অনেক ভেবে শেষমেশ সিদ্ধান্তটি নিলেন ড. মিরা। জীবনের চরম এ পথটি বেছে নিবে কি নিবে না তা নিয়ে বেশ কয়েকটি দিন ধরেই নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করেন। একবার ধরে নেন-বাদ দিই সব কিছু। দিন কেটে যাক। প্রাকৃতিক নিয়মেই তো দিন-রাত্রির পর্যায়ক্রমিক আবর্তন ঘটছে। রুটিন মাফিক ভোর হয়। অফিস, বাচ্চাদের স্কুল-কলেজ। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। পরিবারের প্রতি চরম উদাসীন বাদলের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন। সন্ধ্যার চা-নাশতা। রান্না-বান্না। টিভি দেখা। পরদিনের অফিস কার্যাদি চিন্তা করে মানসিক প্রস্তুতি নেয়া। সবাইকে নিয়ে রাতের খাবার শেষ করা। ঘড়ির কাঁটার মতোই যেন দিন এবং দিনের নিয়মিত কাজগুলো ঘুরে ঘুরে আসে।
ড. মিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি আত্মহত্যা করবেন। সময়টাও ঠিক করে নিয়েছেন। রাত তিনটা এক মিনিটে। আজ শনিবার। মিরা মায়ের কাছে শুনেছিলেন তার জন্ম হয়েছিল শনিবার রাত তিনটা এক মিনিটে। তাই জন্ম মুহূর্তের সময়টি আত্মহত্যার জন্য যুতসই মনে হলো মিরার। দড়িতে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন একবার। পরক্ষণে সিদ্ধান্ত বাতিল করে ডিসপেন্সারি থেকে ইনজেক্শন আর বিষ নিয়ে এলেন। ইনজেকশন ইনসুলিনের মতো পুশ করলেই সব লেটা চুকে যাবে।
একজন আইনজীবী ডেকে ছেলে-মেয়ের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের কর্মটিও শেষ করে রাখলেন। গত সপ্তাহে ছোটবোন ইরার বাসায় গিয়ে তিনদিন থেকে এলেন। ইরার বাসা মিরপুর ডিওএইচএস-এ। ইরার স্বামী বড় ব্যবসায়ী। কখন দেশে থাকেন, আর কখন দেশের বাইরে তা কেউ খুব সহজে জানতে পারে না। এবারও দেশে ছিলেন না মাহফুজুর রহমান। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ইরার সংসার। বিয়ে হয়েছে ছ’বছর হলো। এই ছ’বছরে এক রাতের জন্যও ইরার বাসায় গিয়ে থাকেনি মিরা। কিন্তু এবার হঠাৎ করে গিয়ে তিন দিন থাকাতে বেশ অবাক হলো ইরা ও মাহফুজুর রহমান। বিদেশে থেকেও বারবার খোঁজ খবর নিলেন। আতিথেয়তার যেন কোনো ত্রুটি না হয়। ফেরার সময় ইরাকে খুব করে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন মিরা। ওতেই কেমন একটা খটকা লেগেছিল ইরার। মিরার চোখে জল এসেছিল। একমাত্র ছোট বোন ইরা। মা নেই। চলে গেলেন গত বছর। আর বাবা সে তো ইরার বিয়ের পরপরই চলে গেলেন।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ইস্কাটনের ‘ছায়াবিথী’ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সপ্তম তলার দক্ষিণের বারান্দার ইজি চেয়ারে পা মেলে বসে আছেন ড. মিরা। ছেলে সীমান্ত কলেজে আর মেয়ে ধ্রুপদী স্কুল থেকে ফিরে নিজেই খাবার নিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
