পূর্বসূত্র:
জরিনা বিবি ছেলের শীতের কাপড় কেনার জন্যে টাকা ধার চাইতে আসেন আজিম মণ্ডলের কাছে। তার ছেলেরা তোজাম্মেলের দলে ভিড়েছে, কৌশলে সে কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দেন মণ্ডল। জরিনা বিবি কথা দেন তার ছেলেরা কখনো তার বিরুদ্ধে যাবে না। আব্দুল্লাহ মাকে তাড়া লাগায়, তিনি শহরে যাবেন। মুসলিম লীগের নেতা হামিদ মিয়ার ছেলে কামরুজ্জামান হেনা খবর পাঠিয়েছেন, তার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। রাজশাহী কলেজে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে মিছিলে আব্দুল্লাহকে দেখে অবাক হয় মমিন। একদল গুণ্ডা লাঠি হাতে কলেজের ভেতর প্রবেশ করে। অবস্থা বেগতিক দেখে সটকে পড়ে মমিন। টাকা পাঠাচ্ছেন না মেজ ভাই, এ নিয়ে তার উদ্বেগ বাড়ছে। জামিরা গ্রামে কামাল নামে তার এক ভাগ্নে আছে বলে শুনেছে সে। ছেলেটি তার বড় বোনের দ্বিতীয় স্বামীর আগের পক্ষের সন্তান। বহুকাল যোগাযোগ নেই। তাকে খুঁজতে জামিরা গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় সে।
শ্যামপুর থেকে জামিরায় দুই পথে যাওয়া যায়- এখান থেকে কাটাখালি হাট হয়ে বড় সড়ক ধরে সোজা পুবে বেলপুকুরিয়া। এইটুকু মাইল চারেক পথ। কাটাখালি থেকে বানেশ্বর পর্যন্ত ঘোড়াগাড়ি চলে। প্রথমে কাপাসিয়া হাট, তারপর বেলপুকুরিয়া মোড়। এরপর দক্ষিণ দিকে এক কোষ পায়ে হাঁটা কাঁচা রাস্তা মাড়িয়ে জামিরা গ্রাম। অন্য পথটি অপেক্ষাকৃত সোজা। শ্যামপুরের পুবে বেলঘরিয়া, তার পুবে একে একে নওদাপাড়া, গোবিন্দপুর ও বাদুড়িয়া গ্রাম। তারপরেই জামিরা। কাঁচা রাস্তাটা প্রায় সোজা চলে গেছে চারঘাটের হলিদাগাছি পর্যন্ত। এ পথে কোনো গাড়ি-ঘোড়া নেই, দুই পা-ই সম্বল। এই রাস্তাই ধরে মমিন। বেলপুকুরিয়া হয়ে গেলেও কমপক্ষে তিন মাইল হাঁটতে হবে। আর এদিক দিয়ে গেলে তার চেয়ে দেড়-দুমাইল বেশি। এরকম হাঁটার অভ্যাস তার আছে। তাছাড়া এলাকাটা দেখা হয়ে যাবে।
এসব গ্রাম মুর্শিদাবাবাদ অঞ্চলের মতোই। ফসলের মাঠ দিগন্তজোড়া, আম-কাঁঠালের বাগান, পতিত বন-জঙ্গল, বিশাল বিশাল বাঁশঝাড়, পুকুর-ডোবা, খাদ-খন্দক, আর তার মাঝে মাঝে ছোট ছোট জনবসতি। এ অঞ্চলে মাটির ঘরই বেশি। অবস্থাপন্নদের চালা টিনের নাহয় টালির, আর গরীবদের ঘরে খড়ের চাল।
বাদুড়িয়া পেরিয়ে পথটা একটা শাখা বের করে দেয় উত্তরদিকে। সেটাই জামিরা গ্রামে ঢুকেছে। এই পথটাই গোটা গ্রাম ভেদ করে আরো উত্তরে গিয়ে ঢাকা মহাসড়কে মিশেছে বেলপুকুরিয়া মোড়ে।
জামিরা গ্রামের নাম মমিনের আগে থেকেই জানা। তাদের অঞ্চলের আহলে হাদিস জামাতের লোকেরা প্রায় সবাই-ই জামিরার পীর মওলানা জাকারিয়া সাহেবের মুরিদ। পীর-মুরিদী বলতে যা বোঝায় এদের ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়ানো-ছিটানো জামাতের লোকরা একটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে থাকেন। এরা শরীয়তের নিয়ম-কানুন মেনে চলেন কঠোরভাবে। এদের পীরদের আসলে বলা চলে নেতা বা অভিভাবক। এরা সর্দার বলেও ডাকেন পীরকে। শরীয়তী কোনো সমস্যা স্থানীয়ভাবে না মেটাতে পারলে এরা পীরের শরণাপন্ন হন। অনেক সামাজিক বিষয়েও পীর বা তাঁর প্রতিনিধির হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। ভারত-পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে ভারতীয় অংশে-পড়া মুরিদরা আর তেমনভাবে পীরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন না। তবে নিবেদিত-প্রাণ কিছু লোক এখনো কষ্ট করে পীর-মুরিদি ধরে রেখেছেন।
