সকাল থেকেই আকাশটা মেতেছে লুকোচুরি খেলায়। সূর্য নেই নেই করে ঘোমটার আড়াল থেকে ফিক করে হেসেছিল মৃদু। তারপর কখন যেন আলো আলো ভাবটা গেল মরে। কিশোরীর ফুঁপিয়ে কাঁদার মতো একটু ছিঁচকাঁদুনে বৃষ্টি সহসা উড়ে যায় তুলোটে ডানায়। সেই থেকে আকাশটা হুতুম প্যাঁচা। কখন যে গাল ফুলিয়ে বেশুমার কাঁদতে বসবে ঠিক নেই।
এখন না শীত, না গরম। বাতাসে কু দিচ্ছে বসন্তের কোকিল। ঝুরঝুর পাতা ঝরে রাস্তাটা বনে গেছে পাতার কার্পেট। গাছগুলো যৌবন-হারা ন্যাড়া-কংকাল। রাস্তার উল্টোদিকে একটা মরা গাছ সেই কবে থেকে ক্রুশের মতো দাঁড়িয়ে আছে নিজের কবরের ওপর। অথচ এই গাছটাই একদা থোকা থোকা শাদা ফুল খোঁপায় পরে যৌবন দেখাতো উল্টেপাল্টে। মৃদু বাতাসে উড়ে উড়ে ঝরে পড়ত অগণিত খুদে তারার ফুল। এই ঝরে-পড়া ফুলের শিল্প অবিরত পিষ্ট হতো। ছুটন্ত যান্ত্রিক চাকায়। কিন্তু মুগ্ধতার ছোঁয়াটুকু তাতে বোধ করি মলিন হতো না এতটুকু। যৌবনের বিপুল আনন্দ বিলানো সেই নন্দিত গাছটি এখন এমনই অপাঙক্তেয় হয়েছে সবার কাছে, এ-দিয়ে চুলোর লাকড়ি বানাতেও প্রবল অনীহা তাদের।
রেবেকা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে এলোমেলো রুখু চুলগুলো টেনে খোঁপা করল। হাতে কতো কাজ পড়ে আছে, অথচ সেই কখন থেকে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। এই ছোট্ট বারান্দাটুকু একান্তই তার আপনার। কথায় বলে শখের গরু আকাশে ওড়ে। তার হয়েছে সেই দশা। যখন যেটা মনে ধরেছে একটা দুটো গাছ এনে ঠেসে পুঁতেছে নানারকম টবে। এখন এই গাছের জঙ্গল থেকে কোনটা রেখে কোনটা সরাবে তার দিক পাচ্ছে না। একটা আতা গাছ তো বুড়ো হাত চললো। ওটায় না ধরে ফুল, না ফল। শুধু ডালপালার ঠুনকো বাহার। দু’ একটা টুনটুনি ওখানে বসে ফুর্তির আমোদে মাতে। এইটুকুই যা চোখের আরাম।
রাকিবুলকে অবশ্য এসব কিছুই টানে না। সে অন্য জগতের মানুষ। সকাল-সন্ধ্যা ডেবিট-ক্রেডিটে মুখ গুঁজে থাকে। তাই বলে মনটারে লেজারের কাঠিন্যে সঁপে দেয়নি একেবারে। একটু চাপা টাইপ বলে প্রকাশের ভঙ্গিটা অন্যরকম। বিয়ের পর কথাবার্তা নেই নতুন বউ নিয়ে একবার সোজা হাজির হলো বৃক্ষমেলায়। গভীর কৌতূহল আর উৎসাহ নিয়ে মানুষটা এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখা শুরু করল যেন মস্ত এক বৃক্ষঅন্ত প্রাণ। গাছের ভুবনে পা দিয়ে তার নিজেরও একটু দিশাহারা ভাব হলো। নীলফামারীতে ফেলে-আসা ছেলেবেলার বাগানটা চকিতে ফিরে এলো চোখের সামনে। কত পদের গোলাপই না ছিল মৌ ভিলার সেই বাগানটায়! বদলি চাকরির সুবাদে বাবাকে ঘুরতে হয়েছে নানা প্রান্তে। সৌখিন মানুষ। যেখানে গেছেন খুঁজে খুঁজে দু-একটা চারা, নয়ত কলম তুলে এনে পুঁতেছেন শখের বাগানে। দোতলার বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে এই স্বর্গ-উদ্যানের রূপসুধা পান করেছেন বহুদিন। বাবা মারা যাবার পর সেই সুখ কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে!
