লাশটা বুড়িগঙ্গায় ভাসছে। যেভাবে ফুলে ফেঁপে উঠেছে.. তাতে মনে হয় অন্তত দিন তিনেক হলো তার সলিল সমাধি ঘটেছে। যারা জলে হাবুডুবু খেয়ে খড়কুটো ধরে বাঁচতে চেয়েও না পেরে শেষে জলেই আত্মাহুতি দেয়… তাদের জলে ভাসা মরণোত্তর লাশ যারা দেখেনি, তারা এ ধরনের লাশের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবে না।
নাকের অবস্থা, চোখের অবস্থা, ফুলে ফেঁপে ওঠা পেটের অবস্থা, হাত-পা, অন্তর্গত যৌনাঙ্গের অবস্থা, এতই সঙ্গিন হয় যে খুব কাছের মানুষ ছাড়া তাকে চেনা যায় না। অনেক সময় কাছের মানুষও চিনতে ভুল করে। স্ত্রী স্বামীকেও চিনতে পারে না। সনাক্ত করতে খুঁজতে হয় চিহ্ন। বগলের নিচের তিল অথবা ঊরুর মধ্যখানে কাটা দাগ দেখে স্ত্রী বুঝতে পারে, এটাই তার স্বামী।
এ ক্ষেত্রেও তাই হলো। বুড়িগঙ্গার তীরে ভেসে ওঠা এই মৃত লোকটাকে কেউ চিনছে না। ছয় ফুটের মতো লম্বা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ছোট ছোট চিকন চুল, হাঙরের চোখের মত মোটা বিশাল চোখ, কালোর মধ্যে লালচে আভা পড়লে যে রঙের জন্ম হয়, গায়ে সেই রঙ দিব্বি মেখে লোকটা শুয়ে আছে।
একটু আগে সম্পূর্ণ নগ্ন ছিলো সে। যখন ডিঙি নৌকার মাঝি প্রথম তাকে দেখেছিলো, তখন সে চমকে ওঠে কী যে করবে বুঝতে পারছিলো না। বুড়িগঙ্গার পানির উৎকট গন্ধের মধ্যে তার বাস.. সেই সলিম ব্যাপারী লাশটির পচে যাওয়া গন্ধ হজম করেই পাশের ডিঙি নৌকার মাঝি কিতাব আলীকে ডাকলো, একটু কাছে আসলে বললো,
– ও ভাই, কিতাব আলী, দেখো, দেখো, একটা লাশ পানিতে ভাসছে, এক্কেবারে পচি ফুলি গেচে। কি করবো, বলো দিকিনি?
কিতাব আলী সলিম ব্যাপারীর কথা শুনতে পায়। তখনও লাশটা চোখে পড়েনি। অনেকটা নিস্পৃহ ভাবেই উত্তর দেয়,
– কই, কই, দেকা যাচ্চে না তো। মেয়ে মানুষ না পুরুষ।
– বোজা যাচ্চে না। মনে হচ্চে পুরুষ। ফুলি এক্কেবারে ফুটবল হয়ে গেচে। বুজার জো নি।
ইতোমধ্যে তারা খুব কাছাকাছি আসে। দুই নৌকার গলুই আপনা আপনিই একত্রিত হয়। নাহলে এর জন্য অনেক কসরৎ করতে হতো। তেমন কোন স্রোত নেই নদীতে। সচরাচর একটি মুরগি হেঁটে যায় যে গতিতে বুড়িগঙ্গার স্রোত তারও চেয়ে কম গতিতে প্রবহমান। সেই স্রোত অনাবশ্যক কত কিছু বয়ে নিয়ে যায়। খড়কুটো, ছেঁড়াখোঁড়া বস্তা, পচাগলা ন্যাকড়া, দু’ চারটে পলিথিন ব্যাগ.. ধীর বেগে। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এই সব চলা ফেরার কোন সময়ের তাড়া থাকে না। অপ্রয়োজনীয় জিনিস, আগে আসলেই কি আর পরে আসলেই কি। কেউ এর জন্য অপেক্ষা করে না।
দুই নৌকা মিলেমিশে গেলে তারা একত্রে দড়িবেঁধে নেয়। অল্প স্রোতে নৌকা দুটো ভাসতে থাকে। লাশের সাথেই। যেনো কতকালের বন্ধুত্ব্। সলিম ব্যাপারী আর কিতাব আলী লাশটির দিকে এগিয়ে যায়। লগি তল পায় না। বৈঠা ঠেলেই যেতে হয়। কাছাকাছি এসে দু’জনে একসাথে ভালো করে দেখে নেয়, লাশটি দিব্বি পুরুষ মানুষের। পুরুষ ও নারীর শরীরের ভিন্নতা আছে। চুল, চোখ, হাত, পা, জংঘার। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না একদম।
লাশটি পুরুষেরই। বিশাল শরীর পানি খেয়ে খেয়ে আরও বিশাল হয়েছে। সলিম ব্যাপারী বলে,
– চলো, লাশটাকে কিনারে নিয়ে যাই।
কিতাব আলী একমত হয়।
– চলো। তাই করি।
দু’জনে মিলে দুই নৌকার মাঝখানে নিয়ে আসে লাশটাকে। কায়দা কানুন করে তীরে নিয়ে আসতে খুব একটা কষ্ট হয় না তাদের।
এইবার দুইজনই কাছা মেরে নেয় লুঙির। নৌকা থেকে কাছি খুলে নেয়। কাছি দিয়ে বেঁধে নেয় লাশের দুই পা একসাথে। বেড়ি পরানোর মতো করে। তারপর দু’জনের শক্তির পরীক্ষা শুরু হয়। পারে, তারা পারে। লাশটাকে তীরে তুলে আনতে পারে।
মানুষ লাশ হয়ে গেলে এত ভারী হয় কেন?
তখন কেবল সূর্য উঠেছে। নদী পাড়ের পলি আর দূর্বা ঘাসের অমসৃণ পাড়ে লাশটা আকাশের দিকে হাঁ করে আছে। এখন আস্তে আস্তে মানুষের ভিড় বাড়ছে। আশপাশে সকলেই জেনে যায়, বুড়িগঙ্গায় একটা লাশ ভেসে উঠেছে। ব্যাটা ছেলের লাশ।
ভিড়ের মধ্যে কে একজন বলে ওঠে,
– কার মায়ের পোলা রে? কি হইছিলো, কে জানে? কোত্থেকে আনলি এই মরা বেশরম লোকটাকে?
কিতাব আলী বলে,
– ভাসি যাচ্ছিলো, গাং এর মদ্যি দিয়ে। পেত্থম দেকতি পায় সলিম ব্যাপারী। আমি একটু দূরি মাছ ধরতিচি। ওই ব্যাটাই আমাক ডাকি বললি, জলদি আয়, দ্যাক, দ্যাক, একটা লাশ ভাসি যাচ্চে। আমি ওকেনে যায়ে দুইজন মিলি তুলি আনলাম।
ভিড়ের মধ্যে ভেসে ওঠা সেই লোকটা বললো,
– ও তাই? তাইলি তো পুলিশে খবর দিতি হবি।
– তাই দাও, থানা এখান তিন ম্যালা দূর। সাইকিল আছে কার? যা না ভাই, থানায় খবর দি আয়।
একটা মাঝ বয়সী লোক, যার হাতে একটা ঝোলা, মাথায় একটা টুপি। পরনে লুঙ্গি। গায়ে পাঞ্জাবি। ফজরের নামাজ পড়ে এদিক দিয়ে যাচ্ছিলো, সে এই খবর নিয়ে থানার দিকে রওয়ানা হয়। বলে,
– আমি যাচ্চি। আমার সাতে কেউ যাবেন আপনেরা?
একজন যুবক, হাতে হ্যাজাক, কাঁধে ঝোলা এই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলো।
ভিড় দেখে একটু দাঁড়িয়েছিলো, এই কথা শুনে বললো,
– তাহলি আমি যাই।
সকলে এক বাক্যে বললো
– যাও না ভাই, সাতে যাও সাইকেল আলার। গিয়ে খবরটা দিয়ে আসো, আমরা এখানেই আছি।
– ঠিক আচে, যাচ্চি।
যুবকটা মাঝ বয়সী লোকটাকে সাইকেলের রডে বসালো। আর সাইকেলটা একটু ঠেলে গতিশীল করে এক লাফে সাইকেলের সিটে উঠে প্যাডেল ঘোরাতে লাগলো।
নদীর ধারের এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে সাইকেল উড়ে চললো। মরা মানুষের গন্ধে ভারি হয়ে যাওয়া বাতাস পেছনে পড়ে থাকলো।
সংসারে কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা মানুষের দুঃখ কষ্টকে ঘাড়ে নিয়ে চলতে থাকে। ঘাড় থেকে সেই ভার না নামানো পর্যন্ত শান্তি পায় না।
দুই.
ইশিতা তিন দিন ধরে কিছুই খায় নি। ঘুম তো দূরের কথা চোখের পাতাও একত্রিত করতে পারেনি। নিঝুমকে নিয়ে পথে পথে ঘুরেছে শুধু। নিঝুমের বয়স এই জুনে সাত বছরে পড়বে। ওর বাবা অনেক আদর করে ওকে। যা চায় সব কিনে দেয়। চুলের ফিতা থেকে কলের পুতুল পর্যন্ত। চাবি ঘুরিয়ে দেয়, আর পুতুল কী সুন্দর নাচতে থাকে। নাচে আর হেঁটে হেঁটে বাবার দিকে যায়। বাবা পুতুলের মুখ ঘুরিয়ে দেয়, দুষ্টু পুতুলটা আবার নিঝুমের দিকে ফিরে আসে। পায়ের কাছে এসে থেমে যায়। পুতুলটা একা একা দাঁড়াতে পারে না। হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। বাবা তখন দৌড়ে আসে। ‘আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়’ বলে বুকে তুলে নেয়। বাবার কোলে আশ্রয় পেয়ে নিঝুম আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
দম ফুরালে পুতুলেরা অসহায় হয়ে যায়। অথর্ব মানুষের মতো। শরীরের হাড় নড়বড়ে হলে, চোখের জ্যোতি ঘোলাটে হলে মানুষ শুধু অল্প আঘাতে পড়ে যায়। পড়ে হাত পা ভাঙে অথবা গা গতরে ব্যথা পেয়ে পুতুলের মতই যেখানে সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
নিঝুমের বাবা এর আগে এরকম কখনও করেনি। ইশিতার সাথে বিয়ে হওয়ার পর এই প্রথম আরিফ চৌধুরী তিনদিন হলো সংসার ছেড়ে বাইরে আছে।
সম্ভাব্য সব জায়গায় পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে ইশিতা। সারাদিন এখানে ওখানে খুঁজে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে যখন বাসায় এসে শরীরটা এলিয়ে দেয় নরম তুলতুলে বিছানায়, তখন তার কান্না আসে। কোথায় যেতে পারে সে। একবারও কি মনে পড়ছে না আমাদের কথা?
রবিবার আরিফ যখন অফিসে যায়, তখন তাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিলো।
ইশিতা জিজ্ঞেস করে,
– কী হয়েছে তোমার?
– না, কি হবে? কিছুই তো হয় নি।
– তোমাকে আজ খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে কেন, বলো না প্লিজ?
– তুমি শুধু শুধুই দুশ্চিন্তা করছো। আমি তো বেশ আছি।
– না, আমাকে বলতেই হবে, কেন তোমার মন খারাপ?
এবার আরিফ বিরক্ত হয়।
– বলছি কিছু হয়নি আমার। তারপরও তুমি জিদ করছো।
– তুমি আজ অফিসে যেতে পারবে না।
– না আমাকে যেতেই হবে। অফিসে অনেক কাজ আছে।
– না, তুমি আজ যেতে পারবে না। আমি তোমাকে যেতে দেবো না।
– তুমি শুধু শুধু এরকম করছো। আমি যাচ্ছি। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এই কথা বলে ব্যাগ হাতে আরিফ বাইরে যেতে উদ্যত হলো। ইশিতা আজ তাকে কিছুতেই যেতে দেবে না। এগারো বছরের সংসার তাদের। কত সুন্দর ভাবেই কেটে গেছে এতটা সময়। ইশিতা এখানে একা। মা বাবা আর ইমন থাকে মালয়েশিয়া। সেখানে বাবা ইদ্রিস আলী চাকরি করেন। এই বয়সে একা থাকা কষ্টকর। তাই ইশিতার বিয়ের বছর পাঁচেক পর বাবা, মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে চলে গেছেন মালয়েশিয়া।
ইশিতা এখানে বড় একা। কোন দুঃখ যদি কথা বলে, কেউ নেই শুনবার। কোন কষ্ট যদি হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, কেউ নেই জল ঢেলে তাকে বরফের মতো ঠান্ডা করার। সে এখানে বড় একা। মা নেই, যে আঁচলে মুখ গুঁজবে। বাবা নেই, তার হাত ধরে বাতাসে হাঁটবে।
ছোট একটা ভাই আছে, তাও থেকেই নেই। মায়ের আঁচল ধরে পাড়ি জমিয়েছে ভিন দেশে।
এখানে আপন বলতে তো আছে একমাত্র আরিফ। সে যদি ভালোবাসার হাত বাড়ায়, সে সেই খাঁচায় ঢুকে পড়ে অবলীলায়। আর যদি অবহেলা উগরে দেয় ইশিতার দেহে ও মনে.. তা থেকে মুক্তির জন্য প্রাণপণ ছুটতে থাকে.. কোথাও আশ্রয় না পেয়ে আরিফের কাছেই আশ্রয় নেয়।
এ এক বিধিবদ্ধ নিয়ম। কাঁটাতারের মতো। ভেতরে জায়গা কম, ঢুকতে গেলে গা কেটে যায়। লাফ দিতে গেলে নিয়তি পা চেপে ধরে। ঘরের মাছি ঘরেই থাকে। উড়বার শক্তি পায় না।
কোন বাধা মানে না আরিফ। ইশিতা যতই আগলে রাখতে চায় তাকে.. আরিফ ততই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। মেয়ে মানুষের অধিকার, শক্তি একসময় ম্রিয়মাণ হতে বাধ্য।
এক হাত দিয়ে জঞ্জাল সরানোর মতো ঈশিতাকে সরিয়ে আরিফ দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ধাক্কা খেয়ে নির্বোধ নারী ড্রইং রুমের কার্পেটে লুটোপুটি খায়। একজন ছিলো, যে বুকের বোতাম ধরে টেনে তাকে থামাতে পারতো, সে এখন স্কুলে।
এই সব সুখ দুঃখের নিন্দিত খেলা সে কিছুই দেখতে পেলো না।
সম্বিত ফিরে পায় ঈশিতা। সে দেখতে পায়, গভীর রাতের সেই চিত্রকল্প… যেটা আরিফ সংগোপনে জন্ম দিয়েছে। ঈশিতা সেখানে দর্শক মাত্র।
তিনদিন নেই আরিফ। শূন্য খরখরে ঘর। যেনো বাতাস নেই। যেনো ছায়া নেই। যেনো সূর্য নেই। অন্ধকার গ্রাস করেছে সব। সেই অন্ধকারে ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছে, গভীর অবহেলায় তলিয়ে যাচ্ছে ঈশিতা।
নারীরা এত অসহায় কেন? রেল গাড়ির মতো গড়িয়ে গড়িয়ে চলে। এমনি এমনিই গড়ে না। তাকে ঠেলতে হয়। পুরুষ নামক যন্ত্র তাকে ঠেলে। ঠেলে ঠেলে স্টেশনে পৌঁছে দেয়, যেখানে প্রশান্তি ঘুমায়।
পুরুষহীন নারীর চাকা এই সমাজে একা একা ঘুরতে জানে না।
তিন.
