ঊনবিংশ ও বিংশ এই দুই শতাব্দীর সন্ধিসময়কে কেন্দ্রে রেখে স্যুররিয়েলিজম পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য তত্ত্বের যে ধারা বহমান ছিল ছয় দশক ধরে তার মূল কথা হচ্ছে বিরাজমান রাষ্ট্র-সমাজ পরিস্থিতিকে অস্বীকার করা। কিন্তু এই অস্বীকৃতির পথ ধরেই পরোক্ষ ভঙ্গিতে হলেও, কবি-শিল্পীগণ সমাজবাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন অনেকটা অজান্তেই। আর সমাজতন্ত্রবাদী শিল্পী-সাহিত্যিকরা তো সমাজের ছবি এঁকেছেন সচেতনভাবেই; প্রত্যক্ষ ভঙ্গিতেই।
এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এইসব আন্দোলন ছিল রাজনীতি বা সমাজ নিরপেক্ষ। বারবার সমকালের বিচিত্র বাস্তবতা ও জীবন পরিস্থিতির পটভূমিতেই আবির্ভাব ঘটেছে এইসব আন্দোলনের। এই গদ্য রচনায় আমি বিংশ শতাব্দীর প্রধান কিছু শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য এবং কী ধরনের দেশ-বাস্তবতায় তাদের উদ্ভব ঘটে তা সাধ্যমতো বলবো।
যে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাকে আমরা সন-তারিখ দিয়ে নির্দিষ্ট করতে পারি। কিন্তু শিল্প-সাহিত্যের আন্দোলনের বেলায় এটা খাটে না। সে কারণে বিশ শতকের প্রধান প্রধান কাব্য-আন্দোলনসমূহের উৎস সন্ধানের জন্য আমাদের যেতে হয় উনিশ শতকের শেষ তিন দশক ধরে উদ্ভূত ফ্রান্সের নতুন কবিতাভাবনার কাছে।
১৮৭০-৭১ সাল নাগাদ ঘটে যায় ফ্রান্স-জার্মানির যুদ্ধ। স্তেফান মালার্মে সে সময় প্রতীকবাদের শিল্পভাবনায় নিমজ্জিত। বিসম্পর্কের কূট রণকৌশলের কাছে পরাজিত ও আত্মসমর্পিত হতে হয় ফ্রান্সকে। এই যুদ্ধ ফ্রান্সকে কিছুই এনে দেয়নি; বরং ফরাসিরা খুব অসম্মানিত বোধ করে। রাজতন্ত্রের বদলে এবার আসে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের শাসন। সমরোত্তর কালপর্বে ফরাসি জনগণ ছিল জিজ্ঞাসাজর্জরিত সংশয়দীর্ণ। অনতিকাল পরেই তা ক্ষোভে রূপ নেয়। রাষ্ট্রপ্রধানের কিছু হঠকারী কাজকর্ম রীতিমতো ক্ষিপ্ত করে তোলে জনতাকে। তারা সেনাবাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে প্যারিসের অনেকখানি জায়গা দখলে নিয়ে নেয়। উত্তপ্ত জনতার সঙ্গে শাসকের বিরুদ্ধ কিছু গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ হাত মেলান সেই বিপ্লবে। তখন নগর পরিচালনার জন্য গঠিত হয় ‘পারি কমিউন’ যাতে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল সাম্যবাদী গোষ্ঠীসমূহের। ‘ডাস ক্যাপিট্যাল’ গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৮৬৭। ১৮৭১-৭২ সাল নাগাদ এই বই ও তার বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপব্যাপী। সুতরাং ‘পারি কমিউন’-এ মার্কসবাদী নেতাদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। যুদ্ধের পর কী কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো আর কোন পরিস্থিতিতে গঠিত হলো ‘পারি কমিউন’-এর মতো সংগঠন এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে, জনগণের আবেগের কানাকড়ি মূল্য না দিয়ে রাষ্ট্র-প্রশাসন বরং বন্ধ করে দেয় ওই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড।
এই পরিস্থিতিতে স্বাধীনচেতা শিল্পী-সাহিত্যিকদের মনোভাব ঠিক কেমন ছিল তা পরিষ্কার নয়। তারা কি সাময়িকভাবে পলায়নী মনোবৃত্তির দাসত্ব করেছিলেন? ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতা পড়ে অন্তত তখনকার রাজনৈতিক বাতাবরণ বুঝে নেয়া কঠিন। তবে প্রতীকবাদী কবিতার প্রকাশভঙ্গির যে ধরন তাতে খুব পরোক্ষভাবে হলেও প্রাগুক্ত ওই দেশবাস্তবতার ছবি আঁকা একেবারে অসম্ভব ছিল না। ১৮৭১ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুর কাল পর্যন্ত জার্মানি তার ক্ষমতা ও প্রভাব বজায় রেখেছিল ফ্রান্সের ওপর। মাঝখানের ২৩-২৪ বছর ছিল খুবই অস্থিরতার সময়। এখন দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থার ফলে দেশের