দ্বিতীয় সর্গ : ধাত্রী-গৃহে
এ এক আজব দেশ, কি অদ্ভুত এর
প্রথা, শিশুকে জন্মের পরই দেয়া হতো
ঠেলে দূরে ধাত্রী-গৃহে। মক্কার সমস্ত
অভিজাত পরিবার সদ্যোজাত শিশু
ঠেলে দিতো গ্রামে বিশুদ্ধ আরবিভাষী
মানুষদের সান্নিধ্যে, খাঁটি আরবি শিখে
হতে পারে যাতে তারা নিখাদ আরব।
বিনিময়ে ধাত্রীগণ উপহার পেতো
প্রচুর সম্পদ। তায়েফের হাওয়াজেন
গোত্রের একটি শাখা বনি সাআদ ছিলো
বিখ্যাত এ পেশায়। হালিমা সাআদিয়া
এ গোত্রেরই এক নারী। সে-বছর ছিলো
খরা। ফসল হয়নি খেতে। হালিমার
দুগ্ধ-শিশু পায় না বুকের দুধ, কাঁদে
সারা রাত্রি খিদেয়। দারুণ খাদ্যাভাবে
শুকায়ে গিয়েছে স্তন। ভাগ্য অন্বেষণে
স্বামীকে নিয়ে সে উঠলো গাধার পিঠে
একদিন। ভুললো না সঙ্গে নিতে তার
ছোট্ট শিশু। যাবে সে মক্কায়। যদি মেলে
কোনো ধনীর দুলাল, জুটবে অদৃষ্টে
বিপুল বৈভব। বনে যাবে রাতারাতি
ধনী হয়তো বা। অভাবানটন আর
থাকবে না সংসারে। বনি সাআদের
আরো কিছু নারী, ওই দিনই, স্বামী-শিশু
নিয়ে হয়েছিল বের একই উদ্দেশ্যে।
রুগ্ণ গাধা হালিমার, ছুটতে পারে না
জোরে। সবার পশ্চাতে তাই গিয়েছিল
তারা পড়ে। বিত্তশালীদের সব শিশু
খুঁজে খুঁজে নিয়ে সেইসব নারী বনি
সাআদের, ফিরে আসছিল হাসিমুখে।
কী কপাল হালিমার! হালিমা তখনও
পৌঁছোতে পারেনি মক্কা। রুগ্ণ তার গাধা
ছুটতে পারে না জোরে। তারা গিয়ে পেল
উজাড় শহর। ধনীদের ছেলেমেয়ে
নিয়ে গেছে যেন ছেঁকে। ফেলে রেখে গেছে
একটি এতিম শিশু সমস্ত মক্কায়।
নাম তার মহম্মদ। বললো হালিমা,
‘হায় রে অদৃষ্ট! এ শিশুর পিতা নেই।
একে নিয়ে গেলে পাবো না তেমন কিছু।
তবে শূন্য হাতে ফিরে যাবো, সেটাও বা
কেমন দেখায়! এখন, সায়মার বাপ,
তুমিই সিদ্ধান্ত নাও, খালি হাতে যাবো,
নাকি নিয়ে যাবো এতিম এ শিশুটাকে।’
স্বামী তার হারিস ইবনে আবদুল
উজ্জা বললো সমস্ত শুনে, ‘ফিরে যাবো
খালি খালি এত দূর এসে- হয় না এ-
তুমি যাও, নিয়ে আসো তাকে।’ তাই শুনে
ছুটলো হালিমা ফের আমিনার গৃহে।
অশ্রুসিক্ত চোখে যখন আমিনা তাঁর
পুত্রধন তুলে দিলো হালিমার কোলে,
আকাশ পাঠালো মেঘ। ছায়া দিয়ে সেই
মেঘ চলতে লাগলো পাছপাছ। অকস্মাৎ
উথলে উঠলো দুধ বুকে। হালিমা তা
পেল টের। মরা গাঙে উঠেছে জোয়ার
ফের। সে-দুধের ভারে স্তন ন্যুব্জপ্রায়।
পথিমধ্যে পড়লো সে বসে একখানে।
দক্ষিণ স্তনটি তার তুলে দিলে মুখে,
করতে লাগলো সে পান পরম তৃপ্তিতে।
অতঃপর দিতে গেল অন্য স্তন যেই,
ফিরিয়ে নিলো সে মুখ। বিস্মিত হালিমা
এ শিশুর হেন ব্যবহারে। অবশেষে
উথলে পড়া সে-দুধ খাওয়ালো সে তার
নিজের পুত্রকে। ভরে গেল পেট দুধে।
দুই শিশু নিয়ে, অতঃপর, হালিমা ও
তার স্বামী রুগ্ণ গাধার ওপর চড়ে
বসতেই, ছুটতে লাগলো যেন ঘোড়া।
ছুটতে ছুটতে তারা অতিক্রম করে গেল
বনি সাআদের আগে-ফেরা কাফেলাকে।
বিস্ময়াভিভূত তারা করলো জিজ্ঞেস,
‘এটা কি, হালিমা, আগেকার সেই গাধা?’
