
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
সিরাজুল ইসলাম মুনির
প্রকাশক : আগামী
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
মূল্য : ২০০০ টাকা
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস আজ আর কারো অজানা নয়। গল্পে-কবিতায়, উপন্যাস-প্রবন্ধে কিংবা ছড়া-গীতিতেও মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। প্রতিনিয়ত একে ঘিরে রচিত হচ্ছে নতুন নতুন পরিকল্পনা। কারণ মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির প্রেরণার বাতিঘর। বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা দীর্ঘ উপন্যাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে (২০১৮)।
কাব্যিক নামের ভেতর দিয়ে লেখক বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাস খুঁজে নিয়েছেন। যে ইতিহাসের মধ্যে আছে এ জাতির প্রতি পাকিস্তানিদের নির্যাতন ও নির্মমতার কাহিনি। আছে স্বাধীনতার নতুন সূর্যোদয়ের কাহিনি। আছে সহস্র ত্যাগ আর তিতিক্ষার গল্প।
ইতিহাস থেকে উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে নতুন কোনো বিষয় নয়। এ ধারাবাহিকতায় সিরাজুল ইসলাম মুনির (১৯৫৬) ইতিহাসের সাহায্য নিয়ে সৃজন করেছেন তার বৃহৎ উপন্যাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে (২০১৮)। মুক্তিযুদ্ধের পেছনে আছে ২৩ বছরের শাসন-শোষণ ও নির্যাতন। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস মানে স্বাধীনতা প্রাপ্তির উল্লাস নয়। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। আলোচ্য উপন্যাসে এর প্রতিফলন কতটুকু সার্থক হয়েছেÑ তা আমরা খুঁজে দেখতে পারি।
আলোচ্য উপন্যাসটিতে একশত তেইশটি চ্যাপ্টার রয়েছে। সহায়ক গ্রন্থপঞ্জিসহ এর সংখ্যা আরো এক বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি পরিচ্ছেদের নামকরণ করা হয়েছে কাব্যময় ভাষায়। যেমন প্রথম পরিচ্ছেদের নাম- কৌটোবন্দি মন। এখানে আমরা উপন্যাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দারা এবং দীপাকে পাই। শুরুতেই দীপাকে খাটে নতুন বউয়ের মতো স্থির হয়ে বসে থাকতে দেখি। প্রতীক্ষার পিঁড়িতে দীপা বসে থাকে দারার জন্য। অফিস থেকে ফিরে দারা দীপার নিমগ্নতার চিত্রটি উঁকি মেরে দেখে। এ দৃশ্য যেন উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদের ইঙ্গিত বহন করে।
এরপরের পরিচ্ছেদ পিন্ডি না ঢাকা। এখানে ইতিহাস ও ইতিহাসের মানুষগুলো অগ্নিসময় নিয়ে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তার প্রাণবন্ত বিবরণ উঠে এসেছে এ পরিচ্ছেদে। ’৭০ এর নির্বাচন পরবর্তী সময়ের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর নীলনকশাকে কেন্দ্র করে পূর্ববাংলায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। পল্টনে যোগ দিচ্ছে হাজার হাজার ছাত্র আর মিছিলের পর মিছিল।
প্রথম দেখা, মিছিলে। ইতিহাসের এক দুঃসময়ের চিত্র এ পরিচ্ছেদে। দারা ও দীপার প্রথম সাক্ষাৎ। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর ঢাকার রাজপথ। সেই সময়ের বিখ্যাত সব শ্লোগান এ পরিচ্ছেদে উঠে এসেছে। মিছিলে দীপার মুখ থেকে শ্লোগান উচ্চারিত হলে দারা তাকে মিছিলের অগ্রভাগে নিয়ে গেছে। সে সময়ের সে শ্লোগানগুলো বিপ্লবী ও সংগ্রামী প্রাণে যে প্রদীপ্ত আভা ছড়িয়ে দিয়েছিল তার গুরুত্ব কম নয়! শ্লোগানগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ তোমার দেশ আমার দেশÑ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলার মহান নেতাÑ শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। বীর বাঙালি অস্ত্র ধরÑ বাংলাদেশ স্বাধীন কর। তোমার আমার ঠিকানাÑপদ্মা, মেঘনা, যমুনা। স্বাধীন কর, স্বাধীন করÑবাংলাদেশ স্বাধীন কর। পিন্ডি না ঢাকাÑ ঢাকা, ঢাকা।১