বেশ বড় গ্রাম জামিরা। সবটা বেড়িয়ে দেখা মমিনের পক্ষে সম্ভব হয় না। সে ইচ্ছে এবং সময় কোনওটাই নেই তার। কামালকে খুঁজে বের করা তার আসল উদ্দেশ্য। রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে যতটুকু দেখা যায় তাতে বোঝা যায় এ গ্রামে অনেক ধনী লোকের বাস। অনেকগুলো বড় বড় বাড়ি আছে, তার মধ্যে কয়েকটা ইটের। পীরদের মসজিদ ও মাদ্রাসা আয়তনে খুব বড় না হলেও বেশ পুরনো। পাতলা ইট আর চুন-সুরকির দালানে একটু-আধটু ক্ষয় ধরেছে।
সে আসরের নামাজ পড়ে পীরদের মসজিদে। নামাজের পর একজন মুরুব্বিকে জিজ্ঞেস করে কামালের কথা। এ গ্রামে কামাল আছে কয়েকজন। কাক্সিক্ষত কামালের সূত্র খুঁজে পেতে তাই আরো অনেকের সাহায্য নিতে হয়। তারাই একে-ওকে ডেকে হদিস বের করে কামালের। সে এখন আর জামিরায় থাকে না। বানেশ্বর হাটের ওপর জমি কিনে বাড়ি করেছে সে। হাটের ওপর নানা রকম ব্যবসা করে। হাতে কাঁচা টাকা-পয়সা হয়েছে কিছু। সে বেশ প্রভাবশালী এখন।
সেদিনের মতো শ্যামপুর ফিরে আসে মমিন।
চৌদ্দ.
-কী ব্যাপার গো মাস্টার ভাই, কুণ্ঠে গেছেলেন? খুঁইজি খুঁইজি পাওয়া য্যায়ছে না।
মমিনকে সামনে পেয়ে তাকে একেবারে জাপটে ধরে তফেজ। তার হাঁক-ডাক শুনে মনে হয় গুরুতর কিছু ঘটে গিয়েছে, আর তার সঙ্গে তার যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু সে মনের মধ্যে গভীর অনুসন্ধান চালিয়েও তাৎক্ষনিকভাবে খুঁজে পায় না কী এমন ঘটতে পারে যার সঙ্গে তার যোগ রয়েছে। হঠাৎ তার সেদিন রাতের কথা মনে পড়ে তফেজ যেদিন ভিজে জবুথবু হয়ে তার কাছে এসেছিল। ব্যাপারটা তখনই তার কাছে রহস্যময় ঠেকেছিল। তার মনে কু গেয়েছিল এর মধ্যে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু আছে। কিন্তু বলতে পারেনি সে মুখ ফুটে। তারপর তো কয়েকদিন কেটে গিয়েছে, সে ভুলেই গিয়েছিল ব্যাপারটা। কিন্তু এর মধ্যে তার তো কোনো দোষ নেই। তার মনে সন্দেহ জাগে তফেজ নিজে বাঁচার জন্যে তাকে জড়িয়ে মিথ্যা কাহিনি ফাঁদেনি তো! ভেতর ভেতর কিছুটা ভড়কে যায় সে।
-আব্দুল্লাহ ভাই আপনেক খুঁইজ্ছে।
-আমাকে? ক্যানে? কী হয়িছে?
-তা তো আমি জানিনি। খুঁইজ্তে আইসিছোল। আমাক বুইল্লো, মাস্টার সাইব কুণ্ঠে রে?
-আমাকে ক্যানে খুঁইজ্ছে! প্রায় স্বগতোক্তির মতো করে বলে মমিন। তার কপালে ভাঁজ পড়ে।
জামিরা থেকে ফেরার পথে সন্ধ্যে হয়েছে নওদাপাড়ায়। সেখানকার এক মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়েছে মমিন। এতক্ষণে শীত জেঁকে বসতে শুরু করেছে। কুয়াশা নামছে ধোঁয়াটে চাদরের মতো। আকাশে এতক্ষণ যে তারাগুলো মিটমিট করছিল সেগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আঁধার ঘন হয়ে আসছে।
-আর কিছু ব্যলেছে?
-না, কী ব্যলভে?