বোশেখের পড়ন্ত বিকেলের পাতা ওড়ানো বাতাস ড. মিরার বারান্দায়ও দোল দিয়ে যাচ্ছে। আনমনা মিরার স্মৃতির মানসপটে ভেসে উঠল তার ভালোবাসার মানুষ মুহাইমিনের চেহারাটা। কত ইনোসেন্ট মনে হতো তাকে। সেটি স্কুল জীবনেরই কথা। মিরা অষ্টম শ্রেণিতে ভালো রেজাল্ট করেই নবম শ্রেণিতে। বাবা শফিউল আলম মিরাকে ব্যাচে পড়ার জন্য একজন শিক্ষকের কাছে পাঠালেন। মহল্লার বিভিন্ন নামকরা স্কুলের অনেক ছেলেমেয়েরাই তাঁর কাছে পড়ে। মিরার কয়েকজন বান্ধবীও পড়তো সেখানে। মুহাইমিন কোনো স্কুল অথবা কলেজ শিক্ষক ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন আর পড়ার ফাঁকে বাসায় ব্যাচ পড়াতেন।
পড়তে গিয়ে প্রথম দিনেই মিরার বুক কেঁপে ওঠে। মুহাইমিনের চোখে চোখ রেখে কথা বলতেই কেমন যেন একটি প্রাকৃতিক দোলা লেগে যায় মিরার মনে ও দেহে। সবচেয়ে বেশি চোখে আটকে থাকে মুহাইমিনের মুখের হাসি। সিøম দু’টি ঠোঁট মেলে যে একজন মানুষ এত সুন্দর হাসতে পারে তা মিরা প্রথম দেখল। তারপর সপ্তাহে তিনদিন নিয়মিত পাঠ নেয়া। ব্যাচে আসা। পড়ার ফাঁকে, আড়চোখে দেখে নেয়া। কখনো কখনো নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এসে পড়া। মাকে রাজি করিয়ে পুডিং, পায়েস, আচারসহ নানান পদের খাবার নিয়ে আসা। মুহাইমিনের বিব্রত চেহারা, সংকোচভাব দেখে বেশ মজা পেত মিরা। মুহাইমিন মিরার দুর্বলতা বুঝত। তারপরও নিরুত্তাপ থাকত। মুহাইমিনের নির্লিপ্ততা দেখে মাঝে মাঝে রেগে যেত মিরা।
অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। মিরার মায়ের আমন্ত্রণে বেশ কয়েকবার ওদের বাসায় যাওয়া-আসা হয় মুহাইমিনের। বিশেষ কোনো দিনে খাবারের আয়োজন হলে প্রথম অতিথি হিসেবে মুহাইমিন থাকবেই। মিরার বাবা শফিউল আলম ও মা সানোয়ারা বেগমেরও মুহাইমিনকে খুব পছন্দ। মুহাইমিনের সম্মতি হলেই তারা ভবিষ্যতের দীর্ঘ জীবনের একটি মোহনা তৈরি করে নিতো। পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং মুহাইমিনের মেলামেশা দেখে এই ভাবনাটাই তাদের মনে গেড়ে বসেছিল। ইতোমধ্যে মিরা কলেজ ডিঙিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখে। আর মুহাইমিন ভালো রেজাল্ট করলেও চাকরির দেখা পায় না। মিরার স্বপ্ন-কল্পনা, ভালোবাসা এবং নিষ্পাপ হাসির মানুষটার প্রতি ভালোলাগার জোয়ারে কখনো ভাটা পড়ে না।
মিরার আত্মবিশ্বাস দৃঢ়তর হয় যে মুহাইমিন একদিন ভালো চাকরি পাবে। দেশবরেণ্য একজন মানুষ হবে। এমন একজন মানুষের সাথে জীবনের দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়ার স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে মিরা। কিন্তু আমাদের সমাজের আর দশটি পরিবারের মতো মিরার বাবা শফিউল আলমও একজন বেকার মুহাইমিনের সাথে মিরার বিয়ে দেয়ার উচ্ছ্বাসটা দমিয়ে রাখে। এ সম্বন্ধ থেকে পিছু হটার আরো একটি বিষয় শফিউল আলম সাহেবকে তাড়িত করে। সেটি হলো মুহাইমিন ভিন্ন জেলার মানুষ। নিজ জেলার মানুষের প্রতি শফিউল আলমের দুর্বলতা প্রবীণ। ইতোমধ্যে