‘রুগ্ণ সেই গাধা’, বললো হালিমা হেসে।
পৌঁছোলো বাড়িতে তারা সবার আগেই।
মহোল্লাসে কিশোরী সায়মা জুড়ে দিলো
চিৎকার। ছিলো সে খালার সাথে গৃহে
যখন মক্কায় মহাব্যস্ত হালিমারা
বাচ্চার সন্ধানে। বললো সায়মা এসে,
‘আমাদের রুগ্ণ উটনীটা আজ, ও মা,
দিয়েছে অনেক দুধ! সে-দুধ আমরা
খেয়েছি সবাই মিলে। পালানে এখনও
রয়েছে প্রচুর জমে।’ সায়মার পিতা
সে-দুধ দোয়ালো। একসাথে করলো পান
তৃপ্তি মিটিয়ে। করলো স্রষ্টার প্রশংসা
উচ্চৈঃস্বরে। অতঃপর বললো, ‘হালিমা,
সত্যিই কল্যাণময় এক পুণ্য শিশু
এনেছো তোমার সাথে। এ-শিশুর কোনো
তুলনা হয় না।’ কিশোরী সায়মা সেই
আশ্চর্য শিশুকে তুলে নিলো তার কোলে
আর আবৃত্তি করতে লাগলো সুকণ্ঠে :
‘আমাদের মহম্মদ সব থেকে ভালো।
জীবিত থাক সে আমাদের মাঝে। সুশ্রী
বলিষ্ঠ যুবকে পরিণত হোক। আমরা
দেখবো দু-নয়ন ভরে তাঁকে। বড় হয়ে
সে যেন দখল করে নেয় ইয়েমেন,
সিরিয়া ও রোম। যে শত্রুতা করবে তাঁর
সাথে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রভু, তাঁকে
মহাসম্মানের অধিকারী করে দাও।’
হেলেদুলে সায়মা আবৃত্তি করে তার
তাৎক্ষণিক তৈরি পঙক্তিমালা; শিশুনবি
কান পেতে বুঝি শোনে আর পুষ্পকুঁড়ি-
চোখে পিটপিট করে চায়। হালিমাকে
ডেকে শোনায় সায়মা, ‘আমাদের ভাই
কিভাবে তাকায় দ্যাখো, যেন বোঝে সবই!
