হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) বাংলা কথাসাহিত্যের এক অনন্য নন্দিত কথাশিল্পী । তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হুমায়ূন আহমেদ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক ও নির্যাতনের শিকার হন। অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরে আসেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্মর হুমায়ূন আহমেদের লেখায় ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের বিবিধ প্রসঙ্গ। শুধু লেখায় নয়, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ চিত্রায়িত করেছেন সম্পূর্ণ কৃত্রিমতা বর্জিত সহজ-সরল ও সর্বজনগ্রাহ্যরূপে।
হুমায়ুন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যসসমগ্র গ্রন্থে মোট ৬টি উপন্যাস সংযোজিত হয়েছে। এগুলো হলো শ্যামল ছায়া (১৯৭৩), নির্বাসন (১৯৮৩), সৌরভ (১৯৮৪), ১৯৭১ (১৯৮৬), সূযের্র দিন (১৯৮৬) ও আগুনের পরশমনি (১৯৮৮), এর বাইরে তাঁর অন্য দুইটি বৃহৎ কলেবরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস হলো অনিল বাগচীর এক দিন (১৯৯২) এবং জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৬)। নিচে হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যসসমগ্র গ্রন্থের ৬টি উপন্যাস সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো।
শ্যামল ছায়া :
হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া উপন্যাসে একদল মুক্তিসেনার বিপদসংকুল অভিযাত্রার ধারা বর্ণিত হয়েছে। যেখানে মুক্তিবাহিনীর একটি দল রাতের বেলা নৌকাযোগে রামদিয়ার দিকে ছুটছে। ঝুপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দাঁড় টেনে চলেছেন হাসান আলি নামের একজন।
হঠাৎ দূরে একটা নৌকার আওয়াজ শুনে সচকিত হয়ে ওঠে দলের সবাই। হাসান আলির শ্রুতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। অনেক দূরের স্পিডবোটের মৃদু শব্দও তার কানকে ফাঁকি দিতে পারে না। হাসান আলি নৌকা থামিয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করে। এ এলাকায় মিলিটারিরা স্পিডবোট ছাড়া চলাচল না করলেও রাজাকাররা নৌকা নিয়ে লুটপাট করে। তাদের প্রধান টার্গেট মেঘালয়গামী নৌকাগুলো। অতর্কিত হামলা করে টাকা-পয়সা, গয়না-গাটিসহ মেয়েদের ধরে নিয়ে যায় তারা। প্রতিটি নৌকার গুমোটভাব ছাপিয়ে ওঠে কারো বেসুরো কান্নার শব্দে। হয়তবা কারো স্বামী নিখোঁজ, কারো যুবতী মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে রাজাকাররা। পরে অবশ্য জানা গেল কাসুন্দিয়ার জগৎপাল আর তার ভাইয়ের পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় শরণার্থী ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছে। শ্যামল ছায়ার হাসান আলি একটি প্রতিবাদী চরিত্র। সবসময় চুপচাপ থাকে সে। একসময় চেয়ারম্যানের কথায় রাজাকারে নাম লিখিয়েছিল হাসান আলি। কিন্তু মিলিটারিদের সাথে হিন্দুপাড়ায় আগুন দেয়া, নিরীহ ছেলেদের চোখের সামনে গুলি করে মারা আর মেয়েদের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সহ্য করতে পারেনি হাসান আলি। প্রতিশোধের দৃঢ় শপথ নেয় সে। মেথিকান্দা জায়গাটা মুক্তিসেনাদের কাছে এক রহস্য। এর আগে চারবার আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে। পাঁচ নম্বর অপারেশন এবার। রামদিয়া পৌঁছাতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। ঘন অন্ধকারেও হাসান আলি টুনু মিয়ার নৌকা সনাক্ত করে ফেলে। পরিকল্পনা মাফিক তাদের যৌথবাহিনী মেথিকান্দায় আক্রমণ করবে। অদূরে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার প্রচণ্ড আওয়াজে দলের সবাই চাঙ্গা হয়ে ওঠে। থানার মিলিটারি ক্যাম্প লক্ষ্য করে চলতে থাকে তাদের রণ প্রস্তুতি।
সৌরভ :
