তিনি ছিলেন এক নিভৃতচারী কবি। ভদ্র, সুশিক্ষিত, বিনয়ী, নিরহংকার, সদালাপী, দরদী মানুষ। এভাবে আরও অনেক বিশেষণ যোগ করেও তাঁর যথার্থ পরিচয় তুলে ধরা হয়তো সম্ভব নয়। তাই সে চেষ্টা আমি করবো না। তাঁর সঙ্গে যারা ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত হবেন। অরণ্যের অসংখ্য বৃক্ষরাজির মধ্যে দেবদারু বৃক্ষ যেমন সব বৃক্ষকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, সমাজের জনারণ্যে তিনি ছিলেন তেমনি এক সুউচ্চ মহীরুহশ্যামল, সৌম্য, প্রশান্ত ছায়াদার এক সুউচ্চ বৃক্ষ। তাঁর নাম আবদুর রশিদ খান। মানবীয় মহৎ গুণাবলীতে ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ এক উদারপ্রাণ মানুষ। তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি একজন কবি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অন্যতম প্রধান কবি।
পঞ্চাশের দশকের খ্যাতিমান কবি আবদুর রশিদ খানের জন্ম ১৯২৪ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুর শহরের পার্শ্ববর্তী পশ্চিম জাফরাবাদ গ্রামে। স্থানীয় রঘুনাথপুর প্রাইমারি স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। পরে পুদকালিন্দিয়া এম.ই. স্কুল, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, জামুর্কি নবাব আব্দুল গনি হাইস্কুল ও ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে লেখাপড়া করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৯ সালে ইংরাজিতে অনার্স ও ১৯৫০ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি প্রথমে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ (১৯৫১-৫২), ঢাকা কলেজে (১৯৫২-৫৫) অধ্যাপক, অতঃপর বাংলাদেশ সরকারের বাংলা অনুবাদক ও প্রকাশনা রেজিস্ট্রার (১৯৫৫-৭৫) এবং বাংলাদেশ প্রকাশনা নিবন্ধন পরিদপ্তর পরিচালক ও অনুবাদক (১৯৭৫-৮৩) হিসাবে কর্মরত থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পাঠ্যাবস্থায় লেখালেখির সূত্রপাত। ছাত্র জীবনে স্কুল ম্যাগাজিন, হল ম্যাগাজিন সহ ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। ১৯৫০ সালে কবি আশরাফ সিদ্দিকীর সহযোগে তাঁদের সম্পাদিত ‘নতুন কবিতা’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি বাংলা কাব্য-জগতে সকলের সাগ্রহ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থঃ
কাব্য: নক্ষত্র: মানুষ ও মন (১৯৫২), বন্দী মুহূর্ত (১৯৫৯), মহুয়া ) ১৯৬৫), বিস্মিত প্রহর (১৯৬৮), অনিষ্ট স্বদেশ (১৯৭৫), সমস্ত প্রশংসা তাঁর (১৯৮০), তিমির হনন (১৯৮৮), অলৌকিক এক দ্বীপ (১৯৯১), আল্ আমীন (কিশোর কাব্য, ১৯৯১), নির্বাচিত কবিতা।
সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ: নতুন কবিতা (আশরাফ সিদ্দিকী সহযোগে, ১৯৫০), প্রেমের কবিতা (১৯৫৯), অনুবাদ: আকাশ জয়ের ইতিকথা (১৯৬০), মুক্তা (১৯৬২), কিশোর মনীষী (১৯৬৭), ইকবালের যবুরই-আজম (কাব্যানুবাদ, ১৯৮৭), The English Translation of Some Selected Poems of Farrukh Ahmed
অপ্রকাশিত: দুরন্ত কিশোর, ফুল হব না পাখি হব (কিশোর কবিতা), হারানো দিন (কিশোর কবিতা), হাকলবেরি ফিন (ভাবানুবাদ), টম সয়ার (ভাবানুবাদ), টম কাকরে কুটির (ভাবানুবাদ, ভালো লাগার প্রতিধ্বনি (বিদেশী কবিতার অনুবাদ) MIRRDRED MOMENTS (নিজের কবিতার অনুবাদ) ইত্যাদি।