মমিনের টনক নড়ে। তফেজ তার মুখ ভ্যাংচাচ্ছে নাকি? এতক্ষণ সে কি তাহলে মুর্শিদাবাদী আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল? কী আশ্চর্য! সে সাধারণত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। এটা সে চেষ্টা করেই শিখেছে। অবশ্য কিছু-না-কিছু আঞ্চলিক টান থেকেই যায়। তবু সে মোটামুটি ভদ্র বাংলা বলতে পারে। তাহলে এখন এরকম হলো কেন? ভয় পেয়েছে নাকি? হয়তো তা-ই হবে। সে দেখেছে মানুষ আনন্দ পেলে, রেগে গেলে, অবচেতনভাবেই মূল মাতৃভাষায় কথা বলে ফেলে। ভয়ে বা শোকেও হয়তো মানুষের এরকমই হয়। একেই বলে মাতৃভাষা, এ যে নাড়ির টান। আপনা থেকে, অবচেতনভাবে বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। চেষ্টা করে তাকে হয়তো ভুলে থাকা যায়, কিন্তু একেবারে মুছে ফেলা যায় না। কখনো না কখনো সেটা প্রকাশ পাবেই।
আব্দুল্লাহ সাহেব যে কারণেই তার খোঁজ করুন না কেন তাতে কোনো ঝামেলা হওয়ার কথা নয়। কারণ, আজ পর্যন্ত তার সঙ্গে তেমন কোনো দেখা-সাক্ষাৎ বা কথা-বার্তা কিছু হয়নি তার। বা তাকে নিয়ে কারো সঙ্গে কোনো গল্প-গুজবও করেনি সে। তাহলে খুঁজছেন কেন? সেটা ভাবনার বটে, তবে দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে তার। আর কথা বাড়ায় না মমিন। সে ঘরে ঢোকে। হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসে।
-মাস্টার সাইব, আছেন নাকি?
চৌকির ওপর ল্যাটা মেরে বসে পড়ছিল মমিন। সামনে হারিকেন ও বই। কণ্ঠটা অপরিচিত লাগে তার কানে। সেটা চিনে নেওয়ার আগেই আলগা ভেজানো দরোজা ঠেলে ঘরে ঢোকে আব্দুল্লাহ। মিটমিটে আলোয় ঘরে এমনিতেই রহস্যের ছায়া। অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির আগমনে সেটা আরো গভীরতা পায়।
-আসুন, বসুন। ত্রস্ত হয়ে নিচে নামে মমিন। কিন্তু এ ঘরে বসার আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। বাইরে বারান্দায় একটা টুল আছে, সেটাই নিয়ে আসে সে। তার ওপর বসে আব্দুল্লাহ।
-আপনের সাথে কথা ব্যুলবো-ব্যুলবো করছি ক’দিন থেকিই। …তারপর সাধারণ কিছু কুশলাদি বিনিময় হয় তাদের মধ্যে। আব্দুল্লাহ সম্পর্কে একটা সমীহ ভাব কাজ করছিল মমিনের মধ্যে। তাকে এ বাড়ির লোকেরা যেভাবে ভালবাসে, ভক্তি ও মান্য করে, আর সে যেরকম কম কথা বলে, কম মেশে, তাতে তাকে একজন অহংকারি মানুষ বলে ধারণা হয়েছিল তার। কিন্তু তার হাব-ভাবে সেরকম মনে হচ্ছে না। হাসি-হাসি মুখ, ও বন্ধু-বৎসল চোখের দৃষ্টি তার। এখন যেরকম সহজ-সরল ভাবে কথা বলছে তাতে বিপরীত চিত্রই ফুটে ওঠে। সে তার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছে যেন তারা অনেক দিন থেকে চেনা এবং ঘনিষ্ঠ।
-আপনাকে কলেজের মিটিং-এ দেখলাম।
-তাই নাকি? আপনে ছিলেন মিটিং-এ?
-হ্যাঁ, একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম আপনাদের বক্তৃতা।
-আচ্ছা, দ্যাখেন তো, মুখের ভাষা কাইড়ি লিবে তাই কি হয়?
