পাথর প্রেমিক
নাক্ষত্রিক অন্ধকারে স্ববিরোধী ক্ষোভে আমি নেই
বিবসনা বাতাসের ঘূর্ণিপাকে আমি নেই। আমি
আলোতে ছিলাম। আমি অরণ্যের চঞ্চল হরিণ হয়ে
হিংস্র বাঘের চোখে আতঙ্কিত নজরে ছিলাম। আমি
বস্ত্রাবৃত শরীরে সজ্জিত সৌন্দর্যর
ছিলাম অপরাজিত প্রতিযোগী দুঃখ হরণের।
আমাকে খুঁজবে কেনো তুমি তপ্ত মরুপ্রান্তে, এই
আমাকে খুঁজবে কেনো আবেগের গহ্বরে, কেনোনা
আমি অপমৃত্যুকে লঙ্ঘন করেই পৌরাণিক পৃথিবী পাই
এবং আমাকে আমি বারবার পার করি ভাঙা সেতু
লুপ্ত হই তোমার মাঝে তোমার ভাবনালোকে। আমি
তোমার বন্ধনে বাধা। তপ্তরোদে-ফাগুনে শ্রাবণে
আমৃত্যু তোমার সঙ্গে। আমি নেই-তুমি আমার
প্রতিধ্বনি। আমি পাথর প্রেমিক, গতিশীল হরিণ কাল
পার হয়ে অবিরাম একান্তে নিশ্চুপ।
আকাশ আমার নয়, নীল নয়, নক্ষত্র নয়
তোমাকে আমি দিয়েছি ওই আকাশ, অরণ্য আর দিয়েছি সবুজ
দিগন্ত প্রভাত। পুষ্প নয়, গন্ধ নয়, চন্দ্রিমা আমার নয়,
তবু ফুল আর অলীর উৎসবে আমি দিয়েছি তোমাকে
দিয়েছি পূর্ণচন্দ্র জোস্না।
আমৃত্য তোমার সঙ্গে স্বপ্নে আছি সঙ্গমেও আছি-
আমি সঙ্গে আছি বলে সঙ্গীত সন্ধায় বাজে করতালি
সঙ্গে আছি সামনে আছি তাই রুদ্ধ উৎসবে পৃথিবী
আজো নেচে ওঠে ।
আকুলতা আমাকে ছোঁবে না, বিয়াদে পাবে না
তোমার ঘরেই দেখো বধির-বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছি
এবং তোমার প্রতিযোগী আমিই-এ সত্য
যদি জানো, জানবে কোথায় কেমন আছি।
পৃথিবীর পান্থপথে
আমি বিংশ শতাব্দীর সমান বয়সী-জন্মাবধি স্নায়ুযুদ্ধে
সংঘাত সংঘর্ষে কেটে গেছে কতকাল। মৃগতৃষা নিবারণে
অসমর্থ বলে আমি মনুষ্য ধর্মের স্তবে আজো নিরুত্তর
অবিশ্বাসী ভবিষ্যের অভিব্যক্তি বাদে আমি অতীত বিমুখ।
অতঃপর বহুবার আত্মোপলব্ধির অভাব লুকিয়ে রেখে
সর্বনাশা হাহুতাশ বিবর্জিত স্বপ্ন রচনাকে জলাঞ্জলি
দিয়ে অকাল জরায় অবরুদ্ধ এক অন্ধাবেগী শুক্র শাপে
পরিপূর্ণ মহাশূন্যে ভস্মীভূত হয়ে অভিসারে আসি ফিরে।
পৃথিবীর পান্থপথে ক্র্যাচে ভর করে ক্রমাগত হেঁটে যাই
প্রস্থানের পথচিহ্ন এঁকে যাই ধূলি ধূসরিত মরুপান্তে
পুরনো অভ্যাস দোষে মৌনের মন্ত্রণা বেমালুম ভুলে যাই
যেনো আমার আসক্তি ঘৃণ্য অভিব্যাপ্তি এই বর্তুল সংসারে।
বৃত্তভুক্ত পূর্বাপর নিপাত, উদ্ধার, অন্তহীন অভিযোগ
অনুযোগ কিছুতেই নেতির বিস্তার নেই আমার জীবনে
উপরন্তু অকারণে পুণ্য পদ্য লিখি কাগজের মর্মমূলে
যেনো এক অন্তর্যামীনে মিশে নির্বাক প্রাগ্বতী সংকেতে।
হয়তো বা নিরাকার কিংবা নির্বিকার কোনো বৃক্ষের সমাধি
তৃষিত মরুর বুকে উন্মুক্ত মনের যতো প্রার্থনাসমূহ
ধ্যানী স্বপ্নে জাগরণে কেনো মনে রাখি বাসনার কল্পতরু
যাকে কেন্দ্র করে ওই সুদূরে হারাই কেবল নিজেকে নিজে।
মায়ামৃগী তুমি কেনো বন্দিনী আমার জরাজীর্ণ গৃহকোণে
ওই স্খলিত-বসন ঊরুতে তোমার অনাদি নিশার শান্তি
ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু সুধাসঞ্চিত তোমার ওষ্ঠ-অধর চুম্বনে
যথাগতি ফিরে আসে শাশ্বত সুখের অনাবিল আলিঙ্গনে।
অমৃতের অন্বেষণে
সপ্ত সমুদ্রের জল সেচে মণি-মুক্তা খুঁজে অতৃপ্ত আত্মার-
কোথাও মেলেনি এক-বিন্দু শুদ্ধসস্তি। কোনো স্বরূপে মেলাতে
