ও পাথর, তুমি এতো পাষাণ কেন গো? পাষাণ হলেও তোমাকেই যে মিতা মেনেছি। এই পাহাড়কে সাক্ষী রেখে, আর গাছপালা যাহ্। গাছাপালাই বা কোথায়, সবই তো পাথর পাথর- পাথরগুলোকেই সাক্ষী মেনে আর ঐ যে হাওয়া বাতাস নানান ছন্দে নেচে নেচে নানান ভাষায় সুর-আওয়াজ তুলে চক্কর খায় তোমার চারপাশে তাকে সাক্ষী ধরে নিয়ে আমার কথাগুলো বলি। দুঃখের কথা। বেদনার কথা। কষ্টের কথা। ব্যথার কথা। আহাজারির কথা। কান্নার কথা। হাহাকারের কথা। সুখের কথাও কি? আনন্দ হাসির? বলতে পার সুখ আনন্দ হাসি কাকে বলে কোথায় থাকে? জন্মেই দেখি বাবার গোমড়া মুখ। আমারও মুখটাও তেমনি আদল নিয়েছে। ঠিক তোমার খটখটে পাষাণী চেহারার মতো। তাইতো তোমার কাছে আসি। আমার মনের সব কথা চুপি চুপি তোমাকেই বলি। আর কাকে বলব? কে শুনবে আমার কথা? আবার শুনলেও বিপদ। রাজার শূন তৈরি হয়ে আছে বিঁধবে বলে। তাই যত কথা জমিয়ে রাখি তোমার বুকে। ছুটে আসি পাহাড়ের এই নিরিবিলিতে। পাথর গো, তোমার কানে মুখ রেখে আমার কথা শুনাই। কথাগুলো তুমি জমিয়ে রেখো। সময় এলে উসলে দিও সবার মাঝে। পাথর তুমি, আমার কান্না কি তোমার কানেও জমে?
গৈ-গেরামের জনপদ থেকে পাহাড়টা খানিক দূরে। গ্রামের মাথার ঠিক উত্তরে। দক্ষিণে রাজধানী। পাহাড়ের চাইতে রাজধানীই কাছে। দু’কদম আগ বাড়লেই রাজা-রাণীর রাজপ্রাসাদ। আর উত্তরে পাহাড়ে যেতে হয় অনেকগুলো এবড়ো থেবড়ো ক্ষেত-জমির আল ভেঙে ভেঙে। বুনো ঝোপ জঙ্গল পেরিয়ে। তারপর খানিকটা পাথুরে প্রান্তর। পাড়ি দিলেই আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুক্ষ্মসূক্ষ্ম পাহাড়। পাহাড় তো নয় যেন জগদ্দল পাথর।
ক্ষেত জমিতে গরু চরায় রাখাল। আপন মনে তারা ঘাস বিচালি কচি গাছের পাতা চিবোয়। তাদের স্বাধীন ছেড়ে দিয়ে রাখাল চলে আসে এই পাহাড়ে।
পাহাড়ের একটু ভেতরেই পাথর খুঁড়ে সে ছোট খাট একটা গর্ত বানিয়েছে। এই গর্তে মুখ রেখে সে তার না বলে তো উপায়ই নেই।
কোনো কথা বলতে গেলেই মা বলে: চুপ!
বাবার কাছে তো ঘেঁষাই যায় না। আবদার করা তো দূরে থাক। ঠোঁট নড়তে দেখলেই বাবা বলে ওঠে : চুপ!
দেন-দরবার-সালিশ-মজলিসে গাঁয়ের প্রধান মাতবর ময়-মুরুব্বিরা ধাঁধা করে ওঠে: চুপ!
দিনকাল রাতভর চারপাশে ঘুর ঘুর করে পাইক বরকন্দাজ লের্বেন সিপাইরা। তাদেরও বজ্র নির্মোঘ: চুপ!
কথা নাই। কাজ বেশি। করো করো করো। খেটে মরো। অচিরে দেখো রাজ-রাজড়ার উন্নতির রথ। বাণী শোনো তাদের থেকে। বাণী বাণী অমৃত বাণী।
কিন্তু বেচারা রাখাল ছেলে। তার যে কথা কইতে ইচ্ছে করে অনেক। পেটের ভেতর কথাগুলো ভুর ভুর করে। কামড়ায়। আবার গুরু গুরু করে মেঘের ডাকের মত। একদিন মনের কথা কাউকে কইতে না পেরে তার সেকি ছটফটানি! কেন এমন হয় কে জানে! গরুগুলোকে ক্ষেতে ছেড়ে দিয়ে সে আপন মনে হাঁটতে থাকে। আর মনের ভেতর কথাগুলোকে গুনগুনিয়ে তোলে।
হাঁটতে হাঁটতে কখন যে সে পাথর-ঢাকা পাহাড়ে এসেছে, চলতে চলতে ঢুকে পড়েছে পাহাড়ের বেশ ভেতরে খেয়ালই হয়নি। একটা উঁচু পাহাড় তার পথ আটকে দেয়। সে স্থির দাঁড়িয়ে পড়ে। চারদিক তাকিয়ে দেখে চারপাশ পাহাড় আর পাহাড়। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। একা!
বাহ! এই তো বেশ জায়গা। এখানে কোনো মানুষজন নেই। শাসন করার কেউ নেই। তাকে বাধা দেয়ার কেউ নেই। কেউ ঠোঁটে তর্জনি ছুঁয়ে বলবে না: চুপ!
আজ সে কথা বলবে। সে মুখ খুলল। কিন্তু কথা বেরুচ্ছে না কেন? এক ধরনের জড়তা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গলা পরিষ্কার করে সে বলে উঠল: শোনো!
পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ধ্বনি উঠল: শোনো!
এক কণ্ঠস্বর আওয়াজ তুলল কয়েক কণ্ঠস্বরের। নিজের গলার স্বর শুনতে তার ভালো লাগায়।
সে কণ্ঠে আরো জোর এনে চিৎকার করে বলল: আমি কথা বলতে চাই।
শ্লোগানের মতো ফেটে পড়ল এ ধ্বনি। চারদিক থেকে চলল এর অনুরণন। এক পাহাড়ের প্রতিধ্বনি ফিরে এসে ধাক্কা দিচ্ছে আরেক পাহাড়কে। বাজছে আওয়াজ। এতো শব্দ তরঙ্গে হতচকিত হয়ে পড়ল রাখাল ছেলে। ভড়কে গেল খানিকটা।
মাথা ঝাঁকিয়ে আপন মনে বলল: না। এমনভাবে হবে না। কেউ না কেউ একদিন এখানে আসবে। শুনে ফেলবে তার কথা। কত কথা তার। সব কথা সে বলবে। বলবে আর জমিয়ে রাখবে। এই পাহাড়েই।
ভেবে ভেবে সে ঠিক করল ঠিক করবে। এক পাহাড়ে খানিকটা ওঠে দু’তিনটে পাথরের চাঙড় সরিয়ে গর্তের মতো জানালো। কথা হবে এই খোড়ল গর্তে। চুপি চুপি। পাহাড়ের বুকে। পাহাড়ের সিন্দুকে। এখানেই জমিয়ে রাখবে তার যত কথা।
ও পাথর, পাথর ভাই! তুমি কি আমার কথা শুনতে পারছ। আমার দুঃখগুলো সব জমিয়ে রাখবে। তোমার খোড়লে। সময়ে তুমি জানিয়ে দিবে এক রাখাল ছেলের সকল দুঃখ!
