জীবনের অলিন্দ পেরিয়ে মানুষকে একসময় চলে যেতে হয় মৃত্যুর ওপারে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজ প্রতিভা ও কর্মের গুণে আজীবনই থেকে যান মৃত্যুহীন। শারীরিকভাবে এসব মানুষ দূরে চলে গেলেও তাদের সৃষ্টিগুলো পড়ে থাকে এই পৃথিবীতে। যেগুলো প্রতিনিয়ত বিস্ময় উপহার দিয়ে যায় জীবন্ত মানুষকে। এই বিস্ময় হলো সীমাহীন লড়াইয়ের মাঝে বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত নেশার বিস্ময়। এই বিস্ময় হলো সকল অন্যায়-অত্যাচারকে ভেঙে নিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এক নিরন্তর লড়াইয়ের বিস্ময়। বাংলাদেশের সাংষ্কৃতিক জগতে আমজাদ হোসেন (১৯৪২-২০১৮) তেমনি এক বিস্ময়কর প্রতিভার নাম। শিল্পের প্রায় প্রতিটি শাখায় যিনি রেখেছেন তুমুল প্রতিভার স্বাক্ষর। হয়েছেন সব্যসাচী। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, গান ও চলচ্চিত্রকে শাসন করেছেন রাজার মতো, হয়েছেন মুকুটহীন সম্রাট।
খুব ছোটবেলা থেকেই শিল্পের প্রতি গভীর অনুরক্ত আমজাদ হোসেনের সাহিত্যচর্চা শুরু হয় ছড়া লেখার মাধ্যমে। তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় তার লেখা প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয় ‘আজাদ’ পত্রিকার শিশুদের পাতায়। এরপর ১৯৫৩ সালে মেট্রিক পাস করার পর কলকাতার বিখ্যাত দেশ পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হয়। সম্পাদক সাগরময় ঘোষ কবিতাটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আমজাদ হোসেনকে কলকাতায় স্থায়ী হবার আহ্বান জানান। কিন্তু দেশ-মাতৃকার প্রতি গভীর মমত্ববোধের অধিকারী আমজাদ হোসেন সে আহ্বান ফিরিয়ে দিয়ে রয়ে গেলেন এই বাংলাদেশের মাটিতেই এবং হয়ে গেলেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সুখ-দুঃখের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরপর ১৯৫৯ সালের দিকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চা শুরু করেন এবং লিখে ফেলেন ভাষা আন্দোলনের ওপর ‘ধারাপাত’ নামক এক কালজয়ী নাটক। যার গল্প দিয়ে পরবর্তীতে ‘রূপবান’ খ্যাত পরিচালক সালাহ উদ্দিন ‘ধারাপাত’ নামক সিনেমাও নির্মাণ করেন। এখানে নায়ক হিসাবে আমজাদ হোসেন অভিনয়ও করেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আমজাদ বাংলা সাহিত্যের দুর্দমনীয় এক নাম। কথাসাহিত্য বিশেষ করে গল্প, উপন্যাস ও নাটক রচনায় তিনি অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের সমকালীন জীবন, রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতা আমজাদ হোসেনের লেখার বিষয়বস্তু। সমাজের ভেতর ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন কুসংস্কারের জাঁতাকলে আটকে থাকা নিম্ন বর্গের মানুষদের জীবনচিত্র তাঁর সাহিত্যে ফুটে উঠেছে। ছাত্রজীবনে বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন, ফলে আমজাদ হোসেনের লেখায় শোষিত বা সর্বহারা মানুষদের প্রতিবাদী চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। ‘নিরক্ষর স্বর্গ’ তার এই ধারার একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। এখানে শোষকের অত্যাচারী হাত থেকে সাধারণ মানুষের ফুঁসে ওঠার চিত্র দেখা যায়। এ ছাড়াও ‘অবেলায় অসময়’, ‘উত্তরকাল’, ‘ফুল বাতাসী’, ‘রক্তের ডালপালা’, ‘শেষ রজনী’, ‘মাধবীর সংবাদ’, ‘যুদ্ধে যাবো’ তার অন্যতম সব বিখ্যাত উপন্যাস। বাংলাদেশের রাজনীতির অগ্নিপুরুষ মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর উপর লেখা ‘মওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি’ তাঁর একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী রচনা। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও গণ-আন্দোলনের এক বিশুদ্ধ পরিচয় পাওয়া যায়। এ ছাড়া বাংলা ছোটগল্পেও আমজাদ হোসেনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। নির্বাচিত গল্পসহ আরও অনেক গল্প প্রকাশিত হয়েছে। বলা যায়, সাহিত্যের যে শাখায়ই তিনি হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। ছোটদের জন্য তিনি রচনা করেছেন অসাধারণ সব মুক্তিযুদ্ধের গল্প ‘জাদুর পায়রা’ ও ‘জন্মদিনের বেলুন’ নামে তাঁর দুটি শিল্পসফল কিশোর উপন্যাসও রয়েছে। বাংলা নাটকেও তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর রচনায় নির্মিত অসংখ্য নাটক টেলিভিশনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। জব্বার আলী সিরিজের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়।