এটা কোন জীবন হলো? পায়ে পায়ে যেখানে বিপদের আশঙ্কা। হাঁটতে গেলে ভয়, দৌড়াতে গেলে ভয়, দরজার খিলে কেউ টোকা দিলে ভয়, নদীতে স্নান করতে গেলে ভয়… এত শঙ্কাময় জীবন চায়নি প্রিয়তি।
তবুও সাড়ে সাত বছর এভাবেই কেটে যাচ্ছে তার। যে মানুষটি বিয়ের আগে ছিলো একটি প্রতিভা। একটি আদর্শ। একটি সুগভীর প্রতশ্রুতি… সে কেমন করে দিন দিন একটি জ্বলজ্ব্যান্ত পাপ হয়ে গেলো।
তার সাথে খেলতে গেলেই কলঙ্ক লেগে যায়। তার হাত ধরলেই সন্দেহ আর ভয় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দিনে সিগারেটের ঝাঁঝালো গন্ধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। হিমাংশু শুধু মদ খায় না। মদ বেচে। শুধু মাতাল হয় না। হাজার হাজার লোককে মাতাল করে তৃপ্তি পায়। এটা তার নেশা এবং দিন যাপনের পেশা। এই ভালোমানুষটি প্রেম করে বিয়ে করেছিলো প্রিয়তিকে।
ইডেন কলেজে প্রিয়তি যখন ইকনোমিক্সে ভর্তি হলো হিমাংশু তখন ঢাকা ভার্সিটিতে অনার্স ফাইনালে কেমেস্ট্রিতে। এরপর মেঘ নয়, মেঘের চেয়েও গভীর ভালোবাসায় নিমগ্ন হলো তারা। প্রায় প্রতিদিন ক্যাম্পাসে দেখা হতো তাদের। সারা বিকেল ভালোবাসার কথা বলতো। মুগ্ধ হতো বাতাস।
স্নিগ্ধ হতো বৃষ্টি। সাক্ষী থাকতো ছায়া। লজ্জা পেতো বৃক্ষ। পাখিরা এ ডাল থেকে ও ডালে বসতো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো ওদের প্রেম।
প্রিয়তি বলতো- এ নামটি তুমি কোথায় পেলে, বেছে নিলে আমার জন্য। আমি কি তোমার এতই প্রিয়?
– তুমি আমার একটুও প্রিয় নও। হাতটা নাও, ওকে জিজ্ঞেস করো, আমি কে তোমার? পায়ের দিকে তাকাও, ও কি বলে দেখো, চোখে চোখ রাখো, শুনতে পাও কোন কথা? ঠোঁটটা কাঁপছে কেন, জিজ্ঞেস করে দেখো, কী চায় ও।
এবার লজ্জা পায় প্রিয়তি।
বলে- ও কথা বলো না। ঠোঁট কাঁপে কেন, জানো না তুমি?
কোথায় তোমার চোখ, জিজ্ঞেস করে দেখো তো, আমাকে দেখার পর, ও আর কাউকে দেখে কিনা?
– এত কথা জানো তুমি প্রিয়তি?
– তুমিই তো শিখিয়েছো। কথা বলতে। ভালোবাসতে। তোমার ভিতরে কি আছে বলতো, কি জাদু? তোমাকে দেখলে আমার সব শিরা উপশিরা, আমার ধমনীর সব রক্তকণিকা তোমাকে পাওয়ার জন্য উন্মাতাল হয়ে যায়, কেন এরকম হয় হিমাংশু, কেন এমন হয়?
– জানি না আমি কিচ্ছুই। আমি শুধু তোমার ভিতরে ডুবতে চাই, স্নিগ্ধ হতে চাই।
– ডোবো। কে বাধা দিচ্ছে তোমাকে। ডুবে দেখো বাতাস চুপচাপ সরে যাবে, ছায়া মাটিতে মিশে যাবে।
রোদ আয়নার মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। আমাদের ভালোবাসাবাসি দেখবে।
– প্রিয়তি, এভাবে বলো না। এই তো কয়টা মাস তোমার পরীক্ষাটা শেষ হলে, একদিন, কোন এক দিন, হারিয়ে যাবো আমরা ঘন বনে। কেউ দেখবে না। কেউ বাধা দেবে না। ঘর বাঁধবো ছায়াবৃক্ষের নিচে। আগুনের উত্তাপ নেবো। বরফের নির্মলতা নেবো। এই তো আর কটা দিন লক্ষীসোনা। এই কথা বলে তার অপলক চোখ দেখে নেয় পরিপার্শ্ব। কেউ কোথাও নেই। ভালোবাসা দুলে ওঠে। টগবগ করে ফুটে ওঠে প্রিয়তির মুখ, কপোল, কপাল। প্রিয়তি সান্ধ্যকালীন লাল আভার মত দীপ্তি ছড়ায়। সে আলোতে আর একবার হেসে ওঠে হিমাংশুর পৃথিবী। ভালোবাসা এত সুন্দর হতে পারে।
আলো নিভে যাচ্ছে। আজ আর নয়। এখন হলে ফিরতে হবে।
একদিন ফুটলো ফুল। গন্ধ ভাসলো বাতাসে। একদিন বিধাতাকে সাক্ষী রেখে পুরোহিতের সান্নিধ্যে ওদের বিয়ে হয়ে গেলো।
সুখ আর ছন্দে ভর করে কেটে গেলো বছর তিনেক। চাকরি পেলো না হিমাংশু। সকাল বিকেল টিউশনি করে ভাত জলের ব্যবস্থা করতে হলো তাকে। না, প্রিয়তিকে প্রাইভেট চাকরি করতে দেবে না। সরকারি চাকরি মিললো না। লিখিত পরীক্ষায় পাস করে ঠিক ঠিক। কিন্তু ভাইভাতে আউট। বছরের পর বছর এইভাবে যুদ্ধ করতে থাকলো বাস্তবতার সাথে। নিয়তি সেখানে নির্বিকার।
একদিন হার মানলো সে। পরাজিত হলো ইচ্ছে শক্তির কাছে। একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিতে জয়েন করলো প্রিয়তি। দেশ-বিদেশ ট্র্যাভেলস। ভালই চললো কিছু দিন। তারপর? আস্তে আস্তে প্রকাশিত হতে প্রিয়তির রূপ। আর সেই রূপ বাতাসে উড়তে লাগলো। প্রিয়তি কতটুকু সুন্দর প্রিয়তি নিজেও জানে না। তার চোখের দীপ্তি, মুখের কারুকাজে দিন দিন আসক্ত হয়ে পড়লো সাব্বির আহমেদ চৌধুরী। এই কোম্পানির এমডি।
সচরাচর যা হয়, তাই হলো। এমডির শক্ত থাবা একদিন প্রিয়তিকে নিয়ে গেলো অন্য ঘরে। বিড়াল যেভাবে ইঁদুরকে নাচায়, বাজায়, তারপর খামচে ধরে, সেইভাবে প্রিয়তিকে খামচে ধরলো। কেউ নেই প্রিয়তির। হাত, পা, চোখ, মুখ, সত্যি বলতে কি প্রিয়তির লকলকে শরীর কিছুক্ষণের জন্য অন্য কারও হয়ে গেলো।
হিমাংশু হেরে গেলো।
রিজাইন করলো প্রিয়তি। এর পর কোন এক রাতে।
– কী করা যায়, বলতো প্রিয়তি.. এইভাবে আর কতদিন?
– কিচ্ছু করার দরকার নেই।
– এক বেলা খাবো, একবেলা খাবো না, তবু আর চাকরি নয়।
– তুমি এত ভালো কেন প্রিয়তি।
– তুমি ভালো বলে।
– কে বলেছে আমি ভালো.. দু’বেলা খেতে দিতে পারিনা, আমাকে তবু ভালো বলছো।
– তোমার এই ব্যর্থতাই আমার আরাধ্য। এই ব্যর্থতা নিয়েই যাতে ভালো থাকতে পারি, সেই আশীর্বাদ করো। ব্যর্থতা শব্দটা হিমাংশুকে খুব নাড়া দিলো। একটা প্রতিবাদ, একটা হিংস্রতা তার অভ্যন্তরে সুচ ফুটিয়ে দিলো।
সে সিদ্ধান্ত নিলো, তাকে টাকা ধরতে হবে। কত টাকা পত পত করে উড়ছে। তুলার মতো, বটের পাতার মতো, ধূলার মতো। তাকে ধরতে হবে, গায়ে মাখতে হবে।
সে ডাকলো-
– প্রিয়তি, প্রিয়তি।
উত্তর দিলো না প্রিয়তি। প্রিয়তি কি ঘুমিয়ে পড়েছে?
হিমাংশুর মনে হলো। পাঁচ বছর বিয়ে হয়েছে তাদের।
প্রিয়তি একটা সন্তান দিতে পারেনি তাকে। প্রিয়তি বন্ধ্যা। প্রিয়তি অলক্ষুণে। প্রিয়তি কলঙ্কিত। প্রিয়তি নষ্ট হয়ে গেছে। এমডি প্রিয়তিকে নষ্ট করেছে।
ওকে আর ছোঁব না আমি। ও ফাঁপা। ঝরঝরে হয়ে গেছে। তক্ষুনি একটা প্রতিহিংসা জেগে উঠলো তার ভেতর। প্রিয়তিকে আজ সে জবর দখল করবে। প্রিয়তির ওপর জিঘাংসা চরিতার্থ করবে। সে পশু হয়ে উঠলো। কর্ষিত ভুঁই মই দিয়ে সমান করার আগে যেমন হয়ে যায়, প্রিয়তিও সেই রকম এলোমেলো হয়ে গেলো। শকুনের ভয়ে মুরগির বাচ্চা যেমন অনর্গল কাঁপতে থাকে, প্রিয়তি সেই ভাবে অসহায় কাঁপতে লাগলো।
চার.
দ্বীপচর থানা থেকে একটা পিক-আপ ভ্যান এলো। একজন ইন্সপেক্টর আর চার জন কনস্টেবল। নাক মুখ সাদা কাপড়ে বাঁধা। দুর্গন্ধকে কেউ পছন্দ করে না। বাতাসও না। যেখানে দুর্গন্ধ, সেই এলাকা থেকে বাতাস দৌড়ে পালাতে চায়। কিন্তু দুর্গন্ধ তাকে আঁচল দিয়ে বেঁধে রাখে। এ ক্ষেত্রে বাতাসের স্বভাব একেবারে মানুষের মতো।
মানুষ এতই স্বার্থপর হয় যে, দুর্গন্ধযুক্ত পিতার লাশও বেশিক্ষণ পৃথিবীর মাটির ওপর রাখতে চায় না। সাত তাড়াতাড়ি মাটির অভ্যন্তরে পুঁতে ফেলতে চায়। মাটির একমাত্র খাঁটি বন্ধু হয়ে তাকে বুকে তুলে নেয়। মাটির কোন হাত পা নেই, তাই বাধা দিতে পারে না।
এখন অনেক লোকের ভিড়। মেয়ে পুরুষে সয়লাব হয়ে গেছে পুরো বুড়িগঙ্গা তীর। সকলেই এক নজর দেখে চোখেমুখে গামছা বেঁধে চলে যাচ্ছে। মানুষের এক ধরনের কৌতূহল থাকে। এপার থেকে ওপার দেখতে চায়। মেঘের ওপারে কি, তারা। তারার ওপারে কি। আকাশ। এতেও মন ভরে না। আকাশের ওপারে কি জানার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।
কী আছে আকাশের ওপারে? কেউ বলে আকাশের ওপারে আকাশ, তার ওপারে আকাশ, এইভাবে পিঠাপিঠি সাতটি আকাশ, তারপর মহাকাশ, সপ্তর্ষিমন্ডল, কত কিছুু গ্রহ, নক্ষত্র কত কিছু। কোথায় গিয়ে ঠেকেছে কে জানে। স্বর্গ বা নরকই বা কোথায়। এসব হিসাব মেলানো কঠিন।
জেরা শুরু হয়।
আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ায় দুই মাঝি কিতাব আলী আর সলিম ব্যাপারী। ইন্সপেক্টর ওদের জবানবন্দী নেয়। কাগজে লিখতে থাকে ঘটনাপ্রবাহ। ইন্সপেক্টর আলী হোসেন তাদের জিজ্ঞেস করে, অনেকটা ধমকের সুরে।
– কোথায় পেয়েছো এই লাশ?