দীপার চোখের ভেতর মিছিলের জোয়ার। এ মিছিলের একটাই গন্তব্য যেন তা হলো স্বাধীনতা। মিছিলের অগ্রভাগ এবং এর ব্যাপ্তি বোঝাতে লেখক বলেন- শ্লোগানের প্রতিধ্বনি শহরের দালানকোঠা, বৃক্ষরাজি পেরিয়ে মাঠ, নদী, প্রান্তর ছাড়িয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে দূরের গ্রামে, সমগ্র বাংলাদেশে। ২
এরপরের পরিচ্ছেদে ২৪ জনকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হত্যা করা হয়েছে। তার মধ্যে আবু জাফর গিফারী কলেজের ছাত্রনেতা ফারুক ইকবাল। রামপুরা-মৌচাক স্থলে গুলিতে নিহত হন। শ্রমিকলীগ আর ছাত্রলীগের যৌথ উদ্যোগে সভা চলে। সভায় বঙ্গুবন্ধু উপস্থিত হন। এ সভায় বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দেন ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত হরতাল হবে। অফিস-আদালত, কল-কারখানা সব বন্ধ থাকবে। এই মঞ্চে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা করা হয় ৫৪ হাজার ৫ শত ৬ বর্গমাইল বিস্তৃত এই ভৌগোলিক সীমারেখার নাম বাংলাদেশ। আর শেখ মুজিবুর রহমান বাংলােেশর সর্বাধিনায়ক। এই সভায় উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র দীপা উপস্থিত ছিল। এই সভাস্থলে দীপার অনুভূতি মাতৃসুলভ। সে অনুভব করে তার তলপেটে বাংলদেশ নামক এক শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এমন ভাবনার মধ্যেই দারার সঙ্গে তার আবারও দেখা হয়।
এখন আর কেউ কারো সঙ্গে আদর্শগত বিরোধ নেই। সময় যেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। যে কোনো সময় লেগে যেতে পারে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ।
এ পরিচ্ছেদে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের কথাও উঠে এসেছে। উঠে এসেছে ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে সবার প্রস্তুতিপর্ব। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া এসব হুবহু উঠে এসেছে। স্বাধীনতা ঘোষণা করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে তাই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
পরের দিন ৭ মার্চের ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু। তাই তিনি রেণুর সঙ্গে আলাপ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি কিভাকে ভাষণ শুরু করবেন, সে বিষয়েও একান্তভাবে চিন্তা ভাবনা করেন। কিন্তু তাঁর মাথায় চিন্তার ঝড় থেমে থাকে না। লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ববাংলার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানিরাই এই টিক্কা খানকে কসাই নামে ডাকে। কারণ বেলুচিস্তানে বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে সে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে।
রেসকোর্সের ময়দান লোকে লোকারণ্য। বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বর থেকে বের হলেন। ভিন্নপথে বেলা ৩টার দিকে বঙ্গবন্ধু এলেন। উপন্যাসের এ পরিচ্ছেদে দীপাকে দেখা যায় সেও মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে এসেছে। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় শেখ মুজিবের বক্তৃতা শেষ হয়। দীপা বাড়িতে গিয়ে বক্তৃতার আবেগ ছড়িয়ে দেয় তার মাকেও।