সাহিত্যিক আমজাদ হোসেনের পরিচয় ছাপিয়ে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনই বেশি জীবন্ত। বাংলাদেশের সিনেমা জগতের এক অবিসংবাদিত অধ্যায় হিসাবে তিনি চিরদিন অমর থাকবেন। সর্বগুণে গুণান্বিত এই মহান ব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্রের কাহিনী রচনা, পরিচালনা ও অভিনয় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, বাংলা চলচ্চিত্রকে তিনি করেছেন সমৃদ্ধ। মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ ছবির মধ্য দিয়ে তার রূপালী জগতে আগমন। এরপর অভিনয় করেন মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ সিনেমায়। মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালীন যে সিনেমা স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন জোয়ার এনেছিল, জহির রায়হান পরিচালিত সেই ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমার কাহিনীকার ও সংলাপ রচয়িতা ছিলেন এই আমজাদ হোসেন। গ্রাম-বাংলার নিটোল ভালোবাসার অন্যতম কালজয়ী ছবি ‘সুজন সখী’রও কাহিনীকার ও সংলাপ রচয়িতাও তিনি। পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে নির্মিত ‘বেহুলা’ সিনেমার রচয়িতাও আমজাদ হোসেন। এ ছাড়া ‘আনোয়ারা’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘জয়যাত্রা’, ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’র মত সুপারহিট সিনেমাগুলোর কাহিনীর রচয়িতা তিনি।
অভিনেতা আমজাদ হোসেনও কোন অংশে কম নয়। ‘জীবন থেকে নেয়া’র মধু ভাই চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় আজো বাংলার দর্শকদের মনে গেঁথে আছে। হারানো দিন, বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, প্রাণের মানুষের মত দর্শকপ্রিয় সব সিনেমাতেও তিনি সাবলীল অভিনয় করেছেন।
১৯৬৭ সালে আমজাদ হোসেন প্রথম ‘জুলেখা’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করেন। প্রথম ছবিতেই নির্মাতা হিসাবে বোদ্ধাদের প্রশংসা অর্জন করেন। এরপর থেকে একে একে বাল্যবন্ধু, পিতাপুত্র, এই নিয়ে পৃথিবী, বাংলার মুখ, নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, জন্ম থেকে জ্বলছি, দুই পয়সার আলতা, সখিনার যুদ্ধ, ভাত দে, হীরামতি, প্রাণের মানুষ, আদরের সন্তান, সুন্দরী বধূ ও কাল সকালের মতো অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর এসব সিনেমাগুলো বাণিজ্যিক ধারায় সফলতা অর্জনের পাশাপাশি সমালোচকদের মনও জয় করেছিল। শিল্পমান সমৃদ্ধ এসব সিনেমাগুলোতে আবহমান গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ ফুটে উঠেছে। ফলে দর্শক হুমড়ি খেয়ে সিনেমাগুলো দেখতে হলে যেতো।
১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেন নিজের লেখা ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’ উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে নির্মাণ করেন তার সেই বিখ্যাত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমাটি। ফারুক, ববিতা, আনোয়ারা, রওশন জামিল ও এটিএম শামসুজ্জামান প্রমুখ অভিনীত এই ছবিটি দারুণ ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করে। পাশাপাশি কালজয়ী সিনেমা হিসাবে স্থান করে নেয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর প্রতিনিধি, অসহায় নারী গোলাপীর সংগ্রামমুখর জীবন কাহিনীর এক বিশ্বস্ত দলিল এই সিনেমাটি। এখানে সেলুলয়েডের গোলাপী যেনো বাংলাদেশের অসংখ্য অসহায় নারীর প্রতিনিধি। যারা প্রতিকূল পরিবেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপক্ষে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যায়। তবুও হার মানতে চায় না। ধর্মীয় গোঁড়ামিও এসব গোলাপীকে টিকে থাকার লড়াইয়ে বাধা দিতে পারে না। বিখ্যাত এই সিনেমাটি বাণিজ্যিক সফলতার পাশাপাশি এগারোটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে ভীষণভাবে আলোচিত হয়। এই সিনেমার ‘হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ’ গানটি এখনো বাংলার মানুষের মুখে মুখে।