মহম্মদ আমাদের প্রজ্ঞাবান শিশু।’
শাসায় হালিমা, ‘ছি-ছি! এভাবে বলে না;
লোকেরা নজর দেবে। বদনজরে যে
কুসুমও শুকিয়ে যায়!’ এই বলে তাঁকে
শাড়ির আঁচলে ঢেকে পালায় হালিমা
ঘরের ভেতর, যেন কোনো গুপ্ত ধন
লুকাবে সিন্দুকে। এসেছে আশ্চর্য শিশু,
শুভ আগমন যার দিয়েছে বহায়ে
আনন্দের শিহরণ বাতাসে বাতাসে,
পুষ্পে পুষ্পে, পত্র ও পল্লবে। হালিমার
জমি-জিরাত- ছিলো যা বিরান বারোমাসই,
পুষ্পহীন, শস্যহীন- নতুন বৃষ্টিতে
ভিজে তা উঠলো বেঁচে। গজালো সেখানে
ঘাস। পশুপাল তার, সেই ঘাস খেয়ে
হৃষ্টপুষ্ট হলো। দিতে লাগলো দুধ তারা
বালতি ভরে ভরে। ‘হে হালিমা,’ বলে তার
স্বামী হারিস ইবনে আবদুল উজ্জা,
‘বরকত এনেছে বয়ে এ সুন্দর শিশু
আমাদের ঘরে। ভাগ্যের দরোজা গেছে
খুলে যে হঠাৎ! অযত্ন হয় না যেন
এর মোটে। চোখে চোখে রেখো সর্বক্ষণ।’
লোকেরা অবাক চোখে চেয়ে চেয়ে দ্যাখে
হালিমার ভরা মাঠ ফসলে ও ঘাসে।
উৎফুল্ল মেষপাল ভরা পেট নিয়ে
ঘরে ফেরে প্রতিদিন। সুখ-সচ্ছলতা
উপচে উপচে পড়ে তার ঘরে- দোরে।
ভাবে তারা, কী রহস্য এর। বুঝি তারা
পেয়ে গেছে জাদুর চেরাগ! সে- চেরাগ
আর কিছু নয়, আমিনার পিতৃহারা
পুত্র, হালিমার দুধছেলে, আবদুল্লাহ-
সায়মা-উনাইসা-হোজাইফার দুধভাই
স্বর্ণশিশু মহম্মদ, মহম্মদ নবি।
আনন্দের শেষ নেই, সুখ ও শান্তির,
হালিমার সংসারে। ছোট থেকে বুড়ো,
এ-শিশুকে নিয়ে মগ্ন সকলেই। যে-ই
চায় একটিবার তার পুণ্য মুখে, যায়
তার ঠাণ্ডা হয়ে বুক। হালিমার গৃহে
গড়াগড়ি যায় জোছনারা রাত্রিদিন,
যেন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে আকাশে।
ছুটে আসে দূর থেকে কত যে মানুষ
দেখতে একটা নজর সেই চন্দ্রমুখ!
হেসে-খেলে, নেচে-গেয়ে, আদরে-সোহাগে
দেখতে দেখতে কেটে গেল দু-বছর।
দুধ ছাড়ানোর হয়েছে সময়। আর
প্রথা অনুসারে নিজের মায়ের কাছে
পালিত শিশুকে ফিরিয়ে দেওয়ার দিন
এসেছে ঘনায়ে। শুনে কেঁদে জারজার
কিশোরী সায়মা। কাঁদে আর বলে : ‘না, না,
দেবো না মহম্মদকে কোথাও, মা, যেতে!
না হয় আমারই খানা দিও তুমি খেতে।’
হালিমার ত্রস্ত চোখ ভিজে যায় জলে।
কোলে তুলে নিয়ে আকাশের চাঁদ, বলে :
‘কোন্ অধিকারে, বাছা, রাখি তোরে কাছে!