উন্নয়নকর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়েছে ভীষণভাবে। ভারী শিল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এবং বহির্বিশ্বে খাদ্যশস্যের দাম কমে যেতে থাকায় শস্য রপ্তানি করেও আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। অবশ্য অন্যত্র, কিছু ক্ষেত্রে, ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে ততদিনে। শিক্ষার বিস্তার ঘটায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য ম্লান হয়েছে। বর্ধিত হয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। নাগরিকগণ নিজেদের এলাকার মেয়র বাছাই করে নেয়ার অধিকার পেয়েছে। পাশাপাশি মননচর্চার ক্ষেত্রটিও প্রসারিত হয়েছে অনেকখানি। এমনতর রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থার মাঝখানে পড়ে ভালেরি, মালার্মে ও ভের্লেনের মতো প্রতিভাধর লেখকরা হয়ে উঠলেন কম-বেশি সমাজনিস্পৃহ, শুদ্ধাচারী এবং অন্তরনির্ভর। এদের মধ্যে পল ভালেরি এবং স্তেফান মালার্মেকে আমার যথার্থই বড় মাপের ভাবুক ও ভিন্নধর্মী কবি মনে হয়েছে। প্রতীকবাদী কাব্য আন্দোলনের পুরোহিতপ্রতিম লেখক মালার্মের কাছে বস্তুজগৎ গুরুত্ব পায়নি। তিনি মূল্য দিয়েছেন কবির স্বপ্নবিভোর চৈতন্যলোককে। পেঙ্গুইন বুকস থেকে প্রকাশিত মালার্মের কাব্যসংকলন, সংস্করণ ১৯৯০-এর ভূমিকায় আশ্রিত তার বিখ্যাত উক্তি প্রসঙ্গত স্মরণযোগ্য- ‘আমি বলি ফুল! আর সে বিস্মৃতির অনেক ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমার কণ্ঠস্বর আমার সব অবয়বরেখা ভেঙে-চুরে দেয়। পরিচিত বোঁটাগুলো থেকে সঙ্গীতের মতো করে জেগে ওঠে এক ধরনের ভাব-সুবাস কিন্তু তা কোনো ফুলের মধ্যে তুমি পাবে না।’ (অ্যান্টনি হার্টলের ইংরেজি অনুবাদ থেকে লেখককৃত বঙ্গানুবাদ, পৃষ্ঠা : XXVIII) কেননা প্রতীকবাদী জিজ্ঞাসা শিল্পীর বা কবির অন্তরের অভ্যন্তর থেকেই জাগে। এবং এর বিষয় সন্ধানের জন্য কবিকে তার আবেগের কাছে অর্থাৎ শিল্প-চৈতন্যময় অনুভূতিদেশেই বার বার ফিরে যেতে হয়।
অপূর্ণতাবোধ, অপ্রাপ্তি এবং হতাশাজাগানোর মতো বড় ধরনের অস্তিত্বসঙ্কটের আত্মদীর্ণতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রতীকবাদী কবি-শিল্পীদের সমাজ-বিমুখতা। প্রতীকবাদী শিল্প আন্দোলনের পর ইউরোপে আরও যেসব প্রধান শিল্প-আন্দোলন ঘটেছে সেগুলোরও সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ কবিই সমাজবাস্তবতার চেহারাকে তাদের কাব্যে জায়গা দেননি। যন্ত্রণাপ্রদ সূক্ষ্ম সংবেদন থেকেই তাদের এই দেশবাস্তবতার আপাতবর্জন। তবে তারা মানস-গভীরের রহস্যলোকেই জীবনের পরম অর্থ সন্ধান করে গেছেন। প্রতিভার বরপুত্রগণ এই পথেই সৃজিত কাজের ভেতর দিয়ে প্রদর্শন করতে পেরেছেন শিল্পের পরাকাষ্ঠা।
প্রতীকবাদী আন্দোলনের সমসময়েই ফ্রান্সে ‘পার্নাসিয় (Parnassiens) কবিগোষ্ঠী’ নামে একদল কবির আবির্ভাব ঘটে। অবশ্য ‘পার্নাসিয়’দের কাব্যচর্চা শুরু হয়েছিল প্রতীকবাদীদের কিছুটা আগেই। গ্রিক পুরাণে বর্ণিত পার্নাসিয়াস পর্বতটি দেবতা অ্যাপলো ও কলা-দেবী মিউজের বাসস্থান হিসেবে খ্যাত। পার্নাসিয় কবিসমাজ সেখান থেকেই নামটি গ্রহণ করেছেন। কাতুল মিন্দে (Catulle Mendes) এবং এল এক্স দ্য রিকার (L X de Ricard) নামে দুই তরুণ কবি ১৮৬৩ সালে একটি সংঘবদ্ধ কাব্যচর্চার কথা ভাবেন যার পরিণতি ওই পার্নাসিয় কবিগোষ্ঠী। এবং তাদের মুখপাত্র হিসেবে প্রথম কবিতা সঙ্কলনটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৬ সালে। মোটামুটি ১৮৭৬ পর্যন্ত ফ্রান্সে এদের সম্মিলিত প্রভাব বজায় ছিল।
