বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে নানা মাত্রিক পরিবর্তন লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে বিগত কয়েক বছরে। এখন ফিকশনের প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং বলতেই হয় কবিতা পিছিয়ে পড়েছে এবং পড়ছে। বিগত বছরটি গেছে নানা ঘটন- অঘটনের মধ্য দিয়ে। সবাই জানেন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার কমিটির একজন পরিচালকের স্বামীর যৌন কেলেংকারীর কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় এবং এ নিয়ে আন্দোলন বিক্ষোভের মুখে গত বছর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয় নি। এই ঘটনা ছিল বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনের জন্য দুঃসংবাদ। নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বাছাইকারী সংস্থা সুইডিশ একাডেমির সদস্য ক্যাটরিনা ফ্রস্টেনসনের স্বামী ফরাসী চিত্র সাংবাদিক জাঁ ক্লদ আর্নল্টের বিরুদ্ধে ১৮ মহিলার উপর যৌন নির্যাতন ও নোবেল পুরস্কারের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ এলে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দেয়। অভিযোগ ছিল, আরনল্ট যৌন হয়রানি ছাড়াও আর্থিক অনিয়ম করেছেন এবং ৭ জন নোবেল বিজয়ীর নাম ফাঁস করে দেন- যা নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ও সংশ্লিষ্ট ঘটনার উপর প্রভাব ফেলে। অনেক গোপনীয় তথ্য ফাঁস হয়ে পড়ায় কমিটির কাজে ব্যাঘাত ঘটা ছাড়াও এতে পুরস্কারের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। গত নভেম্বরে আর্নল্টের বিরুদ্ধে স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হয়। আর্নল্ট ও তাঁর স্ত্রী বহু বছর ধরে স্টকহোমে নোবেল পুরস্কার জয়ী লেখক লেখিকাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে পরিচালিত প্রদর্শনী, লেখা পাঠের অনুষ্ঠান বা অন্যান্য পারফর্মিং কর্মকাণ্ড পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ফোরাম নামে একটি ক্লাব চালাতেন। এটি পরিচালিত হতো নোবেল কমিটির ফান্ডে। এটি পরিচালনা করতে গিয়ে আর্নল্ট সংশ্লিষ্ট মহিলাদের যৌন হয়রানি ও অর্থ তসরুপ করেন বলে অভিযোগ। ক্লাবটি পরে বন্ধ করে দেয়া হয়। তাদের কার্যক্রমে অনিয়ম ও যৌন হয়রানির প্রতিবাদে ২০১৮ সালের ৩ মে সাহিত্য পুরস্কার মনোনয়ন কমিটির চেয়ারম্যানসহ ৭ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। ফলে দেখা দেয় অচলাবস্থা। পরিণামে পুরস্কার স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। কার্যত ১৮ জন মহিলা আর্নল্টের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনে প্রকাশ্যে মুখ খুললে একাডেমি থেকে ক্যাটরিনাকে বরখাস্তের ব্যবস্থা নেয় সংশ্লিষ্ট কমিটি। কিন্তু এ ব্যাপারে কমিটির ১৮ সদস্য একমত না হওয়ায় তীব্র বিভাজন দেখা দেয়। তখন কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন পার্মানেন্ট সেক্রেটারি প্রফেসর সারা দানিউস। তাঁর পদাংক অনুসরণ করেন আরো ৬ সদস্য। এর আগে ১৯ এপ্রিল স্টকহোমে সুইডিশ একাডেমি ভবনের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। প্রধানত নারীরাই এতে যোগ দেন। তারা পদত্যাগকারী সারা দানিউসের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। তারা যৌন হয়রানির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের জয় হয়েছে এবং বিচারে কারাদন্ড হওয়ায় আর্নল্ট কারাগারে রয়েছেন। সম্প্রতি সুইডিশ কমিটি এবছর সাহিত্যে দুটি নোবেল পুরস্কার দেয়ার কথা ঘোষণা করেন এবং সেই মতে কার্যক্রম চলছে। আর অতীতের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে কমিটিতে কিছু পরিবর্তনও আনা হয়েছে।