পারিনি স্বতন্ত্র সত্তা। সূর্যাস্তের মেঘে আজ নৈঃশব্দ্য ক্রন্দন।
কোনো এক দিকভ্রান্ত হরিণ শাবক আমি নিজের অজান্তে
নিজে অভয় অরণ্য হারিয়ে-খুঁজছি বিষাদের বৃক্ষছায়া।
মরু ধুধু সাহাবার আগুন-প্রান্তরে কিম্বা কোনো প্রাণহীন
পাহাড়ের পাদদেশে নুড়ি পাথরের মতো কেটেছে একাকী
গাত্রদাহে সান্ত্বনার প্রলেপ মেখেছি জন্মান্ধের অনুরাগে।
স্বর্নিমিত শবাধারে পাপের প্রসাদে কেটে গেছে দীর্ঘদিন
যেখানে দু’চোখ ভরে দেখেছি মানব সভ্যতার শুরু এবং-
শেষ রূপান্তর। লোলুপ স্বপ্নরা খুবলে খেয়েছে জীর্ণ –
পাঁজরের হৃদপিণ্ড, ক্ষয়িষ্ণু জীবন, মননের মুক্তপাঠ।
শেষান্তের গানে আজ অন্তিম প্রার্থনা-প্রাণবন্ত প্রকৃতির-
অপরূপ সৌন্দর্যের মোহবন্ধনেই প্রকৃতিতে মুগ্ধ হই
নিসর্গের মনোলোভা দৃশ্য, অফুরন্ত সবুজের সমারোহ
নীল সমুদ্রসৈকত, বৈকালী আকাশে গোধূলির রাঙামেঘ
আদিগন্ত সমুদ্রের ষোড়ষী তরঙ্গ, পাহাড়ি ঝরনার গান
অরণ্যের শ্যামালিমা, মুক্ত পাখিদের সুমধুর কলরব
বুনো বাতাসের স্পর্শে হেসে ওঠা জুঁই-জবা নিশিগন্ধা
অমৃতের অন্বেষণে নিমগ্ন প্রকৃতি আমাকে সজীব করে।
মৃত্যুক্ষুধা
এই জোস্নাস্নাত রাতে জানালার শার্সি ছুঁয়ে
বিবসনা বাতাসের লুকোচুরি। উষ্ণ উন্মাদনা-
বুকে ধরে তুমি ক্রমে মোমের মতন গলে পড়ো-
ঊরুস্পর্শী লতাগুল্মে লোকলাজে রাঙা চার চোখে
স্বপ্নমুগ্ধ কানাকানি। আদিম আগুন হয়ে গেলো
নেওয়া দেওয়া যেন সমস্ত শরীরে মৃত্যুক্ষুধা।
স্বর্গের মর্ত্যরে এক-বিন্দু ব্যবধান সনাতন-
শর্তে মৌমের নির্ঝর। মৃত্যুর মঞ্জরি শোনা যায়
অপার্থিব স্বর্গসুধা সঞ্চিত তোমার মৌন গীতে।
কতো জন্ম-জন্মান্তর নিমিশে ফুরায় নগ্ননদে
শয্যামুখী সৌন্দর্যের ক্লান্তি মুছে দিয়ে ক্রমাগত
নীলারুণ প্রহরের কামার্ত মাধুরী ঝরে পড়।
ঘৃণ্য-সংক্রামক ব্যাধি গাঢ় প্রসাধনে ঢেকে দিয়ে
বশীকরণের মন্ত্রে জীবন জলধি উবে যায়-
মহাশূন্যে। অন্ধকারে অন্ধ আদিমতা জেগে থাকে
উচ্ছ্বাসিত অভিসারে পৃথ্বীর পৃথুল কোল জুড়ে
অবিরল নবাগত নবজাতকের বোবা-কান্না
অলীক স্বর্গের দ্বারে হানা দিতে পারে বারে বারে।
পৌরাণিক প্রহসন
আমার নির্জন বাড়ি-ভেতর বাড়ির ভাঙাঘরে
বুভুক্ষ ছুছোরা সব উলঙ্গ উচ্ছ্বাসে ঢুকে যায়
যত্রতত্র মলমূত্র। ঘরের মেঝেতে বিশ্রীগন্ধ
শ্বাসরূদ্ধ পরিবেশে কেঁদে ওঠে তিক্তপ্রাণ।
এক রাতে ক্লান্ত ঘুমে বিভোর ছিলাম। অতঃপর –
ঘৃণ্য ছুছোতে ছুঁয়েছে আমার অনেক সুস্বাদের
শাহী খাবার। ভেঙেছে পূর্বপুরুষের পৌঢ়প্রথা
নষ্টকষ্টে জলাঞ্জলি দিয়েছি সংসার স্বর্গ-মর্ত্য।
বিবাগী বিরহে আজ পথের বাউল। অনুরাগী
একতারা সুরহারা বিষাদে বেসুরে বাজে একা
বন্ধুরূপী শত্রুসভা আমার চিতার আয়োজনে
চন্দন কাঠের স্তূপ সাজায়-বাজায় শঙ্খধ্বনি।
অথচ, অজ্ঞাত ওরা রাখেনি খবর-বারবার
আমি শুধু খণ্ড-মৃত্যু হজম করেই বেঁচে থাকি
পৌরাণিক প্রহসনে ক্ষয়িষ্ণু জীবন জ্বলে ওঠে
এক পূর্ণাঙ্গ মৃত্যুর মৌণ প্রতীক্ষায় আছি আজো।
অবেলায় অস্তগামী সূর্যের অন্তরে অন্ধকার-
বাসা বাঁধে। বৈকালিক ভ্রমণে দিগন্তে দিশেহারা
বসন্ত বাউরী শুধু আপন অরণ্য খুঁজে ফেরে
ক্লান্তি মাখা পালকের ঐশ্বর্যে জাগ্রত বেদনায়।