পার্নাসীয় কবিরা মনে করতেন, কাব্যচর্চা হচ্ছে ধর্মচর্চার মতই পবিত্র ও বিশুদ্ধ কাজ যার জন্য ঐকান্তিকতা প্রয়োজন। পূর্বে অনুসৃত কাব্য-পথ বা কাব্যধারা সম্পর্কে সশ্রদ্ধ এই নতুন কবিরা ছন্দের প্রতিষ্ঠিত-পুরনো ধরনকে সাধ্যমতো ব্যবহার করেছেন। চিরায়ত মূল্যবোধগুলোর ওপরেও তাদের শ্রদ্ধা ছিল। তাদের কবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নৈর্ব্যক্তিকতা। ইতিহাস, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব প্রভৃতি নানা বিষয়ে লিখেছেন তারা। অনুপুঙ্খ বর্ণনা এবং যথার্থ চিত্রকল্পের প্রতি ছিল দুর্বলতা। অস্বচ্ছতা অথবা অতীন্দ্রিয়তার দিকে তারা ঝুঁকে পড়েননি। মজার ব্যাপার, পার্নাসীয় কবিদের লেখায় রোমান্টিক কবিদের মতো ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস দেখা যায় না অর্থাৎ স্বভাবে এদের কবিতা আধুনিক কবিতার কাছাকাছি। কিন্তু পার্নাসীয় কবিরা প্রতীকবাদের আধুনিকতাকে পুরোপুরি মেনে নেননি। এটা এরকম স্ববিরোধিতাই। ব্যক্তিগত মগ্নচৈতন্যের স্থলে নৈর্ব্যক্তিক বিষয়ভাবনা, রহস্যের বদলে স্পষ্টতা এবং রচনারীতির আধুনিকতর রূপের পরিবর্তে ঐতিহ্যসম্মত অবয়বতা ও সহজবোধ্যতার পুরনো পথ অনুসরণ করেছিলেন পার্নাসীয় কবিবৃন্দ। ফলে এদের কাব্য-আন্দোলনটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেনি। অন্য দিকে, প্রতীকী কবিতার আন্দোলন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই ইউরোপের অনেক দেশে এবং আমেরিকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনের যার কথা হচ্ছে, কবিতাকে হতে হবে এমন যাতে সে উপলব্ধির একটা চিত্তস্পর্শী অবয়ব দিতে পারে। আর তা করতে হলে কবিতাকে বিবৃতি প্রধান, বক্তব্যমূলক বা ভাবসর্বস্ব হতে দেয়া চলবে না। প্রতীকবাদী কবিদের ভাষ্য হচ্ছে, প্রতীকের রূপনির্মাণের মাধ্যমেই অনুভবকে অবয়বতা দেয়া সম্ভব। চিত্রকল্পবাদী কবিদের মতে তা সম্ভব কেবল হৃদয়গ্রাহী চিত্রকল্প সৃষ্টির ভেতর দিয়ে।
ইমেজিজম বা চিত্রকল্পবাদ-এর আন্দোলনের সূত্রপাত ইংল্যান্ডে। কেমন রাষ্ট্রিক-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওই আন্দোলন দেখা দিয়েছিল এবার সে কথা বলা যাক। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ ইউরোপের বড় দেশগুলো বেশ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। বাণিজ্যক্ষেত্রেও তারা প্রভাবশালী হতে চায়। দুর্বল দেশগুলোর ওপর মাতব্বরি করার এবং সাম্রাজ্যবিস্তারের ইতর অভিপ্রায় থেকে বৃহৎ শক্তিগুলো একজোট হতে থাকে। তারা বিশাল আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়ার কূট-কৌশলে লিপ্ত হয়ে ওঠে। তখন ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ অবস্থা শান্ত। নাগরিকরা নিরুদ্বিগ্ন। ততদিনে শিক্ষাবিস্তার ঘটেছে দেশে। আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমাজে। সভ্য শ্বেতাঙ্গ জাতি হিসেবে সাধারণ নাগরিকগণ গৌরববোধে আচ্ছন্ন। রাজনীতির ক্ষেত্রে আছেন ডিজরেইলি, গ্লাডস্টোনের মতো দক্ষ ব্যক্তিত্ব যাদের ওপর দেশবাসী ভরসা করতে পারে।
এমন দেশ-পরিস্থিতি শিল্পী-সাহিত্যিকদের পুরোপুরি সমাজচেতন হয়ে ওঠার পথে অন্তরায় হয়ে থাকে। আবার তা সংবেদী মানুষকে সমাজবিমুখও করে তোলে না, ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল উনিশ শতকের শেষ তিন দশকে; ফ্রান্সে। এর কম নিস্তরঙ্গ-নিরুদ্বেগ সময়ে বিলেতের কবিরা শুধুই কবিতা নিয়ে ভাববার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন। এটা তো পরিষ্কার যে, কাব্যক্ষেত্রে নতুন কিছু করার অভিপ্রায় থেকেই চিত্রকল্পবাদের উন্মেষ। ইংল্যান্ডের সমসাময়িক তরুণ কবিরা, স্বভাবতই, চিত্রকল্পের মনোতোষ নতুনত্বের চমৎকৃত হয়। কেননা এই রীতির ক্ষেত্রে কবির ভাবোচ্ছ্বাস নয়, গুরুত্ব পেয়েছে ভাষা দিয়ে তৈরি ভাবছবির বিষয়টি।