– বুড়িগঙ্গায় ভাসছিলো, মধ্যিখানে, উই জাগায় ভাসছিলো। আমিই পেত্থম দেকিচি। কিতাব মাছ ধরছিলো একটু তফাতে..ওক ডাকলাম।
দুই জন মিলে ঠেলে ঠুলে একেনে আনলাম।
এতগুলো কথা একবারে বলে অনেকটা হাঁফাতে থাকে সলিম ব্যাপারী।
– তখন সময় কত আনুমানিক?
– তকনো বেলা উটিনি… একটু একটু আঁদার ছিলো।
– এখানে কিভাবে নিয়ে এলে?
– দুই নায়ের মাঝে ফেলি টেনেটুনে একেনে নিয়ে আলাম। পরে পার সাতে দড়ি বাদি ডাঙায় তুলিচি।
এবার মুখ খুললো কিতাব আলী।
– পুলিশ ভাই, এত বড় ভূতের নাকাল লাশ ও একা আনতি পারতো না। আমরা দু’জন মিলি আনিচি।
পচা জিনিস কি সহজে আনা যায়? খুব কসরৎ করা লাগেচে।
লাশটির যৌনাঙ্গ গামছা দিয়ে ঢাকা। গামছার নিচে নেতিয়ে থাকা দেহ বরফের মতো চুপচাপ। ঠাণ্ডা।
থানা থেকে সাদা থান আনা হয়েছে। গামছা উঠিয়ে সেই থান দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত।
গামছা উঠিয়ে নেয়ার সময় সকলেই একপলক দেখে নিলো লাশটিকে। মেয়েলোক দু’তিনজন ছিলো, মনে হয় লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিলো।
পুলিশ আসলে এরকমই। লজ্জা, ভয় আর দয়ামায়ার মাথা খেয়ে এই চাকরি করে। জন্ম হয় লোভ আর লালসা। ইচ্ছে করলেই থান কাপড়টা দিয়ে কোমর ঢেকে আলগোছে গামছাটা টান মারতে পারতো। কিন্তু তা করলো না।
এই বার ট্রলির ওপর উঠিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়ার পালা। দুইজন কনস্টেবল পিক-আপে থাকলো। বাকি দু’জন ঘাস আর কাদার উপর শুয়ে থাকা লাশটাকে ট্রলিতে উঠাতে চেষ্টা করলো। হাতে পাস্টিকের মোজা। পেরে উঠলো না। বললো,
– হাঁ করে তাকিয়ে কি দেখছো? ধরো। উঠিয়ে দাও ট্রলিতে। যত সব নবাবের বাচ্চা। শালা।
পুলিশ এই বাণী ছুড়ে দিলো অই দুজন মাঝির দিকে ইশারা করে।
নিরুপায় হয়ে পাশে শুয়ে থাকা গামছা দিয়ে ধরলো নিতম্ব আর পায়ের দিকটায়। চারজন মিলে ট্রলিতে ওঠাতেও খুব কষ্ট হচ্ছিল। এত ওজন হয় পচে যাওয়া লাশের।
লাশ পিক আপে ওঠানো হলো। এত মানুষের মায়া ছেড়ে লাশটি চলে যাচ্ছে। কারও কারও চোখ ভেজা। সলিম ব্যাপারীর কষ্ট হচ্ছে। এতক্ষণ মনে হচ্ছিল, এই লাশটি তার, সে এখন সলিমকে পর করে দিয়ে চলে যাচ্ছে। একটু কাঁদছেও না। যার জন্য এত কিছু করলো সলিম ব্যাপারী, মাছ ধরতে পারলো না, নতুন কেনা গামছাটাকে জলাঞ্জলি দিলো, গায়ে গতরে দুর্গন্ধ লাগিয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে পিক আপে উঠিয়ে দিলো, সে বিদায়ের সময় একটু মন খারাপ করবে না…দুফোঁটা চোখের পানি ফেলবে না।
মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে?
ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগলো।
ইন্সপেক্টরের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো সে।
– এই, তোমরা ওঠো গাড়িতে। ও সি সাহেব তোমাদের নিয়ে যেতে বলেছে।
– আমাদের? ক্যান?
– অত কথা কিসের? ওঠ তাড়াতাড়ি। হারাম খোরের দল। যতসব..
– নিরুপায় হয়ে তারা উঠলো পিক আপে। গায়ে কিছুটা দুর্গন্ধ লেগে আছে। পিক আপে ওঠার পূর্ব মুহূর্তে সলিম ব্যাপারী গামছাটা পুঁটলি বানিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বুড়িগঙ্গার পানিতে নিক্ষেপ করলো।
বুড়িগঙ্গার মন খুব উদার। সে কাউকে গ্রহণ করতে আপত্তি করে না। সে শত্রু মিত্র বোঝে না। সকলকেই আগ্রহভরে বুকে তুলে নেয়। নিজে পুড়তে রাজি আছে কিন্তু অন্যকে পোড়ায় না।
যথারীতি পিক আপ থানায় পৌঁছায়। লাশ নামানো হলো দূরবর্তী এক কোণে। কেউ দুর্গন্ধ হজম করতে চায় না।
সগির ব্যাপারী আর কিতাব আলীর মুখবন্ধ নেওয়া হয়। তাদের ছবি তোলা হয়। বৃদ্ধা আঙুলের টিপ নেয়া হয়। আগামীকাল সকাল দশটার মধ্যে ভোটার আইডি নিয়ে থানায় হাজির হতে বলা হয়।
সলিম ব্যাপারী আর কিতাব আলী ছুটি পায়। হেঁটে হেঁটে তাদেরকে বুড়িগঙ্গার তীরে যেতে হবে… যেখানে তাদের ডিঙি বাঁধা আছে। পেটে ক্ষিধে। পকেটে পয়সাও নেই।
পাঁচ.
আরিফ চৌধুরী বাসা থেকে বেরিয়ে সোজা অফিসে গেলো। আজ তার মেজাজ খারাপ। কিন্তু একটুও বুঝতে দিলো না। চোখে মুখে মন খারাপের চিহ্ন অথচ কী এক আশ্চর্য মহিমায় অফিসে সে সপ্রতিভ।
পি. এস দীপ্তি রায়। যে তার সব ভালো মন্দ জানে, সেও বুঝতে পারলো না তার প্রকৃত অবস্থা। অফিসে ঢোকার সাথে সাথে একগাদা ফাইল নিয়ে হাজির হলো সে।
বললো- স্যার, এমডি স্যার আজও আসবেন না। সিঙ্গাপুরে নতুন একটা মিটিং। আরও দুই দিন থাকতে হবে। তাই উনি বলেছেন ইমারজেন্সি ফাইল আপনাকে ডিসপোজ করতে।
– কোন চিঠি?
– হ্যাঁ, মেইল করেছেন।
– দেখি..
মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটি উধাও হয়ে গেলো। মেয়েটি চলে যাওয়ার সাথে সাথে তার শরীর থেকে ভুরভুর করে যে সেন্ট বেরুচ্ছিলো, তা কিছুটা নিষ্প্রভ হলো। তবুও বাতাসের সাথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেন্টের গন্ধ তার নাকে এসে লাগছে। মেয়েটি খুব সুন্দর করে আধুনিক ঢংয়ে শাড়ি পরতে পারে। কপালে টিপ দেয়, লাল নীল সবুজ। শাড়ির সাথে রঙ মিলিয়ে। চুলের খোঁপায় এক এক দিন এক এক ফুল গুঁজে আসে। এক এক ফুলের এক এক গন্ধ। এক এক অভিব্যক্তি। প্রায় তিন বছর হলো মেয়েটি সাথে আছে। সিনসিয়ার। সে ভালো করেই বোঝে, বসের সাথে কী ভাবে ডিল করতে হয়।
ফিরে এলো দীপ্তি। সাথে অফিস অর্ডারের চিঠি।
– দেখি?
– স্যার।
– ঠিক আছে, ফাইলে রেখে দিও। প্রথম প্রথম আপনি আপনি বলতাম তাকে। একদিন দীপ্তি বললো- স্যার, আমাকে আপনি আপনি করে বলেন কেন? আমি কত ছোট। তাছাড়া আমি আপনার পি. এস। আমার খুব লজ্জা করে।
– আমি সহজে তুমি বলতে পারি না। ঠিক আছে চেষ্টা করে দেখবো।
– থ্যাংক ইউ স্যার।
– ওকে, দীপ্তি। ফাইলগুলো দেখে দিচ্ছি।
দীপ্তি তবুও দাঁড়িয়ে থাকে। টেবিলের এক প্রান্তে। এবার আরিফ চৌধুরী, দীপ্তির মুখের দিকে তাকায়।
– কিছু বলবে?
– ভয় লাগছে বলতে আমার। আপনার কি হয়েছে স্যার?
– কেন, আমাকে কি অন্য রকম লাগছে? কেন ও কথা বলছো?
– হ্যাঁ স্যার, আপনাকে মলিন লাগছে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। ঘুমাননি রাতে?
দীপ্তিকে খুব ঘনিষ্ঠ ঘনিষ্ঠ লাগছে। খুব কাছের মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে দীপ্তিকে সব কিছু খুলে বলি। অফিসের মধ্যে দীপ্তিকেই সবচেয়ে আপন মনে হয়।
বলে- তুমি ঠিকই বলেছো দীপ্তি। রাতে ঘুম হয়নি আমার। মাথার মধ্যে অন্য একটি চিন্তা ভর করেছিলো। সারারাত বারান্দায় বসে হাঁটাহাঁটি করেছি। তুমি তো জানো চিটাগাং এ আমার এক ফ্রেন্ড আছে। বিপাশা। ওর খুব বিপদ। ওর পাশে আমাকে দাঁড়াতে হবে। দীপ্তি বলে- কি হয়েছে তার? কি ধরনের বিপদ?
– সে তোমাকে বলা যাবে না। তুমি ছোট মানুষ। আমি রাতে বিপাশার সাথে অনেক কথা বলেছি। আমি বুঝতে পারিনি। কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ইশিতা।
– তারপর?
– সকালে ইশিতা আমাকে অফিসে আসতে দিতে চায়নি। আমি জোর করে চলে এসেছি। এক পর্যায়ে আমাকে আজ আগলে রাখতে চাইছিলো সে।
– তারপর কি হলো?
– আমি ধাক্কা দিয়ে ইশিতাকে ফেলে দিয়েছি। দেখলাম, ও ড্রইং রুমে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়েছে। আমার ধাক্কা খেয়ে। আমি সেদিকে ফিরেও তাকাইনি।
– আপনি এত নিষ্ঠুর হতে পারলেন?
– কেন পারবো না? প্রত্যেক মানুষের একটা নিজস্ব জগৎ আছে। নিজস্ব বোধ আছে। সেই বোধের কিছু গোপনীয়তা থাকে। সেটা সে লুকিয়ে রাখতে চায়। সে কখনও চায় না, সেই গুপ্তধনের কেউ সন্ধান পাক। সেই সম্পদ তার একার। সেখানে কেউ হস্তক্ষেপ করুক, সে এটা সহ্য করতে পারে না।
– ঠিক আছে, তাই বলে তাকে আপনি অবহেলা করবেন? তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবেন?
– না, আমি বুঝি, আমার এটা ঠিক হয়নি। সেই সময় বিপাশা আমাকে এই ভাবে আচ্ছন্ন করে ছিলো যে আমি কিছুটা উদভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম।
– স্যার, আমি যাই। আমার সব শুনে কেমন যেন খারাপ লাগছে। মাথা ঝিম ঝিম করছে।
এই মুহূর্তে দীপ্তিকে আমার খুব আপন মনে হয়। বলি- দীপ্তি, আজ তোমাকে একান্ত নিজস্ব কিছু কথা বলে ফেলেছি। আপন মনে করে। কিছু মনে করো না।
– না স্যার। আমি কিছু মনে করিনি। জানি না, বিপাশা ম্যাডামের কি হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, আপনি যে ভাবে বলছেন, তাতে আপনার যাওয়া উচিত।
– দীপ্তি, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি.. আমি যাবো তার কাছে। এবং আজই। আবেগে আর উত্তেজনায় আমি তোমাকে সব বলে ফেলেছি। দীপ্তি, কথা দাও, তুমি এই বিষয়ে কাউকে কিচ্ছু বলবে না।
– না স্যার। কাউকে কিচ্ছু বলবো না। আপনার সাথে প্রায় দুই বছর আছি, কোন দিন আপনার অবাধ্য হই নি। আপনার ক্ষতি হোক, তা কোনদিন চাই নি। এই মুহূর্তে দীপ্তিকে পৃথিবীর সব চেয়ে কাছের মনে হয়।
সে দীপ্তিকে এতদিন ছায়া দিয়ে রেখেছে।
এই সংসারটা আসলে খুব খারাপ। পরিপার্শ্ব কাউকে ভাল থাকতে দেয় না। নানা অভিনব কায়দায় মানুষ মানুষকে ঠকায়, প্রতারণা করে, সুযোগ ফেলে কচমচ করে খেয়ে ফেলে, হাড়হাড্ডি পর্যন্ত।
দীপ্তি যে এখন পর্যন্ত নিরাপদ আছে… এটা তার অহংকার। নাহলে দীপ্তির মতো অল্প বয়সে বিধবা হওয়া একটা মেয়ে এতদিন এর ওর থাবার আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত হতো। সংসারে আঁচড় দেয়ার মানুষের অভাব নেই।
দীপ্তি বললো,
– স্যার, এখন যাই।
– না, যাবে না। বসো। আমার ভালো লাগছে না।
এই বলে কলিং বেল টিপলো আরিফ।
সাথে সাথে একজন পিয়ন এলো, বললো,
– স্যার?