‘কী হলো রেবু, অমন তন্ময় হয়ে কী ভাবছ?’
‘কই, কিছু নাতো!’
‘লুকাচ্ছো, আমি যদি ভুল না করি তুমি নিশ্চয় সেই গোলাপ বাগানের কথা ভাবছিলে…।’
‘ধ্যত, ও ভেবে আর কী হবে!’
‘কেন হবে না। একটু ওয়েট করো। আমি কিছুটা গুছিয়ে নিই। গাজীপুরে যে জায়গাটা আছে না আমাদের- ওই যে ভাওয়ালের জায়-জঙ্গলের ভেতর…।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আমরা একবার সেখানে যাবার সময় তুমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলে। শেষে নানা পথ ঘুরে একটা বাজারে থেমে ভাত খেয়েছিলাম।’
‘ঠিক বলেছ। কী যে বিড়ম্বনা হয়েছিল তোমার খাবার নিয়ে! কিছুতেই ভাঙা হোটেলটায় ঢুকবে না। তারপর যদিও বা নিমরাজি হলে, শেষতক মাছিটাছি নিয়ে শুরু করলে আরেক নাটক। না, না, কিছুতেই কোনো খাবার ছোঁবে না এই নরকের। ব্যবসা ছুটে যাচ্ছে দেখে ক্যাশবাক্স ফেলে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল আমুদে ছেলেটা। তারপর জামাই-বউ মিলে টেবিল সাফসুতরো শুধু নয়, তোমার প্লেট-গ্লাস ধুয়ে দিল সাবান দিয়ে। শরম-রাঙা কচি বউটার সঙ্গে দুটো কথা বলতে বলতে উঁকি দিয়ে দেখলে রান্নার নমুনা। শেষে তো সাত খুন মাফ। ঝাল ঝাল শুঁটকি ভর্তা আর তেলাপিয়ার ঝোল দিয়ে গরম ভাত খেতে খেতে কত যে তারিফ করলে রান্নার। খাবার শেষে বাইরের দোকান থেকে চা আর মিষ্টি পান এনে দিয়েছিল ছেলেটা। মনে আছে লেবু চা খেয়ে তুমি বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলেছিলে, এমন খাঁটি গরুর দুধের চা হাজার টাকা দিয়েও ঢাকায় মিলবে না।’ রাকিবুল একটা গোলাপকে আদর করতে করতে স্বপ্নের ঘোরে কথাগুলো বলল।
‘ওরে বাবা সব মনে রেখেছ দেখছি। সে তো কবেকার কথা। ওখান থেকে ভাতটাত খেয়ে আমরা রওয়ানা হয়েছিলাম তোমার জায়গা দেখতে। কেন যেন বার বার গুলিয়ে ফেলছিলে গ্রামের রাস্তাটা। কী যে বিশ্রী ব্যাপার। তুমি তো মেজাজ টং করে বসে আছো। ভাগ্যিস, একটু এদিক সেদিক ঘুরে শেষতক পৌঁছতে পেয়েছিলাম স্বপ্নের বিশ্রামপুরে।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমারই ভুল হয়েছিল পথ চিনতে। তুমি খুব টায়ার্ড হয়ে পড়েছিলে মনে আছে।’
‘আরে না, সেদিন অমন জোর করে না এলে একটা মিস হয়ে যেত।’ রেবেকা কথাটা বলে একটু যেন আনমনা হয়ে পড়ল।
বিয়ের পর এই বুনো জায়গাটার কথা দু-একবার শুনলেও অতটা আমলে আনেনি। বনবাদাড় মানেই তার কাছে সাপকোপ আর জোঁক-বিচ্ছুর আস্তানা। তবুও কেন জানি ঈদের এক ছুটিতে পণ করল বনেই তারা যাবে। রাকিবুল তো শুনেই না না করে উঠল। কৃত্রিম ভয়ের গলায় বলল, ‘বনে বাঘ-ভাল্লুক থাকতে পারে। না বাবা, আমি ওসবে নেই। তার চেয়ে চলো বরং নীলফামারী ঘুরে আসি। শ্বশুরবাড়ির দোতলায় বসে চা খেতে খেতে হিমালয়ের সূর্যোদয় দেখব…।’
‘হিমালয় পরে হবে। আমি ওই বাঘ দেখতেই বনে যাবো কাল। তুমি আর না করতে পারবে না। ঠিক তো?’
