প্রজাপতিগুলো নিজে নিজে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল একের পর এক, এবং অগ্নির ওপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি অভূতপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি হতে নিজের ভেতর একটি হিরণ্ময় পরিবেশ সম্মোহনের মতো আবিষ্ট করে রাখে অনেকক্ষণ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম দৃশ্যগুলো, এবং দেখতে দেখতে আমি নিজের ভেতর প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধানুভব করলাম বাংলা সিনেমার নায়ক যখন প্রতিনায়ক নায়িকার বড়লোক বাবাকে অতীতে নায়কের উপর নির্যাতন ও কষ্টগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তগুলোর মতো। নিজের শিরা উপশিরাগুলোর মধ্যে বয়ে যাচ্ছিল আগুনের হলকার মতো প্রবহমান রক্তের স্রোত।
আহ, কী সুখানুভূতি! নিজেকে সম্রাট আকবরের চেয়ে কোন অংশে কম মনে হচ্ছিল না। বরং বড় প্রতীয়মান হয়। কেউ হলে হয়ত ভাবত, এখন মরে গেলেও শান্তি। কিন্তু সে মরতে চায় না। বর্তমান প্রতিটি মুহূর্ত সে চেখে পরখ করে নিতে চায়।
প্রতিটি মানুষ জীবনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করে, অধীর আগ্রহ নিয়ে। তার সব পরিশ্রম সেই কাক্সিক্ষত সময়টির জন্য। সেও। অগ্নির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বে উঁইপোকাগুলো কী করছিল কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি দেখছিলাম। লেপোলিয়ন সৈনিকদের মতো উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে আত্মহত্যার পূর্বে কী স্নিগ্ধ হাসি দ্যুতিময়তা টিকরে টিকরে পড়েছিল, সত্যি দেখার মতো। আহ্, কী অপূর্ব দৃশ্য! এ মৃত্যু যেন গোপন আহ্লাদ উপচে পড়া অনুভূতি, খাঁজ-কাটার হিরে খণ্ডের প্রভা: অসংখ্য মানুষ এক এক করে বাঁচি কী মরি লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে, অগ্নির গহিনে তাদের কণ্ঠ মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বে তাদের অন্তিম আর্তনাদগুলো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। দেখতে খুব আমোদ লাগছিল।
এ্যাই।
কেউ যেন ডাকলো আমাকে। পেছনে তাকালাম। এদিক ওদিক দেখলাম, কেউ নেই। প্রিয়া আসার কথা ছিল, সে ডাকছে এমত শোনা গেল। সে এখনও আসে নি, নিশ্চিত হলাম। ফের দৃশ্যগুলোর দিকে মনোনিবেশ করলাম, মন বসছিল না।
মেয়েটা যে এখন কেন আসছে না, ভেতরে ভেতরে উশখুশ বাড়ছে। বাড়তি কাজের চাপ, তাকে বলেছি, বুঝিয়ে। সাধারণত দেরি করে না। জ্যামে পড়ে নি ত!
মধ্য অপরাহ্ণ পেরিয়ে এখন বেলা পড়তির দিকে। শাহবাগে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রাস্তার ওপার একজন কবির চোখাচোখি হতে সে হাত নাড়াল। আমার কোচিংসেন্টারে এসেছিল। একটা বিজ্ঞাপনের জন্য। ইতোমধ্যে আমার অফিসে বেশ ক’বার এসেছিল। আজ বেশ ব্যস্ত, অন্যদিন আসেন। অন্যদিন আসলে অনুরোধ স্বরে বললাম, বিজ্ঞাপন ফর্মমেট করা হয় নি। আরেকদিন যদি আসতেন! জ্বী ভাই, কোন ক্লান্তি নেই, সে বলল। আসছেন যখন অনেক কষ্ট করে, অন্তত এক কাপ চা খেয়ে যান। কবি মাথা নাড়াল। অফিস বয়কে বললাম, কবিকে চা দিতে।
প্রিয়া অন্য রুম থেকে দেখছিল সব। তার কাছে আসতে বলল, এভাবে একজন লোককে আপ-ডাউন করাচ্ছো কেন, মাত্র দু’হাজার টাকার বিজ্ঞাপন, যেভাবে লোকটাকে টানাহেঁচড়া করাচ্ছো, তাতে তার অর্ধেক টাকাও থাকবে না। মানুষকে খেলতে তোমার বেশ আনন্দ লাগে, তা-ই না?
কোন কিছু বললাম না। মুখে ছড়ানো ছিটানো গর্বিত গর্বিত হাসি।
যেন পিঁপড়ের পা ফেলে দৌড়াচ্ছি। চোখের সামনে লটকে থাকা একখণ্ড মাংশ ক্রমশ অতি কাছে দৃশ্যমান পাহাড়ের মতো দূরে সরে যাচ্ছে মরীচিকার মতো নাটকের শর্ট ক্লোজ দৃশ্যের মতো। আমার দৌড়ানোর জিদ আরও দ্বিগুণ হয়। দূরে কাছে থেকে আমার প্রিয়-অপ্রিয় কেউ কেউ হাত তুলে তাদের হাসিকে আড়াল করলেও কারও কারওটা বাতাসে দ্রবীভূত হয়ে রাস্তার উপর চা স্টলের আড্ডায় সিগারেটের চক্রাকার ধোঁয়ার পড়ে মধ্য দুপুরের রোদের ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্যুতিময় হয়।
মানুষের হিশপিশ বাড়তে থাকে পর্দার অন্তরালে; আজ বিকেলের দিকে প্রিয়ার সঙ্গে আমার বেরুনোর কথা আছে, কোথায় যাবে, জানা নেই, তবে এটুকু জানা, ’তৈরি থেক, বিকেল ৫-টার দিকে আসব’, আসা মাত্র ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে, এরকমই তার মাথার মধ্যে ইনডেক্স করা আছে। তবে তার চোখে-মুখে একটি বিবমিষা প্রশ্ন উদ্ভাসিত করে রাখে, যা নীরবে কুন্তিপুত্র কর্ণের জন্মরহস্যের মতো কৌতুকপূর্ণ, বিষণ্নতায় মুদ্রিত হেতু আমার চিন্তা জুড়ে এক ধরনের ভদ্রোচিত শঙ্কা বয়ে যেতে থাকে, যার ছাপ আমার মুখের সর্বত্র নাটকের অভিনেতার মুখের মেকাপের মতো ।
’এ্যাই, চল।’ প্রিয়া কাছে এসে দাঁড়াবে, এবং উষ্ণ দূরত্বে নিজেকে রেখে নিচু স্বরে বলবে। অন্য কেউ দেখলে বুঝবে, ও বুঝি নীরবে লক্ষ্মী মেয়ের মতো আমার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এবং ভদ্র দর্শকের মতো মতো আমাকে দেখছে।
দৃশ্যটি আমার চোখের আড়াল হয় না। আমি তার চোখে চোখ রাখি। দেখি, তার বিপন্নচোখে যাত্রার রিহার্সেলের শেষ রাতের শেষ দৃশ্যের দীর্ঘশ্বাস ফুটে আছে। সন্ধ্যেবেলার তারার মতো। আমার বুকের উপর উঠে জুড়ে বসে। হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পরে ধীরে আস্তে বুকের গভীর থেকে একটি বরফশীতল শব্দ গলা পর্যন্ত উঠে এসে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মুমূর্ষু রোগিকে দেয়া স্যালাইনের ফোঁটার মতো। বিন্দু বিন্দু। শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। দৃষ্টির প্রান্ত ছুঁয়ে কুয়াশা জুড়ে বসে, উদ্বিগ্ন মানুষের পৃথিবীর মতো। তার কণ্ঠ নিশুতি রাতের ঝিঁ ঝিঁ স্বর এমনত শোনায়।