তোর মা যে, হায়, চাতকের মতো আছে
চেয়ে তোর পথ! আমি তোর দুধমাতা-
এ ছাড়া তো নই।’ বলে দু’চোখের পাতা
ভেজায় সে শোকে। তা দেখে ফোলায় ঠোঁট
শিশুনবি, যেন কাঁদবার অভিপ্রায়ে
মেলেছে পাপড়ি শতদল। সেই ফুল
বুকে নিয়ে, ‘কাঁদে না! কাঁদে না, সোনা’ বলে
কত যে বোলায় হাত মাথায় ও পিঠে।
‘কী হয়েছে?’ বলে ঝটিকার পায়ে ছুটে
আসে সায়মার পিতা হারিস ইবনে
আবদুল উজ্জা। কে যেন দিয়েছে লেপে
চোখেমুখে তার গভীর বিষাদ। দুঃখ
উঠেছে উথলে, বুকে। মাতিয়ে জীবন
উত্তাল আনন্দে, চলে যাবে মহম্মদ-
চলে যাবে চিরতরে ফেলে এ কুটির,
আসবে না ফিরে আর- এই ভাবনায়
হয় না রাতের ঘুম, মন বসে না যে
কোনো কাজে। মাঠ থেকে ঘরে ফিরে আর
দেখতে পাবে না পদ্মফুলফোটা মুখ-
ভাবলেই হৃদয় শুকিয়ে যায়। আঁখি
তার ছলোছলো। ‘আমাদের মহম্মদ
কী চায় আমাকে বলো!’ বলে তুলে নেয়
তাঁকে কোলে। কাঁদে সায়মা পিতার বস্ত্র
ধরে, ‘বলো, বাবা, আমাদের মহম্মদ
যাবে না কোথাও আমাদের ছেড়ে বলো!’
শুনে পিতাও যে তার, নির্বাক নির্ঝর
যেন, ছেড়ে দেয় অশ্রুজল; ‘বোকা মেয়ে!’,
কী করে সে বলে আর কিভাবে বুঝায় :
‘কোন্ সূত্রে বাঁধি বল্ পরের পুত্রকে !’
দিনক্ষণ ঠিক হলো মক্কায় যাওয়ার।
সায়মাও গেল সাথে। মক্কার ভাস্কর
তায়েফের দোলনায় দুলেছে দোদুল
দু-বছর। দুলিয়েছে তায়েফবাসীর
হৃদয় যে দুর্লভ হাসিতে, তাকে ফের
সমস্ত নিয়ম ভেঙে, প্রথা ভেঙে, নিয়ে
আসবে তায়েফে, হালিমার গৃহে- সেই
স্বপ্নে বিভোর সায়মা। হালিমাও খোঁজে
কত যে বাহানা। থেকে থেকে কাঁদে মনÑ-
বুকজুড়ে উথলে উঠেছে শোক, চোখে
নেমেছে যে অমানিশি। কি-মায়ার জালে
বেঁধেছে এ শিশু! কী হবে উপঢৌকন,
বিত্ত-বৈভব, যদি না মহম্মদ যায়
সাথে! তার একটা হাসির বিনিময়ে
দিয়ে দেয়া যায় বুঝি সবই। কি-আজব
শিশু, কি-অমূল্য শিশু এ যে, যেই তাকে
দ্যাখে একটিবার, সেই বোঝে, যেরকম
সোনা দেখে সাধারণ লোকও বোঝে স্বর্ণ-
মূল্য তার। বুঝায় হালিমা আমিনাকে
মক্কা নগরীর নানা সমস্যার কথা;
বলে, ‘শুনেছি মক্কায় ছড়িয়ে পড়েছে
নানা সংক্রামক ব্যাধি। যদি চান, নিয়ে
যাবো ফিরিয়ে আমরা মহম্মদকে। আরো
কিছুদিন আমাদের কাছে রেখে দেবো।
ভয় হচ্ছে, এ-সময়ে মক্কায় থাকলে
কোনো ক্ষতি হতে পারে তার। না জানি কী
অসুখ-বিসুখ হয়ে বসে!’ আমিনা তা
শোনে মন দিয়ে আর দ্যাখে চেয়ে চেয়ে-
পিতৃহারা পুত্র তাঁর নয়নের মণি
কি-ফুর্তিতে করছে খেলা সায়মার কোলে !