-মুখের ভাষা কি কেড়ে নিতে চাচ্ছে? উর্দু রাষ্ট্রভাষা হবে, বাংলা তো আমাদের ভাষা থাকবেই। পশ্চিম পাকিস্তানেও তো কয়েকটা ভাষা আছে- সিন্ধি, পাঞ্জাবি, পশতু…। ওরা ওদের ওইসব মাতৃভাষাতেই কথা বলে। উর্দু ওদেরও ভাষা নয়। অসুবিধা হলে ওদেরও তো হওয়ার কথা। ওরা তো কিছু বলছে না।
-অরা ব্যুলছে না তার কারণ, অরা উর্দুও জানে। উর্দু হলে অরে অসুবিধা হবে না।
-উর্দু আমরাও তো কম বুঝি না। আমার মনে হচ্ছে ভাষা নিয়ে উভয় পক্ষ থেকেই বাড়াবাড়ি হচ্ছে। উর্দুর সঙ্গে বাংলাও যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তাতেই বা কী অসুবিধা আমি বুঝি না।
-এডিই তো সমস্যা, মাস্টার সাইব। অরা বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি সব ধ্বংশ কইরতে চাচ্ছে।
-দেখুন, আমাদের ওখানে, মানে পশ্চিম বঙ্গে হিন্দি আর ইংরাজির খুব দৌরাত্ম্য। উর্দুর প্রভাবও কম না। বাংলার সেখানেও জায়গা নাই। কিন্তু কই, ওইখানকার বাঙালিরা তো আন্দোলন করছে না, বলছে না বাংলা ভাষা বা বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংশ করে ফেলছে? ওরা কি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের চেয়ে কম বাঙালি, নাকি কম বোঝে?
আব্দুল্লাহ এতসব ভাবেনি। আসলে সে এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে। নেতারা যা বলছে ততটুকুই জানছে।
-দেখুন, আমার মনে হয়, উর্দুর পাশাপাশি বাংলা, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য ভাষাগুলোকেও রাষ্ট্রভাষা করা উচিত। করলে ক্ষতি তো নেই, বরং লাভই হবে, সবাই খুশি হবে, রাষ্ট্রেরও কোনো অসুবিধা হবে না। তাই না?
-হ্যাঁ, সেডিই তো অরা ব্যুঝছে না।
-কূপমণ্ডুকতা, অদূরদর্শিতা আর গায়ের জোর ছাড়া আর কিছু নয় এটা। এর ফল ভাল হতে পারে না।
-তাহিলেই বুঝেন, আন্দোলন না কইরি উপায় কী?
-তা ঠিক। তবে কারো না কারো উচিত সমঝোতার পথ অবলম্বন করা। সবাই-ই যদি চরমপন্থা গ্রহণ করে তাহলে সংঘাত আর অরাজকতা হবে। দেশের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে।
মমিন ভেবে পায় না এটা হয় কী করে। রাষ্ট্রের কর্ণধাররা এতটুকুও ভাববে না যে একটা সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, বিশেষ করে কোটি কোটি মানুষের ওপরে। এর ফল কখনো ভাল হতে পারে না। সকলকে ডেকে বসে পরামর্শ করে করলেই তো হয়, সবাই খুশি থাকে। তা না করে এ সরকার যা করছে তাকে অন্যায় এবং কূপমণ্ডুকতা ছাড়া আর কী বলা যায়! এটাই স্বৈরাচার। সে ভাবে, যারা সরকারের এই অন্যায় উদ্যোগ ও আচরণের বিরোধিতা করছে তারাও ভুল পথে এগুচ্ছে। সে এটা ভেবে আশ্চর্য হয় যে এরা আবেগটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি, যুক্তি এবং দূরদর্শিতার অভাব দেখা যাচ্ছে। অথবা এমনটাও হতে পারে যে, এই ইস্যুটাকে ব্যবহার করে অন্য খেলা খেলতে চাচ্ছে কেউ। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা যাকে বলে। পাকিস্তানের কপালে দুর্ভোগ আছে বোঝা যাচ্ছে।
এসব নিয়ে আরো অনেক কথা হয় ওদের। অনেক কিছুতেই একমত হয় তারা। আব্দুল্লাহ চমৎকৃত হয় মমিনের জানাশোনা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষমতা দেখে। সেটা অনুমান করতে পারে মমিন নিজেও। তার ভাল লাগে এই ভেবে যে এ বাড়ির সকলের প্রিয় মানুষটির সঙ্গে তার হৃদ্যতা সৃষ্টি হলো।
-আপনে তো খুব ভাল জানেন। কী কইরি শিখলেন এইসব?
-আমরা পাকিস্তান আন্দোলন করেছি। অনেক মিটিং-মিছিলে গিয়েছি।
হুগলিতে মাদ্রাসায় পড়ার সময় তাদের এক শিক্ষক ছিলেন। তিনি ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি এবং বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে অনেক কথা বলতেন। তার উৎসাহে অনেক বই পড়েছে মমিন। মাদ্রাসায় আজাদ পত্রিকা রাখা হতো। সেই পত্রিকা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ত সে। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় এসেও সে চর্চা অব্যাহত ছিল। এভাবে সে ভারত-পাকিস্তানের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ, সাম্প্রদায়িক ভেদ, মুসলমানদের অতীত ও বর্তমান, তাদের দুর্দশার কারণ ও এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়, ইত্যাদি বিষয়ে একটা সম্যক জ্ঞান লাভ করেছে।
-আপনের রাজনীতি করা উচিত।
আব্দুল্লাহর কথায় হাসে মমিন। তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করে, আমাকে নাকি আপনি খুঁজছিলেন? কোনো দরকার ছিল?
