আফ্রিকা পশ্চিমা শিল্প সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু একই সঙ্গে তার নিজস্বতাকে ধারণ ও লালন করার ব্যাপারে সে শতভাগ একনিষ্ঠ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমনকি বিভিন্ন সময় ঔপনিবেশিকদের দ্বারা আমদানিকৃত ধর্মগুলোর প্রতিও আফ্রিকা ঈর্ষণীয়ভাবে সুনম্য। তবে এর নিজস্বতাকে আফ্রিকা অখণ্ডই রাখতে বদ্ধপরিকর। এ প্রসঙ্গে লিওপোল্ড স্যাঁদার স্যাঁগরের আফ্রিকি মুসলমানদের ব্যাপারে একটি উক্তি স্মর্তব্য : : African Moslems must work to restore Islam, its mystic and humanistic level while bringing it into harmony with the African spirit(আফ্রিকার কবিতা, ৩৪)। এই যে, Synthesis বা সংশ্লেষণ এটিই আফ্রিকাকে মহত্ত্ব দান করেছে, আফ্রিকাকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে অন্যান্যদের মধ্যে।
আফ্রিকার বিশেষত্ব হলো এর সমাজব্যবস্থার মধ্যে জাতীয়তা বোধের তীব্র আকাক্সক্ষা নিহিত আছে। কিন্তু সমাজতন্ত্রবাদ ও বোধের চর্চাও এখানে শাশ্বত। আফ্রিকিদের ঈশ্বর কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এ ঈশ্বর সবার। তবে যখন যে যেভাবে ঈশ্বরকে দেখে, তখন সে ঈশ্বর ঠিক তারই এবং তার মতোই। এখানকার ভূমি কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তবে সেই ভূমিতে যখন কেউ ফসল ফলায় তখন সেটা তার নিজের। এখানে গোত্র প্রধানের সঙ্গে ঈশ্বরের চুক্তি হয় ভূমির অধিকার নিয়ে। তবে সে অধিকার গোত্র প্রধানের নয়, এটি গোত্রের সকল সদস্যের। একজন আফ্রিকি ইউরোপীয় বেশ ভূষায় সজ্জিত হতে পারে। কিন্তু ড্রাম বেজে উঠলেই তার রক্তে জেগে ওঠে আফ্রিকার আত্মা।
আফ্রিকিদের কেউ নেটিভ বলুক-এটা তারা আদৌ পছন্দ করে না। আবার কেউ তাদের কৃষাঙ্গ বা নিগ্রো বলুক সেটাও তাদের কাছে গ্রহণীয় নয়। ‘তারা কেবলমাত্র আফ্রিকান নামেই অভিহিত হতে চায়’ (গান্থার ১০)। জন গান্থার ১৯৬৯ সালে তাঁর Inside Africa গ্রন্থে বলেন, আমেরিকায় প্রতি দুই মিনিট তিন সেকেন্ডে একটি করে মোটরগাড়ি চুরি হয়। এদিক থেকে নৈতিক বোধ বিবেচনায় আফ্রিকিরা অনেক উন্নত। কোন কোন পশ্চিমা ইতিহাসবিদ আফ্রিকিদের আক্রমণাত্মক বলে অভিহিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে এটি সহজেই অনুমেয় যে, তাদের মনের গভীরে প্রোথিত নিরাপত্তাহীনতার তীব্র বোধ থেকে এরূপ আচরণে তারা উদ্যত হয়। সাদাদের অতিরিক্ত প্রীতির প্রতিও তারা অতীত অভিজ্ঞতার ভীতি থেকেই সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে।
ঔপনিবেশিকরা যখন আফ্রিকার ইতিহাসের কথা বলেন তখন তারা দুরভিসন্ধি নিয়েই আলোচনা শুরু করেন আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার সময় থেকে। মুসলমান ঔপনিবেশিকরা আফ্রিকায় এসেছে সপ্তম শতকে বণিকের বেশে। আর ইউরোপীয়রা এসেছে পঞ্চদশ শতকে যদিও সপ্তদশ শতকে এরা মহাসমারোহে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ যেমন ঘানা, কেনিয়া, তানজানিয়া, সুদান, মালি ইত্যাদি দেশে বিস্তৃত করতে থাকে তাদের ব্যবসায়িক জাল। আফ্রিকার ইতিহাসের কথা বলতে গেলে এর প্রাচীন ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করা অপরিহার্যরূপেই জরুরি। প্রাচীন ইতিহাসের বীর যোদ্ধা হানিবাল যিনি রোমানদের পরাস্ত করেন, সেবার রানী যিনি রাজা সোলায়মানের বিজ্ঞতার দ্বারা মুগ্ধ হয়েছিলেন, রানী নেফারতিতি, যোদ্ধা রাজা শাকা, জ্ঞানী গল্পকথক ঈশপের শিকড় তো আফ্রিকাতেই। আফ্রিকিদের মধ্যে শিক্ষাদান প্রক্রিয়াও আলাদা ছিল। যেখানে