– দুই কাপ কফি আনো তো। ব্ল্যাক কফি। দুধ চিনি ছাড়া।
– আর কিছু দেব?
– পেস্তা বাদাম আছে? থাকলে দাও।
দীপ্তি ডান পাশের চেয়ারে বসা। একেবারে নিঃশ্বাসের দূরত্বে। খুব লক্ষ্মী মেয়ে দীপ্তি। গ্র্যাজুয়েট। ছিমছাম চেহারা। শ্যামল। কিন্তু অদ্ভুত। অপূর্ব সুন্দর। চোখ দুটো জ্যোতির্ময়। হরিণের চোখের আদল। স্লিম ঠোঁটে চিকন হাসির দাগ লেগে থাকে। চুল ছাঁটা। রেবন্ডিং করা। একধরনের সেন্ট নির্গত হতে থাকে। বেশ লম্বা। ৫ ফুট ছয় ইঞ্চি। ওর হাসিটা খুব অভিনব। ঝর্ণার চিহ্ন লেগে থাকে। সে খুব মার্জিত। নিরাভরণ। কিন্তু স্নিগ্ধ। সুস্মিত।
বিধাতা তাকে কিছু দিতে কার্পণ্য করেননি। গায়ের রঙ ছাড়া। এই অসম্পূর্ণতা বাদ দিলে সে অনায়াসে সুন্দরের তালিকায় শ্রেষ্ঠ হতে পারে। কফি খেতে খেতে আরিফ চৌধুরী বলে- তুমি জীবন সম্পর্কে কী ভাবছো?
– কিছু ভাবছি না স্যার। সুব্রত চলে গেলো, সব তছনছ হয়ে গেলো। বাবা নেই। ভগবান সেই কবে নিয়ে গেলো তাকে। মা চলে গেল দাদার কাছে কলকাতায়। আমি এখানে পিসির কাছে একা। জীবনে আর কিছু পেতে চাই না স্যার। অনেক তো পাওয়া হলো। আর কিছু পাওয়ার শখ নেই।
– এত হতাশ হলে চলবে কি করে দীপ্তি? জীবনকে হাল্কাভাবে দেখো না। চড়াই উতরাই পার হয়ে লক্ষ্যে পৌঁছুতে হয়। এত সহজ ভাবছো কেন?
– না স্যার। সহজ ভাববো কেন? যাকে ধরতে যাই, সেই হারিয়ে যায়। লাঠির এক আগা ধরি। অন্য আগা পিছলে যায়। পিছলে যেয়ে ধুলা বালির মধ্যে পড়ে যায়। উঠাতে পারি না। লাঠি থেকে ধূলা ঝেড়ে ফেলা কি এতই সহজ?
দীপ্তি কিছুক্ষণের জন্য দার্শনিক হয়ে যায়। আরিফ চৌধুরী ভাবে, সাতাশ বছরের এই মেয়েটি, যে তার একান্ত সান্নিধ্যে বসে আছে, সে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এত বোঝে? তার মনে হয়, আছাড় খেয়ে খেয়ে শিশুটি কাদামাটির মধ্যে বেড়ে ওঠে, সে আর অল্প আঘাতে ভেঙে পড়ে না। দীপ্তির অবস্থাও তাই। পরিবেশ প্রতিপক্ষের সাথে সে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। অধিকার নিয়ে তাকে পৃথিবীর পথ হাঁটতে হবে। লক্ষ্যে পৌঁছুতে হবে।
টেলিফোনের রিং বেজে উঠলো হঠাৎ। দীপ্তি চেম্বারে আসার সময় ফোন ডাইরেক্ট করে এসেছে। সে উঠে যেতে চাইলো। আরিফ সাহেব তাকে ইশারায় এখানেই ফোন ধরতে বললো।
– গুড মর্নিং। কে?
– আমি..
দীপ্তি বুঝতে পারে। এ নিশ্চয় ম্যাডাম।
আরিফ ইশারায় বলতে বললো, সে অফিসে নেই।
দীপ্তি বললো,
– উনি তো অফিসে আসেন নাই আজ।
চমকে উঠলো ঈশিতা।
– কী?
– না ম্যাডাম, তার মোবাইলও বন্ধ। আমরা তার খোঁজ পাচ্ছি না।
ওপার থেকে ফোন রেখে দেয়া হলো।
দীপ্তি খুব লক্ষ্মী মেয়ে। আরিফের সব কথা শোনে।
ওকে খুব আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তার মনে হয়, দীপ্তি তার ধরাছোঁয়ার বাইরে। এত কাছের সে, তবুও তাকে অনেক দূরের মনে হয়।
ছয়.
আরিফ চৌধুরী অবশেষে প্লেনে চেপে বসলো। বিপাশার কাছে যাবে। বিপাশার এই বিপদের দিনে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। তার জীবন যেখানে বিপর্যস্ত সেখানে ঈশিতা আর জেরিন প্রতিপক্ষ হতে পারে না।
এখন প্রায় সন্ধ্যা। সিলেট বিমানবন্দরে ল্যান্ড করলো ইউ এস বাংলার এয়ার ক্রাফট। ঈশিতা জানলে কক্ষনো ইউ এস বাংলায় উঠতে দিতো না। প্রায়ই দুর্ঘটনা হয় এই এয়ারলাইন্সের।
আরিফ এসব আমল দেয় না তত। দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই। বলে কয়ে আসে না। বৈশাখের মেঘের মতো। কখন কাল বৈশাখী হয়ে দরজায় হানা দেবে, অল্পক্ষণ আগেও বোঝা যায় না। ধূসর থেকে মেঘ কালো হয়ে যায় মুহূর্তেই। তার পর শুরু হয়ে যায় তাণ্ডব।
এয়ারপোর্টে কেউ নেই। তাকে রিসিভ করার জন্য। অফিসিয়াল ট্যুর হলে তার অপেক্ষায় গাড়ি থাকতো। প্রটোকল অফিসার থাকতো। পিয়ন থাকতো লাগেজ কাঁধে নিয়ে গাড়িতে ওঠানোর। কখনো কখনো ফুল হাতে দীপ্তি ঘোষের মতো সুন্দরী ললনা থাকতো।
কিন্তু আজ বহির্গমন পথ ফাঁকা। তাকেই একাই ট্যাক্সি ঠিক করতে হবে। একাই খুঁজে নিতে হবে বিপাশার বাড়ি। ৩৪ নম্বর আম্বরখানার বাংলোটাইপ বাড়ি। যে বাড়িটি তৈরি করেছেন তার স্বামী ইশতিয়াক চৌধুরী।
যার বয়স ৫৬। বিপাশার বয়সের দ্বিগুণ।
এত বেশি বয়সের একজন মানুষকে বিয়ে করলো কেন বিপাশা? ভাবতে অবাক লাগে। ভদ্রলোক লন্ডনে থাকেন, দেখতে বিদেশীদের মতো। লাক টকটকে। অনেক প্রাচুর্য আছে তার। সিলেটের এই বাড়িটি তার নামে লিখে দেবে, প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো বলে?
না আগের পক্ষের মেয়ে জেরিনকে সে মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছিলো বলে।
এইসব প্রশ্নের উত্তর বিপাশাই ভালো করে জানে না। সে জানবে কেমন করে। অত জেনে কি লাভ। বিপাশার বিপদ। তাকে এই বিপদ থেকে বাঁচাতে হবে।
স্কুটার ৩৪ নম্বর আম্বরখানার বাড়ির গেটে থামলো। মুহূর্তেই খুব সন্তর্পণে গেট থেকে বের হয়ে আসলো বিপাশা। তার চোখে মুখে আতঙ্ক। কেউ যদি দেখে ফেলে। কেউ যদি অনুসরণ করে, এই ভর সন্ধ্যায় কে এই আগন্তক। বিপাশা যাকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে।
বিপাশার ভয় নেই। তবে অন্যলোকের এত ভয় কেন? অন্যলোকের চোখের দৃষ্টি কেন এই দুই জন মানুষকে ঘিরে। কেন তাদের এত কৌতূহল? কি ক্ষতি করেছে বিপাশা?
ইশতেয়াক চৌধুরী তার স্বামী। যে গত সপ্তাহে লন্ডনে মারা গেছে। তার অসাক্ষাতে এই বাড়ির আশপাশের মানুষগুলি যারা, যার কেউ ভাতিজা, কেউ ভাগিনা, তাদের দৃষ্টি এখন এই বাড়িটির ওপর। কেন উড়ে এসে জুড়ে বসে এই অজানা অচেনা মেয়েটি সব দখল করে নেবে তার চাচা/ মামার সম্পদ? কাবিননামার একটি সিগন্যাচারই তাকে দিয়ে দেবে সব অধিকার?
না, নজর পড়েছে সাতাস ঊর্ধ্ব এই যুবতীর উপর? যে একজনকে হারিয়ে অন্য জনের কাছে এলো। তৃষ্ণা মেটাতে। একটু পূর্ণতার জন্য। সেখানেও শূন্যতা। কথা ছিলো নিয়ে যাবে লন্ডনে। কিন্তু নিতে পারেনি, তার বৌএর দৌরাত্ম্যে। এখন একা একা থাকা। একা বাড়িতে একা একা থাকা। শুধু জেরিন, ৭ বছরের একটি নির্বোধ বালিকাকে বুকে আগলে ধরে জীবন কাটায়। যে মেয়েটি নতুন বাবা আর পুরাতন বাবার পার্থক্য বোঝে না।
খুব সন্তর্পণে বিপাশার ঘরে ঢুকলো আরিফ চৌধুরী।
খুব ছিমছাম, সাজানো গোছানো, অভিজাত ঘর বিপাশার। বিপাশার কেন? লন্ডন প্রবাসী ইসতিয়াক চৌধুরীর ঘর। এখনও যার মালিকানা পায়নি বিপাশা।
ড্রইং রুমের একটি সোফায় বসলো আরিফ। বিপাশা বন্ধ করে দিলো ড্রইং রুমের মূল দরজা। বন্ধ করার আগে ভালো করে দেখে নিলো কেউ দেখে ফেললো কিনা আরিফ চৌধুরীকে। সাতাশ বছরের একটি রূপবতী স্মার্ট টগবগে যুবতী মেয়ের ঘরে কে কখন ঢুকলো- এটা দেখার জন্য চোখের অভাব হয় না।
বরং শত শত চোখ উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে, কখন এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখবে। বিপাশার একা ঘরে দুর্দান্ত যুবকের আগমনের দৃশ্য। আর তা যদি হয় অপরিচিত কেউ। এখন সন্ধ্যা। আলো ছাড়া চোখ দেখে না। সূর্য চোখ বুজে আছে। গলি পথে আলোর অভাব। স্কুটার থেকে নেমে বিপাশার সাথে ড্রইং রূমে ঢোকা অবধি কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। তবু বিপাশার ভয় ভয় লাগে।
গা থম থম করে। আরিফ চৌধুরী এটা বুঝতে পারে।
একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টরের এটা না বোঝার কথা নয়।
বিপাশা এসিটা ছেড়ে দেয়। হু হু করে শব্দহীন ঠাণ্ডা বাতাস আরিফ চৌধুরীকে ভিজিয়ে দেয়। বিপাশা শাড়ির আঁচলটা মাথায় ভালো করে তুলে দিতে দিতে বলে- চা খাবে না কফি?
– কফি, বাক কফি। কে বানাবে? তুমি?
– হ্যাঁ। কাজের মেইড টাকে আজ সন্ধ্যায় ছুটি দিয়ে দিয়েছি। তা ছাড়া এতদিন পর এলে তুমি, এক কাপ কফি নিজ হাতেই বানিয়ে দিই।
– ওকে।
এর মধ্যে একটি ফুটফুটে মেয়ে দৌড়ে এসে বললো- ও, আংকেল এসেছো? মা কখন থেকে তোমার জন্য ওয়েট করছে।
– তুমি করো নি?
– আমি তো সেই সকাল থেকে।
– তাই?
এই কথা বলে জেরিনকে কাছে টেনে নিলো আরিফ। বাবার আদর থেকে বঞ্চিত এই মেয়েটিকে খুব আদর করতে ইচ্ছে করে তার। জেরিনও মনে হয়, এই ভালোবাসাকে খুব উপভোগ করে।
তৃষ্ণা যখন খুব বেশি, তখন কেউ জলের গুণাগুণ পরখ করে না। পুকুরের জল আর নদীর জল তার কাছে এক মনে হয়।
স্নেহের তৃষ্ণা জেরিনকে এইভাবে পিপাসার্ত করেছিলো যে আরিফ চৌধুরীর অল্প আদর সে চোখ বন্ধ করে উপভোগ করে। আর আরিফ চৌধুরী? সে জেরিন আর নিঝুমকে আলাদা করতে পারে না। মনে হয় জেরিন নয় নিঝুম তার কোলে দুলছে। যাকে সে অবহেলায় অনাদরে ঢাকায় ফেলে এসেছে।
কফি নিয়ে ত্রস্ত পায়ে ঈশিতা এলো। দুই কাপ। মনে হলো সে নিজের জন্যও এক কাপ এনেছে। সাথে নিমকি বিস্কুট।
– এই নাও। বলে একটা কাপ আরিফ চৌধুরীর হাতে দিলো।
অন্যটি ট্রেতে পড়ে থাকলো। সেখান থেকে মিষ্টি ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। ছাদ না থাকলে তাই হতো। সব ধোঁয়াই আকাশে উঠতে চায়। এটা ধোঁয়ার স্বভাব। আরিফ চৌধুরী বললো,
– তুমি নাও। জেরিনের জন্য আনো নি?