ধানের ক্ষেতে ঘুঘুর আবাদ
ক্ষেত জমিতে হাল চাষ শেষ। গায়ের কিষাণরা মনের আনন্দে ধানের বীজ ছড়িয়ে যাচ্ছিল চষা ক্ষেতে। আনন্দই বটে। গতবারের ধানের গোলা ভরে হয়েছে টইটম্বুর। এর সাথে আঁখের আবাদ। পাকানো গুড়ের গন্ধে ঘর মৌ মৌ। পাটের আবাদ ঘরে আনবে কড়ি মোহর। এবারে আকাশের গতিকও ভালো বলেই মনে হচ্ছে। ফসলের মাঠ মৌসুম শেষে পাশ ধানের ঘ্রাণে জান ভরিয়ে দিবে নিশ্চয়ই। এ আনন্দে কৃষকদের ঠোঁটে পাখির শিস। কণ্ঠে গুন গুন গান। ওরা ভুলেই গিয়েছে এ রাজত্বে জোরে আওয়াজ করতে নেই- একমাত্র রাজার জয়ধ্বনি ছাড়া। প্রজার ধর্ম হলো চুপ করে থাকা আর রাজার পরিষদদের সব কথায় পুতুলের মতো ঘাড় নেড়ে সায় দেয়া।
মনের ভেতর যদি আনন্দ-বালক থাকায়, তাহলে কি আর চাঙ্গা মনটাকে এতোসব বিধি-নিষেধ বিধান-আদেশের মধ্যে আটকে রাখা যায়! তখন তো হাত তুলে নাচানাচি করতে ইচ্ছে করে গো!
এমন সময় বেজে উঠল ডমুর ঢাকা। বাজবাদ্য। সাথে সাথে বজ্র নির্ঘোষ: শোনো শোনো শোনো!
হাইথ্যা হাল ফেলে ছুটল। চাষা চাষ বন্ধ করে কান পাতল। জাউল্যা জাল রেখে দৌড়ে এলো। কামার বাদ্য শুনে তালগোল হারিয়ে গনগনে আগুনের ভেতর লোহা হাতুড়ি ফেলে হাঁফাতে হাঁফাতো এলো, তাঁতি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাঁত থামিয়ে কান পেতে রইল। তাইতো! এ সময় তো রাজার এখানে আসার কথা নয়। কী এমন বিপত্তি ঘটল যে রাজার নকিবরা ঢোল-সহজরত নিয়ে নগর-বন্দর-গৈ-গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে!
: শোনো হে পুরবাসী! শোনে গৈ-গেরামের লোকজন। শোনো সকল প্রজা! এসেছে ফরমান। রাজার নতুন ফরমান! হয়েছে কারবার। কিষাণের গোলায় ভরা ধান দেখে রাজ দরবারের নিশ্চয়ই লাখস বেড়ে গিয়েছে। খাজনা বাড়িয়ে কবে তিন গুণ। ধান আর কিষাণের রইবে না, যাবে রাজার গোলায়। ভাবতে ভাবতেই প্রজা সাধারণের মুখ শুকিয়ে আমসি।
রাজার লোক সিপাই-সান্ত্রীদের এসব দেখার ফুরসত নেই। সব জায়গায় সব প্রজার কানে রাজ্যের ফরমাস পৌঁছে দিতে হবে, তাই নিয়েই তারা ব্যতিব্যস্ত। কত ঢঙে কত রঙে যে বাদ্য বাজাল তারা তার ঠিক-ঠিকানা নেই। তারপর এলো সেই ঘোষণা। সোজা-সাপ্টা সাদামাটা ঘোষণা। এবার ফসল ভালো হয়েছে। প্রজাদের মনে খুশি। তাই মহারাজাও খুশি। প্রজাদের কল্যাণ আর মঙ্গলেই তো তার আনন্দ। তাই তিনি প্রজাদের জন্য আরো খোশ খবরের ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য প্রজাকুল মহাধিরাজের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তাঁর গুণকীর্তন করে শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য।
খোশখবর হলো: এ মওসুমের জন্য রায়ত-প্রজাদের জন্য সব খাজনা মওকুফ!
ঘোষণা শুনে প্রজাদের চোখ চড়ক গাছ। এমন অবাক করা ঘোষণা তারা জিন্দেগিতেও শোনেনি। তারা কেন, তাদের সাতপুরুষেও হয়নি। আগের কালে রাজাদের বদান্যতায় অভাব অনটন খরা দুর্ভিক্ষে খাজনা মওকুফ হতো, কিন্তু কৃষকের গোলাভরা ধানে খাজনা উঠত চড়চড় কর- এমন সৃষ্টি ছাড়া মওকুফের ভাবনা তাদের কল্পনাতেও নাই।
এ ঘোষণা ঠিক বিশ্বাস করবে কিনা বুঝে উঠতে পারছে না, এ ওর মুখে তাকাতাকি করছে। এমন ধারা ঘোষণার পেছনে আর কোনো মতলব নাই তো! ওদের মুখগুলো আরো শুকিয়ে আসে। আরো মলিন হয়ে ওঠে অজানা আশঙ্কায়।
রাজার লোকেরাও অবাক। এমন ঘোষণা শুনে তো প্রজারা আনন্দে দিশেহারা হয়ে ফেটে পড়ার কথা। কিন্তু এরা তো দেখা যাচ্ছে জড়পাথর হয়ে পড়েছে। অতি শোকে যেমন পাথর, অতি সুখেও কি তাই?
প্রধান নজিব ফিসফিস করে বলল: কিগো, তোমাদের আনন্দ লাগছে না? কথা কইছো না কেন? হাসছো না কেন?
প্রজাদের মধ্যে বুদ্ধিমান একজন। রাজা নিশ্চয়ই চাইছেন এ খবরে তারা আনন্দ করুক। এমন চিমসে মুখে এরপরও আনন্দ না ফুটলে তো তাদের গর্দান যাবে। হাত জোড় করে বলল : হুজুর, আমরা তো গোলাম। মহারাজের হুকুমে আমাদের চুপটি মেরে থাকা ধর্ম। অনুমতি পেলেই আমরা হাসতে পারি।
ঢাকিতে আওয়াজ উঠল দ্রিম দ্রিম দ্রিম। প্রজাদের সব আনন্দ যেন জড়ো করে ঢাকিয়েত কোরাস তুলল।
: হাসো। হাসো। হাসো। আনন্দ কর। উৎসব কর। হাসতে হাসতে গড়িয়ে যাও। মহামতি রাজাধিরাজের বন্দনা কর আর স্তব কর।
কত রকম হাসি। মনে আসে না হাসি। মুখ ঠোঁট চোখ হাসির নানা আদল নিয়ে ফুটে উঠল। তেমন তার বিচিত্র রকম আওয়াজ। হাসির শব্দ। ইলবিল খিল খিল।
হুক্কা হুক্কা হি: হি: হা: হা:। খ্যাসখ্যাসে হাসি ফ্যাসফ্যাসে হাসি। অট্টহাসি বদখত হাসি। মৃদু হাসি গোল হাসি চ্যাপ্টা হাসি নাকি হাসি। চারপাশের আবহাওয়াই হাস্যময় লাস্যময় উষ্ণ গরম হয়ে উঠল। এবার বাজল দামামা। জোর আওয়াজ। ঢাক ঢোল ঢাকিও। তারপর একটানা সিঙ্গার আওয়াজ।
সবাই হাসি থামিয়ে দিন। আবার নতুন কিছু আসছে বুঝি। সবার মুখ গুরুগম্ভীর। রাজার লোকেরা আরো।
এবার বজ্রনির্মোঘ। ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। দিগন্তেও। মেঘ ছাড়িয়ে ডাক তুলছে ঊর্ধ্ব-আকাশে।
: শোনো হে কৃষক কুল! এবার পাট আঁখ যা হয়েছে, এরপর এগুলোর চাষ আবাদ ফসল আর প্রয়োজন নাই। এখন থেকে কেউ তার জমিতে ধানের বীজ ফেলতে পারবে না। লাগাতে পারবে না পাট কিংবা আঁখ। বা অন্য কোনো ফসল যা তোমরা বরাবর চাষ করে আসছো।
প্রজাদের মুখের বানানো হাসিটাও গেল মুছে। তারা চোখ গোল গোল করে এ ওর দিকে তাকাতে লাগল। ফসলই যদি না ফলানো যায় তাহলে খাবার আসবে কোত্থেকে? টাকা কড়ির জোগান হবে কিভাবে? খাজনার কড়িই জুটবে কেমন করে? কপালে তাদের ভাঁজ পড়তে লাগল।
সেসব দেখার সময় নেই রাজকর্মচারীদের। পরের ঘোষণাটা এলো পরপরই: এখন থেকে সব জমিতে চাষ করতে হবে যব। শুধুই যব। যব উৎপাদন ও মাড়াইয়ের পর সব পাঠিয়ে দিতে হবে সরকারি গুদামে। সেগুলো বিদেশে রপ্তানি করে স্বর্ণমুদ্রা উঠবে রাজকোষে।
ঘোষণা দিয়েই রাজার লোকেরা চলে গেল। হায় হায় উঠল কিষাণদের মধ্যে। তাদের সাথে যোগ দিল কামার কুমার জেলে তাঁতি সবাই। কিষাণের ঘরে কিছু না উঠলে তো তাদের ঘরেও ফাঁকা ফক্কিকার থাকবে। এতো মহা হাহাকার!