গ্রিকরা অ্যাকাডেমি খুলে তাদের সন্তানদের শিক্ষা দিয়েছে, সেখানে আফ্রিকিরা কেবল প্যারাবল শুনিয়ে তাদের সন্তানদের শিক্ষাদান কার্য সম্পাদন করেছে। ইতিহাসের পাঠ প্রদানের জন্য প্রতিটি গ্রামে ছিল Griot ও Griottess. অবসর বিনোদনের জন্য তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কারও হয় আফ্রিকাতেই। কাঠের ড্রামের তালে তালে নাচের উদ্ভবও এখানেই। খ্রিস্টধর্মের প্রধান প্রচারক সেইন্ট অগাস্টিন ও তার মা সেইন্ট মনিকার শেকড় তো আফ্রিকার মাটিতেই। এগুলো ধীরে ধীরে গ্রিক ও রোমানরা নিয়েছে। হানিবালের বিজয়ের মধ্যে দিয়ে রোমান সাম্রাজ্য আফ্রিকাভুক্ত হলে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। পরবর্তীতে ৭ম ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে যথাক্রমে আরবীয় ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের আগমনের মধ্য দিয়ে আফ্রিকা তার নিজস্বতা হারানো ও বিকৃতির অপচেষ্টার শিকারে পরিণত হওয়ার অধ্যায়ে প্রবেশ করে। আরবীয়রা চাপিয়ে দেয় তাদের ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ। তবে সমগ্র আফ্রিকার মধ্যে ঐক্যের সূত্র হিসেবে এই আরবদের ইসলাম ধর্ম ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। জন গান্থার মনে করেন, আফ্রিকার ঐক্যবন্ধনের বড় একটা সূত্র হচ্ছে ইসলাম (৭)। আবার ইউরোপীয়রা চাপিয়ে দেয় নিপীড়নের স্টিম রোলার আর বাইবেল। আরবীয় বণিকদের প্রভাবে আফ্রিকিরা তাদের নিজস্ব ধর্ম, বিশ্বাস-ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির অনেকটা হারিয়ে বসে। আর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে আফ্রিকা হয়ে পরে ট্রমাক্রান্ত। এতে আফ্রিকার ভৌত পরিবর্তনের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনও ঘটে অনেক।
এ কথা তো সত্য যে, আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসন চর্চা স্থানীয় জাতীয়তাবাদের পথ প্রস্তুত করে। ঔপনিবেশিকরা নিজেদের স্বার্থেই যোগাযোগের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছে, ম্যালেরিয়ার ঔষধ আবিষ্কার করেছে, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার পথ দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থার ছক প্রদান করেছে, শিক্ষা-ব্যবস্থার সূচনা করেছে, গোত্রবিবাদ নিরসনের ব্যবস্থা করেছে। এত এত কাজ করার পরও ওপনিবেশিকদের আফ্রিকা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে কেন? এর প্রথম উত্তর হলো, নীতিগতভাবেই এক দেশ অন্য আরেক দেশকে শাসন করতে পারে না। আর ঔপনিবেশিক শাসন শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই ছিলো দমন-পীড়ন-শোষণমূলক। এটি আফ্রিকিদের আত্মবিস্মৃত জাতিতে পরিণত করার প্রকল্প বৈ কিছু নয়। এই সত্যোপলব্ধিই আফ্রিকিদের স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেছে।
ইতিহাসের পাঠও যে ঔপনিবেশিক তৎপরতা ও এর স্বার্থ রক্ষার জন্য কলুষিত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। আফ্রিকার ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া আরও নগ্ন হয়ে উঠেছে। নানা অভিঘাতে আফ্রিকার মিথ, লোকসাহিত্য, গল্প ইত্যাদিকে দাবিয়ে রাখার সব চেষ্টাই করেছে ইংরেজ, ফরাসি ও পর্তুগিজ শাসকেরা। এই দমন-পীড়নের প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন ও তার অবস্থান জানিয়ে দিতেই আধুনিক আফ্রিকি সাহিত্যের জন্ম। এ প্রসঙ্গে J. N. Nkengasong বলেন, It is often asserted that African Literature was born in the cradle of adversity as an instrument of protest against colonial exploitation and cultural domination. যেহেতু ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে আফ্রিকার জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ঘটে, তাই আফ্রিকি সাহিত্যেও অস্থিমজ্জায় রাজনৈতিক সঙ্কট, তীব্র সাংস্কৃতিক চেতনা ও আত্ম-পরিচয় স্থাপনের সংগ্রামের ঝাঁঝ পাওয়া যায়।