– না। ও কফি খেলে রাতে ঘুমাতে পারবে না।
ইশিতা কফির কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দেয়ার আগেই জেরিনকে বললো- মা, তুমি যাও, বেড রুমে গিয়ে খেল।
কাল বিলম্ব না করে জেরিন প্রায় দৌড়ে বেড রুমের দিকে চলে গেল। এই বয়সের মেয়েরা দৌড়ানোর মতো হাঁটে। বড়দের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তাদের দ্রুত হাঁটতে হয়। বড়দের স্টেপ বড়।
জেরিন বললো- তোমার আসতে কষ্ট হয়নি তো।
– না, তবে কষ্ট হচ্ছে তোমার জন্য। কাল রাতে সব শোনার পর তোমার জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। একটা বিপদ পার হয়ে এলে, এখন অন্য বিপদ তোমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললো।
– ভাবিনি, এরকম হবে। তুমি আমার অনেক দিনের বন্ধু। তুমি তো সবই জানো, বাবা ছোট্ট একটা চাকরি করতো। মারা যাওয়ার পর মা খুব অসহায় হয়ে পড়লো। পুরনো ঢাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতো তারা। ছোট ভাই ছিলো বাউণ্ডুলে। রশিদ। পড়াশুনায় ভালো না। টেনেটুনে কোনভাবে বি.এ পাস করেছে। ওর জ্ঞান ফিরলো। বুঝতে পারলো একটা চাকরি কত প্রয়োজন।
– তারপর?
– যেনো তেনো একটা জোগাড় করে ফেলোলো সে। বাউণ্ডুলেরা খুব করিৎকর্মা হয়।
আমাদের চারজনের সংসার। আমিও একটা চাকরি নিলাম। পনের হাজার টাকা বেতন। তাতে বাসা ভাড়াই হয় না। এইভাবে চলছিলো আমাদের জীবন।
আরিফ চৌধুরী চুপচাপ শুনছিলো এইসব কাহিনী।
বললো,
– ইশতিয়াক চৌধুরী কিভাবে এলো তোমার জীবনে?
এটা আগে বলো।
– সে কথাই তো বলছি।
জেরিন আবার বলতে শুরু করলো- সিলেটে একটা ট্র্যাভেলিং কোম্পানিতে ইন্টারভিউয়ের জন্য যাচ্ছিলাম ট্রেনে। তখন দেখা হয়ে গেলো ইশতিয়াক চৌধুরীর সাথে। তার পর অনেক লম্বা গল্প।
– শুনতেই তো হবে। না হলে সমস্যা দূর হবে কী করে?
সাত.
বিপাশা আবার বলতে শুরু করলো,
– ইশতিয়াক চৌধুরী মানে আমার হাসব্যান্ড ৭ দিন আগে মারা গেছে। লন্ডনে। ব্রেইন স্ট্রোক। আজ ১৭ তারিখ না? আজ তার আসার কথা ছিলো। বাংলাদেশে। কিন্তু মৃত্যু তাকে আসতে দিলো না। বেঁধে রাখলো লন্ডনে। আমাকে আর জেরিনকে সাগরে ভাসিয়ে।
আরিফ চৌধুরী বললো- কিভাবে?
– কথা ছিলো, এই বার এসে এই বাড়িটা আমাকে লিখে দেবে। আমার নামে এক কোটি টাকার ফিক্সড ডিপজিট করে দেবে। কিন্তু কিছুই হলো না।
– উনি মনে হয় বুঝতে পেরেছিলেন, আর বেশি দিন বাঁচবেন না।
– মনে হয়। ৬/৭ মাস আগে যখন শেষ বারের মতো এলো, আমাকে খুব আদর করতো। এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও যেতো না। সবসময় আমার পিছ পিছ ঘুরতো।
– জেরিনের সাথে কথা বলতো?
– সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখতো ওকে। এমনকি, ঘুমের সময় ওর মাথায় হাত দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতো।
এটা ওটা খেলনায় ভরে ফেলতো। মনে, ওকে খুশি করার জন্যই ও এসেছে।
বিপাশা বলেই চলেছে- একবার জ্বর হলো জেরিনের। মাথায় বরফ দেয়া, ঠাণ্ডা পানিতে গা মুছে দেয়া, ওষুধ খাইয়ে দেয়া… এসব সে নিজে করতো। এখন আমার জেরিনের জন্য খুব কষ্ট হয়, চার বছর বয়সে বাবাকে হারালো, অনেক সাধনায় সাত বছর বয়সে দাদুর বয়সী বাবাকে পেলো, সেও ওকে ছেড়ে চলে গেলো। এখন আমাদের কী হবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?
– ভয় পাচ্ছো কেন বিপাশা? আমি আছি না?
– তুমি কেমন করে থাকবে, তোমার সংসার আছে না?
তুমি কেন শুধু শুধু স্বপ্ন দেখাচ্ছো?
– স্বপ্ন দেখাচ্ছি না। কাল রাতে যখন টেলিফোনে সব কিছু বললে, আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। মনে হয়েছিলো, তখনই ছুটে আসি, তোমাকে বলি, ভয় কি তোমার, আমি থাকবো তোমার পাশে।
কাল বলিনি- আজ তোমার পাশে বসে, তোমাকে স্পর্শ করে বলছি, আমি তোমার পাশে থাকবো। যেমন করেই হোক তোমাকে আমার কাছে রাখবো। ইশতিয়াক সাহেব যেটা পারেনি, আমি সেটা প্রমাণ করে দেবো।
– শুধু শুধু আমাকে আশ্বাস দিচ্ছো।
– আশ্বাস নয়, আশ্বাস নয়, এই তোমার হাত ধরে বলছি, আমি তোমাকে ছেড়ে কখনও কোথাও যাবো না।
বিপাশা চমকে ওঠে। আরিফ যখন তার হাত ধরলো, সে ফিরিয়ে নিলো না তার হাত। এক ধরনের অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করলো। সে তো এরকম একটি হাতই চায়, যে হাত আর কেউ কেড়ে নেবে না কোনদিন। এ হাত হবে, একান্ত তার। চিরদিনের জন্য। মৃত্যুও যাকে ছিনিয়ে নেবে না।
বিপাশা বললো- এ হাত তো তুমি আর একবার ধরেছিলে। কই রাখতে পারো নি তো..? অল্প একটু ঝড় ঝাপ্টা আসলো আর আমের গুটির মতো আমাকে ছেড়ে দিলে। একটুও ভাবলে না, সেই গুটি ঝড়ে জলে ভিজে কিভাবে পচে গলে গেলো, কিভাবে নষ্ট হয়ে গেলো।
– বিশ্বাস করো বিপাশা, তখন হাতে শক্তি ছিলো কম। অল্প শক্তিতে ধরে রাখতে পারিনি। এখন আমার হাতে অনেক জোর, পৃথিবী ভেঙে পড়লেও তুমি আর কাচের মতো টুকরো টুকরো হবে না। আমি এখন জোড়া দেয়ার অনেক নিয়ম জানি।
– কি যা তা বলছো তুমি? তোমার কন্যা? তোমার স্ত্রী? তোমার সংসার?
নারীরা এরকমই। সাজানো গোছানো অন্য সংসারে ঢুকতে চায় না। অন্য সংসারের বোঝা হয়ে থাকতে চায় না। সে একাই সর্বস্ব চায়। কারও ভাগ কাড়তেও চায় না নিজের ভাগ কাউকে দিতেও চায় না। তার সাম্রাজ্যে সে একা সাম্রাজ্ঞী হতে চায়।
– আমার সংসার নিয়ে তোমার ভাববার দরকার নেই।
সংসার তো চাইনি, আমি তোমার কাছে আসি! বরং বাধা দিয়েছে। তারপরও তো এসেছি। সংসারকে ধাক্কা দিয়ে এক লাফে তোমার কাছে এসেছি। আর এসেই যখন পড়েছি। তখন ফিরিয়ে দিও না আমাকে। তুমি আমার, তোমার কন্যা আমার। আর কিছু চাই না আমি। আর কিচ্ছু চাই না আমি।
এই কথা বলে আবার বিপাশার হাতটি ধরলো আরিফ চৌধুরী। এবার আরও শক্ত করে। মনে হলো, কুড়িয়ে পাওয়া মানিক হারিয়ে গিয়েছিলো, এখন ধূলা বালির মধ্যে আবার পেয়ে তাকে দশ দশটি গিঁট দিয়ে তা আঁচলে বেঁধে রাখতে চাচ্ছে।
এবার সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায় বিপাশা। ডিনারের সময় হয়েছে। আরিফ যেতে দেয় না তাকে। বিপাশা চমকে ওঠে।
– কী করছো তুমি?
– বিপাশা তুমি আমার। আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি?
বিপাশা কাঁপতে কাঁপতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে বেড রুমের দিকে যেতে চায়। আরিফ ভালোবাসার শক্ত রশি দিয়ে তাকে বেঁধে ফেলে । আলিঙ্গনে বিদ্ধ করে তাকে। বিপাশা শব্দ করে কেঁদে ফেলে। এত ভালোবাসা তার সহ্য হয় না।
এই মুহূর্তে এক অবাক কাণ্ড ঘটে। মায়ের কান্নার শব্দেই মনে হয় বেডরুম থেকে ছুটে আসে জেরিন। মাকে এই পুরুষটির বুকের মধ্যে দেখে আবেগে, খুশিতে চিৎকার করে ওঠে বলে– বাবা, বাবা।
দু’হাত প্রসারিত করে বলতেই থাকে,
– বাবা, বাবা, বাবা….
ততক্ষণে আরিফের শক্ত বাহু থেকে মুক্তি নিয়েছে বিপাশা। সেখানে এখন লুটোপুটি খাচ্ছে ৭ বছরের কিশোরী জেরিন।
এখন আর বিপাশার ভয় নেই। তার সাথে আছে আরিফ চোধুরী। ইতোমধ্যে রাত গাঢ় হয়েছে। ডিনারের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। সে ডিনার রেডি করতে গেছে। জেরিন এখন বাবার কোলে খেলা করছে।
বিপাশা বললো- ফ্রেশ হয়ে নাও। ডিনার রেডি।
এই কথা বলে একটা টাওয়েল এগিয়ে দিলো। টাওয়েলে সুগন্ধি। মিষ্টি মধুর। সাদামাটা ডিনার। সবজি, চিকেন, ডাল। কোন আধিক্য নেই। কোন আতিশয্য নেই। ডিনার করে ড্রইং রুমে ফিরে আসে আরিফ চৌধুরী। এখন তার ইশিতার কথা মনে হচ্ছে। নিঝুমের কথা মনে হচ্ছে।
এই সময়টায় বাসায় ফেরে। প্রতিদিন ঈশিতা অপেক্ষা করে। একসাথে ডিনার করবে বলে। নিঝুম কোন কোন দিন জেগে থাকে। কোন কান দিন ঘুমিয়ে পড়ে। জেগে থাকলে সেও ডাইনিং টেবিলে বসে। তার জন্য আলাদা উঁচু চেয়ার আছে।
এ বাড়িতে ড্রইং রুম ছাড়া তিনটি রুম। বেড রুম ছাড়া যে দু’টি রুম, তার একটিতে ইশতিয়াক চৌধুরীর বৃদ্ধা বোন থাকে। আজ নেই। ভাই মারা যাওয়ার পর খুব কান্নাকাটি করছিল। বড় ছেলে আসিফ রায়হান এসে নিয়ে গেছে।
ওই রুমটি একটু বড়। প্রথমে বিপাশা ভেবেছিলো, ওই রুমেই থাকতে দেবে আরিফকে। পরে ভাবলো, বৃদ্ধ মানুষের ঘরে থাকতে দেয়া ঠিক হবে না। তাই জেরিনের রিডিং রুম গুছিয়ে দিয়ে ডাকলো আরিফকে- আরিফ, চলে এসো, জার্নি করে এসেছো, তোমাকে টায়ার্ড লাগছে, শুয়ে পড়ো।
– এত তাড়াতাড়ি? কেবল সাড়ে দশটা বাজে।
– কী করবে এখন?
– গল্প, গল্প, গল্প করবো। তোমার আসল প্রবলেমই তো ভালো করে শোনা হলো না। কাল রাতে টেলিফোনে এত কাঁদলে যে!
– কান্না তো থামিয়েই দিলে তুমি। কেন কাঁদবো আর? তুমি আছো, আমি আর ভয় করি না। যা ঘটে ঘটুক। ইশতিয়াক মারা গেছে। ওরা যদি বাড়িটা নিয়ে নেয়, নিক। যদি বাড়ি থেকে বের করে দেয় আমাকে, দিক। আমার আর কোনো ভয় নেই। আমি এখন পাথর। পাথরের কোনো ভয় থাকে না। লাঠি দিয়ে মারলেও লাঠি ভাঙে, ধাক্কা দিয়ে গর্তে ফেললেও, গর্ত ক্ষতবিক্ষত হয়। পাথরের কিছু হয় না পাথর স্বমহিমায় উজ্জ্বল থাকে।
– এত কথা জানো তুমি?