এর মধ্যেই রাজার নামের ছত্রছায়ায় গাঁয়ে গাঁয়ে হানা দিয়ে ফিরতে শুরু করেছে রাজদরবারের নানান কিসিমের পরিষদ, দেশি বণিক, গোলাদার, মহাজন, আর তাদের সাথে ভিন্নদেশি সওদাগররা।
গজফিতা আর কিসব হাতিয়ার পত্তর নিয়ে তারা যাচ্ছে ক্ষেতে খামারে। মাটির গুণ পরখ করছে। হিসাব কষছে কী পরিমাণ যব চাষ করা যায়।
: যবে কি ধানের মত ভাত হবে?
: আঁখের মত গুড় বানানো যাবে?
: পাটের মত দড়ির ফাঁস চট বানানো যাবে!
: যব কি কাজে লাগে।
: জ্বর হলে রোগীকে বার্লি খেতে দেয়। এই বার্লি নাকি যব থেকে হয়।
: আমরা কি তবে বার্লি খেয়েই পেট ভরাব? বার্লি খেয়ে খেয়ে জ্বরো রোগী বনে যাব?
রাজার লোকদের সাফ কথা, ধানাই-পানাই নেই কিছু। রাজা বাহাদুর হুকুম করেছেন ক্ষেত জমিতে নতুন আবাদ আসবে। যব চাই। যব চাষ করো। রাজকোষে আসুক স্বর্ণমুদ্রা সোনার মোহর। রাখাল ছেলে এমন ফসলের নাম জীবনে শোনেনি। যব গাছ দিয়ে কি খর হয়? গরু ছাগলে খেতে পারবে? রাখাল বাবাকে গিয়ে শুধোয়: যব কি, বাজান?
বাবা ঠোঁট উল্টায়। জবাবটা তার জানা নেই। আর জবাব দেয়ার সময়ও নেই তার। সে খুব ব্যস্ত। হরদম চাষাভূষোরা আসছে। দিন নাই রাত নেই। কী সব শলা-পরামর্শ হচ্ছে। টান টান উত্তেজনা আর উদ্বেগ তাদের ভেতর। বাবাকেই তারা মুরুব্বি মানছে। বিহিত একটা করতেই হবে। ফসল একবার খায় বুলবুলিতে। আরেকবার লুটে নেয় মগরা। এরপর আসে রাজার খাজনা। এ বছর মনে হয়েছিল বছরটা শান্তিতে যাবে। শান্তি আর কোথায় রইলো! যব এসে সব তছনছ করে দিয়েছে।
রাখাল যবের খবর কার কাছ থেকে জানতে চাইবে! নিত্য সাথী তার গরু-ছাগলগুলো। তাদেরকে জিজ্ঞেস করে : যব কেমন জানো তোমরা?
গরু বলে হাম্বা। ছাগল বলে ব্যা। মানে: ওটা আবার কি চিজ? রাজ্যজুড়ে সবার মন খারাপ। রাখাল ছেলেরও মন খারাপ। গরু চরাতে এসে সে তার প্রিয় পাহাড়ি পাথুরে খোড়নের কাছে এলো।
ফিস ফিস করে বলল: জানো বন্ধু, রাজ্যজুড়ে সবার মন খারাপ- কেবল রাজার লোকরা ছাড়া। জমিতে যব চাষ করতে হবে। যব গাছে নাকি সোনা ফলে। বলো তো, সোনা কি খাওয়ার? ওটা খেয়ে কি পেট ভরবে?
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল: কে জানে কপালে কী আছে! এখন আমাদের কপালে যব চাষ লেখা আছে। গরু ছাগলগুলোই বা খাবে কী? ঘাসও যদি যবের মতো সোনার হয়ে যায়! পাথর বন্ধু, তুমি কি যব চেনো? যব কি? বাতাসে শোঁ শোঁ আওয়াজ। পাথরের খোড়লে তা এসে ঝাপটা দিয়ে যায়। কেমন এক গমগমে শব্দ চারপাশের পরিবেশ ভারি করে দিয়ে যায়।
২. বীজ গেল ভেসে, খাজনা এলো ঠেসে
রাজার লোকরা প্রজাদের হাতে হাতে যবের বীজ পৌঁছে দিয়ে গেল। গাঁয়ে গাঁয়ে জমায়েত ডেকে শিখিয়ে গেল যব চাষের পদ্ধতি। ভিনদেশী সওদাগরের লোকরা ক্ষেত ঘুরে ঘুরে তদারকি করবে চাষাবাদের। এসব তদারককারী বেতন ভাতার খরচাদি বহন করতে হবে চাষাদেরকেই। এ যেন খাজনার চাইতে বাজনা বেশি। আরও চাইতে বেশি বাজনাদার।
সবার মনে প্রশ্ন জাগল, প্রজাদের ওপর এমন জুলুম কি মহারাজ করতে পারেন! তারা বেমালুম ভুলে গেল অতীতের যত জুলুমবাজির দাগ। সদাশয় রাজাধিরাজ মহারাজের রোশনাই দয়াবানের চেহারাটাই তাদের চোখের সামনে ভাসতে লাগল যিনি গোলাভরা ধানের আনন্দ উপভোগ করতে ন্যায্য খাজনা পর্যন্ত মওকুফ করে দিয়েছেন।
রাজা মহামহিম যদি যব চাষ নিয়ে তাদের কষ্ট নিরানন্দের কথা শোনেন তাহলে নিশ্চয়ই এর বিহিত করবেন।
রাখালের বাবা বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল : হুকুমটা তো ওখান থেকেই এসেছে। তারই ইচ্ছায়। সোনা দানা যা আমদানি হবে সবই তাঁর হবে। তিনি কেন রায়ত-প্রজাদের কথায় কান দেবেন!
এ যুক্তি কেউ মানল না। তারা দল বেঁধে যাবে রাজপ্রাসাদে। রাজাকে বুঝিয়ে বলবে সবকিছু। তিনি নিশ্চয়ই মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, আর বিধি মোতাবেক ব্যবস্থাও নেবেন।
রাজপ্রাসাদে প্রজাদের এই অভিযানে নেতৃত্ব দিতে হবে বাবাকেই। বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা আর আপত্তি করল না। যব চাষ ঠেকাতে হলে একটা কিছু তো করতে হবেই।
পরের দিন কাক-ডাকা ভোরে গৈ-গেরামের লোকগুলো দল বেঁধে সারি দিয়ে রওনা করল রাজপ্রাসাদের অভিমুখে। গাঁয়ের সীমানা ছাড়িয়ে যাহাতক তারা নগরের সীমানায় পা রেখেছে, রে রে করে ছুটে এলো সিপাই সান্ত্রির দল। চাষাভূষোদের আটকে দিল নগর-প্রান্তেই। খানিক পরেই বিশাল ভুঁড়ি নাড়িয়ে চাড়িয়ে হেলতে দুলতে এসে হাজির হলো কতোয়াল। নাকের ডগায় বিশাল সাইজের গোঁফ। হাতে ধরা মোটাসোটা মারদাঙ্গা বেতের দণ্ড। এসে মুখোমুখি দাঁড়ান বাবার। বাবাই তো সবার সামনে। তার মুখের সামনে দণ্ডটা ঘুরাতে ঘুরাতে বলল: কোথায় যাওয়া হচ্ছে দল বেঁধে?