সত্যিই তো, গুটি-বসন্তের প্রাদুর্ভাবে
ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছে মক্কায়! যদি
আক্রান্ত হয় সে অন্য শিশুদের মতো,
থাকলে এখানে! হালিমা চাচ্ছেই যদি
নিয়ে যেতে ফের, যাক না, থাকুক গিয়ে
নিরাপদে দুধমার কাছে কিছুদিন
আরো। ক্ষতি কিবা তাতে! এ-হেন সিদ্ধান্তে
আমিনার, ছড়িয়ে পড়লো মহাখুশি
হালিমার সারা মুখে, মাটির কুটিরে
যেরকম হেজাকের আলো। ছুটে গিয়ে
সেই বার্তা জানালো পিতাকে মহানন্দে
কিশোরী সায়মা। পরম করুণাময়
মহান স্রষ্টার দরবারে পিতা তার
জানালো শুকরিয়া প্রাণভরে। অবশেষে
নানা উপঢৌকনে আমিনা ভরে দিয়ে
হালিমার গাধা, জানালো বিদায়। দিক-
বিজয়ীর বেশে ফিরলো সায়মা গৃহে।
লোকজন ছুটে এসে দেখলো তার সূর্য-
মুখ; মুহূর্তেই ঘুচে গেল অন্ধকার
জমে ছিলো যত জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
শিশু মহম্মদ নক্ষত্রের পায়ে ছোটে
হালিমার আঙিনায়। আলোকচ্ছটায়
চমকায় চারদিক। পাড়ার শিশুরা
পতঙ্গের মতো ধরে ঘিরে তাকে, যেন
বিদ্যুতের বাতি কোনো রাত্রির শহরে।
দুধভ্রাতা আবদুল্লাহ-হোজাইফা আর
দুধবোন উনাইসা-সায়মাও এসে
মাতে সে খেলায়। হালিমার গৃহকোণে
বসে রোজ চাঁদের বাজার। তাই দেখে
জুড়ায় নয়ন হালিমা ও তার স্বামী।
বাড়ির পাশেই বড় মাঠ হালিমার।
সে-মাঠে চরাতে যায় মেষ দুধভ্রাতা
আবদুল্লাহ। মহম্মদ খোঁজে তাকে সারা
বাড়ি। হালিমা বুঝায় তাকে কতভাবে,
তবু সে নাছোড়, ভাইকে যে তার চা-ই।
‘তোমার ভাই যে মেষ নিয়ে গেছে মাঠে;
এই তো ফিরলো!’ মহম্মদ ধরে জিদ-
সেও যাবে মাঠে, মেষ চরাবে সে তার
ভাইয়ের সাথে। হালিমার হাত ধরে
ছোটে শিশু মহম্মদ। অবাক নয়নে
মেষেরা, ঘাসের কথা ভুলে, চেয়ে থাকে
তার দিকে। যেন পড়ে গেছে শোরগোল
মেষপালে- মহম্মদ মহম্মদ ধ্বনি
আছাড়ি পিছাড়ি খায় মরুর বাতাসে।
মেষদের সাথে মেতে ওঠে আবদুল্লাহ-
মহম্মদ মধুর খেলায়। তাই দেখে
ফিরে যায় বাড়িতে হালিমা, তৃপ্ত মনে।
তবু সায়মার বাপ বিচলিত হয়ে
ছুটে আসে পরপরই। আরও কিছুক্ষণ
খেলে মেষ চরানোর খেলা, ফিরে চলে
তারা বাড়ি। এরপর থেকে প্রায় দিনই
আবদুল্লাহ-মহম্মদ যেতে থাকে মাঠে।
উন্মুক্ত আকাশ, বিশাল পৃথিবী আর
প্রকৃতির নানা রঙ দেখে ভবিষ্যৎ-
নবি চমকে চমকে ওঠে। মেষপাল
লুটায় আনন্দে তাকে দেখে, বাতাসেরা
নৃত্য করে চলে খেজুরপাতায়, গলা
ছেড়ে ধরে গান বনের পাখিরা। তাকে
দেখে যেন চিনতে পারে না আবদুল্লাহ;