– অনেক যুদ্ধ করছি জীবনের সাথে। ঘাটে ঘাটে শিখেছি। শিখছি। আর শিখছি।
– এসো, বসো আমার কাছে। সেই ইউনিভার্সিটির তুমি আর এই তুমি। কত পার্থক্য। কত বদলে গেছো।
– থাক, ওসব কথা। ওসব কথা উঠলে সারারাতেও শেষ হবে না। এসো অন্য কথা বলি।
– অন্য কি কথা। প্রতশ্রুতি তো তুমিই রাখো নি। আমাকে বিয়ে করার ভয়ে পালিয়ে চলে গেলে কানাডা। ফিরে যখন এলে, আমি তখন অন্য ঘরের বউ।
– থাক না ওসব কথা। তাতে কষ্টই বাড়বে।
– তাহলে?
– একটা গান গাও না? ওই যে গাইতে… সখি ভাবনা কাহারে বলে, সখি যাতনা কাহারে বলে..
– না, আজ তোমার কোলে ঘুমাতে মন চাইছে।
– মনকে শক্ত করে বেঁধে রাখো বিপাশা।
– আমি পরাজিত হতে চাই না। আর কত পরাজয় স্বীকার করবো বলো? অনেক তো হলো।
এই কথা বলে বিপাশা প্রায় দৌড়ে বেডরুমে চলে গেলো। নিবিয়ে ফেললো বাতি। জেরিনের ঘুমুতে কষ্ট হচ্ছে। জেরিন আলোতে ঘুমাতে পারে না।
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো আরিফ। তার চোখেও ঘুম নেই। সেও কি আলো নিভিয়ে তার জন্য নির্ধারিত শোবার ঘরে চলে যাবে! কী করবে এখন সে। কিছু ভাবতে পারছে না আরিফ।
বিপাশারও ঘুম পাচ্ছে না। মনের মধ্যে একটা চিন্তা দানা বাঁধতে লাগলো। আরিফকে কি বাসায় রাখা ঠিক হলো? আমি না হয় চিনি। এখানে আর তো কেউ ওকে চেনে না, তার বিষয়ে কিছুই জানে না। হঠাৎ যদি কেউ সন্দেহ করে। আমি রাত্রে একজন পরপুরুষকে থাকতে দিয়েছি ঘরে।
এমন তো হতেও পারে, আরিফকে গেট থেকে নিয়ে আসার সময় কেউ দেখে ফেলেছে। তখন কিছু বলেনি।
অবজারভ করছে। সুযোগ বুঝে একটা কিছু অঘটন ঘটাবে।
না না, এসব চিন্তা থাক। আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না। কী আর হতে পারে? বেশি কিছু যদি হয়, আমাকে ঘর থেকে বের করে দেবে। আরিফকে হয়তো মান অপমান করবে? না, না, এটা কিছুতেই হতে পারে না। আরিফের কোন ক্ষতি হোক.. এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। একটু দেরিতেই দরজা খোলে বিপাশা। বুঝতে না বুঝতেই তিনজন যুবক ঢুকে পড়ে বিপাশার ঘরে। তাদের মুখে কালো কাপড়। হন্তদন্ত হয়ে কি যেনো খুঁজতে থাকে। পেয়ে যায়। বলে- হারামজাদা, মনে করেছিস, মেয়েমানুষ খেয়ে চলে যাবি… সেটা তোর ভাগ্যে নেই। চল আমাদের সাথে চল। তোকে জমের ঘরে নিয়ে যাই।
ইতোমধ্যে আরিফের চোখ মুখ বেঁধে ফেলেছে তারা।
দেরি না করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো গলি পথে দাঁড়ানো একটা মাইক্রোবাসে।
বিপাশা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো। কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ করলো না। শুধু এটুকু বুঝলো, কাল সকালে ওরা এই বাড়ি থেকে তাকে বের করে দেবে।
আট.
হিমাংশুর টাকা দরকার। এতদিন খাঁচায় বন্দী থেকে টাকা রোজগার করেছে। এখন খাঁচা থেকে বের হয়েছে সে। খাঁচার বাইরে কত টাকা। শিমুল তুলার মতো ওড়ে।
বাতাসে ভাসে। ধরতে জানলেই হলো। টাকা ধরার নিয়ম অনেকে জানে না। সেও ক’দিন আগে জানতো না। এখন সে রপ্ত করেছে। রপ্ত করেছে উড়ন্ত টাকা কিভাবে পোষা বিড়ালের মতো বসে। প্রভুভক্ত কুকুরের মতো কিভাবে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। আবার মাথায় হাত দিলেই কিভাবে পায়ের কাছে বসে লেজ নাড়ে। সে ভালো করেই জানে, কি জাদু ছড়ালে টাকা অনুগত ভৃত্যের মতো উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে।
সে খুঁজে বের করে পরিতোষকে। এক সময়ের বন্ধু। যে মদ বেচা টাকায় এখন কোটিপতি। একদিন রাতে পরিতোষ বলে- কি হয়েছে তোর, মুখ শুকনো কেন? কোত্থেকে আসলি তুই?
– আগে একটু মদ দে। মন ভালো করে নিই। তারপর সব বলি।
– কি বলছিস যা-তা। তুই মদ খাবি?
– হ্যাঁ, আমি ভালো নেই রে। দেখি মদ খেয়ে ভালো থাকা যায় কি না?
– কি হয়েছে তোর, মদ খাবি? সত্যি বলছিস তুই?
– হ্যাঁ, আমাকে মদ দেতো.. যে কোন ব্র্যান্ডের। দে না এক পেগ?
– মদের সাথে আর কিছু?
– মানে?
– মেয়েমানুষ টেয়েমানুষ?
– না, না ওসব চলবে না। প্রিয়তি যদি জেনে যায়?
হঠাৎ তার প্রিয়তির কথা মনে হয়। প্রিয়তি যদি জানে আমি মদ খাচ্ছি, মেয়ে মানুষের সাথে ফষ্টি নষ্টি করছি, আমাকে একেবারে জবাই করে ফেলবে।
হিমাংশু খাটে পা ঝুলিয়ে বসেছে। সাদা ধুতি পরনে। গায়ে লাল জামা। আর কেউ নেই এই ঘরে। সে একটা চুরুট ধরিয়ে খাচ্ছিল। পাশে একটা বেড সুইচ। সে সেটায় টিপ দিলো।
ক্রিং ক্রিং শব্দ হওয়ার সাথে সাথে সত্যি সত্যিই একটা মেয়ে পাশের ঘর থেকে বের হয়ে এলো। পরিতোষের সামনে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলো,
– কি চাই বড় বাবু?
– এক পেগ মদ নিয়ে আয় তো।
এই কথা বলেই সে হিমাংশুকে জিজ্ঞেস করে,
– হুইস্কি খাবি, না অন্য কিছু?
– দে, তোর যা ইচ্ছে।
মেয়েটা সব শোনে। কিছু না বলেই সে ভেতরে চলে যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এক পেগ নয়, এক বোতল হুইস্কি নিয়ে এলো। পরিতোষের হাতে ধরিয়ে দিলো একটা গাস। ছিপি খুললো। বললো- এই নিন।
হিমাংশু গেলাস বাড়িয়ে দিলো তার দিকে। বললো,
– দাও।
মেয়েটি খুব সাবধানে বোতল থেকে মদ ঢালতে লাগলো। গেলাশে ফেনা ভিড় করলো। একটু উপচিয়েও পড়লো। কিন্তু এতে কারও হাত ভিজলো না। মেঝেতে কয়েক ফোঁটা পড়লো মনে হয়।
মেয়েটি ভেতরে চলে গেলো। যাওয়ায় সময় হিমাংশু খেয়াল করলো, মেয়েটি অল্প বয়সী। মুখ উজ্জ্বল।
নাক, চোখ সপ্রতিভ। চুল বেণী করা। দেখে মনে হয় গ্রাম্যতা ভিড় করে আছে তার চেহারায়। গ্রামের মেয়েরা খুব লক্ষ্মী হয়।
হিমাংশুর মনে হয়, জিজ্ঞেস করি, কে মেয়েটি? কিন্তু সাহস হয় না। অল্প সময় এসে বেশি জানতে হয় না।
এটা অনধিকার চর্চা।
শুধু মনে হয়, পরিতোষ মেয়ে মানুষের কথা বলেছিলো।
সেটা কি এই মেয়ে? না ভেতরে আরও মেয়ে আছে। পরিতোষ কি এই সব মেয়েদের সান্নিধ্যে যায়? পরিতোষের বউ কি জানে … এই সব কীর্তিকলাপ?
হিমাংশু জিজ্ঞেস করে- তুই খাবি না?
– না
– আমি রাতে মদ খাই না। রাতে মদ খেলে আমি কোন কাজ করতে পারি না।
চমকে ওঠে পরিতোষ। রাতে কি কাজ করে পরিতোষ? পরিতোষ বলে- এবার বল, কেন এসেছিস? এতদিন পর?
– আমার একটা কাজ দরকার।
– কাজ? এখানে? আমি কি করি জানিস?
– খুব ভালো করে জানি না, তবে এটুকু জানি, তুই মদের ব্যবসা করিস।
– আর কি জানিস?
– জানি, তোর অনেক টাকা।
– আর?
– জানি, তোর গ্যাং-এ অনেক লোক। তুই তাদের ওস্তাদ।
ওদের কাজে লাগিয়ে তুই অন্ধকার রাজত্ব তৈরি করেছিস। সেই রাজ্যের তুই অধিপতি। তুই যা ইচ্ছা তাই করতে পারিস। যাকে ইচ্ছে তাকে দুনিয়ায় রাখতে পারিস, যাকে ইচ্ছে তাকে মুহূর্তেই বিদায় করে দিতে পারিস।
– তোর জানা শেষ?
– আজ আরও জানলাম, তোর কাছে মেয়েমানুষ থাকে।
তুই তাদের পুতুলের মতো ব্যবহার করিস। তাদেরকে তুই উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে। আজ্ঞাবহ ভৃত্যের মতো।
– তোর জানার অনেক বাকি! কিছুই জানিস না তুই।
ওই ঘরে কি আছে, তাও জানিস না। ঘরের ওপাশে কি আছে তাও অজানা। আমার পায়ের নিচে কি, তাও কি জানিস?
এই কথা বলে, একটা সুইচ টেপে পরিতোষ। আলগা হয়ে যায় একটা সুড়ঙ্গ।
চমকে ওঠে হিমাংশু। তার মনে হয়, আসলেই কিছুই জানে না সে। সুড়ঙ্গের মধ্যে কি আছে, সেটাও কি জানে সে। আসলেই পরিতোষ রহস্য কিছুই জানে না সে।
বলে- আসলেই কিছুই জানি না আমি। আমার জানার দরকারও নেই। আমি চাই তোর কাছে থাকতে।
তোর বন্ধু বলিস আর শিষ্য বলিস, আর আজ্ঞাবহ দাস বলিস, আমি তোর কাছে থাকতে চাই। আমার অনেক টাকা দরকার।
– টাকা নিবি? কত টাকা?
– আমি ভিক্ষা চাই না। করুণা চাই না। আমি টাকা রোজগার করে দেখাতে চাই, আমিও জানি, আমিও জানি এই রঙঢং ওয়ালা পৃথিবীতে কিভাবে বেঁচে থাকতে হয়। কিভাবে শত্রুর গলায় ফাঁসি পরাতে হয়।
– তাহলে কি করবি?
– আমি কিচ্ছু করতে চাই না। শুধু তোর পায়ের কাছে বসে গুপ্তধন আবিষ্কার করতে চাই।
– পারবি থাকতে?
– কেন পারবো না?
– পারবি বউকে না দেখে বছরের পর বছর একা কাটাতে? পারবি দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে থাকতে?
পারবি হুকুম দিলে ট্রিগারে টিপ দিতে, সামনে কে আছে দেখা যাবে না, বউ তো দূরের কথা, সে যদি হয় মা?
পারবি? এখন বল।
– আমি সব পারবো। কেন পারবো না। আমাকে পারতে হবে, আমি তোমার বন্ধু না?
– থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড।
এই কথা বলে পরিতোষ বুকের মধ্যে টেনে নেয় হিমাংশুকে। বড় শক্ত ওর বুকের হাড়। মনে হলো গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, থেঁতলে যাচ্ছে তার সমস্ত শরীর!