নোবেল পুরস্কারের পর মর্যাদার দিক থেকে পরবর্তী স্থানে থাকা ম্যান বুকার পুরস্কারের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আসছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। শর্টলিস্ট ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে। পাঠকরা এই লেখা যখন পড়বেন তখন বিজয়ীর নামও ঘোষণা করা হয়ে যাবে। আর জুন ২০১৯ এর পর বুকার পুরস্কার স্বনামে ফিরছে। ম্যান গ্রুপ পিএলসি এই পুরস্কারের স্পন্সরশীপ প্রত্যাহার করায় নতুন একটি সংস্থা এই পুরস্কারের স্পন্সর হবে ৫ বছরের জন্য। পরে আরো ৫ বছর বাড়ানো হতে পারে। ম্যান বুকারে কয়েক বছর আগে মার্কিন লেখকদের অংশ গ্রহণের সুযোগ করে দেয়ার পর পর কয়েক বছর মার্কিনীরা এ পুরস্কার জয় করায় লন্ডনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সামনে কি হবে আগামী মাসগুলোতে তা পরিস্কার হবে।
আগেই বলছিলাম ফিকশনের প্রাধান্যের কথা। ফিকশন অর্থে কথা সাহিত্য অর্থাৎ উপন্যাস ও ছোটগল্প বুঝালেও উপন্যাসেরই জয়জয়াকার চার দিকে। ছোট গল্প কম লেখা হচ্ছে বলা যাবে না হয়তো, কিন্তু ছোট গল্পের সংকলন প্রকাশ সেই হারে হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপীই এই প্রবণতা লক্ষণীয়।
আর নতুন প্রবণতা হিসেবে লেখার বিষয়বস্তু ও স্টাইলে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। সাধারণ ঘরোয়া কাহিনীর পাশাপাশি ইতিহাস নির্ভর কাহিনী, ক্রাইম ফিকশনধর্মী লেখা ও সেক্স প্রাধান্য পাচ্ছে। আরেক ঘটনাও লক্ষ্য করার মতো। আমেরিকা বৃটেনকে ছাপিয়ে নতুন নতুন দেশের লেখক-লেখিকারা সাহিত্য অঙ্গনে উঠে আসছেন। গত বছর ম্যান বুকার পুরস্কারের ক্ষেত্রেও এ চিত্র দেখা যায়, যখন দেখা গেল পোলিশ লেখিকা টোকারজুক জিতে নিলেন এ পুরস্কার। কোথাও কোথাও জনপ্রিয়তা বা বেস্ট সেলারের দৌড়ে বড় লেখককে পেছনে ফেলে দিয়েছেন নতুন লেখক বা লেখিকারা।
দুই.
নোবেল পুরস্কারের পর সবচেয়ে মর্যাদাবান সাহিত্য পুরস্কার বুকার পুরস্কারের ৫০ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে গত জুলাই মাসে লন্ডনে এক উৎসবের আয়োজন করা হয়। ‘ম্যান বুকার ফেস্টিভাল’ নামের এই উৎসবে বিগত ৫০ বছরে পুরস্কার পাওয়া অনেক নামকরা লেখক-লেখিকা যোগ দেন। বুকার পুরস্কার নামে এই পুরস্কার চালু হলেও লন্ডনে ব্যবসায়ী সংস্থা ম্যান গ্রুপ পিএলসি এর স্পন্সর হওয়ার পর এর নামকরণ করা হয় ‘ম্যান বুকার পুরস্কার’। ম্যান বুকার পুরস্কার ও ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার- এ দুই ক্ষেত্রেই এখন প্রতি বছর পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। গত বছর ৬ থেকে ৮ জুলাই লন্ডনে এ উৎসবে ৬০ জনেরও বেশি অতিথি বক্তা যোগ দেন।
মাইকেল ও তার বই
এ উৎসব উপলক্ষে বিগত ৫০ বছরের সবচেয়ে সেরা বই হিসেবে ‘গোল্ডেন ম্যান বুকার প্রাইজ’ জিতে নেয় মাইকেল অনডাটজের উপন্যাস ‘দি ইংলিশ প্যাশেন্ট’। মাইকেল শ্রীলংকায় জন্মগ্রহণকারী একজন কানাডীয় লেখক। তার বইটি ১৯৯২ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করে। গোল্ডেন বুকারের শর্টলিস্টে ছিল মার্কিন লেখক জর্জ সন্ডার্সের ‘লিংকন ইন দি বার্দো’ ও বৃটিশ লেখিকা হিলারি ম্যান্টেলের ‘উলফ হল’।