বাবা কিন্তু এতটুকু ভয় পায়নি। এজন্যই তো সবাই তাকে নেতা মানে। মুরুব্বি ডাকে। প্রজাদের সব কাজে তাকে সামনে ঠেলে দেয়।
বাবা জবাব দিল, জবাব দিতে তার বুক এতটুকু কাঁপল না। শান্ত কিন্তু ভারি কণ্ঠে বলল: মহারাজের সাথে দেখা করতে।
হা..হা.. অট্টহাসিতে ফেটে পড় কতোয়াল। বলল: মহারাজ কি তোদের ঘরের পুতুল, দেখা পেতে চাইলেই দেখা পেয়ে যাবি?
এরপরই গম্ভীর। গর্জে বলল: আর এক পাও এগুনো যাবে না। কদম বাড়লেই তলোয়ারের এক কোপে মাথা দুই ফাঁক করে দেবো।
এর মধ্যেই ঘোড়া দাবড়ে রাজপ্রাসাদ থেকে ছুটে এসেছে রাজার দূত। ঘোড়া থেকে নেমেই সে এগিয়ে এসে কতোয়ালকে আটকাল। তাকে এক পাশে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল: এখন কোনো মারামারি কাটাকাটি না। মহারাজের হুকুম প্রজাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে।
কতোয়াল মুখ বাজিয়ে বলল: মানে? ঐ ছোটলোকদেরকে এখন লাই দিতে হবে।
: প্রয়োজনে হলে তাই। কোনোভাবেই ওদেরকে এখন ক্ষ্যাপানো যাবে না। কৌশলে কাজ হাসিল করতে হবে। ওদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে ঘরে ফেরত পাঠাতে হবে।
কতোয়াল অবাক হয়ে বলল: সারাজীবন এদেরকে দাবড়ে বেরিয়েছি, এখন এদেরকে হুজুর হুজুর করতে হবে কেন?
দূত বলল: কারণ আছে। বুঝিয়ে সুজিয়ে ওদেরকে দিয়ে এখন যে কোনো মূল্যে যব চাষ করাতে হবে।
কতোয়ালের এক জবাব: ডাণ্ডা পিটাই করলে ওরা বাপ বাপ করে রাজার হুকুম তামিল করবে।
দূত বিরক্ত হয়ে বলল: মহারাজ যব চাষের আগে কোনো হাঙ্গামা চান না। দেশে ভিনদেশী সওদাগররা আছে। দাঙ্গা ফ্যাসাদ দেখলে তারা ভয় পাবে। যবের কারবার ছেড়ে এ রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে অন্য রাজ্যে। সেখান থেকে যব কিনবে। তাদেরকে কোনোভাবেই ভয় পাওয়ানো যাবে না। অগত্যা কতোয়াল ফিরে এসে দাঁড়ান চাষাভূষোদের মুখোমুখি তার পাশে রাজার দূত।
কতোয়াল কৃষক জনতার দিকে তাকিয়ে উঁচু স্বরে বলল; রাজাধিরাজ মহামতি মহারাজের কাছে আপনাদের খবর পৌঁছেছে। তিনি যব চাষ সংক্রান্ত আপনাদের সব অসুবিধা গুণ সম্পর্কে অবগত এবং আপনাদের সাথে এ ব্যাপারে সংহতি প্রকাশ করছেন। তিনি আপনাদের সব সমস্যার যথাবিহিত সমাধান করবেন। এ নিয়ে আপনারা চিন্তা করবেন না। দেশে এ মওসুমে ধান চাষ না হলেও আপনাদের কাছে খোরাকির ধান পৌঁছানোর ব্যবস্থা তিনি করবেন সময় এলেই। রাজ্য ও মহারাজের সামনের দিকে তাকিয়ে আপনারা এ মওসুমে যব চাষ করে রাজ্য ও মহারাজের মর্যাদা বাড়িয়ে দিন। আপনারা মহারাজাকে দেখুন। মহারাজ আপনাদেরকে দেখবেন।
চাষা-কিষাণ জনতা মাথা নাড়ল। মহারাজ যখন তাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, একবার সে অনুরোধ রেখে দেখা যেতেই পারে।
তারা সবাই তাকাল বাবার দিকে। বাবা সবার মুখের দিকে তাকাল। তাদের মনোভাব বুঝতে মোটেও অসুবিধা হলো না। গম্ভীর হয়ে বলল: আমরা ফিরে যেতে পারি। কিন্তু সবসময় প্রস্তুত থাকব সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য। রাজদূত কতোয়ালকে ফিসফিস করে বলল: লোকটা কে? ভয়ঙ্কর বলে মনে হচ্ছে।
কতোয়াল বলল: কী জানি! চিনি না তো!
রাজদূত এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। ফিসফিস করে বলল: বিপজ্জনক লোক। নজর রাখবেন এর দিকে।
গ্রামে ফিরে যে যার কাছে লেগে পড়ল। জমিতে শেষ পর্যন্ত যবের বীজই বোনাবুনি করা হলো। রাজকর্মচারী আর ভিনদেশী সওদাগরের লোকরা দেখভাল করল। কিষাণদের মুখ শুকনো থাকলেও সাফল্যের ও বিজয়ের আনন্দে তাদের চোখ-মুখ হাসি খুশি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ধারা মনের সুখে ইতল বিতল গানও গাইলো। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল পরের দিন রাতেই। মুষলধারে বৃষ্টি। বাতাসের দাপট। ঝড়ের তাণ্ডব। ওদিকে নদীর বাঁধ ভেঙে কনকনিয়ে পানি ঢুকে পড়ল ক্ষেত জমিতে। যবের বীজ সব গেল ভেসে, চারপাশে থৈ থৈ পানি। সারারাত চলল এমন ধারা। বৃষ্টি থামল শেষ রাতে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে রাজকর্মচারী, ভিনদেশী সওদাগর আর তাদের লোকজনরা মাথায় হাত দিল। এ কেমন সর্বনাশ লিখন ছিল তাদের ললাটে! এ ক্ষতি পুষিয়ে নেবে কিভাবে?