বিখ্যাত Poetry পত্রিকার মার্চ ১৯১৩ সংখ্যায় এজরা পাউন্ড ‘A few Donts’ নামের একটি লেখায় চিত্রকল্পবাদী কবিদের করণীয় সম্বন্ধে একটি দিকনির্দেশনা দেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯১৫ সালে ছয়জন অগ্রণী তরুণ কবির একটি কাব্য সঙ্কলনে কবিতাসমূহের পাশাপাশি সংযোজিত হয় চিত্রকল্পবাদের ইশতেহার। ওই ইশতেহারের ছয়টি সূত্রে দেশ পরিস্থিতির বা লেখকদের সমাজমনস্কতার পরিচয় নেই যদিও তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। তা সত্ত্বেও ওই সূত্রগুলোতে ফরাসি প্রতীকী কবিতার মতো বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা নেই। তা ছাড়া মানব-ভাবনার বহুমাত্রিকতার বিশিষ্ট রূপ প্রতিফলিত হয়েছে ওখানে। প্রাগুক্ত ইশতেহারে বর্ণিত নির্দেশনা অনুসারে এই নতুন কবিদের কাজ হচ্ছে To use the language of common speech… to creat new rhythms as the expression of new moods… to allow absolute freedom in the choice of suject. আরও বলা হয়েছে We believe passionately in the artistic value of modern life… we oppose the cosmic poet…
কল্পনবিলাসকে প্রশ্রয় দিলেও চিত্রকল্পবাদী কবিদের পা ছিল বাস্তবের মাটির ওপরেই। অবশ্য তাদের সমাজচেতনার চেহারা স্পষ্ট আকার লাভ করতে পারেনি।
এই সময় ‘জর্জিয়ান’ নামে আরেকটি কবিগোষ্ঠী দেখা দেয় ইংল্যান্ডে। এদের ভাবনায় নিজস্বতা ছিল। চিত্রকল্পবাদী কবিদের তবু খানিকটা সমাজ সংলগ্নতা ছিল। জর্জীয়রা দেশ, সমাজ, সমাজের পরিবর্তমান অবস্থা- এসব নিয়ে ভাবতে নারাজ ছিলেন সচেতনভাবেই।
তৎকালীন ক্ষমতাশীল রাজা পঞ্চম জর্জের (রাজস্বকাল ১৯১০-৩৬) নামানুসারে জর্জীয়রা তাদের কবিসমাজের নাম রাখে। রাজা বা প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করা নয় বরং তাদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়ার বিষয়টিই এখানে ফুটে উঠেছে। এর অর্থ এই কবিগণ স্থিতাবস্থা রক্ষা করায় বিশ্বাসী। কেবল তরুণ প্রতিভারা নয়, ওই সময়ের অনেক প্রতিষ্ঠিত কবিও এই গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন। এডওয়ার্ড মার্শ, ল্যাসেলেস অ্যাবারক্রম্বি, রুপার্ট ব্রুক, জন ডিঙ্কওয়াটার, হ্যারল্ড মানরো প্রমুখের নাম বলা যায়। মজার ব্যাপার, রচনাবৈশিষ্ট্যে জর্জিয়ান নন এমন কিছু কবিও; যেমন ডি.এইচ. লরেন্স, রবার্ট গ্রেভস; উক্ত কবি-দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এবং তাদের রচনাকর্ম ছাপতে হতো জর্জীয় কবিদের সম্পাদিত সাহিত্যের কাগজে। চিত্রকল্পবাদে ছিল যুগ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। জর্জিয়ানরা, অপরপক্ষে, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন। জর্জীয় কবিদের মনের ঝোঁক ছিল সহজ-সরল রাখালিয়া ধরনের কবিতার দিকে। প্রজ্ঞা বা অন্তর্দৃষ্টি তাদের কবিতায় চোখে পড়ে না। প্রচল ছন্দ ও আঙ্গিক মান্য করেই তারা কাব্যচর্চা করে গেছেন। ভালোবাসতেন ফুল-পাখি-নদী-সরোবর-অরণ্য পর্বত প্রভৃতি নিয়ে প্রথাসিদ্ধ কবিতা লিখতে এবং এসব লেখার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হতো নিস্তরঙ্গতাপ্রিয় মনের কোমল অনুভূতি। নতুন কিছু করার চেষ্টাই করেননি এই কবিরা। বরং সমযুগের লক্ষণ ও বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব থেকে কবিতাকে সযত্নে দূরে রেখেছেন। মোট কথা ১৯১০ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত জর্জীয় কবিদের রক্ষণশীলতার বিপরীতে চিত্রকল্পবাদীরাই ছিলেন আধুনিক এবং অগ্রগামী। ১৯১৯ সাল পর্যন্ত সক্রিয় থাকার পর এই ধারাটির অবসান ঘটে। ততদিনে এলিয়ট মঞ্চে প্রবেশ করেছেন তার ক্ষয়-ক্ষত-শূন্যতাবাহী ব্যতিক্রমী চিত্রকল্পের ডালা নিয়ে।
চিত্রকল্পবাদী ও জর্জীয় কবিদের সমকালে ইউরোপে Futurist বা ভবিষ্যৎবাদী নামের একটি কাব্য-আন্দোলন দেখা দিয়েছিল। এর সূত্রপাত হয় ফ্রান্সে যদিও এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইতালির কবি ফিলিপ্পো মারিনেত্তি। পুরো নাম ফিলিপ্পো টমাসো মারিনেত্তি। ফিউচারিস্ট কাব্যতত্ত্বের ধারণাটি প্রথম তার মাথাতেই আসে। এই মতবাদের সারকথা হচ্ছে বিদ্রোহ। প্যারিস থেকে প্রকাশিত ‘লে ফিগারো’ পত্রিকায় এ সম্পর্কিত যে মেনিফেস্টো পত্রস্থ হয়েছিল ১৯০৯ সালে তার আসল কথা হচ্ছে, মানবসভ্যতা এখন পরিবর্তন আকাঙ্ক্ষী। সে জন্য উনিশ শতকি পুরনো ধ্যান-ধারণাসমূহ ত্যাগ করতে হবে। নতুন কবিতাকে হতে হবে সাহসী, ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তাতে থাকবে প্রবৃত্তির প্রকাশ, বুনো আবেগ। প্রসাধনচর্চিত নয়, এই কবিতার মেজাজ হওয়া উচিত ইন্ডিয়-সংবেদী, যথেচ্ছাচারপূর্ণ এবং আক্রমণাত্মক। আর তার ভাষা হবে চিৎকার ও গালাগালির কাছাকাছি। তদুপরি, কাব্য ভাষায় ক্রিয়া ও বিশেষণের নতুন ধাঁচের প্রয়োগ দেখানো চাই। আরও থাকা চাই গণিত ও জ্যামিতির ভাষা- সংশ্লিষ্ট নানারকম চিহ্ন।