-হ্যাঁ, এইসব ব্যাপার লিয়েই কথা ব্যুলতে চাচ্ছিলাম। আসলে আমরা ইট্টুক মুশকিলে পইড়িছি ব্যুঝলেন? আমরা মুসলিম লীগ করি, আবার রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন সমর্থন করছি। এই লিয়ে ঝামেলা হোচ্ছে।
রাজশাহীতে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘কম্যুনিস্ট’রা। মুসলিম লীগের অনেকেও এর সঙ্গে রয়েছে। এরা না পারছে এই আন্দোলনের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হতে, না পারছে বিচ্ছিন্ন থাকতে। এই আন্দোলনের যুক্তিটা তাই ভাল করে বোঝা দরকার বলে মনে করছে তারা। রাজশাহীর মুসলিম লীগের নেতা হামিদ মিয়ার ছেলে হেনা তা-ই বলেছেন। কুরআন-হাদিস দিয়ে মাতৃভাষার গুরুত্বতুলে ধরা যায় কিনা, এবং পাকিস্তান সৃষ্টির তত্ত্ব ও আকাক্সক্ষার সঙ্গে একে মেলানো যায় কিনা সেটা ভেবে দেখতে বলেছেন তিনি। এ ব্যাপারে মৌলবি-মওলানাদের সঙ্গে আলাপ করতে বলেছেন। মমিন মাদ্রাসা পাশ করা ছাত্র শুনে আব্দুল্লাহ এ ব্যাপারটা নিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছিল।
-দেখুন, আমি মাদ্রাসা থেকে পাশ করেছি এটা সত্যি। কিন্তু এ মাদ্রাসা সে মাদ্রাসা নয়। এটা আলিয়া ঘরানার মাদ্রাসা। এটা সাধারণ স্কুলের মতোই, এখানে সব বিষয়ই পড়ানো হয়। এখানে ধর্ম বা কুরআন-হাদিস সাধারণ স্কুলের চেয়ে একটু বেশি পড়তে হয় এটা ঠিক, তবে তাতে কেউ মৌলবি বা মওলানা হওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।
তার কথা শুনে মনে মনে হতাশ হয় আব্দুল্লাহ। তাদের গ্রামে, মানে উত্তরপাড়ায় মৌলবি-মওলানার অভাব নেই। বড় আলেম হিসেবে তাদের কারো কারো নাম-ডাকও যথেষ্ট। তাদের কাছে যাওয়া যায়। সে গেলে তারা খুশিই হবে। কিন্তু যেতে চায় না আব্দুল্লাহ। ওদের সঙ্গে কেন যেন ঠিক মেলে না তাদের। অথচ একই জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর লোক তারা।
আব্দুল্লাহর মুখের দিকে তাকিয়ে তার হতাশা আঁচ করতে পারে মমিন। -আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারব। তবে কিছু সময় লাগবে।
ইলিয়াস খাবার নিয়ে আসে। -বড় ভাই, চাচী আপনেক্ ভাত খাইতে ডাইক্ছে।
ওঠে আব্দুল্লাহ। -তাহিলে দ্যাখেন তো কী করা যায়।
-আপনি ভাববেন না, আমি লিখে দিব।
আব্দুল্লাহ বিদায় নেয়। দরোজা ভিড়িয়ে দিয়ে ইলিয়াস বলে, আগে খায় লেন, মাস্টার ভাই। আমি অ্যাখুনই থালি-বাসুন লিই যাবো।
-আজ এত তাড়াহুড়া কেন? এশার আজানই তো এখনো হয়নি।
-চাচীর শরীল খারাপ। আজ তাড়াতাড়ি হ্যাঁশিল সামলায় ঘুমাতে যাবে। খায় লেন টপ কইরি।
হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে মমিন। ইলিয়াস বলে, বড় ভাই কী বুইল্ছলো?
এই ছেলেটার সব কিছুতে কৌতূহল। বিরক্ত হয় মমিন। -সে কথা জেনে তোমার কী কাজ বলো তো?
-না, আমার আর কী কাম। ভাই যাওয়ার সুময় বুইল্লো তো, তাই জিজ্ঞাস করনু।
-ও কিছু না। তুমি বুঝবে না।
– কী অ্যামুন জিনিস যে বুইজ্বো না?
-কুরআন-হাদিসের কথা। ভাষার কথা। বুঝলে?
-কুরান-হাদিস? বড় ভাই কুরান-হাদিসের কথা জিজ্ঞাসা কইরছে?
-কেন? তাতে অসুবিধা আছে?
-না, মানে, বড় ভাই তো নমাজ-রুজা ঠিক মুতন করে না। মাইন্ষে কত কথা বুলে।
এবার অবাক হয় মমিন। -নামাজ-রোজা করে না?