বুকার পুরস্কারের সূচনা হয় ১৯৬৯ সালে। তখন এই পুরস্কারের নাম ছিল ‘বুকার-ম্যাক কনেল প্রাইজ ফর ফিকশন’। তবে সাধারণভাবে বুকার পুরস্কার হিসেবেই বলা হতো। বৃটিশ কোম্পানি বুকার ম্যাক কনেল লিমিটেডের নামে এর নামকরণ করা হয়। ২০০২ সালে এই পুরস্কার প্রদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত হয় বুকার প্রাইজ ফাউন্ডেশন আর ম্যান গ্রুপ এই পুরস্কারের স্পন্সর হয়। প্রথম বছরে এই পুরস্কারের অর্থ মূল্য ছিল ২১ হাজার পাউন্ড এবং তা দীর্ঘদিন ধরে ছিল। ২০০২ সালে এর মূল্যমান বাড়িয়ে ৫০ হাজার পাউন্ড করা হয়। সময়ে সময়ে এই পুরস্কারের নিয়মকানুনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ইংল্যান্ডের লেখকদের সেরা উপন্যাসের জন্য এই পুরস্কার দেয়ার বিধান ছিল। পরে কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশগুলোর লেখকদের ইংরেজি ভাষায় লেখা বই এই পুরস্কারের আওতায় আসে। ২০১২ সালে সারা বিশ্বের ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত উপন্যাসের জন্য এর দুয়ার খুলে দেয়া হয়। তবে এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। পরপর দু বছর মার্কিন লেখকরা এ পুরস্কার নিয়ে যান। এ নিয়েও বিতর্ক কম হয় নি। ভারতের একাধিক লেখক লেখিকা এ পুরস্কার পেয়েছেন। এটি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী সাহিত্য পুরস্কার। এ পুরস্কারের মধ্য দিয়ে বহু লেখক উঠে এসেছেন এবং বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে সুপরিচিত হয়েছেন, দ্যুতি ছড়িয়েছেন। তাদের বই অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে। ১৯৬৯ সালে প্রথম বুকার পুরস্কার জয়ী উপন্যাসের নাম ‘সামথিং টু অ্যানসার ফর’। এটির লেখক ব্রিটেনের পি এইচ নিউবি। যুক্তরাজ্য ছাড়াও বহু দেশের লেখক-লেখিকারা এ পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৭ সালে এ পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ সন্ডার্স। ২০০৫ থেকে চালু হয় ম্যান বুকার ইন্টান্যাশনাল প্রাইজ। প্রতি দু বছরে এক বার দেয়া হতো এ পুরস্কার। ২০১৫ থেকে প্রতিবছর এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। বিশ্বের যে কোন দেশের লেখকের লেখা উপন্যাস ইংল্যান্ড থেকে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হলে এই পুরস্কারে অংশ নিতে পারে। মূল লেখক ও অনুবাদককে পুরস্কারের অর্থ ভাগ করে দেয়া হয়। ২০১৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার জিতে নিয়েছেন পোল্যান্ডের লেখিকা ওলগা টোকারজুক তার উপন্যাস ‘ফ্লাইটস’ এর জন্য। তিনি এ বছরও আছেন শর্ট লিস্টে। এত সব আয়োজন সত্ত্বেও ম্যান বুকারের ইতি ঘটছে জুন মাসে।

ওলগা টোকারজুক ও তার উপন্যাস ফ্লাইটস
তিন.
বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে নতুন প্রবণতা হিসেবে লেখার স্টাইলে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে । প্রথাগত উপন্যাসের চেয়ে অতীত আশ্রয়ী কোন কাহিনী, থ্রিলার বা চমকে দেয়া নতুন কাহিনীবস্তু পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছে। যেমন ২০১৮ সালে বুকার জয়ী জর্জ সন্ডার্সের উপন্যাস ‘লিংকন ইন দি বার্দো’তে উঠে এসেছে দুঃখের এক অতীত। নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা ফিকশনের মধ্যে গোয়েন্দা কাহিনী বা থ্রিলার দেখা যাচ্ছে অনেক। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিকথা বা স্মৃতিচারণমূলক ব্যক্তিগত রচনাদি দেশেদেশেই পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছে। কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের মতোই। ইদানিং পাঠক উপন্যাস বা এই ধাচের আলগা রচনাও পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠছে। কবিতার বইয়ের কাটতি সে তুলনায় কম। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পান একজন কবি। তিনি হলেন কবি ও সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলান। এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তি কবিতার প্রতি স্বীকৃতিই বটে। আরেকটি প্রবণতা হচ্ছে, আমেরিকা বৃটেনকে ছাপিয়ে নতুন নতুন দেশের লেখক-লেখিকারা সাহিত্য অঙ্গনে উঠে আসছেন। কোথাও কোথাও জনপ্রিয়তা বা বেস্ট সেলারের দৌড়ে বড় লেখককে পেছনে ফেলে দিচ্ছেন নতুন লেখক বা লেখিকারা।