আরক্তিম স্তব্ধতায় দশাই উৎকণ্ঠা সংক্রমিত হওয়ার ফলে প্রিয়া ও আমার মধ্যে অথৈ বিষণœ নির্জনতার সাঁকো তৈরি হয়। নীরবে। গা ছমছম একটি বিচ্ছিন্ন অনুভূতি সিরাপের মতো চিল্কে ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত শরীরের শিরা উপশিরায়।
একটা অজানা আতঙ্ক চারিয়ে ওঠে বুকের ভেতরে। আমি গাছ হতেও নির্বোধ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। সমস্ত শরীরে মধ্যে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অন্ধকার আচড়ে পড়তে থাকে। এই মাৎস্যপিত্ত বোবা গোঙানো বিচিত্রতা অস্তরীক্ষে প্রতিফলিত হয়ে তার চন্দন মতন মুখাবয়বকে বৈচিত্র্য দান করে সারা ঘরকে আরও স্তব্ধ করে তুললে কালো রঙ দৃশ্যমান হয়। সামনে কেবল কালো আর কালো। আগে পিছে কোন জোনাকপোকা নেই, জ্বলে-ওঠা কিংবা নিভে-যাওয়া তার হদিশও নেই। তার দিনরাত বিভাজিত ভোর হয়ে ফোটে।
চারদিকে অন্ধকার আরো গাঢ় হয়।
এই অবিন্যস্ত অন্ধকারের প্রাগ্রসরমান রক্তধারার অস্তিম দিনে শাহিদ ভাই পাশে এসে দাঁড়ান। তিনিই পৃথিবীর অচেনা দরজার সন্ধান দেন। তার বুদ্ধিতে কাজটা শুরু করি।
যখন বিজ্ঞাপনটা বেরয়, তার ঠিক আড়াই মাসের মাথায়, প্রাগ্রসর অন্ধকারে, মাথার মধ্যে পিঁপড়েগুলো উড়তে আরম্ভ করে। প্রথম প্রথম একটা দু’টো ওড়ে। তারপর তিনটা-চারটা। এখন তার সকাল-সন্ধ্যা নেই। অষ্টপ্রহর ওড়ে। তিনটা-চারটা নয়, অসংখ্য। সারি সারি। ডানঅলা পিঁপড়ে, বারবার করে ওড়ে। আর কাঁপা কাঁপা আগুনের শিখার কাছে এসে ভেঙে পড়ে ডানা পোড়ায়। মুখ থুবড়ে পড়ে। বারাবার। নীরব দর্শক। শুধু দেখে যাই। লাল আভাযুক্ত মাথা দেখতে দেখতে পুড়ে অঙ্গার হয়। শিরশির করে ঘাড়। একটা হিমপ্রবাহ শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে আসে। ভেতরে ঝাঁকুনি ওঠে, মর্মে ধাক্কা লাগে।
গত আড়াই মাস আগে গোসল করে ড্রেসিং টেবিলের পুরনো ভাঙা আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়ালে নিজের যে মুখটা দেখতে পেতাম। পিঁপড়েগুলোর অবিকল সেই রকম। ড্রয়ারটা খুলতেই সেই হিম শিরশির ভাবটা কমে যায়। তার পরপরই স্বাভাবিক হয়ে ওঠি। ড্রয়ারটা আস্তে আস্তে ভরে ওঠে। অবশ্যই ভরে উঠার পূর্বে বেসরকারি ব্যাংকে তুলে রাখি। সাবধানে মার নেই। ড্রয়ার ভরে ওঠে। টাকা আর টাকা। অগুণতি টাকা। দশ, কুড়ি, পঞ্চাশ, পাঁচশ। জিভে পানি আসে। টক দেখলে যেমন মেয়েদের জিভের ডগায় পানি চলে আসে । আলগোছে। ঠিক তেমনি নাকে তার কাচা গন্ধ ধাক্কা খায়। বিভিন্ন নোটের গায়ে বিভিন্ন রকম গন্ধ। পুরো রুম বিমোহিত করে রাখে। সব গন্ধ আমার চেনা। ঘ্রাণযুক্ত নোট।
মাথার ভেতর লাল নীল প্রজাপতি ওড়ে। লোভাতুর হাত সেই দিকে যায়। হাতে কেবল মুঠো মুঠো স্তব্ধতা উঠে বসে। তবুও হাত কাঙালের মতো সেদিকেই যায়।
প্রথম প্রথম টাকা গোনার সময় ভয় ভয় ধরনের একটা চাপা ভাব চেপে রাখত সমস্ত শরীর। যে বুকের ওপর কে যেন আশি কেজি ওজনের পাথর তুলে রেখেছে। সোনার হরিণ দেখানোর নামে। পরিশ্রমের ফসল বাজি ধরার জন্য জমা রাখছি তার কাছে, শেষ পর্যন্ত সামলানো যাবে ত?
ছেলেগুলোর চোখের দিকে তাকাতে কী অস্বস্তি লাগে। হাবভাব যতটা সম্ভব আড়আড় চোখে দেখে নেয়ার চেষ্টা করি। এই বয়সে ছেলেদের আমার ভাল করে জানা আছে। আর না-চেনার কোন কারণ নেই। কিছুদিন পূর্বে আমাদের ঐ বয়সটা ছিল। এই বয়সে মানুষ যখন তখন ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভয়টা সেখানেই।
কিন্তু এখন বুঝে ফেলেছি ভয়ের কোন কারণ নেই। সময় মানুষকে আজ পিঁপড়ে করে দিয়েছে। শুধু আগুন জ্বালাতে জানলে শিকার ধরা খুব কঠিন নয়। তারপরও বেঁচে থাকাটা কত সোজা। ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তার প্রমাণ কয়েক দিনের মধ্যে পেয়ে গেছি।
ইদানিং টাকা গোনার সময় চেয়ারের হাতলোর ওপর হাত এপাশ ওপাশ করলে বগলে টান পড়ে। প্রথমে প্রথমে ব্যাপারটা তার নজরে এড়িয়ে গেছে। এইতো কয়েক দিন আগে রমনা পার্কে প্রিয়ার মাথার ওপর থেকে একটা শুকনো ঝরা পাতা তুলতে ফেলতে গিয়ে। বগলের কাছটায় টান পড়ে।
প্রিয়া ঠোঁটে হাসি। চাপা। মুখে তার রেশ টেনে বলে, জামাটা ছোট হয়ে গেছে। তুমি একটু মোটা হইছ। তারপর … কিছুক্ষণ নীরবতা … ইংরেজি বাক্যের পজের মতো … কখনও সে নিজেই তার নীরবতা ভাঙে, আবার কখনও চুপ হওয়ার অনশন ভাঙে না… শুধু সপ্রতিভ চাহনি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে সেখানে এক ধরনের মিস্টিকতা মোড়ানো থাকে।
যখন ও হাসে, তখন কেবল চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ওকে কী যে দারুণ লাগে, যদি এ কথা ওকে ছোট স্বরে করে বলি, অসম্ভব সুন্দর! অপূর্ব!, তবে তো হাসতে থাকবে তো হাসতে থাকবে, হাসির এক ফাঁকে থেমে, কি যেন বললে, বলে আমার দিকে হাসিমাখা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েই আবার সেই হাসির তোড়ে ওর শরীর ভাসিয়ে দেয়, তখন ওর দিকে আমার তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর ওর চাহনি, সমস্ত শরীরকে নিস্তেজ করে দেয়। প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলবে, তোমাকে …।
মুখ থেকে কথা বেরবে, সেই মুহূর্তে ও আমাকে থামিয়ে দিল।
‘কাল কি তোমার সময় হবে?’ আমার মুখ থেকে কথা তুলে নিয়ে ও বলল।
কিছুটা সপ্রতিভ কণ্ঠে প্রশ্ন করি, ‘কেন?’