-রুজা কিছু কিছু করে। নমাজডা একদমই পড়ে না বুল্লেই হয়। শুক্করবারের নমাজ কুনুকুনু দিন বাড়িত্ থাইক্লে অবশ্য পড়ে। আর ঈদের নমাজ।
-কেউ কিছু বলে না?
-বুলে না আবার? চাচা বুলে, দাদা বুলে, আরো কত জন বুলে। বুইল্লে না করে না, কিন্তুক্ পড়ে না। অ্যার জন্যে সমাজে চাচাক্ কত কথা শুইন্তে হয়।
এখানে এসে প্রথম দু’তিন দিনেই টের পেয়েছে মমিন, এপাড়ার লোকজনের মধ্যে ধর্ম-কর্মের অনুশীলন কম। নিয়মিত নামাজ পড়ে খুব অল্প সংখ্যক লোকই। সে ভেবে পায় না, এরা মানুষ তো ভালই মনে হয়, ধর্ম মানে না এমনও নয়, তাহলে নামাজ-রোজার ব্যাপারে এত উদাসীন ও গাফেল কেন? আজকের আলোচনায় ধর্মের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে, কুরআন-হাদিসের গুরুত্ব ও প্রভাবের কথাও হয়েছে, তখন আব্দুল্লাহর কথা বা হাব-ভাবে তো মনে হয়নি সে ধর্ম-কর্মের বিরোধী। তার মনটা খুব ছোট হয়ে যায়। কিন্তু এ নিয়ে আর ভাবার ফুরসত পায় না সে। ইবরাহিম মণ্ডল দরোজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। -ক্যা বা মাস্টার সাইব, আছেন নাকি? নমাজ পইড়্বেন না?
ভাত খাওয়া তখনও শেষ হয়নি মমিনের। সে খেতে খেতেই উত্তর দেয়- আজান দেন চাচা, আমি আসছি।
দ্রুত খেয়ে নেয় সে। ইলিয়াস থালা-বাসন গুছিয়ে নেয়।
পনের.
আসলাম মৌলবির আজ শরীর খারাপ। ঠাণ্ডা লেগেছে। নামাজে কিরআত করার সময় বারবার গলা ঝাড়ছিলেন। তাই সালাম ফিরিয়ে বসে-বসেই ঘোষণাটা দিলেন তিনি- নমাজের পর তুমরা সগলাই বইসি যায়ো ভাইসব। সমাজের আলোচনা আছে। কোনো সম্বোধন বা ভূমিকা ছাড়াই বললেন। গ্রামে এরকম সাদা-সাপ্টা কথাই বলেন মৌলবি সাহেব। অতিরিক্ত কথা প্রায়ই বলেন না। তবে ওয়াজ মাহফিল হলে অন্য ব্যাপার। সেখানে ওলামায়ে কেরাম, মুরুব্বি-বুজুর্গসহ বেরাদরানে মিল্লাত কাউকে সম্বোধন করতে বাদ রাখেন না। পিতার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারে না তোফাজ্জল। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, খুব জরুরি আলোচনা। আপনারে সকলার থাকা উচিত। কেউ চইলি যাবেন না মেহেরবানি কইরি।
মৌলবি সাহেব বিরক্ত হলেন কিছুটা। বললেন- আচ্ছা, আচ্ছা। ঠিক আছে। বসো। অনেকেই ততক্ষণে সুন্নত নামাজে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। সুতরাং কথা তখনকার মতো বন্ধ হয়ে গেল।
নামাজ শেষে বেশিরভাগ মুসল্লিই চলে গেলেন। যারা থাকলেন তারা বেশিরভাগ মুরুব্বি এবং গণ্যমান্য ও প্রধান গোছের। তবে বেশ ক’জন তরুণও আজ থেকে গিয়েছে। তারা আগেভাগেই মসজিদের বারান্দায় গোছ-গাছ হয়ে বসে পড়েছে তোফাজ্জলকে সামনে রেখে। এই মসজিদের তিনটি অংশ- মূল মসজিদ ছাড়াও একটি বড়সড় বারান্দা রয়েছে, তার চারদিক লোহার জাফরি দিয়ে ঘেরা, ওপরে পাকা ছাদ; তারপর রয়েছে উঠোনের মতো একটা চত্ত্বর, এ অংশটুকুর মেঝেও পাকা, কিন্তু চারপাশ খোলা, ওপরেও ছাদ নেই। সালিশ, বা কোনো আলোচনা হলে সাধারণত তা মাঝখানের অংশে, অর্থাৎ বারান্দায় বসে।
বারান্দার মাঝ বরাবর আসন নিয়ে মৌলবি সাহেব গলা খাঁকারি দিলেন। অর্থাৎ তিনি এখন আলোচনা শুরু করবেন। সকলেই চুপ করে তাঁর দিকে মনোযোগ দিলেন। চারদিকে সবার ওপর নজর বুলিয়ে মৌলবি বললেন, সিরাজুদ্দিন মণ্ডল ভাই নাই নাকি?