মুরাকামি ও তার উপন্যাস
জাপানে জনপ্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামির বই বিক্রি বেশী সবার জানা। প্রতি বছর তাঁর বিপুল সংখ্যক উপন্যাস বিক্রি হয়ে থাকে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে জাপানী লেখিকা রিকু ওন্ডার নতুন উপন্যাস ‘হানি বি এ্যান্ড ডিসটেন্ট থান্ডার’ ২০১৭ সালে জাপানে বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায় সেরা ১০ জনের মধ্যে শীর্ষস্থানে ছিল। মুরাকামির নতুন উপন্যাস ‘কিলিং কমেন্ডাটোর’ ছিল এই তালিকার দুই নম্বরে।
আরব বিশ্বে ফিলিস্তিনী লেখকদের লেখা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গত বছর আরব আমিরাতের আয়োজনে আরব বুকার হিসেবে খ্যাত ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর এরাবিক ফিকশন জিতে নেন ফিলিস্তিনী লেখক ইব্রাহিম নাসরাল্লাহ তাঁর ‘সেকেন্ড ওয়ার অফ দি ডগ’ উপন্যাসের জন্য। নাসরাল্লাহর জন্ম জর্দানের আম্মানে এক উদ্বাস্তু শিবিরে। তাঁর উপন্যাসে দেশহীন মানুষের দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই দেশহীন মানুষ ফিলিস্তিনীরা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মিসরের লেখকদের বইও আরব বিশ্বে জনপ্রিয়। সেখানেও নতুন নতুন লেখক উঠে আসছেন। লেখার স্টাইল ও ভাষাবৈচিত্র্য মিসরের সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
হুদা বারাকাত ও তার বই (আররী সংস্করণ )
২০১৯ সালে এই আরব বুকার পুরস্কার লাভ করেছে হুদা বারাকাতের উপন্যাস ‘দি নাইট মেইল’ । গত ২৩ এপ্রিল দ্বাদশ ইন্টারন্যাশনাল প্র্ইাজ ফর দি অ্যারাবিক ফিকশন (আইপিএএফ) পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। এবছরের এই পুরস্কারের বিচারক মণ্ডলীর প্রধান শারাফদিন মাজদুলিন এই পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ফেয়ারমন্ট বাব আল বাহারে এক অনুষ্ঠানে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যমানের এই পুরস্কার হুদা বারাকাতের হাতে তুলে দেয়া হয়। এছাড়াও এটি লন্ডনে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশের খরচও বহন করবে পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থা। ২০২০ সালে এটি ‘দি নাইট পোস্ট’ নামে প্রকাশ করা হবে। এটির স্বত্ত্ব ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের ওয়ানওয়ার্ড পাবলিকেশনের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তবে এই উপন্যাসের পুরস্কারপ্রাপ্তির ঘোষণা দেয়ার পর কিছু সমালোচনাও শুরু হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন এটি যথাযথ মানসম্পন্ন উপন্যাস নয়। হুদা বারাকাত লেবাননের একজন লেখিকা। ১৯৫২ সালে বৈরুতে তার জন্ম। তিনি পেশায় শিক্ষক ও সাংবাদিক। বর্তমানে বসবাস ফ্রান্সের প্যাবিসে। এ পর্যন্ত তার ৬টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া প্রকাশ হয়েছে একটি ছোট গল্প সংকলন ও একটি স্মৃতিকথা।
এশিয়ার অন্যান্য দেশে ইংরেজি ভাষার বইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষার বইও বেশ জনপ্রিয়। জাপান, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা ও নেপালের নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে করা যায়। এসব দেশে বহু জনপ্রিয় লেখক লেখিকার বই বেস্ট সেলারের তালিকায় উঠে আসছে।
