
কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য
চৌধুরী শাহজাহান
প্রকাশক : ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৮
মূল্য : ২৪০ টাকা
নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্ন থেকেই দেশের জাতীয় পত্র-পত্রিকায় ও সাহিত্য-ম্যাগাজিনে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ লিখে আসছেন চৌধুরী শাহজাহান (জন্ম : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)। ব্যাংকিংয়ের মতো কঠিন ও সর্বদা সতর্কতামূলক পেশাও তাকে সাহিত্যসাধনা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। পড়াশোনা ও লেখালেখির মধ্যেই তিনি সব সময় নিজেকে নিমগ্ন ও ব্যাপৃত রাখতে চেয়েছেন। পেরেছেনও। দীর্ঘদিন লেখালেখি করলেও বই প্রকাশের ব্যাপারে বলা চলে তিনি নির্মোহই থেকেছেন। ২০১৮ সালে একুশে বইমেলায় ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য। বিষয়ে নতুনত্ব নেই বটে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনবরত কাজ হচ্ছে। এ বিষয়টি বাদ দিয়ে তিনি অন্য বিষয়েও প্রবন্ধের বই করতে পারতেন। বই করার মতো সেরকম অনেক প্রবন্ধও তাঁর রয়েছে। কিন্তু প্রথম বইয়ের জন্য সেদিকে তিনি মনোযোগ দেননি। বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকেই। এ থেকেই দেশের ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর টান ও দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের কাছে।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এক মহাকাব্যিক আখ্যান। আপাতদৃষ্টিতে এর সময়সীমা মাত্র নয় মাস হলেও এর শেকড় কালের গভীরে বহুদূর পর্যন্ত প্রোথিত ও বিস্তৃত। কতো দহন, কতো ক্রন্দন, কতো আত্মত্যাগ স্বাধীনতার এতো বছর পরও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। যদিও আমাদের শিল্প-সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ এবং স্মৃতিকথায় ধীরে ধীরে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের রোমহর্ষক অনেক অজানা অধ্যায়, তারপরও আরও অনেক কিছু রয়ে গেছে অন্ধকারে, অনাবিষ্কৃত। ইতিহাসের আলো যেখানে পৌঁছবে না, সেখানে আমাদের সাহিত্যিকগণ নানা বর্ণ-বিভায় আলোকিত করে যাবেন অনাদিকাল।
মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সাহিত্য রচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। ভবিষ্যতের একজন নবীনতম সাহিত্যিকও মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক কিংবা প্রবন্ধ লিখবেন। গবেষণাও করবেন অনেকে। এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিত যে পরিমাণ সাহিত্য রচিত হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা করা দুঃসাধ্যই বলা যায়। চৌধুরী শাহজাহান বেছে নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্য-ছোটগল্প ও উপন্যাকে যা তাঁর প্রধান আলোচ্য বিষয়। তবে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও তিনি ভিন্নধরনের উপন্যাস ও ছোটগল্পের ওপর আলোচনা করেছেন এ গ্রন্থে। হাতেগোনা কয়েকজন কথাশিল্পীর গল্প-উপন্যাসের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। যাঁদের লেখা নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁরা হলেন শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক ও হুমায়ূন মালিক। এ চারজনই বাংলা ছোটগল্পে নতুন চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজন করেছেন। কথাসাহিত্যের ওপর ফেলেছেন নিরীক্ষামূলক বহুকৌণিক আলো।
চৌধুরী শাহজাহান ‘শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস : বাঙালি জাতির স্বরূপ সন্ধান’ প্রবন্ধে জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), দুই সৈনিক (১৯৭২), জলাঙ্গী (১৯৭৩) এবং নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৪) এ চারটি উপন্যাস আলোচনা করেছেন। শওকত ওসমানের উপন্যাসে এদেশের মানুষের ওপর আমরা পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই। পাশাপাশি বাঙালির প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ যথেষ্ট দৃঢ়তার সাথে চিত্রিত হয়েছে। তাঁর উপন্যাস পড়লে পাক হানাদারদের প্রতি আমাদের ঘৃণা ও ক্ষোভ জন্মে। পক্ষান্তরে আত্মত্যাগী শক্তি ও সাহসেও আমরা উদ্দীপিত হই। দেশের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ বাড়ে। প্রাবন্ধিক চৌধুরী শাহজাহান এসব উপন্যাসের বিষয় ও চরিত্রদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘জননী উপন্যাসের সমাজবাস্তবতা’ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। শওকত ওসমান সম্পর্কে তিনি বলেন :
‘ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালেও বাংলাদেশের মৃত্তিকা ও গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নির্ভীক কণ্ঠস্বর, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব ব্যক্তিত্ব।’ [কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা ১৮]