মিরার জন্য অনেক প্রস্তাব আসে। কোথাও সায় দেয় না মিরা। মা সানোয়ারা বেগমেরও মুহাইমিনকে পছন্দ। কিন্তু শফিউল আলমের মুখের ওপর কিছু বলার দুঃসাহস এ সমাজের মতোই নেই। তবে একদিন মুহাইমিনকে ডাকে মিরার মা সানোয়ারা বেগম। শফিউল আলম সাহেব অফিসের কাজেই দেশের বাইরে গিয়েছিলেন। এ কথাগুলো ভাবতে মিরার চোখ জলে ভিজে যায়। মায়ের বেনারশি শাড়িটা পড়েছিল মিরা। তেমন কোনো প্রসাধনী দিয়ে সাজতে ভালো লাগে না মিরার। তাই কপালের মাঝখানে ছোট্ট একটি টিপ দিয়েই সাজার কাজটা শেষ করেছিল।
মুহাইমিন আসে। মিরার ছোট বোন ইরা দরজা খোলে। ও সেভেনে পড়ে। মুহাইমিন ও ইরার মিথস্ক্রিয়ার বিষয়টিও জানত। তাই একটা মুচকি হাসি দিয়েই পাশের ঘরে চলে গিয়েছিল ইরা। বেনারসি শাড়িতে মিরাকে দেখে চমকে যায় মুহাইমিন। বসা থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারে না। বাতাসে দরজায় ঝোলানো পর্দা, পেরেকে টাঙানো ক্যালেন্ডার ওঠা-নামা করছে। পর্দার ফাঁকে নিশ্চিত ইরা উঁকি মারছে তা মুহাইমিনের মনে ফিসফিসানির মতো বলে দেয় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। মুহাইমিন হাত বাড়াতে গিয়েও দমিয়ে রাখে। বেনারসিতে অপরূপা মিরাকে ছুঁতে চেয়েও পারে না।
কথার পিঠে কথা হয়। মিরা-মুহাইমিনের কথার সিলেবাস নির্দিষ্ট থাকে না। নাশতার ট্রে হাতে পর্দা ঠেলে ঘরে ঢোকে ইরা। মুহাইমিনের হাতে এটা-ওটা তুলে দেয়। তেমন একটা খেতে চায় না মুহাইমিন। ইরা মুহাইমিনের মুখের ওপর বলে- এটা খান না ওটা খান না, তো আপনি খান কি? এ কথা বলেই ইরা ও মিরা হাসতে থাকে। মুহাইমিন ওদের হাসার কারণ বুঝতে পারে না। বিব্রত মুহাইমিন মিরার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসি মুখে রেখেই মিরা বলে আপনি বুঝতে পারেননি ইরা কী বলেছে?
না।
বলেছে, আপনি খান- কি?
তিনজনেই হুঁ হুঁ করে হাসিতে ফেটে পড়ে।
পর্দা ঠেলে ঘরে ঢোকে মিরার মা সানোয়ারা বেগম। বলে মিরা, ইরা তোরা ও ঘরে যা। আমি মুহাইমিনের সাথে একটু কথা বলি। সানোয়ারা বেগম কোনো ধরনের ভণিতা না করেই আসল কথা পেড়ে বসলেন।
মিরার বিষয়টা তো তুমি জানো বাবা!
জি আন্টি।
বেশ কয়েকটা প্রস্তাব আমরা নানান ছুতায় না করে দিয়েছি। কিন্তু ওর বাবা তো উঠে পড়ে লেগেছেন। এ যাত্রা মনে হয় আর রক্ষা করা যাবে না। তুমি কিছু একটা করো। তোমাকে আমার নিজের ছেলের মতো জেনেই কথাটা বললাম। প্রয়োজনে তুমি তোমার পরিবারের সাথেই কথা বলতে পারো।
দরজার বাইরে পর্দার ফাঁকে মিরা। মুহাইমিন মাথা নিচু তটস্থ। মিরা ভাবছে মুহাইমিন তো কোনোদিন তাকে প্রেম নিবেদন করেনি। এমনকি ‘ভালোবাসি’ কথাটাও বলেনি তাহলে…। মিরার ভেতরটা কাঁপছে। যদি মুহাইমিন না করে দেয়।
সানোয়ারা বেগমের কথার কোনো উত্তর দেয়নি মুহাইমিন।
সেদিন রাতের খাবার এক সাথেই খেয়েছিল। তারপর মিরার সাথে বেশি কথা হয়নি মুহাইমিনের। ফিরে গিয়েছিল তার ব্যাচেলর ঘরে।
তারপর!