অল্প দিনেই হিমাংশু রপ্ত করে ফেললো আন্ডারওয়ার্ল্ড।
সে পরিতোষের বন্ধু। সাতচল্লিশ সদস্যের গ্রুপের মধ্যে সে এখন প্রধান। বড় বড় অপারেশনে সেই এখন লিডার। পরিতোষ তাকে তুলে দেয় জার্মানির তৈরি আর আর থ্রি পিস্তল। এর পর আর থেমে থাকতে হয়নি হিমাংশুকে। সে এখন বাঘ। হিংস্র। পরিতোষের নির্দেশে যখন তখন যাকে তাকে থাবা দেয়। রক্ত চোষে।
গোগ্রাসে গেলে সেই রক্ত।
একদিন এক অপারেশনে যেতে হয় তাকে সীমান্তের এক কর্নারে। কাঁটাতারের বেড়ার ওপার থেকে আসবে তিন হাজার কার্টন হরীতকী মদ। তেরো কোটি টাকার মাল। বিশাল চালান। নিয়ে আসবে সে তিনটি ট্রাকে। সব আয়োজন শেষ।
তার সাথে আরও পাঁচজন সহকর্মী। সার্বক্ষণিক খবর রাখছে হিমাংশু।
গভীর রাত। তারকাঁটার বেড়া কেটে পাহাড়ি রাস্তায় ঢুকে পড়লো ট্রাকের সারি। কেউ কোথাও নেই। প্রচণ্ড আঁধার।
আর কয়েক কিলোমিটার গেলেই ডেরা। পরিতোষের রাজত্ব।
থমথম করছে সবকিছু।
হঠাৎ গা শিউরে উঠলো পরিতোষের। একটা তীব্র আলোর ঝলকানি অন্ধকারের উপর লাফিয়ে পড়লো।
সে বুঝতে পারলো দুর্যোগ। কী হবে এখন।
একটা জিপ সামনে এসে দাঁড়ালো। ফাঁকা গুলি ছুড়লো কয়েকটা। তারপর? ওয়্যারলেসে খবর দিতে চাইলো বসকে। বস মানে পরিতোষকে। বস কি ঘুমিয়ে পড়েছে? এখন অনেক রাত।
না, কি ভাবছে এসব। তার ইশারায় পাশের পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লো ট্রাক তিনটি। দু’ দিক থেকে দুইটি জিপ এসে ঘেরাও করে ফেললো সে সব ট্রাক । সে গুলি ছুঁড়তে থাকলো। তার সঙ্গীদল যে যার মতো দিগ্বিদিক ছুটতে থাকলো। ধরাও পড়ে গেলো দুই জন।
হিমাংশু প্রাণপণ ছুটছে। কোন দিক সীমানা নেই। কোথায় যাচ্ছে সে। মরণের ভয় নেই তার। তাই বলে এই ভাবে? এই ভাবে ধরা পড়ে মৃত্যুর সাথে মিতালি করবে সে। ছি: ছি:। সে পালাবে না। সে আবার উল্টা ট্রাকের দিকে দৌড়াতে শুরু করে।
পরিতোষের আমানত রক্ষা করতে হবে। সে আবার ট্রাকের কাছে ফিরে আসে। লক্ষ্য করে সাদা পোশাকের এক বাহিনী তাকে ঘিরে ধরেছে। তার প্রিয়তির কথা মনে পড়ে। সে মরে গেলে প্রিয়তি একা হয়ে যাবে। শেষ বিদায়টা তার ভালো হয়নি। সেদিন কী এক তাড়নায় সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো। হিতাহিত জ্ঞান ছিলো না। নাহলে প্রিয়তির উপর সেদিন সে অত্যাচার করেছিলো.. যা তার ভাবনার মধ্যেও ছিলো না। কয়েকজন মানুষ তাকে ঘিরে ধরলো। সে পিস্তলটা ফেলে দিলো মাটিতে। সে মরবে না। প্রিয়তির জন্য সে বাঁচতে চায়।
পরিতোষের জন্য তার কষ্ট হয়। সে তাকে ভালোবাসে। সে তার বন্ধু। সে জন্য নয়। সে অল্প দিনে চোরাচালানের পদ্ধতি রপ্ত করেছে, সে জন্যও নয়। পরিতোষ তাকে ভালোবাসে এজন্য যে, হিমাংশু প্রিয়তিকে ভালোবাসে। প্রিয়তি পরিতোষের বোন। যে ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়েছিলো। যখন ওরা জিপে করে হিমাংশুকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো, তখন হঠাৎ চোখে পড়লো, প্রিয়তি একটা গাছের নিচে আগুন জ্বালিয়ে বসে আছে। প্রিয়তি নাকি অন্য কোন নারী? একজন পুরোহিত গোছের বৃদ্ধ লোক তার মাথায় অবিরত হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। প্রিয়তি কি এখনও তাকে পথে ঘাটে, বন জঙ্গলে খুঁজে বেড়ায়? প্রিয়তিই হবে মনে হয়।
নয়.
বুড়িগঙ্গায় পাওয়া লাশটি রোদে পুড়ছে। কেউ দেখার নেই। এটাই নিয়তি। মানুষ যখন লাশ হয়ে যায় এই পৃথিবীতে তার আর মূল্য থাকে না। এই লাশটি বেওয়ারিশ। পচে যাওয়া গলে যাওয়া দুর্গন্ধযুক্ত লাশ। বুড়িগঙ্গায় যখন ভাসছিলো লাশটা, সলিম ব্যাপারী আর কিতাব আলি উদ্ধার করার আগে অনেক জুলুম করা হয়েছে লাশটির সাথে। ম্রিয়মাণ স্রোতে গাছের গুঁড়ির সাথে ধাক্কা খেয়েছে। মানুষখেকো কিছু মাছ আছে.. তাদের ঠোকর খেয়েছে। নৌকার বৈঠার বেসামাল বাড়ি খেয়েছে।
আর জীবদ্দশায়? কে তাকে ভাসিয়ে দিলো বুড়িগঙ্গায়? কি অপরাধ ছিলো তার। কার পাকা ধানে মই দিয়েছিলো সে। না বিনা অপরাধেই লালসার শিকার হয়েছিলো সে। তাকে হত্যা করে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে দিয়েছে। মৃত মানুষ পানিতে ডোবে না। ডুবলেও কিছুক্ষণ পর আবার ভেসে ওঠে।
লাশটি এখনও সনাক্ত হয়নি। তাই থানার ওসি সাহেব চালান করে দিলো কোতোয়ালি থানায়। এখন পোস্টমার্টেম হবে। পচে ফুলে যাওয়া মানুষকে কেটেকুটে দেখা হবে কে কোথায় গুলি মেরেছিলো, অথবা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দম বন্ধ করে কেড়ে নিয়েছিলো জীবন। কিংবা ছুরি দিয়ে ফেড়ে ফেলেছিলো কলিজা। অথবা রডের বাড়িতে মাথা থেকে খুলে নিয়েছিলো খুলি।
মানুষের মৃত্যুর কত কারণ। সব কারণ কি উদঘাটন করা যায় পোস্টমার্টেম করে? মৃত্যু পরবর্তী সিম্পটম দেখে আবিষ্কার করা যায় কয়টা তথ্য। তবু মানুষ, মানুষকে কাটে, ছেঁড়ে, জোড়া দেয়। মরা মানুষকে নিয়ে অসভ্য খেলার আর শেষ হয় না।
পোস্ট মার্টেমে উদঘাটন হলো না রহস্য। শরীরে কোন গুলি পাওয়া গেল না। আঘাতের কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। গলায় রশির দাগ পাওয়া গেল না।
তাহলে এটা কি স্বাভাবিক মৃত্যু? না নদীতে ডুবে আত্মহত্যা? না কেউ গুম করে হাত পা বেঁধে দিয়েছে নদীতে? কিংবা ইলেকট্রিক শক চুষে নিয়েছে রক্ত?
বেওয়ারিশ হিসেবে ঘোষণা করার আগে শেষ কিছু ব্যবস্থা নেয় থানা। মিডিয়ার সাহায্য নেয়। রেডিও টেলিভিশন এ প্রচার করে মৃত্যু কাহিনী। পেপারে প্রকাশ করে লাশ বৃত্তান্ত।
এ ক্ষেত্রেও তাই হলো। প্রচার শুরু হলো। বুড়িগঙ্গায় কুড়িয়ে পাওয়া লাশ সয়লাব হয়ে গেলো আকাশে বাতাসে।
হুমড়ি খেয়ে পড়লো মানুষ কোতোয়ালি থানায়। লোকে লোকারণ্য। সকলেই খুঁজতে চেষ্টা করলো এই লাশের মধ্যে তার প্রিয়জনকে। কেউ খুঁজলো তার পিতাকে। কেউ খুঁজলো তার ভাই কে। কেউ খুঁজলো তার স্বামী কে।
গত এক সপ্তাহে কয়টা মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে কয়টা খুন, কয়টা আত্মহত্যা। এ খবর কে রাখে?
তবে ঠিকই পাগলের মতো পথে পথে ঘুরছে ঈশিতা। আরিফ কী এক অজানা কারণে তার ওপর রাগ করে চলে গেছে। কোথায় যেতে পারে সে? অফিস জানে না।
তার বন্ধুবান্ধব, প্রত্যেকের কাছে খোঁজ নিয়েছে সে, কোথাও সন্ধান পায়নি।
এত নিষ্ঠুর হতে পারে আরিফ? একবারও মনে পড়ছে না তাকে। নিঝুমকে ভুলে কিভাবে দিন কাটছে তার?
কিছুই বুঝতে পারছে না ইশিতা। কী করবে সে। কি করলে খুঁজে পাবে আরিফকে। সাত বছরের সংসার তাদের। এরকম তো হয়নি কখনও।
আর পারছে না সে। আরিফহীন জীবনটা বিষিয়ে উঠেছে তার। সাইকেলের চাকায় হাওয়া না থাকলে যেমন সাইকেল চলে না, তার জীবনটা অচল হয়ে গেছে। সে আর চলতে পারছে না।
বাবাহীন নিঝুম খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ক’দিন থেকে কিচ্ছু খেতে চাচ্ছে না সে। বাবার অভাব তাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে।
ঈশিতা দেখলো খবরটা। বুড়িগঙ্গার ভেসে যাওয়া একটা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশটি পুরুষের। বয়স চলিশের কাছাকাছি। এখনও সন্ধান মেলেনি তার কোন আত্মীয় স্বজনের। লাশটি কোতোয়ালি থানার কম্পাউন্ডে রাখা হয়েছে। জনসাধারণের দেখার জন্য।
খবরটি দেখে চমকে ওঠে ইশিতা। বুকের মধ্যে একটা কষ্ট টগবগ করে ফুটতে থাকে। তাহলে কি কোন দুর্ঘটনা ঘটলো আরিফের। কেউ খুন করে ভাসিয়ে দিয়েছে তার লাশ। আর কেউ না জানলেও সে তো জানে, আরিফের প্রাত্যাহিক জীবনের ঘটনাপ্রবাহ। সে তো কোন অন্যায় করেনি। তাহলে এই সর্বনাশ হবে কেন?
এখন রাত এগারোটা। সে সিদ্ধান্ত নিলো সকালেই সে যাবে থানায়। দেখবে ফেলে রাখা লাশটি।
ঘুম নেই তার চোখে। পর পর ছায়াছবির মতো ভাসতে থাকে আরিফের সাথে কাটানো তার জীবনের অংশগুলো। চোখের কোণে পানি জমা হয়। অজানা আশঙ্কায় তার মন উথালপাথাল হতে থাকে।
সকালে, সে অফিসের গাড়ি আসতে বলে। গাড়ির সাথে আসে দীপ্তি রায়। আরিফের পিএস। তারা একসাথে কোতোয়ালি থানার দিকে রওয়ানা হয়।
আরিফকে বিপাশার বাড়ি থেকে রাতে সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সকালে আর এক কাণ্ড ঘটে। ইশতিয়াক চোধুরীর ভাইয়ের ছেলে জামিল চৌধুরী বিপাসার বাসায় আসে। একা।
দরজা খুলতেই জিজ্ঞেস করে- কে এসেছিলো রাতে বল্।
হতবিহ্বল বিপাশা কোন উত্তর দেয় না।
এতে জামিল আরও ক্ষিপ্ত হয়। বলে- আমি সব জানি। কাল রাতে কার সাথে ফষ্টি নষ্টি করেছিস তুই
সব জানি। একা থাকতে পারিস না, না?
আমাকে ডাকলিই পারতি। আমি সব ফাঁস করে দেবো। তবে, একটাই বাঁচার পথ আছে তোর…
বিপাশা চুপ করে থাকে। কিচ্ছু বলে না। সে স্পষ্ট বুঝতে পারে, আরিফকে কারা তুলে নিয়ে গেছে। তার খুব কষ্ট হয়। আরিফের যদি কোনো ক্ষতি হয়। এর চেয়ে যদি তার কিছু হতো। তার মরে যেতে ইচ্ছে করে।
জামিল আবার বলতে থাকে- তুই বুঝতে পারছিস না, কী চাই আমি? আমার আংকেল মারা গেছে। এ সম্পত্তি আমার। এখানে তুই আর একদিনও থাকবি না। তারপর, তুই যে কাণ্ড করেছিস, তার পর তোকে একদিনও এখানে থাকতে দেবো না। আজই তুই এই বাড়ি থেকে চলে যাবি। চুপ করে আছিস ক্যান?
বিপাশার মুখে কোন কথা নেই। অতি দুঃখ যখন শরীরে ভিড় করে, তখন মানুষ বোবা হয়ে যায়, কথা বলার শক্তি হারিয়ে যায়।
জামিল আবার বলতে থাকে- এই হারামজাদী, কথা বলছিস না ক্যান? তুই কি চাস, ওই লোকটা রাতে যা করেছে, আমিও তাই করি। তোর মাংস খাই? ভালোয় ভালোয় বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে আমি কাউকে কিচ্ছু বলবো না। যা যা করেছিস, সব গোপন থাকবে। কাউকে কিচ্ছু বলবো না। বল, যাবি, না লোকজন ডেকে কালকের ঘটনা বলে ঘাড় ধরে বের করে দেব?