ইন্দোনেশিয়া বইয়ের একটি বড় বাজার। এখানে অনেক লেখকের লেখা বেস্ট সেলার। একা কুর্নিওয়ান বয়স কম হলেও লেখার গুণে উঠে এসেছেন। ২০১৬ সালে তার উপন্যাস ‘ম্যান টাইগার’ ম্যান বুকারের লংলিস্টে ছিল। ম্যান বুকারে নাম ওঠা দেশের প্রথম লেখক। তার জন্ম ১৯৭৫ সালে পশ্চিম জাভায়। এ পর্যন্ত ২৪ টি ভাষায় তার বই অনূদিত হয়েছে। তার উপন্যাস ‘বিউটি ইজ এ উন্ড’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের করা ১০০ সেরা বইয়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তার লেখায় আছে পবাবাস্তববাদ ও হাস্যরস। তাকে কোন কোন ক্ষেত্রে নোবেল জয়ী গার্সিয়া গ্যাব্রিয়েল মার্কেস ও জনপ্রিয় জাপানি লেখক মুরাকামির সাথে তুলনা করা হয়। সাংবাদিকতা থেকে লেখার জগতে আসা আইউ উতানি আরেক ইন্দোনেশীয় বেস্ট সেলার লেখিকা। সেক্স, পলিটিক্স ও হিস্ট্রি তার উপন্যাসের উপজীব্য। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সমন’ প্রিন্স ক্লারা পুরস্কার পায়। লীলা এস চৌধুরি আরেক ইন্দোনেশীয় বেস্ট সেলার লেখিকা। তিনি সাংবাদিকতা থেকে উঠে আসা। তার পিতা সাংবাদিক মোহাম্মদ চৌধুরি ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় দৈনিক জাকার্তা পোস্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম জেনারেল ম্যানেজার। তার জন্ম জাভায় ১৯২৮ সালে। তারই মেয়ে লীলা। লীলার বেস্ট সেলার বই ‘বুলাং ’ এবং ‘ বিরু লাউত’। তাদের পদবি চৌধুরি হলেও বানানে একটু ভিন্নতা আছে। বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের চৌধুরীদের সাথে কোন মিল থেকেও থাকতে পারে। ইন্দেনেশিয়ার সব লেখক লেখিকাই বাহাসা ইন্দোনেশিয়ায় লেখেন। তবে তা লেখা হয় রোমান হরফে।
মালয়েশিয়ায়ও একই অবস্থা । বাহাসা মালয়েশিয়াতেই প্রধানত তারা লেখেন। ইংরেজি বইও এ দুটি দেশে ভাল চলে। মালয়েশীয় লেখক তান তোয়ান ইং এর জন্ম পেনাং- এ ১৯৭২ সালে। তার সেরা উপন্যাসের মধ্যে আছে ‘গার্ডেন অব ইভনিং’। ২০১২ সালে লেখা এই বইয়ের জন তিনি ম্যান বুকারের শর্টলিস্টে স্থান পেয়েছিলেন।তিনি বিজয়ী হয়েছেন ম্যান এশিয়ান লিটারারি প্রাইজে। দীনা জামান মালয়েশিয়ার একজন বেস্ট সেলার লেখিকা। ৫০ বছর বয়স্কা এই লেখিকার ‘কিং অব দি সি’ নাম করেছে। মনিকা গোজালি আরেক মালয়েশিয়ান লেখিকা। ২০১৬ সালে তার একটি উপন্যাস ডাবলিন লিটারারি এওয়ার্ডের জন্য বিবেচিত হয়েছিল। এছাড়া আরো আছেন রানী মনিকা, চি লুসনা আজহারি ও শি লি কো। তালিকা দেখে বোঝা যায় মালয়েশিায় মুসলিম লেখিকারা দ্রুত উঠে আসছেন। আছেন অন্যান্য জাতি গোষ্ঠির বেস্ট সেলার লেখক ও লেখিকাও।
শ্রীলংকায় স্থানীয় ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় অনেক বই বের হয়। অশোক ফেরি শ্রীলংকার একজন সেরা লেখক। তার উপন্যাস ‘দি গুড লিটল সিলোন গার্ল’ গ্রাটিয়েন প্রাইজের শর্টলিস্টভুক্ত হয়েছিল। নিহাল ডি সিলভার ‘দি রোড ফ্রম এলিফ্যান্ট পাস’ ২০০৩ সালে গ্রাটিয়েন প্রাইজ লাভ করে। এটি শ্রীলংকার একজন সেনা ও বর্তমানে বিলুপ্ত তামিল স্বাধীনতাকামী সংগঠন এলটিটিইর একজন নারী যোদ্ধার অসম প্রেমের কাহিনী। উপন্যাসে দেশের ত্রিশ বছরব্যাপী জাতিগত সংঘাত তথা গৃহযুদ্ধের চিত্রও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশেরও কয়েকজন লেখক লেখিকা ইংরেজি প্রকাশনার মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত হয়ে উঠছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই সবার ধারণা। সব মিলিয়ে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে যে বিষয় বৈচিত্র্য ও কাহিনী গঠনে নতুন নতুন ধারা চালু হচ্ছে আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে সাহিত্য সমালোচকদের অভিমত।