-বাপ মুনে হয় চইলি গেছে। উত্তর দিলেন আজিম মণ্ডল।
আসলে সিরাজুদ্দিন মণ্ডল এসব সালিশ-দরবারে কোনোদিনই খুব একটা থাকেন না।
-ভাই থাইক্লে ভাল হোইতো।
-ক্যান, আজু তো আছে। তোফাজ্জল বলল।
-ব্যাপার কী? আমারে অ্যাতো খোঁজ হোইছে ক্যান?
আজিম মণ্ডলের কথার উত্তর না দিয়ে তাকে কাছে ডাকলেন মৌলবি সাহেব- আজু, তুমি এদিক সামনে আগায় আসো। আজিম মণ্ডল একটু এগিয়ে গিয়ে মামার সামনাসামনি বসলেন।
-ব্যাপার হোইলো…,
আলোচনা শুরু করলেন মৌলবি। মজু মণ্ডল তার ছেলের বিয়ে দিয়েছেন হানাফি ঘরে। কোনো বারণ শোনেননি তিনি। সেজন্য তার বাড়ির বিয়ে বয়কট করা হয়েছে। অর্থাৎ এই সমাজের কেউ তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবে না। কিন্তু বড়বাড়ির লোকেরা সমাজের এই সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করেছে। -হ্যাঁ, আমি মানছি তারা বড়বাড়ির লোকেরে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, কিন্তু সমাজ বুইলিও তো একটা কথা আছে। আমরা যদিল সমাজের ফয়সালা না মানি তাহিলে সমাজ থাকার কী দরকার?
-না, না, এইভাগে সমাজ চইল্তে পারে না। অ্যার একটা বিহিত হওয়া দরকার। গোয়ালপাড়ার এক মুরুব্বি বললেন।
-আমরা অ্যার বিচার চাই। আরেকজন বললো।
আজিম মণ্ডল আগে থেকেই ধারণা করেছিলেন এটা নিয়ে কথা উঠবে কখনো না কখনো। পরিবারের পক্ষ থেকে এর জবাবদিহিও তাকেই করতে হবে। তবে তিনি ধারণা করেছিলেন মৌলবি সাহেব এটা নিয়ে বেশি কথা হতে দিবেন না। কারণ তার মেজ ছেলে আফাজ্জল হানাফি ঘরে বিয়ে করেছে। সেটা বছর চারেক আগের কথা। এ নিয়ে সমাজে কথা উঠেছিল। তখন আজিম মণ্ডলই লজ্জিত ও অপমানিত মৌলবি সাহেবের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আফাজ্জল বাপ-মা বা গোষ্ঠীর লোকেদের অগোচরে বিয়ে করেছে। তাছাড়া তাকে বাড়িতে উঠতে দেওয়া হয়নি। সে বাইরে থাকে, বাইরে একা-একাই বিয়ে করেছে, বাইরেই থাকবে বউ নিয়ে। সুতরাং এ জন্যে মৌলবি সাহেবকে দায়ী করা চলে না। তাঁর এ যুক্তি মেনে নিয়েছিল সমাজের লোক। কেউ পাল্টা যুক্তি দেয়নি। ব্যাপারটা শুরুতেই চাপা দিয়ে দিয়েছিলেন আজিম মণ্ডল। কিন্তু তিনি জানতেন, এ বিয়ের খবর আফাজ্জল তার বাড়ির লোকেদের জানিয়েছিল। মৌলবি সাহেব নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু বিয়েতে বাগড়া দেওয়ার চেষ্টা করেননি। আফাজ্জল ভাল ছেলে, লেখাপড়া করেছে, একটা সরকারি চাকরি করে, তাকে নিয়ে তিনি গর্ব করেন। সে দূরে থাকে, কিন্তু বাপ-মায়ের খবর রাখে, এটা-ওটা কিনে পাঠায়। এসব দিক থেকে তাকে খারাপ বলা যাবে না। কিন্তু মেয়ের খপ্পর থেকে বাঁচতে পারল না। আফাজ্জল তার বিয়ের কথা আজিম মণ্ডলকেও জানিয়েছিল। তার বাপ-মাকে রাজি করানোর দায়িত্ব দিয়েছিল তাকে। মৌলবি সাহেব দুঃখ করে বলেছিলেন, দ্যাখো আজু, অঅমি সারা বছর আহলে হাদিসের ওয়াজ কইরি বেড়াই, আর আমার লিজের ছেলি হানাফির ঘরে বি কর্ইছে। মুখ দেখাব কী কইরি বুলো তো।