আসলে মনের দিক থেকে রাকিবুল এক পা বাড়িয়েই ছিল। মানুষটা একটু অলস গোছের। সঙ্গী না পেয়ে সে ও-মুখো হয়নি বহুদিন। এবার বউয়ের কথায় নেচে উঠল।
গাড়ি থেকে নেমে ওরা মাটির রাস্তা ধরে সামান্য হেঁটে চলে এলো টিলার কাছে। গাছপালার বিপুল আড়াল বলেই জায়গাটা ছায়ামগ্ন। চিকন অলস রোদ শুয়ে আছে ঝোপঝাড়ের চূড়ায়। নিঝুম নীরবতা ভেঙে কী একটা পাখি ডেকে উঠল কুউপ কুউপ করে। রাকিবুল সামান্য ঝুঁকে পাশের লতানো গাছটা থেকে একটা নীল ফুল তুলে এনে তার হাতে দিয়ে বলল, ‘ওয়েলকাম টু বিশ্রামপুর। তুমি তো গাছটাছ খুব পছন্দ করো। আজ জমশেদ বেঁচে থাকলে দারুণ হতো। পাগলটা জোরজার করে জায়গাটা কেনালো আমাকে দিয়ে। বিশ্রামপুর নামটাও ওর দেয়া। এখানে বসে নিরিবিলি ছবি আঁকবে। আর্টক্যাম্প করবে। কত প্ল্যান। কিছুই হলো না। বেচারা ঘুমের মধ্যে মরে পড়ে থাকল রামপুরার মেসে। ব্যস, খেল খতম…।’ রাকিবুল বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশের গাছ থেকে প্যাঁচানো একটা লতা ছিঁড়ে বলল, এই লতাগুলো খুব কাজের। কেজি দরে বিক্রি হয় বাজারে। বাঁশ বেতের কাজে এসব দরকার পড়ে। বুঝলে না, জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা…।’
‘ঠিকই বলেছ। এই দ্যাখোনা কার গোয়ালে কে দেয় ধোঁয়া। মানুষটা তোমাকে দিয়ে জঙ্গল কেনালেন নিজে থাকবেন বলে। আজ কোথায় উনি? হয়তো ভাবছো পাগলটা তোমার একগুচ্ছ টাকা পানিতে ফেলে দিলো। কিন্তু ভদ্রলোক তোমার কত বড় একটা উপকার করে গেছেন এখন নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ?’ রেবেকা দার্শনিকের গলায় কথাটা বলে উদাস হয়ে গেল।
‘কেন বুঝব না! এক ডেভেলপার তো জোঁকের মতো লেগে আছে জায়গাটার জন্য। ওরা রিমোট বানাতে চায়। টাকা কোনো ব্যাপার না। রাজি হলেই হয়।’
‘খবরদার, ওসব কথা কানে তুলবে না। এখানে স্রেফ একটা মাটির ঘর তুলব। তোমাদের ঢাকায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে আমার। স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দেবো ভাবছি। তোমার তো আর যাহোক টাকা-পয়সা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। নিজেদের এতোবড় বাড়ি। শকের চাকরি করছো আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছো মনের সুখে। কোনো পিছুটান তো দেখি না। আমি কিন্তু ঠিকই একদিন চলে আসব বিশ্রামপুরে। এখানে নতুন