প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ, বিশিষ্ট কবি ও লোককবিজ্ঞানী ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকীর মত বিশিষ্ট জনেরা ছিলেন তাঁর সহপাঠী। মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ তাঁর কবি-স্বভাবের প্রধান দিক। তাঁর কবিতার মূলভাব ও বিষয় এটাই। তিনি প্রধানত কবি-সহজ, সুন্দর ভঙ্গিতে তিনি কবিতা লিখেছেন, তাঁর শব্দ-চয়ণ ও বিন্যাস-নৈপুণ্যে কাব্যিক ব্যঞ্জনা, সুর, ছন্দ ও লালিত্য ফুটে উঠেছে।। অনুভূতির প্রগাঢ়তা ও আন্তরিকতার স্পর্শে তা সংবেদনশীল হৃদয়কে সহজেই দ্রবীভূত করে। অতি সহজেই তাঁর কবিতার আবেদন পাঠক-চিত্তে অনুরণন সৃষ্টি করে। পাঠককে কাছে টানবার, নিজের ভাব ও অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চারিত করে দেখার এ সক্ষমতাই প্রকৃত শিল্পীর কাজ। এখানেই তাঁর প্রতিভা, শক্তিমত্তা ও দক্ষতার প্রকাশ ঘটে।
কবি আব্দুর রশিদ খান ছিলেন তেমনি একজন প্রতিভাধর, শক্তিমান, দক্ষ কবি। তাঁর কাছে কবিতা রচনা ছিল এক অনায়াস শিল্পকর্ম। রূপমুগ্ধ কবি সহজ শব্দের কুশলী বিন্যাসে অন্তরঙ্গ অনুভূতির প্রকাশকে এত স্বচ্ছন্দ ও স্বাভাবিক করে তোলেন যে, তা অন্যের মনে শুধু অনুরণন নয়, সুর ও ছন্দের মাধুর্যে তা গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। এটা তাঁর কাব্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং এর উপরই মূলত কবি হিসাবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও স্থায়ীত্ব বহুলাংশে নির্ভরশীল।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা-কেন্দ্রিক নতুন সাহিত্যান্দালনের পুরোভাগে যাঁরা ছিলেন, তারা হলেন কবি শাহাদৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, আব্দুল কাদির, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন, মোখাখখারুল ইসলাম, আশরাফ সিদ্দিকী, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখ। তাঁদের কিছু পরে, পঞ্চাশ দশকের শুরুতে উল্লেখযোগ্য আরও কতিপয় কবির আবির্ভাব ঘটে। এঁরা হলেন-কবি হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ, আব্দুস সাত্তার, ফজল শাহাবুদ্দীন, শহীদ কাদরী প্রমুখ। তাঁদের পাশাপাশি যে কবি এসময় কাব্য-ক্ষেত্রে সক্ষম পদ-চারণা করেছেন এবং জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত নিরন্তর কাব্য-চর্চায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন, তিনি হলেন কবি আবদুর রশিদ খান। এত দীর্ঘ সময় ধরে যিনি নিরলসভাবে কাব্য চর্চা করে গেছেন, কবি হিসাবে তাঁর খ্যাতি ও পরিচিতি ততটা গড়ে ওঠেনি কেন, তা আমার নিকট একটি প্রশ্ন ও রহস্য বলেই মনে হয়।
আমার কাছে মনে হয়েছে, তাঁর প্রচার-বিমুখ মনোভাব, সহজ-সরল জীবনবোধ ও নিভৃত-চারিতাকেই এজন্য বিশেষভাবে দায়ী করা চলে। এছাড়া, চাকরি থেকে অবসর নেবার পর তিনি বাকি জীবনের অধিকাংশ সময় তাঁর যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী একমাত্র পুত্রের বাসায় একান্ত নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করার ফলে তিনি অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন। তবে সৌভাগ্যবশত স্বদেশ, সমাজ ও বাংলা সাহিত্য চর্চার কেন্দ্রভূমি থেকে অনেক দূরে থাকলেও এবং নিজেকে কোনভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করতে আগ্রহী না হলেও তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনে কবিতাকেই তিনি একমাত্র সঙ্গী করে রেখেছিলেন। অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নিজেকে কবিতা চর্চায় একান্তভাবে নিমগ্ন রেখেছিলেন। এসময় প্রবাসে থেকেও তিনি তাঁর কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে কাব্য-জগতে স্বকীয় অস্তিত্ব বজায় ও পরিচিতি তুলে ধরতে পারতেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে চেষ্টা তিনি করেননি। ফলে এ দীর্ঘ সময়কালে তার সব লেখা পান্ডুলিপি আকারে বস্তাবন্দী হয়ে আছে- কেউ তার খোঁজ পায়নি এবং তিনিও অনেকটা বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছেন। তবে এ বিস্মৃতির দীর্ঘ অন্তরালবর্তী জীবনে তাঁর দু’টি অতি উল্লেখযোগ্য কাব্যকর্ম প্রকাশিত হয়েছিল এবং তার সাথে অনুঘটক হিসাবে আমার নিজের সম্পৃক্তি রয়েছে, একথা ভেবে আমি গভীর আনন্দ ও তৃপ্তি বোধ করি। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যকর্ম-নির্বাচিত কবিতার প্রকাশে আমার আগ্রহযা তিনি তাঁর এ গ্রন্থের ভূমিকায় নিজেই উল্লেখ করেছেন এবং আমার একান্ত অনুরোধে তিনি কবি ফররুখ-আহমদের ৩৬টি নির্বাচিত কবিতা অনুবাদ করেছিলেন-যা প্রথমে আমি আমার সম্পাদিত ‘ফররুখ একাডেমী পত্রিকা’য় ধারাবাহিকভাবে ছেপেছি এবং পরে `The English Translation of Some Seleiated Poems of Farrukh Ahmed’ নামে আমি আমার ভূমিকা সংবলিত করে ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে প্রকাশ করেছি।
যে কবি ১৯৭৭ সালে ৫৫ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তির পরও প্রায় ৪৩ বছর পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় বিচরণ করেছেন এবং অন্তিম সময় পর্যন্ত নিরন্তর সাহিত্য-সাধনা অব্যাহত রেখেছেন-সমাজ, বিশেষত, আমাদের সাহিত্যামোদী বিদগ্ধ মহল তাঁকে কতটা মর্যাদা দিয়েছে, স্মরণ করেছে, তা স্বভাবতই প্রশ্নের উদ্রেক করে। অভিযোগ আছে, আমাদের সমাজ আজ আদর্শহীন, লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যবিহীনভাবে অনির্দিষ্ট গন্তব্য পথের অতিযাত্রী, নানা মত-পথে বিভক্ত-বিচ্ছিন্ন, দ্বন্দ্ব-সংঘাতে অহেতুক সময়ক্ষেপণে ব্যস্ত। বিশেষত রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে পারস্পারিক হিংসা-বিদ্বেষ, অনৈক্য-বিভেদ ও সংশয়-সন্দেহের কারণে অসুস্থ-দূষিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকের অভিমত। সে কারণে ন্যায়বোধ ও সুস্থ বিচার-বিবেচনা অনেকটা অবলুপ্ত। যোগ্যতা ও প্রতিভার বিচারে এবং বলতে গেলে, প্রায় সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকেই আমরা প্রাধান্য দিয়ে থাকি। এজন্য রাজনীতি-নিরপেক্ষ ব্যক্তিরাও যথোচিত সম্মান ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন।
আবদুর রশিদ খানের প্রতি সমাজের অবহেলা, ঔদাসীন্য থেকে আমার মনে এরূপ একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তাঁর দীর্ঘজীবনে তিনি রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলেন। তিনি রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তি ছিলেন না। রাজনীতির প্রতি সম্পূর্ণ নির্মোহ থেকে শুধুমাত্র সাহিত্য-চর্চায় যিনি নিজেকে একান্তভাবে আত্মমগ্ন রেখেছিলেন, সাহিত্য ও সাহিত্যমোদীগণ তাঁকে কতটা স্মরণ রেখেছে, সে