বরাবরের মত এবারেও হাতে পেলাম ‘নতুন এক মাত্রা’র ‘বসন্ত সংখ্যা’। হাতে পেয়ে পাতা উল্টাতেই নজর কাড়লো কবি আল মাহমুদের বসন্তবৈরী কবিতা। যদিও কবিতাটি এর আগেও পড়েছি। তবে দ্বিতীয়বার পড়তে মন্দ লাগলো না। এযেন সদ্য লেখা কবিতা। তারপরেই ছড়াকার আবিদ আযমের গ্রহণকৃত সাক্ষাতকার। সেটিও কবি আল মাহমুদের। বাংলা কবিতার নানা বিষয় উঠে এসেছে সাক্ষাতকারটিতে। উঠে এসেছে আল মাহমুদের কবি হওয়ার গল্প। তাঁরপরেই শ্রদ্ধা নিবেদন অংশে প্রাবন্ধিক ফজলুল হক তুহিন ‘বাংলা মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল’ শিরোনামে তুলে ধরেছেন কবি আল মাহমুদের সামগ্রিক সাহিত্যকর্মকে। প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আলোচনার উপজীব্য বিষয় হিসাবে বেছে নিয়েছেন আল মাহমুদের কবিতা। তার বিশাল কবিতার জগত থেকে খুঁজে খুঁজে বের করেছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। জসিম উদ্দিন দেখাতে চেয়েছেন আল মাহমুদের কবিতায় কীভাবে, কত রকমভাবে কতটা, নান্দনিকভাবে ইতিহাসের এই অংশটি ব্যবহৃত। জন্মশতবর্ষে কবি তালিম হোসেনকে নিয়ে স্মৃতিগদ্য লিখেছেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা জামান আব্বাসী। স্মৃতির পাশাপাশি কবিতা নিয়েও আলোচনা করেছেন তিনি। গবেষক আব্দুর রহিমের সুলিখিত গদ্যে উঠে এসেছে শওকত ওসমানের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে লেখা শওকত ওসমানের জাহান্নাম হইতে বিদায় দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল উনিশশ একাত্তর সালেই। এই প্রবন্ধটিতে নেকড়ে অরণ্য, দুই সৈদিক, জলাঙ্গী-এর মত পাঠক নন্দিত উপন্যাসের ভেতরদেশে নিয়ে জান তিনি। আতাউল হক মাসুমের আলোচনায় উঠে এসেছে কিংবদন্তী কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাসের আলোচনা। তবে আলোচনাটি আরো সমৃদ্ধ হতে পারতো। হুমায়ূন আহমেদের বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস এই আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। লেখক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে আরেকটু পরিশ্রম করতে পারতেন। তাতে করে লেখাটি আরো ঋদ্ধ হতো। প্রাবন্ধিক বিলু কবিরের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে আমরা কবি সাযযাদ কাদিরের নতুন সত্তাকে খুঁজে পায়। যে সাযযাদ কাদিরের পরিচয় তার কবিতা পড়ে হয়তো পাবো না। তার কবিতার জন্য যে পরিশ্রম, ব্যক্তি হিসাবে যে অমায়িক ব্যবহার, পড়াশোনার বিষয়ে যে সিরিয়াসনেস তারই আলোকপাত করেছেন বিলু কবীর।
এই পত্রিকার চমকপ্রদ গদ্য বলে মনে হয়েছে লালন : তর্ক-বিতর্ক, বাস্তবতা এবং কিছু কথা। প্রাবন্ধিক নির্ঝর আহমেদ প্লাবন যে খুব পরিশ্রম করে গদ্যটি রচনা করেছেন। তা পড়ামাত্র বুঝা যায়। লালন বিষয়ে নানা মুনির নানা মত প্রচলিত। অধিকাংশ গবেষকই লালন বিষয়ে যুক্তির চেয়ে নিজের পক্ষপাতী মননকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। গবেষকদের এই ক্ষীণদৃষ্টির কারণে মরমি কবি লালন শাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে বির্তকের পর বির্তক। এই সকল বির্তকিত বিষয়ের মাঝ থেকে লালনের মানসপট তুলে ধরার মত কঠিন-শক্ত কাজটি করেছেন তিনি। সে কারণে তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। সরদার জয়েন উদদীন আমাদের শিশুসাহিত্য থেকে বড়দের সাহিত্য সবশ্রেণির পাঠকের জন্য লিখেছেন। তার গল্পে যে