এবার বিপাশা জামিলের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বলে- না, না আমাকে মাফ করে দাও। আমি চলে যাচ্ছি।
আজ রাতের ট্রেনেই আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি।
– পা, সরিয়ে নেয় জামিল। আমি যাচ্ছি। কাল সকালে তোকে আর যেন দেখি না। সম্পত্তির লোভ তাকে পশু বানিয়ে দেয়।
অথচ, তার চাচা যখন বেঁচে ছিলো, তখন মাঝে মাঝে এই বাসায় আসতো সে। কত বিনয়ী আর ভদ্র ছিলো সে।
বিপাশা আবার পা চেপে ধরে- আমি চলে যাচ্ছি। একটা অনুরোধ করি, তোমরা আরিফ কে ছেড়ে দাও। কাল রাতে যাকে ধরে নিয়ে গিয়েছো।
জামিল এবার জানোয়ার হয়ে যায়, হিংস্র বাঘের মতো গর্জন করে বলে,
– আরিফ কে? আমি তাকে চিনি না। ওর কথা আর মুখে উচ্চারণ করবি না। আর একবার ওর কথা বললে, আমি তোকেও শেষ করে দেবো। খবরদার…
বিপাশা মিনতি করে বলে- তোমার পায়ে পড়ি, ওকে তোমরা মেরো না। ও বড় ভালো মানুষ…
এ কথার উত্তর দিলো না জামিল। পা ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
বিপাশা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলো। তার কান্না থামানোর কেউ নেই।
দরজা হাঁ করে খোলা থাকলো। তার একবারও মনে হলো না, জামিলের মতো আর কেউ ঢুকে যদি তার সর্বনাশ করে পালিয়ে যায়।
সে সন্ধ্যার মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে ঢাকার ট্রেনে উঠলো।
পুরনো ঢাকার লালখান বাজারে তার মা এখনও বেঁচে আছে.. যে এসবের কিছুই জানে না।
সকালে সেও থানার দিকে রওয়ানা হলো। তার মনে এক অজানা আশঙ্কা।
আর একজন, প্রিয়তির হাসব্যান্ড, হিমাংশু, অভাবের তাড়নায় যে পরিতোষের আশ্রয়ে গেলো। সেও মদের ডিব্বার মধ্যে লকলকে একটা যুবক নষ্ট হয়ে গেলো।
মদ আর মেয়েমানুষ যার প্রতিদিনের আরাধ্য। পরিতোষের মতো।
পরিবেশে মানুষ প্রভাবিত হতে বাধ্য। প্রথম দিন, দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিন সকিনার হাত থেকে মদের গেলাশ নিলো অনেকটা নিস্পৃহ ভাবেই। কিন্তু তারপর?
পরিতোষের রক্ষিতা সকিনা, রাবেয়া, খাদিজারা তার প্রিয় হয়ে গেলো খুব। গেলাসে উপচে পড়া মদের মতো তারাও উপচে পড়তে লাগলো হিমাংশুর শরীরে। হিমাংশু বুঁদ হয়ে উপভোগ করতে লাগলো এই সব উন্মাদনা।
প্রিয়তির হাসব্যান্ড কোথায় গেছে প্রিয়তি জানে না।
সে তাই আড়ালে আবডালে জলে জঙ্গলেও খোঁজে আবার খবর পেলেই লাশ হয়ে যাওয়া শরীরেও মধ্যেও হিমাংশুকে খুঁজে ফেরে। কিন্তু দিন যতই যায়, তার স্বামী অন্বেষণের মাত্রা বেড়ে যায়। বাবার স্নেহহীন জেরিন তিল তিল করে বড় হতে থাকে।
কোতোয়ালি থানার এই লাশের খবরটা তারও চোখ এড়ায় না। বুড়িগঙ্গার উৎস জানে সে। এই নদীটি বড় অসহায়। যমুনার শাখা ধলেশ্বরী থেকে যার উৎপত্তি।
তারপর পুংলি, বংশাই, তুরাগ হয়ে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তার পর বুড়িগঙ্গা। এর দুই পাড়ে কত শহর, কত গ্রাম, মসজিদ মন্দির লাউডগা সাপের মতো ফণা তুলে আছে। এরা শুধু এই সব ক্ষীণ অসহায় নদীকে গোগ্রাসে গিলতে চায়। বেড়ে ওঠে অবৈধ স্থাপনা।
প্রিয়তি একটা বেবিট্যাক্সি ডাকে। জেরিন ঘুমাচ্ছে। ওর ঘুম ভাঙায় না। মেইডকে বলে বেরিয়ে যায় হিমাংশুর খোঁজে।
মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন জাগে, আসলে তার এই পদচারণা, লাশের মধ্যে হিমাংশুকে খোঁজার এই যে উন্মত্ত নেশা, এতে কি লাভ? কি হবে এই লাশ যদি সত্যি সত্যিই হয় হিমাংশুর? পচে গলে যাওয়া লাশ দিয়ে কি করবে সে? যে লাশ কথা বলে না, যে লাশ জেরিনকে আদর করতে পারে না, যে লাশ প্রিয়তির চোখের দিকে তাকিয়ে ভালোবাসা খুঁজতে পারে না, কি হবে সেই গলিত মথিত লাশ দিয়ে।
প্রতিবার লাশের খবর পেয়ে প্রিয়তি সিদ্ধান্ত নেয়, ভবিষ্যৎ এ আর এইভাবে খুঁজতে যাবে না হিমাংশুকে।
কিন্তু যখনই লাশের খবর পায়, সে ঘরে থাকতে পারে না। এক আশ্চর্য নেশায় সে ছুটে চলে যায় হিমাংশুর সন্ধানে। সে ভালো করেই জানে, লাশ যদি সনাক্ত হয় হিমাংশুর, তাহলে তো আরও উটকো ঝামেলা। দাফন, কাফন, কবর সংগ্রহ, জানাজা কত ঝামেলা..!
তাহলে কি এই স্তিমিত আশায় খুঁজতে যায় হিমাংশুকে.. যদি এই লাশ হিমাংশুর না হয়, সে বুঝতে পারবে, হিমাংশু মরে নাই…দিন যতই অতিক্রান্ত হোক, একদিন ঠিক ঠিক ফিরে আসবে হিমাংশু।
হয়তো তাই, প্রিয়তি আর ভাবতে পারে না। ঠিক ঠিক পৌঁছে যায় থানায়।
দশ.
থানায় অনেক মানুষের ভিড়। কেউ প্রিয়জনের খোঁজে। কেউ কৌতূহলে। কেউ পুণ্যের আশায়। মৃত মানুষকে দেখলে মৃত্যুর কথা মনে হয়। মৃত্যুচিন্তা আসলে মানুষ পাপ থেকে বিরত থাকে। পরকালের কথা মনে হয়।
জাহান্নাম জান্নাতের কথা মনে হয়। সত্তর গুণ শক্তিশালী আগুনের কথা মনে হয়। আজদাহা সাপের কথা মনে হয়। হুর গেলেমান, দুধের নহর, মধুর নহর, সরাবের নহরের কথা মনে হয়।
একটা বাধ্যবাধকতা আসে। হাত, চোখ, মুখ তখন কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষ মরতে চায় না। কিন্তু মৃত্যু দেখলে অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও মানুষ সন্ন্যাসী হয়ে যায়। পৃথিবীর আকর্ষণ হারায়।
এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে ইশিতা, প্রিয়তি, বিপাশা আছে। আছে দীপ্তি নামের পিএস। আরিফ চৌধুরী যার বস। চোখের সামনে লোকটি হারিয়ে গেল। তার সাথেই শেষ দেখা হলো যার। সিলেট যাওয়ার পেনের টিকিট তো সেই বুকিং দিয়েছিলো।
তার মনে হয়, তাহলে কি আরিফ চৌধুরী আকাশে উড়ে আকাশেই হারিয়ে গেলো। আকাশে কে থাকে আরিফের? সেখানে কার জন্য এত মায়া?
অনেক ভিড়ের মধ্যে এই চারজন মেয়েমানুষ। ঈশিতা আর বিপাশা খুঁজছে আরিফকে। প্রিয়তি খুঁজছে হিমাংশুকে। আর দীপ্তি? সেও তো আরিফকে। যে মাত্র তিন দিন আগে হারিয়ে গেলো।
আর যারা আছে তারা পুরুষ। গুম খুন বেড়ে যাওয়া এই শহরে হারিয়ে যাওয়া মানুষের অভাব নেই। অভাব নেই খুঁজতে থাকা মানুষেরও। অভাব আছে শুধু যে হারিয়ে গেছে, তাকে পুনর্বার পাওয়া। কোথায় হারিয়ে যায় এই সব মানুষ?
লাশটি এখন চাদরে ঢাকা। সাদা চাদরে। ফুলে ফেঁপে ওঠা হাত পা পেট বুক চাদর ফুঁড়ে আকাশের দিকে হাঁ করে আছে। একটু বিদঘুটে দেখাচ্ছে। এখন আর তেমন গন্ধ নেই। গন্ধ নিবারণকারী ওষুধ ছিটানো হয়েছে।
মুখটা খোলা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইশিতা।
একি আরিফের লাশ। চোখ আধখোলা। ঘোলা। কপালে কিসের কিসের যেন দাগ। চুল ছোট ছোট। আরিফের মতোই দু-একটা পাকা। আগে তো খেয়াল করা হয়নি। আরিফের চুল কি পেকেছিলো? একটি কানের একপাশে কালো দাগ। অন্য কান একটু ঘা ঘা। মনে হয় কেউ ঠুকরিয়েছে। মাছ কিংবা মানুষ।
দাঁত ঠোঁট দিয়ে ঢাকা। দেখা গেলো না। লাশটার মাথাটা একটু বড় লাগছে। মনে হয় ফুলে এরকম হয়েছে।
এ লাশটি কি আরিফের? সিদ্ধান্ত নিতে পারে না ঈশিতা।
প্রিয়তির কাছে লাশটি একটু বেশিই লম্বা মনে হয়।
হিমাংশু কি এতটা লম্বা ছিলো? পচে গেলে পেট বুকের মতো মানুষও কি লম্বায় বেড়ে যায়? এবার নাকের দিকে চোখ পড়ে। ফুলে নাকের ছিদ্র্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কান হয়েছে হাতির কানের মতো। বোঝার উপায় নেই।
হিমাংশুর মোচ ছিলো… এ লাশের তো নেই। কপালের দাগ তো দেখেনি কখনও। এটাও তো চোখে পড়েনি।
তবে কি ম্রিয়মাণ দাগ এখন পানি পেয়ে স্পষ্ট হয়েছে?
চোখ ঘোলা কেন এত? বিড়ালের চোখের মতো। চোখে কি ঘোলা জল লেগে আছে?
বিপাশাও বিভ্রান্ত। প্রকৃত চেহারা তো এখন পাওয়া যাবে না। চোখ মুখ নাক কান দেখে মানুষ চেনা যায়? চেহারা তো এই সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সমন্বয়। কোন অঙ্গ কোথায় কিভাবে সেট করে মানুষের সৌন্দর্য আঁকেন
বিধাতা.. এটা বিধাতার কারুকাজ। মানুষ এখানে নিতান্ত অসহায়। বিপাশার একবার মনে হয়, যে মানুষটি তিনদিন আগেও ছিলো তার একান্ত সান্নিধ্যে.. তাকে আজ এত দূরের মনে হচ্ছে কেন?
ওরা ধরে নিয়ে গেলো ওকে? কিই বা ছিলো তার অপরাধ? তাই বলে ওরা ওকে মেরে ফেলবে? মেরে ভাসিয়ে দেবে লাশ, বুড়িগঙ্গায়। সিলেটে নদী ছিল না?
সুরমা কুশিয়ারা কত নদী। তারপর এখানে কেন?
তাহলে কি সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে অতিদূর ধলেশ্বরী, তুরাগ অথবা বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে গেল লাশ? অল্প স্রোতে ধলেশ্বরী থেকে লাশ বুড়িগঙ্গায় আসতে কয়দিন লাগে?
আর একজন, দীপ্তি… সে স্যারের ম্যাডামের সাথে অনেকটা বাধ্য হয়েই এসেছে… সে দেখতে চায় না এই ভয়ঙ্কর লাশ। এই লাশ তার স্যার আরিফ চৌধুরীর হতে যাবে কেন?
তার মনে হয়, তার স্যার ঠিক ঠিকই ফিরে আসবে অফিসে। অফিসে ঢুকেই ইন্টারকম টেলিফোনের বাটন টিপবে। বেজে উঠবে শব্দ। বলবে,
– দীপ্তি, কেমন আছ? এম ডি স্যার আসেনি?
– না স্যার। আগামী কাল আসবেন। নানা কারণে দেরি হচ্ছে তার।
– আচ্ছা পেন্ডিং ফাইলগুলো নিয়ে এসো তো। আর করিম মিয়াকে এক কাপ কফি দিতে বলো। ব্যাক কফি।
– ওকে, আসছি স্যার।
– ওকে।
থানার এই সব পরিবেশ ভালো লাগে না দীপ্তির। সে লাশের দিকে না তাকিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে।
লাশ দেখা প্রায় শেষ। কেউ সনাক্ত করতে পারলো না।
এখন ফিরে যাওয়ার পালা।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে একজন বলে উঠলো,
– বুক তিন চাদরটা একটু সরান তো দেখি, কোন চিহ্ন টিহ্ন পাওয়া যায় কিনা? লাশটা হিন্দু না মুসলমানের?
তাও তো বুজতি পারলাম না।
লাশের পাশে একটা ছোকড়া মতো কনস্টেবল দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো,
– খুলতিচি। আপনেরা একটু সরেন।
সে ভিড় ঠেলে বুকের কাছে এলো। বললো, সরেন, সরেন, আমি চাদর উটাচ্চি। ভালো করি দেকি নেন।
এই বলে সে গা থেকে সম্পূর্ণ চাদর আলগা করে ফেলে।
লাশের উদোম চেহারা হাঁ হয়ে যায়। বেরিয়ে যায় বুক পেট, নিতম্ব, শিশ্ন সব কিছু।
আরিফ আর হিমাংশুর লাশ দেখতে আসা এই চারজন মেয়েমানুষ হতভম্ভ হয়ে পড়ে। তারা জীবিত উলঙ্গ পুরুষ অনেক দেখেছে। কিন্তু এই প্রথম পচে ফুলে যাওয়া গলিত মথিত উলঙ্গ পুরুষের লাশ দেখতে পেলো। চোখ ফিরিয়ে নিতে কষ্ট হলো তাদের।