আফ্রিকার সাহিত্য বলতে এর মৌখিক সাহিত্যকেই বুঝানো হয়। এর লিপিবিহীন ভাষার উপস্থিতি জায়গা করে দেয় ঔপনিবেশিকদের ভাষাগুলোকে। বর্তমানে আফ্রিকার প্রায় সবগুলো দেশের সংবিধানই বিদেশি ভাষায় রচিত। দুই হাজারেরও বেশি ভাষার আফ্রিকার লিংগুয়া ফ্রাংকাও বিদেশি ভাষা। আফ্রিকাকে বিদেশি ভাষাভাষী মহাদেশ বললে ভুল হবে না। কেবলমাত্র ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকি মৌখিক ভাষার লেখ্যরূপ উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। বিশ শতকে এসে এই প্রচেষ্টা বেগবান হয়। ইগবো ভাষার উপন্যাস Omennko এবং Ala Bingo প্রকাশিত হয় ১৯০৫ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে। তবে এই উদ্যোগও স্তিমিত হয়ে পড়ে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে। এর কারণ দুটোÑ রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। ঔপনিবেশিকদের ব্যবসার প্রসার, পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং তা স্থানীয়দের জন্য অপরিহার্য করে তোলার মধ্যে এর সাফল্যের অনেকটাই বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত হলো, স্থানীয়রাও ইতোমধ্যে বিদেশি ভাষা বলতে, লিখতে, পড়তে শুরু করেছে, পশ্চিমা প্রপঞ্চের লেখ্যরূপের সাহায্যে যোগাযোগের আওতা বৃদ্ধি করে চলেছে। বিদেশি ভাষার রসদ সংগ্রহের ব্যাপারে আফ্রিকার অতি উৎসাহ এর স্থানীয় ভাষাকে প্রান্তের দিকে ঠেলে দেয়। কেন্দ্র দখল করে নেয় ঔপনিবেশিকদের ভাষা। ফলস্বরূপ, বর্তমানে আফ্রিকার কোনো দেশেই এর কোনো স্থানীয় ভাষা দাপ্তরিক বা অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে পুরোপুরিভাবে সুবিধে করে উঠতে পারেনি। এমনকি আফ্রিকার ভাষা আফ্রিকি সাহিত্যেরও ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি।
১৯৬২ সালের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, আফ্রিকি সাহিত্যের ভাষা কী হবে? অনেকেই মত দেন স্থানীয় ভাষার পক্ষে, আবার কেউ কেউ বিদেশি ভাষার পক্ষে। চিনুয়া আচেবে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের পক্ষেই অবস্থান নেন। সারা জীবন লিখেও যান ইংরেজিতে। তাঁর প্রবন্ধ ‘The African writer and the English Language’ এ ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের পক্ষে বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, এই ভাষা আফ্রিকার ভাবনা ও মানসকাঠামোকে ধারণ করতে সক্ষম। তবে কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে, আচেবে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে আফ্রিকি সাহিত্যকে Misguide করেছেন বা বিপথে চালিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে Obi Wali বলেন,
…until these writers and their western midwives accept the fact that true African literature must be written in African languages, they would be merely pursuing a dead end, which can only lead to sterility, uncreative and frustration.