তারা রাজদরবারে গিয়ে ধরনা দিল। সব শুনে-টুনে রাজা বড় করে দম ছাড়ল। স্বর্ণমুদ্রা এ দাগায় আর বুঝি কপালে জুটলো না। উল্টে রাজকোষ ফাঁকা। খাজনাও তো এ বছর মওকুফ করা হয়েছে।
ভিনদেশী সওদাগররা তাদের বীজ ও মেহনতের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করল। রাজা এ ক্ষতিপূরণ সমানভাবে ভাগ করে প্রজাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ না দিতে পারলে জমি ক্রোক করে নেয়া হবে। এতে ভিনদেশী সওদাগররা বেজায় খুশি।
ওদিকে আরেক ফরমান। রাজ ফরমান বলে কথা। কিষাণের গোলায় যে ধান রয়েছে তার একটা অংশ নামমাত্র মূল্যে রাজভাণ্ডারে বিক্রি করতে হবে। তাও আবার বাকিতে। এ দাম তুলতে কিষাণের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বছর খানেক ঘুরতে হয়।
শুধু তাই নয়, গোলায় জমলো ধানের উপরও দিতে হবে খাজনা।
ফরমান শুনে প্রজারা দিশেহারা। এতো খাজনা নয়, লুটপাট। যব চাষের ক্ষতিপূরণ। প্রায় বিনা দরে ধান বিক্রিÑ রাজার একাংশ মানে গোলার ধানের অর্ধেক। তার উপর আবার বাকি ধানের উপর খাজনা। হাতে তো এক কানাকড়িও থাকবে না। সবাই ছুটে এলো গায়ের বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ বাবার কাছে। বাবা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। রাজাদের স্বভাব-চরিত্র তার মুখস্থ। তাই সেদিন একটা কিছু হেনস্থা না করে নগর থেকে ফিরতে তার ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু তার সহজ সরল ভাই বেরাদার পাড়া পড়শিরা! তারা হাঙ্গামা এড়িয়ে শান্তিতে থাকতে চায়।
এখন তো সর্বস্বহারা হওয়ার অবস্থা। যব চাষের আগে থেকেই রাস্তা ঘাট বানানোর কাজ শুরু হয়েছে। ভিনদেশী রাজা-রাজড়ার লোকজন নিত্য আসা-যাওয়া করছে, যবসহ গ্রাম থেকে লাভজনক পণ্যগুলো পাচার করতে হবে ভিনদেশেÑ তাই উন্নত রাস্তা উন্নত ঘোড়া উন্নত ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা হচ্ছে। মাল পরিবহনের গাড়িগুলোরও আসা-যাওয়া শুরু। এই উন্নতির ঢেউ-এরও দাম কষতে হবে প্রজা সাধারণকে।
তাই বাবার দীর্ঘশ্বাস। জানে না কিভাবে এ রদ করতে হবে। প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু এমন ধারার জুলুম তো আর সওয়া যায় না। তাই সবাই মিলে পরামর্শ করে ঠিক করা হলো। সদাশয় রাজাধিরাজ মহারাজের দরবারে দল বেঁধে আরজি জানানো হবে, তারা এতোসব খাজনা খরচের ভার বইতে পারবে না। আর মওসুম এখনো আছে। তারা যবের বদলে ধানই লাগাতে চায়। ধানের আবাদ রক্ষণাবেক্ষণ তাদের জানা। কোনো ঝড় বাদল খরায় ধানের আবাদ বরবাদ হবে না।
চলল মিছিল নগর পানে। গন্তব্য রাজপ্রাসাদ। মহারাজ সাক্ষাৎ না দিলে নগর সড়কের দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে চুপচাপ। তাতেও কাজ না হলে সড়কের ওপর বসে অবস্থান নেবে।
কিন্তু এবার কতোয়ালের ভোল পাল্টে গিয়েছে। হাতের ডান্ডা তার ঘুরতে শুরু করেছে চরকির মতো। তার সাথের সিপাই সান্ত্রিরা তেড়ে মেড়ে হামলে পড়ল প্রজাদের ওপর। নগরে ঢোকার পরপরই। প্রজারাও অনড়। তাদের জানমালের ব্যাপার। পিছু হটতে চায় না।
কতোয়াল কোষ থেকে তলোয়ার বের করল। দেখাদেখি সিপাইরাও।
কত যে নিরীহ প্রজা কাটা পড়ল। কতজন আটকা পড়ল। বাবাও সাহসী। কিন্তু বুদ্ধিমান। লড়াইয়ে জিততে হলে বুদ্ধির প্যাঁচ কষতে হবে। নিজেদের বাঁচিয়ে লড়তে হবে। সে কৌশলে অবশিষ্ট প্রজাদের নিয়ে সরে পড়ল। তার আগে পাকড়াও হলো অনেকে। এখন দেখতে হবে অন্য পথ। অন্য উপায়।
৩. কাজী আছে কেতাবে বিচার কাঁদে এজলাসে
রাজ্য জুড়ে আহাজারি। কান্নার মাতম। তাও আবার শব্দ না করে। আওয়াজ বাইরে গেলেই রাজদ্রোহ। কঠোর শাস্তি।
যাদের পরিজন মারা গিয়েছে তারা কাঁদছে। যাদের ঘরের লোক কয়েদ হয়েছে তারা কাঁদছে। যারা পিটুনি খেয়েছে জখম খেয়েছে তাদের মুখে থেকে আতর্নাদ বেরুতে চেয়েও ভয়ের চোটে শেষ পর্যন্ত গোঙানির আওয়াজ তুলছে।
দেখে-শুনে বাবা আর ময়-মুরুব্বিদের সহ্য হচ্ছে না। এর বিহিত করতেই হবে।
দেশের সবচাইতে প্রবীণ কাজী। তার দরবারে পাওয়া যায় ন্যায্য বিচার। সে রাজা উজির প্রজা রায়ত উঁচু-নিচু ধনী গরিব কিছুই বুঝে না, বুঝে ইনসাফ-ন্যায্য ন্যায়বিচার।
তার নামে কত যে কিসসা মশহুর হয়ে আছে তার হিসেব নিকেশ নেই। বিচারের দরবারে বসে সে কাউকে ভয় ডর করে না। সব ধরনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হক কথা বলে হক বিচার করে। তিন রাজার আমলের কাজী তিনি। এখনকার রাজার বাবা যখন রাজা ছিলেন, তখন কাজীর একটা বিচারের গল্প সবার মুখে মুখে। রাজা মৃগয়ায় গিয়ে এক বনবাসীর ছেলেকে তীরবিদ্ধ করে। এতে ছেলেটি মারা যায়। এ নিয়ে কাজীর দরবারে বিচার বসে।
রাজাকে এসে দাঁড়াতে হয় কাজী দরবারে আসামির কাঠগড়ায়। সব শুনে কাজী রায় দেন, যেহেতু রাজা তার অগোচরে তীর ছুড়ে ছেলেটাকে মেরছে। ইচ্ছাকৃত নয়, এজন্য রাজার প্রাণদণ্ড হলো না। তবে শিকারের সময় তীর ছোঁড়ার আগে তার যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। আর একটি নিরপরাধ বালকের প্রাণহরণ ঘটেছে। এ জন্য তার বিহিত করতেই হবে। অতএব যতক্ষণ কাজীর দরবার চলবে, ততক্ষণ রাজাকে এই আসামির কাঠগড়ায় এক ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। আর ছেলের ক্ষতিপূরণ বাবদ রাজাকে ছেলের বাবার ওজন মতো রৌপ্যমুদ্রা ছেলের পরিবারকে দিতে হবে। রাজা শিরোধার্য করে নিলেন কাজীর এই রায়।
রাজ্যজুড়ে ধন্য ধন্য পড়ে গেল কাজীর নামে। এই ধন্যের জের কালে কালে এখনো চলছে।
সবাই মিলে পরামর্শ হলো, কাজী সাহেবের কাছেই চাইতে হবে হক বিচার।
কিন্তু কাজী সাহেবের পেঁচামুখো মুন্সীরা নাচার। তারা সাফ-সুতরো জানিয়ে দিল: রাজার বিরুদ্ধে এমন ধারার বিচার চলবে না। এ মামলা দায়ের করা যাবে না।
এমন আজব কথা শুনে প্রজারা সবাই এ ওর দিকে তাকাতাকি করতে লাগল। মুন্সী আর ওদের দিকে তাকালোই না। ব্যস্ত হয়ে পড়ল অন্যদিকে। কেন এমন বিচার চলবে না, জুলুমের প্রতিকার তো কাজীর দরবারেই হয়- এমন ধারার সওয়ালের কোনো জবাবই এলো না।
বাবা গম্ভীর হয়ে বলল : আমরা কাজী সাহেবের সাথে দেখা করব। এ কথাটা তাঁর মুখ থেকেই শুনতে চাই। মুন্সী বাবার দিকে তাকাল চোখ গরম করে। খ্যারখ্যারে গলায় বলল: কাজী সাহেব তোদের মতো চাষাভূষোদের সাথে কথা বলবেন বলে বসে আছেন! ভাগ এখান থেকে। নইলে পাইক তলব করব।
অগত্যা ওরা কাজীর দরবার থেকে বেরিয়ে এলো।
বাবা শান্ত মানুষ। একটু ভেবে নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল: কি করা যায় দেখছি। তোমরা গাঁয়ে ফিরে যাও। কয়েকজন মুরুব্বি আমার সাথে থাকো। একজনের কাছে যাব ধরনা দিতে।
সে রাজার দাদার দরবারে পরিষদ ছিল। তারপর তার বাবার। বর্তমান রাজার আমলে অবসর নেয়। অভিজ্ঞ লোক রাজ্যের বিধি-বিধান আইন-কানুন ভালো জানে। এমন বিচার কাজীর দরবারে চলবে কিনা, চললে কিভাবে চালাতে হবে- এ ব্যাপারটার হিল্লে সেই করতে পারে। তাই চলো তার কাছেই।
সব শুনে প্রবীণ পরিষদ জোরের সাথেই বলল: অবশ্যই চলে। চলতেই হবে। রাজার বাবার যদি বিচার হয়ে শাস্তি হতে পারে, এখন কেন বিচার চলবে না! আমি কাজীর সাথে দরবার করছি। এরপর তার এজলাসে বিচারটা উঠবে তখন এ বিচার নিয়ে তোমাদের পক্ষ থেকে আমিই লড়ব।
পরিষদের সাথে কাজীর দেখা হলো। সাথে সাথে কাজী ধরাচূড়ো পরে ছুটল রাজার কাছে। সব শুনে রাজা বলল: আমার আমলেও ন্যায্যবিচার হবে। একদম কিতাব মতো। এখনকার আইন-কানুন বিধি-বিধান সব মেনে নিয়ে। পরিষদ চাচার খেদমত আমি করছি। আপনি বিচারটা আপনার এজলাসে তুলতে দিন। আর হক বিচার করুন। কাজী ইতঃস্তত করে বলল : বিচারের রায় যদি আপনার বিপক্ষে যায়!