করে ঢেলে সাজাবো সবকিছু। ঘুরে ঘুরে নানারকম গাছপালা এনে লাগাব বাবার মতো। কোনো ইট-সিমেন্টের বালাই থাকবে না। শুধু একটা মাটির ঘর হলেই চলে যাবে। শুকনো ডালপালা কুড়িয়ে উঠোনে বসে ভাত রাঁধব নিজের হাতে। চুলোয় ফুঁ দিতে দিতে হয়ত চোখে পানি এসে যাবে। তা যাক না- এ আর এমন কী? গাছকোমর বেঁধে চালের নাগাল থেকে টুক করে ছিঁড়ে আনব তরতাজা লাউ। তুমি মাথায় গামছার টোপর পরে কলস নিয়ে পানি আনতে যাবে পলিবাড়ির ইঁদারায়। তারপর ভাতটাত খেয়ে গাছতলার শুকনো পাতার বিছানায় দু’জনে মহাসুখে ঘুমিয়ে পড়ব ঘুঘুর ডাক শুনতে শুনতে।’ রেবেকা গভীর আবেশে এমন তন্দ্রাচ্ছন্ন গলায় কথাটা বলল যেন সত্যি সত্যি এখনই ঘুমিয়ে পড়বে।
‘বাপের যুগ্যি মেয়ে যাহোক। ভদ্রলোক গাছপালার রোগটা ভালোরকমই ধরিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে। ঠিক আছে, তুমি যখন স্বেচ্ছায় বনবাসী হতে চাইছ, আমি না হয় বনমালী হয়ে কাটিয়ে দেব বাকি জীবনটা…।’ রাকিবুল মজার গলায় কথাটা বলে খুক খুক কেশে উঠল।
বৃষ্টির বড় দুটো ফোঁটা মাথায় পড়তেই সম্বিত ফিরে পেল রেবেকা। ছুটির দিন বলেই বৃক্ষমেলায় ভিড় উপচে পড়েছে এতক্ষণে। ওদিকে আকাশটাও সেজে উঠেছে মেঘে মেঘে। উত্তর থেকে নিঃশ্বাস ফেলছে রাগী হাওয়ার বেগ। ঝির ঝিরে রেশমি বৃষ্টিটা টুংটাং তাল ঠুকছে সেতারে। ভেজা হাওয়ায় বৃষ্টির গন্ধ চুরিয়ে উঠছে।
গোলাপ ঝাড় থেকে চোখ ঘুরিয়ে মানুষটাকে দুমুহূর্ত খুঁজল। দূরে নয়, কাছের একটা স্টলেই সে মগ্ন হয়ে আছে একটা বনসাই প্রিয়। বোঝা গেল ব্যাপারটা খুব মনে ধরেছে তার। বোতলভূতের মতো একটা বাড়ন্ত গাছকে কেমন ছেঁটেকেটে বছরের পর বছর বেঁটে করে রাখছে- এ এক অপার বিস্ময়। চালাক-দোকানি এই বিস্ময় কাজে লাগিয়ে ভালোরকম খসিয়ে নিয়েছে পাগলেটে খদ্দেরের কাছ থেকে। মানুষটার খুশি দেখে পুলকিত হলেও মুখে তা প্রকাশ করল না। গাছ গিনিপিগ করে মানুষের এই নির্মম-বিনোদন আর যাহোক তার ভালো লাগে না।
রাকিবুল কী বুঝল কে জানে। সে মৃদু হেসে বনসাইয়ের ছোট্ট টবটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘তোমাকে কখনও কিছু দেয়া হয় না। এটা দিলাম। জীবন তো এমনই…।’
সেই কবেকার কথা। কিন্তু মনে হয় এই তো যেন সেদিন। সেই গাছটা এখনও তেমনি আছে। শুধু বদলে গেছে মানুষটা।