কেন আবার। তোমাকে নিয়ে একটু শপিংয়ে বেরুব। এই যা।
কী অদ্ভুত মনে হয়। এইত সেইদিনের কথা! আমি দানিয়েল রাহমান। মাস চার পাঁচ আগেও, আগস্ট-নভেম্বরের দিকে হবে, সিটি কলেজে এসআই চাকরির জন্য ফিজিক্যাল টেস্টের লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। দাঁড়িয়ে প্রধান পুলিশ কমিশনারের হাতে একসময় ইন্সাল্ট হয়েছিলাম। তখন ওজন একদম কম ছিল। রীতিমত আন্ডারওয়েট। আর বছর ঘুরতে না-ঘুরতে আধপুরনো জামা এঁটে বসল শরীরে। তার নামই শরীর। ভারি শরীরটা কোথায় থেকে এল?
হঠাৎ শব্দ ওঠে, কোথায় থেকে উঠে আসল, কেন হল, কিভাবে হল, এসব জটিল চক্রে বোধ গোলা হয়; কিন্তু পানি ফর্শা হয় না। অবচেতনভাবে হাই ওঠে! অন্ধকার। ঘুরে ঘুরে ছায়া নামে। ৮০ পাওয়ারের বাল্বের গায়ে মাকড়সা জাল বোনে। দ্রুত বোনে। ক্রমাগত তার স্বাভাবিক পরিধি বাড়তে থাকে। তার সাথে সাথে মাকড়সারও।
বিছানার ওপর আমার হাত দুটো সামনের দিকে এগিয়ে যায়। পা দুটো পিছিয়ে যায়। মাথা নেমে আসে। ক্রমশ নামতে থাকে। গুড়ি গুড়ি ছাপা অক্ষরে খুব আছে। পড়তে থাকি। কিন্তু মাথা মণ্ডু কিছুই বুঝে আসে না … ভাবি কোথায় গেলো ওজনটা … কোথায় থেকে জানি রেজিস্ট্রি পোস্টে একটা চিঠি আসার কথা ছিল … ঠিকানাটা কি ভুল হলো … না, চিঠিটা ভুলে …
তবুও পড়তে থাকি। হাত দুটো বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। পা দুটো পিছিয়ে আসে। রাত বাড়ে। একসময় বিছানায় এলিয়ে পড়লাম। জেনারেল নলেজের পাতায় থুতনি ঠেকে। গুড়ো গুড়ো শব্দের ওপর দিয়ে পিঁপড়েগুলো হাঁটতে থাকে। এক সময় নিজের অজান্তেই মধ্য রাতে ফাঁটলের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এই সব দৃশ্য আমি শুধু দেখি। দেখে দেখে নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়। নিজের পায়ের নিচের মাটি খানেকটা শক্ত হয়। পায়ের নিচের মাটি শক্ত থাকলেও মানুষের পৃথিবীর পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই ক্রমবর্ধমান পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি আমি। এ সময় প্রিয়া থাকলে আরও ভাল লাগত। প্রিয়ার অনুপস্থিতি তখন বুকের গভীরে বড় বেশি বাজে। তবুও পিঁপড়েদের দৃশ্য দেখি। একা একা। কীভাবে ওরা হাঁটছে। কীভাবে ফাঁটলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।
২
পরের দিন। জানালা ভেঙে সূর্যের প্রথম আলো চোখে পড়তে ঘুম ভাঙল। এখন সকাল সাড়ে আটটা। ঝাপসা চোখে দেয়াল ঘড়িতে তাকালাম। কালকের ক্লান্তি ভাব যায় নি এখনও। এখনও জেনারেল নলেজের পাতায় ডানহাত। ও দিক চোখ ফেরাই। প্রিয়ার ৩জ সাইজের একটি সিংগল ছবি। ছবিটি সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের পাশে পড়ে আছে। মনে পড়ে কাল স্টুডিও থেকে আনা। বারটা ছবির সবগুলো ড্রয়ারে তুলে রাখলেও এটা রাখা হয় নি। তার মুখে মোনালিসা হাসি ছড়ানো। কী জেদি মেয়ে।
নিজের অজান্তে বুকের অতল থেকে একটা তুপ্তির হাসি উঠে এসে ভেঙে পড়ে বিছানায়, পুরো রুমে। বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে ছবিটা ড্রয়ারে তুলে রাখলাম। মোহাম্মদপুর থেকে, প্রিয়ার দূর সম্পর্কের আত্মীয়, কী যেন নাম। প্রিয়াদের বাসায় কদম ছাট গোঁফের ফর্সা মতন যে ছেলেটা ইদানিং আসা যাওয়া করছে। সে কি এভাবেই আসতে থাকবে। ভেতরে একটা ধাক্কা লাগে। নিজের ভিতর বুদবুদ শব্দ ওঠে। কোন আওয়াজ হয় না। এলোপাতাড়ি প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। এক সময় জট পাকিয়ে বিশ্রি বিশ্রি দৃশ্য চোখের সামনে ভাসে একবার। আরেকবার ডোবে। নিজের ভেতরটা পিন-পতন মোচড় দিয়ে ওঠে। চোখের সামনে থেকে এই সব দৃশ্য লেখা মুছে ফেলার চেষ্টা করি। কোনো লাভ হয় না। অগত্য অপরাগ ব্ল্যাকবোর্ডের লেখার ওপর কালো রঙ ঢেলে যে অবস্থা দাঁড়ায়, সে রকম আমিও হিজিবিজি রঙে কালো করে ফেলার চেষ্টা করি। এবং সেই সঙ্গে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিই। মনে পড়ে প্রিয়াদের বাসায় তার সঙ্গে প্রিয়াই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
এখন ন’টা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। আমাকে আবার সাড়ে ন’টার পূর্বে বেরুতে হবে। একটা জরুরি কাজ। ওখানে দশটার মধ্যে না-পৌঁছালেই নয়।
আম্মার থার্ড ইলেকট্রিক শকটা নেয়া হয় নি এখনও। আবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আনন্দ জেনারেল হাসপাতালে নিচে পনের দিন রাখতে হবে। দাদাকে দু’একদিনের মধ্যে শাহবাগ ডায়বেটিকস হসপিটালে নিতে হবে। রিটায়ারমেন্টের পর আব্বার যে এলপিআর চলছিল সেটা শেষ হবে এই মাসেই। তারপর?