রাজা নির্বিকারভাবে বলল: গেলে যাবে। আমার রাজ্যে ন্যায্যবিচার হবে। আপনার তো অনেকদিন হলো। এখন অবসরে যাবেন না আরো কিছুদিন ন্যায়বিচার কায়েম করতে চান।
কাজী মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল: মহারাজের শুভ ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা।
রাজা বলল: আপনার তো এখনো বিবেক-বুদ্ধি ভালো আছে। শরীরের গাঁথুনিটাও ভালো। আরো কিছুদিন রাজ্যের ও রাজার খেদমত করলে অসুবিধা! আপনার মাসোয়ারা এ মামলার পর দ্বিগুণ করে দেবো।
কাজী হাসিমুখে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
রাজ্যজুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ল, রাজা, কতোয়াল ও রাজকর্মচারী ক’জনার বিরুদ্ধে বিচার বসছে কাজীর দরবারে। কাজী সাহেব শক্ত বিচারক-ন্যায়বিচার তার ধর্ম।
বিচারের দিন প্রবীণ পরিষদকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সময়ের অনেক আগেই তার পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার চিহ্নটিও নয়। বাবা কয়েকজনকে নিয়ে ছুটে গেল পরিষদের বাড়িতে। সেখানে সে নেই। তার নাকি কঠিন অসুখ করেছে। তাই রাজবৈদ্য তার চিকিৎসা দিচ্ছে। বাবা ও অন্যরা ছুটে গেল রাজবৈদ্যের বাড়িতে। বৈদ্য অতিশয় গম্ভীর ভারি গলায় জানিয়ে দিলো: পরিষদের শারীরিক অবস্থা অতিশয় খারাপ। তার নড়ন-চড়ন নিষেধ। কথা বলা বন্ধ। এখন তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ কথাবার্তা কিছুই চলবে না।
এর মধ্যে পরিষদ নিজেই হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো সবার সামনে। এক গাল হেসে বলল: ওহে প্রজাকুল। আমি যারপরনাই অতিশয় অসুস্থ। আমার নড়াচড়া মানা। কথা বলা বারণ। উত্তেজিত হওয়া হারাম। তাই না বৈদ্য মশাই? আমাকে এখন কিছুদিন মরার ঘাটের এই বৈদ্যের চিকিৎসায় আটকে থাকতে হবে। খোদা হাফেজ। বলেই পরিষদ আবার গটগট করে অন্দর মহলে চলে গেল।
হতাশ হয়ে কাজীর দরবারে ফিরে এলো বাবা ও তার দল।
দরবার এর মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। চাষিরা নিজেদের আরজি নিজেরাই পেশ করলো। যত ধরনের অভিযোগ আছে সব ঝেড়ে দিল।
কাজীর মুখ গম্ভীর। সব শুনে-টুনে কাজী রায় ঘোষণা করল। এক ঘণ্টার সময়। সারমর্ম করলে দাঁড়ায় কাজীর দরবার সহ রাজ্যে সব বিচার-আচারে রাজ্যের প্রচলিত আইন ও রাজ-ফরমান অনুযায়ী হয়। সে মোতাবেক রাজার সমস্ত কার্যকলাপই রাজ্যের স্বার্থে, রাজ্যের তাই এ সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার এখতিয়ার এই কাজীর দরবারে নেই।
কাজী একটি পর্যবেক্ষণও প্রজা সাধারণের এ ধরনের আচরণ প্রবণতা ও কার্যকলাপ রাজদ্রোহের শামিল। রাজ্য পক্ষ প্রয়োজন বোধ করলে এ সংক্রান্ত পৃথক মামলা দায়ের করতে পারে।
হতাশ হয়ে গায়ের লোকেরা গাঁয়েই ফিরে গেল। ঐদিন রাতেই বাবা নিখোঁজ। রাত দুপুরে কয়েকজন শাদা পোশাকের লোক টমটম গাড়িতে চড়ে এসে হাজির হয়। নিজেরদকে কতোয়ালের লোক বলে পরিচয় দেয়। বাবাকে জেরা করে সকালেই ছেড়ে দেবে- এই করাল করে সাথে করে নিয়ে যায়। পরদিন সকাল কেন তাকে আর দেখাই যায় না।
কিছু লোক বলে বেড়ায়, নিরীহ প্রজাদের বিভ্রান্ত করার জন্য তার ওপর সাধারণ মানুষ ক্ষেপে আছে। তাই সে পালিয়ে বেঁচেছে।
রাখাল ছেলেদের পরিবারে পাহাড় ভেঙে পড়ল। পরিবারের ভার এসে পড়ল রাখালের ঘাড়ে। ঐটুকু ছেলে ঘর-সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যায়। এই চাপের মধ্যেও সুযোগ পেলে ইতি উতি বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। আর পাহাড়ের সেই পাথুরের খোড়লে নিজের দুঃখের কথাগুলো বলে যায়। কত কথা যে সেখানে জমে রইলো কে জানে!
মাস ছয়েক পরে এক ভোরে বাবাকে পাওয়া গেল বাড়ি থেকে খানিক দূরে এক বটগাছ তলায়। মাথা ভর্তি কুঁকড়া চুল। মুখভর্তি দাড়ি। হাতে একটা বাঁশি। চেহারায় বিপর্যয়ের ছাপ। চোখে উদ্ভ্রান্তি।
কারা নাকি তাকে গাঁয়ের এই রাস্তার ওপর ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। তারা ঘোড়ায় চেপে তাকে নিয়ে এসেছিল। এখানেই ফেলে দিয়েছে। এখানেই এই গায়েই নাকি তার বাড়ি। জায়গাটা তার চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু নিজের বাড়িটা খুঁজে পাচ্ছে না। চিনতেও পারছে না। কত ভাবে কত রকম প্রশ্ন করা হলো, কোনোটারই সে ঠিকঠাক জবাব দিতে পারছে না।
সেই সাহসী বাবাটার চোখে-মুখে ভীতি। দৃষ্টি ছড়িয়ে যাচ্ছে ইতি উতি। খবর পেয়ে রাখাল ছেলে আর তার মা ছুটে এসে বাবাকে ঘরে নিয়ে গেল।
বাড়িতে ঢুকেই তার সেকি হাউমাউ কান্না। একদম বাচ্চা মানুষের মত। ফিসফিস করে বৌকে জানাল, যারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা বিপজ্জনক লোক- রাজার লোক নাকি অন্য কেউ জানে না সে। তবে তাদের অত্যাচার নির্যাতনের বিবরণ সে দেবে না, তবে শুধু এইটুকু সে জানে যে ওদের কবলে সে আর পড়তে চায় না। এর চাইতে মৃত্যুও অনেক ভালো।
৪. একি হেরিনু রূপের বাহার মরিতে চাই না ভুবনে
রাখাল ছেলে এখন এসেছে নগরে। বাবা ঘরেই সারাদিন শুয়ে বসে থাকে। তাই সংসারের পুরো ভার সেই যে ঘাড়ে এসে পেয়েছিল তা আর নামানোর সময় পায়নি। ওটাই এখন স্থায়ীভাবে চেপে বসেছে। গরুর রাখালি কাজ শুধু নয়, হাল-আবাদ থেকে শুরু করে সব কাজই তাকে করতে হয়। সব কাজ মায়ের সাথে পরামর্শ করে।
সাংসারিক প্রয়োজনেই তার নগরে আসা। কী এক ভাবনায় বিভোর হয়ে সড়কের মাঝ বরাবর সে হাঁটছিল। লোকরা তো তার মতো পথ ধরেই হাঁটাহাঁটি করছে। ঘোড়া ও গাধা আরোহীরাও যাচ্ছে পথচারীদের পাশ কাটিয়ে। আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে রাখাল ছেলে এতোই বিভোর ছিল যে খেয়ালই করেনি, লোকজন কখন থেকে সরে যেতে শুরু করেছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের হাঁটাচলা। রাজপথের দু’পাশে তারা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
রাখাল ছেলে কিছু কিছু টের পেলেও ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিল না। একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কি, সেটা তার ধারণায় নেই।
সে ছিল রাজপথের মাঝখানে। এক পাশে সে সরে এলো। হাঁটা কিন্তু তার থামলো না। সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। এর মধ্যে দেখল রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সারি-বাঁধা লোকগুলো মাথা নিচু করে আছে। তাদের চোখ তাদের পায়ের ওপর।
কেমন এক অজানা বোধে গা-টা তার শির শির করে উঠল। ঠিক এ সময়ই ছুটন্ত ঘোষণা: হুঁশিয়ার।
কথা শেষ না হতে হতেই শপাং চাবুকের আঘাত এসে পড়ল তার পিঠে। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। সাথে সাথে ঘোড়ার লাথি। ছিটকে এলো সে রাজপথের এক পাশে সারি বাঁধা লোকদের ভিড়ে। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। তার পাশের লোকজন ধরাধরি করে তাকে দাঁড় করল। সে কাপড়ের ধুলো ঝাড়ল। এখনো ব্যাপারটা তার মাথায় ঢোকেনি। রাজপথ এখন অশ্বারোহী বাহিনীর দখলে। টগবগে ঘোড়াগুলো রাজার সান্ত্রিদের পিঠে চড়িয়ে কদম কদম হাঁটছে।
পাশের লোকটা ফিসফিস করে তার কানে কানে বলল : সড়কের দিকে তাকিও না। আমাদের মতো চোখ নিচু করো। মাটির দিকে তাকাও।
রাখাল অবাক হয়ে বলল: কেন?