সময় বয়ে চলেছে। পতাকার পরিবর্তন হচ্ছে। সবাই মিলে পতাকা নির্দিষ্ট করতে সময় দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সমঝোতা হচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েকটি পরিচ্ছেদে দারা দীপা ও পাখির কার্যক্রম বর্ণিত হয়েছে। পাখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। থাকে রোকেয়া হলে। রাজনীতির জন্য একপ্রাণ দারা। ছুটোছুটি করছে। সংগ্রহ করছে সবার কাছ থেকে বন্দুক, পিস্তল এসব। প্রশিক্ষণ নিচ্ছে আগাম যুদ্ধের। কিভাবে বন্দুক চালাতে হয় তারা শিখছে। নিশ্চিত যুদ্ধের সম্মুখে দেশ। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি চলছে।
পতাকা তৈরির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উঠে এসেছে। পতাকার রং নির্বাচন করা, কাপড় কেনা, পতাকা তৈরির গল্প ও গুরুত্ব উঠে এসেছে লেখকের বর্ণনায়।
পরদেশী এক চরিত্রও এই উপন্যাসে একজন দ্রষ্টা। ইট মিনস তুম হেড হিন্দু পরিচ্ছেদে মৃত্যু মিছিলের পর লাশ সরানোর কাজ চলছে। বিহারিরা মিউনিসিপ্যালটির ট্রাক নিয়ে লাশগুলো মাটি চাপা কিংবা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিচ্ছে। পরদেশীকেও নেয়া হয়েছে লাশ সরানোর কাজে। পরদেশী মর্গের ভেতরে ঢুকে দেখে সেখানে অগুনতি লাশ। গুলিবিদ্ধ, বেয়নেটের ধারালো খোঁচায় ক্ষত-বিক্ষত খাবলা দিয়ে তোলা মাংসের ক্ষত চিহ্ন, অর্ধনগ্ন পুরুষ, নগ্ন নারী দেহ, ক্ষতবিক্ষত জননযন্ত্র। দুফালি হয়ে ঝুলে থাকা স্তন বীভৎসতার সকল নমুনা নিয়ে শত লাশের স্তুপ দেখে পরদেশী। পরদেশী ডুকরে কেঁদে ওঠে। তখন তার আর বমি বমি আসে না। তার নাকে পচন ধরা মাংসের গন্ধ লাগে না।
মানুষের আত্মাগুলো যেন ডুকরে কাঁদছে, পরদেশী যেন তাদের কথাগুলো শুনতে পায়। তারা বলছে কী হলো পরদেশী, এমন হয়ে গেল কেন? এমন হলো কেন? পরদেশীর মধ্যে এমন সব ভাবনা উঠে আসার পর সে হঠাৎ চমকিত হয়।
সে দেখে অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ে। এতে রূপবতী মেয়ে সে জীবনে দেখেনি। চোখগুলো টানা টানা ফর্সা রং এমন সৌন্দর্যের মধ্যেও কী এক ব্যথার ছায়া। তার শরীরটা ঢাকা আছে একজন বয়স্ক মানুষের শরীরের নিচে। তার পরনে পাঞ্জাবি, সাদা লুঙ্গি। মুখ জুড়ে সাদা দাড়ি। তার বুকের ডান পাশ বিদীর্ণ। এখনো তাজা শরীর, তাজা রক্তের দাগ। হয়তো ভোররাতে নামাজ পড়তে বের হয়েছিল। তখন গুলি খেয়েছে।
পরদেশীর মানবিকতাবোধ এবং তার অন্তরের যে ব্যথার পরিমাণ উপচে উঠেছে লেখক তাকে পাঠকের কাছে বাস্তব করে তুলেছেন। সে লাশের স্তুপে যে সুন্দরী মেয়েটিকে দেখতে পেয়েছিল তার তলপেট থেকে জনন অঙ্গ পর্যন্ত লম্বা করে চেরা ছিল। অত্যাচারের চিহ্ন মেয়েটির শরীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। মেয়েটির পরদেশীর বেদনাবোধ জাগ্রত হয়। সে তাকে উদোম করে বাইরে নিতে চায় না। তাই আরেকটি পুরুষ লাশের গা থেকে প্যান্ট খুলে নিয়ে মেয়েটিকে পরিয়ে দেয়। এই কাজ করতে গিয়ে অনেক মৃতদেহের ওপর তার পা লেগেছে সে অনুশোচনায় সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।৪
