণের বিরুদ্ধাচরণ করে কবি অগ্নিঝরা গান, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সংগ্রাম চলবেই তেমনই একটি গান এবং কবিতা।
জনতার সংগ্রাম চলবেই
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।
হতমানে অপমানে, নয় সুখ সম্মানে
বাঁচবার অধিকার কাড়তে
দাস্যের নির্মোক ছাড়তে
অগণিত মানুষের প্রাণপণ যুদ্ধ
চলবেই, চলবেই,
আমাদের সংগ্রাম চলবেই
[সংগ্রাম চলবেই, কবিতা ১৩৭২]
যুদ্ধকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে কবি ঢাকা থেকে ‘অভিযোগ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। যার মূল বক্তব্য ছিল হানাদার পাকবাহিনীকে ও তাদের দোসরদেরকে অভিযুক্ত করা ও তরুণ সম্প্রদায়কে যুদ্ধের ডাক দিয়ে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে দুর্জয় সাহসী ভূমিকা পালন করেন। বলা যায় প্রগাঢ় দেশপ্রেম ও দুঃসাহসিক মনোবৃত্তির চূড়ান্তরূপ আমরা অবলোকন করি তাঁর সাহিত্য ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে। আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আপসহীন ছিলেন। তিনি ছিলেন সংগ্রামের নির্ভীক এক সৈনিক। তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে ‘প্রসন্ন প্রহর’, ‘বৈরী বৃষ্টিতে’ ও ‘তিমিরান্তিক’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে, যদিও কবিতাগুলোর রচনা কাল ১৯৩৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত। তিনি ব্রিটিশ শাসন থেকে বাংলাদেশের শাসন মোট তিনটি রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড অবলোকেন করেছেন। সাথে উপলব্ধি করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও ভয়াবহরূপ। ব্রিটিশবিরোধী ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের চিত্র পাই ‘প্রসন্ন প্রহর’ থেকে শুরু করে তাঁর প্রতিটি কাব্যের ভিন্ন ভিন্ন পঙ্ক্তিমালায়। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ছিল দেশভাগ ও ধর্মভিত্তিক স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন- ২১ শে ফেব্রুয়ারি, স্বৈরশাসক-সামরিক শাসন, স্বাধিকার আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা-উত্তর সমাজচিত্র। ‘চতুর্দিকে তার/ জমাট রক্তের পুরু অচ্ছাদন।/ পরিচয়হীন ফলকে লিপিবদ্ধ/ ‘২১শে ফেব্রুয়ারি। [একুশে ফেব্রুয়ারি, তিমিরান্তিক]। যদিও রাষ্ট্র, সমাজ, দেশাত্মবোধ ও প্রেম বিষয়ক কবিতা রয়েছে প্রসন্ন প্রহর কাব্যে। ‘এখানে হ’ল না কালো রাত্রির শেষ/ সূর্যের পথে মহানিশা দিল হানা,/ হে পাখী আমার নতুন সুরের দেশ/ ভাসাও আবার তোমার ক্লান্ত ডানা।
[আর কোন দেশে, প্রসন্ন প্রহর]
ধ্বংসের রাজ পেয়েছে রাজ্যভার
বিশ্বমানবতার
দিক-দিগন্তে একি ক্ষমাহীন আকুণ্ঠ ব্যভিচার
স্তব্ধ কৌতূহলে
অতীত যুগের পাতা ছিঁড়ে একে একে
ভাসাই তিক্ত বিস্মরণীর জলে
[ফাল্গুন হত গান, প্রসন্ন প্রহর-০২]
অথবা
আগামী দিনের কবি গাথায় কথায়
সঙ্গীতে জাগিয়ো রেখো সে দুঃসহ ব্যথ্
াআগামী কালের শিল্পী শোণিত স্বাক্ষরে
হৃদয়ের প্রেক্ষাপটে এঁকো সেই কথা।
[সেই রাত্রি, প্রসন্ন প্রহর : ০৫]
তৎকালীন সমাজের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষের কবলে জন-জীবন, স্বদেশি আন্দোলন-সংগ্রাম, দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবর্তন এসবের এক বিক্ষুদ্ধ যুগের প্রতিনিধি ছিলেন কবি সে সময়কার হতাশা নৈরাজের ওপর তিনি নির্ভরশীল ছিলেন না। সর্বদা সংগ্রামের মধ্যেই তিনি জীবন-সত্যের সন্ধানে ছিলেন। সংগ্রামী চেতনাই তাঁর কাব্যকে ধাবমান রেখে মহিমান্বিত করে তুলেছে। তাঁর কবিতায় বলিষ্ঠ বক্তব্য, সরাসরি উপস্থাপনা জীবনস্পর্শী বাক্য পাঠকদের সহজেই আকৃষ্ট করে। নতুন রাষ্ট্রের নানা ধরনের অসংগতি ও অভিক্ষেপ দেখে কবির অসন্তোষ এবং এর থেকে পরিত্রাণের সামাজিক আশা, আশ্বাসের, আভাস মূর্ত হয়ে উঠেছে বারবার তাঁর কবিতায়।