লোকটি ফিসফিস করেই বলল: এ পথে এখন রাজকন্যা যাবেন। তাকে দেখতে নেই। তার ওপর চোখ পড়তে নেই। রাজার লোকরা তাহলে চোখ গলিয়ে দেবে।
রাখালের সেই অবাক হওয়ার প্রশ্ন : কেন?
লোকটা বলল: সব কেন জানতেও নেই। তবে শুনেছি, রাজকন্যা খুব সুন্দরী। যে দেখবে সে পাগল হয়ে যাবে। তাই নিজের স্বার্থেই রাজকন্যাকে না দেখা ভালো। রাখাল ছেলে একবার রাজপথে তাকাল। ঘোড়ার পিঠে চেপে রাজার সান্ত্রিরা যাচ্ছে। তাদের নজর চারপাশে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। রাখাল চট করে তার মাথা নিচু করে ফেলল। কিন্তু অদম্য কৌতূহল তার ভেতরে ছটফট করছে।
রাজপথে নকিব ঘোষণা করতে করতে যাচ্ছে: হুঁশিয়ার। সাবধান! রাজ্যের চোখের মণি সকলের সম্মানীয়া মহামান্য রাজকন্যা আসছেন।
ঘোড়ার পায়ের দাপট বেড়ে গেল। চাকার ছুটে চলা ঘর ঘর আওয়াজ ছুটে আসছে।
রাখাল তার বালকসুলভ কৌতূহল আর সামলাতে পারলা না। তার চোখ ছুটে গেল রাজপথে।
রাস্তার দু’পাশের লোকজন মাথা নিচু করে আছে। রাজকন্যার আগে-পিছে পাহারাদার সিপাই-সান্ত্রিরা যার যার কাজে ব্যস্ত। কেউ যে ভিড়ের এক পাশে দাঁড়িয়ে রাজপথের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে পারে বা এমন সাহস পোষণ করতে পারে, এমন ধারণা তাদের মাথাতেই নাই। তাই কেউ রাখাল ছেলেটাকে খেয়ালই করল না।
রাজপথে রাজগাড়ি। টেনে নিয়ে যাচ্ছে আট ঘোড়া। ঘোড়ার ছাউনি খোলা। আড়ালে থাকতে ভালো লাগে না রাজকন্যার। ঘেরটোপে থেকে নিজেকে বন্দী বন্দী মনে হয়। চারপাশের জগৎটাকে তার রূপারূপ কিছুই দেখা যায় না। বুঝা যায় না। তাই পথ চলতে সে গাড়ির ছাউনি নামিয়ে রাখে। চারপাশটায় নজর বুলাতে বুলাতে যায়।
চারপাশের লোকগুলো কেমন বোকাসোকা। সবাই মাথা নিচু করে আছে। মাটিতে দেখার কী আছে! এমনকি সিপাই সান্ত্রিরাও তার দিকে তাকাতে সাহস করে না। এ সময়ই তার নজর যায় ছেলেটার দিকে। ফুটফুটে ছেলে। তারই বয়সী। গরিব চাষার ছেলে বুঝাই যাচ্ছে তার পোশাক-আশাক দেখে। কিন্তু সাহস আছে ছেলেটার। ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। মুগ্ধতার দৃষ্টি।
রাজকন্যার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফোটে। ওতে উজ্জ্বল হয় ছেলেটার মুখও। রাজপথ ধরে গাড়ি যাচ্ছে এগিয়ে। তার সাথে তাল মিলিয়ে ভিড় ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজকন্যা মৃদু হেসে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকাল।
রাজকন্যার জুড়ি গাড়ি এসে থামল প্রমোদ প্রাসাদের সামনে। বিশাল বিশাল সিংহদ্বার খুলে গেল শব্দ করে। ভেতরে ঢোকার আগে রাজকন্যা আবার তাকাল নতজানু মানুষদের ভিড়ে। সেই তো ছেলেটা। দাঁড়িয়ে রয়েছে ওদিকে। সটান তাকিয়ে আছে তার পানে। এতটুকু ভয় ডর নেই।
রাজকন্যার ঠোঁটে আবার মৃদু হাসি খেলে গেল। আট ঘোড়া টানা জুড়ি গাড়ি ঢুকে গেল প্রাসাদের ভেতরে। বন্ধ হয়ে গেল তোরণ।
প্রমোদ প্রাসাদে পদ্মপুকুরে। সখীদের নিয়ে জলকেলিতে নেমেছে রাজকন্যা। খেলাধুলা সাঁতার জল ছিটানো হৈ চৈ সবকিছু শেষে রাজকন্যা গুনে গুনে সাতটা ডুব দিল। তার স্নান সাঙ্গ।
পানি থেকে সিঁড়িতে পা দিয়ে উঠতে যাবে, এ সময়ই তার নজরটা ছুটে গেল দেয়ালের দিকে। পাশেই দেয়ালের চাইতেও উঁচু এক গাছ। ঐ গাছের মগডালে পাতার ফাঁকে একটা মানুষের আদল। সেই ছেলেটা না? বিস্ময়ে আঁতকে উঠল রাজকন্যা। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো: কে ও?
সখীরা ঐ ঐ করে উঠল: কে? কে? কে?