সৌরভ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ ঢাকার আবাসিক এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কাহিনী চিত্রায়িত করেছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে শফিক নামের এক যুবক। সে লাঠিতে ভর করে পথ চলে। শারীরিক অক্ষম হওয়ায় তাকে পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে হেনস্তা হতে হয় না। শফিকের বাসাবাড়ি দেখা শোনার কাজে বিশ্বস্ত সহচর কাদের মিয়া। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে ওঠা-বসা কাদেরের। সে বাইরে থেকে একেকদিন একেক ধরনের খবর নিয়ে ঘরে ফেরে। একদিন কাদের এসে বলে, তেরো লাখ ছয়চলিশ হাজার পাঁচ’শ পাঞ্জাবি এখন ঢাকা শহরে। অন্যদিন কাদের খবর নিয়ে এলো, জেনারেল টিক্কা খানকে মেরে ফেলা হয়েছে। আরেকদিন কাদের বাচ্চু ভাই দরবেশের চায়ের দোকান থেকে পাকা খবর আনল, মেজর জিয়া চিটাগাং এবং কুমিল্লা দখল করে ঢাকার দিকে রওনা হয়েছে। দাউদকান্দিতে তুমুল ফাইট হচ্ছে। অবশেষে কাদের মিয়া নানা ঘাটের জল খেয়ে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখায়।
নিচতলার ভাড়াটে আজিজ সাহেব বিলু-নীলু নামের দুই যুবতীপ্রায় কন্যা নিয়ে থাকেন। আজিজ সাহেব দীর্ঘদিন যাবৎ শয্যাশায়ী। চোখে দেখতে পান না। নিয়মিত বিবিসির খবর শোনেন তিনি। কয়দিনে কয় হাজার মিলিটারি খতম হলো এসব তথ্য তার নখদর্পণে।
শফিকদের বাসার আরেক ভাড়াটে জলিল সাহেবকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জলিল সাহেবের ভাই তাকে খুঁজতে এসে নানা ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি দৈনিক পাকিস্তানে ‘সন্ধান চাই’ বিজ্ঞাপন দেন এবং পুরস্কার ঘোষণা করেন। বিজ্ঞাপনের নেতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়।
১৯৭১ সালের শাসরুদ্ধকর সেই দিনগুলোতে বাঙালি জনসাধারণকে বিভিন্ন অনভিপ্রেত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ঘোষণা প্রচার হওয়ার পর এক ব্যক্তি এসে বলল সে জলিল সাহেবকে মিরপুরে আটক অবস্থায় দেখেছে। টাকা পয়সা খরচ করলে সে দেখা করিয়ে দিতে পারে। এভাবে ধোঁকা দিয়ে সে বেশকিছু টাকা পয়সা এবং তৈজসপত্র হাতিয়ে নিয়ে যায়। মানুষ যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। ফাঁসির আসামিও একসময় মৃত্যুভয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের সেই নয় মাস নিজেকে মানিয়ে নেয়া মোটেও সহজ ছিল না। কেননা তাদের সামনে কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা ছিল না। তবে সবকিছুর মাঝেও একটা আশার ব্যাপার ছিল এই। একদিন দেশটা স্বাধীন হবে। একদিন মুক্তি পাবে দেশের মানুষ।
নির্বাসন :
হুমায়ূন আহমেদ ‘নির্বাসন’ উপন্যাসে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের একটি পটভূমি তুলে ধরেছেন। জরীর চাচাতো ভাই আনিস আর্মির লেফটেন্যান্ট ছিলেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে পাক আর্মির সাথে যুদ্ধের সময় তার মেরুদণ্ডে গুলি লাগে, সেই থেকে তার পেরাপাজিয়া হয়। কোমরের নিচের অংশটুকু অবশ। মাঝে মধ্যে ব্যথার তীব্রতায় অস্থির হয়ে ওঠে আনিস। তখন তাকে পেথিড্রিন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে জরী এবং আনিস একে অপরকে পছন্দ করতো। জরীর বিয়ে ঠিক হলে সে বড় চাচাকে বলে বিয়ে ভেঙে দেয়। কিন্তু যুদ্ধ তাদের জীবনের সব হিসাব এলোমেলো করে দেয়। পি.জি হাসপাতালে আনিসকে দেখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে জরী। সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আনিস বলে, ‘একটা যুদ্ধে অনেক কিছু হয় জরী।’ এখানে আনিসের কণ্ঠে প্রকাশ পেয়েছে অসহায় আকুলতা। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হয়। দেশের জন্য লড়তে গিয়ে অনেকে জীবন বিলিয়ে দেন। অনেকে পঙ্গু হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকেন। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারানো ত্যাগী যোদ্ধাদের নিয়ে ভাববার ফুরসত মেলেনি অনেকেরই।
