গায়ে তেজ ভর করার পর গঙ্গারামের জীবন নদীতে ভালো লাগার জোয়ার আসে। কিন্তু তাতে কী ময়লা তাকে সাফ করতেই হবে। এটাই কি গঙ্গার দুঃখ? তা না জাতের সুইপার কন্যা মাধু ফুল যৌবনা হয়ে উঠতেই গঙ্গার চোখকে ভেংচি কাটে। মানুষের মধ্যে সব মানুষ কি সুন্দর হয়? হয় না। এটা কি করে বোঝাবে মাধুকে। গঙ্গার শরীরের পেশীগুলো দৃঢ় আর চওড়া। কিন্তু তার চেহারায় নায়ক ভাবটা ছিলো না। সুইপার কলোনীর সবাই তাকে বলতো বড় হলে তুই ভিলেন হবি। আসলে গঙ্গা তো মানুষ। মানুষের আবার জাত। সংসার, সমাজ মানুষকে নায়ক বানায়, ভিলেন বানায়। গঙ্গার আচরণে কখনো ভিলেনী ভাব ছিলো না। তো গঙ্গা বড় হয়ে হাটে ঝাড়– দেবার কাজ পেয়েছিল, তা তার বাপের কারণে। হাট কমিটি নিয়োগ দিয়েছিল-প্রতিদিন ডিউটি। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসলেও দারোয়ানদের সাথে প্রতিদিন হাট জোগাতে হয়। মাসে একটা মাসো হারা আর হাটের দিন দোকান থেকে দু’চার পয়সা হাত পেতে নিতে হয়। কাঁচা বাজার, মাছ বাজার থেকে বাছপড়া কিছু পণ্য গঙ্গার হয়। তাতে করে হাটের দিন বেশ আয় রোজগার হয়। হাটের বড় দোকানি মল্লিক বাবু, আজাহার, সুধীর সবাই তাকে ভালোবেসে টিট্কারি দেয়। খুব মজার মজারকথা বলে। বেশি হাসাহাসি করলে আবার বলে- কিরে মালটাল খেয়েছিস নাকি। না বাবু মাল আমি খাই না, গঙ্গা বলে। শুনে মল্লিক বাবুরা হাহা করে হাসে বলে- মাল খাবি না তো খাবি কিরে। মাল না খেলে জাত থাকে। গঙ্গা লজ্জা লজ্জাভাব করে কেটে পড়ে। এভাবে হাটবার গুলোতে মজা করতে করতে মজার বসন্ত যায়। মাল যে গঙ্গা খায়না তা নয়। কিন্তু স্বীকার করলে হয়তো বাবুরা কে কি বলে তাই এড়িয়ে যায়। মাল খেলেও বাবুদের সামনে খায় না- তার মধ্যেও একটা সততা রাখে। সব কিছুরই একটা ধর্ম থাকে, একটা নিয়ম- ইডা মাইনত্যে হয়। না হল্যে সমাজ থাকে না, ভালোবাসা থাকে না বাবু। তো মাধু মেয়েটা একটু ফর্সা বলে দেমাগ খুব বেশী। গঙ্গার মতো পাড়ার উঠতিগুলো খুব উস্খুস্ করে। এ পাড়ার, ওপাড়ার চারপাঁচ জন নায়ক সাজতে এ পাড়ায় আসে। গঙ্গার হাত নিস্পিস্ করে -শালাদের শুয়ারের মুতন পিটিয়্যা পাড়া ছাড়াত্যে পারল্যে য্যান শান্তি পাতুক। কিন্তু কেন? গঙ্গা ভাবে-মাধুর সুন্দর হাসি তো তার জন্য নয়। তার বাপ-মা ভালো চেহারা, ভালো ঘর, পারলে জাত ভেঙ্গে উঁচু জাতে বিয়ে দিবে। অর্থ কড়ি আছে এমন ছেলেদের দিবে। আর মাধুরও দোষ নাই- কেবল দোষটা শুধু গঙ্গার। তাই গঙ্গা সন্ধ্যায় তাড়ি গেলা ধরে ফেললো। বাপ মরে যাবার পর তার খুব স্বাধীন স্বাধীন মনে হলো। মাল খেতে তার আর ভয় লাগে না। কিন্তু এই স্বাধীনতার মধ্যে কি যেন নাই। শাসন নাই। স্বাধীনতারও একটা শাসন থাকা লাগে। তাই ভরা সন্ধ্যায় মাল খেয়ে এসে, ভেঙ্গে যাওয়া হাটের যত নোংরা, ময়লা ঝোটিয়ে সরাতে থাকে গঙ্গা। হাটের এ মোড় থেকে ও মোড় পর্যন্ত থেমে থেমে সে ঝাঁট দিয়ে যায়। সে যেন থামতেই চায়না। পাহারাদার কালু এসে জিজ্ঞেস করে- কিরে গঙ্গা, তোর আজ হয়্যাছে কি, এত শক্তি পালি কোতি? গঙ্গা একবার দাঁড়িয়ে কালুর দিকে তাকিয়ে বলে-বুঝলি বাবু দুনিয়্যার সব ময়লা যদি ছাপ করত্যে পারতুক তাহল্যে মুনে বড্ড শান্তি পাতুকরে।