রাজকন্যা আঙুল তুলে দেখাল। সবাই হৈ হৈ করে উঠল: ওটা তো প্রাচীর।
রাজকন্যা দাঁতে দাঁত চেপে বলল: পাশের গাছে দেখ। সবাই দেখতে পেলো কয়েকটা বানর বসে কিচিরমিচির করছে।
সখীরা অবাক হয়ে বলল: ওগুলো তো বানর। ওখানে নিত্যই থাকে। রাজকন্যা এবার বিরক্ত। ধমকে বলল: ভালো করে তাকিয়ে দেখল।
সখীরা আবার তাকাল। এবার তারা মগডালে পাতার আড়ালে রাখাল ছেলেকে ঠিকই দেখতে পেল। তারা সম্মিলিত কণ্ঠে হৈ হৈ করে উঠল। শুরগোলে ছুটে এলো সিপাই সান্ত্রিরা। তারাও দেখতে পেল রাখাল ছেলেক। তারাও হৈ হৈ করে উঠল। ছুটে এলো আরো সিপাই আরো সান্ত্রি।
রাখাল ছেলে তখন গাছের মগডালে নেই। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। হৈ চৈ পড়ে গেল প্রমোদ প্রাসাদে।
৫. পাথরে জাগে তুফান জ্বলে ওঠে পাহাড়
রাখাল ছেলে পাহাড়ের বুকে পাথরের খোঁড়লের কাছে এসে থামে। শ্বাস ফেলে জোরে জোরে। এতটা পথ ছুটতে ছুটতে এসেছে সে। হাঁফাচ্ছে। বুকের ভেতর আওয়াজ উঠছে দ্রিম দ্রিম। এ আওয়াজ যেন অন্য রকম।
সে বুক ভরে শ্বাস নেয়। বাতাসে বেজায় আনন্দ। কপালের ঘাম মুছে তর্জনী দিয়ে। ছুটে আসায় যে ঘাম জমেছে, তাতে খুব সুখ।
একটু থিতু হলে খোড়লে সে মুখ রাখে। ফিসফিস করে বলে: আজ আমার আনন্দের সীমা নাই। এতো সুখ জীবনে পাই না। আমি আজ এক পরীকে দেখেছি। আমাদের দেশের রাজকন্যা। মানুষ এতো সুন্দর হয়! এতো সুন্দর করে হাসতে জানে! ঐ হাসিতে জীবনের যত দুঃখ যত কষ্ট সব মিটে যায়!
এরপর সে চারপাশের পাহাড়ের মাঝখানে এসে দাঁড়াল, দু’হাত ছড়িয়ে সোল্লাসে বলে উঠল: ও জগৎ, ও সংসার, ও পাহাড়, ও হাওয়া, আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি। পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি উঠল: ভালোবাসি!
হালকা বাতাস। ওতেই প্রশান্তি অনুভব করছে রাখাল। পাহাড় থেকে একটা নহর বয়ে গিয়েছে তাদের গাঁয়ের দিকে। সে নহরে সে হাঁটু জল পর্যন্ত নামল। হাতে মুখে মাথার চুলে পানি দিয়ে তার খুব প্রশান্তি লাগল। আজ ভয়ে ভয়ে পানিও পান করল প্রাণ ভরে।
নহর থেকে উঠে তার তীরে সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়ল। তাকাল আকাশের দিকে। আকাশটাকে অনেক বড় ও চঞ্চল মেঘের আনাগোনা দেখে ভালো লাগল। মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছে পাখিগুলো।
আকাশে হঠাৎ কালো ধুঁয়োর মেঘ উড়ছে বলে তার কাছে মনে হলো। কালো মেঘের গতিবিধির পথ অনুসরণ করে দেখতে পেল, তার গ্রাম থেকে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ছে। ধুঁয়োর সাথে আগুনের লেলিহান শিখা। কোন্ বাড়িতে আবার আগুন লাগল? তার কাছে মনে হলো বাড়িটা তাদেরই।
সে লাফিয়ে দাঁড়াল। ছুটে যাবে, এর মধ্যেই তার বন্ধুরা এসে তাকে ঘিরে ফেলল। বলল: তুই গাঁয়ে যাবি না। রাজার লোকেরা তোর খোঁজে গাঁয়ে ঢুকেছে। তোকে না পেয়ে তোদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
জানা গেল, আগুনে জ্যান্ত পুড়ে মরেছে বাবা। রাজার লোকদের বাধা দিয়েছিল বলে রাজার লোকরা তলোয়ারের এক কোপে মায়ের মাথা ধড় থেকে কেট ফেলেছে। রক্তে মাখামাখি রাখালদের বাড়ির আঙিনা।
হাহাকার করে উঠল রাখাল। তার আর্তনাদে প্রকৃতি যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদিকে আগুনের দাপাদাপি চলছে। ছড়িয়ে পড়ছে যেন পুরো গ্রামে। আকাশ বরাবর আগুনের স্তম্ভ রচনা করছে আগুনের শিখা।
গ্রামের লোকেরা ছুটে আসছে পাহাড়ের দিকে। ওরা গ্রাম ছেড়ে পালানোর আশ্রয় খুঁজছে। ওদের কাছে জানা গেল, রাজার সিপাই সান্ত্রির লোকজন রাখালকে ধরতে এসেছে বটে, তাদের আরো মতলব ছিল। রাজার হুকুম তামিল করা। ওরা গাঁয়ের লোকের কাছে ধানের অর্ধেক নিয়েছে জোর করে। যব চাষের ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। খাজনা চেয়েছে। এতোসবের জন্য গ্রামবাসীরা প্রস্তুত ছিল না। তারা সময় বাড়িয়ে চেয়েছে। কিন্তু রাজার লোকেরা কোনো কথা শুনে নাই। গোলা থেকে সব ধান কেড়ে নিয়েছে। যারা বাধা দিতে এগিয়ে গিয়েছে তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। ধরে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছে অর্ধেক গ্রামবাসীকে। বাকিরা পালিয়ে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ে।
রাখালের সারা দেহ রাগে উত্তেজনায় কেঁপে উঠল। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হলো। চোয়াল শক্ত হলো। চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করল। সে তাকাল তার গ্রামের দিকে। সর্বনাশা লেলিহান আগুনের দিকে।
তার গলার রগ ফুটে উঠছে। মাথা উঁচু হচ্ছে। তার কণ্ঠ থেকে ক্রোধোন্মত্ত গর্জন-ধ্বনি ফেটে পড়ল। সে অগ্নিদগ্ধ গ্রাম থেকে মুখ ফিরিয়ে ছুটল পাহাড়ের দিকে।
সে এসে দাঁড়াল পাথুরে খোড়লের সামনে। খোঁড়লে পাহাড়ি লাল পানি। যেন টগবগ করছে। ফুটছে। রাখাল দু’হাতে প্রচণ্ড বেগে খোড়লের দু’পাশের পাথর চাপড়াতে চাপড়াতে বলল: প্রতিশোধ! প্রতিশোধ চাই! রক্তের প্রতিশোধ। হত্যার প্রতিশোধ। আগুনের প্রতিশোধ। ধানের প্রতিশোধ!
মুহূর্তে প্রকৃতি কি স্থির হয়ে পড়ল। এক উন্মাদ ক্রুব্ধ আর্তনাদে?
খোঁড়লের ভেতর রক্তাভ পানি। টগবগ। শব্দটা বাড়ছে। পাহাড় কাঁপছে। কাঁপছে সব কটি পাহাড়। শুরু হয়েছে ঝড়ো হাওয়া। শব্দ উঠছে উদ্দাম। প্রকৃতি জেগে উঠছে। এক ভ্রমও রূপ নিয়ে।
খোঁড়ল থেকে তুমুল বেগে বেরিয়ে এলো রক্তপানি, পাহাড়ের ভেতর জেগে উঠছে এক দানব। পাথর গড়িয়ে নামছে। চারপাশের পরিবেশ ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। হঠাৎ বিস্ফোরণ। পাহাড়ের চূড়ো বিস্ফোরিত হয়ে দাউ দাউ আগুন জ্বলে উঠল। পাহাড় ছুড়ে দিল গরম লাভা পাথর। প্রবল স্রোতে সব ধেয়ে আসতে লাগল নিচে। রাখালের ভেতর উল্লাস। সে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলো পাহাড় থেকে। তার পিছু পিছু আগুন, পাথর, পানি ও লাভার স্রোত। পুরো নহরের পানি ইগবলয়ে রক্তবর্ণ ধারণ করে ফুটতে লাগল।
রাখালের উল্লাস থেকে পলাতকপ্রবণ গ্রামবাসীরাও উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। তারা রাখালকে অনুসরণ করল। তাদের পাশে পাশে ছুটছে নহর। পেছনে ধাওয়া করছে উত্তপ্ত প্রকৃতি। পুরো বাজ্যটাকেই যেন তারা গ্রাস করবে।