এই সব ফ্ল্যাশব্যাকগুলো মনে পড়লে এখন আমার হাসি পায়। অসুস্থ অতীত নিয়ে হাসতে গেলে একটা শক্ত জায়গার দরকার হয়। আমি সেটা তৈরি করে ফেলেছি।
ভার্সিটিতে এসেছিলাম। এক বন্ধুর বাসায়। ভার্সিটি লাইফের। কাজও ছিল। ভার্সিটি এলাকায় ওদের বাসা। ভার্সিটি থেকে রিক্শায় যেতে যেতে পাশে বসে থাকা ছেলেটাকে দেখলাম। আড়চোখে। সুরু সুতোর মতো একটা হাসি খেলল বুক পকেটে। এই পিঁপড়েটাও মরবে, মরতে তোমাকে হবেই। জন্মানোর পর থেকেই সামনে-পেছনে ফাঁদ পাতা থাকে। আমি এইট কি নাইনে পড়ি, আব্বা তার অফিসের কার মুখ থেকে যেন শুনেছিলেন। তার ছেলে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে বিদেশে বিরাট চাকরি করছে। আব্বার কাছে থেকে আম্মা শুনলেন। বললেন ছেলেকে তোমার মত করলে চলবে না। ছেলে তার, তার মত চলবে। তুলশির বাবা বলেছে সাইন্স ছাড়া গতি নেই। যুগটাই এখন তাই। ভুলে গেলাম, আমি ভাল কবিতা লেখতে পারি। প্রমির পাল্লায় আজও তার বৈঠা ধরে রেখেছি। চেষ্টা করলে হয়ত তার চেয়ে ভাল কবিতা লিখতে পারতাম। ফিজিক্সের দোলনায় দুলতে দুলতে একদিন কম্পিউটিটিভ পরীক্ষার হাজতে পৌঁছলাম। এই ধরনের ব্যবচ্ছেদের নিয়ে দিনের বেলায় রাতের ব্যবসাটা চালানো যায়। অবলীলাক্রমে। তাতে বুকের গহিনে রক্ত ক্ষরণ হয় না।
‘গাজিপুরের শেষ বাসটা পাব ত, ভাইয়া?’ বলল ছেলেটা দু’জনের মধ্যে যে নীরবতা ছিল, তা ভেঙে। তখনই ছেলেটি চোখে পড়ল। তাকে দেখলাম। উৎকণ্ঠা ঘুরপাক খাচ্ছে তার চোখে মুখে।
‘হে, পেয়ে যাবে।’ কথাগুলো বলার সময় নিশ্চয়তা মেশালাম।
বাসটা মিস করলে খুব অসুবিধা হবে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে খুব রাত হয়ে যাবে।
রিক্শাঅলা পেছন ফিরে ছেলেটাকে দেখল। অবাক হয় না। স্বাভাবিক চাহনি। রাজধানিতে পড়তে এসে অনেকেই তার মতো অবস্থায় পড়ে। কেউ রাজধানির কোথাও না কোথাও কোন এক রকম কাটিয়ে পড়ের দিন বাড়ি ফিরে যায়। ছেলেটার পিঠে হাত রাখলাম। হাতে অভিভাকত্বের নিশ্চয়তার পরশ। এটা আমার বিজনেসের একটা কৌশল। এই ক’দিনে অনেকটা রপ্ত করে নিয়েছি।
‘কোথায় থাক তুমি?’
গাজিপুর শহরেই। পাঁচ টাকা রিক্শা ভাড়া। গত সপ্তাহে বাস মিস করায় বাড়ি ফিরতে খুব কষ্ট হয়েছিল। বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে একটা কি পৌনে একটা হয়ে গিয়েছিল। মা-বাবা দু’জনেই খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন।
‘জীবনে দাঁড়াতে গেলে পরিশ্রম করতে হয়। পরিশ্রম না করে কখনো কেউ কি কিছু পেয়েছে?’ আত্মনিশ্চয়তার সঙ্গে বললাম।
দেখলাম ছেলেটার চোখ এখন অনেকটা স্বাভাবিক। উৎকণ্ঠার ছাপও কিছুটা কম। সে জায়গায় আত্মবিশ্বাসের খেলা। বুক পকেটের পেছনে সেই সুরু সুতোর মতো হাসি খলখল করে উঠল। এই পিঁপড়াটাও ফাঁদে ঢুকল। পালানোর কোন পথ খোলা নেই। এই ভাবে মানুষ আটকে পড়ে। মনে পড়ে, যখন চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত, তখন ফার্মগেটের সিউর সাকসেস’ কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলাম। ক্লাশ করে বাসায় ফেরার সময় পাশে থাকত শাহিদ ভাই। কোচিং সেন্টারে মালিক কাম প্রশিক্ষক। শাহিদ ভাই বলত, আমি শুনতাম। আমতা আমতা করত ভেতরটা। এবার নিশ্চয়ই পেয়ে যাব। নিশ্চয় পাব। তার পেছনে একটা অনিশ্চয়তাও ছেপে থাকত। শাহিদ ভাইয়ের সাজেশন নাকি ৯০ পার্সেন্ট কমন পড়ে। গতবারও নাকি পড়েছিল। অনেকের মুখেও শুনেছিলাম। এবার পড়বে নাকি …। শাহিদ ভাই বলত, এখন আমি বলি। নতুন পিঁপড়েরা শোনে। এই ভাবে ইতিহাস হাঁটে। মানুষ বেঁচে থাকে। তাকে বেঁচে থাকতে হয়। এখন আমি যেমন তার সঙ্গে পা রেখে চলেছি।
শাহবাগের মুখে রিকশা থেকে নামতে নামতে বললাম, বাড়িতে ভাল করে প্র্যাকটিস কর। কম্পিউটিটিভ পরীক্ষার জন্য কোচিংটা কোনো ফ্যাক্টর নয়। তুমি যত প্র্যাকটিস করবে তোমার চান্স তত বেশি, বুঝলে?
চলে যাচ্ছিলাম আজিজ সুপার মার্কেটের দিকে, কী মনে করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বললাম চিন্তার কিছু নেই। সাজেশন যা দিয়েছি আশা করি নাইন্টি টু পার্সেন্ট কমন পড়বে।
আশা করি শব্দ দুটোর ওপর আলতো ভাবে জোর দিলাম। যতটা জোড় দিলে বাদ বাকি শব্দগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে, অথচ পিঁপড়েটা ঠিক আটকে থাকে ততটাই।
৩
প্রেস থেকে বেরুতে বেরুতে দেরি হয়ে গেল। হাতের দিকে তাকালাম। সাড়ে ছয়টা। প্রিয়ার মুখটা ভেসে এল। আজিজ সুপার মার্কেটের বৈশাখিতে প্রিয়ার থাকার কথা। ওটা আমার বন্ধুর দোকান। ওর সঙ্গে কথা, পৌঁনে ছয়টার মধ্যে চলে আসব। এতক্ষণে ও কি থাকবে। কোচিং খোলার পর থেকে ওর সঙ্গে আমার ডেটিং মিস হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন কথা বরখেলাপ। তবুও আজ আমার ওর সাথে দেখা হওয়া উচিত। এই ক’দিন সময় খবি দ্রুত ছুটছে। কোচিং সেন্টারটা খোলার পর থেকে দম ফেলার ও সময় পাই নি। যত স্টুডেন্ট হবে ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। এখন বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোর কাছে মানুষ নরম মাটির মতো। নিজেদের ইচ্ছে মতো যা খুশি বানিয়ে নিতে পারে। চাকরি খবর সংক্রান্ত বহুল প্রচারিত দু’তিনটি জাতিয় দৈনিক পত্রিকায় এলিফেন্ট রোডের একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা আমার হয়ে বিজ্ঞাপনটা দেয়। কোচিং সেন্টারের নামটা প্রমি ঠিক করে দেয়। ও একটা জাতিয় দৈনিকে কাজ করে। খুব কষ্টে কাজটা পেয়েছিল। এই কাজটা পাওয়ার পেছনে। একটা জাতিয় পত্রিকার নির্বাহি সম্পাদকের সহযোগিতা ছিল। অসম্ভব ভাল লোক। খুব চমৎকার কবিতা লেখেন। বর্ণচোরা কবি। গত বছর ওর একটা কবিতার বই বেরয়। বলল প্রমি। হঠাৎ বলে বসল, ‘য়ুরেকা’।