দেশ স্বাধীন হলে একসময় জরীর বিয়ে হয়ে যায়। আনিস অবহেলায় পড়ে থাকে একলা এক ঘরে। যুদ্ধ-পরবর্তী সাজানো গোছানের দিনগুলো মোটেও সুখকর ছিল না। এমনও দেখা গেছে, স্বামীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে স্ত্রীর হয়তো অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেছে। একদিন আচমকা ক্র্যাচে ভর দিয়ে আহত নিখোঁজ স্বামী এসে হাজির।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নির্বাসন উপন্যাসে জীবনের অনেক কিছু হারিয়ে স্বাধীনতা ক্রেতা আনিসের জীবন-সংগ্রাম ফুটিয়ে তুলেছেন।
১৯৭১ :
১৯৭১ উপন্যাসে দেখা যায় নীলগঞ্জ গ্রামের দুই ধনী ব্যক্তি হলেন নীলু সেন ও জয়নাল মিয়া। দু’জনই গ্রামের মান্য ব্যক্তি। নীলগঞ্জ গ্রামে দু’জন বাইরের লোকও থাকেন। একজন মসজিদের ইমাম সাহেব অপরজন আজিজ মাস্টার।
নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি ঢুকলে সর্বপ্রথম ইমাম সাহেবেরই নজরে পড়ে। শেষরাতে আজান দেয়ার জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন ইমাম সাহেব। স্কুল ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মিলিটারির দল দেখে ভড়কে যান তিনি। নামাজ পড়ে ফেরার পথে নীল শার্ট পরা রাজাকার রফিক ইমাম সাহেবকে ধরে নিয়ে যায় মেজর সাহেবের কাছে। মেজর সাহেব দপ্তরি পাঠিয়ে স্কুলের হেডমাস্টার আজিককেও ডেকে আনে। রফিকের সহায়তায় মেজর দু’জনকে গ্রামের বিভিন্ন বিষয়, গ্রামে মুক্তিবাহিনী আছে কিনা, শেখ মুজিবকে চেনে কিনা এসব জিজ্ঞাসাবাদ করে। পছন্দমত উত্তর না পেয়ে দু’জনকেই মারধর করা হয়।
সঠিক তথ্য না দেয়ায় আজিজ মাস্টারকে নির্মম শাস্তি দেয়া হয়। মানসিক অত্যাচারের সর্বশেষ ধাপে নিয়ে গিয়ে একসময় আজিজ মাস্টারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নীলু সেনকে হত্যা ও জয়নাল মিয়াকে অপদস্থ করা হয়।
পাকিস্তানিরা কোনভাবেই এদেশের মানুষকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তেমনি বাস্তবতার এক নির্মম পরিহাস ফুটে উঠেছে ১৯৭১ উপন্যাসে। রাজাকার রফিক মেজর এজাজ আহমেদের সকল নির্দেশ মানলেও মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করায় মেজর তাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না। কার্যোদ্ধার হলে একসময় বিভিন্ন দুষ্কৃতকর্মের সহযোগী রফিককে গুলির নির্দেশ দিতে দ্বিধা করে না মেজর সাহেব।
আগুনের পরশমনি :
আগুনের পরশমনি রচিত হয়েছে ঢাকা শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে। দুই মেয়ে রাত্রি, অপালা ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন সরকারি চাকুরে মতিন সাহেব। রাত্রি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আর অপালা ক্লাস এইটে। লেখক যুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেন এই পরিবারের উৎকণ্ঠা, উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। এই পরিবারে আশ্রয় নেয় এক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, বদিউল আলম। আলম মুক্তিযোদ্ধা জেনে মতিন সাহেবের স্ত্রী সুরমা খুব ভড়কে যান। নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ভীত হয়ে তিনি আলমকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু আলম এ বাড়ির ঠিকানা সহকর্মীদের জানিয়ে দেয়ায় সে এখানেই থেকে যায়। অপারেশনের মুহূর্ত ঘনিয়ে এলে আলম, সাদেক, আশফাক, নূরু, সবাই একত্রিত হয়। গ্রেনেড চার্র্জে নূরুর জুড়ি নেই। তবে ট্রেনিং এর সময় একবার বিপত্তি ঘটেছিল। নূরু ঠিকমত পিন খুললেও ছুড়ে মারতে পারছিল না। হাত শক্ত হয়ে গিয়েছিল তার। সময় মাত্র সাত সেকেন্ড। দৌড়ে এসে মেজর ময়না মিয়া গ্রেনেড কেড়ে নিয়ে ছুড়ে মারলে সে যাত্রায় রক্ষা!