কথা ভেবে আমি নিদারুণ মর্মজ্বালা অনুভব করি। পৃথিবীর অধিকাংশ মহৎ কবি-শিল্পীরাই তো ক্ষমতার রাজনীতির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত না করেই শিল্পের চর্চা করেছেন। তাঁদের শিল্প বা সাহিত্য শুধু মানুষ, মানুষের হৃদয়ানুভূতি, দুঃখ-দুর্দশা, হাসি-আনন্দ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, প্রত্যাশা-বঞ্চনা ও মানুষের বিচরণ ক্ষেত্র পৃথিবীর রূপ-সৈৗন্দর্য, নানা বৈচিত্র্য ও বিবর্তনের ইতিহাস উঠে এসেছে নানাভাবে। আব্দুর রশিদ খানের রচনায়ও আমরা মানুষ ও পৃথিবীর এ ধরণের চিরায়ত বিষয় ও আবেগ-অনুভূতির প্রতিফলন লক্ষ্য করি। তা সত্ত্বেও যেভাবে আমাদের সাহিত্যে তাঁর যতটুকু স্থান পাওয়ার কথা, তা তিনি পাননি। স্থানের কথা না হয় বাদই দিলাম, সাহিত্যবোদ্ধা ও বিদগ্ধ সাহিত্য-সমালোচকেরাই বা তাঁকে কতটা স্মরণ রেখেছেন! এ বিস্মরণের গ্লানি নিয়েই এ পৃথিবীতে দীর্ঘকাল বেঁচে থেকেও তিনি সীমাহীন অনাদর-অবহেলা-উপেক্ষার গ্লানি নিয়ে দেশ থেকে দূরে, আটনাল্টিকের পাড়ে, সুদূর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে লোকচক্ষুর অন্তরালে একান্ত নিভৃতে প্রচন্ড অভিমানে অনেকটা নিঃসঙ্গ অবস্থায় চির বিদায় গ্রহণ করলেন। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পদ-মর্যাদায় আজীবন অধিষ্ঠিত থেকে দেশ ও জাতির নিরলস সেবায় নিয়োজিত থেকে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনকে যিনি জীবন্রে একমাত্র ব্রত হিসাবে নিয়েছিলেন, সে দেশ ও ভাষা-ভাষী মানুষ কেউ সে খবর জানলো না, শোক-সভার আয়োজনও হলো না, কোন শোক-বাণীও প্রচারিত হলো না। নীরবে, নিভৃতে, লোকচক্ষুর অন্তরালে, অশ্রুসিক্ত নয়নে, প্রচন্ড অভিমানে তিনি চলে গেলেন-তাঁর পরম প্রিয় মহান স্রষ্টার সান্নিধ্যে।
১৯৭০-৭১ সালে কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি আমি তখন ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য-সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে কবি আবদুর রশিদ খানের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। আমি তাঁর কবিতা পত্রিকায় ছাপতাম। তারপর দীর্ঘকাল অদেখা ও যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতার কারণে তাঁকে একরকম ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রায় তিন দশককাল পরে হঠাৎ তাঁর সাথে দেখা হওয়ায় পুনরায় তাঁর সান্নিধ্য লাভ ও তাঁর সাথে কিছুটা ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পাই। সেটাও বলতে গেলে, এক আকস্মিক ঘটনা। তবে আমার জন্য তা ছিল এক স্মরণীয় ও আনন্দের বিষয়।
আমি তখন বিশ বছর কাল প্রবাস-জীবন অতিবাহিত করে ঢাকায় একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা এবং সে সাথে বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাজে জড়িত হয়ে পড়েছি। বিশেষত ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’ গঠন করে তার কর্ম-তৎপরতায় সম্পৃক্ত হয়েছি। তখন দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট কবি-লেখক ও সাংবাদিক আখতারুল আলম। ১৯৬০ সালে আখতারুল আলম যখন মওলানা মোহম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন, তখন থেকে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। যাইহোক, একদিন ইত্তেফাকে আখতারুল আলমের সাথে দেখা করতে সম্পাদকের রুমে ঢুকে দেখি এক দাড়িওয়ালা টুপিপরা বয়স্ক ব্যক্তি ও একজন মহিলা সেখানে বসে সম্পাদকের সাথে কথা বলছেন। আমাকে দেখেই সম্পাদক সোৎসাহে বলে উঠলেন, এনাকে চেনেন? আমি কিছুটা অপ্রতিভের ন্যায় বললাম, ‘না, এনাকে চিনতে পারলাম না?’ সম্পাদক পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি কবি আবদুর রশিদ খান আর উনি তাঁর মেয়ে।’ এক বিস্ময় ও আনন্দময় দৃষ্টিতে আমি তাঁর দিকে হাতবাড়িয়ে দিয়ে আমি আমার পরিচয় দিলাম এবং আমাদের পুরাতন পরিচয় ও সম্পর্কের আনন্দঘন স্মৃতির কথা স্মরণ করে তাঁর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কসূত্র গড়ে তুললাম। এভাবে পরিচয়ের পর সেদিন আলাপ-আলোচনা শেষে তার ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর নিলাম। এরপর আমি নিয়মিত তাঁর বাসায় যাতায়াত শুরু করলাম। তিনি উষ্ণ আন্তরিকায় আমাকে গ্রহণ করলেন।
তিনি এত ভদ্র, বিনয়ী, নিরহংকার ও সদালাপী ছিলেন যে, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে সহজে সেখান থেকে উঠতে পারতাম না। একথা-সেকথায় অনেক সময় পাড় হয়ে যেত। তবে আমাদের কথার মূল প্রসঙ্গ ছিল সাহিত্য, সাহিত্য-সম্পর্কিত নানা বিষয়, নানাজন ও তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা- অভিজ্ঞানের বিষয়। একদিন কথায় কথায় তাঁকে কবি ফররুখ আহমদের কয়েকটি বিখ্যাত কবিতার ইংরাজি অনুবাদ করতে। অনুরোধ করলাম। শুনে তিনি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে প্রবল গর্জন করে বললেন, অসম্ভব! ফররুখ আহমদের কবিতার অনুবাদ করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। যাঁর কবিতা আবৃত্তি করতেই দাঁত ভেঙ্গে যায়, তাঁর কবিতার ইংরাজি অনুবাদ করা কি চাট্টিখানী কথা!”
তাঁর কথা শুনে আমি গভীর প্রত্যয় ও দৃঢ়তার সাথে বললাম, ‘আমি নিশ্চিত, আপনার পক্ষে ফররুখের কবিতার অনুবাদ করা অবশ্যই সম্ভব এবং শুধু সম্ভব নয়, এ কাজটি একান্ত স্বচ্ছন্দে আপনি করতে সক্ষম।” আমার কথা শুনে কিছুটা অবাক বিস্ময়ে তিনি আমার দিকে তাকালেন। তারপর কিছুটা শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কীভাবে আপনার মধ্যে এ প্রতীতি জন্মালো যে, এ কাজটি আমার পক্ষে সম্ভব?’ আমি আমার বক্তব্যের সপক্ষে তিনটি যুক্তি উপস্থাপন করে বললাম, প্রথমত, আপনি একজন কবি। কবির পক্ষেই কবিতা অনুবাদ সহজতর। দ্বিতীয়ত, আপনি ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যে একজন সুদক্ষ ব্যক্তি। আপনি নিজের লেখা অনেক কবিতার ইংরাজি অনুবাদ করেছেন এবং অনেক খ্যাতনামা ইংরাজ কবির কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তৃতীয়ত, আপনি ফররুখের নিকট-সান্নিধ্য লাভ করেছেন, আপনি তাঁকে অন্তরঙ্গভাবে দেখার ও জানার সুযোগ পেয়েছেন। তাছাড়া, আপনি তাঁর একজন ভক্ত ও অনুরক্ত, এ অনুরাগ-রঞ্জিত আপনার অসাধারণ কাব্য-প্রীতিই আপনাকে এক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যোগাবে।