ইতালির রাজনৈতিক ইতিহাসের পটভূমি মাথায় থাকলেই কেবল মারিনেত্তির ওই কাব্য-আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুভব করা সম্ভব। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই ইতালিতে চালু ছিল নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের শাসন। ১৯০৩ থেকে ১৯১৪ সালের ভেতর তিনবার রাষ্ট্রপ্রধান হতে পেরেছিলেন জিয়োভান্নি জিয়োলিত্তি। জিয়োভান্নির কেবল ক্ষমতাপ্রীতিই ছিল না, মোটামুটি সফলতার সঙ্গে দেশ চালানোর মতো বিচক্ষণতাও ছিল। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল নাজুক।
ইতালির তৎকালীন সমাজ পুঁজিবাদনির্ভর। ধনী-গরিবের মধ্যে পার্থক্যও ছিল অনেকখানি। বিত্তহীনদের জন্য জীবিকার সুযোগ ছিল সামান্য। বহুদলীয় রাজনীতিতে যেহেতু সমালোচনা ও ভিন্নমত পোষণের অবকাশ থাকে, প্রতিষ্ঠা পায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য; তাই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অসন্তোষ ও ক্ষোভ দানা বাঁধবারও সুযোগ পায়। এবং তার প্রকাশও ঘটে। সুতরাং মারিনেত্তি ও তার সমমনা কবিদের লেখায় ক্ষুব্ধ মন তার প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছিল। এমনটা হওয়াই ছিল স্বাভাবিক কেননা সে সময় গোটা ইতালিই হয়ে উঠেছিল অসহিষ্ণু ও আক্রমণাত্মক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তা শিখর স্পর্শ করে। মারিনেত্তি আমৃত্যু সৃষ্টিশীল ছিলেন এবং শেষ দিন পর্যন্ত ভবিষ্যতবাদী কবিতার স্বপক্ষে লিখেছেন। বিশ্বযুদ্ধকালিক ঘোলাটে পরিস্থিতি ও নানা প্রতিকূল অবস্থার চাপে কোণঠাসা হতে হতে অবশেষে আন্দোলনটির বিলুপ্তি ঘটে ১৯২০ সাল নাগাদ। ইতালির আধুনিক কবিতায় ‘ভবিষ্যতবাদ’-এর অবদান অস্বীকার্য। ওই দলে জুসেপপে উনগারেত্তি এবং ইউজেনিও মনতালের মতো প্রভাবসম্পাতি গুরুত্বপূর্ণ কবিরাও ছিলেন। এই কাব্য-আন্দোলন দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। উত্তরকালের একাধিক শিল্পতত্ত্বের ওপরেও এর প্রভাব লক্ষ করা গেছে। আধুনিক সিনেমা এবং নাটকও এই তত্ত্বের মূলভাব গ্রহণ করেছে।
‘ভবিষ্যতবাদী’ কাব্য-আন্দোলনের প্রভাব পড়ে রাশিয়ায় ১৯১০ থেকে ১৯১৪-র মধ্যে সেখানকার ছোট ছোট অনেক কবিগোষ্ঠী নিজেদের ‘ভবিষ্যতবাদী’ বলে পরিচয় দিয়েছিল। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল Cubo-Futurist (ত্রিমাত্রিক ভবিষ্যতবাদী) গোষ্ঠীর কবিরা। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি, কবি ও চিত্রশিল্পী ডেভিড বারল্যুক (David Burlyuk ভেলেমির খলেবনিকভ ((Velemir Khlebnikov)) প্রমুখ। মায়াকোভস্কি শুধু সাড়া জাগানো কবিতাই লেখেননি, অগ্রণী লেখক মারিনেত্তির পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার মতই ‘ভবিষ্যতবাদী’ কবিতার ওপর প্রবন্ধও লিখেছেন। ১৯১২ সালে তিনি জনসাধারণের রুচির গালে থাপ্পড় নামে একটি আক্রমণাত্মক গদ্য লেখেন। এই রচনায় তিনি প্রচল ও বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের ওপর এক হাত নিয়েছেন। বঞ্চিত-পীড়িত জনসাধারণের অধিকার আদায়ে সোচ্চার কণ্ঠ মায়াকোভস্কির কাব্যভাষা কর্কশতাচিহ্নিত। রক্ষণশীলতাজনিত মসৃণতার বিপরীতে তিনি এনেছেন আপাতউদ্ভট ধ্বনির দ্যোতনা, উচ্চগ্রামের এক অনন্য মাধুরী। এবং এই সবকিছুকেই অর্থময়তা দিতে পেরেছেন ব্যতিক্রমী দক্ষতায়। অভিনব বাকপ্রতিমা এবং উদ্ভট ধ্বনিসমূহের ভেতর থেকে গূঢ় অর্থ বের করে আনার এই কৌশল-পরবর্তী আধুনিক ইউরোপের সাহিত্যে প্রযুক্ত হয়েছে বার বার। প্রশংসিতও হয়েছে। ১৯১৯-২০ সাল নাগাদ রুশ ফিউচারিস্ট কবিতাও অবসিত হয়ে আসে। ১৯১২ সালের দিকে ফ্রান্সের অত্যন্ত মেধাবী ও সজীব মনের কবি গিয়ুম আপোলিনেয়রও ‘ভবিষ্যতবাদ’-এর কাব্যতত্ত্ব দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অন্য ফরাসি কবিগণ এতে তেমন সাড়া দেননি। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, বিশ শতকের গোড়ার বছরগুলোতে রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত জারতন্ত্র এবং আত্মপর অভিজাততন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দেয়ার মানসতা সৃষ্টি হওয়ার তীব্রতম পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার কবিদের কবিতায় এই তত্ত্বের পরিপূর্ণ ও সার্থক প্রকাশ দেখা গেছে।
১৯১৪ সালের দিকে Vorticist বা ঘূর্ণনবাদী নামে আরেকটি শিল্পতত্ত্বের উন্মেষ ঘটেছিল। চিত্রকল্পবাদী কাব্য আন্দোলনের সমান্তরালে বছর তিনেক খানিকটা ঢেউ তুলে এর সমাপ্তি হয়। ভর্টিসিজমের ধারণাটি প্রথম মাথায় আসে কবি উইন্ডহ্যাম লুইসের। পরে এজরা পাউন্ডও এতে আগ্রহ দেখান। এই মতবাদটির উৎস চিত্রকলা। সেখান থেকেই এটা কবিতায় আসে। Vorticism কী? মহামতি অ্যারিস্টটলের মতে শিল্প কোন কিছুর অনুকরণ- মূলের অসম্পূর্ণ অনুকরণ। অপরদিকে ঘূর্ণনবাদীরা বললেন; না, শিল্প অনুকরণ নয়, নতুন সৃষ্টি। শিল্পীর কাজ হচ্ছে, অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে সেই ‘নতুন’- কে আকৃতি ও রূপ দেয়া। এ কাজ করতে গিয়ে কবিদেরকে সাহায্য নিতে হয়েছে প্রতীক এবং চিত্রকল্পের। তাই ঘূর্ণনবাদী কাব্য প্রতীকী ও চিত্রকল্পপ্রধান কবিতার অনেক কাছাকাছি। কবিতা ও চিত্রকলা উভয় শিল্পের ক্ষেত্রেই ভর্টিসিজমের ছাপ পড়েছিল। কেননা সমসময়ে কবি ও চিত্রীরা শিল্পভাবনার বিচারে কাছাকাছি ছিলেন। এবং তারা পরস্পরকে প্রভাবিতও করেছেন।
এখন আমরা বলবো Impressionism বা অনুভূতিবাদ প্রসঙ্গে। এই শিল্প আন্দোলনের জন্মস্থান ফ্রান্স এবং এর দ্বারা আধুনিক কবিতা ঋদ্ধ হয়েছে অনেকখানি। ১৮৭৪ সালে প্যারিসে প্রদর্শিত হয়েছিল বিশ্বখ্যাত শিল্পী ক্লোদ মোনের একটি চিত্রকর্ম। ছবিটার নাম ‘সূর্যোদয়: একটি উপলব্ধি।’ অনুভূতিবাদের ধারণাটি আসে ওখান থেকেই। এক্ষেত্রে মোনের ভাবসঙ্গী ছিলেন চিত্রশিল্পী পিসারো এবং সিসলি। মনের ভেতর চলিষ্ণু অনুভবগুলো যতটা সম্ভব সরাসরি চিত্রপটে তুলে আনতে হবে। রঙের ছোপ ফেলে, তুলির দ্রুত টানে, আলো-ছায়া ও গতির সমন্বয়ে যথাসম্ভব অল্প সময়ে তা সম্ভব করে তোলা চাই। কেননা সময় নিয়ে, চিন্তা করে, সযত্নে আঁকতে গেলে শিল্পী মনের ওই প্রথম অনুভূতিকে আদৌ ধরা যাবে না। অথচ মনের মধ্যে চলমান ভাবসমূহ যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে- যে প্রথম প্রতিক্রিয়া তাকে তুলে আনাই Impressionism-এর মূল কথা। আমি ভাবি, first impression is the best impression কথাটা কি ওখান থেকেই এসেছে? যাই হোক, অনুভূতিবাদী শিল্পীরা নিখুঁত হতে চাননি। তারা চেয়েছেন মনের প্রতিক্রিয়াকে রূপ দিতে আর সেই ‘রূপ’ দর্শক মনে কী প্রতিক্রিয়া জন্ম দেয় তা দেখতে। যদি রাজনৈতিক দিক থেকে বিচার করি, তাহলে বলতে হবে, মর্মপীড়াপ্রদ রাষ্ট্রিক-সামাজিক নৈরাজ্য থেকে পালানোর জন্যই একান্ত অনুভূতিলোকে আশ্রয় নিয়েছিলেন অনুভূতিবাদী শিল্পী ও কবিরা। ইমপ্রেশনইজমকে কবিতায় ফলপ্রসূ করে তোলার অভিপ্রায়ে কবিরা শব্দের যৌক্তিক বিন্যাস এমনকি কখনো কখনো শব্দাবলীর ভেতরের অর্থসঙ্গতিরও তোয়াক্কা করেননি। একই উদ্দেশে তারা বিচিত্র রকম ধ্বনি ও ভাষার সঙ্কেতকে যোগ্য উপায়ে ব্যবহার করেছেন।