তারপর কী ঘটেছিল সে প্রশ্ন আমাদের।
মিরা ও মুহাইমিনের দূরত্ব দিন দিন বেড়ে গিয়েছিল। প্রতিটি ক্ষণ অন্তঃদহনে ক্ষয়ে ক্ষয়ে হৃদয়হীন রক্তমাংসের মানুষে পরিণত হয় মিরা। বাবা শফিউল আলমের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় মিরাকে। স্বামী বাদল। একজন এনজিও কর্মী। সামাজিক রীতিনীতিতেই বিয়ে হয়। দেয়া-নেয়া দেনমোহর সব। কিন্তু শ্যামলা গড়নের সবলদেহী সরু গোফওয়ালা এনজিও কর্মী বাদলকে মিরার মোটেই পছন্দ হয় না। তারপরও কবুল বলতে হয়। গ্রহণ করতে হয়। নিরুপায় হয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েই গ্রহণ করতে হয় বাদলকে। ভেতরে কোনো উত্তেজনা আবেগ, প্রেম অথবা নিজ থেকে কোনো কিছু দেয়ার আগ্রহ জাগে না। নিজের জীবনে অপ্রত্যাশিত এই রক্ষা কবজ মেনে নিয়ে মিরা ভাবতে থাকে আমাদের সমাজের প্রায় নব্বই ভাগ মেয়ে নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র সামাজিকতার জন্য, বিয়ে নামক মালাটি গলায় পরে সংসার নামক কতগুলো মানুষ নামের প্রাণীর সাথে একই সাথে বসবাস করছে। যেখানে ভালোবাসা ও ভালোলাগার বিষয়টি প্রাধান্য না পেলেও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ তারা এড়িয়ে যেতে পারে না। নিরুপায় হয়েই করতে হয়।
আর ঐ যে বলা হচ্ছিল ‘সামাজিকতা’ এই অস্পৃশ্য বস্তুটির কারণেই মিরাকে দু’টি বাচ্চা নিতে হয়েছে। সমাজের চোখে মিরার এখন সুখী পরিবার। এনজিও কর্মী স্বামীর বাড়ি ফেরার সময়-অসময় নেই। নিজের মতোই থাকেন।
ইতোমধ্যে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন নামকরা থানা নির্বাহী কর্মকর্তা হয়েছেন মিরা। ছাপোষা বাদলের পদোন্নতি এনজিওতে থেমে আছে। স্ত্রী বড় পদে চাকরি হওয়াতে স্বামীর সাথে দূরত্ব দীর্ঘতর হয়। বাদল বাসার তেমন খরচও দিতে চায় না। অনেক সময় কাজের কথায় দু-চার দিন বাসার বাইরেও থাকে।
ড. মিরার একটি সংসার আছে। এটি সমাজের চোখে বড় স্বাভাবিকতা। কিন্তু সংসারটি কেমন আছে, এ খবর সমাজের অনেকেই জানে না। হয়তো কেউ জানতেও চায় না। সবকিছু গড়পড়তাভাবে চললেও ড. মিরা যে কারণে আত্মহত্যা করতে চায় সেটা জানার চেষ্টা করা যাক।
আজ রাত তিনটা এক মিনিটে ড. মিরা আত্মহত্যা করবে। সব প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন। চল্লিশ বছর পেরুনো এটুকু জীবনের পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব কষে কিছুই মেলাতে পারে না মিরা। বাদলের সাথে কাটানো সময়টা পরীক্ষার মূল খাতার সাথে স্টেপলারে সাঁটানো একটি অতিরিক্ত পাতার মতোই মনে হয়। যা না হলেও জীবন দিব্যি চলে যেত। জীবনের সাথে সেঁটে থেকেও মানিয়ে নেয়ার মতো চলে যাচ্ছিল। কিন্তু মিরার মনটা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে যখন জানতে পারল বাদল অন্যকারো সাথে বেশ ভালো সময় কাটাচ্ছে। এবং বিশ্বস্তসূত্রে খবরটি জানার পর মুহাইমিনের কথা খুব মনে পড়ে। মুহাইমিন এখন সরকারের প্রথম শ্রেণীর অফিসার। তার নিজের ঘর-সংসার, পরিজন অনেক কিছুই হয়েছে। সে সংসারের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হওয়ার স্বপ্ন ছিল মিরার। কিন্তু কিছুই হলো না।
আর এদিকে যাকে সামাজিক সাইনবোর্ড রেখে সমাজের মুখ বন্ধ করে রেখেছিল সেই বাদলও পরনারী-পরঘরে আসক্ত হয়ে পড়েছে। টেনে নেয়া জীবনটাকে বেশ পানসে এবং অসহ্য মনে হয় মিরার। সবচেয়ে বেশি তাকে বিষিয়ে তুলেছে বাদলের অকথ্য যাচ্ছে তাই ব্যবহার।