মনে হয় ভিন্ন গ্রহ থেকে আসা কেউ।
ভয়ঙ্কর কাণ্ড এক, একদিন, ঘটে
গেল মাঠে আকস্মিক। নিত্যকার মতো
করছিল তারা খেলা। হঠাৎ দু’জন
লোক, দুধসাদা বস্ত্র পরিধানে, এসে
ডাকলো মহম্মদকে। তাকে নিয়ে তারা
চললো নির্জনে। আবদুল্লাহ দেখছে সব
দূর থেকে। দেখলো সে, তাকে ধরে তারা
শোয়ালো মাটিতে। অতঃপর খুব দ্রুত
ফেঁড়ে ফেললো তার সিনা। তাই দেখে ভয়ে
কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেল আবদুল্লাহ
বাড়ি। মাকে গিয়ে বললো সমস্ত কথা।
হালিমা ও তার স্বামী উল্কার গতিতে
ছুটে এলো। এসে দেখতে পেল- হতভম্ব
একাকী দাঁড়িয়ে মহম্মদ; তার সারা
গায়ে কাঁদামাটি। সে বললো, দুটো লোক
এসে তার বক্ষদেশ চিরে ফ্যালে। ফেলে
বের করে নেয় তার হৃৎপিণ্ড, যা একটি
সোনার বাটিতে রেখে ফ্যালে ধুয়ে। ফের
সেটি বুকের ভেতরে পুরে সেলাই করে
দেয় তার বুক। হঠাৎ কোথায় যেন
তারা হয়ে যায় অদৃশ্য। হালিমা তাই
শুনে, জুড়ে দেয় আর্তনাদ। ‘মহম্মদ!’
‘হায় মহম্মদ!’ বলে চাপড়ায় বুক
আর বলে, ‘আমিনাকে আমি কী জবাব
দেবো, হায়!’ মহম্মদ বলে, ‘আমি ঠিক
আছি, দ্যাখো।’ হালিমার ভয় তাতে কাটে-
না একটুও। তাকে নিয়ে তারা ফিরে আসে
বাড়ি। ‘মহম্মদ! মহম্মদ!’ বলে কাঁদে
বোন সায়মাও। কোর্তা খুলে তার, কত-
বার দ্যাখে তার বুক তন্ব তন্ব করে
হালিমা, কাটার কোনো দাগ আছে কিনা
তার ছোট্ট বক্ষ-’পরে। হারিস ইবনে
আবদুল উজ্জা হালিমাকে ডেকে বলে,
‘চলো হে হালিমা, যার পুত্র তার কাছে
দিয়ে আসি ফিরিয়ে আমরা। ভয় হচ্ছে
এখানে থাকলে তার বড় ধরনের
কোনো ক্ষতি হতে পারে।’ সেইদিনই তারা
মক্কায় চললো ছুটে। বললো আমিনা
শুনে, ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছো তার ’পরে
আছর পড়েছে কোনো অশুভ শক্তির?’
বললো হালিমা, ‘আমার তো মনে হচ্ছে
তা-ই!’ আমিনা বললো, ‘হে হালিমা, তবে
শোনো, সে যখন এলো পেটে, আমি স্বপ্ন
দেখলাম। দেখলাম আমার ভেতর
থেকে একটা আলো বের হয়ে চতুর্দিক
করে তুললো আলোকিত। সে-আলোয় আমি
দেখতে পেলাম স্পষ্ট, বসরার সুউচ্চ
রাজপ্রাসাদও। সে ক্রমশ আমার গর্ভে
বৃদ্ধি পেতে থাকলো। খোদার কসম, এত
আরামদায়ক গর্ভধারণের কথা
কোথাও শুনিনি আমি। যখন প্রসব
করলাম তাকে, তার হাত দুটো ছিলো
মাটিতে এবং আকাশের দিকে ছিলো
উঁচু করা তার মাথা। মনে রেখো, কোনো
অশুভ শক্তির কাছে আমার এ পুত্র
নোয়াতে আসেনি মাথা।’ অবাক বিস্ময়ে
রইলো হালিমা চেয়ে যেন উঁচু কোনো
পর্বতের দিকে, ছুঁয়েছে যা আসমান।