
মাসিক কৃত্তিবাস
সম্পাদক : নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ও অন্যান্য
মার্চ ২০১৯
দাম : ৪০ টাকা
আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় এক অনিবার্য নাম। ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ এই মহান কবি বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। তাঁর এই মৃত্যুতে শোকে ভেসেছিল বাংলাদেশের মানুষ। সেই শোকের স্রোত এসে পড়েছিল বাংলা একাডেমির মাসব্যাপি উৎযাপিত বইমেলায়। শোকাগ্রস্ত হৃদয় নিয়ে মেলায় ভিড়ির করেছিল তাঁর পাঠকমহল। বিশেষত, ঐতিহ্যের স্টলে আল মাহমুদ রচনাবলী ক্রয়ের যে জোয়ার বয়ে গেছে তা থেকে বুঝা যায় তার জনপ্রিয়তা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আরো বেড়ে গেছে। তিনি কাল থেকে কালান্তরে প্রবেশ করেছেন। তার মৃত্যুও পরের দিনে প্রকাশিত বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো দেখলেই বুঝা যায় কতটা শোক সামলেছে এই ভাষার মানুষ। কারণ কবি আল মাহমুদ ছিলেন ভাষা সৈনিক ও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আর মৃত্যুও ঘটলো ভাষার মাসেই। এমনকি কবির অন্তরের প্রিয় ইচ্ছা অনুযায়ী শুভ শুক্রবারে। তার এই মৃত্যুর দিনকে হয়তো অনেকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেবেন। তবে একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু; তর্কে বহু দূর।’ যা হোক বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। কারণ একজন কবি তাঁর মৃত্যুর পরে কবিতা ছাড়া আর কি রেখে জান যা দিয়ে হবে তার উচ্চতার বিচার। সুতরাং কবির সমকাল থেকে মহাকালে প্রত্যাবর্তনের বিচার হবে তার কবিতা দিয়ে। কবির ব্যক্তিগত আর্দশ দিয়ে নয়। কারণ অনেক আস্তিক কবি আছেন যারা লিখেছেন তবে একলাইনও মৌলিক কবিতা হয়নি। আবার এমন অনেক নাস্তিক কবি আছেন যাদের মধ্যে কবিত্ব নেই। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী নন বলেই তিনি কবি, এমন প্রচারের চেষ্টা করেন। এসকল চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর আর কতটা অপচেষ্টা তা সময়ই বলে দেয়।
কবি আল মাহমুদ জন্মছিলেন এমন এক সময়ে যখন ব্রিটিশ রাজ ক্ষমতায়। বাঙালি মুসলমান করছে স্বাধীনতার সংগ্রাম। ফলে সেই সময় আমাদের কাব্যের যে ধারা তৈরি হয়েছিল তা দীর্ঘদিন প্রভাব সঞ্চার করেছিল। যা হোক এই স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে জন্ম নিয়ে তিনি দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম, বাঙালি মুসলমানের ভাষার লড়াই, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান পতন। তার কবিতায় এই সকল বিষয় যেমন আছে। আছে নিরেট কবিতা। যেখানে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য স্থান করে নিয়েছেন। কবি আল মাহমুদ হলেন সেই কবি যিনি ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ লিখে লাভ করেছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তার সময়ের অনেক লেখকই এই সম্মান অনেক পরে লাভ করেছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বের হলো তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’। এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে তার স্থান তৈরি করে নিলেন। এবং তিনি নিজেকে অতিক্রম করার চেষ্টায় ফিরে এলেন ক্রমান্বয়ে তার নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে এবং ঐতিহ্যের দিকে। তার কবিতার উপাদান হয়ে উঠলো বখতিয়ায়ের ঘোড়া। তার নায়ক হলেন বখতিয়ার। এই যে নিজ ঐতিহ্য নিয়ে আসলেন এতে করে কিছু অসমালোচক আল মাহমুদকে নিয়ে অপপ্রচার শুরু করেদিলেন যে, আল মাহমুদ আর কবি নেই, তিনি এখন মৌলবাদী। ভাবখানা এমন যে, আল মাহমুদ তার ধর্মীয় বিশ্বাসে ফিরে এসেছেন, ফলে তার কবিত্ব শক্তি চলে গেছে। এই সব অপ্রচার যারা করতেন, তারা বোধ হয় এটা জানেন না যে তারাশঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায় পুজা করে লিখতে বসতেন। সে যায় হোক। কবি আল মাহমুদের মৃত্যুর পরপরই পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা কৃত্তিবাস যে সংখ্যাটি প্রকাশ করেছেন, তার জন্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখেন। এতে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন কবি ও লেখক কবি আল মাহমুদের কবিতা বিষয়ে তাদের আলোচনা তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : জ্যোর্তিময় দত্ত, সুবোধ সরকার, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তম দত্ত, জাহানার পারভীন, দেবশঙ্কর