কৌতুক করে বলা হয়ে থাকে- ‘কারো বুঝ, কারো তরমুজ’! কৌতুক করে হলেও কথাটা কৃত্রিম কিংবা কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখার মতো নয়। কেননা, জীবনে কখনো কখনো এমন সব ঘটনা ঘটে, যেসবের পেছনে কারণ খুঁজতে গেলে অকারণে সময়ের অপচয়ই হবে, কিন্তু কৌতুক খুঁজতে গেলে যৌতুক ছাড়াই তা পাওয়া যাবে। মনে পড়ে চাকরিকালীন সময়ের একটি ঘটনা। তখন আমার চাকরির বয়স দেড় যুগ পেরিয়ে গেছে। আর ঘটনার চটুল চরিত্র আবুল কালামের এক বছর। আবুল কালামের গ্রামের বাড়ি মিরসরাই উপজেলায়। আমারও। ফলে আবুল কালাম তার যে কোনো আবদার-অনুরোধ নিয়ে প্রথমেই যার কাছে আসা সবচেয়ে সহজ ও সুবিধাজনক মনে করতো, সে ছিলাম আমি। দারোয়ান হলে যে গোপ ও গাম্ভীর্য থাকার কথা, তা কালামের মধ্যে ছিলো না। তার চেয়ে কমিক চরিত্রের উপাদান ছিলো উল্লেখ করার মতো। একদিনের ঘটনা। হন্তদন্ত হয়ে আমার টেবিলের সামনে এসে সে বললো – ‘স্যার, শুনেছি আপনি নাকি কবিতা লিখেন?’
– তা কবিতা দিয়ে তোমার কি কাজ?
– কাজ আছে স্যার, আছে। আছে বলেই তো আপনার কাছে এসেছি।
– কালামের ত্বরিত জবাব।
– তা, কাজটা কী?
– একটা সমস্যায় পড়েছি স্যার, মহাসমস্যায়।
– মহাসমস্যাটা কী, খুলে বলবে তো!
– সমস্যাটা হলো, চট্টগ্রাম শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়ান হাট মোড়। মানুষ, গাড়ি-ঘোড়ায় গিজগিজ থাকে সারাক্ষণ। অথচ সেখানে কোনো পাবলিক টয়লেট নেই। আপনি কবি মানুষ। সমস্যাটা নিয়ে যদি পত্রিকায় কিছু লিখেন, বড়ো উপকৃত হই।
কালামের কথা শুনে আমি কাঁদবো না হাসবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কেননা, কবিতা লেখার সাথে টয়লেট সমস্যা নিয়ে লেখার কী সম্পর্ক! তবে হ্যাঁ, কবিতার সাথে সমস্যাটার সম্পর্ক না থাকতে পারে, কিন্তু জীবনের সাথে নেই, সে কথা বললে লোকে পাবনার রোগী বলে সন্দেহ করবে। সন্দেহ করবে; কেননা, জীবন কখনো কখনো কবিতাময় হলেও, কবিতা কখনো জীবন নয়। জীবন তো জীবনের মতোই জটিল ও বাস্তব, কবিতার মতো কাল্পনিক নয়। কবিতার সমস্যা আর জীবনের সমস্যা যদি এক হতো, তাহলে প্লেটো কবিদেরকে নির্বাসনে পাঠাবার প্রস্তাব করতেন না।
কালাম যে সমস্যাটার কথা বয়ান করেছে, সে সমস্যাটা যে সাড়ে সাংঘাতিক, সন্দেহ নেই। কালাম ও কালামের মতো যাত্রীরা তা হরহামেশা টের পায়। একে তো লক্কড়ঝক্কড় মার্কা লোকাল বাস, তার ওপর লোকজনের চাপ, তার ওপর আবার নাস্তা খেয়ে লোড হওয়া পেটের ভেতর থেকে নিম্নচাপ, কি ভয়াবহ ব্যাপার বাপরে বাপ, টের না পেয়ে কি উপায় আছে! চারিদিক থেকে এত চাপের পরও কি চেপে রাখা যায়, কিংবা চুপ থাকা যায়? যায় না যে, সেটাই সবচেয়ে বড় সত্য। আমরা তো সবসময় ত্যাগের কথা বলি। কিন্তু সেই ত্যাগ কি মুখের সত্য, নাকি মনের সত্য, বোঝা বড় মুশকিল। ত্যাগের কথা বলে বলে মুখে তুফান তুললেও আমাদের ত্যাগ যে শেষাবধি টয়লেট পর্যন্ত, তা বুঝতে বোধ করি কারো অসুবিধা হয় না। তবে এই ত্যাগ মহামূল্যবান না হলেও, যে মহাময়লাময় ও মহাদুর্গন্ধময়, তা মানুষ মাত্রই বোঝে। তারপরও মানুষ কোনো কিছুর ‘পরিণতি’র কথা যতটা না চিন্তা করে, তার চেয়ে বেশি ‘প্রাপ্তির’ জন্য পাগল হয়ে ওঠে। কেবল খাই খাই, নাই নাই, আরো চাই, আরো চাই। দোজখের চাহিদা যেন।
অথচ পরিণতি তো এই –
যে খানার জন্য
মানুষ এত দিওয়ানা,
সেই খানাই কি না,
পেটে প্রবেশের পর
হয়ে যায় পায়খানা!