কয়েকটা সফল অপারেশনের পর পেট্রলপাম্পে ছিল আলমদের শেষ অপারেশন। সেদিনই তার বিদায় নেয়ার কথা। সবকিছু ঠিকমত সম্পন্ন হলেও একটা মিলিটারি ট্রাক তাদের পিছু নেয়। ঠিক সময়ে নূরু গ্রেনেড নিক্ষেপ করলেও তারা গুলিবৃষ্টির সম্মুখীন হয়। আলম গুলিবিদ্ধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে। ধরাধরি করে মতিন সাহেবের বাসায় নিয়ে এলে সবাই মিলে সেবা শুশ্রুষা করতে থাকে।
অপালার মা প্রথমে আলমকে মেনে নিতে না পারলেও পরে তাকে পুত্রস্নেহ দেন। এমনকি আলমের নিরাপত্তার জন্য তিনি নামাজ পড়ে দোয়াও করেন। আলম মুক্তিযোদ্ধা জানার পর থেকেই প্রভাবিত হয়েছে রাত্রি। বিষয়টি রাত্রির মার দৃষ্টি এড়ায়নি। অপালা বয়সে ছোট হলেও সেও সহজে সবকিছুই বুঝতে পারে।
সেদিন রাতেই আশফাককে তুলে নিয়ে যায় আর্মিরা। অমানুষিক নির্যাতনের পরও তার কাছ থেকে অন্যদের তথ্য বের করতে পারেনি তারা। ১৯৯৪ সালে ‘আগুনের পরশমনি’ দিয়েই হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে অভিষেক হয়। ‘আগুনের পরশমনি’ সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালনাসহ মোট আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
সূর্যের দিন :
সূর্যের দিন হুমায়ুন আহমেদ-এর একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস। যেখানে স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন ছেলে ‘ভয়াল ছয়’ নামে একটি দল গঠন করে। তাদের ইচ্ছা, পায়ে হেঁটে পৃথিবী পরিভ্রমণ করা। প্রথমে তারা যাবে আফ্রিকার গহিন অরণ্যে। দলের ছয়জনের একজন খোকন। বড় চাচার কড়া শাসনে বড় হয়েছে খোকন। বন্ধুদের সাথে মিছিলে গেলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয় তাকে।
১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ ইয়াহিয়া খান অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করলে বাঙালি জনতা রাস্তায় নেমে পড়ে। জনসমুদ্র দেখে ভীত বিহ্বল সরকার কার্ফু জারি করে। যার ফলে ভয়াল ছয় দলের ছেলেমানুষি সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ পেল না। বরং ওরা হয়ে উঠলো কিশোর মুক্তিযোদ্ধা।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সাজ্জাদ আর বল্টু গন্ডগোলের মধ্যে পড়ে যায়। গুলির ভয়ঙ্কর শব্দে দিশেহারা চারদিকের মানুষ। দৌড়ে এক বুড়ো দাদুর বাড়িতে আশ্রয় নেয় ওরা দু’জন। যুদ্ধে যোগদান করলে ভয়াল ছয় এর কেউই আর কখনও ঘরে ফিরতে পারেনি। এমন লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এদেশের স্বাধীনতা। লেখকের ভাষায়, ‘একটি সূর্যের দিনের জন্য এ দেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে প্রাণ দান করতে হলো।’
শহীদ পিতার সন্তান হিসেবে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার চাক্ষুষ সাক্ষী হওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধকে লালন করতেন চেতনায়। মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনাকে উপজীব্য করে রচিত তাঁর উপন্যাসগুলোই সে প্রমাণ বহন করে। ছোট ছোট দৃশ্যের মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ অসাধারণ দক্ষতার সাথে তুলে ধরেন হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা, নারীর উপর বীভৎস নির্যাতন, গেরিলা যুদ্ধ, মুক্তিসেনাদের তৎপরতা, রাজাকারদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড প্রভৃতি। সশরীরে না থাকলেও হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে আছেন তার অনবদ্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যে, বেঁচে আছেন অগণিত ভক্তকুলের হৃদয় মাঝে। সাহিত্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ উদঘাটনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।