দারুণ নাম। পাল্টে দিয়েছে আমার সব কিছু। অংকটা কয়েকদিন আগেও কঠিন ছিল। এখন সহজ। উত্তর : বেঁচে থাকা। পরিস্থিতি মানুষকে সব কিছু ঠিক করে দেয়। যেমন আমার সব বদলে দিল।
রিক্শার জন্য দাঁড়ালে দেরি হয়ে যাবে। তাই হাঁটা শুরু করলাম। প্রিয়া চলে যেতে পারে। ও কি আমার জন্য এখনও অপেক্ষা করছে? ওকে আজ কিছু জরুরি কথা বলা দরকার, গত দু’দিন থেকে ভেবে রেখেছি।
ভেতরে আমার ঘোড়া ছুটছে। দ্রুত ছুটছে।
বৈশাখি গিয়ে দেখলাম, আমার জন্য শুধু শূন্যতাই অপেক্ষা করছে। গত পাঁচ বছরে এই প্রথম আমার রাগ হলো প্রিয়ার ওপর। আমি সহজে রাগতে পারি না। তবে রাগ করলে প্রিয়াকে দারুণ লাগে। দেখার মতো। তাই সামান্য কিছুতেই ওকে রাগাতাম। প্রথম প্রথম ও বুঝত না আমি ওকে রাগাচ্ছি। শুধু শুধু। উস্কে দেয়া ছিচ আগুনের মতো রেগে উঠত ও।
পরে বুঝতে পেরেছিল। এখন ওকে আর সহজে রাগানো যায় না। খুবই লক্ষ্মী মেয়ে। ওর মিষ্টি হাসির আড়ালে আমার সব কৌশল চাপা পড়ে যায়। এখনও ওকে দেখে বোঝার উপায় নেই। ও আমার ওপর রাগ করেছে, না …।
প্রিয়া চলে গেল। ও কেন বুঝল না এখন দেরি হওয়াটা স্বাভাবিক। প্রেসে বসে ফাইনাল প্রুফটা কয়েকবার চেক করলাম। উত্তরে ভুল করলে কোচিং সেন্টারের অনেক বদনাম হয়ে যাবে। ভালো করে চোখ বুলিয়েছি তাই। উপরে ওঠার সিঁড়িটা পাকাপোক্ত করে নিতে হবে প্রথম থেকেই। আর এর জন্য ও ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে পারলো না। আমার এতো কিছু করা জন্য। ওর জন্যই তো!
ঘাড়ের শিরাটা আরেক একটু ফুলল। তার একটা ভালো মতো জবাব দেওয়া দরকার। আমার এসব কিছুতে প্রিয়ার খুশি হওয়া উচিত। আমি চাই ও তাই। আর ও কি না …।
গত কয়েক বছর যাবত ঘুণ পোকার শব্দ নিয়ে যে অসুখটা আমার ভেতর বেড়ে উঠেছিলো, সেটা সেরে গেছে। কোচিং সেন্টার খোলার দেড় মাসের মুখে।
কোন অফিসে কারও সঙ্গে দেখা করার জন্য ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে থাকতে মিনেট দশের বেশি কেটে গেলে গলা শুকিয়ে আসত আর। ভার্সিটিতে থেকে বেরিয়ে, সরকারি চাকরি খুঁজতে খুঁজতে সরকারি চাকরির নির্ধারিত বয়স সীমা পেরিয়ে গেল। বুঝতেই পেলাম না। সরকারি চাকরির বয়স নাগালে নেই। কোন কিছু একটা আপ্রাণ জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলাম। বাঁচতে হবে। চারিদিকে অন্ধকার। প্রিয়ার মুখে হতাশা। ওর তাড়া। সময় কম। বয়স বাড়ছে।
কোথায় যাব কী করব। লাখ লাখ হাত, মুখ। ভয়ঙ্কর জলঘূর্ণিতে খড় ভাসছে একটা দু’একটা। তাও আবার কালে ভদ্রে। উপরঅলার মর্জি। কিন্তু এখন ত আমার আর কোন অসুখ নেই। তাহলে? প্রিয়া কেন দাঁড়াল না। বুক ভেঙে ছোট একটা স্তব্ধ তপ্ত নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল।
আজিজ সুপার মার্কেটের থেকে ইস্টার্নপ্লাজার সামনে নেমে ঠিক করলাম বিদেশি জিন্স পেন্টের শপটা ঘুরে যাব। শাহিদ ভাই বিদেশি জিন্স প্যান্টের প্রতি খুবই সিক। একটা দারুণ কিছু প্রেজেন্ট করতে হবে। আর তখনই মনে মনে হাসলাম। এই লোকটাকেও কয়েকদিন আগে প্রচণ্ড ঘৃণা করতাম।
কী অদ্ভুত! একা একা ভেবে হাসছি দেখে পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া দু’চার জন অবাক চোখে তাকালো। প্রচণ্ড রাগ হলো প্রিয়ার ওপর। ও সঙ্গে নেই। খারাপ লাগছিল। অপেক্ষার মতো কষ্ট পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। অভিমান করেও হয়তো তাই চলে গেল। চলে যাওয়ারই কথা। কোচিং সেন্টার খোলার পর থেকেই এই অনিয়ম। প্রতিদিন এই অনিয়ম কার সহ্য হবে। প্রিয়াও ত মানুষ! নিজের পর দারুণ রাগ হল।
লোকগুলো তাকাক। অবাক হওয়ার আবার কী আছে। শাহিদ ভাই আমাকে যে প্যান্টটা দিয়েছিল তা কোন কনসালটেন্সি ফার্মে গিয়ে পয়সা খরচ করলেও আমি পেতাম না। মনে মনে তাই আমি ভয়ঙ্কর খুশি হয়েছিলাম। সঙ্গে, অবাকও। এখন বুঝতে পারি যে অবাক হবার কিছু নেই। রাস্তার বাঁকের মতো জীবনের কতগুলোও রকম কতগুলো মোড় থাকে।
সেই সময়টা আমার অনিশ্চয়তার ভাইরাস নিয়ে পুরো রাজধানিতে নাগরদোলার মতো চক্কর খাচ্ছিলাম। বিভিন্ন এনজিও ফার্মে ইন্টারভ্যু বেসরকারি হাই স্কুলে ফিজিক্স আর্টস টিচার। কত কী। কিছু বাদ রাখে নি। সব পথ তন্নতন্ন্ করেছি। সব দরজা বন্ধ। চাবি হারিয়ে গেছে। অসুখটা বাড়ছে। ক্রমশ। কপালে বলি রেখা বাড়ছে। প্রিয়ার মুখের তীর্ষক চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দিন দিন। পিপি অফিসের সামনে পিচ গলছে। হা করে দেখছি আমি। ভিড়ের মধ্যে থেকে কাঁধের ওপর কে যেন হাত রাখল।
কি করছ এখন?
ঘাড় ফেরালাম।
দেখি, শাহিদ ভাই।
‘কী আর করব। মেডিকেল কলেজে শুয়ে আছি। মেরুদণ্ডে ঘা হয়েছে। শাহিদ ভাই।’ বললাম আমি। শ্লেষ শ্লাঘামূলক ভাঙা গলা।
শাহিদ ভাই হাসল। সফল মানুষের হাসি। তার রেশ ধরে কর্নেগি স্টাইলে বলল: বোকার মতো কথা বলছ কেন। বেঁচে থাকার পদ্ধতিটা শেখ। বিপদে অনেক বুদ্ধিমানে বোকার থেকে নিচে নেমে আসে। আবার বোকাও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে। মনে হলো। কিছু বললাম না। কয়েক মুহূর্তে শাহিদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে একটু চিহ্ন সূচক স্বরে বললাম : কী করে!