এই খানা আর পায়খানার পার্থক্য যদি মানুষ বুঝতো, পচা পরিণতির কথা চিন্তা করতো, তাহলে চাহিদার সর্বগ্রাসী থাবার কাছে নিজেকে ছেড়ে দিতো না, কেবল নিজের ন্যূনতম প্রয়োজন- এর প্রাপ্তিতেই খুশি থাকতো এবং লোভের লাগাম টেনে ধরতো।
কালাম অবশ্য ঐরকম স্বভাবের ছিলো না। নিজের সামান্যতেই সন্তুষ্ট ছিলো। লেখাপড়া ঠেলে ঠুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত হলেও সে ছিলো যেমনি জিনিয়াস, তেমনি একখান জিনিস। সে দারোয়ান ছিলো ঠিকই, কিন্তু দায়িত্ববান ছিলো। অফিসে কখনো লেট লতিফ ছিলো না। সে কবিতা না বুঝলেও কবিতাকে ভালোভাবেই বুঝতো। সপ্তাহের ছুটির সময় এলে কবিতার জন্য কাতর হয়ে পড়তো। কতক্ষণে কর্মস্থল থেকে বিদায় নিয়ে বাস ধরবে, কবিতার কাছে যাবে, সে চিন্তায় অধীর হয়ে থাকতো। বাড়িতে গেলেই কেবল কবিতা কবিতা। মুরব্বিরা তার কাণ্ড দেখে বলতো কবিতা-পাগল। কবিতাও এসব দেখে লজ্জাবতী লতা হয়ে যেতো। এই কবিতা কিন্তু আর কিছু নয়, কেউ নয়, তার বিয়ে করা একমাত্র বউয়ের নাম। যেন বউ নয়, সাধের লাউ।
সে সময় সপ্তাহে দু’দিন ছুটি ছিলো না। ছিলো – বৃহস্পতিবার হাফ, শুক্রবার মাফ। শনিবার এলে মোরগ ডাকা ভোরে বাস ধরতে হতো কালামকে। কালাম উঠতো মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থেকে। তখন এখনকার মতো এত ঘন ঘন বাস ছিলো না। তদুপরি যাত্রীর তুলনায় বাসের সংখ্যা ছিলো স্বল্প। ফলে কোনো স্টপেজে বাস দাঁড়ালে কার আগে কে উঠবে এমন একটা প্রতিযোগিতা ছিলো প্রাত্যহিক ব্যাপার। একেতো লোকাল বাস, তার ওপর লক্কড়ঝক্কড় মার্কা; যাকে মজা করে মানুষেরা মুড়ির টিনও বলে, তার ওপর যে কোনো জায়গায় থামে এবং যাত্রী নেয়, সবার ওপর বাসে ওঠার ভয়ানক প্রতিযোগিতা, সব মিলিয়ে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব যেন। উঠলেই যে সিট পাওয়া যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সিট পাওয়া ছিলো রীতিমতো সৌভাগ্যের ব্যাপার। সিট না পেলেও না উঠে উপায় নেই। কারণ নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছতে না পারলে বিনা নোটিশে চাকরি নট। কালামের চেয়ে সেটা কে বেশি বোঝে! কিন্তু বুঝলে কী হবে? বাসে ওঠে বসার সিট পাওয়া দূরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকাটাও দুরূহ। চারিদিক থেকে শুধু চাপ আর চাপ। চাপের চোটে চ্যাপটা হওয়ার পালা। যাদের ভরা পেট, তাদের ভর্তা হবার অবস্থা। যাদের পেট খারাপ, তাদের অবস্থা তো জোলাপ। যারা লুজ মোশানের রোগী, তাদের অবস্থা কেবল খারাপই নয়, খবরও হয়ে যায় কাপড়ে-চোপড়ে। কেননা ঐ অবস্থায় গেট বাল্ব ফ্রি হয়ে যায় কি না তাই! তদুপরি পকেটমারের ভয়। চাপের ঝামেলা যত বেশি, পকেটমারের তত পোয়াবারো। এতসব চাপ, চোরের ভয়ের মধ্যে কবিতা কেন, ববিতাকেও কি ভালো লাগবে? কালাম কবিতা লেখার সাথে টয়লেট