আমজাদ হোসেন পরিচালিত আরেকটি নন্দিত সিনেমা হলো ‘নয়নমনি’। ১৯৭৬ সালে নিজের লেখা ‘নিরক্ষর স্বর্গে’ উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে তিনি এই সিনেমাটি নির্মাণ করেন। সমতাহীন সমাজব্যবস্থা, কুসংস্কার ও সমাজপতিদের প্রভাব এ সিনেমার মূল উপজীব্য। সমাজপতি মন্ডল মোড়ল বিপ্লবী নয়নকে কমিউনিস্ট বলে গালি দেয়। চক্রান্ত করে পাগল বানিয়ে দেয়, তবুও বিপ্লবী নয়ন তার আন্দোলন থেকে পিছু হটেনি। ছবিটি শেষ হয় একটি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে, যে বিপ্লব সকল অন্যায়, অত্যাচারকে দূর করে ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। ছবিটির শেষ দিকের একটি সংলাপ ‘ওই মশাল নিয়ে চল’। এই মশাল হলো পরিবর্তনের মশাল। ফারুক এবং ববিতা অভিনীত এই ছবিটিও বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
১৯৮২ সালে আমজাদ হোসেন নির্মাণ করেন আরেকটি সফল সিনেমা ‘দুই পয়সার আলতা’। মা-বাবা হারা গ্রামের অনাথ মেয়ে কুসুমের জীবন সংগ্রাম এই সিনেমার মূল উপজীব্য। কঠোর সামাজিক অনুশাসনের ফলে কুসুমের ভালোবাসার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যায়। যৌতুকের কারণে বারবার কুসুমের বিয়ে ভেঙে যায়। ফলে তাঁর উপর নেমে আসে চাচা-চাচীর অমানুষিক নির্যাতন। রাজ্জাক-শাবানা ও আনোয়ারা অভিনীত এ ছবিটিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়। আমজাদ হোসেনের এই ধারার ‘সুন্দরী’ ও ‘ভাত দে’ সিনেমাগুলোও কালজয়ী চলচ্চিত্রের আওতাভুক্ত। এসব সিনেমাগুলোতে নারী নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। ‘ভাত দে’ সিনেমাতে মা-বাবা হারা জরীর অন্তহীন জীবন সংগ্রাম দেখা যায়। যেখানে জরীর মুখে এ সমাজ একটু অন্ন দিতে পারে না কিন্তু অন্ন চুরির দায়ে শাস্তি কিন্তু ঠিকই দিতে পারে। তবুও জরী প্রতিবাদ করে। ভাত দে….
‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ আমজাদ হোসেনের আরেকটি কালজয়ী সিনেমা। এ ছবিতে আমজাদ হোসেন দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার অসহযোগ আন্দোলনের সময় বেলাল নামক এক শিল্পী জাগরণের গান গেয়ে মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। হানাদারেরা বেলালের মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে হত্যা করে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও বেলালের স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তাঁর বন্ধুরা দুই নাম্বারি করে অনেক টাকা উপার্জন করে। কিন্তু সৎ মানুষ বেলাল হয়ে যায় মৃতপ্রায়। বুলবুল আহমেদ ও ববিতা অভিনীত এ সিনেমাটি ব্যাপক বাণিজ্যিক সফলতা অর্জন করে পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও অর্জন করে। এই ছবিটি তিনটি শাখায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার লাভ করে।
বাংলা সিনেমার অন্যতম দিকপাল এই মহান শিল্পী চলচ্চিত্রের কাহিনী লেখা ও পরিচালনার পাশাপাশি অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গানের রচয়িতা ও সুরকারও। তাঁর লেখা ও সুর করা বিখ্যাত গানের তালিকাও অনেক দীর্ঘ। আমি আছি থাকবো ভালোবেসে মরবো, একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, কেউ কোনদিন আমারেতো কথা দিল না, কিংবা ‘দুই পয়সার আলতা’ সিনেমার ‘এমনোতো প্রেম হয়’, ‘এই দুনিয়া এখনতো আর সেই দুনিয়া নাই’। এসব গান বাংলা সিনেমার তথা বাংলা গানের ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ। এছাড়াও ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ সিনেমার টাইটেল গান ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়’, এবং ‘আদরের সন্তান’ সিনেমার ‘সময় হয়েছে ফিরে যাবার’ গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
শিল্পকলায় অবদানের জন্য মহান এ শিল্পী বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো পুরস্কারই অর্জন করেছেন, সর্বমোট বারোবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পদকেও ভূষিত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে মহান এই শিল্পীর অবদান চিরদিন বাঙালির মনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে থাকবে বলে মনে করি।