আমার প্রত্যয়পূর্ণ, আবেগাশ্রিত, যুক্তি-বাণে তিনি মনে হলো পরাভূত হলেন। নরম সুরে প্রশান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আচ্ছা দেখা যাক, আপনি যখন বলছেন।” তাঁর সম্মতিসূচক কথা শুনে আমি আস্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরে গেলাম। দু’দিন তাঁর সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। তৃতীয় দিন রাত বারটায় টেলিফোনে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে আমি কিছুটা শংকাবোধ করলাম। এতরাতে কোন বিপণ্ণ ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো তো টেলিফোন করার কথা নয়! আমাকে হতবাক করে দিয়ে ভারী গলায় তিনি বললেন, “মতিউর রহমান সাহেব, আমাকে আপনি এমন এক গুরুদায়িত্ব মাথায় চাপিয়ে দিয়ে গেছেন যে, এ কয়দিন আমি এতটুকু স্বস্তি ও বিশ্রাম নেবার অবকাশ পাইনি। অনবরত আমি শুধু ফররুখের কবিতা নিয়ে ভেবেছি আর পাগলের মত দিনরাত পরিশ্রম করে এ পর্যন্ত তাঁর ২৬টা কবিতার অনুবাদ করে ফেলেছি। একটু রাত হলেও এ কথাটা আপনাকে না জানিয়ে স্বস্তিবোধ করছিলাম না।”
তাঁর কথা শুনে আমার প্রায় আনন্দে চিৎকার করে ওঠার মত অবস্থা। আমি বললাম, “দেখলেন তো আমি সত্য বলেছিলাম কিনা?” তিনি সপ্রতীভভাবে বললেন, আমি তো চিন্তাও করিনি যে, এটা আমার পক্ষে সম্ভব। সেদিন আপনি বলাতে আমি সাহস করে মহান আল্লাহর রহমত কামনা করে এ কাজে হাত দিলাম এবং শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল। জানিনা, অনুবাদ হিসাবে কতটা সার্থক হয়েছে।”
আমি আবার প্রত্যয়ের সুরে বললাম, “আমি নিশ্চিত, আপনার অনুবাদ অবশ্যই সার্থক হয়েছে।” পরের দিনই তাঁর বাসায় গিয়ে সেগুলো নিয়ে এলাম এবং প্রথমে আমার সম্পাদিত ‘ফররুখ একাডেমি পত্রিকা’য় ছেপে দিলাম। পরে তা বই আকারে প্রকাশ করি। এর কিছুদিন পর তিনি আমেরিকায় ছেলের বাসায় চলে গেলেন। তিনি তখন আমেরিকার গ্রীনকার্ড ধারী স্থায়ী বাসিন্দা। মাঝে-মধ্যে ঢাকায় আসতেন। আমেরিকায় যাওয়ার পূর্বে আমি অনুরোধ করলাম, ওখানে গিয়ে ফররুখের আরো কিছু কবিতার অনুবাদ করতে। তিনি রাজী হয়েছিলেন।
এরপর ২০০৬ সালে আমি সস্ত্রীক আমেরিকায় যাই। আমার বড়মেয়ে সুমাইয়া ও ছোটছেলে আবিদুর রহমান তখন আমেরিকায় থাকে। মেয়ের বাসা আইওয়াতে থাকাকালে নিউইয়র্ক থেকে আমার এক প্রাক্তন ছাত্র টেলিফোনে আমাকে সেখানে যাবার আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে আমার কয়েকজন ভক্ত-অনুরক্ত, বন্ধু-বান্ধব আমাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতে চায়। আমি সম্মতি দিলে তারা প্লেনের টিকিট পাঠায়। আমি এক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে যাই। প্রতিদিন এখানে-ওখানে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমার অনুরোধে একদিন তারা কবি ফররুখ আহমদের উপর একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমি টেলিফোনে কবি আব্দুর রশিদ খানকে অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেই। তিনি থাকতেন নিউ ইয়র্ক থেকে ১৬০ মাইল দুরে কানেকটিকাটে-গাড়িতে দু’-আড়াই ঘন্টার রাস্তা। তিনি এসেছিলেন-স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, নাতি ও নাতনিকে সাথে করে। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারপর আমার হাতে ফররুখ আহমদের ৮টি কবিতার অনুবাদ তুলে দিলেন। দেশে এসে পূর্বের ২৬টির সাথে নতুন আটটি কবিতা যুক্ত করে The English Translation of Some Selected Poems of Farrukh Ahmed বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করি।