রেবেকা ব্যস্ত পায়ে গা-ঝাড়া দিয়ে চলে এলো ভেতরে। ইস, কতো বেলা হয়ে গেল! অথচ কী এক ঘোরের ভেতর সে ডুবে আছে সেই সকাল থেকে। ওদিকে যা ভয় করেছিল তাই ঘটেছে। অসুস্থ কংকালসার মানুষটা আছড়ে-বিছড়ে পড়ে আছে খাটের এক কোণে। মানুষ তো নয়, আউলা বাতাসে বাসা থেকে ছিটকে-পড়া ছোট্ট এক পাখির ছানা। সাত বছর ধরে মানুষটা নিঃশেষ হতে হতে এ অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে একবার সিঙ্গাপুরে নেবার কথা উঠলেও রোগীর অবস্থা দেখে তা না করে দিয়েছেন ডাক্তার। রোগটা কটর-মটর টাইপের। সবাই কেবল তত্ত্বের কথা বলে। কাজের কাজ হয় না কিছু। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংও নাকি এর ছোবল থেকে রেহাই পাননি। তাহলে এখন কি শুধুই দিন পার করার ছলনা!
আর বসে থাকার সময় নেই। দ্রুত হাতে মানুষটাকে ধরাধরি করে শুইয়ে দিল বিছানায়। অ্যান্টিশোর এয়ার-ম্যাট্রেসে রেখে ঠেকাতে হচ্ছে ঘায়ের তাণ্ডব। বাঁকানো হাত-পায়ের জন্য আলাদা ফিজিও থেরাপির ব্যবস্থা। একজন হাসপাতালের লোক নিয়ম করে এসে এটা করে দিয়ে যায়। শুধুই টাকার শ্রাদ্ধ কাজের কাজ হয় না কিছু।
রেবেকা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে এমন সযত্নে প্যাম্পারটা খুলল যেন পাকা নার্স অতিশয়। ওয়েট টিস্যু, গরম পানি, সাবান-স্যাভলন, এয়ার ফ্রেশনার- সব ধাপ শেষ করে একটা ফতুয়া পরিয়ে দিল গায়ে। মায়ের কাজের সময় টুলু এ ঘরে আসে না। ছেলেটা ক্লাস নাইনে উঠে কেমন যেন একটু বড় হয়ে গেছে। বাবার শিয়রের কাছে গম্ভীর মুখে চুপচাপ বসে থাকে মাঝে মধ্যে। হয়ত আলগোছে বাবার শীর্ণ হাতখানা একটু ধরে। আনমনে বিলি কাটে রুখু চুলগুলোতে। বাবা ছিল ওর প্রিয় বন্ধু। সেই এতো কাছের মানুষটা এভাবে ধীরে ধীরে নির্বাক কংকাল হয়ে যাবার পর টুলুও যেন চুপচাপ বদলে যায় অনেকটা। ঘরের কোণে বইটই নিয়ে বসে থাকে মুখ গুঁজে। ডেকেও সাড়া পাওয়া যায় না সহজে। আজ কী হলো! গেল কোথায় ছেলেটা? আবার কি বৃষ্টি শুরু হলো নাকি? আকাশজুড়ে ঘন মেঘ পেখম তুলে নাচছে। কোথায় যেন বাজ পড়ল কানফাটা শব্দে। দেখতে দেখতে অন্ধকার চাদরে ঢেকে গেল চারদিক। প্রবল দমকা বাতাস আছড়ে পড়ছে শোঁ শোঁ শব্দে। তার বুকের সবটুকু তাপ শুষে নিয়ে প্রকৃতি এখন মহাক্রোধে ফেটে পড়ছে।
রেবেকা প্রবল উৎকণ্ঠায় দ্রুত পায়ে ছুটে এলো শখের বারান্দায়। সব হারানোর কষ্ট তার সইবে, কিন্তু প্রিয় বনসাই হারিয়ে গেলে সে কী নিয়ে বাঁচবে!