দারা বুড়িগঙ্গা পার হয়ে কেরানীগঞ্জের দিকে যায়। ওখানে নেতৃবৃন্দ আছে। কিন্তু ওখনে গিয়ে তেমন কাউকে পায় না সে। কয়েকদিন পর পাক আর্মিরা এসে ওখানেও হত্যাযজ্ঞ চালায়। জিনজিরা রক্তভেজা জনপদে তৈরি হয়। দারা অল্পের জন্য বেঁচে গেল। দারা বাড়ির পথে পা বাড়ায়। নদীপথে এসে সীতাকুণ্ডে পৌঁছে। ঢাকার মানুষ যে যেদিকে পারছে ছুটছে। তাজউদ্দীন, আমির উল তাঁরা বর্ডার পার হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেষ্টা করছেন। বঙ্গবন্ধুর বরাত দিয়ে তারা ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা চাইছেন। অপরেশন সার্চ লাইট ঢাকাকে যতোটা কাবু করেছে দেশের অন্যান্য জেলাকে ততোটা পারেনি। প্রায় জায়গা থেকে শক্ত প্রতিরোধের খবর আসছে। যশোর, খুলনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া সব জায়গা থেকে টিক্কা খানের মন খারাপ করা খবর আসছে। চট্টগ্রামের যুদ্ধের চিত্রও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাদা মেঘ কালো মেঘ পরিচ্ছেদে খালেদ মোশাররফ আর শাফায়াত ৪র্থ বেঙ্গল কোম্পানিগুলোকে পুনর্গঠন করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তারা ছাত্র যুবকদের ট্রেনিং দিতে শুরু করেছেন। শরবিদ্ধ পাখি পরিচ্ছেদে এদেশের হাজারও তরুণীর বাস্তব চিত্র ঔপন্যাসিক যেন হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছেন। সেই সময়ে যে সব নারী ধর্ষিত হয়েছেন তাদের খণ্ডচিত্র এই পরিচ্ছেদে উঠে এসেছে। তাদের মানসিক যন্ত্রণার চিত্র ঔপন্যাসিক যেভাবে তুলে এনেছেন তা অনবদ্য হয়ে ফুটেছে।
দারা শাবরুম দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবে। খোঁজ করছে নেতাদের। অরুণ নামের এক ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়। গাড়িতে যাবার পথে কয়েকজন শিল্পীর কথা দারার কানে আসে। তারা সবাই চট্টগামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। এ স্থানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সাবলীল ব্যবহার লক্ষণীয়। বঙ্গবন্ধুর হাইকমান্ডের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন। মুক্তিযুদ্ধের একটা বিরাট অংশ ভারতে সংগঠিত হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে আর কোনো মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে ভারতীয় অংশের মুক্তিযুদ্ধের চিত্রটি এমন নিখুঁতভাবে আসেনি। কিন্তু আলোচ্য উপন্যাসে সিরাজুল ইসলাম মুনির সে সঙ্কট ঘুচিয়ে দিয়েছেন। বিস্তারিত বর্ণনায় তিনি সে সময়ের ওপারের ঘটনা তুলে এনেছেনÑ উপন্যাস পাঠে তার প্রমাণ মেলে। অরুণের পরিবারের সঙ্গে দারার ঘনিষ্ঠতা ও নেতৃবৃন্দের নানা তৎপরতার চিত্রও উপন্যাসে অঙ্কিত হয়েছে।
কারাগারের দিনগুলো পরিচ্ছেদে বঙ্গবন্ধুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে এনেছেন লেখক। পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বসে তিনি সবার কথা ভাবছেন। দেশের কথা ভাবছেন। চোখ বন্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমির দিকে তাকালেন, তার ছেলেরা, তার কৃষক ভাই, শ্রমিক ভাইরা, পুলিশ-ইপিআর আর বেঙ্গল রেজিমেন্ট-কর্মরত সৈনিকরা সবাই মিলে নিশ্চয়ই আজ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। বঙ্গবন্ধুর ভাবনাগুলো আপনাআপনি এসে ধরা দেয়। কোনো বন্দী মানুষ ভাবনা থেকে নিস্তার পায় না। ভাবতে না চাইলেও ভাবনা তাকে পর্যুদস্ত করে। তিনি যুদ্ধ দৃশ্য কল্পনা করেন এবং জানেন মুক্তিকামী মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারে না। তার বাঙালিকেও কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। তার বাঙালি একদিন স্বাধীন হবেইÑ এই আশাবাদ তাঁকে কারাগারে আশান্বিত করে।৬