সমাজবাস্তবতা সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন প্রাবন্ধিক আশরাফ পিন্টু। তবে লেখাটি আরো বিশ্লেষণাত্মক হতে পারতো। বাংলাদেশের অন্যতম কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। যার কবিতার সাথে জুড়ে আছে আবহমান বাংলার লোকায়িত জীবন। যিনি কবিতার মধ্যে বাংলার ঐতিহ্যকে আধুনিক ভাবে এনেছেন। সহজ ভাবে এনেছেন গভীর বাণী। তাঁকে নিয়ে ইমদাদুল হক মামুনের দীর্ঘ আলোচনা আমাদের মুগ্ধ করে। আসাদ চৌধুরীরের কাব্যেও মূল্যায়ণ করেছেন ইয়াহ্ইয়া মান্নান। তার আলোচনার মধ্য দিয়ে এই ফুলটির অন্তত দশ-দশটি প্রেমপত্র পাওয়ার কথা কাব্যের বিষয় ও শিল্পশৈলীগত দিকের সাথে পরিচয় ঘটে। ভি এস নাইপলকে নিয়ে উদয় শংকর দুর্জয়ের লেখায় নতুনত্ব না পেয়ে মর্মহত।
বরাবরই রঙিন অলংকরণে কবিতা আমাকে মুগ্ধ করে। তবে অলংকরণ বিষয়ে যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন সম্পদনা পরিষদ, কবিতা বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দিয়ে মানসম্পন্ন কবিতার প্রতি নজর দিলে ভালো করবেন। গুচ্ছ কবিতা বিভাগের উপরি পাওনা গীতিকবিতা। এমন বৈচিত্র্য আনলে পাঠক রুচি পরিবর্তীত হয়। তাতে করে পাঠক নতুনত্বে স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। আরবি সাহিত্যে অন্যতম কবি ইমরুল কায়েস। কবি ইমরুল কায়েসের কবিতা অনুৃবাদে নোমান সাদিক যে ছন্দের দিকটি গুরুত্ব দিয়েছেন তাতে তিনি দুঃসাহসিক কাজ করেছেন বলতেই হয়। এখন তো অধিকাংশ কবিতার অনুবাদ করা হয় গদ্যে। সেই ধারা থেকে নিজেকে বের হয়ে এসেছেন পাশাপাশি পাঠকদেরও মোহিত করেছেন। নাজিব ওয়াদুদের ধারাবাহিক উপন্যাস পদ্মাপাড়ের উপাখ্যান বিষয়ে পাঠকরা নিজেরাই এত দিনে বুঝে গেছেন য়ে এটি কতটা জীবনবাদী বিস্তৃত প্লটের কাহিনী হয়ে উঠছে। এই বিষয়ে মন্তব্য করা নিষ্প্রয়োজন বলে মনে করছি। কথাকার দিলতাজ রহমানের মমতাজ গল্পটির মধ্য দিয়ে নগর জীবনের যে সামাজিক ভিত্তি, সাংসারিক টানা পড়েন, বিশেষ করে নারী বিষয়ে আমাদের পুরুষবাদী সমাজে যে ধারণা তা যে একজন নারীকেউ আক্রান্ত করে সে প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। নানী আসমানী তারা পড়তে গিয়ে শরৎচন্দ্রের অভাগীর স্বর্গ।
গল্পের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। এই গল্পটির ভেতর দেশে উঠে এসেছে মুসলিম পরিবার জীবন-এতিহ্য। আভাগীর স্বর্গ গল্পে যেমন শ্মশানের বর্ণনা পাঠককে মাতাল হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি এই গল্পটিতে আছে জানাজাহ এর পুংখানুপুংখ চিত্র। এটি যে একটি ঐহিত্যবাদী লেখকের গল্প তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে যে গল্পটি পড়তে গিয়ে ছোখের জল ধরে রাখতে পারিনি তা হল বেদনার চাকে। আহমদ বাসিরের এই গল্পটির প্লট নগরকেন্দ্রিক অন্য গল্পকারদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তবে এমন গল্প পড়তে থাকলে পাঠক জীবন বিষয়ে হতাশ হয়ে ওঠেন কিনা? সেটা বিবেচ্য। মাহফুজুর রহমান আখন্দের মুগল চিত্রকলা প্রসঙ্গে আলোচনাটিই আমাদের দেশের শিল্পকলাকে জানাতে সহায়ক হবে বলেই মনে হয়।
শেষে এই কথাটিই বলবো যে, আস্তে আস্তে আরো সমৃদ্ধ হবে নতুন মাত্রা সে বিষয়ে আমি আশাবাদী। তবে সঠিক সময়ের মধ্যে পত্রিকাটি হাতে পেলে বেশি ভালো লাগতো। ধন্যবাদ নতুন এক মাত্রা পরিবারকে।
– নূরুজ্জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া