২০০৯ সালে আমি দ্বিতীয় বার আমেরিকা যাই। সেবারেও তিনদিনের জন্য নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। অসুস্থতার কারণে তিনি আসতে পারেন নি। আমাকে দেখা করতে কানিকটিকাটে যাবার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ২০১৩ সালে তৃতীয় বার আমি আমেরিকায় গিয়ে অধিকাংশ সময় ছেলের বাসা ক্যানসাসে ছিলাম। মেয়ে তখন আইওয়া থেকে বদলি হয়ে ডালাস চলে গেছে, সেখানেও ছিলাম কিছুদিন। নিউইয়র্ক যাওয়া হয়নি, কবির সঙ্গেও দেখা হয়নি, তবে টেলিফোনে বহুবার কথা হয়েছে। ঐ সময় তিনি তাঁর হাতে লেখা দু’টি পান্ডুলিপি আমাকে ডাকে পাঠিয়ে দেন। আমি সে দু’টি পান্ডুলিপি সাথে করে ঢাকায় নিয়ে এসে আমার কম্পিউটারে কম্পোজ করে রেখেছি। সেখান থেকে কয়েকটি কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপাতেও দিয়েছি।
২০১৭ সালে আমি যখন চতুর্থ বারের জন্য আমেরিকা যাই, তখনও তাঁর সাথে দেখা হয়নি, তবে টেলিফোনে কথা হয়েছে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে আমি তখন ঢাকায়। হঠাৎ একদিন তাঁর টেলিফোন পেলাম, ঢাকা থেকে তিনি তখন ঢাকায় এসেছিলেন, তাঁর মনিপুরের পুরানা বাড়িটা ডেভেলবপারকে দেয়ার জন্য। তিনি আমার সাথে দেখা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এর দু’দিন পরে ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে রওয়ানা হলাম। কিন্তু অনেক দিন পরে আমি বহু চেষ্টা করেও কিছুতেই তাঁর বাসা খুঁজে পেলাম না। দু’দিন আগে তিনি যে টেলিফোন থেকে আমাকে ফোন করেছিলেন, সে নম্বরটা সেফ করে না রাখায় আমি আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম না। মনে মনে গভীর আক্ষেপ জমা হলো। এর একদিন পর ২৯ অক্টোবর আমি সস্ত্রীক পঞ্চম বারের মত আমেরিকা চলে আসি।
আমেরিকার ক্যানসাস সিটিতে অবস্থানকালে ৭ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ টেলিফোনে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে গভীরভাবে মর্মাহত হলাম। তাঁর বড় মেয়ে ও ছেলের বউ জানালো বিগত ১ ফেব্রুয়ারি কানেকটিকাটের ম্যানচেষ্টার হাসপাতালে সন্ধ্যা সাতটায় তিনি ইন্তিকাল করেন। পরে সেখানকার বায়তুল মামুর মসজিদে জোহর নামায শেষে জানাজান্তে সেখানকার ইনফিল্ড মুসলিম কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি একপুত্র, তিন কন্যা, নাতি-নাত্নি রেখে যান।
২০০৫ সালে তিনি যখন কিছুদিনের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন, তখন তিনি আমাকে তাঁর প্রকাশিত সবগুলো বই খুঁজে পেতে দিয়েছিলেন। আমি খুব হতাশ হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মাত্র এ কয়টি বই? তিনি বললেন, পান্ডুলিপি জমা হয়েছে অনেক কিন্তু ছাপার সুযোগ হয়নি। আমি তাঁকে অনুরোধ করলাম, সব কাজ ফেলে আগে বই প্রকাশের ব্যবস্থা করুণ। এরপর বার বার তাগাদা দেয়াতে তিনি তাঁর নির্বাচিত কবিতার একটি বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরি করেন। ছয়শো পৃষ্ঠার বিশালার সে কাব্যগ্রন্থটি একদিন প্রকাশিত হলো, সেখানে গ্রন্থের ভূমিকায় আমার নামও তিনি উল্লেখ করেছেন। আমাকে সানন্দে নিজের হাতে এককপি সৌজন্য হিসাবে দিলেন। আমি সে গ্রন্থের সমালোচনা লিখে পত্রিকায় ছেপে দিয়েছি। তাঁর সাহিত্য-কর্ম সম্পর্কে ঐসময় একটি প্রবন্ধও লিখেছি।