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের খবর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্কের গুরুত্বও উপন্যাসে উঠে এসেছে। বিশ্ব রাজনীতির মনমানসিকার চিত্র, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের তৎপরতার চিত্রও উঠে এসেছে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বহির্বিশ্বের অপতৎপরতা মুনির তাঁর উপন্যাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যুক্ত করে নতুনত্ব এনেছেন। সাধারণত এত বৃহৎ আয়তনের পটভূমির উপন্যাসে পরিচ্ছেদের পর পরিচ্ছেদের যোগসূত্র রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ঔপন্যাসিক সে দুরূহ কর্মটি সার্থক প্রতিপন্ন করেছেন। প্রতিটি পরিচ্ছেদে পাঠককে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় রেখে কাহিনি এগিয়ে নেয়ার মধ্যে মুন্সিয়ানার ছাপ রয়েছে। বিশেষ করে পার্বত্য এলাকার মুক্তিযুদ্ধ, বর্ডারের ওপারে মুক্তিযুদ্ধের জন্য যারা প্রতিনিয়ত ট্রেনিং আর পেছনে কাজ করেছেন তাদেরকে তিনি তুলে এনেছেন। পাখি, দারা, রফিক, দীপা এসব চরিত্রের জন্য লেখকের অনুভূতির জায়গা খুব দৃঢ় বলে প্রতিভাত হয়েছে। তাদের তিনি ঠিক মতো থ্রোয়িং করতে পেরেছেন বলেই পাখি হয়ে উঠেছে সাহসী নারী যোদ্ধা। সে জীবনবাজি রেখে তার আর আসমার এমনকি দীপার অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যে ইঙ্গিত দিয়ে ঔপন্যাসিক উপন্যাস শেষ করেছেন তাও বেশ ইঙ্গিতবহ।
উপন্যাসের নামকরণ বিষয়টি নিয়ে লেখক আরো চিন্তা করতে পারতেন। একটি উল্লেখযোগ্য গানের কলি ব্যবহার না করে আরো ইঙ্গিতময় নাম তিনি হয়তো খুঁজে নিতে পারতেন। তাহলে মনে হয় ষোলোকলায় পূর্ণ হতো সবটুকু।
যা হোক, লেখক কঠিন পরিশ্রম করে ইতিহাসকে এমন একটি হৃদয়মথিত করা উপন্যাসের জন্ম দিয়েছেনÑ তার জন্য তিনি সার্থক। তিনি ইতিহাসের চরিত্রগুলোকে উপন্যাসে রূপদান করেছেন খুব সহজেই। বঙ্গবন্ধুর সেন্টিমেন্ট তিনি খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে ধরতে পেরেছেন বলে মনে হয়। আলোচ্য এ অংশে নিচের উদ্ধৃতিটি আমরা লক্ষ করতে পারি।
টেমসের ওপর দিয়ে বাঁক নিয়ে উড়ে যাবার সময় তিনি জানালায় চোখ রাখেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন এমন হবে, বুড়িগঙ্গার ওপরও এরকম অনেক আলোকোজ্জ¦ল ব্রিজ নির্মাণ করবেন, যা দু’পাড়কে একত্রিত করবে। ঢাকা হয়ে উঠবে মেগা সিটি, লন্ডনের মতো, এরকম আলোক উৎসারী। ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে যাবার সময় তার মনে হয়, এ হয়তো তার ধলেশ্বরী অথবা পদ্মা।৭
সিরাজুল ইসলাম মুনিরের শ্রম ও নিষ্ঠার পরিচয় মেলে আলোচ্য উপন্যাসে। বৃহৎ আয়তনের এই উপন্যাসে তিনি ইতিহাসের পাত্র-পাত্রীদের সঙ্গে উপন্যাসে কল্পিত বাস্তব চিত্রের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন। ঘটনার ঘনঘটা তেমন নেই বললেই চলে। প্রতিটি বর্ণনা এবং ভাষার সাবলীল ব্যবহার লেখকের গভীর অনুসন্ধিৎসু মনের পরিচয় বহন করে। লেখকের শিল্পচেতনা উপন্যাসটিকে যথার্থ অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে করি। একটি দেশের জন্ম ও সময়কালকে নিয়ে এ ধরনের উপন্যাস রচনা করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বিশ্বাসের জায়গাটুকুতে সৎ থেকে পটভূমি অঙ্কন করা চাট্টিখানি কথা নয়! পুরো উপন্যাসে কল্পনার বাড়াবাড়ি নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে সেটুকু উপন্যাসের প্রয়োজনে এসেছে এবং তা যথোপযুক্ত। আর বানান সম্পর্কিত যেটুকু ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে তা খুবই সামান্য।
হয়তো পরবর্তী মুদ্রণে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। ইতিহাস আর ফিকশন সমান্তরালে এগিয়ে নেয়ার যে কৃতিত্ব মুনির দেখিয়েছেন- তার জন্য অবশ্যই তিনি ধন্যবাদ পেতে পারেন।