পৃথিবীর সমগ্র সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধেই কবি কথা বলেছেন। সিকানদার আবু জাফর উচ্চকণ্ঠ কবি। সবকিছু পূর্ণচক্ষে দেখেন এবং যা বলেছেন তা পূর্ণকণ্ঠে বলেছেন। তিনি কখনোই সম্পূর্ণ আবেগের বর্শবর্তী হয়ে পরিচালিত হননি। চল্লিশের একজন মুসলিম কবির মধ্যে যা দেখা যায়নি। সেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী চেতনা সর্ব জাগ্রত রেখেছিলেন তিনি তাঁর কবিতায়। এবং তা বিশ্বস্ততার সাথে সে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। কবিতায় তিনি সর্বহারাদের কথা বলেছেন। নিঃস্ব মানুষের হতাশার কথা বলেছেন শোষিতের ভাষারূপ যেন তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতা ছিল সাম্যবাদের পক্ষে সুতীক্ষ্ণ ক্ষুরধার।
রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয় কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাঁপি
আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি
তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া
তুমি বাংলা ছাড়ো।…
আজকে যখন খুঁড়তে গিয়ে নিজের কবরখানা
আপন খুলির কোদাল দেখে সর্বনাশা বজ্র দিয়ে গড়া
কাজ কি দ্বিধায় বিষন্নতায় বন্দী রেখে ঘৃণার অগ্নিগিরি
আমার বুকেই ফিরিয়ে নেব ক্ষীপ্ত বাঘের থাবা
তুমি আমার জলস্থলের মাদুর থেকে নামো
তুমি বাংলা ছাড়ো।
[বাংলা ছাড়ো]
জনজীবনের নীতিহীনতা দেখেও কবি আশাহীন ছিলেন না। সমাজজীবনের অসংগতি, সুবিধাভোগীদের লোলুপতা, সমসাময়িক ঘটনাগুলো তাঁর কবিতায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সঙ্গে উঠে এসেছে। তিনি যেমন ভাষাশহীদদের নিয়ে লিখেছেন তেমনি একুশের হত্যাকাণ্ডের সাথে অবিভক্ত ভারতের সমস্ত হত্যাকাণ্ডকে তিনি স্মরণ করেছেন। এখানেই কবির বিশাল বিন্যস্ত ভূমি হয়ে ওঠে কবিতার চারণ ভূমি। সমসাময়িক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্ব, গ্লানি হতাশা, মানুষের দুঃখ ক্লেশ, ধনী-দরিদ্রদের বৈষম্য উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। এতে তার বিশাল আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে সর্বদাই কবির কবিতার শেকড় স্বদেশেই গ্রোথিত ছিল।
বৃহৎ জনগণের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ সহানুভূতির ধারাবাহিকতার স্বরূপ পরবর্তী কাব্যধারাকে সমভাবে প্রতীয়মান রেখেছে। কবি সর্বদা থেকেছেন দেশজ পটভূমির প্রতি সদাজাগ্রত।
আমার জবাব পেলাম।
তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি কিনা?
না!
আমরা যে সমাজের জীব
তারই ধারায় তুমি ভাসমান তৃণ।
ইতিহাস পরিবর্তনের দিন এলে
হৃদয় নিয়ে তুমি খেলবে না,
আমি জানি।
[গতানুগতিক, তিমিরান্তিক]
সমকালীন সব বিষয়গুলি কবি তাঁর কবিতায়, গানে ও প্রবন্ধে, এমনকি তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। তবে শিল্পের প্রায়োগিক প্রকাশভঙ্গির চেয়ে কবি সমাজ সচেতনতায় বেশি মনোনিবেশ করেছেন। তাই তাঁর কবিতায় আধুনিকতা স্পষ্টরূপ পায়নি কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন-
তিনি তাঁর সমকালের সমস্ত আধুনিকতার পথিকৃৎ ছিলেন এবং আমাদের আধুনিক রুচি গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি যে গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন তা কখনোই ভুলে যেতে পারবো না। এ ঋণ স্বীকার করে বলতে হয়- তাঁর কবিতায় কিন্তু এই অধুনিকতা ছায়াপাত করেনি। কিন্তু তবু কেবল উপলব্ধির শক্তিতে তিনি সটান ছিলেন, বিশিষ্ট ছিলেন এবং শেষের দিককার কবিতায় আমরা লক্ষ্য করি তিনি ক্রমশ স্যাটায়ারের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন [আবু হেনা মোস্তফা কামাল, স্মরণ সংখ্যা’৯০]।
পঞ্চাশের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ বলেন, ‘আমি মনে করি ‘বাংলা ছাড়ো’ আমাদের সাহিত্যে সম্ভাবনাময় রোমান্টিক রচনাধারার আলোকবর্তিকা রূপে বহুকাল পর্যন্ত অনির্বাণ হয়ে থাকবে। আঙ্গিকের সরলতা ও ভাষার সহজবোধ্যতা যেভাবে কবি এই বইয়ে উত্থাপন করেছেন সম্ভবত অতীতে তা তিনি কোনদিন কল্পনা করেননি। যেন অলৌকিক সার্থকতায় উজ্জীবিত হয়ে কবি এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন।’ [আল মাহমুদ, স্মরণ সংখ্যা’৯০]। তিনি কবির পাশাপাশি সংগঠক ছিলেন তবে তার সাংগঠনিক শক্তির বিচারিক মানদণ্ড ছিল শিল্পবোধে উত্তীর্ণ পদক্ষেপ।