বাংলা কথাসাহিত্যে এক রতœদ্বীপের নাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। মাত্র দু’টি উপন্যাস ও নিরীক্ষাধর্মী প্রায় ২৩টি গল্প নিয়েই স্বদর্পে, স্বমহিমায় উজ্জ্বলতর নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন সুদীর্ঘকাল। তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস খোয়াবনামা’র ওপর ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস খোয়াবনামা : জীবন জিজ্ঞাসা ও সমকাল’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন চৌধুরী শাহজাহান। আমরা জানি, খোয়াবনামা’য় পলাশীর যুদ্ধ থেকে দেশভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম চিত্রিত হয়েছে। এ প্রবন্ধে তিনি খোয়াবনামা’র প্রেক্ষাপট, চিত্রিত জীবন ও সমাজ, বিভিন্ন বিশ্বাস ও কুসংস্কারে ভরা মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব মেলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। ফলে অনেক পাঠক আগ্রহী হয়ে উঠবে খোয়াবনামা পাঠে। কিংবা উপন্যাসটি পাঠ না করেও গিরির ডাঙা, গোলাবড়ি, কাৎলাহার বিলের মানুষের অন্তর্গত জীবন সম্পর্কে আঁচ করতে পারবে পাঠক, শুধু প্রবন্ধটি পাঠ করে।
‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাসের কুশীলবরা সবাই খোয়াব বা স্বপ্ন দেখে। শরাফত মন্ডল খোয়াব দেখে আরো বেশি ভূ-সম্পত্তির মালিক হওয়ার, মণ্ডলের ছেলে আবদুল কাদের স্বপ্ন দেখে স্বাধীন পাকিস্তানের। তমিজ স্বপ্ন দেখে এক টুকরো ধানী জমির। স্বপ্ন ব্যাখ্যায় চেরাগ আলি ব্যবহার করে ছেঁড়াখোঁড়া বইটি। এই ‘ছেঁড়াখোঁড়া’ বইটি যেন বাঙালি জাতির খোয়াবনামা।’ [কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা ৩৬]
মানবজীবন ও প্রকৃতির নিগূঢ় রহস্যময়তা উন্মোচন করেন হাসান আজিজুল হক, তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর তাঁর বেশ কয়েকটি ছোটগল্প রয়েছে যেমন ভূষণের একদিন, ঘরগেরস্থি, কৃষ্ণপক্ষের দিন, আমরা অপেক্ষা করছি, বিধবাদের কথা ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত হাসান আজিজুল হকের সব গল্পের বিষয় ও চরিত্রদের মনোজাগতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ওপর আলোকপাত করতে বেশ মনোযোগী ও যত্নশীল হয়েছেন চৌধুরী শাহজাহান। এ ছাড়াও ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পে দেশভাগের ফলে ব্যক্তির অন্তক্ষরণ ও অধঃপতন কিভাবে হলো তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। হাসান আজিজুল হক সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি যথার্থই বলে মনে হয়।
‘হাসান আজিজুল হক একজন শক্তিশালী ও সত্যনিষ্ঠ গল্পকার। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনবোধ, কল্পনাশক্তি, সংগ্রামী চেতনা ও মানবতাবোধ অত্যন্ত প্রখর। তিনি খুব সহজে খেটে খাওয়া, নিরন্ন, সাধারণ মানুষের অন্তরে পৌঁছে যান। তাঁর কুশীলবদের মুখ দিয়ে সমাজের শাসন-শোষণের ইতিহাস উঠে আসে অনায়াসে।’
[কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা ৩৯]
আশির দশকের একজন নিরীক্ষাধর্মী কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন মালিক, অনেকটা নীরবেই কাজ করে যাচ্ছেন। যদিও বিপুল সংখ্যক পাঠকের ওপর তাঁর আধিপত্য কিংবা প্রভাব বিস্তার নেই, এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ থাকাও উচিত নয়, বেশ কয়েকটি সফল ছোটগল্পের কথাকোবিত হিসেবে তাঁর সন্তুষ্ট থাকা বা তৃপ্ত থাকা উচিত। গল্প-উপন্যাসের বিষয়, ভাষা ও বয়নকৌশল এবং পরিমিতিবোধে ইতোমধ্যেই নিজস্বতার আসন পাকাপোক্ত করেছেন। চৌধুরী শাহজাহান তাঁর প্রায় সব গল্প ও উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন নিবিষ্ট চিত্তে। হুমায়ূন মালিকের গল্পের বিচিত্র বিষয়, শিল্পনিরীক্ষা ও স্বাতন্ত্র্যের জায়গাটি স্পষ্ট করবার চেষ্টা করেছেন পাঠকের সামনে। তাঁর ভাষার শিল্পরীতি-কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন :
‘হুমায়ূন মালিক তাঁর গল্পে আর যা যা করেন তা হলো অসমাপিকা ক্রিয়াকে সমাপিকা ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার, অন্বয় পদ বিলুপ্তি বা যথেচ্ছ ব্যবহার, শব্দ উহ্য রেখে বাক্যগঠন পদ্ধতির (Elliptical way of defining) প্রয়োগ। এতে গল্পের থেকে মেদ ঝরে পড়ে, ভাষা হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ, সাংকেতিক। এভাবে শব্দ বা বাক্য বিন্যাসের অভিনবত্ব নতুন স্বাদ সৃষ্টি করে।’ [কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা ৭৯]
কথাসাহিত্যের ওপর নয়টি প্রবন্ধ রয়েছে ‘কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য’ গ্রন্থে। একজন প্রাবন্ধিক হিসেবে চৌধুরী শাহজাহানের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা, মূল্যায়নের যথার্থতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা পাঠকদের হয়তো বা অতৃপ্ত করবে না। তবে শওকত ওসমানের জীবন ও কর্মবিষয়ক যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, তা আরও বিস্তৃত হতে পারতো। এখানে শুধু তথ্যকেই তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। এটাকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারতেন। যাহোক, চৌধুরী শাহজাহান বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান চারজন কথাশিল্পীর গল্প-উপন্যাসের নির্মাণকৌশল, চিত্রিত চরিত্রদের অন্তর্গত সংকট বিচার-বিশ্লেষণ করে লেখকের সবলতা ও দুর্বলতার ব্যাপারে তাঁর নিজের মতামত স্পষ্ট করেন, ফলে লেখকের সৃজন ক্ষমতা সম্পর্কে পাঠকের একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায়। তাঁর এ প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই। প্রবন্ধের ভাষাকে তিনি জটিল-কঠিন করেন না। সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যে, অনাবশ্যকতা এড়িয়ে কথাশিল্পীর নির্মাণ-ক্ষমতা কৌশল তিনি মর্ম দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন।