এডওয়ার্ড সাঈদ ১৯৩৫ সালে ফিলিস্তিনে খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা শুরু করলেও মাত্র ১৩ বছর বয়সেই অন্যদের মত ইসরাইলের আগ্রাসনে অনেক ফিলিস্তিনিদের মত ভাগ্য বরণ করে নিজ দেশ থেকে মিসরের কায়রোতে চলে যান। মাত্র তিন বছর পর ১৯৫১ সালে পরিবারের সাথে আমেরিকায় পাড়ি দেন এবং সেখান থেকে শিক্ষা ও পেশা জীবন শুরু ও শেষ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিনস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে বিএ ১৯৬০ সালে এমএ পাস করেন। ১৯৬৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন।
১৯৬৩ সালে তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ডমিনিয়ন ফাউন্ডেশন অধ্যাপক পদ লাভ করেন। ১৯৯২ সালে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক নির্বাচিত হন। তিনি ইংরেজি ভাষা ছাড়াও বেশ কয়েকটি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। ফলে তিনি তুলনামূলক সাহিত্যে নতুন দিগন্তের সূচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে এক কলঙ্কময় ইতিহাসের সৃষ্টি হয় ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের জন্ম ও ফিলিস্তিন নামক রাষ্ট্রের বিলুপ্তির মাধ্যমে। এ কলঙ্কময় অধ্যায় তাঁর চিন্তার জগৎকে নাড়া দিয়েছে প্রবলভাবে। ফলে তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে যায় প্রাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের দ্বন্দ্ব। আর দ্বন্দ্বের স্বরূপ নির্ণয় করে তিনি একে একে রচনা করেন অসংখ্য বই ও প্রবন্ধ।
১৯৭৮ সালে এডওয়ার্ড সাঈদ প্রকাশ করেন বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দেয়া ওরিয়েন্টালিজম। তাঁর এ গ্রন্থ প্রাচ্যের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবন বিশ্লেষণে পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের মানসিকতা গঠন সম্পর্কে মৌলিক তত্ত্ব পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা খণ্ডন করতে সক্ষম না হয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। তাঁর এ গ্রন্থটি নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছে উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা, উত্তর-উপনিবেশবাদীরা, মার্কসবাদীরাসহ বহু বুদ্ধিজীবী। যদিও সব বিতর্কের পর গ্রন্থটি আপন মহিমায় নিজের অবস্থানকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং বর্তমান বিশ্বে চোখের পর্দাকে সরিয়ে দিয়ে উপনিবেশিত ও সাবেক উপনিবেশিত দেশসমূহকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তাঁর কোয়েশ্চান অব প্যালেস্টাইন (১৯৭৯) এবং কাভারিং ইসলাম (১৯৮১), ওরিয়েন্টালিজমের পর তাকে একজন মানব হিতৈষী হিসাবে পরিচিতি দান করেন। এরপর ১৯৯৩ সালে তাঁর কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটির মাধ্যমে মূলত পাশ্চাত্য যে কৌশলে প্রাচ্যের প্রতি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালায় এবং মানসিক ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার ঘটায় তার স্বরূপ উন্মোচন করেন।
২.
বর্তমান সময়ে এডওয়ার্ড সাঈদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নানা কারণে। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, ‘তিনি সফল অধ্যাপক, অত্যন্ত উঁচু ও মৌলিক মানের সাহিত্যসমালোচক, এবং সেই সঙ্গে লেখক। সাঈদ কেবল সাহিত্যসমালোচনা রচনা করেননি, তাঁর গ্রন্থ আছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে, এমনকি সঙ্গীত সম্পর্কেও; আত্মজীবনী ও ভ্রমণবিবরণেও তিনি অনবদ্য।’ তাঁর এ অনবদ্য রচনার একটি কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ারিজম।
এডওয়ার্ড সাঈদের কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম বিগত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে এখন পর্যন্ত অত্যন্ত আলোচিত ও তাত্ত্বিক বই হিসেবে বিবেচিত। এ বইয়ে সাঈদ দেখিয়েছেন কিভাবে পশ্চিমা বিশ্ব নিজ ইতিহাসের অন্ধকারকে চটকদার শব্দের ও বুদ্ধিভিত্তিক বয়ানের আড়ালে ‘আমরা’ ও ‘অন্যরা’ বিভাজন তৈরি করে প্রাচ্যকে হেয় করছে। কেননা ‘পশ্চিমের কোনও ইতিহাস নেই, অন্তত জানা কোনও লিখিত ইতিহাস যে-টুকু আছে তার পুরোটাই বর্বরতার ইতিহাস লুণ্ঠন আর হত্যাযজ্ঞ যাদের জীবনের ব্যাকরণ তারাই কিনা আখ্যা দেয় অন্যরা অসভ্য। আসলে মিথ্যাচারের ছায়াতলে বড়জোর অন্ধকার জন্ম নেয়, আলোর অঙ্কুরোদগম সেখানে ঘটবে কিভাবে? অতঃপর অন্ধকার জন্ম দেয় ‘আমি’, ‘আমরা’ উবে যায় অভিধান থেকে। অহংকারী ‘আমি’ তখন বয়ান করে ‘অন্যরা’ মিথ্যা।’
এ সংঘাত সৃষ্টিকারীদের উত্তরাধিকার পশ্চিমা পণ্ডিত স্যামুয়েল হান্টিংটন। তিনি ১৯৩৩ সালে The Foreign Affairs পত্রিকায় লিখেন The Clash of Civilization? (সভ্যতার সংঘাত?)। এর তিন বছর পর তার প্রবন্ধটিকে আরো বড় করে নতুন তত্ত্ব সংযোজন করে The Clash of Civilizations and the Remarking of World Order. নামে বই প্রকাশ করেন। এ বইয়ে তার মূল বক্তব্য ছিল, ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নতুন পর্ব শুরু হয়েছে। এই পর্বে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বিশ্বের পুরনো বিভাজন আর প্রাসঙ্গিক নয়, প্রাসঙ্গিক নয় ধনতন্ত্র বনাম সমাজতন্ত্রের সংঘাত, এবার মানবজাতির অভ্যন্তরীণ বিভেদ হবে চরিত্রে, সংস্কৃতিতে সেই বিভেদই হবে সংঘাতের মূল উৎস; বিশ্বরাজনীতিতে প্রভুত্ব বিস্তার করবে সভ্যতার সংঘাত।’
সাঈদ বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন, ‘পশ্চিমই বরং পূর্বকে বর্বর আখ্যা দিয়েছেন, হীন বানিয়েছে, আর তা বানিয়েছে নিজেদের প্রয়োজনেই। এবং এ পথে তাদের টেনে আনে সাম্রাজ্যবাদী জিঘাংসা। পশ্চিমের মানুষেরা এরকম জ্ঞানেরই জন্ম দিয়েছে এতকাল, যে জ্ঞানের মূল সুরটা হলো প্রাচ্য অসভ্য-বর্বর।’
পশ্চিমাদের ফাঁদে পড়ে দিশেহারা প্রাচ্য কিভাবে সংস্কৃতির পর অন্য সংস্কৃতিকে গ্রহণ করছে তা সাঈদ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি মনে করেন গ্রামসির ভাষায় এরা ‘হেজেমনিক’ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের সংস্কৃতির দিকে তাকিয়েও দেখে না। তিনি সালমান রুশদির সাথে এক সাক্ষাৎকারের সময় বলেন, ‘আমাদের ক্ষেত্রে বাস্তব হলো আমরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা, এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতির দিকে দৌড়াতে চাই। আমরা যাযাবরের মত, এবং সম্ভবত আমরা শংকর জাতিভুক্ত মানুষ ছাড়া নিজেদের ভাবতেই পারি নাই। আমাদের অবরুদ্ধতাকে আমাদের এই প্রবণতাই আরও বেশি দীর্ঘায়িত করে রেখেছে।’
তবে এত কিছুর পরও গবেষকরা মনে করেন, সাঈদের মূল দুর্বলতার জায়গাটি হলো, কাল ও ব্যক্তি নির্বিশেষে পাশ্চাত্যের প্রত্যেককে ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কতকগুলো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কারণে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি মানব সভ্যতার এক বড়ো প্রতিনিধি। ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয় শক্তির হাজারো অপকীর্তি সত্ত্বেও একথা সত্য।
৩.
১৯৭৮ সালে সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পাঁচ বছরের মধ্যেই ‘সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যের মধ্যকার সাধারণ সম্বন্ধ পরিষ্কার হয়ে যায়’। ওরিয়েন্টালিজম রচনার সময়ে তিনি সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ক নিয়ে কাজ শুরু করেন। কিন্তু ওরিয়েন্টালিজম প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বের মুখোশ উন্মোচন হবার পর থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ভঙ্গি সাঈদকে প্রভাবিত করেছে আরো বেশ কিছু ধারণা জড়ো করতে। এ প্রয়াসের প্রাথমিক ফল হলো তাঁর ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে ধারাবাহিক বক্তব্যমালা। এ বক্তব্যগুলোর আরো পরিমার্জিত ফল হলো তাঁর কালচার ও ইম্পেরিয়ালিজম।
আফ্রিকা, ভারত, দূরপ্রাচ্যের অংশ বিশেষ, অস্ট্রেলিয়া এবং ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জ সম্পর্কে ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের লেখাগুলোকে গভীর পর্যালোচনা করেছেন। এসব লেখালেখি কিভাবে আফ্রিকাতাত্ত্বিক ও ভারততাত্ত্বিক তকমা তৈরি করে দূরবর্তী অঞ্চল ও তার অধিবাসীদের শাসন করার সাধারণ ইউরোপীয় প্রয়াসের অপকৌশল ব্যবহার করা হয় তা তুলে ধরেন। এ ছাড়া ইসলামি বিশ্বের প্রাচ্যবাদী বর্ণনার সাথে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, আয়ারল্যান্ড ও দূরপ্রাচ্যকে বর্ণনার বিশেষ ইউরোপীয় কৌশলের উপাদান ও মাত্রাগুলো চিহ্নিত করেন।
পশ্চিমারা যে কৌশল ব্যবহার করে প্রাচ্যকে তথা তৃতীয় বিশ্বকে শাসন ও শোষণ করে সে সম্পর্কটি স্পষ্ট করেন। এর মধ্যে ইউরোপীয় ‘রহস্যময় প্রাচ্য’-এর বর্ণনা আর ‘আফ্রিকীয় [অথবা ভারতীয়, কিংবা আইরিশ বা জ্যামাইকান কি চৈনিক] মানস’ সম্পর্কিত ছকবাঁধা বয়ানে, আদিম বা অসভ্য জনপদে সভ্যতা পৌঁছে দেয়ার ভণিতায়, চাবুক মেরে ফেলা বা প্রলম্বিত শাস্তির বিরক্তিককরভাবে পরিচিত ধারণায় যার দরকার হতো ‘তারা’ অসদাচরণ করলে, কারণ ‘তারা’ প্রসঙ্গত শক্তি বা সহিংসতার ভাষা সবচেয়ে ভালো বুঝত। ‘আমরা’ যেন ‘তারা’ সে রকম ছিল না। আর তারা দাবি করেন এ কারণেই ‘তারা’ ‘আমাদের’ হাতে শাসিত হতে বাধ্য।
শিল্পবিপ্লব ও তথাকথিত পশ্চিমা রেনেসাঁসের পর অ-ইউরোপীয় অঞ্চলে সাদাদের আগমন শুরু হয়। এর মধ্যে কোন কোন অঞ্চলে বাধাগ্রস্ত হলেও বেশির ভাগ জায়গায় বিনা বাধায় ব্যবসা বিস্তার করে এবং কৌশলে সংস্কৃতিকে স্থানীয়দের মধ্যে চাপিয়ে দিয়েছিল। উনিশশতকীয় আলজেরিয়া, আইসল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো বিচিত্র জায়গায় সংগঠিত হওয়া সশস্ত্র প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রায় সর্বত্র সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, জাতীয় পরিচয়ের ঘোষণা, আর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে স্বাধিকার ও জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের সাধারণ লক্ষ্যে সংগঠন বা দল গড়ে তোলার উল্লেখযোগ্য প্রয়াস চলছিল। এক্ষেত্রে কখনোই এমন ঘটেনি যে সাম্রাজ্যের সংঘাতে উদ্যমী অনুপ্রবেশকারীরা নিরীহ বা নিষ্কর্মা অ-পশ্চিম দেশি লোকদের ওপর চড়ে বসেছে। সর্বদা কোনো না কোনো ধরনের সক্রিয় প্রতিরোধ সচল ছিল, এবং অবিশ্বাস্য রকম সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে।
সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী সাধারণ বিন্যাস আরা সাম্রাজ্য-বিরোধী প্রতিরোধ সংগঠনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞান-এই দুই বিষয় এ বইয়ে এমন বিচিত্রভাবে তুলে আনার চেষ্টা করেছে যা ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থের পরিপূরক হয়ে থাকেনি। বরং ভিন্নতর কিছু করার সুস্পষ্ট প্রয়াস বা প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। এখানে তিনি ‘সংস্কৃতি’ কী ও এর প্রভাব অন্য দেশে বিশেষকরে অ-ইউরোপীয় অঞ্চলে সাদাদের সংস্কৃতি কিভাবে বিস্তার লাভ করে।
তিনি ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি দিয়ে দু’টি বিশেষ ধারণাকে বুঝিয়েছেন। প্রথমত, বর্ণনা, যোগাযোগ ও উপস্থাপনার কলাকৃতির ন্যায় সেই সকল চর্চাকে বোঝায় যেগুলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঞ্চল থেকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন এবং প্রায়শ আকৃত হয় নান্দনিকরূপে যার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বিনোদন। অবশ্য এর সাথে যুক্ত বিশ্বের দূরবর্তী অংশসমূহ সম্পর্কে জনপ্রিয় লোককাহিনীর ভাণ্ডার আর জাতিবিদ্যা, ইতিহাসবিদ্যা, ভাষাবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং সাহিত্যিক ইতিহাস প্রভৃতি জ্ঞানগর্ভ বিষয় থেকে প্রাপ্ত বিশেষায়িত জ্ঞান-এদের উভয়ই। যেহেতু উনিশ ও বিশশতকের আধুনিক প্রাশ্চাত্য সাম্রাজ্যসমূহ তার আলোচনার মূল লক্ষ্যবস্তু, সেহেতু তিনি বিশেষ করে উপন্যাসের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে লক্ষ করেছি। সেগুলো তার মতে, সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, সূত্র ও অভিজ্ঞতানির্মাণে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর মাধ্যম তিনি এটা দাবি করছেন না, শুধুমাত্র উপন্যাসই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বরং এটা ছিল সেই নান্দনিক বস্তু যার সঙ্গে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বর্ধিষ্ণু সমাজগুলোর যোগসূত্র, তাঁর বিশ্বাস, অধ্যয়নের পক্ষে দারুণ আগ্রহোদ্দীপক। আধুনিক বাস্তববাদী উপন্যাসের আদিরূপ হলো রবিনসন ক্রুসো আর অবশ্যই এটা দুর্ঘটনাক্রমে ঘটেনি যে, এই উপন্যাস একজন ইউরোপীয় ব্যক্তি সম্বন্ধে যে দূরবর্তী এক অ-ইউরোপীয় দ্বীপে নিজের জন্য এক জায়গায় স্থাপন করেছে।
এ বইয়ের মূল বক্তব্য অবশ্যই পশ্চিমা বিশ্বের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের সুনিপুণ কৌশল উন্মোচিত করা। আর এ বিষয়ে সুকৌশলে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন সমুদ্র অভিযাত্রীরা তাদের অভিজ্ঞতাকে নিজেদের মত করে উপস্থাপন করে। এ অভিজ্ঞতা বর্ণনার সময় তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে উচ্চমর্যাদাশীলরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর সাদা বর্ণের ঔপন্যাসিকরা চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রেও অ-ইউরোপীয়দের সম্পর্কে যা কিছু লেখেন তা পুরোপুরি কল্পকাহিনী। এগুলো উপনিবেশস্থ লোকদের আত্মপরিচয় ও নিজস্ব ইতিহাসের অস্তিত্ব বিঘোষণের কৌশলও হয়ে উঠেছে।
সাঈদের মতে, সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত যুদ্ধ অবশ্যই ভূমি নিয়ে। কিন্তু এ ভূমির মালিক কে, এতে বসতি স্থাপন ও কাজকর্মের অধিকারী কে, কে একে চালিয়ে নিচ্ছে, কে এটাকে পুনরায় অধিকার করেছে, এবং কে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা আঁটছে-এসব প্রশ্ন যখন উঠত তখন এগুলো সৃজিত, আলোচিত ও কখনো-বা নির্ধারিত হতো তাদের বয়ানের মধ্যে। একজন সমালোচককে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বললেন, জাতিসমূহ নিজেরাই আখ্যানকর্ম। আখ্যান রচনার কিংবা অন্যবিধ আখ্যানসমূহের সংগঠন ও আবির্ভাব রহিত করার ক্ষমতা সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদের কাছে খুব গুরুত্ব পায় আর উভয়ের মধ্যে অন্যতম প্রধান সংযোগসূত্র রচনা করে।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুক্তি ও আলোকায়নের মহা-আখ্যান উপনিবেশের বিশ্বে জনতাকে জাগ্রত হয়ে সাম্রাজ্যের বশ্যতাকে ছুঁড়ে ফেলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এ প্রক্রিয়ায় অনেক ইউরোপীয় ও আমেরিকান এসব কাহিনী ও এদের নায়কদের দ্বারা আন্দোলিত হয়েছেন এবং তারাও সাম্য ও মানব সম্প্রদায়ের নতুন নতুন আখ্যান রচনার সংগ্রামে ব্রতী হয়েছেন।
আরেকটি বিষয় হলো, প্রায় অগোচরভাবে সংস্কৃতি হলো শোধনকারী ও উৎকর্ষসাধক উপাদানসমন্বিত এক ধারণা, যা ১৮৬০ সালে ম্যাথ্যু আর্নল্ড সংজ্ঞায়িত করেছেন। আর্নল্ডের মতে, সংস্কৃতি হলো শ্রেয়তম জ্ঞান ও চিন্তার জন্য সমাজের রক্ষণাগার। আর্নল্ড বিশ্বাস করতেন যে, আধুনিক, উগ্র, বাণিজ্যমুখী ও দুর্ভাগ্য নির্মম নাগরিক অস্তিত্বকে পুরোপুরি প্রতিনিবৃত্ত না করতে পারলেও সংস্কৃতি একে লাঘব করে। দান্তে কিংবা শেকসপিয়র পড়ার কারণে জ্ঞান ও চিন্তার রাজ্যে যা কিছু সেরা তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার উদ্দেশ্যে আর নিজেকে, জনতাকে, সমাজ ও সংস্কৃতিকে সেরা আলোয় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। কালক্রমে প্রায়ই সহিংসভাবে রাষ্ট্র বা জাতির সাথে সংযুক্ত হয় সংস্কৃতি। এ ঘটনা প্রায় সবসময়ই কিছু মাত্রায় বিদেশীভীতিসহ ‘আমরা’ ও ‘তারা’-এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রচনা করে। এ অর্থে সংস্কৃতি পরিচয়ের একটি উৎস, এক সংগ্রামশীল উৎস যেমন ইদানীং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে ‘প্রত্যাবর্তন’-এ লক্ষণীয়। এসব ‘প্রত্যাবর্তন’ সঙ্গী হয় কঠোর বৃদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক আচরণবিধিমালার যেগুলো বহুসংস্কৃতিবাদ ও সংকরায়নবাদের মতো তুলনামূলকভাবে উদার দর্শনসমূহের সঙ্গে যুক্ত প্রশ্রয়প্রবণতার বিরোধী। সাবেক ঔপনিবেশিক বিশ্বে এসব ‘প্রত্যাবর্তন’ নানারকম ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী মৌলবাদের জন্ম দিয়েছিল।
সাঈদ তাই মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে এমনভাবে পাঠ করা সম্ভব যেন এরা অবিভক্ত ও সমসত্ত্ব নয়, আবার ক্ষুদ্রতর উপখণ্ডসমূহের সমষ্টি, ভিন্ন কিংবা পরস্পরবিচ্ছিন্নও নয়। প্রকৃত অর্থে ভারত হোক, লেবাননে বা যুগোশ্লাভিয়ায় কিংবা আফ্রিকাকেন্দ্রিক হোক, ইসলামকেন্দ্রিক বা ইউরোপকেন্দ্রিক ঘোষণাসমূহে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রজাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের বিরক্তিকর বিস্ফোরণ ঘটেছে; সাম্রাজ্য থেকে মুক্তির সংগ্রামকে মূল্যহীন করে তোলার তুলনায় বহুদূরে গিয়ে সাংস্কৃতিক ডিসকোর্সেও এ ক্ষুদ্রায়ন এক মৌলিক মুক্তিকামী শক্তির সারবত্তা প্রমাণ করে যা স্বাধীন হবার, অন্যায় আধিপত্যভারমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলার আকাক্সক্ষাকে উদ্দীপ্ত করে। যা হোক, এ শক্তিকে বোঝাবার একমাত্র উপায় ঐতিহাসিক বোধের বিপুল বিস্তার। আমাদের নিজেদের স্বরকে শ্রবণযোগ্য করে তোলার বাসনায় আমরা ভুলে যাই পৃথিবীটা একটা ভিড়ের জায়গা, এটাও যে যদি প্রত্যেকে নিজের স্তরের মৌলিকত্ব ও প্রাধান্যের ওপর জোর দিতে থাকত তবে আমাদের প্রাপ্তি হতো অনিঃশেষ যন্ত্রণার এক অস্বাভাবিক কোলাহল আর এক রক্তাক্ত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা যার প্রকৃত ভীতিপ্রদ চেহারা দেখা দিতে শুরু করেছে ইউরোপের এখানে সেখানে বর্ণবাদী রাজনীতির পুনরাবির্ভাবে, আমেরিকায় রাজনৈতিক শুদ্ধতা ও পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির বিসম্বাদে এবং আমরা নিজের এলাকার কথা বলতে গেলে, ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের অসহিষ্ণুতায় এবং সাদ্দাম হোসেন ও তাঁর বহু অনুকরণীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাধ্যমে ঘটা বিসমার্কীয় স্বৈরতন্ত্রের অলীক প্রতিশ্রুতিতে।
সুতরাং কী গুরুগম্ভীর ও উৎসাহব্যঞ্জক বিষয় এটা যেন শুধু নিজের পক্ষকেই পাঠ করা নয়, বরং এটাও অনুধাবন করা যায় যে কিপলিংয়ের মতো একজন মহৎ শিল্পী কী নিপুণ দক্ষতায় ভারতকে উপস্থাপন করেছেন, আর তা করতে গিয়ে কিভাবে তাঁর উপন্যাস কিম শুধু যে ইঙ্গ-ভারতীয় বাস্তবতার প্রেক্ষিতের লম্বা ইতিহাসের ওপর নির্ভর করেছে তাই নয়, নিজের অস্তিত্ব সত্ত্বেও এর মধ্যে যে বিশ্বাসের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ ভারতীয় বাস্তবতার প্রয়োজন ছিল এবং কম বেশি অনির্দিষ্টভাবে তা ব্রিটিশ অভিভাবকত্বের জন্য মিনতি করেছে-এর অগ্রহণযোগ্যতার পূর্বাভাব দিয়েছে। সাগরপাড়ের যে সমস্ত অধিকৃত এলাকার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নান্দনিক বিনিয়োগ ঘটেছে, তা সাঈদের মতে, সেসব জায়গায় রয়েছে বিরাট সাংস্কৃতিক অঙ্গন। যদি ১৮৬০ সালের দিকে ব্রিটিশ বা ফরাসি নাগরিক হতেন, তবে আপনি ভারত কিংবা উত্তর আফ্রিকাকে পরিচিত ও অপরিচিতের যুগলবন্দি হিসেবে দেখতেন ও অনুভব করতেন, কিন্তু তাদের আলাদা সার্বভৌমত্বের নিরিখে কখনোই তা করতেন না। আপনার বয়ান, ইতিহাস, যা উপনিবেশবাদী কর্মকাণ্ডের শুধু নয়, বরং বিদেশী ভূগোল ও জনতাকে যৌক্তিক করে তোলে এমন শক্তির এক প্রবল বিন্দু হিসেবে প্রতিভাত হতো। সর্বোপরি, আপনার ক্ষমতার চেতনা ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারত না ঐসব ‘স্থানীয়’ লোকেরা যারা সর্বদা অনুগত ছিল অথবা ছিল অগোচরে অসহযোগিতাপ্রবণ, তারা কখনো ভারত বা আলজেরিয়া ত্যাগ করতে আপনাকে বাধ্য করবে; অথবা এমন কিছু বলতে সক্ষম হবে যা হয়তো বলবৎ ডিসকোর্স-এর বিরুদ্ধতা, প্রতিরোধ, কিংবা অন্য অর্থে প্রতিস্থাপন করবে।
সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম অর্জন ছিল বিশ্বকে ছোট করে আনা। আর যদিও এ প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ও নেটিভদের মধ্যে বিচ্ছিন্নায়ন ছিল ছলনাপূর্ণ ও মূলগতভাবে অন্যায়, আমাদের বেশির ভাগই এখন সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে সাধারণ বলেই ধরে নেয়। আতঙ্ক, রক্তপাত, আর প্রতিহিংসা তিক্ততা সত্ত্বেও ভারতীয় ও ব্রিটিশদের, আলজেরীয় ও ফরাসিদের, পশ্চিমা ও আফ্রিকীয়, এশীয়, লাতিন আমেরিকান এবং অস্ট্রেলীয়দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্তরূপে একে বর্ণনা করাই হলো আসল কাজ।