সমস্যার কি কারণ খুঁজে পেয়েছিলো জানি না, তবে চট্টগ্রাম শহরে টয়লেট সমস্যা যে একটি বড় রকমের সমস্যা, সেটা অস্বীকার করার জো নেই। যারা বাইর থেকে জার্নি করে এসে শহরের প্রবেশপথ দেওয়ান হাট মোড় বা শহরের ঐরকম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নামেন, তারা স্বশরীরে বুঝতে পারেন সমস্যাটা কত গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনেও সমস্যাটির প্রতিচ্ছবি প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রতিবেদনটি বহু বছর পরের হলেও তার প্রাসঙ্গিকতা পথ হারায়নি। ‘৬০ লাখ মানুষ, গণশৌচাগার ৩৮টি!’ শিরোনামের উক্ত প্রতিবেদনের একস্থানে লেখা হয়েছে, ‘নগরের (চট্টগ্রাম) ৪১টি ওয়ার্ডে ৬০ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ পুরো শহরে গণশৌচাগার রয়েছে মাত্র ৪৩টি। এর মধ্যে আবার ৩টি বন্ধ। একটি ভেঙে সংস্কার করা হচ্ছে। সচল আছে ৩৯টি। অর্থাৎ প্রতি ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৬ জন নগরবাসীর জন্য গড়ে গণশৌচাগার রয়েছে মাত্র একটি। এর বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরিসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন নগরে ৫ থেকে ৭ লাখ লোক আসে।’ (প্রথম আলো, ৩১ অক্টোবর ২০১৭)
কবিতা লেখা আর টয়লেট সমস্যা নিয়ে লেখা যে এক জিনিস নয়, সেটা কালাম যেমন বোঝেনি, তেমনি আরো অনেকেই বোঝে না। দেশে অনেক কিছুর অভাব থাকলেও এরকম অবুঝের অভাব নেই। এরকম একটি স্মৃতির কথা মনে পড়ছে এ মুহূর্তে। সেদিনটা ছিলো ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর। সেদিন বিকেলে চট্টগ্রামের সিআরবির শিরিষতলায় রোহিঙ্গাবিষয়ক কবিতা পাঠের আসর বসেছিলো। রেঙ্গুনের রক্তলোলুপ জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের রক্ত দিয়ে যে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলো, তারই প্রতিবাদে ছিলো ঐ কবিতা পাঠের আসর। শুধু প্রতিবাদই নয়, রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মিতা ও সমর্থন জানানোও ছিলো আয়োজনের উদ্দেশ্য। মাইকের ব্যবস্থাও ছিলো। কালধারা আয়োজিত সেই কবিতা পাঠের আসরে কবিরা একের পর এক কবিতা পাঠ করে যাচ্ছিলেন। একসময় আসে আমার কবিতা পাঠের পালা। সেই মানবিক মুহূর্তও যে কিভাবে মশকরায় পর্যবসিত হয়ে যায়, তা দেখে আমি কিছু মুহূর্তের জন্য যুগপৎ বিস্মিত ও বিমূঢ় হয়ে যাই! খুলে বলি, আমি আবৃত্তি আরম্ভ করেছিলাম। আস্তে আস্তে আমার আওয়াজ ও আবেগ একে অপরকে আলিঙ্গন করে যখন অগ্রসর হচ্ছিলো, তখন এক বেরসিক বাদাম বিক্রেতা আমার সামনে এসে বুলন্দ আওয়াজে বলতে থাকলো বাদাম বাদাম! বার বার তার এমন হাঁকডাকের কারণে কিছুতেই আমি কবিতা পড়তে পারছিলাম না। বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলাম। বাদামওয়ালার তাতে