নগুগি ওয়াথিয়োঙ্গও বিশ্বাস করেন, আফ্রিকি সাহিত্য আফ্রিকি ভাষাতেই লেখা হওয়া উচিত। যদিও আচেবে, আমা আটা আইডু প্রমুখ মনে করেন যে, আফ্রিকি সাহিত্য ইংরেজিতেও লেখা হতে পারে। আফ্রিকায় প্রায় ২০৩৫টি ভাষা আছে। অনেকগুলো ভাষা এখনো অনাবিষ্কৃত। অনেকগুলো ভাষা এত অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রচলিত যে, সেগুলো উদ্ধার করার জন্য সরকারের তরফ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগও নেই। নাইজেরিয়াতেই প্রচলিত আছে ৫০৫টি ভাষা। কিন্তু সেগুলোর নিজস্ব কোনো লিখিত রূপ নেই। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলোর কোনোরূপ সদিচ্ছাও দৃশ্যমান নয় এই ভাষাগুলো থেকে লিংগুয়া ফ্রাংকা নির্বাচন করার। এর পেছনের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য নয়। পুঁজিবাদী সমাজে সবকিছুর মতো শিল্প-সংস্কৃতিকেও পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। তাই বাজার ব্যাপারটা বেশ বড় একটা বিষয়। বাজার যত বিস্তৃত হবে কর্পোরেটের পকেটের স্বাস্থ্যের ততো উন্নতি ঘটবে। আর এই বাজার বিস্তরণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ইংরেজি ভাষা। তাই বৃহত্তর বাজারে ঢুকে পড়ে অর্থ সমাগম বাড়ানোর উদ্দেশ্যও লেখককে ইংরেজি ভাষায় আশ্রয় নিতে প্রলুব্ধ করে। তবে এর যে বিরুদ্ধ-প্রপঞ্চ তৈরি হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। এজেন ওয়া-ওহায়েটোর মতে, আচেবের ইংরেজি লেখা ও এর পেছনে তার সাফাই গাওয়া সত্যিই বিরক্তিকর (১২২)। তবে তিনি এটিও বলেছেন যে, সাহিত্যকে বাণিজ্যিকীকরণের প্রচেষ্টা হিসেবে আচেবের অবস্থান ঠিকই আছে।
এই উপলব্ধির মধ্যেও আফ্রিকার মহত্ত্ব নিহিত আছে। আফ্রিকা আজ বুঝতে পারছে যে, সে বিশ্বের পুঁজিবাদী শক্তির দুরভিসন্ধির শিকার। এর নানান জায়গা থেকে অনেক শক্তিশালী কণ্ঠ ধ্বনিত হচ্ছেÑ এটিও কম নয়। আধিপত্য চর্চার বাইনারি অপজিশন হিসেবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ৎবংরংঃধহপব তৈরি হবেই। আফ্রিকার সাহিত্য-সংস্কৃতির সংজ্ঞাও তৈরি করতে চেয়েছে বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা শক্তি। এ প্রসঙ্গে জেমস টিসাইয়র বলেন, Literary and cultural production in and about Africa has always been mediated by a complies of historical contingencies some of which are outside the cultural orbit of the continent’ (xi). আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের অবস্থার জানান দেয়ার শক্তিশালী প্রচেষ্টা হিসেবে আফ্রিকি সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিজেকে বিশ্বের কাছে জাহির করছেÑ এটাও কম সামর্থ্যরে ব্যাপার নয়।