-দুনিয়ার ময়লা সাফ করল্যেও মানুষের ময়লা সাফ হয়নারে গঙ্গা- কালুর জবাবটা গঙ্গার বুকের মধ্যে কেমুন করে উঠে। ভাবে- সব মানুষের মুনের মধ্যে যে ময়লা আছে, সেড্যা কেহু ঝাঁটা দিয়্যা পরিস্ক্যার করত্যে পারে নারে, যদি মানুষ লিজে না সাফ করে। গঙ্গা ভাবে রাজার হাটটা হাট বারে যেমন কর্যা ভর্যা থাকে, তেমুন যদি রোজ রোজ ভর্যা থাকতোক, তাহল্যে কতই না ভালো হত্যোক।
একদিন হলো তাই, কালু এসে বললো- বুঝলি গঙ্গা এই হাটটা আর হাট থাকছ্যে না। রাজাবাজার হয়্যা যাচ্ছে। মানুষ বাড়্যাছে, দুকান বাড়্যাছে, তাই পৌরসভা এড্যাকে বাজার কর্যা দিছে, এখন থাক্যা রোজই হাট বার হচ্যে। শুনে মনের মধ্যে একটা ভালো লাগা ভর করে গঙ্গারামের। হাটটা ধীরে ধীরে ভরে উঠে পশরায়। একদিকে বেড়িপানের দোকানগুলো বসে, অন্যদিকে মুচি সোলাই, মাছ বাজার, সবজি বাজার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে হবার কারণে হাটটা দ্রুত বাজার হয়ে যায়। শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীরা আর দূরের বাজারে যায় না। তাই দিনে দিনে সবকিছু চমকে চমকে উঠে। ইলেকট্রিকের বাল্ব, গোটা হাট এলাকায় জল- জল করে জলে। নতুন নতুন দোকান হয়। আশেপাশের গায়ের মানুষ বাজারে ছুটে আসে।
আহারে এরই মধ্যে কবে যে মাধুর বিয়ে হয়ে যায়, গঙ্গা খোঁজই রাখে না। শেষমেষ একটা শ্যামলা মেয়ে দেখে বিয়ে করে নেয় গঙ্গা। জাতের শ্যামলা মেয়েরও কি কম খ্যামটা। সবাই বলে- গঙ্গা হল্যো রাজা বাজারের সুইপার। তাই তার দাম অন্যদের চেয়ে বেশী। ফুল্লরা তাই ভক্তি ভরেই রাজী হয়েছিল বিয়েতে। গঙ্গার এ সবই অতীত জীবনের গল্প। সুইপার কলোনীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকদিন পর গঙ্গার সাথে দেখা। ঘাসের উপর উদাস হয়ে বসেছিলো গঙ্গা। মুখে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি। সুইপার কলোনী আর সেই রকম নাই। সেখানেও সবাই যেন আধুনিক হয়ে গেছে, ঘাসে ভরা মাঠে অন্য সবার মতো সুইপারের বাচ্চারা ফুটবল, ক্রিকেট খেলছে। আর গঙ্গারাম বুড়ো সেই সব খেলা- ঝাপসা চোখে দেখছিলো। প্রথম প্রথম আমাকে দেখে চিনতে না পারলেও, মনে করিয়ে দিতে হলো। বললো- ব্যাপারির ছেলে ওসমান না! আপনার সাথে তো গল্প হত্যো বাবু।
আমিও এক পুরাতন খরিদ্দার। ছাত্র জীবন থেকেই বাড়ির বাজারের ভার আমার উপর ছিলো। বাবার অনেক নাম- ডাক থাকায় গঙ্গাও বাপকে চিনতো। তাই বাপের পরিচয় দেওয়ায় তার চোখ ছল্ ছল্ করে উঠলো। তারপর তার অতীতের গল্প শোনা। গঙ্গারাম তার গল্পগুলো যেন ছবির মতো বাক্সে ভরে রেখেছে। একে একে আমাকে শুনিয়ে, আবার যেন বুকের বাক্সে সাজিয়ে রাখলো। আমার সাইকেলটা ঘাসের উপর দাড় করানো ছিল। আমরা পশাপাশি বসেছিলাম ঘাসে বললাম- আপনি কি আর বাজারের দিকে যান?
– না বাবু পারি ন্যা, আমার বউটা আমার নাম কর্যা দোকানিদের কাছে থাক্যা চাহ্যা চিন্ত্যা লিয়্যা আসে। সবাই আমার নাম শুনল্যে দ্যায়। বাজারের দোকানদাররা আমাকে যে কি ভালোবাসে। গঙ্গার চোখ ছল ছল করে। আমি বলি- তোমার জীবনে আর কি, কি চাওয়ার আছে?
– মানুষের কত স্বপ্ন থাকে, চাওয়া থাকে। তেবে বাবু ছোট জাতের ছোট স্বপ্ন। সব মানুষের সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। স্বপ্ন লিয়্যায় মানুষ শ্মশানে যায়, গোরে যায়। সারাজীবন যে ময়লা সাফ কর্যাছি তারপরও কি মানুষের, এই গঙ্গার মুনের ময়লা সাফ হয়! কখনো সাফ হয় না বাবু। দীর্ঘশ্বাস গঙ্গারামের- মানুষের ভালোবাসাড্যা হল্যো আসল। বাজারের দুকানির্যা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়্যাছে, সেড্যাও কি কম পাওনা। এ সময় দেখলাম টলতে টলতে একজন যুবক সামনে এসে দাঁড়ালো। গঙ্গা তাকিয়ে বলে- কিরে হিরু কি চাহাছিস? বুঝলাম যুবকের নাম হিরু। গঙ্গা বলে- আমার জামাই, সালা মাল খাল্যেও টলে না খাল্যেও টলে। হিরু বলে বাবা ই-লোকটা কেডা? -এহল্যো রাজা বাজারের মল্লিক বাবুর ছেল্যা। লেখ্যাপড়া জানা মানুষ।
হিরু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা আদাব দেয়। আমি ইশারায় আদাবের জবাব দিই। হিরু বলে- বাবাকে রাজা বাজারের দোকানীর্যা খুব ভালোবাসে। আমাকে দেখলেই তো বুলে- তোর শশুর গঙ্গারামের খবর কিরে? আমি তো বুলি- বাবু শ্বশুর তো বুড়্যা হাবড়া হয়্যা গেলছে, এই মরল্যো বুল্যা। আমি ধমকে বলি- এভাবে বলতে হয় না হিরু, সে তো তুমার গুরুজন। হিরু বলে- বুল্যাছেন ঠিকই বাবু, গুরুজন বটে। আমি গঙ্গার দিকে দেখলাম-তার বিষণ্ন মুখ, অজানা ভয় শংকা, ক্ষিণ হয়ে আসা শরীর, সাদা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, খুব কস্ট পেল যেন। আমি হিরুর দিকে একটু কঠিনভাবে তাকাতেই সে ইতস্তত করে বলে- শ্বশুর আমাকে কিছু টাকা দিবে বুল্যা বিটির সাতে বিহ্যা দিলো, তো এখনও দ্যায়নি। ক্যানে দ্যায়নি বুলেন? আবার শুননু শশুরের বুকে অসুক বাঁধাছ্যে। তাহল্যে বাবু তুই বোল, আমিই বা কি করবো। এ শশুর লিয়্যা আমার কি লাভ। তেবে হ্যাঁ শ্বশুরের লাশ যখন রাজাবাজারের মধ্যে দিয়্যা শ্মশানে যাবে সেদিন দেখবি, বাজারের সব দুকানদার তার লাশ দেখার লাগ্যা ভিড় লাগ্যা যাবে। লাশ একবার বাজারে নামাবেই নামাবে- এ আমি বুল্যা রাখনু। আমি এবার ধমকের সুরে বললাম- হিরু তুমি এখন যাও। আমি গঙ্গার সাথে কথা বলছি।
ধমক খেয়ে হিরু আবার টলতে টলতে সোজা হলো, তারপর ঘুরে মুখ খিস্তি করে চলে গেল। আমি দেখলাম- গঙ্গার শুষ্ক মুখ যেন মুহূর্তেই উজ্জল হয়ে উঠেছে, মুখের মধ্য ভালোলাগার ছাপ-স্পষ্ট। আমি অবাক হয় তাকিয়ে রইলাম। গঙ্গা বললো-হিরু ছোড়া খারাপ না। অকেতো আমিই যৌতুকের টাকা দিতে চাহালছিনু, দিতে পারিনি। উতো বুলবেই বাবু। তেবে একখান কথা উ কিন্তুক সত্যি বুল্যাছে। আমি মর্যা গেলে বাজারের লোকজন আমাকে থামাবেই, আমার লাশ নামিয়্যা তারা আমাকে শেষ দেখা দেখব্যে। তুই দেখিস, গঙ্গার লাগ্যা সবাই আফসোস কইরব্যে। চোখের পানি ফেলবে, কথা বলতে বলতেগঙ্গার চোখ ছল্ছল্করে উঠলো। আমি আর বসে থাকতে পারলাম না চলে এলাম।
গঙ্গাদের জীবনে এই এত টুকু আশা আর স্বপ্নই বাকি থাকে। আর কিছু চাওয়া পাওয়া থাকে না।
তারপর অনেক দিন পার হয়ে গেল। শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় মগ্ন আমাদের সময়কার খোঁজ কে রাখে। সময় তির তির করে এগিয়ে যায়। হঠাৎ করে কত পরিচিতজনের মৃত্যুর খবর পাই। কিন্তু গঙ্গাদের জীবন মৃত্যুর খবর কে কিভাবে রাখে। বুড়োরা মরে গেলেতো পৃথিবীতে একটা জায়গা ফাঁকা হয়। শোক শোক খেলা শেষে সবাই আবার পূর্ণ নিশ্বাস নিয়ে ভুলে যায় অতীত। এই বাজারের পুরাতন ব্যবসায়ীর অনেকে মরে গেছে। কেউ কেউ বুড়ো হয়ে হয়তো ম্যানেজারি করছে, আবার কারও কারও উত্তরাধিকারীরা দোকানের দখলে নিয়েছে।
একদিন বাজারে কেনাকাঁটা করার সময় হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল গঙ্গার কথা। দোকানদার আলীকে জিজ্ঞেস করলাম- হ্যারে গঙ্গারামের কোন খবরটবর জানিস? আলি দু’পাটি দাঁত বিকশিত করে বললো- সে তো কতদিন আগেই মর্যা গেলছে- আজক্যার কথা।
আমি বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম- এতদিন বাজার করতে আসি কেউতো কোনদিন বললো না। অথবা আমিই কি খোঁজ রেখেছি। জিজ্ঞেস করলাম- গঙ্গার লাশ কি বাজারের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল?
– হ্যাঁ হ্যাঁ বাজারের মধ্যে দিয়্যাই তো লিয়্যা গেলছিল।
– বাজারের কেউ কি তার লাশ দেখতে চেয়েছিল। লাশ নামাতে বলেনি কেউ? আলির মুখটা গম্ভীর হলো, বললো- কেহু কেহু বুললো কার লাশ যায়রে?
লাশের সাতের কে একজুনা বুললো- গঙ্গার লাশ যায়। এ কথা শুন্যা দুচার জন দুকানদার দাঁড়িয়্যা আফসোস করল্যো। কই কেহুতো নামাত্যে বুললো না। আর যে ভিড় ভাট্টার সময়। খরিদ্দার সামলাবে না লাশ দেখব্যে বুলেন। আর সেই সব ব্যবসায়ীর্যা কি আছে। তারাও কেহু কেহু মরত্যে বস্যাছ্যে।
আমি বললাম- তাইতো কারই বা সময় আছে। সবাইতো স্বার্থের হাতে বন্দী। কার স্বপ্ন কি, কার চাওয়া কি, তা কি কেউ খোঁজ রাখে! রাখারই কি দরকার। আমি বাজারের রাস্তার দিকে তাকালাম- দেখলাম হরিবোল- হরিবোল সুরে বাজারের মাঝ রাস্তা হয়ে গঙ্গার লাশ চলে যাচ্ছে শ্মশানের দিকে। সাথে জনা দশেক লোক। কোন দোকানী ফিরে দেখছে না। কেউ তার লাশ নামাতে বলছে না, শুধু তার জামাই হিরু মরা পোড়ানো ঘিয়ের ভাড়টা নিয়ে, টলতে টলতে চলেছে পিছু পিছু। একজন খোল বাজাচ্ছে- বোল হরি হরিবোল সুরে। গঙ্গা শুয়ে আছে কাঁচা বাঁশের মাচায়। শরীরটা চলার ছন্দে ছন্দে নড়ে উঠছে হরিবোল সুরে। গঙ্গার দুই ধারে প্রসারিত করা দুই হাত যেন বলছে- কই তোরা আমাকে নামাবি না, আমার লাশটা দেখবি না? আফসোস করবি না দুফোঁটা চোখের পানি ফেলবি না? তোরা যে আমাকে বড্ড ভালোবাসতিস। আমি যে সারাজীবন তোদের বাজারের ময়লা সাফ করেছি বাবুরা।