রাত একটা পেরিয়ে। তিনটা এক মিনিটে মিরা তার নিজের শরীরে ইনজেকশন পুশ করে আত্মহত্যা করবে। তন্দ্রাভাব থাকার জন্য আগেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিয়েছে। বাদল সাহেবÑমিরার স্বামী আজও বাসায় নেই। প্রায় শুক্রবার-শনিবার তিনি বাসায় থাকেন না। কোথায় যান, কোথায় রাত কাটান তা মিরার বেশ জানা আছে। তাই প্রতিবাদ করে সংসারে অশান্তি বাড়াতে চান না। তবে মিরা অনেক চেষ্টা করেছে মানিয়ে নেয়ার। বাদলের কথামতোই সবকিছু করার। সংসারের খুঁটিনাটি সবকিছুতে বাদলের মতটাই প্রাধান্য পায়। তাই বলে হৃদয়ের ভালোবাসা জড়িয়ে মাখামাখি করতে পারে না মিরা। ওটা ভেতর থেকে আসে না। ভেতর থেকে বুদবুদটা না এলে কাহাতক অভিনয় দিয়ে চালিয়ে নেয়া যায়? মিরা নিজেকেই প্রশ্ন করে। যে প্রশ্নের উত্তর মিরার জানা নেই।
বাতি নিভিয়ে দেয় মিরা। জানালার পর্দা কিছুটা সরানো। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘরে উঁকি দিয়ে আলো ছড়াচ্ছে। ছেলে-মেয়ে পাশের ঘরে। দেয়ালে বালিশ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে শুলো মিরা। বিছানার পাশে টুলস বক্সের ওপর বিষভর্তি ইনজেকশনের সিরিঞ্জ। ঘুমের ওষুধে তন্দ্রাচ্ছন্ন মিরা চোখ বন্ধ করে রাত তিনটা বাজার অপেক্ষা করছেন। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলে রাত তিনটার অ্যালার্মও দিয়ে রেখেছেন। পাছে যদি ঘুমিয়ে পড়েন। তাহলে তো সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে।
চোখ বন্ধ করে মিরা আত্মহত্যার কথা ভাবছে। হঠাৎ রোকেয়া হলের অরুনিমার মূর্তিটা মিরার সামনে অন্ধকারে আবছায়ার মতো ভেসে উঠল। রোকেয়া হলের পঁয়ত্রিশ নম্বর কক্ষে ওরা চারজন থাকত। অরুনিমা, শায়লা, কামরুন ও মিরা। লোক প্রশাসনে পড়ত অরুনিমা। বেশ সুন্দরী ছিল। মায়াবী চোখ, চোখা নাক আর লম্বা পিঠ ঢাকা চুল দেখে অনেক মেয়েই অরুনিমার প্রেমে পড়ে যেত। তবে অরুনিমার সাথে ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই কাজলের জমিয়ে সম্পর্ক চলছিল। এমন কখনো শুনিনি ওদের মধ্যে রাগ-অভিমান বা মনোমালিন্য হয়েছিল। কিন্তু সেই অরুনিমা একদিন আমাদের হলের কক্ষেই ফ্যানের সাথে ওড়না প্যাঁচিয়ে আত্মহত্যা করল। হলের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা-পরিচিতদের কেউ বিশ্বাস করতে পারল না কেন অরুনিমা আত্মহত্যা করল।
লম্বা চুলে পিঠ ঢাকা সুন্দরী অরুনিমা এই অন্ধকার আলো-ছায়ায় মিরার ঘরে হাজির। মিরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তন্দ্রাজড়ানো কণ্ঠে অরুনিমার সাথে কথা বলছে মিরা।
মিরা! অস্বাভাবিক অরুনিমার কণ্ঠস্বর।
হুঁ।
তুমি কি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছো?
হুঁ।
এখন রাত দুইটা ত্রিশ মিনিট। তোমার আত্মহত্যা করার আরও একত্রিশ মিনিট বাকি।
হুঁ। মিরা দেখতে পাচ্ছে রোকেয়া হলের পঁয়ত্রিশ নম্বর কক্ষের সিলিংয়ের সাথে ঝুলে আছে অরুনিমা। ঘাড় একদিকে বাঁকানো। জিহ্বা খানিকটা বেরিয়ে আছে।
মিরা! হঠাৎ অরুনিমার জড়ানো ডাকে চমকে ওঠে মিরা।
কাজলের কথা মনে আছে তোমার?
হুঁ।
কাজল-নিরূপমার জমানো সংসার চলছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ওদের বেশ সুখের দিন কাটছে। আমি কাজলের জীবন থেকে এ রকম হঠাৎ করেই সরে গেলাম। আমার তো কোনো পিছুটান ছিল না। কিন্তু তুমি! থামে অরুনিমার ছায়া থেকে ভেসে আসা কণ্ঠ।
পুনরায় অরুনিমার কণ্ঠ- তোমার ছেলে-মেয়ে। মিরা চিৎকার দিয়ে ওঠে- মুহাইমিন! মুহাইমিন!
মুহাইমিনের নাম জপতে জপতেই চোখ বুজে আসে মিরার। অরুনিমার ছায়া বিলীন হলেও কণ্ঠে শোনা যায়- শুধু একটু নিঃস্বার্থ কাছে পাওয়া, আশ্রয়, অর্পণ-বিসর্জনের নিমিত্তে যুগে যুগে ফিরে আসে ভালোবাসা।