একটা কোচিং সেন্টার খুলো আমার মত। তোমাকে আর চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরতে হবে না। চাকরি মানে টাকা ত। এই টাকাই তোমার পেছনে পেছনে ঘুরবে।
তুমিও ফার্মগেটে সিওর সাকসেস কোচিং সেন্টার খুলেছ। আসি আব্বার অগ্রিম বেতন তোলা টাকা থেকে ভর্তির ফিস দিয়েছিলাম। চাকরি পাইনি তোমার সাজেশন তো।
হোঁচট খেলাম আমি। তীর্যক ভঙ্গিতে তাঁকালাম শাহিদ ভাইয়ের দিকে।
তাতে আমার কী হল। আমি রাজহালতেই আছি। দেশে আরও বেকার বাড়বে। প্রতিবছর ক্রমশ বেকার বেড়ে চলেছে। তার সংখ্যা বাড়বেই। তুমিও বেঁচে থাকবে ঠিক আমার মত। তাই না?
জিপিও অফিসের সামনে চা খেতে খেতে শাহিদ ভাই পুরো স্কিমটা খুলে বলল। স্টুডেন্ট প্রতি ১০০০ টাকা। ১০০ স্টুডেন্ট হলে ১ লাখ টাকা। বিজ্ঞাপনে লিখবে মানি ব্যাক গ্যারান্টি। চাকরি না পেলে টাকা ফেরত। দেখবে হুমড়ি খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মানুষ। ঝাঁকে ঝাঁকে পিঁপড়ের মতো।
‘ফেরত দিলে আমার কী থাকবে?’ জিজ্ঞাসার স্বরে বললাম আমি।
সবটা ফেরত দেবে কেন? ৫০০ টাকা কোচিং ফি। ৫০০ টাকা গ্যরান্টি মানি। কোচিং ফি’টা পুরো লাভ। মানে বছরে পাচ্ছ ৫০ হাজার টাকা। তাছাড়া রেজাল্ট বেরোতে বেরোতে প্রায় পুরো বছর। ততদিনে যে টাকা ফেরত দেবে। সেটা তো ব্যাঙ্কে। সুদে আসলে …। এখন কিছু বুঝলে?
বিমোহিত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম। হাঁ-না কিছু বললাম না। কেবল মুগ্ধতার দৃষ্টি নিয়ে শাহিদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
শাহিদ ভাই হাসল। সফল মানুষের তৃপ্তির হাসি। অনুভব করলাম, রাজধানির শরীরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় কাঁপল। আমার হাই টেম্পেরেচার জ্বরটা বিপদ সীমার নিচে নেমে এল। মুহুর্তে সুস্থ হয়ে উঠলাম। সেই শাহিদ ভাইকে একটা কিছু মূল্যবান জিনিস প্রেজেন্ট করা আমার উচিত। অকৃতজ্ঞ মানুষ জীবনে কখনো সুখি হতে পারে না। সফল হলেও জ্বলন্ত সিগারেটের মতো তার ভেতরটা অঙ্গার করে দেয়। আমিও তার দুটোই পেতে চাই।
কারও প্রিয় জিনিস তাকে প্রেজেন্ট করা উচিত। তাতে দু’পক্ষই খুশি হয়। প্রথমে ভেবেছিলাম, একটা দামি ঘড়ি দেব। প্রিয়ার ধারণা ছিল। শাহিদ ভাইয়ের জিন্স প্যান্ট প্রিয়ার কথায় অগত্য এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাম। শপটা ফাঁকা। শুধু একজন ভদ্রলোক চোখে পড়ল। সরাসরি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আড়চোখে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলাম। তারপর সেলসম্যানকে মুখ ঘুরিয়ে বললাম : তার থেকে আরও ভাল কিছু দেখান। রিসেন্ট ফ্যাশন?
এই প্যান্টটা দেখুন। ক’দিন হল ইতালি থেকে আসা। খবি দামি কোম্পানি।
কত দাম?
দুই হাজার।
এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যে ভদ্রলোকটি আমি দেখছিলাম, তিনি এবার আমার দিকে চোখ তুলে তাঁকালেন। চোখ দুটো কপালের ওপর। যেনো লাল লাল ডালিম ফুল। ভুরুতে বিস্ময়। আমি হাসলাম। মনে মনে বিজয়ের হাসি। আমাকে দেখছে। দেখবে। দেখতেই হবে। দেখুন, দেখুন। ভালো করে দেখুন। বউ দেখার মতন করে দেখুন। আমি তুলশি রহমান। প্রিয়ার কথা মনে পড়ল। ও পাশে থাকলে দু’জন মিলে বেশ মজা করা যেত। কোনো আনন্দ একা উপভোগ করে তৃপ্তি পাওয়া যায় না। এ জন্য দ্বিতীয় জনের প্রয়োজন। তাতে আসর জমে ভাল। তৃপ্তিও পাওয়া যায়।
চিনতে পারছেন? পারছেন তো। পারবেন না? আমার মতো প্রতিবছর শত শত প্রতিভাবান ছেলেদের আপনি দিনের আলোতেই গলা চেপে খুন করেছেন। ’৯২ সালে বাংলাদেশের সরকারি সিভিল সার্ভিসে একলক্ষ পঞ্চাশ হাজার ছেলে পরীক্ষা দিয়েছিল। ইন্টারভ্যুর জন্য সিলেক্ট হয়েছিল সাতশত চুয়ান্ন কি সাতান্ন জন। আমিও তারই একজন। আপনি আমার ইন্টারভ্যু নিয়েছিলেন। মনে আছে? নেই। আমার আছে। ঠোঁটের ওপর আলতো ঠোঁট রেখে ঘষলাম।
শপ থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমার হাতে ইতালি জিন্স প্যান্ট আর দামি গোঞ্জির প্যাকেট। দাম সাড়ে চার হাজার। ভদ্রলোকের চোখ গাছের মাথায়। সমস্ত পৃথিবী তাকে দেখছে যেন। আর এমন একটা দৃশ্য প্রিয়াকে দেখানো হয় না। সাফল্য পেয়ে যতো আনন্দ তার থেকে কাউকে দেখিয়ে আনন্দ তত বেশি।
জিদ হর্সপাওয়ারের চক্কর খেলো আমার মাথায়। প্রিয়াদের বাসায় গেলে কী রকম হয়। অপেক্ষা না করার কারণটা জানতে না পারলে আজ রাতে ভাল ঘুম হবে না। প্রিয়ার চোখ ঘুমাতে দেবে না। আলপিন হয়ে খোঁচাতে থাকবে সারারাত। ব্যথা করবে। টনটন। ব্যাখ্যাহীন। এক ফোঁটাও রক্ত বেরুবে না। শুধু সেই দিতে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
উহ্, কী অব্যক্ত যন্ত্রণা! এ করাত কলের নিচে যারা একবার পড়েছে, কেবল তারাই তার মর্ম বোঝবে। আকাশ ভেদ করে চিৎকার করবে, কিন্তু পাশে কেহ নেই। কেহ এগিয়ে আসে না। শুধু শুনে শুনে দেখে দেখে কৌতূহলি মানুষের পাশ ঘেঁষে চলে যায়, কোনো শব্দ উচ্চারণ করে না। দেখে করাত কল তাকে কিভাবে কাটছে, এ দৃশ্য তারা মজা করে উপভোগ করে। একে অন্যের দিকে তাকায়। চোখ মুখ ছাপিয়ে খেলা করে এক নতুন কৌতুক। করাত কলের নিচে থেকে কীভাবে ব্যবচ্ছেদ হচ্ছে এ কৌতুক দেখে যাওয়া ছাড়া আর তাদের কোন উপায় থাকে না।