হালদার, চণ্ডী মুখোপাধ্যায়, সুমন গুণ, রাহুল দাশগুপ্ত, ঋতম মুখোপাধ্যায়, দেবকুমার সোম, হিন্দোল ভট্টাচার্য, বল্লারী সেন, পাবলো শাহি, বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়, বেবী সাউ, রূপক চক্রবর্তী, সুজিত সরকার, স্বাগতা দাশগুপ্ত। এছাড়া আরো আছে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সাহিত্য- সমালোচক শিবনারায়ণ রায়, কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত, কবি উৎপলকুমার বসু, সাহিত্য সমালোচক তারাপদ রায় ও সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এর অলোচনা। সংযুক্ত আছে বিশিষ্ট সাংবাদিক নাসির আলি মামুন, কবি পিয়াস মজিদ ও রাজীর নুরের নেয়া সাক্ষাতকার। কবি জ্যোর্তিময় দত্তের আলোচনার প্রথম অংশ পড়ে মনে হয় তিনি ভাসা ভাসা ভাবনা থেকে লেখাটা শুরু করেছিলেন। তবে পরের দিকে তিনি আল মাহমুদকে মূল্যায়ণে যথেষ্ট সততার পরিচয় দিয়েছেন। তার মন্তব্য শোনা যাক :
পঞ্চাশের দশকে যাঁরা বাংলাদেশের কবিতা বদলে দিচ্ছিলেন, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক তাঁদের এক-একজনের প্রতিভা এক-এক রকম। এঁদের মধ্যে আল মাহমুদ ছিলেন সবচেয়ে ইন্দ্রিয়ময়। রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন একলাটি, কিন্তু পরবর্তীরা ঝাঁক বেঁধে এসেছিলেন। এঁদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের পরে আল মাহমুদ হয়তো সবচেয়ে ইন্দ্রিয়ময়।
কবি সুবোধ সরকার তার আলোচনায় যে ভাবে আল মাহমুদকে উপস্থাপন করলেন তা তার কবি সুলভ আচরণ স্পষ্ট। তবে হঠাৎ করেই তিনি কোরআন বিষয়ে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠার চেষ্টা করলেন। এবং কবিতা আর কোরআনের মধ্যে একটা বিরোধী মনোভাব দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন। ‘চারজনের প্রেম’ কবিতাটি প্রসঙ্গে তার সেই মন্তব্যটি শোনা যাক :
কোরান এই কবিতা মেনে নিতে পারবে না। প্রেমের কবিতা, এই অজু হাত কোনো মৌলবাদী শুনবে না।
তার এই কোরান বিশেষজ্ঞ মনোভাব তার সততাকে খাটো বৈ বড় করে তুলেনি। কবি উত্তম দত্ত আল মাহমুদের কবিতার বিশ্লেষণে অনেক খেটেছেন তা তার আলোচনা থেকেই অনুমান করা যায়। এবং তিনি কবি আল মাহমুদকে তার কবিতা দিয়ে মূল্যায়ণের চেষ্টা করেছেন। অন্যদের মত অপ্রাসঙ্গিকভাবে কবিতা বাদ দিয়ে কবির বিশ্বাস নিয়ে টানাহেছড়া করেন নি। কবি আল মাহমুদ বিষয়ে তার মন্তব্য স্মরণীয় :
আল মাহমুদের এই বই (সোনালি কাবিন) এবং অন্যান্য কবিতাগ্রন্থ পড়ে আমার মনে হয়েছে, জীবনানন্দ এবং জসীমউদ্দীনের মধ্যবর্তী যে কাব্যভুবন তিনি নির্মাণ করেছিলেন সেখানে মননের চাইতে হৃদয়-ধর্মই বড়ো। তাঁর কবিতার ভাষা কোনো অর্থেই দুরূহ বা দুর্বোধ্য নয়, বরং নাগরিক দূষণ-মুক্ত এক স্বচ্ছ ও সরল শোণিত-প্রবাহ তাঁর সিংহভাগ কবিতার প্রাণ। খুব অবলীলায় তিনি পাঠকের হৃদয় ও আত্মার সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তুলতে পারেন।
এই সকল আলোচনার মাঝে সবচেয়ে আশ্চর্য জনক তথ্য পরিবেশন করেন জনৈক লেখিকা জাহানারা পারভীন। তার প্রবন্ধ পড়ে মনে হলো তিনি আল মাহমুদকে খুব সামান্যই পড়েছেন। আমরা যারা আল মাহমুদের কবিতার পাঠক আছি, পড়েছি তার কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, আমরা যা কখনো পেলাম না। তেমনি একটি তথ্য পরিবেশন করলেন তিনি। এটা তার সততাকে তো প্রশ্নবিদ্ধ করেই। পাশাপাশি এটাও বুঝায় তিনি বাম-মৌলবাদী চিন্তায় আক্রান্ত। এই সকল ইজমের ভূত মাথায় রেখে একজন বড় কবিকে বিশ্লেষণ করা খুব কঠিন। আর তার সাথে ভুল তথ্য দিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করা সে তো মারাত্মক মানবতাবাদী অপরাধ। তিনি সকলের বিদ্যাকে ঠুলি লাগিয়ে মনমত রচনা করলেন এই মহা মিথ্যা লাইন : ‘সোনালি কাবিন’ লেখা হাতে লিখলেন গোলাম আযমের জীবনী।’ তার এই মিথ্যা তথ্যের জন্য নিন্দা জানায়। এবং আহ্বান জানায় ভালো ভাবে আল মাহমুদকে পড়ুন। তারপর একজন লেখকের মত মন্তব্য করুন। কোন রাজনীতি তাড়িত ব্যক্তির মত নয়।
সামগ্রিক দৃষ্টিতে এত দ্রুততার সাথে এমন একটি সংখ্যা প্রকাশ অনেক কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। তবে সম্পাদনা পরিষদ একটু সচেতনতার পরিচয় দিলে এত বড়ো ভুল তথ্য পরিবেশিত হত না। তাদের এই সুন্দর কাজটা সামান্য কারণে পাঠকের কাছে বির্তকের বিষয় হয়ে উঠলো। তবে যে যার মত উড়া তথ্য দিয়ে আল মাহমুদকে বিশ্লেষণ করলেও, এই সব কিছুতে আল মাহমুদের কবিতার কিছুই যায় আসে না। আল মাহমুদকে তার কবিতায় ‘কবি আল মাহমুদ’ করে বাঁচিয়ে রাখবে বাংলা সাহিত্যে। নিয়ে যাবে কাল থেকে কালান্তরে।