আফ্রিকাকে অপব্যাখ্যা, বিকৃতভাবে উপস্থাপন, দাসের খনি ও শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত করার কাজ যে শুধু ইউরোপীয় রাজনীতিকরাই করেছে, তা নয়। ডারউইন, ফ্রবেনিয়াস, রোপার, গোবিনিও, হেগেল, হিউম, লক, মন্টেস্কু, ভলতেয়ারের মত দার্শনিকেরাও একে কালো/অন্ধকার/অসভ্যতা/অমানব/নরক ইত্যাদির সঙ্গে সাযুজ্য দেখাতেও কার্পণ্য করেননি। এঁদের দর্শনকে সাহিত্যরূপ দিয়ে আফ্রিকাকে পাকাপোক্তভাবে অমানবের স্তরে নামাতে চেষ্টার বাকি রাখেননি অনেক ইউরোপীয় সাহিত্যিক। জোসেফ কনরাড, জয়েস ক্যারি, এলসপেথ হাক্সলে, ফ্রেড মাজডেলানি, গ্রাহাম গ্রিন, রবার্ট রুয়ার্ক প্রমুখ তাঁদের সাহিত্যকর্মে আফ্রিকাকে ভাষাহীন, প্রপঞ্চহীন, লিপিহীন, আলোহীন, সভ্যতাহীন বর্বর, ভাঁড় ও তথাকথিত পশ্চিমা ভদ্রলোকের কাতারে দাঁড়ানোর সম্পূর্ণরূপে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
কাজেই আফ্রিকা যে শুধু বেয়নেটের খোঁচায় বা বুলেটে রক্তাক্ত হয়েছে- তা নয়। এটি পশ্চিমা দর্শন, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মনগড়া ইতিহাসের গোলাতেও জর্জরিত ও বিধ্বস্ত হয়েছে, বিকৃত হয়েছে। সুতরাং আফ্রিকার যুদ্ধ বন্দুকের সঙ্গে শুধু নয়, এ যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি প্রপঞ্চের সঙ্গে প্রপঞ্চের যুদ্ধ, এটি বয়ানের সঙ্গে বয়ানের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে এখন আফ্রিকা বেশ ভালোভাবেই নেমেছে। নিজের সাহিত্য-সংস্কৃতির শক্তিশালী প্রতিনিধিও তৈরি করেছে। এঁরা তাদের চুরি হওয়া ইতিহাসের পুনরুদ্ধারে নেমে পড়েছেন। ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে যে Historical amnesia ঘটেছিল তা থেকে আফ্রিকা জেগে উঠছে। ঔপনিবেশিকদের চাপিয়ে দেয়া Other এর খোলস ভেঙে self এ আবির্ভূত হচ্ছে। এখানেই আফ্রিকার মহত্ত্ব।
তথ্যসূত্র:
Emma, Celli Damage and Davidson Meagan. ‘African languages and African Literature.’ DOI:http://dx. doi.org/10.4314/ujah. v12i1.7. web.
Nkengasong, J.N. “Desolate Realities” in Postcolonial Identities Edited by Smith and Ce(ed). Nigeria: Handel, 2014. Print.
Ohaeto, Ezenwa. Chinua Achebe: A Biography. 1991.
Tsaaior, James Tar. African Literature and the Politics of Culture. Newcastle: Cambridge Scholars Publishing, 2013. Print.
জন গান্থার, আফ্রিকার অভ্যন্তরে (অনু), চৌধুরী শামসুর রহমান, ঢাকা: বুক ভিলা, ১৯৬৯।