তার ভেতর থেকে র্দীঘ নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে। পা বাড়ায় সামনের দিকে। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামে। প্রতিটি পদক্ষেপে যেনো উঠে আসে অন্ধকারে চেপে বসা মানুষের মধ্যে প্রবহমান বর্ণিল যন্ত্রণার মতো সংক্রমিত হতে থাকে শীতল উৎকণ্ঠা।
তার মধ্যে পা ফেলতে থাকে। দ্রুত।
৪
সময় মানুষের অনেক কিছু বদলে দেয়। মানুষ সময়ের ক্রীড়নক। সে কেবল তার মতো করে আচরণ করে যায়। প্রিয়ার মুখে শোনা, আমার নাম কানে গেলে তার বাবার চোখ নাকি কপালের উপর না উঠলেও অস্পষ্ট একটা জিজ্ঞাসার চিহ্ন ফুটে উঠত। মুখে তার কিছুই প্রকাশ পেত না। নিজের ভেতরে সব কেরানির মতো ফাইল চাপা দিয়ে সকালের সদ্য ফোটা গোলাপের হাসিতে পরিবেশ সতেজ রাখতেন। শুধু দেখে যেতাম। মুখে বলা হত না। পরিবেশ মানুষকে অনেক কিছু করতে দেয় না। টুটি চেপে ধরে। ভেতরটা ফেঁটে যেতে পেকে-যাওয়া ডালিমের মত। কিন্তু এর কিছু প্রকাশ করা হত না। মুখ বুঝে সব সহ্য করে যেতাম। আমি সহজে প্রিয়াদের বাসার দিকে ঘেঁষতাম না। আর প্রিয়ার আচরণেও তাই প্রকাশ পেত। তার বাবার গূঢ় তাচ্ছিল্য-বিদ্রুপের কারণটা জানতাম। কিন্তু নিজের দিকে যেতে দমে যেতাম, মিনি সাইজ জোড়া হাই পাওয়ার চশমার চোখ হয়ে যেত। আজ নিজের পায়ের নিচে মাটি আছে। শক্ত মাটি। তাই আজ এই ভরসায় প্রিয়াদের বাসার দিকে পা বাড়ালাম। বুকটা আগের মতো হত-দরিদ্র নয়; এখন সেখানে আত্মবিশ্বাস ও অহম খেলা করে।
বাইরে দাঁড়িয়ে কেন! ভিতরে এস।’ সুরেল গলায় বললেন প্রিয়ার বাবা।
ভদ্রলোক সরকারি কী যেন একটা চাকরি করেন। উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। প্রিয়া বলেছিল, এখন মনে পড়ছে না।
না, মানে এত রাতে…।
ভেতরে এস। এখন এমন কী আর রাত হল।’ মুখ থেকে কথা তুলে নিয়ে বললেন প্রিয়ার বাবা।
হাতের দিকে তাকালাম। এগারটা ছুঁই ছুঁই। এগারটাও তাহলে কখনও কখনও বাসায় হঠাৎ আসার পক্ষে অমন কিছু রাত নয়। পৃথিবী এমন করেই পাল্টে যায়, তাহলে! মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে! খেলাটা নিজের কাছে আছে দেখে বুদ্ধিমানের মতো বিনয়ী হলাম।
আসলে এত রাতে আমি সচরাচর কারও বাসায় আসি না। আমতা আমতা করে বললাম আমি। তারপর খানিকটা থেমে স্বাভাবিক গলায় বললাম, প্রিয়ার সঙ্গে একটু দরকার আছে।
এখানেই কথা বলে চলে যাব। ভদ্রলোক সামান্য অপ্রতিভ হলেন। বোঝা গেল। মেয়েকে ডাকার জন্য ভেতরে চলে গেলেন। প্রিয়া আধ খোলা দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। সমস্ত চোখে মুখে তার অভিমান ও ক্লান্তির ঢেউ ভাঙছে। কোন ভূমিকা না নিয়ে নিচু গলায় বলল: বল, কী বলবে। আমাকে আবার কাল সকালে সকালে উঠতে হবে। সাগররা আসবে মোহাম্মদপুর থেকে। ভাবছি, ঢাকার বাইরে থেকে কিছু দিন ঘুরে আসব। সঙ্গে মাও যাবে। প্রিয়ার কথায় ভয়ঙ্কর হোঁচট খেলাম। ওর সামনে কিছু প্রকাশ করলাম না। খুব আস্তে শুধু জিজ্ঞাস করলাম, ‘হঠাৎ?’
হঠাৎ হতে যাবে কেন, বেশ ক’দিন ধরে ভাবছি।
প্রিয়া যেন তার কণ্ঠস্বরে পাথর চেপে রেখেছে।
‘কেন?’ বললাম। নিচু কণ্ঠে।
কেন আবার। তুমি এখন ব্যস্ত মানুষ। তোমার সময় হয় না। তাই ভাবছি, কয়েকদিনের জন্য অন্য কোথাও একটু ঘুরে ‘আসি।’ গলায় চাদর চাপিয়ে বলল ও।
তুমি জান, ‘আমার এই ব্যস্ততা কার জন্য।’ গলায় দৃঢ়তা রেখে বললাম আমি। তার পর থেমে ধীর লয়ে বললাম,
‘পায়ের নিচে…।’
‘তাই বলে এই ভাবে।’ আমার মুখের কথা টেনে নিয়ে বলল প্রিয়া।
‘মানে?’ কৌতুক ভঙিতে বলে প্রিয়ার মুখের সকৌতুক দৃষ্টির দিকে তাকালাম।
শাহিদ ভাইকে চেন?
তুমি ত তাকে ঘৃণা করতে। তাই না!
‘হ্যাঁ, করতাম। এখন করি না।’ স্বাভাবিক স্বরে শব্দগুলো উচ্চারণ করলাম।
‘কিন্তু আমি তোমাকে করি। ছেলেমেয়েগুলোর কাছ থেকে যেভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছো সেটা তো ঠিক পথ নয়, এটা তুমি ভালো করেই জান। তাই না! একটা আশা দিয়ে টাকা নেওয়া ছাড়া কিছুই! তুমিই বল?’
সময়ের তালে তালে বাঁচার তাগিদে মানুষকে অনেক নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কার করতে হয়। এটা বেঁচে থাকার নতুন পদ্ধতি। বেঁচে জন্য কোনো কিছু ভুল নয়। তুমিই বল, ভুল?
প্রিয়া হাসল। রহস্যমোড়ানো সেই হাসি। তার রেশ নিয়ে কয়েক মূহূর্ত পর ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘জানি, এই ক’দিনে তুমি যুক্তি দিয়ে কথা বলতে শিখেছ। মানি। কিন্তু আসল কথা কী। জান, যার কাছে বেঁচে থাকার জন্য কোন কিছুই ভুল নয়, তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা আনসেফ। পাপ। অমানবিকও। আমি আর তোমার সঙ্গে নেই। সম্পর্ক রাখাটাও আমি আমার দিক থেকে অন্তত সেফ মনে করি না। তাই প্লিজ …’
মনে হয়, সমস্ত আকাশটা আমার ওপর ভেঙে পড়ল। মুখে কোন কথা ফুটল না। আমি অন্ধকারাক্রান্ত হতে থাকি। কী করব কী করা উচিত, ভেবে পেলাম না। মাথাটা পুরো গুলিয়ে যাচ্ছিল। প্রিয়ার হাত দুটো মুঠি করে জড়িয়ে ধরে বললাম: কোচিং সেন্টার খোলার আগেও তুমি চাইতে আমাদের সম্পর্কটা থাকুক। তখন ত তুমি নিজেকে আনসেফ মনে কর নি। এখন কেন একথা বলছ?