কোনো ভ্রক্ষেপ বা ভয় নেই। তার কাছে কবিতার কানাকড়ি দাম নেই। তার কাছে দাম মানে বাদাম। এককথায় বাদাম বেচা, বাকি সব মিছা। যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ। দেখলাম বেরসিক কেবল বাদম বিক্রেতাই নয়, উপস্থিত কবিরা বাদে বেবাকই ছিলো উদাসীনতার উজ্জ্বল উদাহরণ। যেমন যেখানে কবিতা পড়ছিলাম, তার সামনের মাঠে কেউ কেউ ফুটবল খেলছে, কেউ কেউ ক্রিকেট খেলছে, কেউ কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ কেউ পান-বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করছে, কেউ কেউ গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ কেউ খয়রাত করছে, কেউ কেউ মাঠের চারিদিকে সাইকেল চালাচ্ছে। তাদের কারো মধ্যে কবিতা নিয়ে কোনো কদর কিংবা কৌতূহল দেখা গেলো না। প্রত্যেকে নিজেকে নিয়েই ন্যস্ত এবং ব্যস্ত। যেসব প্রেমিক জুটি পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে পাখির মতো স্বপ্নের দেশে উড়াল দিচ্ছিলো, রচনা করছিলো কাব্যিক পরিবেশ, আমাদের কবিতা পাঠ তাদের ওপরও কোনো আকর্ষণ সৃষ্টি কিংবা আছর করছে বলে মনে হলো না। মনে হলো, আসহাবে কাহাফের ঘটনার মতো আমরাও বুঝি এখানে বেগানা। বাইরের কথা বাদ দিলাম, নিজ বাসগৃহেও কি কবিরা বেগানা কম! পরিবারের প্রত্যেকেই কবি নামের গৃহকর্তাকে প্রকাশ্যে না হোক, মনে মনে পাগল ভাবে। কবির কাব্যগ্রন্থ পড়া তো পরের কথা, কোনো দিন খুলেও দেখে না ভুলে। উল্টো তা দিয়ে পানির গ্লাস ঢাকে, যাতে তাতে মাছি এসে না পড়ে। হায়রে, মাছির ভয়ে সতর্ক থাকলে, মৌমাছির মহব্বতে একবারও মজলে না! পানির গ্লাস ঢাকার জন্য আর কিছু বুঝি পেলে না! তাদের এক যুক্তি – আবেগ দিয়ে কি পিপাসা মিটবে বা পেট ভরবে? তাদের কাছে আবেগের চেয়ে বেগের প্রাধান্যই বেশি- মানি বেগের। একবার এক কবির জন্মদিন উপলক্ষে কবির সহধর্মিণীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন এক সাংবাদিক। কবির সহধর্মিণীকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনার স্বামীর কোনো বইটি আপনার বেশি পছন্দ? কোনোরকম চিন্তা না করে তার ত্বরিত জবাব চেক বই! এই হলো অবস্থা। এটাকে অবস্থা না বলে বস্তা বলাই বেহতের। ভাবের বোঝা আর ভবের বোঝা (সংসারের বোঝা) বইতে বইতে কবির অবস্থা গাধার মতো। সে জন্যই বুঝি কে যেন কৌতুক করে বলেছিলেন গাধারাই বিয়ে করে। গাধা হয়েও গুনাহ মাফ নেই। স্বামী মানেই তো আসামি। কবি হলে তো কথাই নেই। গৃহিণী গোয়েন্দা নজরে দেখে। কারণটা আর কিছু নয়, কবিতার ভেতরের ‘তুমি’। এই ‘তুমি’টা কে? কবি তলে তলে অন্য তালে নেই তো? বিবি যদি বেতালের হন, তাহলে বিপদের বালাই নেই। কথায় আছে না, ইস্ত্রি ও স্ত্রী গরম হলে রক্ষা নেই ; ইস্ত্রি গরম হলে জামা সোজা হয়ে যায়, স্ত্রী গরম হলে জামাই সোজা হয়ে যায়।