-আপনের কী দোষ মামু, হজরত নুহ নবীর ছেলিও তার কথা শুনেনি। কী কর্ইবেন। ছেলি সাবালক হয়ছে, শিক্ষিত বুঝদার ছেলি, অ্যাখুন ম্যাডাক্ পছন্দ হয়ছে… ম্যাও কিন্তু খারাপ না মামু, দেখতে-শুইন্তে বা আচারে-ব্যবহারে, কিংবা লেখাপড়াতে, ভালই। খালি হানাফি হোছে এই যা। আজকাল মানুষ আর এইসব দ্যাখে না।
সম্মত হয়েছিলেন মৌলবি সাহেব যে এ বিয়েতে তিনি বাধা দিবেন না। তবে গ্রহণও করবেন না। এতে আপত্তি করেননি আজিম মণ্ডলও। আফাজ্জলকে বুঝিয়েছেন তার বাপের সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা। বলেছেন- আস্তে আস্তে সব ঠিক হয় যাবে, ভাবিসনি।
তার কথা সত্যি হয়েছে। আফাজ্জল ও তার বউ নিজেদের ব্যবহার ও আচরণ দিয়ে সবার মন জয় করেছে। ইদানীং বাড়িতেও আসে, যদিও থাকে না বেশিক্ষণ।
এসব কারণে আজিম মণ্ডল মনে করেছিলেন তাদের বিষয়টা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করতে দিবেন না মৌলবি সাহেব।
-দ্যাখেন ভাইসব, মজু মুণ্ডল তো একঘরে হয় আছেই। তারে সাথে আমরা কুনু লেনদেনও করিনি। অ্যাখুন ভাইবি দ্যাখেন আপনেরা, অরে ঘরে আমারে বিটি আছে, আমারখে যখুন দাওয়াত কইরিছে, আমরা না গেলে আমারে ম্যাডার কী অবস্থা হবে! তা-ও আমরা যাইনি, আমারখে গুষ্ঠিসুইদ্ধি দাওয়াত দিইছে, কিন্তু আমরা যাইনি। খালি …ভাই, ভাবি, আর কয়েকজন ছেলিপেলিক্ পাঠাইছি। আমরা আসল মানুষ কেউ যাইনি।
-একজন যাওয়াও যা, সগলাই যাওয়াও তা-ই। আমরা খবর লিইছি, কম কইরি হলেও আট-দশ জন গেলছে। তোফাজ্জল প্রতিবাদ করে ওঠে।
চার-পাঁচ জনের বেশি যাওয়ার কথা নয়, ভাবেন আজিম মণ্ডল। তবে আত্মীয়বাড়ির দাওয়াত বলে কথা, আরো কিছু ছেলেপিলে যেতেও পারে। সে খবর তার নেওয়া হয়নি। তিনি বিষয়টাকে হালকা করতে বললেন, হুঁ, আতুড়-মাতুড়, কোলেরডা, পিঠেরডা ধর্ইলে আট-দশ জন হতেও পারে।
তার কথা শুনে একটা হাসির রোল উঠল। এতে আরো চটে গেল তোফাজ্জল- এডি হাসি-ঠাট্টার বিষয় না। সমাজ যেখিনে বয়কট কইরিছে, সেখিনে অরা ক্যান যাবে? এডি সমাজেক অবজ্ঞা করা না?
-তুই অতো থড়বড় করছিছ্ ক্যান? সমাজের মুণ্ডল-মাতব্বরেরা তো আছে নাকি? তোফাজ্জলের উদ্দেশে বলেন আজিম মণ্ডল।
-তোফা, তুই থাম। আমরা দেখছি। ছেলেকে মৃদু শাসনের সুরে বললেন মৌলবি সাহেব।
-ঠিক আছে। কিন্তু বিচার আমরা চাই। বলে তাকাল সে আশপাশে বসে থাকা সাগরেদদের দিকে। তারা সবাই শেখানো বুলির মতো হইহই করে উঠল- হ্যাঁ, আমরা অ্যার বিচার চাই।
আজিম মণ্ডলের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে তোফাজ্জল আগে থেকেই পরিকল্পনা করে লোকজন জুগিয়ে এনেছে। তিনি বললেন, আমিও তো তা-ই বুলছি, বিচার করেন না! দশজনে যে বিচার কইরবেন আমরা তা-ই মাইনি লিব।
এবার তিনি চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন তার বাড়ির তেমন কেউই উপস্থিত নেই এখানে। নামাজ হলো তো ব্যস! দে দৌড়। আর মন বসে না মসজিদে। এ বাড়ির লোকেদের আর কোনোদিন হুঁশ-বুদ্ধি হবে না। মনে মনে গজগজ করেন তিনি। [চলবে]