উপনিবেশিত সমাজকে বিভক্ত করাও ছিল ঔপনিবেশবাদের একটি কৌশল মাত্র। আর সাঈদ এ গ্রন্থে প্রসঙ্গটিকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন এভাবে, ‘শ্রেণী বিভক্ত সমাজে যেখানেই সংখ্যালঘু সম্পত্তি মালিকরা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে সেখানেই সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসিত মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তারা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের আশ্রয় গ্রহণ করে।’ এ ধারণাটিকে তিনি আরো সম্প্রসারিত করে বলেন, ‘অধিকৃত দেশের জনগণের মধ্যে এমনভাবে শিক্ষা সংস্কৃতি চর্চার ব্যবস্থা করা ও বিকাশ ঘটানো যার ফলে তারা বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শাসক শক্তিকে নিজেদের জীবন, জীবিকা, শিক্ষা দেওয়া যাতে শারীরিক দিক দিয়ে তারা ভারতীয় হলেও চিন্তা-ভাবনা, সংস্কৃতির দিক দিয়ে তারা আর ভারতীয় থাকবে না, তারা হবে তাদের পশ্চিমা শাসকের মতোই।’
তিনি এ গ্রন্থে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে বলেন, ‘প্রত্যেক পশ্চিমা সাহিত্যিক, দার্শনিক, ঐতিহাসিকের মূল্যায়ন এভাবে করলে বলতে হয় যে তাদের কারও মধ্যেই আধিমানসিক সততা বলে কিছুই ছিল না ও নেই, প্রত্যেকেই মতলববাজ। এই দৃষ্টি থেকে দেখলে মেকেল ও কিপলিং এর সাথে সকলকেই এক করে দেখতে হয়।’
পরিশেষে এ কথা বলা যায়, এডওয়ার্ড সাঈদের কালচার ও ইম্পেরিয়ালিজ পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আড়ালে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে অ-ইউরোপীয় অঞ্চলে যেভাবে সাম্রাজ্যবাদকে বিস্তৃত করেছে তার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। তাঁর এ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে উপনিবেশিত ও সাবেক উপনিবেশিত দেশসমূহের জ্ঞান চর্চার এক অপরিহার্য গ্রন্থ যা প্রাচ্যের প্রতি অ-প্রাচ্যের ভবিষ্যৎ আগ্রাসন থেকে প্রতিরোধের কৌশল ও পথ দেখাবে।
তথ্যসূত্র:
এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ, কালচার এন্ড ইম্পেরিয়ালিজম, ভিনটেজ, যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৯৩
বেনজীর খান সম্পাদিত, এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ: আবিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর, সংবেদ, ঢাকা, ২০১৪
পিটার বেরী, বিগনিং থিওরি : সাহিত্য ও সংস্কৃতি তত্ত্ব পরিচিতি, ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউইয়র্ক, ২০০২
বিল এসক্রফট ও পল অ্যাসওয়ালা, এডওয়ার্ড সাঈদ, রোটলেজ, লন্ডন, ২০০৭
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘এডওয়ার্ড সাঈদ কেন গুরুত্বপূর্ণ’, নতুন দিগন্ত, দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, জানুয়ারি-মার্চ, ২০০৮
নূরুল আরেফিন, ‘ফিরে দেখা এডওয়ার্ড সাঈদ’, অক্টোবর ০৯, ২০১৫
ফয়েজ আলম, ‘একজন সাহসী ও মানবিক বুদ্ধিজীবীর মুখ’, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৪