Expressionism বা অভিব্যক্তিবাদেরও জন্ম চিত্রকলা থেকেই। ১৯০১-এ ফ্রান্সে ‘অভিব্যক্তিগুচ্ছ’ নামে জুলিয়ে অগুস্ত এরভে নামের এক শিল্পীর কাজের প্রদর্শনী হয়েছিল। মনে করা হয়, অভিব্যক্তিবাদের শুরুটা ওখানেই। বছর দশেকের ভেতর জার্মানিতে চিত্রসমালোচনার ক্ষেত্রে expressionism শব্দটির বহুল প্রয়োগ দেখা গেল। এই মতবাদেরও সার কথা বহির্জগতের গোলমেলে অবস্থা থেকে শিল্পীমনকে গুটিয়ে নেয়া। তবে কবি-শিল্পীরা কিন্তু ওই পরিস্থিতিকে আর ওই জগতের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেননি। বরং তারা বেদশর্ত আত্মার গাঢ় অনুভবকে রঙ-রেখার বিমূর্ততার ভেতর দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত জার্মানি ফ্রান্সের ওপর অনেকখানি অধিকার বজায় রাখতে পেরেছিল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ইউরোপের ক্ষমতা-জোটের বিন্যাসে পরিবর্তন আসে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স উপনিবেশ স্থাপন ও বাণিজ্যপ্রসারের ক্ষেত্রে তৎপর হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে জার্মানি পিছিয়ে পড়েছিল। প্রধান কারণ অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও শক্তিশালী নৌবাহিনীর অভাব। দেশটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে। ফলে জনমনে অনিরাপত্তাবোধ বাড়তে থাকে। পুঞ্জীভূত হতে থাকে অসন্তোষ। ক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, জার্মানি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দুর্বল জোটের সঙ্গে যুক্ততা ও পরাজয়ের কারণে জার্মানি বড় রকমের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। অসম্মানের গ্লানি আচ্ছন্ন করে দেশটিকে। এরকম পটভূমিতে অভ্যুদয় ঘটেছিল অভিব্যক্তিবাদের এবং তখনকার রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি ওই শিল্পতত্ত্বকে ফলপ্রসূ করে তুলতে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছিল। ১৯১৪ সাল নাগাদ জার্মান কবিতা ও নাটকে অভিব্যক্তিবাদী ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। এই আন্দোলন থেকে জন্ম নিয়েছে অন্তত দু’জন কালজয়ী লেখক- নাট্যকার স্ট্রিন্্ডবার্গ এবং কবি ও দার্শনিক গটফ্রিড বেন।
অভিব্যক্তিবাদের বিকাশের প্রায় সমসময়ে দাদাবাদী শিল্প-ভাবনার অভ্যুদয় ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। রুমানিয়ার কবি ত্রিস্তান জারা, হান্্স আর্প, জার্মান কবি হিউগো বল এবং রিচার্ড হালসেনবেক- এই চারজন মিলে ‘দাদা’ (Dada)শব্দটি আবিষ্কার করেন। এর দ্বারা তারা বুঝালেন সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, সমগ্রতা ও শূন্যতার বোধ। যা কিছু প্রথাগত, পরম্পরাচিহ্নিত এবং প্রচল অর্থে শোভন তার বিরুদ্ধে ছিলেন দাদাবাদীরা। রূপ-প্রতিমার প্রতিষ্ঠিত ইমেজটি ভেঙে ফেলে তারা সেখানে আনতে চাইলেন নতুন ধাঁচের রূপকল্প। দাদাবাদীগণ, অতএব, প্রশ্রয় দিলেন উদ্দাম কবি-কল্পনাকে। আঘাত করলেন যুক্তি, ধর্মবোধ ও নৈতিকতাকে। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা এবং সেই চেতনা থেকে জাত মানসচাঞ্চল্যের পরিপ্রেক্ষিতে দাদাবাদের মতো একটি শিল্প-তত্ত্বের উন্মেষ ঘটবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। এই শিল্প-ভাবনা চিত্রকলা ও কবিতা উভয় মাধ্যমকেই প্রভাবিত করে। বেশি প্রভাব পড়ে চিত্রকলার ওপর। ১৯২০-এর আগেই দাদাবাদী কবিরা ফ্রান্সে চলে যান। এই দলে যুক্ত হলো আঁদ্রে ব্রেতোঁ, লুই আরাগঁ উত্তরকালে যারা খ্যাতিমান হয়েছিলেন। Dadaism-এ বিশ্বাসী শিল্পী-কবিরা যতটা না গড়তে পেরেছেন তার চেয়ে ভেঙে ফেলেছেন বেশি। পাঁচ-ছ’বছরের মধ্যে এদের দলেও ভাঙন ধরে। আঁদ্রে ব্রেতোঁ নতুন এক শিল্পভাবনা নিয়ে এগিয়ে যান। ব্রেতোঁর নতুন তত্ত্ব পরাবাস্তববাদে অবশ্য শুধু ভাঙার কথা নয়, গড়ে তোলার কথাও আছে। দেখা যাক সেই নির্মাণের চেহারা কি রকম।
ফরাসি কবি ও নাট্যকার গিয়ম আপোলিনেয়র ১৯১৭ সালে তার একটি অ্যাবসার্ড নাটকের ভূমিকায় ঝঁৎৎবধষরংস শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। এর বাংলা করা হয়েছে পরাবাস্তববাদ। কী বোঝায় এর দ্বারা? পরাবাস্তববাদে অবচেতন মনকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মনের অবচেতন অবস্থার ছবি তুলে আনার কথা বলেছেন এই মতবাদে আস্থাশীল কবি ও শিল্পীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৃজনকল্পনা। সে জন্য পরাবাস্তববাদী কবিদের এবং বিশেষভাবে চিত্রীদের কাজে আমরা স্বপ্নে দৃষ্ট ছবির মতো ইমেজ দেখতে পাই। আঁদ্রে ব্রেতোঁ তার ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ‘স্যুররিয়েলিজম ইশতেহারে’ শব্দটিকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ব্রেতোঁ ছাড়া অন্য যারা এই নতুন কাব্যতত্ত্বের ওপর বই লিখেছেন তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে আসে পল এলুয়ারের নাম। এই শিল্পতত্ত্বে সচেতন মনের কর্মকাণ্ডকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে। সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে স্বপ্ন, দিবাস্বপ্ন, কল্পছবি এবং অর্ধচেতন মনের ভাবাচ্ছন্নতা। এই মতবাদে বিশ্বাসী কবিরা বলেন, শিল্প অনুকরণ নয়, শিল্প তেমন নতুন সৃষ্টি যাতে সত্যের উদ্ভাস থাকবে। এদের রচনাভঙ্গিতে প্রতীক ও চিত্রকল্পের গুরুত্ব স্বীকৃত। তবে ভাষার অভিনব প্রকাশ এবং উদ্ভট শব্দ বিন্যাসকেও তারা কম গুরুত্ব দেননি। চল্লিশ, পঞ্চাশ এমনকি ষাটের দশকে রচিত কাব্য ও কলাসাহিত্যেও পরাবাস্তববাদের গভীর অভিঘাত আছে। ওই প্রভাববলয় সক্রিয় ছিল সত্তরের দশক পর্যন্ত। বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং প্রবলভাবে আবদুল মান্নান সৈয়দ ওই শিল্পরীতির চর্চা করেছেন। পশ্চিমে আঁরি মিশো, জ্যাক প্রেভের, জন অ্যাশবেরি, হার্ট ক্রেন, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস প্রমুখের কবিতায় বিষয়টি কম-বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। উল্লিখিত কবিগণ সকলেই স্বপ্রণোদিত অনায়াস ও স্বয়ংক্রিয় কবিতায় বিশ্বাসী ছিলেন।
পরাবাস্তববাদী কবিদের মধ্যেও যুদ্ধ-বিগ্রহ, সমকালিক রুঢ় বাস্তবতা ও বিরাজমান সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি গভীর বিতৃষ্ণা ছিল। সুতরাং ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে এমন ভাবনা সক্রিয় ছিল তাদের মানসলোকে। এর ফলে সমাজতন্ত্রবাদী তাত্ত্বিকরা যখন তাদের মতবাদ নিয়ে হাজির হলেন এবং অডেন, স্পেনডার প্রমুখ সাম্যবাদী কবি তাদের লেখার মাধ্যমে সেই মতবাদের পালে জোর হাওয়া লাগালেন, তখন দেখা গেল আঁরাগ, এলুয়ারদের মতো কবিরাও সাম্যবাদী শিল্পতত্ত্বে আস্থাশীল হয়ে পড়লেন। এর প্রধান কারণ, সমাজতন্ত্রে দেশ-বাস্তবতার বাইরের চেহারাকে (যা ভেতরকেও প্রভাবিত করে) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যার ফলে ১৯৩০ সালের ভেতর ইউরোপে পরাবাস্তববাদী ভাবনার অবসান ঘটে। অবশ্য বহির্বিশ্বে তার তিরিশ-চল্লিশ বছর পরেও বিষয়টি চর্চিত হয়েছে; বাংলা কবিতা প্রসঙ্গে যার উল্লেখ আমি আগেই করেছি। আধুনিক চিত্রশিল্পীদের অনেকের মধ্যেই পরাবাস্তববাদের ছায়া অনুভব করা যায়। তবে প্রধানত মালভাদোর দালি এবং অংশত পাবলো পিকাসোর কাজে এর প্রতিফলন তীব্র ও প্রভাবসঞ্চারী।
সমাজবাদী শিল্প-সাহিত্যতত্ত্ব বিংশ শতাব্দীর গোটা তিরিশের দশক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত নানা বিবর্তনের ভেতর দিয়ে পূর্ণতাপ্রাপ্ত ও বহুব্যাপ্ত এই মতবাদ পরিণতি পেয়েছে। প্রথম যুগের মার্কস, লেনিন, লুকাচ হয়ে আর্নেস্ট ফিশার, জর্জ টমসন, থিওডোর অ্যাডরনো পর্যন্ত নানাভাবে বিবর্তিত ও বিস্তৃত হয়েছে তত্ত্বটি। সমাজবাদী শিল্প-সাহিত্য তত্ত্ব নির্দ্বিধায় এবং সরাসরি পৃথিবীর বাস্তবতাÑ সমাজের বিপন্ন-বিষন্ন চেহারা তুলে এনেছে। অন্ধকার, নিরাশা ও নির্বেদের সেই সব ছবি আলোর গোপন সম্ভাবনাও জাগিয়ে রাখে। আর এভাবেই একটা নতুন যুগ আরম্ভ হয় শিল্প-সাহিত্যভাবনার ইতিহাসে।