কবিতার সাথে যাদের কানেকশন নেই, কিংবা যারা কাব্যকলা ও আঁইট্টাকলার তফাত বোঝে না, কেবল তাদের ওপর দোষ চাপিয়ে লাভ কী? যারা নিজেদেরকে কবি বলে দাবি করে, তারা কতটুকু কবি? কবি বলে তাদের দাবি যদি মেনেও নিই, আঙ্গিকের অথবা অনুভূতির দিক থেকে আধুনিক কবিতার পর্যায়ে পড়ে কি? কোনো পাঁচতারকা হোটেলে যদি গ্রামের গলির হোটেলের পচা, বাসি খাবার পরিবেশন করা হয়, তাহলে কোনো আধুনিক রুচির কাস্টমার কি সেই খাবার খাবে? বর্তমান যুগটা হলো আধুনিক যুগ। বাংলা ভাষাও আধুনিকতাকে আলিঙ্গন করেছে সেই কবে। পাঁচশত বছর পূর্বের প্রাচীন ঢংয়ে কবিতা লিখে যদি আধুনিক কালের পাঠকের সামনে পরিবেশন করা হয়, তারাও কি সেই কবিতা পড়বে? অধিকাংশ কবিতায় (?) ‘আমি’ ‘তুমি’ ‘চাঁদ’ ‘ফুল’ ‘নারী’ ছাড়া কিছুই নেই। অপরদিকে আধুনিক কবিতার নামে যেসব লেখা হচ্ছে, তাতে মনে হবে সব কবিতা বুঝি একজনই লিখেছেন।
ফেসবুকের কল্যাণে এখন অসংখ্য কবির দেখা মেলে। পত্র-পত্রিকায়ও প্রচুর। বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায়ও কবি যশপ্রার্থীদের পদচারণা। একটা কবিতা পড়তে ওঠে দশটা পড়ে ছাড়েন। কবি আর কারে কয়! প্রতিভা প্রদর্শন করতে হবে না! মোলারা দাওয়াত-পাগল বলে যে একটা বদনাম আছে, হাল আমলের বেহাল কবিরা বুঝি তার চেয়েও বেশি। শহরের কোথায় কোথায় সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হবে, তার খোঁজ তারা রোজ রাখে। দাওয়াত না পেলেও দলবল নিয়ে হাজির। তারপর সেখানে ছবি তুলে ফেসবুকে ছেড়ে দিলেই হলো, তাদের কবিখ্যাতি রুখে কে? এরা কে কতটুকু কবি, তার চেয়েও বেশি এরা বোঝে ছবি। এরকম একজনের কাবিলগিরি দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম: কবিতা লিখো, নিশ্চয়ই বুদ্ধদেবের নাম শুনেছো?
: গৌতম বুদ্ধের নাম শুনবো না, তা কি কখনো হয়? পৃথিবীতে তাঁর অসংখ্য অনুসারী আছে।
: আরে গৌতম বুদ্ধ নয়, ‘কবিতা’র বুদ্ধ। কবি দাবি করো, বুদ্ধদেব বসুর নাম শোনো নি?
: কি করতেন তিনি?
: কেন জানো না, তিনি ‘কবিতা’ নামের একটি বিখ্যাত কাগজ সম্পাদনা করতেন, কবিতা লিখতেন, গল্প-উপন্যাস ও নাটক লিখতেন, সাহিত্য-সমালোচনামূলক প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখতেন এবং আরো কত কিছু লিখতেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
: ও, তাই নাকি! – এই ছিলো সেই কবিযশপ্রার্থীর জবাব, যে জবাব শুনে হয়ে যাই আমি লাজবাব।
কলেজে যখন নলেজ আহরণের জন্য অধ্যয়ন করতাম, বন্ধুরা একে অপরকে মশকরা করে বলতো- নায়ক নায়ক ভাব, নায়িকার অভাব। হাল আমলের কবিযশপ্রার্থীদের দেখেও কি বলা যায় না – কবি কবি ভাব, কবিতার অভাব? অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে, কবির সংখ্যা বুঝি কাককেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু কবিতা!
কবিতা এখন কই?
যার কাছে গাই গরু নাই
সে বেছে দই!
অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে – কবি হওয়া বুঝি সহজ কাজ! বাবুইয়ের বুনন নেই, কাকের বাসার মতো কিছু একটা দাঁড় করালেই হলো, কেল্লা ফতে।
চাও কবি হতে
ভয়-ভাবনা কি তাতে
কেবল কিছু তরিকা এস্তেমাল করা চাই
তা ছাড়া চিন্তার কোনো কারণ নাই
প্রথমে যা করতে হবে
খোঁচা খোঁচা দাড়ি রাখতে হবে
কাউকে খোঁচা দেওয়ায় জন্য নয় তবে
খোঁচা খোঁচা দাড়িতে কবি কবি লাগে বলে
মাথায় সাবান-শ্যাম্পু মাখা বাদ দিতে হবে
যাতে চুলগুলোকে উসকো খুসকো লাগে
পাজামা পাঞ্জাবি থাকা চাই প্রতিদিন পরনে
হাঁটা চাই ধীরে ধীরে কাঁধে চটের ব্যাগ ঝুলিয়ে
হবে না মন্দ চোখে প্রাচীন ধাঁচের চশমা হলে
চলায় বলায় উদাসীন উদাসীন হতে হবে
কেউ কিছু বললে যেতে হবে ভুলে
বাস করতে হবে ভুলের ভূগোলে
হবে যত ভুল
ওয়ান্ডারফুল ওয়ান্ডারফুল
তুমি ভুলে গেলেও কেউ যাবে না ভুলে
যদি মনে হয় ফ্যাশনটা গেছে পুরনো হয়ে
গাছে উঠতে হবে না আরো তরিকা আছে
শহরে আড্ডার কিছু জায়গা আছে
সেসব আড্ডায় নিয়মিত যাবে
গেলে দেখবে সহজে পেয়ে যাবে
তোমার তরিকার কিছু স্বপ্নবাজ
খেয়ে দেয়ে যাদের নেই কোনো কাজ
বসে থাকে কবি হওয়ার সহজ সাধনায়
তাদের সাথে আড্ডা যখন দেবে
নিজেকে তোমার কবি কবি মনে হবে
কে কি মনে করে কি যায় এসে তাতে
এতেই থাকলে বসে চলবে না
দৈনিকের যত সাহিত্য সম্পাদক আছে
তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে
তারা যদি পেছনের সারির পদ্যকারও হয়
সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়ে
খ্যাতির আশায় খাতির জমাতে হবে
প্রয়োজনে ছাতিও ধরতে হবে
মাঝে মাঝে কবিতা সন্ধ্যার করে আয়োজন
করতে হবে তাদেরকে আসার আমন্ত্রণ
বসাতে হবে প্রধান অতিথির চেয়ারে
যেতে হবে তারিফের পর তারিফ করে
জান তো তারিফ হলো একপ্রকার তৈল
যা মর্দন করলে খুশি হয় না কে আছে
তার ফজিলতও তুমি পাবে
স্বপ্নে নয় একেবারে হাতেনাতে
ছাপাবার জন্য তার কাগজে
কবিতা না হয়ে যদি হয়ও কিছু আজেবাজে
কিংবা ভিন দেশি কারো কবিতা থেকে মেরে
সোজা দাও পাঠিয়ে তার বরাবরে
কাজ হবেই হবে
সপ্তাহ শেষে দেখবে
বেরিয়ে গেছে তা ছাপার অক্ষরে
তারপর যে কাজটি করতে হবে
তরিকার যত ভাইবোন আছে
দূরের কি কাছে
সবাই মিলে খাছ দিলে
গড়ে তুলতে হবে
বিভিন্ন নামে সাহিত্য সংগঠন
হোক না কাজের বেলায় ঠন ঠন
তবুও তো সংগঠন
গড়ে তুলে পড়ে থাকলে চলবে না
পদক-পুরস্কারেরও প্রবর্তন করতে হবে
প্রবর্তনটা হওয়া চাই প্রসিদ্ধ ব্যক্তির নামে
এমন সব প্রসিদ্ধ ব্যক্তির নামে
যাদেরকে চেনে মানুষ নামে নয় কামে
তারপর ঘরের জিনিস পরের কাছে কেন যাবে
নিজেরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে
রবি ঠাকুরের ভাষায় বলতে গেলে-
‘দেবে আর নেবে, মেলাবে মিলিবে’
দেখবে তারপর যা হবে
তোমার কবিখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে যাবে
‘বুকার’ পুরস্কার যদি না-ই মেলে
বোকার পুরস্কার আছে না
চাও যদি বেকার হবে
নিজেই আসবে চলে তোমার পদতলে
নোবেল পুরস্কার কে না চায়
সবাই কি তা পায়
‘নোবেল’ যদি বলে ‘নো’
দুঃখ বা আফসোস নেই কোনো
‘নো’ হয়েছে কি হয়েছে
‘বেল’ তো বহাল আছে
জেনে নিও জিনিয়াসদের কাছে
বেলের শরবতের কি উপকার আছে
ভাবতে ভাবতে বেলমাথা যাদের
তারা তো পেলে তা খুশিতে নাচে
এর চেয়ে বেশি ভেবে কি কাজ
কবি না হলেও হবে কবিরাজ
বাকি বেবাক কিছু বকওয়াজ।