আমার একান্ত অনুরোধে তিনি ফররুখ আহমদের নির্বাচিত ৩৬টি কবিতায় ইংরাজি অনুবাদ ছাড়াও ফররুখ আহমদের উপর দু’টো নিবন্ধ লিখেছেন, ফররুখ একাডেমি পত্রিকায় আমি তা ছেপেছি এবং পরে আমার সম্পাদিত ‘ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য’, ১ম খন্ডে তা সংকলিত করেছি। এছাড়া, তাঁর নিকট সংরক্ষিত ফররুখ আহমদের কতিপয় অপ্রকাশিত কবিতাও আমাকে দিয়েছিলেন পত্রিকায় ছাপার জন্য। আমি যথারীতি সেগুলো ফররুখ একাডেমি পত্রিকা ও ‘ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য’ গ্রন্থে ছেপেছি। তাঁর ফররুখ-প্রীতি ও চর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন পুরস্কার-২০১২’ তাঁকে প্রদান করেছি। তাঁর ইন্তিকালে বাংলা সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হলো আর আমি চিরদিনের জন্য হারালাম আমার এক অকৃত্রিম সুহৃদ, শুভাকাঙ্খী ও অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিকে।
৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ক্যানসাসে তাঁর ইন্তিকালের খবর শুনে মনে মনে তাঁর কবর জিয়ারতের নিয়ত করি। সে অনুযায়ী ১২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে আমার ছোট ছেলে আবিদুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে প্লেনে করে নিউ ইয়র্ক যাই। সেখানে পৌঁছে ঐদিনই নিউ ইয়র্কের টাইম টিভিতে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করি। পরের দিন নিউ ইয়ার্ক থেকে কানেকটিকাট যাই। আমার সঙ্গে ছিলেন ক্যামেরাসহ টাইম টিভির রিপোর্টার আবিদুর রহিম, বিশিষ্ট সাংবাদিক কাজী শামসুল হক ও বিশিষ্ট ইতিহাস-গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান। আমরা সেখানে মরহুম কবির একমাত্র পুত্র আব্দুল মোনেম খানের বাসায় গেলাম। সেখানে তারা সকলেই প্রস্তুত ছিল। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে পারিবারিকভাবে আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও দোয়ার অনুষ্ঠান করে সেখান থেকে ২৫ মাইল দুরে ইনফিল্ড মুসলিম কবরস্থানে গেলাম মরহুম কবির কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। বিশাল কবরস্থান। আমেরিকায় বসবাসকারী স্থায়ী মুসলিমগণ জায়গা কিনে সেটাকে কবরস্থান বানিয়েছেন। কবর জিয়ারত করে আব্দুল মোনেমের বাসায় এসে চা-নাস্তা খেয়ে আমরা সবাই নিউ ইয়র্ক ফিরে এলাম। ক্যামেরা ম্যান আব্দুর রহিম আমাদের যাবতীয় কর্মকান্ডের প্রচার করলেন টাইম টিভিতে।
পরের দিন ১৪ মার্চ, ২০১৯ নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে ‘নর্থ আমেরিকান রাইটার্স ফোরাম’ কবি আল মাহমুদের মৃত্যুতে এক শোক সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিভিন্ন টিভি ও প্রায় এক ডজন বাংলা পত্রিকার সম্পাদক-রিপোর্টারগণ উপস্থিত ছিলেন। আমি সেখানে আল মাহমুদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি আবদুর রশিদ খানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করি। নিউ ইয়র্ক শহরের অনতিদুরে তিনি বসবাস করতেন, তবু তাঁর সম্পর্কে এখানকার কেউ অবগত নয়, জেনে আমি অনেকটা বিস্ময়বোধ করেছি। এত নিভৃতচারি ও কতটা প্রচার-বিমুখ ছিলেন তিনি, এতে থেকে তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
যাই হোক, তাঁর উজ্জ্বল স্মৃতি চিরদিন আমাকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। মহান রাব্বুল আলামীন জান্নাতুল ফিরদাউসের মর্যাদাপূর্ণ স্থানে তাঁকে অধিষ্ঠিত করুন।