তখন তুমি লড়াই করতে জানতে, তাই।
আমার মুখ থেকে কোন শব্দ বেরুতে চাইছে না। কে মুখের উপর বরফপিণ্ড বসিয়ে দিছে। প্রিয়ার দু চোখে কে যেন জ্বলন্ত অগ্নিসীসা ঢেলে দিল। তার রশ্মি আমাকে ত্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে। লড়াই! লড়াই করে কী হবে। অনেক দেখলাম।
লড়াই করে মানুষ বেঁচে থাকে, তুলশি।
তার বুক চিরে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস নেমে যেতে দেখলাম। কয়েক মুহূর্ত পর চোখ বোজে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি এখন যাও। তোমাকে আমি….।’
প্রিয়া আর উচ্চারণ করতে পারল না। মাথা কিছুটা তোলে আমার দিকে। তারপর একটু থেমে ক্ষীণ স্বরে বলল, এখন তুমি যাও। আমাকে কাল ভোরে ভোরে উঠতে হবে। তাছাড়া …
তাছাড়া কী? কৌতূহলি স্বরে বললাম আমি।
এখন আমার কথা বলতে লাগছে না।
না, আমাকে তোমার সহ্য হচ্ছে না?
আলগোছে প্রিয়া তাকাল আমার দিকে। তবে কোন কথা বলল না। নীরবে, স্তব্ধতাকে আঁকড়ে ধরল। চোখে-মুখে তার গহিন হাতছানি। ওর পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে আঁকা আঁকি যেন তাকেই নীরবে সমর্থন করছে। আচমকা আমার দিকে মুখ তুলতেই, ওর দুচোখে দাবানল আরও দ্বিগুন শক্তিতে জ্বলে উঠছে। নেভাতে যাব, সেই শক্তি কোথায়, পেছনে কে যেন টেনে রাখছে। পরিবেশ হালকা করে দিতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি আজকাল মহিলা সমিতিতে যাওয়া-আসা করছ নাকি?’
‘ও, না। এসব বল না।’ এভাবে হয়ত সে বলত। হেসে হেসে। অন্যসময় হলে।
আজ তার মুখে কে যেন সেলাই করে দিছে। আড়চোখে দেখে আমাকে। কথাটি ওর পছন্দ হয় নি; ওর ঠোঁটের সেই হাসি নীরবে সেই কথাই যেন বলছে। সেই হাসি এখনও তার ঠোঁটে ছাপিয়ে আছে। তবে, সেই হাসি অচেনা, অস্পষ্ট। ওর এই হাসি তুষার কণার মতো ঝিরঝির শব্দে পড়তে থাকে আমার সমস্ত শরীরে, মননে। ক্রমে এর তীব্রতা চেপে বসে আমার অনুভবের শিরা উপশিরা। আমার অনুভূতি সংকুচিত হতে থাকে। আঙুল কেটে গেছে। কিন্তু রক্ত বেরচ্ছে না। এমত পরিস্থিতি আমার ভেতরে বয়ে যাচ্ছে।
আমার সামনে আকাশ ভেঙে নামে কালো করে অন্ধকার। থোকা থোকা। বরফ পিণ্ডের মতো। হিম, শীতল। সমস্ত শহর জুড়ে অন্ধকারের মধ্যে দেখি শুধু একজোড়া চোখে উজ্জ্বল আলোকরশ্মির ছটা, সেই আলোর ছটা নিয়ে প্রজাপ্রতি উড়ছে তার বর্ণিল ডানায়।
অপসৃত অপরাহ্ণের মতো প্রিয়া যেন সরে যাচ্ছে দূরে, কোথাও। এর কোন কিছু আমাকে স্পর্শ করে না। জামার ওপর পড়া ধুলোর গুঁড়ি স্তূপ হয়ে আছে। সেইভাবে সবকিছু মুছে ফেলি। আমার সামনে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। এর হাতছানি। বাতিঘরের মতো। এখন এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে না ভাবলেও চলবে।
মুখের ওপর ক্যাটওয়ার্কের প্রাগকালিন হাসি ছাপিয়ে রাখি। সামনের দিকে পা এগিয়ে দিতে দিতে কী ভেবে পেছনে ঘাড় ফেরালাম। এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রিয়া যেখানে দাঁড়িয়েছিল। তার চোখে মুখে হাসি। তীর্যক, দুর্বোধ্য যেন আজো অমিমাংসিত প্রাচীন পিরামিড কিংবা পিরামিডের শেষ সম্রাট তুতের খামেনের মৃত্যু রহস্যের মতো। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে ফেলি। বেশ দেরি হয়ে গেছে। পা বাড়ালাম। সামনে। বুকের অতল থেকে বেরিয়ে আসে, অর্ধস্ফূট স্বরে, ‘মেয়েটি আসলে অপদার্থ, সন্দেহ নেই।’
তার মাথায় প্রবাহিত হতে থাকে অসংখ্য চিন্তার লাভা। এর ফাঁকে একটি চিন্তা অবচেতনতার বলয় থেকে বেরিয়ে একটি স্পেস দখল করে নিল। এখন সে কথা বলছে, প্রিয়ার বাবা একজন কেরানি। তাও অডিনারি কেরানি, তবে চাকরিটা সরকারি। মুক্তিযোদ্ধা। উপরি আছে, কিন্তু নেন না। দু’ভাই বিএ পাস করে বেকার, চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরছে। মা, চিরকালের অসুস্থ মানুষ। প্রিয়া বাসার কাছে একটি কেজি স্কুলে পড়ায়। কলুর বলদের টানা সংসার। সেই মেয়ে কিনা …
এইসব চিন্তা করার সুযোগ নেই এখন। যে যাওয়ার তাকে চলে যেতে দাও। মুগ্ধ বালকের মতো সারা দুপুর একটি প্রজাপতির পেছনে পেছনে ছুটে চলার সময় এখন নেই, বরং যেখানে নিজের পায়ের নিচে প্রজাপতি পিষ্ট হতে দেখছি। একটি নয়, অসংখ্য। সেখানে প্রিয়া!
হা হা … প্রচণ্ড হাসিতে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করছে তার। সে কি এখন তাই করবে? সময়টা এখন তার। তখনও আমার সারা মুখে ফুটে রয়েছে গর্বিত মানুষের হাসি, প্রাচীন প্রাসাদের স্থাপত্যের কারুকার্যের মতো, আভিজাত্যে, মুখে ঠিকরে-পড়া শেষ হাসির মতো। এরকম অনুভূতি তাড়িত হচ্ছিল সেই সময় কী ভেবে পেছনে চোখ যেতে প্রিয়ার দাঁড়িয়ে থাকাটা চোখে পড়ল এবং তার সারা মুখে সহজ কিন্তু কঠিন, দ্রোহ মিশ্রিত হাসি ছড়িয়ে রয়েছে। মুহূর্তে আমার সমস্ত সুখানুভূতি কর্পূরের মতো চলে গেল এবং চুপচাপ অবনত মাথায় সানের দিকে পা রাখলাম। দ্রুততায়।